শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
সিঁড়ির শেষ ধাপটায় ঠিকমতো পা রাখতে পারেনি বাসন্তী। খন্দের মতো ফাঁকায় পা পড়ে শরীর টাল খেয়ে গেল তার। চোখে অন্ধকার দেখতে দেখতে দুর্বল শরীর হুমড়ি খেয়ে পড়ে যাচ্ছিল নাচে, বারান্দার শানের ওপর। সতর্ক ও তৎপর রসিক একটা লাফ দিয়ে গিয়ে জাপটে না ধরলে বাসন্তীর সর্বনাশ লেখা ছিল কপালে।
দেখছ কাণ্ড! ওই রকম আথালি-পাথালি হইয়া লামতে আছে!
কিছুক্ষণ বাসন্তীর হুঁশ ছিল না। রসিক পাঁজা করে ধরে তাকে বসাল বারান্দায় তারপর নরম গলায় বলল, ভয় নাই, কিছু হয় নাই তোমার। চক্ষু মেইলা চাও তো!
বড় বড় শ্বাস নিচ্ছিল বাসন্তী হাঁ করে। প্রথমটায় কথা বলতে পারল না। তারপর হাঁফ-ধরা গলায় বলল, কী হয়েছে গো আমার?
কিছু হয় নাই।
দু হাত বাড়িয়ে স্বামীর দুখানা হাত চেপে ধরে বলল, আমি কি রাখতে পারব ওকে? ও পেটে আসার পর থেকেই কীসব হচ্ছে বলো তো! এত ভয় করে আমার!
রসিক হেসে বলল, ভয়ই তো তোমারে খাইল। এত ডরানের কী আছে? লও, উপরে লও তো, তোমার কথা শুনি।
বাসন্তী এবার একটু স্বাভাবিক বোধ করছে। এই একটা লোক কাছে থাকলে তার ভয় ভীতি থাকে না, বলভরসা হয়। কিন্তু এ-মানুষটা কাছে না থাকলেই সে যেন কেমনধারা হয়ে যায়, পায়ের নীচে যেন মাটি থাকে না।
বাসন্তী সামলে নিয়ে বলল, তুমি ওপরে গিয়ে বোসো, আমি চা নিয়ে আসছি।
থোও ফালাইয়া চা। অখন উপরে লও। এক কাপ চা মুক্তাই বানাইয়া আনতে পারব।
ও বুঝবে না। গুচ্ছের চিনি দিয়ে ফেলবে, লিকার কড়া হয়ে যাবে। দামি চা নষ্ট করবে। আমার শরীর এখন ঠিক আছে, পারব।
তা হইলে আমি নীচেই বসি। চা লইয়া উপরে উঠতে গিয়া আর এক বিপত্তি বাধাইবা।
কিছু হবে না।
চা নিয়ে এসে বাসন্তী দেখল, রসিক গভীর চিন্তায় মগ্ন। হাত বাড়িয়ে চা নিয়ে বলল, বোঝলা, আমি একটা কথা ভাবলাম।
কী কথা?
যতদিন প্রসব না হইতেছে ততদিন তোমারে আর দোতলায় থাকতে হইব না। আইজই ব্যবস্থা করতাছি। কিছুদিন আর সিড়ি ভাঙানোর কাম নাই।
তাই বুঝি হয়! আমার সব যে ওপরে। পোশাক-আসাক, টাকাপয়সা, গয়নাগাটি।
আরে দূর। বিলিব্যবস্থা করতে লহমাও লাগব না।
অত ভাবছ কেন? তোমার গলা শুনে হঠাৎ দিশাহারা হয়ে নামতে গিয়ে পা-টা ফসকে গিয়েছিল। ও কিছু না। এবার থেকে সাবধান হব।
আমার গলা শুইন্যা তোমার ওইরকম বেজাহান হওয়ার কী হইল? আমি কোন বিলাত থিক্যা আইলাম?
লজ্জা পেয়ে বাসন্তী মুখ নামিয়ে বলে, তোমার কথা খুব বোধহয় ভাবছিলাম। তাই হঠাৎ—
রসিকের কঠোর মুখখানা হঠাৎ স্নিগ্ধ হয়ে গেল।
সে একটু হেসে বলল, আমি কোন নূতন গোসাঁই আইলাম যে আমার কথা ভাবছিলা, আবার দুঃস্বপ্ন দ্যাখছ নাকি?
দুঃস্বপ্ন! সে তো রোজ দেখি। তুমি যদি এ সময়টায় কিছুদিন আমার কাছে থাকতে! তুমি থাকলে কিচ্ছু হয় না।
তা হইলে যে কারবার লাটে উঠব। খাইবা কী? হরিমটর?
সেই তো ভাবি। কী যে করি।
ঠাকুর-দ্যাবতায় তো তোমার খুব বিশ্বাস! না! তাগো ডাকোনা ক্যান?
তারা বুঝি আমার ডাকে সাড়া দেয়? আমি পাপী না?
এইটা আবার কী কথা! তুমি পাপী হইলা ক্যামনে?
সে আছে।
পাপীরই তো ভগবানরে বেশি দরকার। কী কও? পতিতপাবন না কী জানি কয়।
সে ঠিক। তবে আমার ওপর কেন যেন চটা।
রসিক একটু হাসল। তারপর কোমল গলায় বলল, ভগবান যদি চেইত্যা যায় তবে হ্যায় আর ভগবান থাকে কেমনে?
হ্যাঁ গো, তুমি বুঝি ভগবান মানো না?
মানুম না ক্যান? মাল বেইচ্যা খাই, ভগবান না মাইন্যা উপায় আছে? আমার গদিতে তো যাও নাই, ইয়া বড় নাদাপ্যাটা গণেশঠাকুর দেখতে পাইবা। সকালে বিকালে পুরুত আইয়া মালা চড়াইয়া যায়।
খুব ভাল। আমাকেও একটা ভাল দেখে গণেশঠাকুর এনে দিও তো। আমার একটা পটের গণেশ আছে, কিন্তু ছবিটা বডড আবছা। গণেশবাবার আহ্লাদী ভাবটা নেই। এনে দেবে?
দিমুনা ক্যান? আইজকাইল গণেশবাবার প্র্যাকটিস খুব ভাল। মূর্তিও মেলা পাওয়া যায়।
হ্যাঁ গো, দিদি কার ভক্ত জানো?
ক্যান কও তো!
এমনিই। মনে হয় দিদি খুব কালীর ভক্ত। তাই না?
বুঝলা কেমনে?
বলব? রাগ করবে না?
রাগের কী?
একদিন স্বপ্নে দেখলাম দিদি এলোচুলে বসে কালীপুজো করছে। কালীমূর্তির চোখদুটো যেন জীবন্ত!
মাইয়ালোকে পূজা করে নাকি?
স্বপ্নে দেখলাম, সত্যি নাও হতে পারে। স্পষ্ট শুনছিলাম দিদি বিড় বিড় করে মন্ত্র বলছে।
হ্যায় যে কার ভক্ত তা জানি না। তবে ঠাকুরঘরে সবরকমই আছে। শিব-দুর্গা-কালী-জগদ্ধাত্রী, সন্তোষী মা সব।
দিদি বুঝি খুব পুজো-টুজো করে?
তোমারে আইজ দিদিতে পাইছে ক্যান?
একটা দীর্ঘশ্বাস পেলে বাসন্তী বলল, আমি ভাবি কী, আমি কি তার নখের যুগ্যি?
না হইলে কি গলায় দড়ি দিতে হইব নাকি? তাইন তাইনের মতো, তুমি তোমার মতো। তার লগে তো তোমার কাইজ্যা নাই।
আছে বইকী গো। মুখে ঝগড়া নেই ঠিকই, কিন্তু আমি তো দিদির চক্ষুশূল। তাই না বলো!
নাকি? ভাল। কারও চক্ষু শূলাইলে কী করবা? গিয়া তো আর তার চোখে মলম লাগাইতে পারবা না।
পায়ে তো পড়তে পারতাম।
খামাখা তার ঠ্যাং ধরতেই বা যাইবা ক্যান? তুমি তো কিছু দোষ কর নাই, করছি স্যান আমি। তুমি ঠ্যাং টানাটানি করলে লাভ কী?
আমারও কি দোষ নেই?
খুচাইয়া খুচাইয়া দোষ বাইর করনের কামটা কী? তুমি হইলা ঢ্যাপের দলা। মায়ে বাপে ধইরা বাইন্ধ্যা আমার লগে বিয়া দিয়া দিছিল। তোমার তো তাতে হাত আছিল না।
সে তো ঠিক কথা, তবু মনটা মানতে চায় না।
মনের বালাই বেশি থাকলে মাথার গণ্ডগোল হইব, বোঝলা? বিষয়-আশয় আছে, পোলাপান আছে, সংসারধর্ম আছে, এইসবে মনটা সই করতে পার নাই? দিদি-দিদি কইরা হ্যাদাইয়া মর ক্যান?
হ্যাঁ গো, তোমাকে একটা কথা বলব? কিছু মনে করবে না?
আরে কও, কও, সব কইয়া ফালাও, মনটা পরিষ্কার কর।
লোকে বলে আমি নাকি তোমার আসল বউ নই। আইনের চোখে নাকি আমার কোনও দাম নেই। সত্যি?
আইন? আইন তো দেখি সারাক্ষণই চক্ষু বুইজ্যা ঘুমাইয়া আছে। হ্যায় চাইলে স্যান কোনটা গতিক কোনটা বেগতিক তা বোঝন যাইব। আমরা কি আইনের লাগুড় পাই?
লোকে তো বলে দুটো বউ থাকা বে-আইনি।
লোকে মিছা কয় না। কিন্তু সরকারের যেমন আইন আছে তেমন আমাগরও কিছু কয়-কর্তব্য আছে। আমার তো মোটে দুগা বিয়া, আগে তো মানুষ গণ্ডায় গণ্ডায় করত।
আগের দিনে ওসব হত, আজকাল তো হয় না।
আজিকাইল আরও খারাপ কিছু হয়। দুইটা-তিনটা বিয়া হয় না বইল্যা কি সব সাধুপুরুষ হইয়া বইস্যা আছে নাকি। চোরায়-গোপ্তায় কত কী হয়। বিয়া করতে বুকের পাটা লাগে, বোঝলা? গৌরহরি উকিল আমার পিঠ চাপড়াইয়া যে কইছিল “তুমি বাপের ব্যাটা আছো হে” সে তো এমনি কয় নাই।
তাহলে কি আমি তোমার সত্যিকারের বউ?
মিছা-বউ তো আর না। এই লইয়া ধন্ধে পড়ছ নাকি?
চোখে জল আসছিল বাসন্তীর। আঁচলে চোখ মুছে বলল, যখন লোকে বলে আমি তোমার মিথ্যে বউ তখন আমি সইতে পারি না। দিদিকে তখন আমার ভারী হিংসে হয়।
রসিক সস্নেহে তার মাথায় হাত রেখে বলল, আইন মানুষই বানায়, মানুষই বদলায়। যখন যেমন দরকার। আইন লইয়া ভাববা না, সংসার লইয়া ভাব।
সব প্রশ্ন যে জল হয়ে গেল তা নয়; তবে দম ধরল বাসন্তী। বুক ঠান্ডা হল না, তবে জ্বলুনি একটু কমল। রসিকের জুলপিতে একটু পাক ধরেছে। শরীর অবশ্য সেই আগের মতোই মেদশূন্য এবং কঠিন ও পুরুষালি। কিন্তু রসিক আর নবীন যুবক নয়। বাসন্তীর চেয়ে বছর পনেরোর বড়। বাসন্তীর বয়সও তো বসে নেই। মেয়েদের বয়স রেলগাড়ির মতো দৌড়য়। তাদের বয়স হয়ে যাচ্ছে। তারা এখন মোহনার দিকে। এখন আর সম্পর্কের হেরফের হয় না।
রাতে দুজনের আদর সোহাগ হল খুব।
বাসন্তী বলল, এবার কী হবে গো? ছেলে না মেয়ে?
পোলা।
কেমন করে বুঝলে?
ওই যে কয় মাইয়ার মা সুন্দরী, পোলার মা বান্দরী। তোমার চেহারাখান ভাল দেখি না। ঝটকাইছে।
তার যে ভাই হবে একথা সে মায়ের কাছেই শুনেছে। শুনে যে খুশি হয়েছে তা নয়। বরং তার ভারী লজ্জা করে। কারণ, কী করে কোন প্রক্রিয়ায় ভাইবোন হয় তা সে আগে জানত না, সদ্য জেনেছে। আর সেটা এক ভীষণ অসভ্য কাজ। সেই অসভ্য কাজটা তার মা আর বাবা করেছে এটা ভাবতেই তার কেমন যেন মনটা বিকল হয়ে যায়, কান্না পায়। ভগবান, কেন এই বিচ্ছিরি নিয়ম। ওসব অসভ্যতা ছাড়া এমনিতে কোনও নিবাপদ প্রক্রিয়ায় কি ভাইবোন হতে পারে না?
দুপুরবেলায় তার প্রিয় গাছের তলায় অদৃশ্য শিবঠাকুরের সামনে হাঁটু গেড়ে বসে সে। বুকে অভিমান, লজ্জা, ঘেন্না।
ঠাকুর, এসব অসভ্য নিয়ম তুমি বদলে দাও। ওভাবে কেন ভাইবোন হবে ঠাকুর? ছিঃ ছিঃ ভাবতেও যে লজ্জায় মরে যাই। ওভাবে কি আমিও হলাম ঠাকুর? দোহাই তোমার, এ নিয়ম পালটে দাও, তার চেয়ে বরং আকাশ থেকে নেমে আসুক শিশুদের বীজ। বৃষ্টির মতন। জল পড়ুক মায়েদের মাথায়, গায়ে। শিশু সঞ্চারিত হোক মাতৃগর্ভে। না হয় তো অন্য কিছু হোক, অন্য কোনও প্রক্রিয়ায়। ওই লজ্জাহীন বিচ্ছিরি কাজের ভিতর দিয়ে নয়। দোহাই ঠাকুর…
তার ভালমানুষ শিবঠাকুর সব তাতেই রাজি। হাই তুলে বলল, তাই হবে রে বাবা, এখন থেকে তাই হবে।
বর দিলে তো?
দিলাম।
বরটাকে ঠিক বিশ্বাস হয় না মরণের। বর দিলে হবে কী, ভোলাবাবা সব আবার ভুলে মেরে দেয়। শিবঠাকুরকে নিয়ে ওইটেই মুশকিল। এমনিতে মানুষটা বড্ডই ভাল, কারও সাতেপাঁচে নেই। আপনমনে বুঁদ হয়ে থাকে। মরণ সেই জন্যই শিবঠাকুরকে এত ভালবাসে। কিন্তু শিবঠাকুরের ভুলো মনের জন্য তার দেওয়া বরগুলো মোটেই ফলতে চায় না। তিনটে-চারটে বরের মধ্যে একটা হয়তো ফলল, বাকিগুলো ফলল না। এতে ভারী মুশকিল হয় মরণের। বরগুলো ফললে কত কী হয়ে যেত এতদিনে।
আমি হলাম মরণকুমার সাহা, আমার কথা তোমার মনে আছে তো ঠাকুর?
হ্যাঁ হ্যাঁ, তোকে আবার মনে থাকবে না!
তুমি তো ভীষণ ভুলে যাও। এই যে সেদিন পল্টন আমার জলছবিগুলো কেড়ে নিল তুমি কিছু করলে না। কী ভাল সব জলছবি মাকে দিয়ে বাবাকে বলিয়ে কলকাতা থেকে আনিয়েছিলাম। বদলে ভিডিওগেমটা দেওয়ার কথা ছিল পল্টনের। দিল তা? তোমাকে কত করে বললাম, পল্টনের হাতটা যেন ভেঙে দিও ঠাকুর। বাঁ হাতটা ভাঙলেও হবে। শুনলে সে কথা?
বাঁ হাত বলেছিলি, না ডান হাত সেইটেই তো গুলিয়ে ফেললুম রে। তাই আর ভাঙা হয়নি বটে।
তাহলে আমার গায়ে আরও জোর দাও না কেন? একাই যাতে দশ জনকে ঠান্ডা করে দিতে পারি।
কেন, তোর জোর কি কম?
কম নয়, কিন্তু আর একটু হলে ভাল হয়। পল্টন আর গদাইকে খুব পেটাতে ইচ্ছে করে যে। দুটোই পাজি।
তুই পাজি নোস তো।
আমিও আছি একটু, তবে ওদের সঙ্গে পারি না।
ঝগড়া কাজিয়া কি ভাল? ভাব করে নে না।
তুমি কিন্তু কিচ্ছু পারো না শিবঠাকুর। জগু কী বলেছে জানো? ও নাকি মা কালীর কাছে যা চায় সব পায়। মা কালী নাকি তোমার চাইতে অনেক ভাল। সত্যি ঠাকুর?
আরে না না, কালী কি আমার মতো পারে?
আমিও তো তাই বললাম জগুকে। দুজনে একটু ঝগড়াও হল। পান্নাদি সেদিন বলছিল, সন্তোষী মা নাকি কালীর চেয়েও ভাল। সত্যি ঠাকুর?
ওরে, আমিই তোকে সব দেবোখন।
দিচ্ছ কোথায়? এরপর কিন্তু আমি ঠিক একদিন কালীভক্ত হয়ে যাব। তখন বুঝবে।
রাগ করিসনি বাপধন। আর ভুল হবে না।
হ্যাঁ ঠাকুর, তোমাকে যে বলেছিলাম পান্নাদির সঙ্গে আমার দাদার একটু ভাবসাব করে দাও, দিলে না তো!
দিইনি বুঝি! তা সে আর কী করা যাবে।
ওদিকে যে অর্ঘ্য ব্যানার্জির সঙ্গে পান্নাদির ভাব হয়ে গেল!
সে আবার কে রে?
পান্নাদির দাদার বন্ধু। দেখনি বুঝি? কী সুন্দর লম্বা পানা চেহারা কম্পিউটার ইনজিনিয়ার। এই তো বড়দিনের ছুটিতে এসে ঘুরে গেল। তারপর গেল হপ্তায় এসেছে। খবর আছে এ-হপ্তায়ও আসবে। খুব নাকি বড়লোকের ছেলে। তুমি কিন্তু কিচ্ছু পারো না ঠাকুর।
চোখ বুজেই মরণ টের পেল। শিবঠাকুর খসখস করে জটার নীচে মাথা চুলকে নিল। তারপর বলল, সব কি আর খেয়াল থাকে রে। চারদিকে কত কী হুটহাট হয়ে যায়।
ও ঠাকুর, তোমাকে উকুনে খাচ্ছে নাকি? মায়ের কাছে উকুনমারা তেল আছে, চুরি করে এনে দেব?
উকুনমারা তেলও আছে নাকি? দিস তো বাবা, কতকালের পুরনো জটা, উকুন তো হবেই।
পান্নাদির মুখখানা আজকাল খুব ঝলমল করে আর একটা লালচে আভাও দেখতে পায় মরণ। সেদিন জ্যাঠাইমার জন্য ডাব পাড়তে গাছে উঠেছিল মরণ। আজকাল গাছে ওঠা বারণ হয়েছে তার। বাবা হুকুম দিয়ে গেছে, এই বান্দর, গাছে উঠলে কিন্তু চ্যাঙ্গা-ব্যাঙ্গা কইরা ঠ্যাঙ্গামু। তবু চুরি করে কারও কারও কথায় এখনও গাছে-টাছে উঠতে হয় তাকে।
ডাব পেড়ে যখন নেমে এল তখন দেখল, পান্নাদির বাড়িতে খুব হই-চই। কারা সব এসেছে। বাইরের ঘরে হাসাহাসি হচ্ছে খুব।
উঁকি মেরে তখনই ছেলেটাকে দেখতে পেল মরণ। তার দাদাও সুন্দর বটে, কিন্তু এ আরও সুন্দর। কী লম্বা আর ফর্সা। আর মুখখানা অনেকটা ফিল্মস্টারের মতো। মরণ বেশি সিনেমা দেখেনি। টি ভিতে একটু আধটু। অন্যদের মতো সে ফিল্মস্টার বেশি চেনে না। তবে জানে ফিল্মস্টাররা খুব সুন্দর দেখতে হয়।
পরদিন সে পান্নাদিকে জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ, পান্নাদি, এই লোকটা কে এসেছিল তোমাদের বাড়িতে? সুন্দরপানা, লম্বা?
পান্নাদির মুখটা রাঙা হয়ে গেল হঠাৎ। মুখে টেপা একটু হাসি।
ও দাদার বন্ধু। অর্ঘ ব্যানার্জি।
ফিল্মস্টারের মতো দেখতে, না?
আছে একরকম।
আগে ওসব বুঝতে পারত না মরণ। আজকাল পারে।
আর বুঝতে পারে বলে তার মোটেই ভাল লাগে না। কেমন যেন মন খারাপ হয়ে যায়। তার এত বুঝতে পারার দরকারই ছিল না।
পান্না বলল, তোর খুব উঁকিঝুঁকি দেওয়ার অভ্যাস, না? একদিন তোর মাকে বলে দেব।
বাঃ, উঁকিঝুঁকি হল বুঝি? আমি জ্যাঠাইমার জন্য ডাব পেড়ে আনলাম না? তখন দেখলাম তো!
পান্না হাসছিল, খুব সুন্দর লাগল বুঝি তোর?
খুব। তোমার লাগেনি?
মুখটা একটু বেঁকিয়ে তাচ্ছিল্যের ভাব করে পান্না বলল, দেখতে খারাপ নয়। তবে বড্ড নিজের গল্প করে। অহংকার, বুঝলি?
না, ওসব বুঝতে পারে না মরণ। এখনও সব আবছায়া পরিষ্কার হয়ে যায়নি তার কাছে। তবে ধীরে ধীরে প্রাপ্তবয়স্কদের জগতের পর্দা একটু একটু করে খুলে যাচ্ছে। আর যন্ত্রণা হচ্ছে তার। ভাল লাগছে না।
আজকাল সে কমবয়সি মেয়েদের দিকে তাকায়। তার নানারকম অদ্ভুত ইচ্ছে হয়। কেন এসব হয়? কেন এসব হতেই হয়?
জগুও সেদিন বলছিল, অনেক ব্যাপার আছে, বুঝলি?
কী ব্যাপার?
জগু হেসে বলে, একে একে দুই। মানে জানিস?
জানে, না জেনেও মরণ জেনে গেছে। এসব কথার মধ্যে যে একটা আমিষ গন্ধ পায়। তবে তার দুনিয়া যে পালটে যাচ্ছে, এটা খুব সত্যি কথা। শরীরে অনভিপ্রেত উত্তেজনা, মনের মধ্যে আনচান।
জগু কিছু অসভ্য কথা শুনিয়েছিল তাকে। শুনে তার কান গরম হয়ে গিয়েছিল। আবার খারাপও লাগছিল না।
বিজুদার দোতলার ঘরের ঘুলঘুলিতে আর আলমারির মাথায় চড়াইপাখি বাসা বেঁধেছে। সেখান থেকে একটা চড়াই-বাচ্চা পড়ে গেছে মেঝেয়। সেটা এখনও উড়তে শেখেনি। ও-বাড়িতে ভয়ংকর সব বেড়ালের উৎপাত।
বিজুদা তাকে ডেকে একদিন বলল, হ্যাঁ রে, একটা ব্যবস্থা করতে পারিস? তুই তো আগে খুব পাখির বাচ্চা চুরি করতি গাছে উঠে। এই বাচ্চাটাকে সাবধানে বাসায় তুলে দিতে পারবি না?
খুব পারবে মরণ। চড়াই বাচ্চা তুলতে গিয়েছিল বিকেলবেলা। রবিবার ছিল, মনে আছে। গিয়ে দেখে সোহাগদি আর বিজুদা কম্পিউটারের সামনে জোড়া লেগে বসা। দুজনেরই চোখ পর্দায় ধ্যানস্থ। তাকে দেখে কেউ চমকাল না। বিজুদা শুধু বলল, ছাদে ফোল্ডিং মইটা আছে। নিয়ে আয়। পাখির ছানাটা বোধহয় খাটের তলায় ঢুকেছে।
পাখির ছানাকে তার বাসায় স্থাপন করতে যেটুকু সময় লাগল তার, দেখল, দুজনে কেউ কারও সঙ্গে কথা বলছে না। কিছু করছেও না। মনিটরের পর্দায় চোখ রেখে বসে আছে। সেখানে কীসব লেখা আর ছবি-ছক্কর ফুটে উঠছে।
রায়বাড়ির জ্যাঠাইমা ডেকে সেদিন তাকে দুটো গন্ধলেবু আর একটা বাতাবি দিল। গন্ধলেবু মরণের বাবা খুব ভালবাসে। বাতাবিটা কেউ খাবে না। এ-বাড়ির বাতাবি জোঁদো টক। আগে টক-মিষ্টির তফাত ছিল না মরণের কাছে। আজকাল হয়েছে।
জ্যাঠাইমা গলা নামিয়ে জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ রে, ওদের একসঙ্গে দেখতে পাস?
কাদের?
সোহাগ আর বিজু! গাঁয়ে তো ঢি ঢি পড়ে গেছে। পাস না?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন