শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
মন মানুষকে খায় নানাভাবে। কখনও বাঘের মতো হালুম করে এসে লাফিয়ে পড়ে ঘাড় মটকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। কখনও অজগরের মতো ধীরে ধীরে গিলে ফেলতে থাকে। কাকে কখন কী ভাবে খাবে তার কোনও ধরাবাঁধা নিয়ম তো নেই। যখন শত্রু তখন ষোলো আনা শত্রু। আবার যখন পোষ মানে তখন মনের মতো বন্ধুই বা কে। তখন তুমি মরুভূমিতে থাকলেও সে অধরা হয়ে নাচ দেখাবে। ঝড়ের দরিয়ায় সে বন্দরের ছবি টাঙিয়ে দেবে। কখনও ঈশ্বর, কখনও শয়তান, কখনও নিয়তি।
অমলকে খাচ্ছে অজগরের মতো। ধীরে ধীরে একটা অমন মানুষ তার ক্ষুরধার বুদ্ধি, ঝকঝকে মেধা নিয়েও অজগরের গরাস হয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই আর ছাড়িয়ে নিতে পারছে না নিজেকে।
ভাবতে একটু কষ্ট হয় পারুলের।
মন আজ ভাল নেই। ভোররাতে বাবাকে স্বপ্ন দেখেছে সে। মরা মানুষকে স্বপ্ন দেখা কি ভাল? বার বার? গত সাতদিনে বোধহয় বারতিনেক বাবাকেই স্বপ্নে দেখেছে সে। ভোররাতে আজ দেখল, বিরাট বড় একটা বাড়ি আর তার অফুরান গড়ানে বারান্দা পুবের রোদে ভেসে যাচ্ছে। এই অত বড় বারান্দা ধু ধু করছে জনহীনতায়। কেউ কোথাও নেই। আর আশ্চর্য, সেই বারান্দাটা কোথাও শেষ হয়নি। সে হাঁটছে তো হাঁটছেই। কেন যে শেষ হচ্ছে না ছাই কে জানে। ভীষণ ভয় করছিল তখন। ধ্যাত, এত বড় বারান্দা কে যে বানাল। হঠাৎ পিছন থেকে কে যেন বলল, যা না, আরও যা, একসময়ে শেষ হবে ঠিকই।
কে বলল কথাটা? ঝট করে মুখ ঘুরিয়ে সে দেখল, বাবা। তেমনই ফর্সা টকটকে রং, তেমনই মস্ত গোঁফ, তেমনই সুন্দর।
ও বাবা, তবে যে লোকে বলে তুমি মরে গেছ?
দুর বোকা! মরব কেন? এই একটু বেড়িয়ে এলুম।
এ বাড়িটা কে বানাল বল তো! এত বড় বারান্দা কেন?
তা ঠিক, বারান্দাটা একটু বড়। চল তোকে এগিয়ে দিই।
এর আগেও বারদুয়েক বাবাকে স্বপ্নে দেখেছে সে। স্বপ্ন নিয়ে তার তেমন কোনও কুসংস্কার নেই। আবার এও মনে হয়, কী জানি বাবা, স্বপ্নের মধ্যেও কোনও ইশারা ইঙ্গিত থাকতেও পারে।
সকাল থেকেই আকাশে মেঘলা ভাব। মনের মধ্যেও তাই। জ্যোতিপ্রকাশ আজ ভোরে চলে গেল জামশেদপুর। মন খারাপের সেটাও একটা কারণ। বিয়ের পর যখন বরের সঙ্গে ভাব হল তখন সম্পর্কটা উত্তেজক, মাদক। তখন দুজনেরই দুজনের জন্য আনচান অবস্থা। চোখে হারাই ভাব।
তারপর ধীরে ধীরে সেই আকর্ষণের তীব্রতা কমতে লাগল। কিন্তু অন্যরকম একটা টান জন্মাতে লাগল তা থেকে। এখন বরকে ছেড়ে থাকলে একটা কেমন নিরাপত্তার অভাব টের পায় সে।
অবশ্য সেখানে রান্না আর কাজের লোক আছে। তার বরের কোনও অসুবিধে হওয়ার কথা নয়। কিন্তু তবু পারুলের একটু খুঁতখুঁত করে। মনটা সেই কারণেই আজ কেমনধারা হয়ে আছে যেন।
সকালে বিজু এল তার নতুন মোটরবাইক নিয়ে। সবে কিনেছে। ভট ভট করে ফটক দিয়ে ঢুকে সোজা উঠোনে এনে দাঁড় করিয়েই হাঁক মারল, বড়মা! ও বড়মা।
বলাকা ঘর থেকে বারান্দায় বেরিয়ে বললেন, শয়তানের কলটা শেষ অবধি কিনেই ফেললি?
শিগগির কাপড়টা পালটে এসো।
কেন রে মুখপোড়া, কাপড় পালটাব কেন?
তোমাকে এই শয়তানের কলে চাপিয়ে শীতলাবাড়ি থেকে ঘুরিয়ে আনব।
বলাকা চোখ কপালে তুলে বললেন, ওইটেই বাকি আছে আমার কপালে। রক্ষে কর বাপু, বুড়ো বয়সে পড়ে হাড়গোড় ভেঙে দ হয়ে থাকতে পারব না।
আরে, চলোই না, একবার চড়লেই বুঝতে পারবে জিনিসটা মোটেই ভয়ের নয়।
আমার আর আহ্লাদের দরকার নেই বাবা। ওসব তোরা চড় গে।
দেখ বড়মা, বেশি কথা কইবে তো হাটে হাঁড়ি ভাঙব কিন্তু।
ওমা, চোখ রাঙায় দেখ! কী হাঁড়ি ভাঙবি রে মুখপোড়া?
জ্যাঠামশাই একসময়ে মোটরবাইক চড়ত, আমি জানি। একটা গাবদা-গোবদা বি এস এ মোটরবাইক ছিল তখন। তুমি তাতে চেপে জ্যাঠার সঙ্গে শহরে সিনেমা দেখতে যেতে।
তোর মাথা। তোর জ্যাঠা আমাকে মোটে একদিন চাপাতে পেরেছিল।
মোটে একদিন?
তাও অনেক সাধাসাধির পর। আর সে যা কাণ্ড হয়েছিল। বাড়ি থেকে পঞ্চাশ গজও যায়নি দুড়ুম করে আমি পড়ে গেলুম।
এ মা!
আর বলিসনি। হাঁটু ছড়ে, শাড়ি ছিঁড়ে বিদিকিচ্ছিরি কাণ্ড। ওই একবারই।
তোমাকে নিয়ে আর পারা যায় না। ভাবলুম নতুন বাইকটায় তোমাকে চাপিয়ে নিয়ে ঘুরে আসব একটু। আমার মা তো দিব্যি কাল আমার সঙ্গে ঘুরে এল।
আহা, ও ছুঁড়ির আর বয়স কী? আমার চেয়ে বছর দশেকের ছোট।
বয়স নয় বড়মা, এ হল স্মার্টনেসের প্রশ্ন। তুমি একদম স্মার্ট নও। অথচ আমি তোমাকে স্মার্ট বলে ভাবতুম।
আর আমার স্মার্ট হওয়ার দরকার নেই বাবা। কিন্তু দুচাকার জিনিসে বিশ্বাস নেই। কেন যে তোর বাবা মত দিল তাও বুঝি না।
অবশেষে বিজু এসে পারুলকে পাকড়াও করল।
চলো তো পারুলদি, তোমাকে নিয়েই একটা চক্কর দিয়ে আসি।
আজ ভাল লাগছে না রে।
আচ্ছা, তোমরা সবাই নন কো-অপারেশন করলে কেমন করে হয় বল তো! বড়মা রিফিউজ করল, তুমিও।
পারুলের অবশ্য ভয় নেই। গাড়ি কেনার আগে জ্যোতিপ্রকাশের স্কুটার ছিল। বহুবার চেপেছে পারুল। নিজেও চালাতে পারত। আজ অবশ্য মেজাজটা ঠিক নেই। তবু শেষ অবধি রাজি হল সে। ছেলেমেয়ে দুটো আজ ছোট কাকার সঙ্গে বর্ধমানে গেছে ওদের বাবাকে সি অফ করতে। কীসব কেনাকাটা করে দুপুরে ফিরবে। বাড়িটা ফাকা লাগছে বলে বেরিয়ে পড়ল পারুল।
কিন্তু বাইক চলতেই বুঝতে পারল, কাজটা ঠিক হয়নি। বড্ড ঠান্ডা বাতাস লাগছে। কান কনকন করছে, হাত পা সিঁটিয়ে যাচ্ছে।
কিন্তু ওই গতি আর খোলা হাওয়া তার মাথা থেকে মনখারাপটাকে ঝেঁটিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল।
একবার মুখ ফিরিয়ে বিজু বলল, বর্ধমান যাবে পারুলদি?
অত দূর যাবি! দরকার কী?
আহা চলোই না। ঘরে বসে থেকে হবেটা কী?
বড্ড ঘিঞ্জি শহর, সাবধানে চালাস।
বর্ধমানে গিয়ে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে বাইক দাঁড় করিয়ে বিজু বলে, চলো পারুলদি কিছু খেয়ে নিই। বড্ড খিদে পেয়েছে।
দুর! আমার তো একটুও খিদে নেই। এই তো একটু আগে মা জোর করে লুচি তরকারি খাওয়াল। গলা অবধি হয়ে আছে বাবা।
ডায়েটিং করার বদ অভ্যাসটা ছাড়ো তো পারুলদি। আমি জানি তুমি একটার বেশি দুটো লুচি খাও না। না হয় হবেই একটু মোটা, তা বলে খাওয়ার আনন্দটাকে ভোগ করবে না? জীবনটা কদিনের শুনি!
হয়েছে, তোকে আর ফিলজফি ঝাড়তে হবে না। তুই খা, আমি বসছি।
যখন গোগ্রাসে টোস্ট আর ওমলেট খাচ্ছিল বিজু তখন এক কাপ দুধ-চিনি ছাড়া চা নিয়ে চুপচাপ বসেছিল পারুল। একটা চুমুকও দেয়নি। দোকান-টোকানে খেতে তার বড় গা ঘিন ঘিন করে।
তোর সত্যিই খুব খিদে পেয়েছিল, না রে?
খুব। তোমার আর আমার মধ্যে তফাত কী জানো? আমি খিদে পেলে খাই, আর তুমি সুটকি মেরে থাক।
আমার আড়াই মন ওজন হলে তুই কি আমাকে তোর মোটরবাইকে তুলতে সাহস পেতি?
কেন, অসুবিধে কী আছে? আমার বাইকটা কীরকম সফিসটিকেটেড জানো?
তুই একটা ক্যাবলা।
কেন বলো তো!
মোটরবাইকের পেছনে চাপাতে হয় গার্লফ্রেন্ডকে। তোর গার্লফ্রন্ড জোটে না কেন বল তো!
দুর দুর, ওসব তোমাদের সেকেলে ধারণা। গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘোরার মধ্যে কোনও গ্ল্যামার নেই আজকাল। গণ্ডায় গণ্ডায় ঘুরছে।
ও বাবা! তুই যে অনেক এগিয়ে গেছিস! গার্লফ্রেন্ড নিয়ে ঘোরাটাও সেকেলে হয়ে গেছে বুঝি?
আমার কাছে তাই।
আসল কথাটা বললেই তো হয়।
আসল কথাটা কী?
তোর গার্লফ্রেন্ড নেই।
বিজু এক গাল হাসল, কথাটা মন্দ বললানি। সত্যিই নেই।
কেন নেই রে? চেহারাখানা তো সুন্দর। তোর চেহারায় আমি বাবার আদল পাই। তেমনই লম্বা ফর্সা, তোর কাছে মেয়েরা ঘেঁষে না কেন?
ঘেঁষবে কী করে? পাত্তা দিলে তো!
পাত্তা দিলেই তো হয়।
বিজু মাথা নেড়ে বলে, হয় না পারুলদি। আমাকে ছেলেবেলা থেকে শেখানো হয়েছে মেয়েদের সঙ্গে সম্মানজনক দূরত্ব রাখতে হয়। মাখামাখি করতে নেই। বড় হয়ে আমি গাঁয়ের যুব সমাজের অভিভাবক। স্বনিযুক্ত অভিভাবকই ধরে নাও। আমি কি পারি মেয়েদের সঙ্গে ফষ্টিনষ্টি করতে?
এত বেশি পিউরিটান হলে তুই যে এই বয়সেই বুড়োটে মেরে যাবি!
কী আর করা যাবে বলো। রক্ষক হয়ে তো ভক্ষক হতে পারি না। কোথাও কোনও মেয়ের ওপর কোনও রকম হামলা হলে, অপমানের ঘটনা ঘটলে আমরা গিয়ে তো রুখে দাড়াই। সেই আমিই যদি প্রেম-ট্রেম করে বেড়াই তাহলে লোকে বলবে কী?
দুর পাগলা, দুটোকে গুলিয়ে ফেলছিস কেন? মেয়েদের রক্ষা করিস সে তো ভাল কথা, তাতে প্রেম করা আটকায় কীসে?
আটকায়। ও তুমি বুঝবে না। আর প্রেমের যা-সব ছিরি দেখছি তাতে ও ব্যাপারটার ওপরেই আমার ঘেন্না ধরে গেছে।
একটা কৃত্রিম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে পারুল বলে, বুঝেছি। তোর তো দেখছি গভীর বিপদ।
না পারুলদি, বেশ আছি। মেয়েদের নিয়ে ভাবতে হয় না বলে অন্য সব ব্যাপারে মন দিতে পারি। নারীচিন্তা কিন্তু অন্য সব চিন্তাকে খেয়ে নেয়।
পারুল রুমালে মুখ চেপে খুব হাসল। বলল, হ্যাঁ রে তুই ব্রহ্মচর্য-টর্য করছিস না তো! বিবেকানন্দের বই-টই পড়ছিস নাকি?
কেন, পড়া কি খারাপ?
বদহজম হলে খারাপ। নইলে ভালই তো।
না, ওসব নয়। আমি পিউরিটানও নই। আসলে আমি তেমন মেয়ের দেখাও পাইনি যাকে দেখলে দয়ে পড়ে যেতে হয়।।
বড় বড় চোখে চেয়ে পারুল বলে, একটাও নয়?
না পারুলদি, একটাও নয়।
কথাটা কি মিথ্যে বলল বিজু? ভাবের ঘরে চুরি! একথা ঠিক তার জীবনে কোনও মহিলার আবির্ভাব ঘটেনি এতকাল। কিন্তু এখন সে অতটা নিশ্চিত নয়।
এরকম ঘটনা যে ঘটতে পারে তা তার স্বপ্নেও কখনও মনে হয়নি। তার একটা স্পর্ধিত অহং আছে। সেই অহং তাকে পাঁচিলের মতো ঘিরে রেখেছে এতকাল। সুন্দর চেহারা, মেধাবী ছাত্র, রবীন্দ্রসংগীতের দারুণ কণ্ঠ এবং বড় বাড়ির ছেলে— এইসব গুণাবলীর জন্য সে কৈশোরকাল থেকেই চুম্বকের মতো মেয়েদের আকর্ষণ করেছে। কিন্তু তাকে একটা মন্ত্র সেই অবোধ বয়সেই শিখিয়ে দিয়েছিল তার বাবা, দেখো বাবা, মেয়েদের সঙ্গে বেশি মাখামাখি করো না। মায়ের জাত, তাদের সম্মান রাখতে হয়।
তাদের বংশে এই ধারাটা আছে। পুরুষেরা একটু এইরকম, মহিলাদের এড়িয়ে চলে। যখন সে বর্ধমান কলেজে পড়ে তখন ইউনিয়ন করত। খেলাধুলোয় ভাল ছিল বলেও বেশ নামডাক। সেই সময়ে বুলবুলি নামে ফুটফুটে একটি মেয়ে খুব ঘুরঘুর করত তার কাছে। ছোটখাটো, রোগা, কিন্তু ভারী মিষ্টি দেখতে ছিল সে। নানাভাবেই সে নিত্য নিজেকে নিবেদন করতে চাইত। তাকে দেখে মাঝে মাঝে মোহগ্রস্ত হয়ে পড়ত বিজুও। অনেক সময়ে তাদের দীর্ঘ সংলাপও হয়েছে।
বুলবুলি বলত, আমার চোখে চোখে তাকাও না কেন বলল তো! তোমার কি ভয় আমি তোমাকে হিপনোটাইজ করে ফেলব?
খানিকটা হিপনোটিজম তো মেয়েদের মধ্যে থাকেই। কিন্তু কথাটা উঠছে কেন? চোখে চোখ রাখাটা কি জরুরি?
আমার কাছে জরুরি।
কেন?
একটু বোঝার চেষ্টা করো। তুমি বোকা নও।
না নই। বোকা নই বলেই বোকামিটা করি না।
তুমি কি আমাকে ভয় পাও?
না বুলবুলি, আমি বোধহয় নিজেকেই ভয় পাই।
আমাকে নিয়ে কখনও ভাব? যখন একা থাকো?
না-ভাবার চেষ্টা করি।
আমি সবসময়ে তোমার কথা ভাবি। তুমি কেন ভাব না?
তোমাকে কখনও বলা হয়নি, মানুষের মহার্ঘ্য মস্তিষ্কটা অর্থহীন, প্রয়োজনহীন চিন্তায় ভারাক্রান্ত থাকে বলেই অধিকাংশ মানুষ তার মাথাকে সঠিক ব্যবহার করতে পারে না।
ওসব শক্ত শক্ত কথা বলছ কেন? সহজ করে বলো।
সহজ করে বললে বিচ্ছিরি শোনাবে যে।
অর্থাৎ আমার কথা ভাবলে তোমার সময় নষ্ট হয়?
অনেকটা তাই।
এ কথায় বুলবুলির চোখ ভরে জল এল। ধরা গলায় বলেছিল, এরকম অপমান আমাকে কেউ কখনও করেনি জানো?
ভাল করে ভেবে দেখো বুলবুলি, এটা অপমান নয়। এটা এক ধরনের আত্মরক্ষা। বন্ধুত্ব থেকে অবসেশন জন্ম নিলে সমস্যা হবে।
কেন, সমস্যা কীসের?
ভাল লাগার তো শেষ নেই। একটা ভাল লাগার স্টেজ শেষ হলে আর একটা ভাল লাগার স্টেজ আসতে পারে। জীবন পরিবর্তনশীল।
আবার শক্ত শক্ত কথা বলছ?
তুমি বুঝতে চাইছ না বলে শক্ত মনে হচ্ছে। একটু ভাবো তুমি। একটু গভীরভাবে ভাবো৷
বুলবুলির সঙ্গে একটা ঘনিষ্ঠতর সম্পর্কের সম্ভাবনা সেদিনই শেষ হয়ে যায়।
এরকম হব-হব সম্পর্ক আরও তৈরি হয়েছে তার জীবনে। বারবার। শেষ অবধি বিচিত্র সব বহিরাক্রমণেও অটুট থেকেছে তার দুর্গ। ফটক ভাঙেনি, বিজয়োল্লাসে ঢুকেও পড়েনি কেউ।
লুঠেরা না থাক, তস্কর তো আছে। তারা দেয়াল ভাঙে না, সিঁদ কেটে আসে।
অষ্টমী পুজোর দিন একটা ঘটনা ঘটেছিল। তুচ্ছ সামান্য ঘটনা।
মনে না রাখলেও চলে। তবু কী করে যেন থেকে গেছে মনে। তার প্রিয় বানর বজরংকে কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়েছিল সে। সামনেই বলি হচ্ছে। ঢাক বাজছে দ্রিমি দ্রিমি। রাজ্যের লোকের ভিড় চারদিকে। তার মধ্যেই হঠাৎ এক জোড়া বিহ্বল চোখ তার দিকে অপলক চেয়েছিল। ফর্সা মুখখানা লাল হয়ে উঠছিল লজ্জায়। তবু চোখ দুটো সরিয়েও নিতে পারেনি মেয়েটা। বজরং এ-কাঁধ থেকে ও-কাঁধে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিল, চুল ধরে টানছিল বিবেকের মতো। বিজু খুব অস্বস্তির সঙ্গে সরে এসেছিল ভিড় থেকে।
পুজোর ভাসানের দিন প্যান্ডেলে মেয়েটি দাঁড়িয়েছিল একটু তফাতে। সবাই লরিতে উঠল হুড়মুড় করে। মেয়েটির চোখ চকচক করছিল লোভে। কিন্তু শেষ অবধি সে এসে আর দশজনের মতো উঠল না লরিতে, দাঁড়িয়ে রইল একা, ফাঁকা প্যান্ডেলে। এবং সে নির্ভুল চোখে তাকিয়েছিল বিজুর দিকেই। বিজুই যে এই বাহিনীর সর্দার তা জানত সে। হয়তো সে দূরাকাঙক্ষা করেছিল, বিজু তাকে ডাকবে। ডেকে নেবে। কিন্তু বিজু তাকে ডাকবে কেন? সবাই নিজের ইচ্ছেয় যাচ্ছে, সকলেরই প্রবল উৎসাহ, শুধু ওই অহংকারী মেয়েটাই দেমাক দেখাচ্ছিল। বিজুর কী দায় পড়েছিল ডাকার!
পরে মেয়েটা পান্নাকে দুঃখ করে বলেছিল, আমাকে তো কেউ ডাকেনি।
কার ডাকের অপেক্ষা ছিল মেয়েটার?
বিহ্বলতা জিনিসটা বিজু টের পায়। বারবার ওই করুণ একজোড়া চোখ তার স্মৃতিতে হানা দিয়েছে। আর ওই কথা, আমাকে তো কেউ ডাকেনি।
প্রেমিক না হলেও মেয়েদের কাছে হিরো হওয়ার লোভ কি সংবরণ করতে পেরেছে বিজু? বোধহয় না।
স্পোর্টিং ক্লাবের বদমাশ ছেলেরা যখন সোহাগের পিছনে লেগেছিল তখন কথাটা তার কানে তুলেছিল পান্না। স্বাভাবিক অবস্থায় এসব ঘটনা ঘটলে সে প্রতিকার করে বটে কিন্তু বাড়াবাড়ি কখনও করে না। হঠাৎ ওই ঘটনা শোনার পর সে যে কেন উন্মাদের মতো রেগে গিয়েছিল তা কে বলবে? রেগে গিয়ে সে তার ডু গুডার দলবল নিয়ে নিজেই চড়াও হয়েছিল ওদের ওপর। মাত্রা ছাড়িয়ে মারধর করেছিল। তারপর পাঠিয়েছিল সোহাগের কাছে ক্ষমা চাইতে।
কোথায় বিগলিত কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ঘটবে, হল উলটো। মেয়েটা বড়মাকে আর পান্নাকে সাফ জানিয়ে দিয়েছিল তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব কাউকে নিতে হবে না। সুস্পষ্ট অপমান এবং প্রত্যাখ্যান।
তা হলে কি ওই দু চোখের বিহ্বলতা ভুল রিডিং দিয়েছিল বিজুকে? ভুল পাঠ? ভুল ব্যাখ্যা? সব ভুল?
তাই হবে। মেয়েদের মতো এত ভাল ড্রিবল আর কে করতে পারে? অদৃশ্য থাপ্পড় খেয়ে মেয়ে জাতটার ওপরেই কিছুদিন বিতৃষ্ণা এসে গিয়েছিল তার।
নতুন বাইকটি হাতে পাওয়ার পর কিছুদিন হল লম্বা লম্বা ড্রাইভে চলে যাচ্ছে বিজু। খোলা রাস্তা, অফুরান পথ, হাওয়া, রোদ, গতি—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত মুক্তি। বুকটা হা-হা করে আনন্দে। সাইকেল এর কাছে কোথায় লাগে! মোটরগাড়িও না। যৌবন এবং মুক্তির দূত হল মোটরবাইক। হাইওয়েতে সে যখন একের পর এক গাড়ি এবং স্কুটারকে কাটিয়ে দুরন্ত গতিতে ছোটে তখন মনে হয়, এর চেয়ে ভাল কিছু নেই।
পরশু সকালবেলা থেকে একটু একটু মেঘলা করেছিল, হাওয়া দিচ্ছিল খুব। একটা পুলওভার আর তার ওপর উইন্ডচিটার চাপিয়ে হেলমেটে মাথা ঢেকে সাতসকালে বেরিয়ে পড়েছিল বিজু। বর্ধমান থেকে বাইপাস ধরে বাঁকুড়া আরামবাগের রাস্তা ধরে অনেকটা চলে গিয়েছিল সে। তারপর ঝড়বৃষ্টির সম্ভাবনা প্রবল হচ্ছে দেখে ফিরল।
ফেরাটা ছিল পাগলের মতো। বৃষ্টির আগেই গাঁয়ে পৌঁছনোর জন্য সে স্পিড তুলে দিয়েছিল সাংঘাতিক। বাইকটা ক্ষণে ক্ষণে লাফাচ্ছিল রাস্তার খানাখন্দে। শক্ত হাতে হ্যান্ডেল চেপে দাঁতে দাঁত পিষে ঝড়ের সঙ্গে পাল্লা দিচ্ছিল বিজু।
কিন্তু শেষ অবধি বৃষ্টির সঙ্গে পাল্লা দিতে পারল না। প্রথমেই বড় বড় শিল পড়তে থাকায় একটা গাছতলায় কিছুক্ষণ দাঁড়াল সে। তারপর বৃষ্টিতে বেরিয়ে পড়ল। ভিজে ঝুব্বুস হয়ে গেল মাঝ রাস্তায়। ভিজতে ভিজতেই গাঁয়ে ঢুকে সে বাইকের স্পিড কমিয়ে ধীর গতিতে চালাচ্ছিল।
ফটিক কাঞ্জিলালের জমির কাছ বরাবর এসে সে অদ্ভুত দৃশ্যটা দেখতে পায়। একটা মেয়ে ওই প্রবল বৃষ্টিতে ফাঁকা জমিটায় দু হাত দুদিকে ছড়িয়ে স্বপ্নাচ্ছন্নের মতো ঘুরে ঘুরে নাচছে।
পাগল নাকি মেয়েটা?
বাইক থামিয়ে নেমে এল সে।
এই! তুমি কী করছ এখানে?
মেয়েটা জবাব দিল না। ভ্রূক্ষেপও করল না তার দিকে। যেমন ঘুরে ঘুরে নাচছিল তেমনই নেচে যেতে লাগল।
এই সোহাগ! সোহাগ! বাড়ি যাও।
মেয়েটা সম্পূর্ণ সম্মোহিতের মতো নেচেই যাচ্ছিল। জবাব দিল না, তাকালও না।
নিতান্ত বাধ্য হয়েই এগিয়ে হঠাৎ মেয়েটার পথ জুড়ে দাঁড়াল বিজু।
শুনতে পাচ্ছ? কী হচ্ছে এখানে?
মেয়েটা বেভুলে ঘুরতে ঘুরতে এসে ধাক্কা খেল তার সঙ্গে। তখনই বিজু প্রবল বৃষ্টির মধ্যেও শুনতে পেয়েছিল মেয়েটা বিড়বিড় করে অস্ফুট উচ্চারণে কিছু বলে যাচ্ছে। মন্ত্রের মতো।
ধাক্কা খেয়ে মেয়েটা হঠাৎ জলকাদার মধ্যে ধড়াস করে পড়ে গেল। এমন অদ্ভুত ছিল পড়াটা। খাড়া অবস্থা থেকে গাছ যেমন পড়ে তেমনই টানটান শরীর নিয়ে পড়ল। চারদিকে খোয়া ইট, পাথরের টুকরো। মাথা কেটে যেতে পারত।
ভয় পেয়ে গেল বিজু। মেয়েটা পড়ে নড়ছিল না।
গাঁয়ে লোকলজ্জার ভয় আছে। মেয়েটাকে পাঁজাকোলা করে তুলতে পারত বিজু। সেটা করার সাহস না পেয়ে হাঁটু গেড়ে বসে ডাকল, এই যে সোহাগ! ওঠো। তোমার কী হয়েছে?
সোহাগ জবাব দিল না। ওই প্রবল বৃষ্টিতে নির্বিকারভাবে পড়ে রইল।
অগত্যা দুটো কাঁধ ধরে তাকে তোলার চেষ্টা করতে লাগল বিজু। মেয়েটার কপালে নিউমোনিয়া লেখা আছে। কিন্তু মূৰ্ছিত সোহাগকে বসানোও যাচ্ছিল না। তুললেই ফের পড়ে যাচ্ছে। কী যে মুশকিল হয়েছিল বিজুর। একবার ভাবল গিয়ে লোকজন ডেকে আনবে। কিন্তু ওই প্রবল বৃষ্টি এবং ঠান্ডায় লোকজন পাওয়াও মুশকিল।
যখন প্রবল দুশ্চিন্তায় দ্বিধাগ্রস্ত বিজু সোহাগের বৃষ্টিস্নাত মুখের দিকে চেয়ে আছে তখনই হঠাৎ তার দুর্গের প্রাকারে নয়, কোনও অন্ধ রন্ধ্রের পথে চোর ঢুকছিল অবরোধের ভিতর। নিজের হৃদয়কে সে দুর্বল হয়ে যেতে টের পাচ্ছিল।
আর তখনই হঠাৎ খুব ধীরে চোখ খুলছিল সোহাগ। অস্ফুট একটা ‘উঃ’ শব্দ করে সে বৃষ্টির ঝাপটা থেকে মুখ বাঁচাতে দু হাতে মুখ ঢাকা দিল। স্বপ্নোথ্থিতের মতো উঠে বসল।
সোহাগ!
কে আপনি?
আমি বিজু। তুমি এখানে কী করছিলে?
সোহাগ বৃষ্টির ঝরোখার ভিতর দিয়ে তাকে দেখল। চিনতে পারল। তারপর বলল, আমি যা-খুশি করছিলাম। আপনাকে তো আমি ডাকিনি।
ডাকোনি। কিন্তু বৃষ্টির মধ্যে—
তাতে আপনার কী?
তোমার ঠান্ডা লাগবে ভেবে—
আপনি আমার স্পেলটা ভেঙে দিয়েছেন।
কী ভেঙে দিয়েছি?
আপনি বুঝবেন না। বুঝবার মতো বুদ্ধি আপনার নেই।
রেগে গেলেও নিজেকে সংবরণ করে বিজু বলল, তুমি একটা ঘরের মধ্যে ছিলে, তাই ভাবলাম—
প্লিজ! আপনি আমার অনেক ক্ষতি করেছেন। এখন দয়া করে চলে যান।
যাব?
হ্যাঁ, যাবেন।
বিজু কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, তুমি নিজেকে কী ভাব তা তুমিই জানো। আমি তোমাকে পাগলের মতো কাণ্ড করতে দেখেই এসেছিলাম।
আমি একজন পাগলই। আপনি দয়া করে যান।
রেগে গেলে মানুষ অনেক সময়ে বোকার মতো কথা বলে। বিজুও বলল, এইজন্যই মানুষের উপকার করতে নেই।
দু হাতে ভেজা এবং ভিজন্ত চুল গুছি করে একটা খোঁপার মতো বেঁধে নিতে নিতে সোহাগ বলল, আমি আপনার উপকার চাই না তো! কে বলেছে আপনাকে আমার উপকার করতে?
আচ্ছা, ঠিক আছে! এর বেশি আর কথা জোগায়নি বিজুর মুখে। সে বৃষ্টির মধ্যে এসে ফের তার বাইক স্টার্ট দেওয়ার চেষ্টা করতে লাগল। আর হতভাগা, বিশ্বাসঘাতক মোটরবাইকটা জলে ভিজে কিছুতেই আর স্টার্ট নিল না। বাইকটা ঠেলে নিয়ে বাড়ি ফিরতে ফিরতে বিজু দেখতে পেল, উন্মাদিনী সোহাগ পান্নাদের বাড়ির দিকে ছুটছে।
কী ভাবছিস বল তো! অনেকক্ষণ চুপচাপ।
লজ্জা পেয়ে বিজু বলে, একটা স্পেল।
তার মানে কী?
কী যেন ভাবছিলাম একটা। ভুলে গেছি।
লুকোচ্ছিস।
না, সত্যিই ভুলে গেছি।
এবার চল একটু কেনাকাটা করি।
কী কিনবে?
কিছু ঠিক করিনি। শহরে যখন এসেই পড়েছি, মার জন্য কিছু নিয়ে যাই।
বড়মা! বড়মার জন্য আবার কী নেবে? জ্যাঠামশাই মারা যাওয়ার পর থেকে তো বড়মা একেবারে বৈরাগী হয়ে গেছে। দু হাতে কত জিনিস বিলিয়ে দিল। আমাকে কী দিয়েছে জানো?
কী রে?
জ্যাঠামশাইয়ের দুটো পার্কার কলম, একটা জেনিথ ঘড়ি, পুরনো একটা প্রিন্স কোট, দশটা রুপোর টাকা।
হ্যাঁ, মা যেন কেমন হয়ে গেছে।
আমি বলেছিলাম, জ্যাঠামশাইয়ের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে এগুলো রাখো। কী বলল জাননা?
কী?
বলল স্মৃতির কোনও চিহ্ন লাগে না। আমার বুক জুড়ে, চোখ জুড়েই তো লোকটা আছে। জিনিসগুলো বরং ভোগে লাগুক। এরকম ভালবাসা ভাবাই যায় না, কী বলো?
পারুল একটু হাসল। বলল, এরকম ভালবাসা আর আনুগত্যই তো তোরা পুরুষেরা চাস।
যা বলেছ। তবে চাইলেই তো হবে না। দেনেওয়ালারও তো ইচ্ছে অনিচ্ছে আছে।
পুরুষেরা সবসময়েই কলোনিয়াল প্রভুদের মতো মেন্টালিটির হয় কেন রে? তারা রাজা, মেয়েরা প্রজা।
মাইরি পারুলদি, সেরকম হলে কিন্তু বেশ হত।
মারব থাপ্পড়। এখন ওঠ। খাবারের দাম আমি দিয়ে দিয়েছি।
আরেব্বাস! কখন দিলে?
তুই যখন হাঁ করে কার কথা ভেবে আনমনা ছিলি তখন।
যাঃ, কার কথা আবার ভাবলাম!
সে কি আর তুই আমাকে বলবি? তবে ঠিক বের করে নেব। গোয়েন্দা লাগাতে হবে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন