শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
ভূত, ভূত, আর ভূত! দুনিয়াতে এত ভূত থাকলে তার চলবে কী করে? কেন যে এত ভূত-টুত চারদিকে আছে বাবা! ভগবান যে কেন ভূতের সৃষ্টি করল কে জানে! পান্নার কান্না পায়। যত নষ্টের গোড়া ওই সুদর্শন। ভূত জিনিসটাকে মাঝে মাঝে দিব্যি ভুলে থাকত পান্না। ওই সুদর্শন এসেই আবার ভূতের তাণ্ডব শুরু করেছে, সবাই বলে রোজ নাকি মাঝরাতে ও ভূত নামায়। মরতে তাদেরই বাড়িতে এসে জুটেছে বিটকেল লোকটা। নিশুতরাতে নাকি এ-বাড়িতে থিকথিক করে তারা। শোনার পর থেকে দিনরাত রাম নাম করছে পান্না। তবু কি ভয় যায়?
বিজুদা বলেছে, পান্না, তুই কমিউনিস্ট হয়ে যা, তা হলে আর ভূতের ভয় বলে কিছু থাকবে না।
যাঃ, কী যে বলো। কমিউনিস্টের সঙ্গে আবার ভূতের কী?
ওই তো মজা। মানুষ যেমন ভূতকে ভয় পায়, তেমনই ভূত আবার কমিউনিস্টদের ভয় পায়।
দুর! সবসময়ে ঠাট্টা ভাল লাগে না। রাতে আজকাল লেপ চাপা দিয়েও ঘুমোতে পারি না, জানো? বাঁ ধারে হীরা, ডান বারে মা শোয়, দুজনের মাঝখানে মাথা অবধি লেপ ঢাকা দিয়ে শুয়েও মনে হয়, ওই বুঝি ভূতের হাসি শুনতে পাচ্ছি।
তোর পক্ষে সবচেয়ে ভাল জায়গা কী জানিস? হয় হাসপাতালের কোয়ার্টার, না হয় শ্মশানের ধারে বাড়ি।
ও বাবা গো! তা হলে আমি মরেই যাব।
দুর বোকা! হাসপাতাল বা শ্মাশানে কখনও ভূতের উপদ্রবের কথা শুনেছিস? খোঁজ নিলেই দেখতে পাবি কোনও হাসপাতালে একটাও ভূত নেই। কোনও শ্মশানে ভূতের টিকিরও নাগাল পাবি না। কেন জানিস? ও দু জায়গায় এত ভূত যে ভূতে ভূতক্ষয় হয়ে যায়।
তোমাকে বলেছে?
আরে আমি তো একসময়ে ভূতের সন্ধানে ঘুরে বেড়াতাম, জানিস না?
সেটা অবশ্য জানে পান্না। বিজুদার দুর্জয় সাহস। ভূত বলে যে কিছু নেই সেটা প্রমাণ করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছিল। তখন সত্যিই শ্মশান আর কবরখানায় রাতবিরেতে ঘুরে বেড়িয়েছে অনেক।
অত সাহস কিন্তু ভাল নয়, বুঝলে।
কেন, তোর ভূতেরা কি তাতে চটিতং হবে নাকি? তা হোক না। হয়ে আমার ঘাড় মটকাতে আসুক না। আমি তো সেটাই চাই। সুদর্শন ভূত নামায় শুনে ওকে গতকাল চেপে ধরেছিলুম, বুজরুকির আর জায়গা পাওনি? দেখাও তো তোমার ভূত! শুনে ও তো আকাশ থেকে পড়ল। বলল, জম্মে ভূতপ্রেতের কারবার করিনি বাবু। কে যে ওসব গাজাখুরি কথা রটায়! ব্রাহ্মণসন্তান জপতপ একটু-আধটু করি বটে, কিন্তু ওসব তান্ত্রিক কারবারে নেই।
আমাদের কাছেও স্বীকার করতে চায় না। কিন্তু সবাই জানে ও ভূতপ্রেত নামাতে পারে। ওকে না তাড়ালে আমি আর এ-বাড়িতে থাকতে পারব না।
এ-বাড়িতে তোর আর থাকার দরকারটাই বা কী? ভাল দেখে একটা কমিউনিস্ট পাত্রকে বিয়ে করে সটকে পড়। কাকাকে বলছি কাগজে বিজ্ঞাপন দিতে। তাতে লেখা থাকবে, সুন্দরী, শিক্ষিতা সপ্তদশী ভুতভীতা পাত্রীর জন্য অনধিক ত্রিশ ব্রাহ্মণ অকাশ্যপ, ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার বা সরকারি অফিসার এবং কট্টর কমিউনিস্ট পাত্র চাই। হ্যাঁ রে, কমিউনিস্টও তো আবার নানা রকম আছে। তোর কোনটা পছন্দ? সি পি আই, সি পি এম না নকশাল? নকশালের ঝাঁঝ বেশি, ওদের ধারেকাছে ভূত ঘেঁষবে না। নকশালই লিখে দিতে বলি কাকাকে?
পান্না ফিক করে হেসে বলল, ছেলেবেলার মতো আবার চিমটি কাটব কিন্তু। আমি মরছি নিজের জ্বালায়, উনি এলেন ঠাট্টা করতে।
ভাল কথা বললে তো শুনবি না। তা হলে একটা তুক শিখিয়ে দিচ্ছি। যখন ভূতের ভয় পাবি তখন রামনাম না করে কার্ল মার্ক্স কার্ল মার্ক্স করিস, দেখবি তাতে অনেক বেশি কাজ হবে।
কমিউনিস্টরা ভীষণ বাজে লোক হয়।
কী করে বুঝলি?
তোমাকে দেখে।
আহা, আমি আর সাচ্চা কমিউনিস্ট হতে পারলাম কী? একটা ক্যারিকেচার হয়ে রইলাম। সাচ্চা কমিউনিস্ট তো দেখিসনি।
আর দেখে কাজও নেই।
ভূতপ্রেত নামাক আর যাই করুক সুদর্শনের রান্না কিন্তু ফার্স্ট ক্লাস। বুঝলি, কাল একটা পালংচচ্চড়ি রান্না করেছিল, ওরকম ভাল রান্না জম্মে খাইনি। বোধহয় ভূত-টুত ফোড়ন দিয়েছিল, অর্ডিনারি রান্না নয় কিন্তু।
কথাটা মিথ্যে নয়। সুদর্শনের রান্নার ভূয়সী প্রশংসা পান্না তার খুঁতখুঁতে মায়ের মুখে অবধি শুনতে পায়। শুধু রান্নাই নয়, সুদর্শন খুব পয়পরিষ্কার মানুষ। এই চণ্ড শীতেও সকালে উঠে স্নান এবং জপতপ না করে হেঁশেল ছোঁবে না। মানুষটা লোভী নয়, হাতটান নেই। ফলে সুদর্শনের পাল্লা খুব ভারী। একা পান্না তাকে তাড়ানোর কথা ক্ষীণভাবে বলার চেষ্টা করে বটে, কিন্তু তাতে কোনও ফললাভের আশা সে দেখছে না।
সুদর্শন কড়াইশুঁটি দিয়ে একটা নতুন ধরনের ধোঁকার ডালনা রান্না করেছে। রান্নার সময়ে গন্ধে বাড়ি মাত হয়ে যাচ্ছিল। মা একটা টিফিন কৌটোয় খানিকটা ভরে পান্নার হাতে দিয়ে বলল, যা, তোর বড়মাকে দিয়ে আয়। গতকাল একাদশী গেছে, আজ একটু ভাল-মন্দ পেটে যাক। শুনি, আজকাল খাওয়াতে বড্ড অরুচি হয়েছে দিদির।
বলাকা এই শীতে একটু ক্ষীণ হয়েছেন। গায়ে তেল মাখার অভ্যাস নেই বলে একটু খড়িওঠা ভাব থাকেই। টানের সময় তেল-টেল না মাখলে শরীর একটু শুকোয়। বড় ঘরের মাদুরে বসে দুখুরিকে পাশে নিয়ে একটা অ্যাটলাস খুলে আফ্রিকার ম্যাপ দেখছে দুজনে।
ও বড়মা!
তাকে দেখে বড়মার চোখেমুখে যে আনন্দটা ছড়িয়ে পড়ে সেটা বড় ভাল লাগে পান্নার। জ্যাঠামশাই যে কী একাকিত্বের মধ্যে বড়মাকে ফেলে গেছে সেটা পান্না খুব টের পায়। বাড়িটা এত বড় বলেই যেন বড়মার নিঃসঙ্গতাটা বড় বেশি চোখে লাগে। কয়েকজন কাজের লোক ছাড়া ওই দুখুরিই শুধু বড়মার ছায়া হয়ে ঘোরে। দুখুরির বাবা মেয়ের বিয়ে দিয়ে টাকা কামাবে বলে তক্কে তক্কে ছিল। বড়মা অনেক টাকা দিয়ে দুখুরিকে একরকম কিনেই নিয়েছে। বাঙালি এসে মাঝে মাঝে তবু বলে, মেয়ের বারো- তেরো বছরে বিয়ে না দিলে দেশে তার খুব বদনাম হবে। বড়মা বলেছে, তোর আবার বদনাম কী রে মুখপোড়া? কোন গুণের মানুষ তুই? আর দুখুরি আবার তোর দেহাতের মেয়ে হল কবে? ওকে আমি বড় করেছি, আমিই বিয়ে দেব। মেয়ে ভাঙিয়ে পয়সা রোজগারের ধান্ধা করবি তো তোকে গাঁ-ছাড়া করে ছাড়ব।
বাঙালি সেটা জানে। তাই আজকাল ঘাঁটায় না। তবে ধানাইপানাই করে মাঝে মাঝে দশ-বিশ টাকা আদায় করে নিয়ে যায়। স্পষ্টই ব্ল্যাকমেল, তবে বড়মা দেয়। শত হলেও বাপ তো।
আয়, আয়, দুদিন আসিসনি কেন রে?
পড়ছিলাম। সামনে পরীক্ষা।
আজকাল ছেলেপুলেদের সারা বছর যে কীসের এত পরীক্ষা থাকে তা বুঝি না বাবা। এই একরত্তি দুখুরিরও শুনি ফি মাসে পরীক্ষা লেগেই আছে। এর পর বই জলে গুলে খাওয়াবে। হাতে ওটা কী রে?
মা পাঠিয়েছে। ধোঁকার ডালনা।
বলাকা হেসে বলে, সুদর্শনের রান্না তো! বড় ভাল রান্নার হাত ছেলেটার।
একটু অভিমান করে পান্না বলে, ছাই ভাল, ও মোটেই নিজে রাঁধে না।
বলাকা অবাক হয়ে বলে, ও রাঁধে না? তা হলে কে রাঁধে?
সেসব আমি বলতে পারব না। গভীর ষড়যন্ত্র আছে।
বলাকা একটু চেয়ে থেকে বলে, ভেঙে বলবি তো মুখপুড়ি! কোনও অনাচার হয়ে থাকলে ও জিনিস তো আমি খাব না। শুনেছিলুম তো সে খুব আচারবিচার মেনে চলে। আগে নিরিমিষ্যি রেঁধে আলাদা উনুনে আলাদা কড়াইতে মাছ রাঁধে। সেসব শুনেই তো ওর রান্না খেয়েছি কদিন, কী হয়েছে বল তো!
শুনলে তোমার বিশ্বাস হবে না। বলে কী লাভ?
ওরে, অনাচারের কথা লুকোতে নেই। পাপ হয়। আমি শুদ্ধাচারে থাকি, অনাচার সইবে না।
অনাচার কি না জানি না, তবে ওসব রান্না ওর নিজের বলে আমার বিশ্বাস হয় না। ওসব ওর পোষা ভূতের রান্না।
বলাকা খানিকক্ষণ অবাক হয়ে পান্নার দিকে চেয়ে থেকে মুখে আঁচল তুলে হেসে ফেলে। তারপর বলে, যা, খাওয়ার টেবিলে টিফিনবাটিটা রেখে আমার কাছে এসে বোস একটু।
পান্না তাই করল। বলাকার কাছ ঘেঁষে বসে বলল, তোমার বিশ্বাস হল না তো!
হবে না কেন? খুব বিশ্বাস হয়েছে। তবে ভূতের তো জাত নেই, তাদের রান্না খেলে অনাচার হবে না, কী বলিস?
তুমি ঠাট্টা করছ। ও লোকটা যে ভূত নামায় তুমি বিশ্বাস করো না বুঝি?
কেন বিশ্বাস করব না? যে ভূত নামাতে পারে সে তো মস্ত মানুষ। তাকে রোজ প্রণাম করা উচিত।
ফের ঠাট্টা?
বলাকার সঙ্গে দুখুরিও হাসছিল। বলল, এম্মাঃ, তুমি বুঝি ভূতের ভয় পাও? আমি তো রাতবিরেতে কত কত জায়গায় ঘুরে বেড়াই। একটুও ভয় করে না তো!
তুই তো একটা কিস্তৃত। হ্যা বড়মা, তুমি তো বিশ্বাস করো, না কি? তুমি তো আর বিজুদার মতো নাস্তিক নও।
বিজু কি নাস্তিক নাকি?
ও বাবা, বিজুদা নাস্তিক নয়? বলো কী? ভীষণ নাস্তিক। ভগবান মানে না, ভূতপ্রেত মানে না। আমাকে কী বলেছে জানো? ভূতের ভয় পেলে রামনাম না করে কার্ল মার্ক্সের নাম করতে। ওর মুখে কিছু আটকায় না।
ও ওইরকম সব বলে। সেদিন তো দেখলুম শ্যামল দত্তর বাড়িতে দিব্যি নারায়ণ পুজো করে এল। নাস্তিক বলে মনে হল না তো। শ্যামলদের বাড়িতে যার পুজো করার কথা ছিল সেই পুরুতঠাকুরের ম্যালেরিয়া হওয়ায় বিজুকে ধরে এনেছিল।
সে তো আমাদের বাড়িতেও কতবার করেছে। ও তো বলে দক্ষিণা পাই বলে পুজো করি, ভক্তি- টক্তি থেকে তো করি না। বোকা লোকেরা ভগবানের নামে গাঁটগচ্চা দিতে চাইলে আমার কী করার আছে! ও বড়মা, বলো না, তুমি তো ভূতে বিশ্বাস করো।
ওমা, তা করব না কেন?
তা হলে ভয় পাও না কেন বলো তো!
তা তারা তাদের মতো আছে, ভয় পাওয়ার কী হল? এই তুই আছিস, আমি আছি, গাছপালা, পাখিপক্ষী, গোরু ছাগল যেমন আছে তেমনই তারাও আছে। ভয়ের তো কিছু নেই।
আহা, যদি দেখা দেয় তখন?
অত ভাগ্য কি করে এসেছি রে! তোর জ্যাঠা চলে যাওয়ার পর কি কম চেষ্টা করেছি তাকে একবার চোখের দেখা দেখবার! কত নিশুত রাতে জেগে বসে থেকেছি একা ঘরে। কত ডেকেছি তাকে মনে মনে।
বাবা গো! শুনেই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
হ্যাঁ রে, আমি মরলে আমাকে কি তোর দেখতে ইচ্ছে করবে না?
পান্না কাঁদো কাঁদো হয়ে বলল, ওসব বোলা না তো, ভাল লাগে না। মরবে কেন? একদম মরতে পারবে না বলে দিচ্ছি। আজ থেকে কেউ তোমরা আর মরবে না বলে রাখলাম। এখন থেকে সব্বার মরা বারণ।
হেসে পান্নাকে বুকে টেনে নিয়ে বলাকা বলে, ভূতের ভয়ে সবাইকে অমর করে দিলি বুঝি! তা হলে যে বুড়ো-বুড়িতে দুনিয়া ভরে যাবে। খুনখুনে থুত্থুরে বুড়োবুড়ি চারদিকে থিকথিক করবে সেই বুঝি ভাল?
সে আমি জানি না। আজ থেকে সকলের মরা বন্ধ।
দিনের বেলাটা একরকম কাটিয়ে দিতে পারে পান্না। কিন্তু যেই সন্ধেটি হাঁটি-হাঁটি পা-পা করে এগিয়ে আসে, আর শীতের কুয়াশা মাঠঘাট থেকে সাদাটে শরীর নিয়ে পাক খেয়ে উঠে আসতে থাকে, আর শকুনের ডানার মতো নেমে আসে অন্ধকার তখনই বুকের ভিতরে ভয় খামচে ধরে তাকে।
এ সময়ে যে কেন লোকে এত সত্যনারায়ণের পুজো করে কে জানে বাবা। আজ বাড়িসুদ্ধ সকলের নেমন্তন্ন ছিল মরণদের বাড়িতে। পান্না যাবে না, তার পরীক্ষার পড়া। মা বলল, তা হলে তোর গিয়ে কাজ নেই। তুই বরং ঘরে বসে পড়। সুদর্শন আছে, বাসন্তী কাজ করছে, তোর বাবাও এসে পড়বে খন। সন্ধে রাত্তিরে তো আর ভয় নেই।
পান্না স্বীকারও হয়েছিল। কিন্তু কে জানত আজই বাসন্তী কাজ সেরে বেলাবেলি চলে যাবে, বাবার আসতে দেরি হবে এবং সুদর্শনের পাত্তা পাওয়া যাবে না! যখন কপাল খারাপ হয় তখনই এরকম সব ঘটনা ঘটে। সন্ধে ছটা নাগাদ পড়া ছেড়ে উঠে কুঁজো থেকে জল গড়ানোর সময় হঠাৎ সে বাড়ির আঙিনায় সন্দেহজনক নির্জনতাটা টের পেল। বারান্দায় এসে বাসন্তীকে ডাকল। তারপর সুদর্শনকে। কেউ সাড়া দিল না। গোটা বাড়িটা ছমছম করছে। সে একা।
কী করে এখন পান্না! ছুটে গিয়ে পাশের বাড়িতে হাজির হবে? তা হলে বাড়ি খালি পড়ে থাকবে। মা টের পেলে কুরুক্ষেত্র হবে। বাড়ি নির্জন হলেও আশপাশের বাড়ি থেকে অবশ্য লোকজনের গলা পাওয়া যাচ্ছে। পথে লোক চলাচলও আছে। কিন্তু সেটা তো কোনও ভরসা নয়। এ-বাড়ির মধ্যে সে একা। অসহায়। চারদিকে প্রকৃতির রসায়নে এক অদ্ভুত বিক্রিয়া ঘটে যাচ্ছে। বাস্তবের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে পরাবাস্তব। দিনের বেলায় যারা ঘুমিয়ে ছিল তারা জেগে উঠছে। উঠে আসছে। আর পুবের আকাশে কুয়াশার মায়াজালে জড়ানো পূর্ণিমার চাঁদ ম্যাজিক লণ্ঠনের মতো দুলতে দুলতে একটু একটু করে ওপরে উঠছে ওই।
কী করবে এখন পান্না! খুব জোরে চেঁচিয়ে উঠবে? কেঁদে ফেলবে? অজ্ঞান হয়ে যাবে?
হাই!
পান্নার হার্ট বন্ধ হয়ে গিয়েছিল নিশ্চয়ই কয়েক সেকেন্ডের জন্য। পাথরের মতো হয়ে গিয়েছিল সে। অবশ্য বেশিক্ষণ নয়।
ভগবান বলে কিছু একটা তো আছেই। কেউ একজন। নইলে কি এমন হয়? উঠোনে আবছা অন্ধকারে দাঁড়িয়ে সোহাগ।
সোহাগকে দেখলে সে খুশি হয় বটে, কিন্তু আজ সে চিৎকার করে যে লাফটা দিল সেটা শুধু খুশির নয়, উল্লাসের। উঠোনে নেমে সে প্রায় জাপটে ধরল সোহাগকে।
উঃ সোহাগ! বাঁচলাম বাবা! শিগগির ঘরে এসো। একা একা আমার যা ভয় করছিল না!
সোহাগ হেসে ঘরে এল। বলল, একা তোমার ভয় করে বুঝি! ইউ ডোন্ট এনজয় লোনলিনেস!
না বাবা, না। একা থাকতে আমার একটুও ভাল লাগে না।
খুব সুন্দর করে হাসল সোহাগ। বলল, লোনলিনেস-এর মতো এত ভাল আর কী আছে বলো তো। আমার তো একা থাকতেই সবচেয়ে বেশি ভাল লাগে।
তোমার ভাই ভীষণ সাহস। মাঝরাতে উঠে একা একা মাঠেঘাটে ঘুরে বেড়াও। আমি তো ভয়েই মরে যাব।
তোমার খুব ভূতের ভয়, তাই না?
ভূত তো আছেই। পাগল, মাতাল, বদমাশ আমার যে কত ভয়। সবচেয়ে বেশি ভূত।
আমার তো ভূতকে ভীষণ পছন্দ।
মাগো! মরেই যাব।
ভূত হল হিস্টরি। আমি যখন মাঝরাতে একা একা ঘুরে বেড়াই তখন আমার সবসময়ে মনে হয়, আমার চারপাশে ওরা সব রয়েছে। হাজার হাজার, লক্ষ লক্ষ। আজ অবধি যারা জন্মেছে এবং মরে গেছে তারা সবাই। খুব বন্ধুর মতো লাগে তাদের। তারা আশেপাশেই আছে, কিন্তু ডিস্টার্ব করে না, শুধু সঙ্গে থাকে। আমি খুব ফিল করি তাদের। অনেক সময়ে তাদের সঙ্গে কমিউনিকেট করার চেষ্টাও করি।
করো?
হ্যাঁ তো।
কথা বলে তোমার সঙ্গে?
কী জানি? হয়তো বলে। ঠিক বুঝতে পারি না। একদিন মার সঙ্গে খুব ঝগড়া হয়েছিল। রাগ করে রাতে বেরিয়ে গিয়ে আমাদের বাড়ির পাশের বাঁশঝড়টা পেরিয়ে একটা মাঠের মতো উদোম জায়গায় অনেকক্ষণ চুপ করে বসেছিলাম। সেদিন আমার কেমন যেন একটা আনক্যানি ফিলিং হয়েছিল। খুব মনে হচ্ছিল আমার কাছ ঘেঁষেই কে যেন বসে আছে।
ও মা গো!
ভয়ের কী বলো। পৃথিবীতে তো কত কী আছে আনএক্সপ্লেইনড, আনএক্সপ্লোরড।
চেঁচাওনি?
না। আমার কেমন একটা ঘোরের মতো অবস্থা হল। আমি তখন ফিসফিস করে কথা বলতে শুরু করলাম। জিজ্ঞেস করলাম, তুমি কে? কী চাও? তুমি কীরকম একজিস্টেন্স? তুমি কি আমাকে দেখতে পাচ্ছ?
কী বলল?
প্রথমে কিছু নয়। তারপর হঠাৎ আমিও একটা হুইসপার শুনতে শুরু করলাম। সামওয়ান ওয়াজ টেলিং মি সামথিং। কিন্তু স্পষ্ট নয়। অস্পষ্ট, স্ট্যাটিকের আওয়াজের মতো। মনে হল যে কথা বলছে সে একটা মেয়ে। কথাগুলো বোঝা যাচ্ছে না ঠিকই কিন্তু যেন খুব জরুরি গলায় বলে যাচ্ছে। মেয়েটা আমাকে কিছু বলতে চাইছে। আমি বুঝতে পারছি না। তখন খুব দুঃখ হচ্ছিল আমার। ওদের ল্যাংগুয়েজ কে আমাকে শেখাবে বলো।
পান্না হাঁ করে শুনছে। তার দুটো হাত শক্ত মুঠি পাকিয়ে আছে। সোহাগকে তার জোয়ান অফ আর্ক বা ঝানসির রানির চেয়ে কম বলে মনে হচ্ছে না।
পরে দাদুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, এরকম হয় কি না। দাদু বলেছিল, হতেই পারে। তবে দাদুর ওরকম কোনও অভিজ্ঞতা নেই।
কাউকে দেখতে পেলে না?
না। হয়তো দেখার জন্য আরও কিছু প্র্যাকটিসের দরকার হয়। আমার তো তা নেই।
বিজুদাকে তোমার গল্পটা বোলো তো। বিজুদা না কিছু বিশ্বাস করতে চায় না।
তোমার বিজুদা তো একজন হিরো। হিরোরা সহজে হার মানতে চায় না।
বিজুদার ওপর তোমার খুব রাগ, তাই না?
না তো! তবে হিরোদের আমি খুব একটা পছন্দ করি না।
আহা, বিজুদার কী দোষ বলো। তোমার পিছনে বদমাশ ছেলেরা লেগেছিল দেখে আমিই বিজুদাকে বলে দিই। তাই বিজুদা ওদের একটু শাসন করেছিল। আগ বাড়িয়ে তো কিছু করেনি। দোষ তো আমার।
সোহাগ মুখ টিপে হেসে বলে, তুমি বিজুদাকে খুব ভালবাসো, না?
ওঃ, ইয়েস। বিজুদা ইজ এ নাইস নাইস নাইস ম্যান। একদিন ভাল করে আলাপ করলেই বুঝতে পারবে। ওর ঘরে একটা চড়াইপাখি মরে গেল বলে কী মন খারাপ! দুদিন দাড়ি কামায়নি। একটা চড়াইপাখির জন্য কে এত ভাবে বলো!
ওকে! লেট আস লিভ বিজুদা অ্যালোন। জানো তো, এখন থেকে আমরা প্রত্যেক উইকএন্ডে গ্রামে বেড়াতে আসব বলে ঠিক হয়েছে!
ওমা! তাই? আর তোমার মা-বাবার সেই ব্যাপারটা?
একটা সেটেলমেন্ট হয়েছে। দে আর নাউ স্লিপিং ইন সেম বেড। পরে কী হবে বলা যায় না। কিন্তু এখনকার মতো ধামাচাপা।
তাই তোমায় আজ ব্রাইট দেখাচ্ছে।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে সোহাগ বলে, হবে হয়তো। বড়রা যখন ঝগড়া করে তখন আমার খুব ইম্ন্যাচিওর মনে হয়। কেন ঝগড়া হয় বলো তো!
আমার মা-বাবার মধ্যেও মাঝে মাঝে ঝগড়া হয়। তবে বাবা একদম ঝগড়া করতে পারে না। না খেয়ে বেরিয়ে যায়।
দুজনে খুব হাসল।
এই এত বইখাতা ছড়িয়ে কী করছিলে এতক্ষণ!
পড়ছিলাম। সামনে পরীক্ষা না!
এ মা! তা হলে তো আমি এসে তোমাকে ডিস্টার্ব করলাম।
তুমি এসে আমাকে বাঁচিয়েছ। এ বাড়িতে কী হচ্ছে জানো না তো! সাংঘাতিক কাণ্ড! ভয়ে আমি দিনরাত কাঁটা হয়ে আছি।
মাই গড! কী বলো তো!
আমাদের একজন নতুন রান্নার লোক রাখা হয়েছে। সুদর্শন। লোকটা না নানারকম তন্তরমন্তর জানে। নিশুতরাতে নাকি ভূত নামায়। আর তখন এ-বাড়ির আনাচে-কানাচে গিজগিজ করে ভূত।
চোখ গোল গোল করে শুনছিল সোহাগ। বলল, তোমরা ভূত দেখেছ বুঝি?
পাগল! দেখলেই আমি অক্কা পাবো ভয়ে। কিন্তু অনেকে দেখেছে। তারা নাকি বোঁটকা গন্ধও পেয়েছে।
ভূতের কি গন্ধ থাকে?
সবাই তো তাই বলে।
লোকটা ফ্রড নয় তো?
না বাবা, লোকটা তুকতাক জানে ঠিকই। কিন্তু স্বীকার করে না।
সোহাগ ঠাট্টা করল না, হেসে উড়িয়ে দিল না। বরং গম্ভীর মুখ করে বলল, আমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেবে? আমি ওর কাছ থেকে শিখতে চাই।
তোমার ভাই দুর্জয় সাহস। আমি তো মাকে বলেছি লোকটাকে তাড়িয়ে দিতে।
না না, তাড়িও না। এরকম লোক খুঁজলে পাওয়াই যাবে না আর। ডাকো তো লোকটাকে!
কিন্তু সুদর্শনকে ডেকে পাওয়া গেল না। বোধহয় দোকানপাটে গেছে, কিংবা আড্ডা মারছে কোথাও।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন