শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
শিবঠাকুর একটু ভোলেভালা আদমি, কিন্তু একটু পাগলাটেও বটে। বর যখন দিতে শুরু করেন তখন দিতেই থাকেন। আর কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। পরশু দিনও মরণ ভাবছিল, দাদা তো হল, এবার দিদিটা আর বড়মাটা হলেই হয়। তার বোন আছে বটে, কিন্তু দিদি থেকেও ছিল না। আর মা থাকলেও, বড়মা অন্য জিনিস। দিদি আর বড়মা সম্পর্কে কত কী ভেবে রেখেছে মরণ। দিদিটা হবে ঠিক পান্নাদির মতো। আরও সুন্দর হলে তো কথাই নেই। আর বড়মা হবে ঠিক যেমন জগদ্ধাত্রীর প্রতিমা।
আগে থেকে খবর দেওয়াও ছিল না। কাল একটু রাতের দিকে বাবা এসে হাজির। সঙ্গে পাগলা অমলকাকু আর দিদি। মরণ তখন পড়তে বসেছিল। উঠোনে মায়ের গলা পেয়ে বুঝল একটা কিছু হয়েছে। নতুন কেউ এসেছে বাড়িতে। এক লাফে উঠোনে নেমে এসে লণ্ঠনের আলোয় দিদিকে দেখে তার যেমন আনন্দ, তেমনই লজ্জা।
ছোট ছেলেদের অনেক সমস্যা। তার মধ্যে একটা হল কেউ সহজে পাত্তা দিতে চায় না। ভাবে, ওর সঙ্গে আর কীই বা কথা বলার আছে! শুধু ফাই-ফরমাশ করার জন্য তাদের ডাক-খোঁজ করা হয়। মরণ তার এই ভবিতব্য মেনেও নিয়েছে। তার কোনও গুরুত্ব নেই, তার তেমন আদরও নেই। পড়াশুনোয় ভাল হলেও না হয় হত! কিন্তু তাও সে নয়। এই অনাদরের জীবনটার জন্যই তার যা কিছু দুঃখ। সে ভাল বল খেলে, গাছ বায়, খুব জোরে দৌড়তে পারে, কিন্তু সেসব গুণকে কে আর পোঁছে!
সে ধরেই নিয়েছে তার কলকাতার দিদিও তাকে মোটেই পাত্তা দেবে না।
পড়াশুনো শেষ হল রাত নটায়। দোতলার শোওয়ার ঘর থেকে খুব হাসি আর কথার শব্দ আসছিল৷ কিন্তু ইচ্ছে হলেও ওপরে যেতে লজ্জা করছিল তার। দিদি তাকে দেখে হয়তো ভারী তাচ্ছিল্যের সঙ্গে বলবে, ওঃ, এই বুঝি মরণ!
তাই মরণ মাস্টারমশাই চলে যাওয়ার পরও অনেকক্ষণ চুপ করে পড়ার ঘরে বসে রইল।
বসে বসে ভাবছিল মরণ। এই যে বড়মা, দিদি, দাদা এরা নাকি তার খুব আপন কেউ নয়। অন্তত জিজিবুড়ি তাই বলে। জিজিবুড়ির জিভে নাকি বিষ আছে। তার কথা হল, ও আবার আপনার জন কবে থেকে হল রে! বাঙালের প্রথম পক্ষই হল তার আসল। তোরা তো সব দুয়োরানির ছা। কে-ই বা তোদের পোঁছে, কে-ই বা তোদের দাম দেয়। আমার মেয়েটা তো হদ্দ বোকা, পিটুলিগোলা খেয়ে দুধ বলে নাচছে। দলিল-দস্তাবেজে কত ফাঁকফোকর থাকে, উকিল মুহুরিদের হাত করে সব বানিয়ে রেখেছে। যখন কেড়েকুড়ে নেবে তখন আক্কেল হবে মেয়েটার।
জিজিবুড়ি বাড়িয়ে বলে ঠিকই, কিন্তু সমস্যা যে একটা আছে তা মরণও বুঝতে পারে। যদি সমস্যা না থাকত তাহলে কি তার বাবা কখনও মরণ বা তার মাকে কলকাতার বাড়িতে নিয়ে যেত না? আর তার মাও যেন বড়মার নামে ভীষণ ভয় পায়। এইসব থেকে আজকাল মরণ বুঝতে পারে তারা ঠিক আর পাঁচটা পরিবারের মতো নয়। তাদের কিছু গোলমাল আছে। আর সেজন্য দায়ি তার বাবা।
বাবাকে কি খুব অপছন্দ করে মরণ! অনেক ভেবে দেখে তার মনে হয়েছে, যত নষ্টের গোড়া ওই লোকটাই। যেমন কেঠো চেহারা, তেমনই কেঠো স্বভাব। দুটো বিয়ে করার কী দরকার ছিল লোকটার! না, বাবাকে তার একদম পছন্দ নয়।
তার মাও টের পায় মরণ তার বাবাকে পছন্দ করে না। তাই মা মাঝে মাঝে তাকে বলে, মানুষটার বাইরেটা অমন হলে কী হবে, ওর মনটার কথা তো জানিস না! বড় হলে বুঝবি ওরকম মানুষ খুব কম হয়।
মা যে বাবাকে কেন অতটা ভালবাসে, তাও বুঝতে পারে না মরণ। মা কখনও বাবার কোনও দোষ দেখে না, কোনও অন্যায় দেখতে পায় না। বাবার ছেড়ে রাখা চটিজুতোয় পা লাগলে পর্যন্ত প্রণাম করে। অথচ জিজিবুড়ি বলে, বাঙালের নাকি জাতজন্মেরই ঠিক নেই। মায়ের সঙ্গে তার নাকি মোটে বিয়েই হয়নি।
এইসব নিয়েই সমস্যা মরণের। পড়ার ঘরে বসে সে তাই গভীরভাবে ভাবছিল।
আচমকাই জানালায় খুটখুট করে শব্দ হল একটা। ভারী চমকে গিয়েছিল মরণ।
কে রে!
জিজিবুড়ি চাপা গলায় বলল, ও মরণ, জানালাটা একটু ফাঁক কর দিকি ভাই।
মরণ গিয়ে জানালার ছিটকিনি খুলে বলল, কী জিজিবুড়ি?
বলি, কে এল রে তোদের বাড়িতে! অত হাসি-মস্করা কীসের?
দিদি এসেছে যে!
জিজিবুড়ি চোখ বড় বড় করে বলে, দিদি মানে! বাঙালের মেয়েটা নাকি? ও বাবা, এ যে একে একে সবাইকে এনে জোটাচ্ছে! তোদের ভিটেছাড়া করবে নাকি!
তুমি এখন যাও জিজিবুড়ি, কে দেখে ফেলবে।
বলি ছেলেটাও তো এখনও বিদেয় হয়নি। জ্বরের বাহানা করে চারদিন না পাঁচ দিন পড়ে আছে। ও আর যাবেও না। আর বাসন্তীরও বলিহারি যাই, পারলে পাদোদক খায়। তা মেয়েটা এয়েছে কী করতে জানিস?
বেড়াতে এসেছে।
বেড়ানোর কি আর জায়গা নেই বাপু! হিমালয় আছে, মথুরা-বৃন্দাবন আছে, দিল্লি-বোম্বাই আছে, সব ফেলে এখানে এসে আবার গুঁতোগুতি কেন?
তা আমি জানি না। তুমি এখন যাও।
যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। এ পথ দিয়েই যাচ্ছিলুম, নতুন গলা পেয়ে খোঁজ নিয়ে গেলুম। ছেলে-মেয়েকে এনে তো দখল কায়েম করলে, এবার বড়গিন্নিকে এনে বসালেই চিত্তির। তোর মাকে বলিস গয়নাগাঁটি সোনা-দানা সব সামলে রাখতে। মেয়েমানুষের চোখ খুব খারাপ। ঝাঁত করে সব জিনিসের তল্লাশি নিয়ে নেবে। আমি বাপু লক্ষণ মোটেই ভাল বুঝছি না।
এসব শুনলে মন আরও খারাপ হয়ে যায় মরণের।
ওপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে কারা নামছে শুনে মরণ বলল, তুমি এখন যাও জিজিবুড়ি। কে যেন আসছে।
বলেই পাল্লাটা বন্ধ করে দিল মরণ।
পাশেই রান্নাঘর। সেখান থেকে মায়ের গলা পাওয়া গেল, ও মুক্তা, মশলাটা তাড়াতাড়ি বেটে ফেল, আজ একটু মুড়িঘণ্ট করব।
মশলা কখন হয়ে গেছে!
তাহলে শিলটা ভাল করে ধুয়ে একটু পোস্ত বেটে ফেল দেখি।
এইসব শুনতে শুনতে আরও গভীর ভাবনায় ডুবে যাচ্ছিল মরণ। যত বড় হচ্ছে তত তার ভাবনা বাড়ছে। এইজন্যই আজকাল বড় হওয়াটাকে তেমন পছন্দ হয় না মরণের।
ভাবতে ভাবতেই কখন টেবিলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়েছিল।
রাত সাড়ে দশটা না এগারোটায় মা এসে ডেকে তুলল তাকে।
ও মা! তাই তো বলি ছেলেটার সাড়াশব্দ নেই কেন! আয় আয় শিগগির, দিদি এসেছে তো। কতবার করে জিজ্ঞেস করছে তোর কথা!
আমার কথা! বলে মরণ অবাক। তার কথা কেন জিজ্ঞেস করবে। তাকে তো কেউ একটুও দাম দেয় না!
আয় বাবা, উঠে পড়।
ঘুম-চোখেই দেখা হল দিদির সঙ্গে। খাওয়ার টেবিলে।
দেখা হতেই হাত বাড়িয়ে কাছে টেনে নিয়ে পাশের চেয়ারে বসাল।
এ বাবা, তোমার তো ভীষণ দুষ্টু-দুষ্টু চোখ! খুব দুষ্টু বুঝি তুমি?
মরণ হেসে ফেলল।
রসিক সাহা বলল, আরে একেবারে ল্যাজকাটা বান্দর। পড়া নাই, শুনা নাই, সারাদিন পাড়া টহল দিতাছে। খ্যালনের কথা ক’ গাছ বাওনের কথা ক’, ফাল দিয়া উঠব।
দাদা মৃদু-মৃদু হাসছিল। বলল, না, না, ওর ব্রেন আছে। একটু দুষ্টু হলেও পাজি নয়। হি ইজ গুড। আই লাইক হিম।
রাতে বেশি কথা হয়নি আর।
সকালে তার পড়ার ঘরে এসে হামলে পড়ল দিদি।
অ্যাই তোর এত বিচ্ছিরি নাম কেন রে? তোর পোশাকি নাম নেই?
না তো! আমার ইস্কুলের নাম তো মরণকুমার।
এ মা! তোর এ-নামটা ভাল লাগে?
নাঃ, একটুও না।
দাঁড়া, বাবাকে বলে তোর নামটা পালটে দিচ্ছি। কে এ-নাম রাখল বল তো!
বাবাই রেখেছিল। আমার একটা দিদি হয়ে মরে গিয়েছিল বলে নাকি এ-নাম রাখা হয়।
ধ্যেৎ, যত সব কুসংস্কার। তোর একটা ভাল নাম নিতে ইচ্ছে করে না?
এক গাল হেসে মরণ বলে, হ্যাঁ তো। আমার একটা নাম খুব পছন্দ।
কী নাম?
বিশ্বজিৎ।
ধুর! বিশ্বজিৎ একটা নাম হল! এ তো পঞ্চাশ বছর আগের যুগের নাম।
কাঁচুমাচু হয়ে মরণ বলে, তাহলে?
পুঁটি একটু ভাবল। ভেবে বলল, অবিশ্যি মরণকুমার নামটা বেশ নতুন ধরনের কিন্তু। ইট হ্যাজ শার্প এজেস। বেশ ধারালো নাম। কোথায় শুনেছি বল তো এ-নামটা!
মরণ হেসে বলল, বাবা খুব ঢাকার মরণচাঁদের মিষ্টির দোকানের কথা বলে।
ওঃ ইয়েস! না, আফটার এ সেকেন্ড থট নামটা আমার খারাপ লাগছে না।
করুণ মুখে মরণ বলে, তাহলে নামটা বদলাতে বলবে না?
না। নামটার একটা অ্যাপিল আছে। তোর বিশ্বজিতের চেয়ে অনেক ভাল। অন্তত ভ্যাতভ্যাতে নাম নয়।
মরণ একটু আশার আলো দেখতে পেয়েছিল। আলোটা পট করে নিবে গেল।
কী পড়ছিস?
ইংরেজি।
আজ আর পড়তে হবে না। ওঠ।
কোথায় যাবে?
চল না। দোতলার বারান্দা থেকে দেখলাম, বাগানে একটা কুল গাছ রয়েছে। ঝেঁপে কুল এসেছে তাতে।
কুল! হ্যাঁ, কুল গাছ আরও আছে।
কুল খাস না?
মা খেতে দেয় না যে। কাঁচা কুলে নাকি অসুখ হয়। পাকলে খাই।
এ মা, ডাঁশা কুলের মতো জিনিস আছে!
অবাক হয়ে মরণ বলে, এই সকালে কুল খাবে? ভীষণ টক যে!
টক বলেই তো খাবো। তবে এখন নয়। দুপুরে ঝালনুন দিয়ে। গাছে শুঁয়োপোকা নেই তো!
খুব আছে। তবে আমার তাতে কিছু হয় না। কচু পাতার রস লাগিয়ে দিলেই কমে যায়।
চল তো, ঘুরে ঘুরে চারদিকটা দেখি।
মরণ সেটাই চায়। সে বই বন্ধ করে টপ করে উঠে পড়ল।
কোথায় যাবে দিদি?
আগে বেরোই তো, তারপর দেখা যাবে।
দিদিটা যে দেখতে খুব সুন্দর, তা নয়। রাতে ঘুমচোখে আর লজ্জায় ভাল করে দেখেনি। দিদিটা রোগা, মুখখানা ভাঙাচোরা, দাঁতগুলোও ভাল নয়। তা হোক, বেশ হাসিখুশি আছে। শিবঠাকুরের কাছে তো সে সুন্দর দিদি চায়নি। চেয়েছিল, যেন দাদা, দিদি আর বড়মা তাকে খুব ভালবাসে। সেটা হলেই হল।
মুখবাঁধা মস্ত মেটে কলসি নিয়ে বিপিন এসে বসেছে উঠোনের রোদে।
খেজুর রস খাবে না দিদি?
পুঁটি নাক কুঁচকে বলল, খেজুর রস? কেমন খেতে?
খুব ভাল। আমরা তো সবাই খাই।
পুঁটি বিপিনের দিকে সন্দিহান চোখে চেয়ে বলল, খাবো? লোকটার জামাকাপড় যা ময়লা!
মরণ হেসে বলল, ও তো মাঠে কাজ করে। জামাকাপড়ে মাটি লেগে যায়।
পুঁটি খুঁতখুঁত করে বলল, কলসির মুখের ন্যাকড়াটার অবস্থা দেখেছিস? হাকুচ কালো।
ও তো রসের দাগ। খাও না, কিছু হবে না। আমরা তো রোজ খাই।
ওপর থেকে রসিক সাহা হাঁক মেরে বলল, আরে খা, খা। খেজুর রসে মেলা ভিটামিন।
উঠোনে নেমে হাম্মিকে রোদে হামা দিতে ছেড়ে দিয়ে রসিকও বসে গেল রস খেতে।
এক চুমুক খেয়ে পুঁটি স্বাদটা বুঝবার চেষ্টা করল একটু। তারপর বলল, দুর, ভ্যাতভ্যাতে স্বাদ। কোনও কিক নেই। এর চেয়ে কোক ভাল।
মরণ হি হি করে হেসে বলল, ভ্যাতভ্যাতে মানে কী দিদি?
ভ্যাতভ্যাতে! ভ্যাতভ্যাতে মানে ভ্যাতভ্যাতে। তার মানে হচ্ছে ভাতের মতো। তাও তো বিস্বাদ।
কিন্তু ভাত তো আমরা রোজ খাই।
হুঁ, সে কথা ঠিক। কিন্তু শুধু ভাত হল ভ্যাতভ্যাতে। বুঝলি?
হুঁ, সে কথা ঠিক। কিন্তু শুধু ভাত হল ভ্যাতভ্যাতে। বুঝলি?
হেসে ঘাড় নাড়ল মরণ।
পুঁটি চারদিকে চেয়ে বলল, তোদের সবকিছুই ভ্যাতভ্যাতে, না রে?
মরণ ফের হি হি করে হাসল। বেশ দিদি। ভাল দিদি।
রান্নাঘরে উনুনের কাছটি ঘেঁষে জিজিবুড়ি বসা। একটা খয়েরি রঙের ময়লা, ছেঁড়া পুরনো আলোয়ানে মাথা-টাথা ঢেকে জবুথবু। হাতে নিত্যনৈমিত্তিক দুধ-চায়ের গ্লাস। মুখখানা গম্ভীর। তোম্বাপানা। ভিতরে বিষ জমেছে ঢের। বাসন্তী মায়ের চোখ দেখলেই টের পায়, এবার বিষ ওগরাবে। তবে বিষ ওগরানো ছাড়া তার মায়ের আর কিছু করারও নেই।
ছেঁড়া আলোয়ানটা দেখে কষ্টই হয় বাসন্তীর। সেই ছেলেবেলা থেকে শীতকালে মায়ের গায়ে ওই আলোয়ানটাই দেখে আসছে। গরম জিনিস বড় পুরনো হয়ে গেলে ওম কমে যায়। গাঁয়ের এই চাষাড়ে শীত মানতে চায় না। তার মায়ের দ্বিতীয় কোনও শীতবস্ত্র যে নেই, তা বাসন্তী ভালই জানে। রাতে গায়ে দেয় একখানা পুরনো লেপ। তুলো-টুলো সরে গিয়ে সেই লেপেরও জায়গায় জায়গায় জ্যালজ্যালে অবস্থা।
বাসন্তী ইচ্ছে করলে মাকে একখানা আলোয়ান কিনে দিতে পারে, বানিয়ে দিতে পারে নতুন লেপ। কিন্তু না-দেওয়ার কারণ আছে। কারণটা হল, সেই আলোয়ান বা লেপ কোনওটাই মায়ের ভোগে লাগবে না। তার দুই অসুর ছেলে ভোগা দিয়ে হাতিয়ে নেবেই নেবে।
অকালকুষ্মাণ্ড দুটো ছেলের জন্য মায়ের অনেক পোড়ানি আছে বুকের মধ্যে।
বাসন্তী মাঝে মাঝে জিজ্ঞেস করে, হ্যাঁ মা, আমাকে কি পেটে ধরোনি তুমি! সত্যি করে বলল তো। তোমার ভাবগতিক দেখে মনে হয় আমাকে কুড়িয়ে পেয়েছিলে! তোমার ছেলেরাই তোমার সর্বস্ব।
এসব ভাবের কথা অবশ্য জিজিবুড়ি গায়ে মাখে না। তাকে দোষ দিয়ে লাভও নেই। সারাটা জীবন ভাত-কাপড়ের কষ্ট, উঞ্ছবৃত্তি করে করে মানুষটা আর সেই মানুষও তো নেই। মনটা দড়কচা মেরে গেছে।
কাল রাতে রসিক মেয়েকে নিয়ে এসেছে। আসতেই পারে। বাসন্তী খুশিও হয়েছে খুব। দুই পরিবারের মন কষাকষি আর দূর হয়ে, পর হয়ে থাকা যদি একটু কম হতে থাকে তো বাসন্তী তার মধ্যে মন্দ কিছু দেখে না। কিন্তু সংসার হল আঁস্তাকুড়। এখানে ভালকে ভাল বলে দেখা, সোজাকে সোজা বলে ধরার তো রেওয়াজ নেই! এই যে মেয়ে এসেছে এ নিয়েও কথা হয় এবং হবে।
সকালে আঁশটে মুখ করে ওই যে মা এসে বসেছে, তার মানে পেটে জিলিপির প্যাঁচ চলছে। বাসন্তী নিজে যে একটু ভালমানুষ গোছের, তার যে পাঁচালো বুদ্ধি নেই, সে যে ঝগড়ুটে নয়, দজ্জাল নয়, সে যে মুখ খারাপ করতে পারে না এটা সে নিজেও জানে। কিন্তু মা তার এই ভালমানুষি একদম পছন্দ করে না। হয়তো তার মা চায় বাসন্তী তার মায়ের মতোই হোক। সংসারের আঁস্তাকুড় হাঁটকে জীবনটা কাটাক।
তাই অবশ্য হওয়ার কথা ছিল বাসন্তীর। ছেলেবেলা থেকে এক অশান্তির সংসারে সে বড় হয়েছে। মায়ে-বাবায় বনিবনা হত না। তার দুই দাদা ডাগর হয়ে নানা বদমাইশিতে ঢুকে পড়ল। বাসন্তীর তো ভাল হওয়ার কথাই নয়। ভিতু স্বভাবের বাসন্তী বরাবর একটু বাপ-ঘেঁষা ছিল। বাবা কৃতী পুরুষ ছিল না বটে, কিন্তু লোক খারাপ ছিল না। বাসন্তীকে ভালও বাসত খুব। বোধহয় বাবা-ঘেঁষা হওয়াতেই তার স্বভাবে বাপের ছাপ পড়েছে বেশি। আর কপালগুণে বর পেল বাঙালকে। ভগবান সবটা দেন না, দিতে দিতেও খানিক কেড়ে রেখে দেন। তাই বাঙালের মতো বর পেলেও সবটা পেল না সে। বড়বউ খানিক দখল করে রাখল।
তা হোক। এতটাই কি আশা করেছিল সে! চারদিকে ফলন্ত, ভরাট সংসার, মা লক্ষ্মী উপচে পড়ছে চারদিকে। এতটাই কি হওয়ার কথা? নিষ্কন্টক নয় বটে, কিন্তু কাটা গাছের ফুলও কি কম ভাল!
বাসন্তী কচুরির পুর তৈরি করতে করতে ভয়ে ভয়ে অপেক্ষা করছিল, কখন মা বিষ ওগরাবে।
গেলাসটা খালি করে রেখে দিয়ে জিজিবুড়ি বলল, তা বড়বউ কবে আসছে? এখন সুয়োরানি এসে পাটে বসলেই তো হয়।
বাসন্তীর বুক কেঁপে উঠল। তবে সে কিছু বলল না।
জিজিবুড়ি হঠাৎ ডুকরে উঠল, হরিবোল বাবা, হরিবোল। চুষিকাঠি ধরিয়ে এতকাল ভুলিয়ে ভালিয়ে রেখে এবার লাথি ঝাঁটা মারার সময় হয়ে এল।
বাসন্তী চোখ পাকিয়ে বলল, দুধ তো গিলেছ। এবার এসো গিয়ে।
যাচ্ছি মা যাচ্ছি। শুধু বলে যাই ওই হাড়গিলে চেহারার মেয়েটা কিন্তু মনিষ্যির চেহারায় শকুন। ভিটেয় ঘুঘু চরিয়ে ছাড়বে। একে একে আসছে সব সুয়োরানির দূত। মনে রাখিস।
বাসন্তী অখণ্ড মনোযোগে পুর মেখে উনুনে কড়াই চাপাল।
হঠাৎ সুর পালটে জিজিবুড়ি বলল, হাজার দুই টাকা দিবি?
অবাক হয়ে বাসন্তী বলে, দু হাজার টাকা! কেন?
ধার বলেই দে। দু মাস বাদে ফেরত দেবো।
দু মাস বাদে কি লটারি পাবে নাকি?
মায়ের পেটের দুটো ভাইয়ের জন্য তো আর কিছু করে দিলি না। কত করে বললুম, বাঙালকে ধরে বাজারের দোকানঘরটা করে দে। দুজনে মিলে করে কর্মে খেতে পারত। বাঙালের টাকাও শোধ হয়ে যেত এতদিনে। তা আর যখন হল না তখন আর কী করা! কানু বাড়িতেই ব্যবসা ফেঁদেছে একটা। ধূপকাঠি আর মাজন তৈরি করে বেচবে।
দাদারা আজকাল বাসন্তীর কাছে বিশেষ আসতে সাহস পায় না। একসময়ে যথেষ্ট লুটপাট করে বাসন্তীকে প্রায় পথে বসিয়ে দিয়েছিল। এখন পাত্তা না পেয়ে পেয়ে আর বিশেষ আসে না। তবু তার মধ্যেও মাঝে মাঝে নির্লজ্জের মতো এসে টাকা ধার চায়। বাসন্তী ধার দেয় না বটে, তবে দু-দশ টাকা দিয়ে বিদেয় করে দেয়। মিথ্যে করেই বলে, টাকাপয়সা আমার কাছে থাকে না, সব তোমাদের ভগ্নীপতির হেফাজতে। কথাটা ওরা বিশ্বাস করে না বটে, কিন্তু বেশি কিছু বলতেও পারে না। বলার মুখও নেই কিনা!
বাসন্তী বলল, টাকা নেই।
জিজিবুড়ি বিরস মুখে বলে, ধান-বেচা টাকাগুলো তো সদ্য হাতে পেলি।
সেটা হিসেবের টাকা। তোমার জামাই ব্যবসা করে খায়। সে হিসেব বুঝে নেয়। বেহিসেবি চলে না।
আজকালকার বাজারে দুটো হাজার টাকা কি একটা টাকা! নাহয় একটু বানিয়ে-ছানিয়ে যাহোক বলে দিবি। কানু বলেছে এ-টাকা সে ফেরত দেবে।
সে তো খুব ভাল কথা মা। ফেরত পেতে তো আমার হাড়ে দুব্বো গজাল। আর গিল্টি করা কথাগুলো বোলো না তো!
এরপর ভাই দুটো যদি চুরি-ডাকাতি করে খায় তাতে কি তোর মান বাড়বে নাকি!
আমার মান নিয়ে তোমাকে আর মাথা ঘামাতে হবে না। চুরি ডাকাতির কমটাই বা কী করেছে তারা শুনি?
জিজিবুড়ি একটু চুপ করে থেকে বলল, আমার ভয় কী জানিস? গলায় দড়ি-টড়ি না দিয়ে বসে।
তোমার ছেলে দেবে গলায় দড়ি! হাসালে মা। সে দড়ি এখনও তৈরি হয়নি।
জিজিবুড়ি আরও খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, ব্যবসাটা দাঁড়িয়ে গেলে সে কি আর এমন মানুষ থাকবে? শত হলেও ভদ্রলোকের ছেলে তো। অভাবে পড়ে নাহয় অকাজ কুকাজ করে ফেলেছে। তা বলে এটা তো আর খারাপ নয়।
আমি অত তত্ত্বকথা জানি না মা। তোমার ছেলেদের আমার বিশ্বাস হয় না, জেনে রাখো। বহুবার বহু ছুতোয় টাকা নিয়ে মদ-গাঁজা খেয়েছে না হয় পেট পুজোয় গেছে।
তা কী করবে বল! অভাবের সংসার, এণ্ডি-গেণ্ডি ছেলেপুলে, সেগুলোকে তো আর ফেলে দিতে পারে না।
ছেলেপুলেই বা গণ্ডায় গণ্ডায় হয় কেন? অভাবের সংসার, এক পয়সা আয় নেই, অথচ দুই ছেলে দুই বউ জুটিয়ে আনল। জাত দেখলে না, বংশ দেখলে না, কোত্থেকে কাকে ধরে আনল খোঁজ নিলে না। তারপর বছর বছর বংশ বিস্তার করে যাচ্ছে। বেশ যা হোক।।
না হয় আমাকেই দিলি টাকাটা, গরিব মাকেও তো লোকে দেয় খেতে নাকি?
তেমন মা তো তুমি নও! এতদিন বলিনি, জামাইয়ের হাতে দেবে বলে একটা ফর্দ লিখেছিলাম, তার মধ্যে আফিং-এর কথাটা কে লিখিয়েছে বলতে পারো? নাতিকে তুতিয়ে পাতিয়ে তুমিই লিখিয়েছ। এ কি ভাল?
তোম্বা মুখ করে জিজিবুড়ি বলে, তোকেই বলতুম। তা তখন তুই শীতলাবাড়িতে গিয়েছিলি বলে—
আর মিথ্যে কথা বলে পাপের বোঝা বাড়িও না। টাকাপয়সা আমি আর দিতে পারব না, বলেই দিচ্ছি।
টাকাপয়সা কি তোরই থাকবে ভেবেছিস? ভাগাড়ে তো শকুনের নজর পড়েছে দেখতেই পাচ্ছি। বুদ্ধি থাকলে সাঁট করে দশ বিশ হাজার টাকা সরিয়ে আমার কাছে গচ্ছিত রাখলেও পারতিস। আখেরে কাজ হত।
তোমার কাছে টাকা রাখা মানে তো সাপের কাছে ব্যাঙ রাখা। আমার তো আর মতিচ্ছন্ন হয়নি। আমার টাকা আমার কাছেই থাকবে। আমার ভালর জন্য ভেবে আর চোখের জল ফেলো না তো।
রান্নাঘরটা মস্ত বড়। তার এক কোণে বসে মুক্তা মশলা বাটছিল। সে সাতে পাঁচে থাকে না। আজ হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে বলল, কেন বাপু রোজ এসে ঘ্যানঘ্যান করো। বাবা কি তেমন লোক?
জিজিবুড়ি ভস্ম-করা চোখে মুক্তার দিকে চেয়ে বলল, এঃ, বড় আমার বাবা-উলি এলেন রে। বাঙাল আবার কবে তোর বাবাকেলে বাবা হল শুনি! বাঙাল হল মগেদের দেশের লোক, সাপ ব্যাঙ সব খায়, ওদের বামুন-কায়েত নেই। ছিষ্টিছাড়া জীব। কোন সুবাদে তাকে বাপ ডাকতে যাস শুনি। দেখছিস তো কেমন একে একে ছেলে মেয়ে আমদানি করে ঘট-প্রতিষ্ঠা করে রাখছে। এরপর আমার মেয়েটাকে কাঁত করে লাথি মেরে যদি না তাড়ায় তো দেখিস! কপাল খারাপ না হলে, মরতে ওই লোকের সঙ্গে মেয়েটার বিয়ে দিই! এখন বরাতে কী আছে কে জানে বাবা! আর মেয়েটাও আমার বোকার হদ্দ। নইলে বাঙালের সঙ্গে নাচে! গাল ভরে বাবা ডাকছিস। কোন সঙ্গে তুলবে তোকে ওই ম্লেচ্ছটা শুনি!
মুক্তা তার নিজের মতো করে একটা সম্পর্ক তৈরি করে নিয়েছে। রসিক সাহা তাদের বন্ধকী জমি উদ্ধার করে দিয়েছে, তাদের ভাঙা ঘর ছেয়ে দিয়েছে। মুক্তার মা-বাবা এই বুড়ো বয়সে বাঙালের জন্যই একটু সুখে আছে। তার ওপর মুক্তার জন্য পাত্রেরও খোঁজ করছে বাঙাল। বলে রেখেছে বিয়ের সব খরচ তার। কৃতজ্ঞতায় আপনা থেকেই বাবা বলে ডাকে মুক্তা, কেউ শিখিয়ে দেয়নি। আর বাবার প্রতি তার অসম্ভব পক্ষপাত।
জিজিবুড়ির দিকে চেয়ে সে বলল, বাবার মতো মানুষের কুচ্ছো গাইছ, কলিকাল বলে তোমার মুখে পোকা পড়ছে না! বাবার মতো মানুষ বলেই বাবা ডাকি। তাকে ডাকব না তো কি তোমাকে বাবা বলে ডাকব? রোজ এসে এ-বাড়িতে শেয়ালের মতো ঢুকে মেয়ের সংসার ভাঙার চেষ্টা করো, তুমি কেমনধারা মা? নিজের সংসারে তো আগুন লাগিয়ে বসে আছ, সেখানে সুন্দ উপসুন্দের লড়াই হচ্ছে রোজ। সব খবর রাখি।
দ্যাখ মুক্তা, তোর বড় আস্পদ্ধা হয়েছে কিন্তু! চিরটা কাল পরের বাড়ির এঁটো পাত কুড়িয়ে বড় হয়েছিস। তোর এত গুমোর কীসের রে! বলি বাঙালের খুঁটোর জোরে সাপের পাঁচ পা দেখলি নাকি? কার সঙ্গে কইছিস সে খেয়াল আছে?
তা থাকবে না কেন? খুব আছে। তুমি হলে তো বাবুর শাউড়ি। কিন্তু শাউড়ির যা ছিরি দেখছি তাতে ঘেন্না হয় বাপু। মান চাইলে মানী হতে হয়। এ বাড়ির দুধটুকু, সরটুকু, এ বাড়ির নারকোল, সুপুরি কোনটা না হলে তোমার চলে বলো তো! আমরা এটো পাত কুড়িয়ে বড় হয়েছি, আর তুমি?
আমাকে খুঁড়ছিস? এ আমার মেয়ের বাড়ি, তা জানিস? আমার হক আছে।
তা আমারই বা হক থাকবে না কেন! আমরা গতরপাত করে খেটে খাই, বুঝলে! তোমার মতো মাগুনে বেওয়া নই। হাতটি তো পেতেই আছ। আবার যারটা খাচ্ছ তার মুণ্ডুও পাত করছ।
লহর তুলে হেসে কুটিপাটি হয়ে জিজিবুড়ি বলল, ওলো গতরওয়ালি লো! দেখিস আবার বেশি গতরের গুমোর করিসনি। পেট-টেট বাধিয়ে না বসিস। সোহাগ করে বাপ ডাকছিস ডাক, কিন্তু গতর সামলে!
মুক্তা এই অশ্লীল ইঙ্গিতে খানিকক্ষণ হতবাক হয়ে বসে রইল। তারপর বাসন্তীর দিকে চেয়ে বলল, শুনলে বউদি, শুনলে! এখন যদি মুখ ছোটাই তাহলে তোমরা আমার দোষ দেখবে। ও তোমার মা, নইলে জিজ্ঞেস করতুম, ওই মুখ দিয়ে খায় না হাগে, এমন লোকের মুখ দেখলে গঙ্গায় নাইতে হয়।
বাসন্তী মায়ের দিকে চেয়ে বলল, দিন দিন তুমি কী হয়ে যাচ্ছো বলো তো! ভদ্রলোকের সমাজে মুখ দেখাও কী করে?
জিজিবুড়ি দমল না। মুখে বিষাক্ত হাসিটা ধরে রেখেই বলল, ও মা! খারাপ কথা কী আবার বললুম! সোমত্থ বয়সের মেয়ে, রূপযৌবন আছে, তাই সাবধান করে দেওয়া। বাঙাল মনিয্যিদের কি চরিত্তির থাকে রে বাপু!
মুক্তা ফুঁসে উঠে বলল, তোমার চরিত্তির ঠিক রাখ গিয়ে। শ্মশানে বাড়িয়ে বসে আছ, তবু মুখে একটা ভাল কথা শুনলুম না। জন্মে কখনও শুনিনি বাপু কেউ নিজের মেয়ের সর্বনাশ করার জন্য আদাজল খেয়ে লাগে। বলি, ও ভালমানুষের মেয়ে, তোমার মতো গুয়ের পোকারা যদি ওই বাঙালের পাদোদক খায় তবে উদ্ধার হয়ে যায়। বুঝলে! এখন এ বাড়ি থেকে বিদেয় হও, নইলে আমি বাবাকে ডেকে এনে দেখাব তার শাউড়ি রোজ চোরের মতো এসে এ বাড়িতে কেন ঢোকে! তোমার লজ্জা হয় না এবাড়ির চৌকাঠ ডিঙোতে?
কথাগুলো গায়ে না মেখে জিজিবুড়ি উঠে পড়ল। খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, মা-মেয়ের কথার মধ্যে তুই আসিস কেন লা? ঝি-গিরি করছিস তাই কর। আর তোরও বলিহারি যাই বাসন্তী, কাজের লোককে মাথায় তুলছিস একদিন বুঝবি। কথায় বলে গোলামের ওষুধ হল পয়জার। মেনি বেড়ালের মতো মিউ মিউ করলে কি চলে? এসব নিকৃষ্ট মেয়েছেলেদের পায়ের তলায় দেবে রাখতে হয়।
এখন যাও তো মা, আর অশান্তি কোরো না।
যাচ্ছি বাবা যাচ্ছি। পেটে ধরেছিলুম বলে সেই মায়ায় আসা। নইলে কে বাড়ি বয়ে জুতো খেতে আসে!
কেউ তোমাকে জুতো মারেনি মা, নিজের দোষে তুমিই জল ঘোলা কর।
খুব ভালমানুষের মতো, সব রাগ-টাগ ভুলে জিজিবুড়ি বলল, টাকাটার কথা একটু মনে রাখিস মা। কানু বলেছে না হয় সুদই দেবে। দু হাজার দিবি, দু মাস বাদে আড়াই হাজার ফেরত পাবি। টাকাটাও খাটল, ভাইটারও আয়-পয় হল।
কোণ থেকে ইঁ…ইঁ…ইঁ… বলে একটা দীর্ঘ শব্দ করল মুক্তা। তারপর বলল, পুলি পিঠের ন্যাজ বেরোবে গো! উনি দেবেন সুদ। খানেকা ঠিকানা নেহি, নও বাজে চান।
জিজিবুড়ি দরজার কাছ থেকে ফিরে বলল, তাতে তোর কী রে বেশ্যে মেয়ে কোথাকার!
শুনলে বউদি! আমি বেশ্যে হলে ও কী?
বাসন্তী তাড়াতাড়ি দুজনের মাঝখানে পড়ে বলল, ওসব কানে তুলিসনি মুক্তা। কাজ করে যা। তুমি এবার বিদেয় হও তো মা।
জিজিবুড়ি চলে যাওয়ার পর বাসন্তী তাড়াতাড়ি উঠে রান্নাঘরের পাশের গলিটাতে এসে দাঁড়াল। তার চোখ ফেটে জল আসছে। তার মা ওইরকম বটে, কিন্তু একটু কষ্টও তো হয় বাসন্তীর। মা তো লাথি- ঝাঁটা খেয়েই ছেলেদের সংসারে পড়ে আছে। জ্বলেপুড়ে খাক হচ্ছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন