শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
বাইগুনগুলা দ্যাখেন খুড়া, কেমন বোঝেন?
ধীরেন কাষ্ঠর চোখ ভারী জুলজুল করছিল। গোয়ালের পিছন দিকটায় পচাই সার দিয়ে বেগুন ফলিয়েছে বাঙাল। শীতের মাঝামাঝি পার করে তবে ফলেছে বটে বেগুনের মতো বেগুন। কিছু সবজে-বেগুনি দো আঁশলা, কিছু প্রগাঢ় কালচে-বেগুনি রঙের। আখাম্বা বিরাট সাইজের নয়, মাঝারি গড়নের। বড় বড় পাতার আড়ালে আবডালে যেন নববধূর মতো সব আধো-ঢাকা হয়ে উঁকি দিচ্ছে। বেগুন চেনে ধীরেন। এর জাতই আলাদা। গা এত চকচকে যেন কেউ তেলে ডুবিয়ে এইমাত্র তুলেছে।
হাঁটু মুড়ে বসে জহুরির চোখে কয়েকটা বেগুন নেড়েঘেঁটে দেখল ধীরেন। ভারী নরম শরীর, ভিতরে যেন বিচিই নেই মোটে।
বাঙাল হে, এ তো বড় জাতের বেগুন দেখছি। ফলনও তো ধুন্ধুমার।
আইজ্ঞা। আপনারা কাশীর বাইগুন কইতে লোল ফালান, আমি কই ময়মনসিংহের বাইগুন একটু চাইখ্যা দেইখেন, রসগোল্লা ফালাইয়া বাইগুন খাইবেন।
আরও বড় হবে তো!
কন কী! আরও বড় মানে! লাউয়ের লাহান হইব। অখনই কী দ্যাখতাছেন, আর এক মাস পরে দেইখ্যেন, চোখে ধন্দ লাগব।
আজ বাঙালকে বেগুনে পেয়েছে। এক একদিন এক একটা পায় ওকে। তবে সত্যি কথা বলতে কি, ধীরেন সব বেগুনেরই স্বাদ পায়। পেটে খিদে থাকলে স্বাদ-সোয়াদের অভাব হয় না। তার কাছে কাশীর বেগুন যেমন, ময়মনসিংহের বেগুনও তেমন। তফাত হয়তো আছে, কিন্তু বাছবিচার নেই, তবে মোসাহেবি করা তার রক্তের মধ্যেই আছে, যখন যে যা বলে তাতেই তাল ঠুকে না গেলে ধীরেনের চলেই বা কী করে? সুতরাং সে সারা সকালটা বেগুনের ক্ষেতে ঘুরে ঘুরে বিস্তর হ্যাঁ, হুঁ, বটেই তো বলে যেতে লাগল। বেগুন নিয়ে আরও কিছুক্ষণ কাটত। কিন্তু বাঙালের কোলে তার মেয়ে হাম্মি চড়া রোদে আর থাকতে চাইছে না। সে কান্নাকাটি শুরু করায় বাঙাল বাড়ির দাওয়ায় ফিরে এসে ছায়ায় বসল। মেয়েটাকে ছেড়ে দিল উঠোনে।
একটা মেয়ের বমি করার শব্দ আসছিল কুয়োতলার দিক থেকে। কুয়োতলাটা আবডালে। রান্নাঘরের ওপাশটায় একটা নিমগাছের ছায়ার নীচে। এখান থেকে দেখা যায় না। বাঙাল কুয়োতলাটা বানিয়েছে হিসেব করে। নিমপাতা পড়ে পড়ে কুয়োর জল নাকি শুদ্ধ হবে, তা হবে হয়তো। কিন্তু বমিটা করছে কে? একটু কান খাড়া করে ধীরেন। লক্ষণ ভাল নয়। এ যদি বাসন্তী হয় তা হলে চিন্তার কথা। বমি করে নেতিয়ে-টেতিয়ে পড়বে হয়তো। তা হলে ধীরেনের সকালের খ্যাটনটা গেল।
বমির শব্দটা বাঙালও শুনছিল। মন দিয়েই শুনল। তারপর ধীরেনের দিকে চেয়ে বলল, মাইয়ালোকের এই বড় দোষ।
ধীরেন বুঝতে না পেরে একটা হুঁ দিয়ে দায় সারল।
রসিক নিজেই ফের বলল, প্যাটে বাচ্চা আইলেই বমিছমি কইরা নান্দিভাস্যি কাণ্ড।
এবার ধীরেন বুঝল, বলল, বলো কী। হাম্মি তো এই সবে দাঁড়াতে শিখেছে।
আর কইয়েন না খুড়া। ইচ্ছায় তো হয় নাই অ্যাকসিডেন্টাল কেস। হইয়া পড়ছে আর কী!
এরকম তো হতেই পারে। ধীরেন ব্যাপারটার মধ্যে আর কোনও দোষ দেখতে পেল না। তবে সকালে আজ হাঁটাহাঁটি হয়েছে বিস্তর। মহিমদাদার বাড়িতে আজকাল সকালের দিকে গিয়ে পড়লে একটু কফি জোটে। কফির একটু নেশাও হয়েছে আজকাল ধীরেনের। তা গিয়ে শুনল, কফি ফুরিয়েছে। আজ তাই লিকার চা জুটেছে। লিকার চা নিমকহারাম জিনিস। পেটে গিয়ে ঘুমন্ত খিদেকে নাড়া দিয়ে জাগিয়ে দেয়। তখন ভারী হাল্লাচিল্লা পড়ে যায় পেটে। পেটের সেই হাঁচোড়-পাঁচোড় থেকেই মনে পড়ে গেল আজকাল বিজুদের বাড়িতে সকালের দিকে পাঁউরুটি সেঁকা হয়, পুরু মাখন লাগিয়ে খায় সবাই। জব্বর জিনিস। গিয়ে শুনল, সকালে সব পিকনিকে গেছে। আজ শনিবার, বাঙালের আজ বিকেলে আসার কথা। রোববার সকালে তার বাঙালের বাড়িতে পাকা বন্দোবস্ত আছে। কিন্তু বাঙাল না-থাকলে সুবিধে হয় না। বাসন্তীর মা এসে সকালবেলায় থানা গেড়ে বসে থাকে। যৌবনের সেই রসে ঢলঢল মেয়েটি এখন কাকতাড়ুয়া বুড়ি। দেখলেই বুকের ভিতরটা গুড়গুড় করে। তার বউয়ের কাছে নালিশও করে এসেছে।
কামারপাড়ার রাস্তায় সকালে হঠাৎ বলাইয়ের সঙ্গে দেখা। বাসন্তীর হেক্কোড় দাদা। কানাই আর বলাইয়ের মধ্যে মারদাঙ্গা লেগেই আছে। একসময় বাঙাল ভগ্নীপোতকে গাঁ-ছাড়া করে বিষয়সম্পত্তি গাপ করার ফন্দি এঁটেছিল। কালু গুণ্ডাকে দিয়ে খুন অবধি করানোর চেষ্টা করেছিল। কিন্তু বাঙাল শক্তপোক্ত লোক, সে ভয় খায়নি। মার খেয়েও নিজের দখল ছাড়েনি৷ গোঁ আছে বটে। মাঝখানে থেকে কানাই-বলাইকেই এখন আঁটি চুষতে হচ্ছে।
তাকে দেখেই বলাই হাঁটায় ব্রেক কষে বলল, এই যে ধীরেনকাকা কোথায় চললেন?
গলার চড়া আওয়াজটা ধীরেনের ভাল মনে হল না। বলাই মারমুখো মানুষ। তাই মিনমিন করে বলল, এই একটু বেরিয়েছি বাপু।
ওই শালার কাছে আপনার নাকি খুব যাতায়াত শুনতে পাই!
শালাটা কে তা বুঝতে না পেরে ধীরেন থতমত খেয়ে বলল, না তো! কে বলেছে তোমাকে?
লুকিয়ে তো লাভ নেই কাকা। সব জানি। আপনারা কিছু লোকই তো আসকারা দিয়ে ওকে মাথায় তুলেছেন। এখন শালা চোখে ভেলভেট দেখছে। নইলে শুয়োরের বাচ্চার এত সাহস হয়?
ধীরেন বিপদের গন্ধ পাচ্ছিল। বড্ড তেড়িয়া মেজাজ বলাইয়ের। গদগদে একটু হেসে বলল, না বাবা, কে কী রটায় কে জানে। ওসবে কান দিও না।
কেন কাকা, মিছে কথা বলে বুড়ো বয়সে পাপের বোঝা বাড়াচ্ছেন। ওই খানকির ছেলে আপনাদের মাথা খাচ্ছে কী করে? বাইরে থেকে উড়ে এসে জুড়ে বসে আমাদের গাঁ ছারখার করে দিচ্ছে, দেখছেন না? আমার বোন তখন কুঁড়ি মেয়ে, বোধবুদ্ধি হয়নি। তাকে ফুসলিয়ে শাঁখা সিঁদুর পরিয়ে বিয়ের ভড়ং করল, আপনারা পাঁচজন টুঁ শব্দটি করলেন না। নইলে নাবালিকা হরণের জন্য ওর দশ বছর জেল হয়। ও শালা কী মতলবে একটা বউ থাকতে আবার বিয়েতে বসল সেটা কি বোঝেন না আপনারা?
এইবার কার কথা হচ্ছে তা ধরতে পারল ধীরেন। তবে সম্পর্কটা রাগের মাথায় বড্ড গুলিয়ে ফেলছে বলাই। কে কার শালা তার পর্যন্ত হিসেব করছে না।
আমতা আমতা করে ধীরেন বলল, যা হয়েছে তা তো হয়েই গেছে বাবা। একটা মিটমাট করে নাও বরং।
মিটমাট! ভাল বলেছেন বটে। ও হারামজাদা মিটমাটে আসতে চাইলে তো!
যেন ভারী অবাক হয়েছে এমন ভাব করে ধীরেন বলল, চাইছে না বুঝি?
রাগে বলাই যেন দুনো হয়ে উঠছিল, এ কথায় ফেটে পড়ে বলল, ও শালার পাখা গজিয়েছে, বুঝলেন? পেটে পেটে শয়তানি কি কম? আমার বোনকে ফুসলিয়ে বের করে নিয়েছে, লোককে ধাপ্পা দিয়ে দোহাত্তা জমি গাপ করছে, খোঁজ নিলে দেখবেন আরও কটা বিয়ে করে বসে আছে। এসব বদমাশ লোককে আপনারা প্রশ্রয় দিচ্ছেন কী করে? ভুবন জ্যাঠা তো বলেছিল, এই গাঁয়ে বাইরের লোক বসান দিতে দেবে না। পঞ্চায়েত না কচু। কিছু পারল করতে, টাকা খাইয়ে সব মুখ বন্ধ করে দিয়েছে। বেশি নয়, আমার ধূপকাঠির ব্যবসায় দশটি হাজার টাকা ঢাললেই ফুলেফেঁপে উঠবে। খদ্দের ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে। মাত্র দশটি হাজার টাকা ধার হিসেবে চেয়ে পাঠিয়েছিলাম। আমার মাকে দূর দূর করে তাড়িয়ে দিয়েছে।
ধীরেন ভারী অবাক হয়ে বললে, তাই নাকি? এ তো অন্যায় কথা।
অন্যায় নয়! বলে পাঠিয়েছিলুম হ্যান্ডনোট লিখে দিচ্ছি, না হয় বউয়ের নথ বাউটি বাঁধা দিচ্ছি, তা কানেই তুলল না। আপনারা সবাই মিলে এই অন্যায়ের একটা বিহিত তো করতে পারেন। নাকি?
হে হে করে ভারী বুঝদারের মতোই হাসছিল ধীরেন। বাসন্তীর মা বিয়ের সময় মোটা টাকা পণ নিয়েছিল রসিকের কাছ থেকে, সবাই জানে। বিষয়-সম্পত্তিও সবই বাসন্তীর নামে। এদের হয়তো আশা ছিল লোকটাকে হাড়িকাঠে ফেলা গেছে। কিন্তু বাসন্তীকে যত বোকা বলে ধরে নিয়েছিল এরা ততটা বোকা যে বাসন্তী নয়, সেও যে নিজের ভাল-মন্দ বোঝে এটা টের পেয়ে এখন এদের এক গাল মাছি। শুধু তাই নয়, বাসন্তী তার বাঙাল স্বামীকে ভালবাসে খুব। যদিও তার কানে বিষ বড় কম ঢালেনি কানাই-বলাইয়ের মা।
তবে এতসব আস্ফালনের ভিতর থেকে পরমহংস যেমন জল থেকে দুধ তুলে নেয় তেমনি ধীরেনও আসল খবরটা পেয়ে গেল। তা হল বাঙাল এসেছে। আর তার মানেই হল সকালে আজ একটা খ্যাটনের ব্যবস্থা হল।
তা এ পর্যন্ত ভালই এগোচ্ছিল ব্যাপারটা। বেগুনক্ষেত দেখে বেড়ানো অবধি, কিন্তু বাধক হচ্ছে বাসন্তীর ওই বমিটা, ওতেই এক বালতি দুধে এক ফোঁটা গোচোনা পড়ে যাচ্ছে।
সে বাঙালের দিকে চেয়ে বলল, তাই বুঝি?
হ খুড়া। ইচ্ছায় হয় নাই। তবে ভগবানের ইচ্ছার উপর তো হাত নাই।
তা তো বটেই।
আমি বউরে কইছি, কষ্ট-টষ্ট হয় হউক, পোষাইয়া দিমু অনে। কিন্তু মুশকিল কী জানেন? প্যাটে তো কিছুই রাখতে পারছে না। যা খায় উগরাইয়া দেয়।
তবে তো সমস্যা।
খুব সমস্যা।
বমির শব্দ থেমেছে। এখন জল কুলকুচি করার শব্দ হচ্ছে। মুক্তার গলার স্বর শোনা গেল, অ বউদি, পেট তো একেবারে খালি করে দিলে। গিয়ে শুয়ে থাকো গে যাও, রান্না-বান্না আমি দেখছি।
বাসন্তীর ক্ষীণ গলায় বলল, না বাপু, শখ করে ইলিশ মাছ এনেছে। বেগুন-ইলিশ খাবে। আমি পারবখন, তুই একটু আগুপিছু করে দিস।
তোমার মাকে একটা খবর দেব কি?
কেন?
শুনেছি নাকি কোন শেকড় বাটা খাইয়ে পোয়াতির বমি বন্ধ করতে পারে।
না বাপু, ওসব জিনিসে আমার দরকার নেই। বমি হচ্ছে হোক। এ তো আর নতুন কিছু নয়।
বাঙাল খুব আনমনে সামনের দিকে চেয়ে বসে আছে। হাম্মি টলোমলো পায়ে দাওয়া ধরে ধরে হেঁটে বেড়াচ্ছে। মাঝে মাঝে বাপের দিকে ফিরে চেয়ে মোট চারখানা দাঁত দেখিয়ে হাসছে।
ভারী সুন্দর সব দৃশ্য। ছানি-পড়া চোখে এসব দৃশ্য আবছা হয়ে গিয়েছিল। এখন আবার সব ফুটে উঠেছে। ভারী ভাল দেখছে আজকাল ধীরেন। পেটে খিদে আঁচড়াচ্ছে। তবু কিছু খারাপ লাগছে না এখন। মনটা ভাল থাকলে এমন ধারা হয়! তখন খিদে-টিদে সব চাপা পড়ে থাকে।
মনটা ভাল হতে বেশি কিছু লাগে না! মানুষের এক-একটা উচ্চারণই যেন যুগযুগান্তের কুয়াশা কাটিয়ে রোদের আলো ছড়িয়ে দেয়! ওই যে কুয়োতলায় বাসন্তীর ক্ষীণ কণ্ঠ শোনা গেল, বমি করে উঠে হাঁফ ধরা গলায় বলছে, না বাপু শখ করে ইলিশ মাছ এনেছে। বেগুন-ইলিশ খাবে। আমি পারবখন, তুই একটু আগুপিছু করে দিস।
একটুকুই তো কথা, কিন্তু এই কথাটুকুই বড় বিহ্বল করে ফেলেছে তাকে। তাও বাসন্তী হল গিয়ে বাঙালের দ্বিতীয় বউ। আইনে যার স্বীকৃতি নেই। তার উপর ভিনদেশি মানুষ, গোঁয়ারগোবিন্দ, ভাষাটাও রাক্ষুসে। তা বলে কি ভালবাসায় ভাঁটা হল? নাঃ, বাঙালটার কপাল আছে। পুরুষও বটে।
বুঝলেন খুড়া, টাকাপয়সা বিষয়সম্পত্তি কোনও কামের জিনিস না। যার লিগ্গা করি সেই হইল আসল। হ্যায় যদি না থাকে তাহইলে হগ্গলই ফাক। বুঝলেন?
বুঝেছি হে। বাসন্তীর জন্য ভাবছ তো! আরে, চিন্তা কী? ও গাঁয়ের মেয়ে, শহুরে মেয়ের মতো ফুলের ঘায়ে মূৰ্ছা যায় না।
উপর্যুপরি হইয়া গেল তো, তাই একটু ডরাই।
আগে তো বাপু সব উপর্যুপরিই হত। তখন তো আর আটকানোর উপায় ছিল না।
খুড়া, বাসন্তীরে ভাল কইরা আশীর্বাদ কইরেন তো। আপনে একজন সজ্জন মানুষ, মনে কালিঝুলি নাই, প্রাণ ভইরা আশীর্বাদ কইরেন তো। গর্দিশটা য্যান পার হইতে পারে।
তার আশীর্বাদের কোনও দাম আছে বলে যে কেউ বিশ্বাস করে এটাই ধীরেনের কাছে অবিশ্বাস্য। বিহ্বল থেকে বিহুলতর লাগতে লাগল তার। এতটাই যে, চোখে জল এসে গেল। বুড়ো বয়সে কিছুই আটকানো যায় না। না পেচ্ছাপ, না চোখের জল। সুড়সুড় করে চোখের কোল বেয়ে জলের ধারা নেমে এল।
ধুতির খুঁটে চোখ মুছে ধরা গলায় ধীরেন বলল, কোনও কাজ হবে কিনা জানি না, তবে পাপীতাপী মানুষেরও মনে আশীর্বাদ জমা হয়ে থাকে, বাসন্তীর কিছু হবে না হে বাঙাল, তুমি দেখো।
বড় চিন্তা হয় খুড়া। মাইয়াটা বড় ভাল। ভালগুলাই তো টিকতে চায় না কিনা।
টিঁকবে হে টিঁকবে। শশধর ডাক্তারের সঙ্গে একবার দেখা কোরো। পুরনো ডাক্তার। এরকম হোমিওপ্যাথ পাবে না।
না, পেটের হাঁচোড়-পাঁচোড়টা আর নেই ধীরেনের। মন উপচে আনন্দটা চলকে পড়েছে বঝি পেটেও। বেশ ভরা ভরা লাগছে।
চলি হে বাঙাল। বলে উঠতে যাচ্ছিল সে।
আরে, কই যান খুড়া? গিরস্তের অকল্যাণ চান নাকি?
কী যে বলো বাঙাল। তাই চাইতে পারি?
এই বাড়ি থিক্যা একটা কাউয়া পইর্যন্ত শুধু মুখে যায় না। বহেন বহেন।
আবার চোখে জল আসে ধীরেনের। স্থলিত কণ্ঠে বলে, আজ থাক।
পাগল নাকি? আপনারে খাওয়াইলে তো আমারই লাভ খুড়া। পরকালের বোঝা কমব। বহেন।
তা বসল ধীরেন। মনের বিহ্বল ভাবটা যাচ্ছে না। বড় অন্যরকম লাগছে চারদিকটা। ভারী ভাল লাগছে। জীবনে বোধহয় এরকম দিন দুটো-একটাই আসে।
মুক্তা এসে প্রথমে চা দিয়ে গেল। খাঁটি দুধের জিনিস, চা-পাতাটাও বেজায় ভাল। এরকম চা কোথাও খায়নি কখনও ধীরেন।
একটু বাদেই এল লুচি আর নতুন লালচে ছোট আলুর শুকনো দম।
খান খুড়া, প্যাট ভইরা খান।
আজ ধীরেন খিদের জন্য খেল না। লোভেও না। খেতে খেতে মনে মনে বলল, এদের দোষঘাট যা আছে তা সব আমার হোক ঠাকুর। এদের ভাল হোক। এই এদের সব গ্রহের দোষ, সব রিষ্টি, ফাঁড়া সব আমার গ্রাসে গ্রাসে মিশে যাক।
খুড়া।
অ্যাঁ।
প্যাট ভরছে?
ওঃ, খুব ভরেছে হে বাঙাল।
এইবার এক গ্লাস দুধ খান। নূতন গোরুব দুধ।
নাঃ হে, একদিনে এত ভাল নয়। পেট ছেড়ে দেবে।
আরে ধুর, আপনেরে তো অনেকদিন দেখতাছি। পারবেন।
দুধ খেতে হল। তারপর উঠল ধীরেন।
সকালটা আজ বড় ভাল কাটল। এখন বাকি দিনটা যেমনই কাটুক কিছু যায়-আসে না। দিন কেমন কাটবে তার একটা আন্দাজও আছে ধীরেনের। এই গাঁয়ের ঘাটায়-আঘাটায় চরকিবাজি করে বেড়ানোই তার জীবনযাপন। কোনও অর্থকরী কাজ নেই, লাভালাভ নেই, উপার্জন নেই। বাড়ি ফিরলে অশান্তি হয় বলে আজকাল বাইরেই সময়টা কাটিয়ে দেয় সে। কেউ বসতে বললে বসে। চুপচাপ ঘন্টার পর ঘণ্টা বসে থাকতে তার কোনও কষ্ট নেই। কত কী দেখে, কত কী শোনে। সূর্য মাথায় চড়ে বসলে ঘরমুখো হয়।
বাড়ি ফিরতেই তার বউ আজ বলল, বাঙাল বাড়িতে কিছু মেগে-পেতে এসেছ নাকি?
ধীরেন সভয়ে বলল, না তো!
তবে যে বড় ঝুড়িভর্তি আনাজ পাঠিয়েছে। কী ব্যাপার?
অবাক হয়ে ধীরেন বলে, পাঠিয়েছে নাকি?
হ্যাঁ। মেলা পাঠিয়েছে। সঙ্গে একটা খোকা ইলিশ অবধি।
আমি কিছু চাইনি। বাঙাল দিলদরিয়া লোক।
সে তো বুঝলুম। সে লোক খারাপ নয় জানি। কিন্তু তার খণ্ডার শাউড়ি এসে না ফের ঝেড়ে কাপড় পরায়।
ধীরেন কী বলবে, চুপ করে রইল।
শুনলুম, ছেলের বউরা মিলে নাকি আজ বাড়ি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে। তেঁতুলতলায় পুঁটুলি বগলে বসে আছে গিয়ে।
কার কথা বলছ?
বাঙালের শাউড়ির কথাই বলছি। এতকাল ঝগড়াঝাঁটি হত, কিন্তু ঘরের বার করে দেয়নি। আজ দিয়েছে।
কেন?
তা অত কে জানে? ভুতোর মা বলে গেল ছেলের ব্যবসার জন্য বাঙালের কাছে টাকা চাইতে গিয়েছিল। বাঙাল দেয়নি বলে বুড়ির ওপরে গিয়ে রাগ পড়েছে। তাই বুড়িকে বেড়ালপার করতে চাইছে। কর্মফল তো আছে রে বাবা! আমাকে সেদিন বিঁধিয়ে কত কথাই বলে গেল তোমাকে নিয়ে।
মনটা খারাপ হয়ে গেল ধীরেনের। এখন অভাবে-কষ্টে, সংসারের অশান্তিতে বাসন্তীর মা হয়তো ডাইনিবুড়ির মতো একজন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু এরকম তো ছিল না মহিলা। বিয়ে হয়ে যখন এল তখন রূপের বন্যা বয়ে যায়নি ঠিকই কিন্তু ভারী মিঠে চেহারাখানা ছিল। দাঁতের সারি ছিল দেখবার মতো। একটু পুরু রসালো ঠোঁট। গাঁয়ে বেশ বলাবলি হত তাকে নিয়ে। মনে পাপ নেই তার, তবু ধীরেনের স্বীকার করতে বাধাও নেই, ওইরকম একখান বউয়ের বড় সাধ হয়েছিল তার।
সেই জোয়ান বয়সে ধীরেনের শরীরখানাও বড় কম ছিল না। ইয়া বুক ছিল, দু হাতে ছিল কামারের হাতের মতো জোর। ঝাঁকড়া চুল ছিল। অনেক কটাক্ষই তাকে বিঁধেছে এককালে। বাসন্তীর মাও খুব আড়ে আড়ে তাকাত তার দিকে, মিষ্টি মিষ্টি রহস্যময় হাসত। রসালো কথা-টথাও হত মাঝে মাঝে।
না, তার বেশি কিছু হয়নি।
সময়ের পোকা সব কেটেকুটে ফোঁপরা করে দিয়ে গেছে তাদের। এখন সে বউঠানের চোখের বিষ।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল ধীরেন।
মরণ হাঁফাতে হাঁফাতে রান্নাঘরে ঢুকে চেঁচিয়ে উঠল, ওমা!
দুর্বল শরীরে জলচৌকিতে বসে বাঁশের খুঁটিতে মাথা ঠেকিয়ে চোখ বুজে ছিল বাসন্তী। একটু অসাবধানে পেটে এল কুঁচোটা। তাতে বাসন্তী মোটেই বিরক্ত নয়। কিন্তু প্রথম কয়েকটা মাস তার বড় কষ্টের মধ্যে যায়। এই নিয়ে চারবার। প্রথমটা বাঁচেনি। এটাও বেঁচেবর্তে থাকবে কিনা কে জানে। শরীরে মায়া ছড়িয়ে মাকে কষ্ট দিয়ে আসছে তো!
মরণের চেঁচানিতে চোখ খুলে বলল, কী রে?
জিজিবুড়িকে মামিরা তাড়িয়ে দিয়েছে। তেঁতুলতলায় বসে আছে গিয়ে।
সে কী!
হ্যাঁ গো। খুব কাঁদছে বসে, আর রাজ্যের লোক জুটে গেছে সেখানে।
তুই গিয়ে দেখলি?
হ্যাঁ গো। আমি তো গিয়ে হাত ধরে কত টানাটানি করলাম। বললাম, আমাদের বাড়ি চলো।
সোজা হয়ে বসে শুষ্ক মুখে বাসন্তী বলল, তা কী বলল তোকে?
বলল, তোর মাও তো আমাকে সকালে তাড়িয়ে দিয়েছে। আমি কোথাও যাব না। আমি আজ মরব। হ্যাঁ মা, তুমি সত্যিই তাড়িয়ে দিয়েছ?
বাসন্তী একটু চুপ করে থেকে বলল, তাই বলেছে বুঝি? মার যেমন সব কথা! তাড়াব কেন? টাকা চাইতে এসেছিল, দিইনি।
কী হবে মা? জিজিবুড়ি যদি মরে যায়?
কাঁদছে বললি?
হ্যাঁ গো। খুব হাপুস কাঁদছে। মণিবউ বলল, সে নাকি দেখেছে বড় মামি জিজিবুড়িকে চুল ধরে টেনেছে, আরও সব কী করেছে যেন।
বাসন্তী স্তব্ধ হয়ে কিছুক্ষণ উনুনের দিকে চেয়ে থেকে বলল, মা তো সব কথা চেপে যায়। ওরা যে কী করে কে জানে!
কী হবে মা?.
লোক জড়ো হয়েছে কেন রে?
জিজিবুড়ি যে তাদের কাছে সব বলছে।
কী বলছে?
এইসব অত্যাচারের কথা-টথা। তোমার আর বাবার কথাও বলছে।
কী বলছে শুনলি?
বলছিল, তোমরা নাকি মা শাশুড়ি বলে মানো না। সব সময়ে দুরছাই করো। উপোস করলেও খেতে দাও না। শাপশাপান্তও করছিল।
মায়ের জিভে যে বড্ড ধার। তোর বাবা কোথায়?
বাবা তো জমিতে গেছে।
দৌড়ে যাবি বাবা, ডেকে নিয়ে আয় তো মানুষটাকে।
বাবাকে ডাকব? বাবা যে জিজিবুড়িকে দেখতে পারে না।
কে বলল তোকে?
আমি জানি তো।
বাজে কথা। বাবাকে তুমি চেনো না ধন। তোমার বাবার মন বড় ভাল। যা দৌড়ে গিয়ে ডেকে নিয়ে আয়।
তার চেয়ে তুমি চলো না মা।
না বাবা, পাঁচজনের সামনে আমি মেয়েমানুষ গিয়ে আদিখ্যেতা করতে পারব না। তোর বাবা বিবেচক মানুষ, ঠিক একটা ব্যবস্থা করবে। যা, দেরি করিস না।
মরণ পাঁই পাঁই করে ছুটল। বেশি দূর যেতেও হল না। একটু গিয়েই দেখতে পেল তার বাবা ললিতখুড়োর সঙ্গে দাঁড়িয়ে গল্প করছে।
বাবা!
তার বাবা ফিরে তাকিয়ে হঠাৎ সচকিত হয়ে বলল, কী রে, তর মায়ের কিছু হইছে নাকি?
না। মা তোমাকে ডাকছে।
ডাকতাছে? ক্যান রে, শরীর খারাপ লাগে নাকি?
না না। মা ঠিক আছে। কী দরকার যেন।
তার বাবা সঙ্গে সঙ্গে ফিরে এল বাড়িতে।
কী হইছে গো?
বাসন্তী উঠোনে বসে চোখে আঁচল চাপা দিয়ে কাঁদছিল। মুখ তুলে বলল, কী করি বলো তো? বউদিরা মাকে তাড়িয়ে দিয়েছে।
কও কী?
তেঁতুলতলায় গিয়ে নাকি বসে আছে, রাজ্যের লোক জুটেছে সেখানে। কী করব বলো তো?
অকালকুষ্মাণ্ডগুলা কই? বাড়িতে নাই?
ওদের তো চেনো। মাকে ওরাই কি ভাল চোখে দেখে? দেখলে কি বউদের এত সাহস হয়?
কাইন্দো না। কী করতে চাও কও।
সেইজন্যই তো তোমাকে ডেকেছি। তুমি বলে দাও কী করব এখন।
যদি এই বাড়িতে আইন্যা রাখতে চাও তো রাখতে পারো।
আমার যে বড্ড ভয় করে। যেই মা এ-বাড়িতে আসবে অমনি দাদারাও ওই ছুতোয় এসে হানা দেবে। মাকে তো চেনো। ছেলেরা বিষ দিলেও ছেলেদের বিরুদ্ধে মুখ খুলবে না।
হেইটা তো পরের কথা। অখন চটজলদি তো কিছু করতে হইব।
মাকে নিয়ে আসবে?
তুমি কইলে আনুন। ভাইব্যা কও।
আমার মাথায় কি বুদ্ধি আছে? আমি তো তোমার মুখের দিকে চেয়ে আছি।
একখান কথা কই?
বলো না।
ঠাইরেনের দম একটু পরেই ফুরাইব। গুটিগুটি বাড়িও ফিরব। কিন্তু হেইটা কথা না। কথা হইল তোমারে লইয়া। এই অবস্থায় বেশি টেনশন ভাল না।
এই অশান্তি আমার আর সহ্য হয় না যে।
হেই লিগ্যাই কই, আমি গিয়া ঠাইরেনেরে লইয়া আসি। দুই দিন থাউক। তারপর ভাল বুঝলে বাড়িতে ফিরা যাইব।
মা তো ইদানীং এ-বাড়িতেই থাকতে চাইছিল। কিন্তু আমি রাজি হইনি। মায়ের কথাবার্তা আমার ভাল লাগে না। বড্ড খারাপ খারাপ কথা বলে। পান থেকে চুন খসলেই শাপশাপান্ত করে। এখনও নাকি করছে, মরণ শুনে এসেছে।
তবু গর্ভে তো ধারণ করছিল। মায়ে কি আর খারাপ হয়?
তুমি যদি ভাল বোঝো তো আনো গিয়ে। আমি কিছু ভাবতে পারছিনা। তুমি কলকাতায় চলে গেলে আমার ভারী ভয়-ভয় করবে কিন্তু।
দুর বলদা মাইয়ালোক, মায়েরে ভয় কী?
আমি যে যুঝতে পারি না।
খুব পারবা। বরং এই অবস্থায় মা কাছে থাকলে তোমার সুবিধাই হইব। বুড়ি-ধুড়িরা ভাল সামাল দিতে পারে।
মাকে তো তুমি চেনো না!
খুব চিনি। একটু ঘুষঘাষ দিলেই বুড়িরে হাত করতে পারবা। চিন্তা নাই।
ঘুষ দেব? মাকে?
আরে, ঠাইরেন কি আর আবগারির দারোগা? একটু দোক্তা, একটু দুধ, একটু মাথার তেল, একখান কাঁকাই, একথান থান, একজোড়া ভাল জুতা এইসব আইন্যা দিলেই দ্যাখবা ঠাইরেনের মুখে তালা ঝুলতাছে।
মুখে তালা ঝুলবার কথায় বেমক্কা হিহি করে হেসে ফেলল মরণ। বাসন্তীও লজ্জা পেয়ে মাথা নোয়াল। রসিক ছেলের দিকে চেয়ে বলল, এই বান্দর, খাড়াইয়া খাড়াইয়া বড় মাইনষের কথা গিলতাছছ্ যে বড়!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন