ছাপ্পান্ন অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

ছাপান্ন

কাজটা দেখতে সামান্যই। সেদ্ধ ডিম কেটে দু-আধখানা করা। কিন্তু তার মধ্যেও যে কত কারিকুরি আছে সেটা অবাক হয়ে দেখছিল ধীরেন কাষ্ঠ। তার বউ একটা সুতো পায়ের আঙুলে চেপে হাত দিয়ে টান করে ধরে কত সাবধানে হিসেবনিকেশ করে ডিমগুলো কাটছে, একটু হেলদোল নেই, ডিম ছোট-বড় হচ্ছে না। ঠিক মাঝখানটা দিয়ে সুতোর করাতে ভাগ হয়ে যাচ্ছে ডিম। সূক্ষ্ম কাজ। বাহবা দেওয়ার মতো। শুধু কি তাই? সাদা সুতোটার গায়ে ডিমের কুসুম লেগে ভারী সুন্দর একটা রং-ও ধরে যাচ্ছে। রসস্থ মুখে বসে দেখছিল ধীরেন।

একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল। এ-বাড়িতে আস্ত ডিমের চলনই উঠে গেছে। আধখানা বৈ পুরো আর পাতে পড়ে না। আধখানা ডিম এরা কী করে রাঁধে কে জানে। রান্নার সময় নাড়াচাড়ায় কুসুমটা বেরিয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু যায় না। খোলের মধ্যে ঠিক আটকে থাকে। আধখানা ডিম রাঁধতেও মাথা চাই। হাতের কারসাজি চাই। এইসব প্রতিভা ছাড়া কি গরিবের চলে?

একটা ডিম ভাগ করে থালায় রেখেছে তার বউ। ধীরেন ডিম দেখছিল। তখনই লক্ষ করল ডিমটাও দেখছে তাকে। দু-আধখানা ডিম ঠিক একজোড়া চোখের মতো ভারী ফ্যাকাশে নির্বিকার চোখে একটা অপদার্থ লোককে চেয়ে দেখছে খুব। মাপজোক করছে, বুঝবার চেষ্টা করছে লোকটা কেমনধারা। ডিমের এই তাকিয়ে থাকা দেখে ভারী খুশি হচ্ছে ধীরেন। এও একটা ঘটনা। লোকে টেরই পায় না, এরকম কত ঘটনাই সবসময়ে ঘটে যাচ্ছে চারদিকে।

দিন দশেক হল চোখ খুলে গেছে ধীরেনের। আজকাল খুব দেখছে সে। কত রং, কত সূক্ষ্ম ঘটনা, কত শিল্প। ডান চোখের ছানি কাটিয়ে এল বর্ধমান থেকে। সেও এক অশৈলী ব্যাপার। ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়। মানুষকে বড্ড প্রণাম করতে ইচ্ছে যায় ধীরেনের। মানুষ যে কী কাণ্ড ঘটাতে পারে তার কি লেখাজোখা আছে। তার আবছা ভাল চোখটায় কুটুস করে কী একটু করে দিল ডাক্তার, বান্ডেজ খোলার পর ধীরেন অবাক। মরি মরি! সে যে একেবারে আদিগন্ত দেখতে পাচ্ছে! মানুষের এলেম কি কম? যত ভাবে তত মানুষের ওপর ভারী শ্রদ্ধা হয় তার।

অপারেশনের পাঁচদিন পর চেক আপ-এ গিয়েছিল ধীরেন। অল্পবয়সি ডাক্তারবাবুটি দেখে-টেখে বললেন, বাঃ, চোখ তো খুব ভাল আছে!

ধীরেন ডাক্তারবাবুটির মুখের দিকে শ্রদ্ধার সঙ্গে আপ্লুত হয়ে তাকিয়ে ছিল। এরা কি আর মানুষ? এদের ভিতরেই ভগবান ভর করে আছে।

সে বলে ফেলল, ডাক্তারবাবু, আমি কি আপনাকে একটু প্রণাম করতে পারি?

ডাক্তার চমকে উঠে বলল, না না, সে কী? প্রণাম করবেন কেন? ছিঃ ছিঃ, আপনি পিতৃতুল্য মানুষ।

ধীরেন বলল, প্রণাম তো আপনাকে নয়, মানুষকে। মানুষ যে বড় ভাল ডাক্তারবাবু। মানুষ যে বড় ভাল।

ডাক্তার হাসল। বলল, তা তো ঠিকই। কিন্তু প্রণাম করার দরকার নেই। আপনি খুশি হয়েছেন, সেইটেই বড় কথা।

শুধু ডাক্তারবাবুটিই বা কেন? যারা নিজের খরচে তার অপারেশন করিয়ে দিল তারাই কি কিছু কম ভগবান? ট্যাঁকের পয়সা খরচ করে চোখ কাটানো তো সম্ভব ছিল না ধীরেনের।

চোখ খুলে যাওয়ায় এখন দেখার খুব নেশা চেপেছে ধীরেনের। খুব দেখছে চারদিক, মনের সুখে দেখে বেড়াচ্ছে। এই যে ডিমের দুখানা চোখ তার দিকে চেয়ে আছে এটাই তো চোখে পড়েনি এতদিন! ওই যে চৌকির নীচে ডাঁই করা কৌটো-বাউটোর ভিতর থেকে একটা ইঁদুর তার ছুঁচলো মুখ বাড়িয়ে চারদিকটা দেখে নিচ্ছে এটাও কি এতদিন নজরে পড়েছে ধীরেনের! মুগ্ধ হয়ে ইঁদুরটার কাণ্ড দেখছিল ধীরেন। চারদিকে পুঁতির মতো চোখ দুটো দিয়ে দেখে নিচ্ছে। মুখখানা কী সুন্দর! কী নিস্পাপ! মুখ থেকে লেজের ডগা অবধি সৌন্দর্য ইঁদুরের। লোকে তেমন লক্ষ করে না, করলে বুঝত এত সুন্দর জীব বড় বেশি নেই।

মোট ছটা ডিম কেটে বারো টুকরো করল তার বউ। একেবারে মাথা গুনতি হিসেব। এখন অনেকগুলো ডিমের চোখ তাকে দেখছে। আহা, দেখুক। তাকে তো কেউ বিশেষ চেয়ে দেখে না।

ওই যে তার বউ, এক ঘরে থাকে বটে, কিন্তু তাদের চোখে চোখে কদাচিৎ হয় কি হয় না। বেঁচে থেকেও কেমন করে যেন মানুষ একে অন্যের কাছে মরে যায়। ভেবে ভারী অবাক হতে হয় বটে।

এই যে মরে যাওয়াটা, এটা কিন্তু তেমন খারাপ লাগে না ধীরেনের। আসল মরার পর তো কিছু টের পাওয়া যাবে না। এই জীয়ন্ত মরার মধ্যে একটা মজা আছে কিন্তু।

এই যে চোখ কাটাতে বর্ধমান যাওয়া সেটাও ভারী মজার হল। লায়নস ক্লাব অপারেশনের তারিখ জানিয়ে চিঠি দেওয়ার পর ধীরেন সেটা প্রথমে তার বউ, তারপর দুই ছেলেকে জানিয়েছিল। কেউ যেন তেমন গা করল না। ধীরেনের ছানি কাটার ওপর তো দুনিয়ার কিছু নির্ভর করছে না। কিন্তু একজন সঙ্গীর দরকার ছিল। চিঠিতেও লিখেছে, একজন অ্যাটেনডেন্ট সঙ্গে আনতে হবে।

বউ শুনে বলল, আমার মাজায় যা ব্যথা। ছেলেদের বলে দেখ, ওরা যদি যায়।

বড় ছেলে সবে গ্রিলের একটা কারখানা খুলেছে বাড়িতেই। মহা ব্যস্ত। বলল, দেখছ তো ফুরসত নেই।

ছোট ছেলে এতদিন নেশাভাঙের ব্যবসা করত। তারপর গাঁয়ের ভাল ছেলেরা জোট বেঁধে তাকে প্রথমে শাসায়, তারপর উস্তম-কুস্তম পেটায়। বিজু ছিল তাদের নেতা। বিজুর ভয়েই এখন ওসব ব্যবসা ছেড়ে সে শাড়ির ব্যবসায় নেমেছে। বলতেই বলল, কালই আমি মংলা হাটে যাচ্ছি। সেখান থেকে শান্তিপুর।

জানাই ছিল। একটুও দুঃখ হল না ধীরেনের। জীয়ন্ত থাকতে থাকতেই নিজের মরাটা কেমন তা বেশ উপভোগই করছিল সে।

কথাটা লতায়পাতায় বেয়ে বেয়ে যার কানে পৌঁছল সে ধীরেনের কেউ নয়। তার গরজও থাকার কথা ছিল না। তবু বিজুই বলল, ভাবছেন কেন ধীরেনখুড়ো, আমি তো রোজ বর্ধমানে যাই। আমার মোটরবাইকের পিছনে চেপে যেতে পারবেন না?

শুনে একগাল হেসেছিল ধীরেন, মোটরবাইক! ওরে বাবা! সে তো বড় ভাল জিনিস! জীবনে কখনও চাপিনি। জন্মের শোধ একবার চেপে নিলে হয়। উরে বাবা, মোটরবাইক যখন ছোটে তখন যেন চারদিকের বায়ুমণ্ডলে একটা মন্থন হতে থাকে।

শুনে বিজু খুব হাসল।

বিজুই নিয়ে গেল। আর সেই যাওয়াটার কথা মরণ অবধি মনে থাকবে ধীরেনের। কানমুখ ভাল করে ঢেকে নিয়েছিল বটে, তবু কী হাওয়া রে বাবা! আর কী স্পিড। এ যেন মাটির ওপর উড়ে যাওয়ার মতোই ব্যাপার। পড়ার মরার ভয় করেনি একটুও। তার মতো মনিষ্যির মরাই বা কতটুকু ঘটনা? উকুন মারার শব্দটুকুও হবে না। ভয় নয়, বরং ভারী অন্যরকম লাগছিল ধীরেনের। একটু দোল খেয়ে খেয়ে ডাইনে বাঁয়ে হেলে দুলে এরকম যাওয়া সে কখনও যায়নি তো। মানুষ যে কত কলই বানিয়েছে। কী যে আছে মানুষের মাথায় কে জানে বাবা! কী বুদ্ধি! কী বুদ্ধি! মানুষকে তার বারবারই প্রণাম করতে ইচ্ছে যায়।

বিজুই ছিল আগাগোড়া তার সঙ্গে। অপারেশনের পর বিকেলে যখন ছেড়ে দিল তখন বিজু বলল, মোটরবাইকে ঝাঁকুনি লাগতে পারে ধীরেনখুড়ো, চলুন আপনাকে গাড়ি করে নিয়ে যাই।

ধীরেন হাঁ করে থেকে বলল, না না বাবা, ওতেই হবে। গাড়ি যে অনেক পয়সা নেবে।

সেসব চিন্তা করতে হবে না। গাড়ি আমার মক্কেলের। আমি তাকে ফোন করে দিচ্ছি।

শেষ অবধি মারুতি গাড়িতেও চড়ল ধীরেন। নিজেকে রাজাগজার অধিক মনে হচ্ছিল তার। আনন্দে চোখে জল আসছিল।

তুমি অনেক করলে বাবা, আমার জন্য। কী যে বলি তোমাকে!

দুব দুর! এসব তো আমাকে করতেই হয় খুড়ো। কতটুকু আর পারি।

কথাটা ঠিক। বিজু মানুষের জন্য করে। সারা গাঁয়ে তার নামে একটা ধন্যি ধন্যি ভাব আছে।

কৃতজ্ঞতায় অভিভূত ধীরেন মারুতি গাড়ির ভিতর থেকে বাইরের দিকে একটা চোখে চেয়ে বুঝল জলে চোখটা আরও ঝাপসা হয়ে গেছে।

ইঁদুরটা আবার ঢুকে গেছে ভিতরে। চৌকির তলায় অন্ধকার জগতে ওদের দিব্যি থাকা। ওদের মতো যদি অন্ধকারেও দেখতে পেত ধীরেন আরও কত কী দেখা যেত!

উঠোনের ওধারে দুই বউয়ের মধ্যে একটা চাপা গলার ঝগড়া চলছিল কিছুক্ষণ ধরে। এবার সেটা তুঙ্গে উঠল। প্রায়ই হয়, চুলোচুলি অবধি গড়ায়। আর ভাষা যা ব্যবহার হয় তা কোনও ডিকশনারিতে পাওয়া যাবে না।

হঠাৎ তার বউ তার দিকে ফিরে বলল, শুনলে?

কী শুনব?

বড়বউ বলছে তারা নাকি বাড়ির সবটাই আমাদের কাছ থেকে কিনে নিয়েছে। আমাদের নাকি বের করে দেবে।

ও আর শুনে কী হবে?

ভাল করে খোঁজ নাও। গুণধর ছেলে কোনও বদমাশ উকিলের সঙ্গে সাঁট করে সত্যিই নকল দলিল- টলিল কিছু বের করেছে কিনা। আজকাল বড়বউয়ের মুখে প্রায়ই কথাটা শুনছি। ছেলেকে জিজ্ঞেস করলে চুপ করে থাকে। কিন্তু তলে তলে কিছু একটা ঘোঁট পাকাচ্ছে নিশ্চয়ই।

ধীরেন একটু চিন্তিত হয়ে বলল, তাই কি হয়?

আজকাল সব হয়। মাস ছয়েক আগে একবার আমার কাছে বাড়ির দলিল চেয়েছিল। আমি দিইনি। কিছু একটা মতলব আঁটছে তখনই সন্দেহ হয়েছিল। গ্রিলের কারখানা খুলে এখন সাপের পাঁচ পা দেখেছে। কাঁচা টাকা আসছে তো হাতে।

ধীরেন উঠে পড়ল। আয়ুর আর কটা দিনই বা বাকি? মন ভারাক্রান্ত হয়ে থাকলে মূল্যবান সময় লোকসানে যাবে।

কোথায় চললে?

একটু ঘুরে-টুরে আসি৷

সারাদিনই তো ঘুরছ। বলি এদিকটাও তো দেখতে হবে।

ধীরেন তটস্থ হয়ে বলে, আমি দেখে কী করব? আমাকে কি কেউ মানে?

তোমাকে মানে না, সে তোমারই দোষ। মানবে কী করে বলল তো! একটু মানুষের মতো হবে তো। তা তো বটেই।

চুপ করে থাকো বলেই যে তুমি ভালমানুষ তা তো নয়। তোমাকে কি আমি আজকে চিনেছি? এত বড় শয়তান গোটা পরগনা খুঁজলে পাওয়া যাবে না। বাবা তোমার মধ্যে কী দেখেছিল বাবাই জানে।

এসব কথায় যে ধীরেনের রাগ হয় তা নয়। একসময়ে হত বটে, আজকাল আশ্চর্যের বিষয় এইসব গালমন্দের মধ্যে সে নিজেকে একটু একটু আবিষ্কারও করে ফেলে। সে কতখানি শয়তান তার খবর কিন্তু তার বউ রাখে না। ঘোর বর্ষার এক ভুতুড়ে দিনে তার হাতে খুন হয়েছিল মিদ্দার। ঠিক বটে, মিদ্দার খুন না হলে মিদ্দারের হাতে সে খুন হয়ে যেত। যেত তো যেত। তার পরেও এতগুলো বছর বেঁচে থেকে হল কোন অষ্টরম্ভা?

গলা দিয়ে যে এখনও তোমার ভাত নামে এতেই আশ্চর্য হয়ে যাই। নিজের ওপর ঘেন্নাও হয় না তোমার? গলায় দড়ি জোটে না? আবার গিয়ে চোখ কাটিয়ে এলে। বলি চোখ কাটিয়ে হবেটা কী? লেখাপড়া করে ব্যারিস্টার হবে নাকি বুড়ো বয়সে? নাকি পথে পথে ঘুরে ছুঁড়ি দেখে বেড়াবে!

বেশ বলছে কিন্তু। জিভের ধার আছে। কথাও গুছিয়ে বলে। এও এক প্রতিভা। শান পড়ে পড়ে আরও ধারালো হচ্ছে দিনকে দিন।

এ-বাড়ি সে-বাড়ি ঘুরে এঁটোকাঁটা খেয়ে বেড়াও, লজ্জাশরম নেই? বাসন্তীর মা এসে কত কুচ্ছো গেয়ে যায়। লজ্জায় মরি।

বাসন্তীর মা যে এ-বাড়িতে আসে তা জানে ধীরেন। কেন আসে তাও জানে। ধীরেন যে লজ্জা পাচ্ছে। না তা নয়। বাস্তবিক লজ্জা করে বইকী! বাসন্তীর মা তো কত কথাই শুনিয়েছে আড়াল থেকে। কিন্তু কথাগুলো তাকে তেমন চিমটিও কাটে না। বরং সে কথাগুলো শুনে তারিফই করে। বেশ বলে লোকে। মানুষকে কেমন করে অপমান করতে হয়, কখনও সূক্ষ্মভাবে, কখনও স্থুলভাবে তাও কি একটা শিক্ষার বিষয় নয়? এই রণচণ্ডী মহিলা আজ যেমনই হোক, একদিন কিন্তু ভারী রসালো রকমের যুবতী ছিল। ঢলঢল করত। বউঠানের কাছে যেতে বুক ঢিপঢিপও করত একটু। তাকালে জীবন যেন ধন্য হয়ে যেত। ঠোঁট টিপে মাঝে মাঝে এমন মোহন হাসি হাসত যে সারাদিন ওই হাসি মনে পড়ত।

বলি বাড়িতে কি গেল না? সকালে গুচ্ছের বাসি রুটি না হয় মুড়ি তো দেওয়া হয়, নাকি? দুপুরে থালাভর্তি ভাত তত জুটছে। তবে কুকুরের মতো লোকের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ল্যালানোর মতো রুচি হয়? লোকে কী বলে তা কি কানে যায় না? মানুষের চামড়া, না গণ্ডার?

ধীরেন একটু তটস্থ ভাব করে মাত্র। বউকে খুশি কবার জন্যই। নইলে বড়ই বেহায়া ভাববে।

বলি, মুখে কি পুলিপিঠে গুঁজে বসে আছ? বলবে তো কিছু?

ধীরেন বেশ শ্রদ্ধার সঙ্গেই বলল, তা কী বলতে বলছ?

ওদের বাড়িতে যাও কেন? কোন মধু আছে ওখানে শুনি?

ধীরেন ভালমানুষের মতো বলে, না এমনি যাই না। বাঙাল ধরে নিয়ে যায় তাই যাই। বাসন্তীও শ্রদ্ধাভক্তি করে খুব। ওদের পাম্পটা সারিয়ে দিলুম তো সেদিন।

ওসব আমি জানি। ছোঁচার মতো বেহান হতে না-হতেই গিয়ে হানা দাও খাবারের লোভে। ছিঃছিঃ ঘেন্নায় মরে যাই। ঝাটা মারি অমন খাবারের মুখে। আর মাগীরও আস্পর্ধা কম নয়, বাড়ি বয়ে এসে বিষ উগড়ে গেল। বলি লোকে এত সাহস পায় কেন? তোমার মতো ঘাটের মড়ার জন্যই তো!

ওদিকে দুই বউয়ের ঝগড়া একেবারে উদারা-মুদারা-তারায় ঠেলে উঠছে। বাচ্চাগুলো তার মধ্যে ভেজালে পড়ে চিল-চেঁচানি চেঁচাচ্ছে। তার মধ্যেই কিল চাপড় মারার শব্দ হচ্ছে। সব মিলিয়ে ভারী একটা গোলমাল। যেমন কেত্তনের সময় খোল কত্তাল বাজে, এও যেন ঠিক তেমনি। অনেক চেঁচামেচি মিশে একটা শব্দের ঘ্যাঁট তৈরি হয়।

ঝগড়া শোনা ধীরেনের পুরনো বাতিক। একটু বয়স হওয়ার পর থেকেই হয়েছে এই বাইটা। পথেঘাটে ঝগড়া লেগেছে দেখলে সে দাঁড়িয়ে মন দিয়ে শোনে।

বউ ডিমের থালা নিয়ে উঠে গেল। এখন সেও গিয়ে আসরে নেমে পড়বে। দুই বউয়ের ঝগড়া লাগলে শাশুড়ির তাতে মুখ এঁটো না করাটা বোধহয় খারাপই দেখায়।

ঝগড়া শুনতে ধীরেন বারান্দায় এসে দাঁড়াল।

খুড়া আছেন নাকি বাড়িতে? খুড়া!

ধীরেন তাড়াতাড়ি বারান্দা থেকে নেমে একগাল হেসে বলল, বাঙাল যে!

তড়াতড়ি লন তো খুড়া, আমাগো মিক্সিখান খারাপ হইছে। যন্ত্রপাতি লগে লইয়া লন তো।

আহা, পরান মিস্তিরিকে ডেকে নিয়ে যাও না।

আরে ওইটা একটা পাঠা। বাসন্তী কয়, খুড়া হইল কলকবজায় ওস্তাদ। তারে ধইরা লইয়া আস গিয়া। চলেন চলেন, ভাল চিতল মাছ আনছি বৈঠকখানা বাজার থিক্যা। আইজ আমার বাড়িতেই দুফুরে দুইটা খাইবেন।

ধীরেন ফাঁপড়ে পড়ে বলে, খাবো!

ক্যান, খাইবেন না ক্যান? খুড়িমারে কইতে হইব নাকি? উরেব্বাস, ঘরে তো কাইজ্যা লাগছে দেখি।

ধীরেন হেসে বলে, না বলতে হবে না। বলার কিছু নেই। চলো, যাচ্ছি।

বাঙালের পিছু পিছু বেরিয়ে এল ধীরেন। না, তার লজ্জা করছে না তো!

মিক্সি তেমন জটিল যন্ত্র নয়। ধীরেনের বিদ্যের অকুলান হল না। যন্ত্রটা খুলে খুব যত্ন করে সারাল সে। একটা কানেকশনের অভাব ঘটেছিল। আধঘণ্টাতেই হয়ে গেল।

সকালে কী খাইছেন খুড়া?

ধীরেন হেসে বলল, খেয়েছি দুখানা রুটি আর গুড়।

রামচন্দ্র! রুটি আর গুড় একটা খাদ্য হইল?

ধীরেন মাথা নেড়ে বলে, না হে বাঙাল, রুটি গুড় কিছু খারাপ জিনিস নয়। আখিগুড়ে একটা ভারী মিঠে গন্ধ আছে, রুটির সঙ্গে বনেও ভাল।

কী যে কন। গরমাগরম একটু হালুয়া খাইয়া জুইৎ কইরা বসেন। মুখ গুইজ্যা বাড়িতে বইয়া থাকেন ক্যান? বাড়িতে যত গুইজ্যা থাকবেন ততই অশান্তি। বউ বুড়া হইলেই খাণ্ডার।

ধীরেন তা জানে। খাণ্ডারকে সবাই ভয় খায়। ধীরেনও খায় বটে, তবে তার তেমন বিচলন হয় না। মিহিন মানুষ না হলে দুনিয়াটাকে বোঝাও যায় না কিনা। মাথা গরম হলে দুনিয়া আবছা হয়ে যায়। তখন মানুষ নিজের বিয়ে নিজেই জ্বলেপুড়ে মরে। ওতে লাভ হয় না কিছু। বরং জলের মতো মানুষ হওয়া ভাল।

হালুয়া এসে গেল। গরিব ঘরের কেলটি মার্কা জিনিস নয়। গাওয়া ঘিয়ের গন্ধ ছাড়ছে। কিসমিস কাজু গিজগিজ করছে।

কেমন খান খুড়া?

বাস রে! এ যে একেবারে দাঙ্গাহাঙ্গামা হে বাঙাল। এরকমও যে হয় জানতাম না।

যত গুড়, তত মিষ্টি, বুঝলেন খুড়া? যত মালমশলা ঠাসবেন ততই স্বাদ সোয়াদ পাইবেন।

তাই নাকি?

আইজ্ঞা। খাওনের ব্যাপারে বাঙালের লগে কেউ পারব না। বাঙালরা আর কিছু না পারুক কাছা খুইলা খাইতে জানে।

শুধু খেতেই জানে না, খাওয়াতেও জানে।

ওই কথা কইয়েন না খুড়া, মাইনসে খায় নিজের কপালে।

হালুয়াই চেচেপুঁছে খেল ধীরেন। তারপর চা। লজ্জা হল না তো! লজ্জা-লজ্জা করছেও না তার।

চিন্তা কইরেন না খুড়া। মরণরে পাঠাইয়া দিছি, খুড়িমারে কইয়া আইতে যে আপনে আইজ দুফুরে এইখানে খাইবেন।

ধীরেন একটু ভাবল। আধখানা ডিম বরাদ্দ ছিল আজ। তার বাড়িতে ডিমের ঝোলে তেমন মশলাপাতি পড়তে পায় না। ট্যালট্যালে ঝোল হয়। তাও কিছু খারাপ লাগে না তার। সকাল থেকে ডিমের জন্য মনটা প্রস্তুত হয়ে ছিল বলে একটু খারাপ লাগল ধীরেনের। ভাগের ডিমটা ফাঁকই গেল আজ।

তার বদলে দুপুরে চিতলের পেটি ধীরেনের সব দুঃখ ভুলিয়ে দিল বটে, কিন্তু তবু খুব সূক্ষ্যভাবে একটা অভাববোধও কাজ করছিল। তার বরাদ্দ আধখানা ডিম কি তার জন্য অপেক্ষায় ছিল না!

কত কী চোখে পড়ছে আজকাল তার! চালে লাউডগার মধ্যে গা-ঢাকা দিয়ে থাকা কচি লাউ, ওই উঁচু আমগাছের জটিল ডালপালার মধ্যে একখানা মৌচাক। দোতলায় একটা দরজার ওপর একটা ঘোড়ার নাল লাগানো। কই, এসব তো এতদিন চোখে পড়ত না।

এই চোখেই ধীরেন বিকেলে কাঞ্জিলালের পোড়ো জমিটার ধারে একটা মেয়েকে একা বসে থাকতে দেখল। কী যে সুন্দর মেয়েটা! টকটক করছে গায়ের রং, তেমনি সুন্দর মুখের ডৌল। ভারী আনমনে বসে আছে।

ধীরেন দাঁড়িয়ে দূর থেকে দেখল। মেমসাহেব নয় তো!

একটু চেনা-চেনাও ঠেকছিল যেন! কে মনে পড়ছে না।

তারপর মনে পড়ল। এ তো মহিমার নাতনি!

দেখেছে বটে, তবে আবছা চোখে এতদিন বুঝতেই পারেনি যে মেয়েটা এত সুন্দর।

এই যে এইসব সুন্দর ছেলেমেয়ে এরা যে কোথা থেকে আসে কে জানে! ওই যে ক্ষুরধার বুদ্ধির মানুষ, ওই যে রবি ঠাকুর বা আইনস্টাইন, কিংবা যে লোকটা এরোপ্লেন বানিয়েছে এরাই বা হয় কী করে? এই যে তারা কালো ময়লা র্খবুটে হাঁদা মানুষ, সাহেবরা তো এমন নয়! তারা কেমন ফর্সা, তাগড়াই, বুদ্ধিমান মানুষ। এই যে এত তফাত এইটেই ভারী অবাক করে দেয় ধীরেনকে।

সন্ধের পর মহিম ঘরেই ছিল। সাড়া পেয়ে বলল, আয় ধীরেন।

ধীরেন ঢুকে দেখল, গরম চাদরে মুড়িসুড়ি দিয়ে মহিম রায় বসা!

আজ যা শীত পড়েছে, হাতে পায়ে যেন সাড়া পাচ্ছি না।

ধীরেন বলল, তা পড়েছে।

তোর তো গায়ে তেমন কিছুই নেই দেখছি। ওই ছেঁড়া হাফ সোয়েটারে শীত মানে?

ধীরেন লজ্জা পেয়ে বলে, তা মানে।

বলিস কী?

ধীরেন বলল, শীত করতে করতে এক সময়ে আর করে না। এক জায়গায় থেমে যায়। শীতেরও তো ধৈর্যের শেষ আছে।

ভাল বলেছিস। চা খাবি?

তা একটু হলে হয়।

ভুল বললুম! চা নয়, কফি।

ও বাবা, সে তো তোফা জিনিস।

নাতনি এবার নিয়ে এসেছে আমার জন্য। একটা হিটার আর সসপ্যানও এনেছে। যা, ওই টেবিলে সব আছে। হিটার জ্বালিয়ে জল বসিয়ে দে তো।

বাঃ, এ তো দিব্যি ব্যবস্থা।

হ্যাঁ। নাতনি বলে, তোমার আর একটু ভাল থাকা উচিত।

বলে বুঝি? দেখতেও হয়েছে মেমসাহেবের মতো। বিকেলে কাঞ্জিলালের মাঠে বসেছিল। যেন পদ্মফুল।

মেয়েও বড্ড ভাল। আগে একটু সাহেবি ভাব-টাব ছিল, এখন ঝরে গেছে।

দুজনে মিলে কফি বানিয়ে খেল। ধীরেনের সবই ভাল লাগে। কফিটাও লাগল। বেজায় ভাল জিনিস।

চোখটা কেমন আছে রে?

একগাল হেসে ধীরেন বলল, চোখের কথা আর কবেন না দাদা। এত দেখছি যে অবাক কাণ্ড! দেখে দেখে যেন আর কূল করতে পারছি না।

এত দেখতে দেখতেই ফিরছিল ধীরেন। রাত হয়েছে। চারদিকে কুয়াশা। তার ফাঁকেই চাঁদ উঠেছে ঠেলে। চারদিকে কুয়াশামাখা জ্যোৎস্না যেন দুনিয়া ছাড়া জিনিস। এরকম জ্যোৎস্না বিলেতে-টিলেতে ওঠে। এদেশের জিনিসই নয়।

আচমকাই যেন বাতাসে একটা ঢেউ দিয়ে কে যেন তার পাশে চলে আসে। পায়ে পায়ে চলে তার সঙ্গেও।

ধীরেন, মেরে ফেললি আমাকে?

সে কবেকার কথা, অত কি মনে রাখতে আছে দাদা?

কিন্তু এখনও ব্যথা করে যে রে! এখনও যে দম বন্ধ হয়ে আসে।

ওসব বোলো না। তুমি কি কিছু কম করেছ?

করব না! আমার বউয়ের সঙ্গে নষ্টামি করলি, তাই তো ওকে মারলুম। আমার সংসার ভাসিয়ে দিলি তুই!

ও মেয়েছেলেকে কি সামলাতে পারতে মিদ্দার দাদা? ও ছিল কেউটে। সাপের মন্তর না জানলে কি বশ করা যেত ওকে?

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%