শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
তার শরীর সংকেতময়। তার স্মৃতি নেই, বোধ নেই, মস্তিষ্ক নেই, কিন্তু শরীর আছে, আছে বিভিন্ন সংকেত। অতিশয় ক্ষীণ তার দৃষ্টিশক্তি, নিজের চারধারে কয়েক ফুট মাত্র দেখতে পায়, তার বাইরে সব আবছায়া। সে কখনও আকাশ দেখেনি, দিগন্ত দেখেনি, সে চেনে না সূর্যোদয়ের বর্ণ বা জ্যোৎস্নার সৌন্দর্য। সম্পূর্ণ বধির সে, কোনও সংগীত বা শব্দই সে কখনও শোনেনি। কিন্তু গাছের একটি পাতা খসে পড়লেও তার সংকেত সে শরীরের মৃদু তরঙ্গে টের পায়। পাপ বা পুণ্য, ধর্ম বা অধর্ম কিছুই নেই তার। ভাল মন্দ নেই, অবসাদ নেই, আনন্দ বা বিষাদও নেই। আছে ক্ষুধা, এবং মেটানোর জন্য শ্রম ও ক্লেশ। আছে মরসুমি প্রজননও, যা আনন্দের চেয়ে অনেক বেশি ব্যধ্যতামূলক। হ্যাঁ, তার ভয় আছে, জৈবিক ভয়, যাকে সে সঠিক চেনে না কিন্তু টের পায়।
মাটির গভীরে আঁকা-বাঁকা এক গুহাপথ পেরিয়ে অপরিসর, অন্ধকার, কবোঞ্চ এক সংকীর্ণতায় সে তার দীর্ঘ শরীর গুটিয়ে নিস্তেজ শুয়ে আছে গভীর ঘুমে। স্বপ্নহীন এক অসাড় ঘুম। বাইরে শীত। তার শীতল রক্তের শরীরে শীতের সংকেত ধরা পড়লেই তাকে গভীর গুহায় চলে যেতে হয়। মরণের মতো ঘুম জড়িয়ে ধরে তাকে। ক্ষুধা-তৃষ্ণা লোপ পায়, ধীর হয়ে যায় রক্তের প্রবাহ, বিলম্বিত স্পন্দনে শরীর স্তিমিত হয়ে যায়। উপরে উত্তরের শীতল বাতাস বয়ে যায়, সে তার পাতালঘরে শরীরের অমোঘ সংকেতে শুয়ে থাকে। যখন শীত ঋতু শেষ হবে, উত্তপ্ত হয়ে উঠবে চরাচর তখন এই গহীন গভীর গহ্বরে ঠিক সংকেত আসবে শরীরে, ওঠো! জাগো! দীর্ঘ উপবাস ভঙ্গ করো, ছাড়ো খোলস, বয়ে যাও জলের ধারার মতো। গভীর ঘুমের ভিতর থেকে সে সংকেত পায়, জেগে উঠবার আর দেরি নেই।
তুমি হাত দেখতে পারো সুদর্শনদা?
আমার দোষ কী জানো দিদি? সব জিনিসই একটু একটু জানি। কোনওটাই পুরোপুরি জানি না। শেখার কি আর সময় পেলুম! একটা জিনিস হয়তো সবে মন দিয়ে শিখতে লেগেছি অমনি সেখান থেকে পাততাড়ি গোটাতে হল। আর শেখা হল না।
আহা, যা জানো তাতেই হবে। বলো না আমার হাত দেখে, পরীক্ষায় কেমন হবে।
ওসব কি বলতে পারি। পয়সাখের জ্যোতিষীরা ওসব বলে থাকে। খানিক ফলে, খানিক ফলে না। আন্দাজে বলা তো। ও ব্যাটারা জানেও না কিছু। তবে তোমার হাতের রেখা-টেখা ভাল, খারাপ হওয়ার কথা নয় দিদি।
যাঃ, ওরকম বললে হবে না। বেশ ভাল করে দেখে বলো।
বললুম তো, পরীক্ষায় কী হবে তা বলার মতো এলেম আমার নেই। ভার্গব জ্যোতিষীর কাছে শিখছিলুম একটু-আধটু। চেঁটিয়া লোক, সহজে তার কাছ থেকে বিদ্যে বের করা যায় না। শেখানোর জন্য বিস্তর ঝোলাঝুলি করতে হয়। তাও মাল ছাড়তে চায় না কিছুতেই।
ভার্গবটা কে?
নারায়ণগড়ের নাম শুনেছ?
না তো! সেটা আবার কোথায়?
খড়্গপুর থেকে কাঁথির রাস্তায়। বর্ধিষ্ণু গাঁ।
তুমি সেখানেও ছিলে নাকি?
বছরটাক থাকতে হয়েছিল। সেখানকার ইস্কুলে আমার এক মামাতো ভাই ছিল মাস্টারমশাই। কোথাও সুবিধে হচ্ছিল না বলে তার কাছে গিয়ে জুটেছিলাম। সে তখনও বিয়ে-টিয়ে করেনি, দিব্যি ছিলাম দু ভাইয়ে। ইস্কুলেরই অফিসঘরে রাতে বিছানা করে শুতুম। আমার কাজও জুটে গিয়েছিল। হোস্টেলে রান্না করতুম দু বেলা।
তোমার বেশ কালারফুল লাইফ, না সুদর্শনদা?
সুদর্শন লাজুক হেসে বলে, তা বটে দিদি। পেটের দায়ে ঘুরেছি বটে, কিন্তু তাতে ঠকিনি। মেলা মানুষ দেখেছি, মেলা দৃশ্য, কত কাণ্ডকারখানা। মাঝে মাঝে একা একা বসে সেসব খুব ভাবি।
নারায়ণগড়ে কী হয়েছিল বললে না?
হ্যাঁ, সে কথাই বলি। ইতিহাসের মাস্টার ছিলেন কামাক্ষাবাবু। বিষয়ী লোক। জমিজিরেত ছিল। সুদ আর বন্ধকীর কারবার করে বেশ ফুলেফেঁপে উঠেছিলেন। কাঁথিতে একটা সোনার দোকান করে বড় ছেলেকে বসিয়ে দিলেন। ওসব লোকেরই আবার জ্যোতিষীর দিকে টান থাকে খুব। সব রক্ষে হয় কিনা, কারবার আরও বাড়ে কিনা, বিপদ-আপদ হয় কিনা, নানা দুশ্চিন্তায় ভোগে তো৷ তা তার বাড়িতেই এসে থানা গাড়ল ওই ভার্গব জ্যোতিষী। সবাই বলত মস্ত সিদ্ধাই। তা বলব কী দিদি, দু-চারটে মোক্ষম কথা বলেও ফেলত। নিমাই জানার গোপন রোগ ছিল, কেউ জানত না, ফস করে পাঁচজনের সামনে ভার্গব ফাঁস করে দিলে। গুণধরবাবু তার বউকে নিয়ে গিয়ে সবে পেন্নাম করে বসেছেন, ভার্গব বলল, উটি কে গো তোমার সঙ্গে গুণধর? গুণধর বলল, আজ্ঞে আমার বউ। ঘন ঘন মাথা নাড়া দিয়ে ভার্গব বলল, ও তোমার বউ হতে যাবে কেন, ও তো অন্যের বউ। কী লজ্জার কথা বলো পাঁচজনের সামনে! কিন্তু বউটা তখন হাউরেমাউরে করে কেঁদে গিয়ে ভার্গবের পায়ে পড়ল। তখন জানা গেল, সে সত্যিই বালেশ্বরে স্বামী সন্তান ছেড়ে গুণধরের সঙ্গে দশ বছর আগে পালিয়ে এসেছিল।
এরকম একজন জ্যোতিষীই তো আমার এখন দরকার।
জ্যোতিষী বললে ভুল হবে। এ হল সিদ্ধাই, বুঝলে?
সিদ্ধাই আবার কী?
সে আছে। তুমি অত বুঝবে না। নিচুতলার সাধক আর কী। ওই যেসব মারণ-উচাটন, বশীকরণ করে ওরাই হচ্ছে সিদ্ধাই। পয়সার লোভে, মেয়েমানুষের লোভে শেষ অবধি স্বখাত সলিলে ডুবে যায়।
ভার্গবেরও কি তাই হয়েছিল?
তা জানি না দিদি। তবে ওরকমই হয় বলে শুনেছি। ওদের পাল্লায় যারা পড়ে তাদেরও ভাল হয় না। আমিও একটু পড়েছিলাম কিনা।
তুমি কীভাবে পড়লে?
আমিও গিয়ে জুটেছিলাম তার কাছে। বেশি কিছু আদায় করতে পারিনি ঠিকই, তবে লোকটা আমাকে হাত দেখতে শিখিয়েছিল। বেশ শিখেওছিলাম খানিকটা। একদিন আমাকে বলল, দ্যাখ, এসব কিন্তু ফক্কিকারি। খানিক মিলবে, খানিক মিলবে না। এ বিদ্যে কেউ পুরোটা জানে না। খানিকটা খানিকটা জেনে ওপরটা ওপরটা বলে। তোকে যেটুকু শিখিয়েছি তাই দিয়ে করেকম্মে খেতে পারবি। যা, লেগে যা।
তুমি কি জ্যোতিষীগিরিও করেছ নাকি?
না দিদি। সেসব করিনি। অন্তত পয়সা রোজগারের জন্য করিনি। নারায়ণগড় থেকে আমাকে পালাতে হল।
ওমা! কেন?
সে তোমাকে বলা যাবে না।
কেন বলা যাবে না?
ওসব কথা তোমার শোনার মতো নয়।
বুঝেছি।
কী বুঝলে দিদি?
বোধহয় কোনও মেয়ের পাল্লায় পড়েছিলে, তাই না?
খুব লজ্জা পেয়ে সুদর্শন বলল, ওরকমই ধরে নাও।
আহা, যখন ধরেই ফেলেছি তখন বলেই দাও না।
তুমি তো ছোট মেয়ে, তোমার কাছে কি ওসব বলতে আছে?
খুব খারাপ কথা নাকি?
না দিদি, খুব খারাপ কিছু নয়। আমি বরাবর ধর্মভীরু মানুষ। তবে বুদ্ধিটা কাঁচা। নানারকম ফেরে পড়ে নাকাল হতে হয় বুদ্ধির দোষে।
তাহলে বলতে দোষ কী?
আমি তো আহাম্মক, সবাই জানে। আর সেজন্যই ভবঘুরেমিও কাটল না আমার। তা এ সেই আহাম্মকিরই গল্প, বুঝলে?
আর ভূমিকা করতে হবে না। বলো তো!
নারায়ণগড়ে যে ইস্কুলে আমি কাজ করতাম সেটাতে ছেলে মেয়ে একসঙ্গে পড়ত। গাঁয়ের মেয়ে তো, সব বেশি বয়সে ছোট ক্লাসে পড়ত। একটা মেয়ে ছিল বেবি। ক্লাস নাইনে পড়ত। দেখতেও বেশ ছিল। স্কুলের দফতরির যক্ষ্মা হওয়ায় সে তখন দেশে গেছে। আমিই তার কাজ চালিয়ে নিচ্ছি তখন। ক্লাসে রোল খাতা বা নোটিশ নিয়ে যাওয়া, ঘণ্টা মারা থেকে বাগানে ঢুকে-পড়া গোরু-ছাগল তাড়ানো অবধি। তখন উঠতি বয়স, চেহারাখানা খারাপ ছিল না। তা ওই মেয়েটা একটু ঘুরঘুর করতে লাগল। ইস্কুল ছুটির পর একটা ভাইঝিকে কোলে নিয়ে চলে আসত ইস্কুলের মাঠে বেড়াতে। কথা-টথা হত।
বাঃ, বেশ রোমান্টিক ব্যাপার তো।
ভারী লজ্জা পেয়ে সুদর্শন বলল, কাঁচা বয়সের ব্যাপার তো, তাই বলতে চাইছিলাম না।
আরে দুর, এসব আজকাল জলভাত।
হ্যাঁ, তা ওই একটু ভাবসাব মতো হয়ে গিয়েছিল। তারাও বড্ড গরিব।
ব্রাহ্মণ ছিল কি মেয়েটি?
না না, তন্তুবায়।
কিন্তু তুমি যে আবার সাংঘাতিক শুদ্ধাচারী ব্রাহ্মণ।
ওই তো বললাম, কাঁচা বয়সে কি আর হিসেব থাকে?
তারপর কী হল?
গাঁ-দেশ তো, গাছের পাতা পড়লেও পাঁচকান হয়ে যায়। সুতরাং মেয়ের মা-বাপ এসে ধরল আমায় বিয়ে করতে হবে।
রাজি হলে বুঝি?
গাঁইগুঁই করেছিলাম। বংশে কেউ অন্য জাতে বিয়ে করেনি, ঘরে কথা হবে। কিন্তু সবাই এমন ধরে পড়ল যে না বলতে পারিনি। এমনকী হেডমাস্টার বলল বিয়ে করলে চাকরি পাকা করে দেবে। তাই লোভে পড়ে নিমরাজি হতে হল। এরকম যখন অবস্থা তখন ভার্গব গোঁসাই গায়ে জমিয়ে বসেছে। সেই সময়কারই ঘটনা। তুমি কি মানো দিদি, যে, ঈশ্বরের ইচ্ছাতেই সব ঘটে?
তাই হবে বোধ হয়।
যাই হোক, এক বর্ষাকালে ভোরবেলা উঠে শুনলাম বেবিকে রাতে সাপে কেটেছে।
ইস! মরে গেল নাকি?
না দিদি। মরেনি। রাত দশটা না এগারোটায় সাপকাটি হওয়ায় তারা গিয়ে ভার্গব গোঁসাইকে ধরে আনে। আর ভার্গব গোঁসাই নাকি সাধনপ্রক্রিয়া করে বিষ টেনে নিয়েছে নিজের শরীরে। গাঁয়ে হইচই, বেবিদের বাড়িতে লোক ভেঙে পড়েছে। কিন্তু সাপকাটি আমি খুব ভাল চিনি। আদাড়ে-পাদাড়ে ঘুরে এসব জ্ঞানগম্যি ভালই হয়েছে। সাপুড়েদের সঙ্গেও তো কম টো-টো করিনি। সাপ ধরতেও পারি।
অবাক হয়ে পান্না বলে, পারো? সোজা ব্যাপার দিদি, সাহস করলেই শেখা যায়।
ধরেছ কখনও?
অনেকবার।
মন্ত্রতন্ত্র আছে, না?
আছে, তবে সেগুলো কোনও কাজের নয়। আসল কথা হল, কায়দা কৌশল রপ্ত করা। নইলে মন্তর জানলে কিছু হবে না।
বেবির বাড়িতে গিয়ে কী দেখলে?
সে খুব সাংঘাতিক ব্যাপার। বেবিকে কলাপাতায় শোয়ানো হয়েছে। চোখ বোজা। মুখ-টুখ কেমন যেন ফোলা আর লাল। পায়ে বাঁধন। কাটির জায়গাটা কী একটা পাতা দিয়ে ঢেকে রেখেছে। প্রথমে একটু থতমত খেলেও আমার একটু সন্দেহ হল। ওর মাকে বললাম, কাটার জায়গাটা দেখাতে। তা তিনি বললেন, ভার্গব গোঁসাই নাকি নিষেধ করে গেছে। হাওয়া লাগলে খারাপ হবে। কিন্তু সাপকাটির কেস আমি অনেক দেখেছি। বিষধর কামড়ালে অন্য চেহারা হওয়ার কথা। তারপর শুনলাম গভীর রাত অবধি নাকি ঘর বন্ধ করে ভার্গব গোঁসাই কীসব প্রক্রিয়া করেছে। শুনে মাথাটা একটু গরমই হয়ে গিয়ে থাকবে। নিষেধ না শুনে আমি এক ঝটকায় পাতাটা সরিয়ে দেখলাম চারটে দাঁতের দাগ। বিষধর নয়, জলঢোঁড়া বা হেলে কিছু একটা কামড়েছে। কিন্তু সেকথা বলবই বা কাকে বলে! বাড়ি বাড়িসুদ্ধু লোক ভার্গব গোঁসাইয়ের কেরদানি দেখে একেবারে ভাবে ভোর হয়ে আছে। এত বড় গুণীন যে আর হয় না তা গাঁয়েও বলাবলি হচ্ছে। তা সে না হয় হোক। সব বজ্জাত গুণিন আর ওঝা তো এভাবেই হাতযশ বাড়িয়ে তোলে। কিন্তু আসল কাণ্ড হয়ে বসেছে অন্য জায়গায়। আর সেটাই তোমাকে বলা যাবে না।
পান্না একটা শ্বাস ছেড়ে বলল, তুমি না বললেও বুঝেছি।
বুঝেছ? ও বাবা, তোমার খুব বুদ্ধি।
এ আর না বুঝবার কী আছে। বেবিকে ভার্গব গোঁসাই রেপ করেছিল তো!
বড় লজ্জার কথা দিদি। পাষণ্ডটা নাকি বুঝিয়েছিল ওটাও একটা প্রক্রিয়া।
বেবি কথাটা বিশ্বাস করেছিল বুঝি?
গাঁয়ের মেয়ে, মাথায় তো বুদ্ধির ব-ও নেই। তার ওপর সাপের কামড়ে মাথাটারও ঠিক ছিল না। বুদ্ধিনাশ হলেই তো মানুষের সর্বনাশ কিনা। আমি রোজ সকালে জপতপের পর ঠাকুরের কাছে একটা জিনিসই চাই। বুঝলে! শুধু বলি, বাবা, আপৎকালে যেন বুদ্ধিনাশ না হয়, দেখো। বুদ্ধিনাশাৎ প্রণশতি।
তুমি লোকটাকে কিছু বললে না?
না দিদি। আমি মাথা-পাগলা লোক বটে, কিন্তু মাথা-গরম মানুষ নই। আমি যেন দেখতে পেলাম এই ঘটনার ভিতরে আমার মুক্তির পথ খুলে গেছে। যা কিছু সব ঈশ্বরের ইচ্ছেতেই তো ঘটে।
মেয়েটাকে ফেলে পালালে বুঝি! ছিঃ সুদর্শনদা, তাহলে কিন্তু তোমাকে ভাল লোক বলা যায় না। তোমার উচিত ছিল মেয়েটাকে উদ্ধার করা।
ভাল লোক আর হতে পারলাম কই বলো! আর এ কথাও ঠিক যে পালানোর ইচ্ছেও ছিল। সেটা বুঝতে পেরেই বোধহয় পাঁচজনে আমাকে চেপে ধরল, শুভস্য শীঘ্রম, তাড়াতাড়ি বিয়ে সেরে ফেলতে হবে। ভার্গব গোঁসাইও খুব চাপাচাপি শুরু করল। বেবিও খুব গোঁ ধরল। শেষে আমি পালাতে পারি ভেবে আমাকে ইস্কুলের এক ঘরে শেকল তুলে রাখা হতে লাগল। দিনরাত চোখে চোখে রাখা হত।
ও বাবা! তুমি কী করলে?
কী আর করব দিদি? ওই অবস্থায় তো করার কিছু ছিল না। শুধু ভগবানকে ডাকতে লাগলাম। বললাম, ঠাকুর, বুদ্ধিনাশ যেন না হয়। চারদিন বাদেই বিয়ে। একদিন ভার্গব গোঁসাই এসে চোখ পাকিয়ে বলে গেল, পালিয়েও বাঁচবি না, আমার অভিসম্পাত তোকে ধাওয়া করবে। রক্তবমি হয়ে মরবি। আমি বললুম, কিন্তু আমার দোষটা কী? সে বলল, দোষ নয়? বাগদত্তাকে বিয়ে না করলে সে মহাপাতক হয়। তখন আমি বলেই ফেললাম, গোঁসাই, মেয়েটাকে তো বিষধর কামড়ায়নি, কামড়েছিল ঢোঁড়া, বিষধর কামড়ালে কী করতে ওস্তাদ? পারতে বিষ নামাতে? লোকটা কী বলল জানো? এক গাল হেসে বলল, পারতাম না। কিন্তু তাতে কী? লোকে তো জানে আমি পারি। ওতেই হবে। তারপরও আমি বললাম, মেয়েটাকে নষ্ট করলে কেন? তার জবাবে বলল, ওরে, শিবের এঁটোকে এঁটো ধরতে হয় না।
কী বদমাশ!
হ্যাঁ দিদি। বদমাশ বটে, তুখোড় বুদ্ধিমানও বটে।
তুমি কী করলে?
ওই যে বললাম, ভগবানকে ডাকতে লাগলাম। সেই রাতে সৃষ্টিছাড়া বৃষ্টি নামল। বুঝলে দিদি, ভগবানের ওপর নির্ভর করে দেখো, কেমন সব অশৈলী কাণ্ড হয়।
আহা, তোমার কী হল তাই বল না।
বৃষ্টির তোড়ে চারদিক ডুবে গেল। আশপাশের লোক বাড়িঘর ছেড়ে এসে উঁচু স্কুলবাড়িতে উঠল। আমার ঘরের দরজায় শেকল তুলে পলকা একটা তালা দিয়ে রেখেছিল। তারাই সব শেকল-টেকল উপড়ে ঢুকে পড়ল ঘরে। মেলা লোক। সেই রাতে আর পালানো হল না ঠিকই। কিন্তু ডামাডোলে খুব সুবিধে হয়ে গেল। দু দিন বাদে জল নামতেই খঙ্গপুরের বাস ধরে একরাতে পালিয়ে এলাম। আর ওমুখো হইনি।
কিন্তু মেয়েটার কী দোষ বলো!
দোষঘাটের কথা নয় দিদি। আমিই কি আর ভাল? তবে সব ঘটনা থেকেই একটু একট শিক্ষা নিতে হয়।
হ্যাঁ সুদর্শনদা, হাত দেখার কথাই তো হচ্ছিল। দেখই না বাপু হাতখানা আমার।
থাক দিদি, দিনের বেলা দেখে দেবখন। চালসে ধরার পর সন্ধে লাগলেই চোখটা একটু ধোঁয়াটে মেরে যায়। তবে আগেই বলে রাখছি, ও বিদ্যে আমার পুরো জানা নেই।
বলে সুদর্শন উঠতে যাচ্ছিল, এক গাল হেসে বলল, ওই দেখ কে এসেছে! এসো দিদিমনি এসো! সেদিনকার মতো বেগুনি খাবে নাকি?
সোহাগ হেসে বলল, আমি বেশ পেটুক হয়ে গেছি আজকাল, না? সেদিন বড়মাও বলছিল, আমার নাকি আজকাল খুব রুচি হয়েছে। আসলে সোজাসুজি পেটুক বলছে না, মিন করছে।
পান্না গায়ের কাঁথাটা সরিয়ে উঠে বসল, তোমার জন্যই অপেক্ষা করে ছিলাম। কখন এসেছ?
কাল রাতে।
ওমা! আজ সারাদিন কেটে গেল, খবর দাওনি তো!
আজ সকাল থেকে পিসির সঙ্গে অনেক কাজ করেছি। পিসি খুব লোনলি তে। সারা সপ্তাহ আমার জন্য অপেক্ষা করে। আজ দুজনে মিলে অনেক কিছু করলাম।
কী করলে?
তিন চার রকমের আচার, মশলা পাঁপড়, হজমিগুলি। খুব ইন্টারেস্টিং ব্যাপার।
তোমার সঙ্গে এখন সন্ধ্যাপিসির খুব ভাব, না?
হ্যাঁ! খুব। শি ইজ ভেরি লাভিং। আমাকে অনেক কিছু দিতে চায়।
কী?
ঘড়ি, গলার হার, নিজের সব গয়না। আমি বলি, ওসব এখন থাক। তুমি বুড়ো হলে নেব।
বোসো সোহাগ।
বসাই যাক। না বসে উপায় আছে?
ই-মেল পেয়েছ বুঝি?
হ্যাঁ তো। বলে মুখ টিপে হাসল সোহাগ।
এবারও ই-মেল কি সাংকেতিক?
তা ছাড়া কী? ওনলি ডেট অ্যান্ড টাইম।
তোমরা যেন কী! কেউ এক পা এগোবে না, একটুও আবেগ বা উচ্ছ্বাস নেই, কথাও তো বলো না। তোমাদের মধ্যে কী হচ্ছে বলো তো!
কী আবার হবে! কিছু হচ্ছে না। কোনও বোকা-বোকা ব্যাপার তো আমার সহ্য হয় না।
সে না হয় বাড়াবাড়ি না করলে, কিন্তু একটু মনের কথা জানাবে তো! নির্জনে গিয়ে দুজনে একটু বসতেও ইচ্ছে হয় না?
সোহাগ ফের সেইরকম মিষ্টি হেসে বলল, তাতে বা হবে? শুধু কতগুলো সিনেমাটিক ডায়ালগ। ও আমার অসহ্য।
বিজুদাটাও ঠিক তোমার মতো। এক জন্ম দেখে আসছি, কোনও মেয়েকে দেখেই কখনও হেলদোল নেই। একদম অনারোমান্টিক। এই প্রথম আনেক সাধ্যসাধনার পর দেখলাম তোমাকে অপছন্দ করছে না। কিন্তু রোমান্সের কী ছিরি বাবা। যেন দেবা তেমনি দেবী।
রোমান্সের কথা আসছে কেন? উই আর নট ইন লাভ।
উঃ, এমনভাবে বোলো না তো! আমার বুকের মধ্যে যেন হাতুড়ির ঘা এসে পড়ে।
তুমি ভীষণ রোমান্টিক, না পান্না?
ওঃ, আমি যদি প্রেমে পড়ি তাহলে কথা বলে বলে তাকে পাগল করে দেব।
আর কী করবে?
নির্জনে গিয়ে বসব দুজনে, গল্প হবে, কথা হবে, কবিতা হবে, কোনও অসভ্যতা হবে না অবশ্য।
অসভ্যতা বলতে?
শরীর ছোঁয়া, চুমু এইসব।
ওসব অসভ্যতা বুঝি?
না হলেও স্থূল রুচির ব্যাপার। আবেগ ভাল, কিন্তু শরীর নিয়ে নয় বাবা।
তুমি একটু পিউরিটানও আছ।
হ্যাঁ। আমার আবার দুমদাম শরীরের লজ্জা ঝেড়ে ফেলতে আপত্তি আছে। কিন্তু তুমি তো আরও পিউরিটান।
না, পিউরিটান নই, আসলে ভসভসে আবেগ আমার একদম ভাল লাগে না। দেখবে দুজনে প্রেম করার সময় কত ভাভসে কথা বলে, বিয়ের পর তিন মাসও টিকতে পারে না। কেন জানো?
ওদের কোনও ইন্টিগ্রিটি নেই।
তার মানে কী আমাকে বুঝিয়ে দেবে?
মানে বুঝতে হলে তোমাকে সমাজবিজ্ঞান জানতে হবে। জানতে হবে মানুষের ইতিহাস। মানুষ কেন একস্ট্রীম ফ্রিডম থেকে জংলি জীবনে পরিবার, বিয়ে আর সমাজের দিকে ঝুঁকল তা জানো?
বলো না শুনি?
সেটা নরনারীর প্রেম থেকে নয়। প্রয়োজনে। তখন এরকম প্রেম-ট্রেম হত না তো। তার দরকারও ছিল না। দরকার ছিল বিশ্বস্ততা, দায়বদ্ধতা আর পারস্পরিক নির্ভরতার। একটা পরিবারের ভিতে প্রেমের চেয়ে অনেক বেশি প্রয়োজন এই তিনটে জিনিসের। মানো?
সে না হয় মানছি। কিন্তু একটু আবেগও থাকবে না, তা কি হয়?
ওই তিনটে না থাকলে আবেগটা বড্ড জোলো হয়ে যায়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন