শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
লম্বা বাঁশের ডগায় পায়রার মাচান। বাঁশটাকে চিরে তাতে আটকানো হয়েছে কঞ্চির চৌখুপি। পায়রারা এমনই উঁচু জায়গায় বসতে ভালবাসে। দুদিন ধরে খেটেখুটে পায়রাদের বসবার জন্য জিনিসটা বানিয়েছে সুদর্শন। তাদের বাড়িতে নাকি ছিল। একটু মাথা-পাগলা আছে বটে লোকটা। কাক, কুকুর, বেড়াল, পায়রা, চড়াইপাখি সবার ওপর খুব দরদ। এসেছে তো মাত্র কয়েকদিন, এর মধ্যেই বাড়ির আর পাড়ার রাজ্যের বেড়াল কুকুর তার সঙ্গে সঙ্গে ঘোরে, রান্নাঘরের সামনে উঠোনে এসে বসে থাকে খাপ পেতে। সুদর্শন তাদের রুটি, বিস্কুট, মুড়ি, চালভাজা যা হোক খাওয়ায়। নিজের বরাদ্দের খাবার থেকেই দেয় বেশির ভাগ।
মা রাগ করে বলে, এ তোমার বড্ড বাড়াবাড়ি হচ্ছে বাপু। নিজের ভাতটুকুর আধা-আধিই তো দেখছি রোজ কাক-কুকুরকে খাওয়াচ্ছ! বলি অত লাই দেওয়া কি ভাল। লোভ দেখালে রাজ্যের নেড়ি কুকুর এসে আড্ডা গাড়বে।
তা মা, ভূতভুজ্যি বলেও তো একটা জিনিস আছে।
জন্মে শুনিনি বাপু।
চারদিকে উপোসি আত্মা থাকা কি ভাল মা? দিয়ে-থুয়ে খেতে হয়। আজকাল বাবুদের বাড়িতে দানধ্যান উঠে যাচ্ছে, ভূতভুজ্যি নেই, ব্রাহ্মণভোজন নেই, কাঙালিরা একমুঠো ভাত পায় না, ভিখিরিকে ভিক্ষে দেয় না।
মা গজ গজ করে। তার কারণও আছে। এ-বাড়িতে দানধ্যানের পাট নেই তেমন। ভিখিরিরা গাঁয়ের বা আশেপাশের মানুষ, তারা বাড়ি চেনে। এ-বাড়িমুখো বড় একটা হয় না। মা একটু আছে ওইরকম। ব্যাপারটা ভাল না মন্দ তা পান্না কখনও ভেবে দেখেনি। জন্ম থেকেই দেখে আসছে, তারও ওরকমই অভ্যেস হয়ে গেছে, কিন্তু এখন এই উটকো লোকটা এসে কিছু গণ্ডগোল পাকিয়ে তুলেছে। কথাগুলো একটু ক্যাটক্যাটে বটে, কিন্তু বেশ উচিত-কথা বলেই পান্নার মনে হয়।
মা-র ভয় ছিল, লোকটা হয়তো বেশি খাবে। রোগাপানা লোকেরাই নাকি বেশি খায়। কিন্তু দেখা গেল, খাওয়ার চেয়ে খাওয়ানোতেই সুদর্শনের আনন্দ বেশি। তার পাতের ভাত অধিকাংশই যায় কুকুর বেড়ালের পেটে।
রান্নাটা খারাপ করে না। আহামরি না হলেও খাওয়া যায়। একটু দুখে রান্না। তেল-মশলা হাত টেনে দেয়। সেটা এ-বাড়ির হিসেবি মানুষদের পছন্দই।
একদিন মাকে বলল, হ্যাঁ মা, আমরা বীরভূমের লোক, খুব পোস্ত হয় ওদিকে। তা বর্ধমানের লোকে কি পোস্ত খায় না?
মা মুখটা গোঁজ করে বলল, তা খাবে না কেন? আগে খুব হত। এখন পোস্তর যা দাম।
সুদর্শন এক গাল হেসে বলে, কাঁড়ি পোস্ত তো লাগে না। একটু হলেই হয়। রাইসর্ষে মিশিয়ে দিলে দিবি পোস্তর মতোই লাগবে খন।
না বাপু, সর্ষেবাটা পেটের পক্ষে ভাল নয়। ও যা হচ্ছে তাই হোক। শীতকালে তো সবজির অভাব নেই। মাছও তো হচ্ছে। পোস্ত না হয় গ্রীষ্মে বর্ষায় করা যাবে।
সুদর্শন বেশ মুখের ওপরেই বলে দিল, আপনারা একটু হিসেবি মানুষ, না?
সুদর্শন আলাপি মানুষ। দু-চারদিনের মধ্যেই দেখা গেল পাড়ার লোকের সঙ্গে দিব্যি ভাবসাব জমে গেছে তার। দুপুরের দিকে খাওয়ার পর পশ্চিমের ঘরের নির্জন বারান্দায় আশপাশের কয়েকজনা আসে বেশ। কথা-টথা কয়।
মা বলে, ও সুদর্শন, বলি অত আড্ডা কীসের? এ-বাড়ি ও-বাড়ি কথা চালাচালি কিন্তু ভাল নয় বাপু। ধর্মের কথা কি খারাপ কিছু মা?
কী জানি বাপু কী কথা। অত কথায় কাজ কী?
কথা নইলে কি কাজ হয় মা? মানুষের কথাই তো সম্বল।
সুদর্শনকে নানা কারণেই পছন্দ হচ্ছে না মায়ের। ঠিক যেন মাইনে করা কাজের লোকের মতো নয়। একটু ব্যক্তিত্ব আছে, নিজের মতামত আছে, যা-তা বললেই মেনে নেয় না। আবার ঝগড়াও করে না। আসল কথা লোকটা একটু জানেশোনে, একটু যাকে বলে আপারহ্যান্ডও নেয়। ওইটে মায়ের সহ্য হচ্ছে না।
কিন্তু এই ক্ষ্যাপাটে গোছর লোকটাকে পান্নার ভারী পছন্দ। ধারেকাছে এরকম একটা লোক থাকলে মাঝে মাঝে নিজেদের একটু দীন লাগে বটে, কিন্তু ভালও লাগে। একদিন মা একটু বড়মার কাছে বেড়াতে গিয়েছিল। তখন চুপ করে সুদর্শন একজন ভিখিরিকে পাছদুয়ারের কাছে বসিয়ে ভাত দিয়েছিল চাট্টি। পান্না দেখে ফেলেছিল।
ও সুদর্শনদা, ওকে কার ভাগের ভাত দিলে? তোমার ভাগের নাকি? নিজের ভাগটুকু অতজনকে দিলে তুমি যে উপোস করে মরবে!
সুদর্শন এক গাল হেসে বলল, না দিদি, নিজের ভাগেরটা দিইনি। দুজন মুনিশ আজ কাজে আসেনি। তাদেরটাই দিচ্ছি। ভাল করিনি?
পান্না একটু হেসে বলল, ভালই তো৷ কিন্তু বকুনি খেও না যেন!
সুদর্শনের শাস্ত্রজ্ঞান আছে। রামায়ণ-মহাভারত ভাল পড়া। কে কার মা, কে কার বাপ, কে কার ছেলে এসব তার ভুল হয় না কখনও। সে এ-বাড়িতে আসার পর এ-পাড়ায় একটা রটনা হয়েছে, সুদর্শন লোকটা সাধারণ মানুষ নয়। ওর ভিতরে বিভূতি-টিভূতি কিছু আছে।
কথাটা বলতে এসে একদিন পাড়ার পালগিন্নি মায়ের কাছে খুব ঠোক্না খেল। মা বলল, তোমাদের যত অলক্ষুণে কথা। বলি যার বিভূতি থাকে তার কি পেটের রোগ হয়? নাকি পরের বাড়িতে গতর খাটিয়ে খায়?
পালগিন্নি মিনমিন করে বলল, ওঁরা অমন সেজে থাকেন কিনা!
তোমার মুণ্ডু। দু-চার পাতা বই পড়েনি তা বলছি না। তা বলে বিদ্যেসাগরও তো নয়। টক করে গাছে তুলে দাও ওই তোমাদের দোষ।
পাড়াটা এখন ফাঁকা। পারুলদি তার নতুন এ-সি গাড়ি করে চলে গেল জামশেদপুর। সোহাগ আর তার মা ফিরে গেছে কলকাতায়। পান্নার এখন পড়াশুনোর চাপ। হায়ার সেকেন্ডারির সিলেবাস তো কম না। স্কুলেও যেতে হচ্ছে।
সকালবেলায় লেপমুড়ি দিয়ে বিছানায় বসেই পড়ছিল পান্না। এত ভোরে লেপের ওম ছেড়ে উঠতে ইচ্ছেও হয় না। চোখেমুখে জল দেওয়া হয়নি, বাথরুমে যাওয়া হয়নি, দাঁত মাজা হয়নি। আজ একটা ক্লাস পরীক্ষা আছে ইংরিজির। এই একটা বিষয়েই সে বেশি নম্বর পায়। গত মাসে চিরশ্রী তাকে টপকে গিয়েছিল। এবার চিরশ্রীকে টপকানোর জন্য সে প্রাণপণ করছে। পাশেই শুয়ে ঘুমোচ্ছে হীরা। অনেক বেলা পর্যন্ত ঘুমোয়। মা ওকে কিছু বলে না। পান্না জানে এ-বাড়িতে তারই আদর সবচেয়ে কম। সে বেলা পর্যন্ত ঘুমোলে মা কটকট করে কত কথা শোনাত!
আলো আসার জন্য সুমুখের জানালাটা অল্প ফাঁক করে রেখেছিল সে। ওই ফাঁকটুকু দিয়ে একটু আগে ডালে লঙ্কা ফোড়নের গন্ধ পেয়েছে সে। সেই ফাঁকটুকু দিয়েই হঠাৎ চোখ তুলে সে দেখতে পেল, তাদের রান্নাঘরের দাওয়ায় উসকো-খুসকো চুল, খোঁচা-খোঁচা দাড়িওয়ালা একটা লোকে বসে আছে। এখনও রোদ ওঠেনি বলে উঠোনের কমজোরি আলোয় মুখখানা চিনতে পারল না পান্না। এত সকালে কে এল রে বাবা? তাও রান্নাঘরের দাওয়ায় বসা! পাগল-টাগল ঢুকে পড়ল নাকি? পাগলকে তার ভীষণ ভয়।
জানালাটা একটু ফাঁক করে পান্না চেঁচিয়ে ডাকল, সুদর্শনদা! ও সুদর্শনদা! দেখ তো কে এসেছে।
কেউ সাড়া দিল না। লোকটা যেমনকে তেমন বসে রয়েছে।
হীরা বিরক্ত হয়ে পাশ ফিরে বলল, সকালবেলাতে অমন করে চেঁচাচ্ছিস কেন? ঘুমটা ভেঙে গেল।
চেঁচাব না! কে একটা উটকো লোক ঢুকে পড়েছে বাড়িতে।
কে আবার ঢুকবে! ভিখিরি-টিকিরি হবে বোধহয়। সুদর্শনদার তো অনেক পুষ্যি।
মনে হচ্ছে পাগল।
যাঃ!
হ্যাঁ রে, কেমন যেন চেহারা।
হীরা আবার ঘুমোল।
পান্নার পড়া মাথায় উঠল। সে লেপ ছেড়ে উঠে জানালার কাছে গিয়ে উঁকি মেরে দেখতে গিয়ে চমকে উঠল। অমলদা না! এত সকালে অমলদা এসে রান্নাঘরের দাওয়ায় বসে আছে কেন? এ মা। ছিঃ কত বড় মানুষ!
গরম চাদরটা টেনে গায়ে জড়িয়ে চটি পায়ে গলিয়ে দরজা খুলে বেরিয়ে এল পান্না।
অমলদা! আপনি দাওয়ায় বসে আছেন কেন?
অমল তার দিকে তাকাল। সে তাকানোর মধ্যে কোনও স্মৃতি নেই। ভ্যাবলা চোখ। তাকে চিনতে পারছে না।
অবাক হয়ে অমল বলল, তুমি কে বলো তো!
ও মা! আমাকে চিনতে পারছেন না? আমি পান্না। রামহরি চট্টোপাধ্যায়ের মেয়ে!
অমল চারদিকে চেয়ে যেন সংবিৎ ফিরে পেল। ভারী অপ্রস্তুত হয়ে বলল, এটা তোদের বাড়ি বুঝি!
হ্যাঁ তো! আপনি চিনতে পারেননি?
অমল একটু হেসে বলল, আসলে আমি পথ-টথগুলো কেমন গুলিয়ে ফেলেছিলাম।
পথ গুলিয়ে ফেলেছিলেন! সে কী!
অমল একটু লজ্জা পেয়ে হেসে বলল, আজকাল খুব অন্যমনস্ক থাকি তো। খুব ভোরে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে পথ-টথ সব এলোমেলো হয়ে গেল। তারপর একটা লোক ডেকে এনে এখানে বসাল। বলল, চা খাওয়াবে।
লোকটা কে বলুন তো?
ঠোঁট উলটে অমল বলল, চিনি না। ঢ্যাঙা, রোগামতো। বলল, বাবু, আমি আপনাকে চিনি। আপনি অনেক লেখাপড়া জানেন বলে শুনেছি, আজ আপনার কাছে কয়েকটা কথা শুনব। জ্ঞান-বিজ্ঞানের কথা আমার খুব ভাল লাগে। এই বলে নিয়ে এল।
পান্না হেসে ফেলে বলল, ও তো সুদর্শনদা, আমাদের রাঁধুনি।
তাই হবে। লোকটা খুব বকবক করে, তাই না?
হ্যাঁ। কিন্তু আপনাকে বসিয়ে রেখে সে গেল কোথায়?
বলল, গিন্নিমা এখনও ওঠেননি বাবু, দাঁড়ান, দোকান থেকে আপনার জন্য ভাল বিস্কুট নিয়ে আসি।
আপনি উঠুন তো, বৈঠকখানায় এসে বসুন। আমি চা করে দিচ্ছি।
অমল লজ্জা পেয়ে বলে, তুই দিবি।
হ্যাঁ, আসুন। ইস, আমার যে কী ভীষণ লজ্জা করছে! আপনি দাওয়ায় বসে আছেন! ছিঃ ছিঃ!
তাতে কী হয়েছে। তোদের বাড়ির দাওয়ায় বসলে কি আমার মান যায়? এ-গাঁয়ের ধুলো মেখে বড় হয়েছি। হ্যাঁ রে, রামহরিকাকা, কাকিমা সব ভাল তো?
হ্যাঁ।
কতকাল দেখাসাক্ষাৎ নেই। তোর সঙ্গে সোহাগের খুব ভাব, তাই না?
হ্যাঁ। সোহাগ খুব ভাল মেয়ে।
ভারী আনমনা হয়ে খানিকক্ষণ ভ্যাবলা চোখে চেয়ে থেকে অমল বলল, সবাই ভাল। কিন্তু আমার সঙ্গেই কারও বনল না।
অমল উঠল। বৈঠকখানায় এসে বসল।
আপনি ভীষণ রোগা হয়ে গেছেন অমলদা!
বয়স হচ্ছে। এখন ফ্যাট ঝরে গেলেই তো ভাল।
এই শীতে শুধু একটা সোয়েটার পরে ঘুরে বেড়াচ্ছেন! শীত লাগে না আপনার! আমি তো সকালে লেপ ছেড়ে উঠতেই পারি না।
হাঁটলে গা গরম হয়ে যায় তো, তাই আর চাদর-টাদর নিইনি।
বসুন, আমি চা করে আনছি।
রান্নাঘরে এসে পান্না দেখল, সুদর্শন ঠোঙায় বিস্কুট এনে চায়ের জল চাপিয়েছে।
সুদর্শনদা! তুমি কী লোক বলো তো! কাকে এনে দাওয়ায় বসিয়ে রেখেছিলে জানো?
সুদর্শন এক গাল হেসে বলে, তা জানি দিদি। সবাই বাবুকে জানে। মাথা-পাগলা আছেন বটে, কিন্তু পেটে মেলা বিদ্যে। তাই তো রাস্তা থেকে ধরে নিয়ে এলুম। বেভুল ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন।
তোমার আক্কেল যে কবে হবে। বৈঠকখানায় তো বসাতে পারতে! অত বড় মান্যিগন্যি লোককে কি দাওয়ায় বসায়? আমার ঘরের বারান্দায় চেয়ারও তো ছিল?
কী জানি দিদি, ওসব করতে গেলে গিন্নিমা যদি চটে যায়। তাই সাহস করিনি। চা খাওয়াতেও দোনোমোনো করছিলাম। হিসেবের বাড়ি তো!
চিমটিকাটা কথা। তবে গায়ে মাখল না পান্না। বলল, একটা প্লেট দাও, বিস্কুটটা সাজিয়ে নিয়ে যাই।
সুদর্শন একটু দুঃখ করে বলল, ঘরে নিয়ে বসালে দিদি, তা হলে আর বাবুর সঙ্গে কথা-টথা হল না আজকে। দাওয়ায় বসলে দিব্যি কথা হত দুজনে। নাগালের বাইরে নিয়ে ফেললে তো৷
থামো তো! উনি হেঁজিপেঁজি লোক নাকি?
ওই তো হয়েছে মুশকিল। এসব লোককে হাতের নাগালে পাওয়া চাঁদ পাওয়ার শামিল। আজ জুতমতো পেয়েছিলুম দিদি, দিলে তুমি সব ভণ্ডুল করে।
তোমার কী কথা বলো তো অমলদার সঙ্গে!
সুদর্শন একটু লজ্জার হাসি হেসে বলে, এই নানা রকম কথাই তো মনে আসে। দু-একটা কথা জিজ্ঞেস করে নিতুম আর কী। এই ধরো নমঃশূদ্রের মেয়ের সঙ্গে পৌণ্ড্রক্ষত্রিয়ের ছেলের বিয়ে হলে সেটা অনুলোম না প্রতিলোম হচ্ছে। তারপর ধরো বলরামের মা-বাবার একটু গোলমেলে বিয়ে ছিল, তা হলে বলরামের বর্ণটা আসলে কী হবে। তারপর ধরো…
দুর! তোমার যত আজগুবি কথা। ওসব কি অমলদা জানে নাকি? অমলদা বিলেত আমেরিকায় ছিল, সাহেব মানুষ, সায়েন্টিস্ট। ওসব জাতপাতের খবর রাখার কথাই নয় তার।
কিন্তু দিদি, এও তো সায়েন্স।
তোমার মুণ্ডু। এবার চা-টা ভাল করে বানাও। গুচ্ছের চিনি দিও না যেন, আর লিকার বেশি ঘন করবে না। পাতলামতো হবে।
অ্যাঁ। বলে অবাক হয়ে সুদর্শন কিছুক্ষণ তার দিকে চেয়ে থেকে বলে, ওই কি তোমাদের ভাল চা?
হ্যাঁ তো!
আমরা তো ভাল চা বলতে বুঝি কড়া লিকার, কড়া মিষ্টি, ঘন দুধের গন্ধ।
সে হল গরিবদের চা। বড় মানুষরা কি ওরকম চা খায়?
তুমি তো বলেই খালাস। ওদিকে বাবু কী বলেছে জানো?
কী?
যখন চা খাওয়াবো বলে ধরে আনছিলাম তখন বাবু নিজে থেকেই বলল পানসে চা খেতে পারি না বাপু, চা হবে কড়া লিকার আর খুব মিষ্টি। ওপরে সরের টুকরো ভাসবে। আর মুড়ি ছড়িয়ে দিয়ে সুড়ুৎ সুড়ুৎ করে খাবো।
বলল ও কথা?
হ্যাঁ গো।
তবে তাই করো। কী জানি বাবা, অমলদার হয়তো অন্য রকম রুচি।
পান্না ফিরে এসে দেখল, অমল সোফায় বসে ঘাড় কাত করে ঘুমিয়ে পড়েছে। গভীর ঘুম। চোখের কোলে কালি পড়েছে লোকটার। গালের হনু দুটো উঁচু। কী মলিন বেশবাস। এ লোকে যে ওরকম সাংঘাতিক স্কলার ছিল কে বলবে এখন দেখে? বয়সও তো খুব বেশি নয়। চুয়াল্লিশ-পঁয়তাল্লিশ হবে বোধহয়। কিন্তু এর মধ্যেই যেন কেমন শরীরে যৌবনের টান চলে গেছে, জবুথবু ভাব।
পাশের ঘরে মায়ের ঘুম ভেঙেছে।
ও ঘরে কে রে?
আমি মা!
ও ঘরে কী করছিস?
পান্না দরজার কাছে গিয়ে চাপা গলায় বলল, অমলদা এসেছে।
অমলদা আবার কে?
আহা, অমলদাকে চেনো না?
মহিম ভাসুরঠাকুরের ছেলে?
হ্যাঁ।
ও মা! এত সকালে কী ব্যাপার? কিছু হয়েছে নাকি?
না, না, কিছু হয়নি। এমনি এসেছে।
এত সকালে!
চা খেয়ে চলে যাবে।
বউয়ের সঙ্গে কী যেন গোলমাল শুনছিলুম।
আস্তে মা। শুনতে পাবে।
দরজাটা আবজে দে না। কাছে আয়।
দরজাটা সাবধানে ভেজিয়ে আধো-অন্ধকার ঘরে ঢুকল পান্না। মশারির ভিতর থেকে মা বলল, মাথাটা নাকি একটু খারাপ হয়েছে?
না তো! গাঁয়ের লোকে একটা ছুতো পেলেই রটায়।
তা নয় বাপু। অনেক টাকার চাকরিটাও নাকি ছেড়ে দিয়েছে। গাঁয়ে এসে থানা গেড়ে বসে আছে। এ তো ভাল লক্ষণ নয়। লোকে পুরনো কথা তুলছে।
কী কথা?
ওই যে পারুলকে নিয়ে। পারুলের জন্যেই নাকি পাগল। ওর বউ নাকি সন্দেহ করে এখনও দুজনের সম্পর্ক আছে।
বাজে কথা। পারুলদি কি সেরকম মেয়ে?
কে জানে বাবা কী। তোর অত সাউকারি করতে হবে না। সংসারের মারপ্যাঁচ বোঝার মতো বুদ্ধি কি তোর হয়েছে? নাপতেবুড়ি বলে গেল, পারুলের যে ছেলে হবে তার পিছনে নাকি ওই অমল।
ছিঃ মা, ওসব মনে করাও পাপ।
তা বাপু, বললেই দোষ? কীর্তিটা কি দোষের নয়?
কী করে ভাবলে বলো তো!
ভাবতে আমার বয়েই গেছে। ও আবর্জনা না ঘাঁটাই ভাল। লোকের মুখ তো তা বলে বন্ধ থাকছে না। ওসব লোককে বাড়িতে বেশি ঢুকতে দিতে নেই।
তুমি বড্ড সেকেলে মা। কিচ্ছু বোঝে না। কেবল কানে শুনে সব বিশ্বাস করো। পারুলদি কি তেমন মেয়ে বলে তোমার মনে হয়?
সকালবেলাটায় আর মুখ নাড়তে হবে না। ঠাকুর দেবতার নাম এখনও উচ্চারণ করিনি। তোর বাবা এসময়ে গেল কোথায়?
বাবা তো রোজ সকালে মর্নিং ওয়াক করতে বেরোয়।
মর্নিং ওয়াক না ছাই। চাষের মাঠে গিয়ে বসে আছে দেখ গে। খেজুর রস সাঁটছে। কিন্তু এখন অমলের সঙ্গে কথা বলে কে?
আমিই বলছি। সুদর্শনদা চা করছে।
বেশি গলাগলির দরকার নেই। ও মানুষ কিন্তু ভাল নয়। চরিত্রের দোষ আছে।
পান্না একটু রাগ করেই এ-ঘরে এসে দরজা বন্ধ করে দিল। অমল এখনও নিঃসাড়ে ঘুমোচ্ছে। মাথাটা আরও ঝুলে পড়েছে বাঁ ধারে।
সুদর্শন চা নিয়ে আসার পর পান্না ডাকল।
অমল ঘুম ভেঙে ভারী লজ্জিত হয়ে বলল, ইস, ঘুমিয়ে পড়েছিলাম।
আপনি খুব টায়ার্ড, না?
হ্যাঁ। খুব টায়ার্ড। রাতে ঘুম হয় না তো। সেই রাত দুটোয় ঘর ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছি।
রাত দুটো!
হ্যাঁ। ঘুম না এলে ঘরে আমার দমবন্ধ হয়ে আসে।
বেরিয়ে কোথায় যান?
কোনও ঠিক থাকে না। বেরিয়ে পড়ি।
কলকাতায় যাবেন না?
যেতে ভয় হয়।
ভয় কেন অমলদা?
কলকাতাকে ভয় পাই না। ওদের পাই।
কাদের ভয় পান অমলদা?
অমল একটু হেসে বলল, সবাইকে ভয় পাই রে। আমার আত্মবিশ্বাস বড্ড কমে গেছে।
সোহাগ কিন্তু আপনাকে খুব ভালবাসে।
হুঁ।
সোহাগ বলছিল, ওর মন খুব খারাপ।
কেন?
আপনার আর বউদির নাকি সেপারেশন হয়ে যাচ্ছে?
অমল চায়ের কাপটা হাতে নিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ স্থির হয়ে। তারপর বলল, তোরাও শুনেছিস বুঝি?
হ্যাঁ। সেইজন্যই তো আপনি—
কথাটা শেষ করল না পান্না। আসলে এতটাও তার বলার কথা নয়। তার হঠাৎ মনে হল সে মাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে।
অমলের অবশ্য তেমন ভাবান্তর হল না।
মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ, মনটা ভাল নেই রে। আমার যে কী হয়েছে তা বুঝতে পারি না। পাগল হয়ে যাচ্ছি কি না কে জানে। গেলে একরকম ভালই। পাগলের তো স্মৃতি থাকে না। মাথার মধ্যে সব উলটোপালটা হয়ে যায়।
কেন পাগল হবেন অমলদা? ওসব ভাববেন না। কলকাতায় ফিরে যান। সব ঠিক হয়ে যাবে।
অমল ভারী সরল চোখে তার দিকে চেয়ে বলল, বলছিস?
হ্যাঁ।
যাব?
হ্যাঁ অমলদা, প্লিজ।
অমল মাথা নেড়ে বলল, বেশ, তুই যখন বললি যাব। অনেক সময়ে ভগবান ছোট ছোট মানুষের ভিতর দিয়ে কথা বলে ওঠেন, জানিস?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন