শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
ওইখানে ওই কদমগাছের তলায় শিব এসে দাঁড়ান। বেশ পেল্লায় চেহারা, একটু ভুঁড়ি আছে, বেশ বড় জটা, গোঁফ আছে, দাড়ি নেই। কাঁধ আর মাথার ওপর তিনটে সাপ ফোঁস ফোঁস করছে ফণা তুলে। বাঁ হাতে কমণ্ডলু, ডান হাতে ত্রিশূল, পরনে শুধু বাঘছাল। পিছনে ষাঁড়। শিবঠাকুর তাকে ডেকে বলেন, বৎস, তুমি তিনটে বর চাও।
মরণের এইখানেই মুশকিলটা হয়। তার এত কিছু চাওয়ার আছে যে তিনটে বরে তার সিকিভাগও হয় না। কিন্তু ঠাকুর-দেবতাদের নিয়মই হল, তিনটের বেশি বর দেন না, তাই মরণ খুব হিসেবনিকেশ করে রোজ। এমন তিনটে বর চাইতে হবে যে, আর কিছু চাওয়ার না থাকে। খুব কায়দা করে, বুদ্ধি খাটিয়ে তিনটে বর তৈরি রাখতে হবে। শিবঠাকুর একটু ভেলেভালা আদমি। কৌশল করে যদি একটা বরের মধ্যেই তিন-চারটে বর ঢুকিয়ে দেওয়া যায় তাহলেও হয়তো খেয়াল করবে না। এই নিয়ে তার গ্যাঁড়ার সঙ্গে কথাও হয়েছে। গ্যাঁড়ার অবশ্য বর নিয়ে তেমন কোনও সমস্যা নেই। সে শুধু চায় অমিতাভ বচ্চনের মতো লম্বা হবে, কুংফু ক্যারাটের ওস্তাদ হবে আর বড় হয়ে আমেরিকায় যাবে। ব্যস, ওতেই তার তিনটে বর ফুস।
কিন্তু মরণের সমস্যা অত সরল নয়, প্রথমে সে ভেবেছিল, শিবঠাকুরের কাছে রসিক বাঙালের বদলে একজন ভাল বাবা চেয়ে নেবে। কিন্তু পরে ভেবে দেখেছে, তার মা রসিক বাঙাল বাবাকে এতই ভালবাসে যে, বাবা বদলালে মা কেঁদেই মরে যাবে। তার চেয়ে বরং রসিক বাঙালই তার বাবা থাক, শুধু মেজাজটা অমন তিরিক্ষি না হয়ে যেন একটু নরম-সরম হয়, আর তাকে যেন ন্যাংটো করে চান না করায়, আর যেন ন্যাড়া করে না দেয়। দুনম্বর হল, কলকাতার বড়মা আর দাদা-দিদিরা যেন বেশ ভাল লোক হয় আর তারা যেন তাকে খুব ভালবাসে। মরণের মাঝে মাঝে মনে হয়, বোনটা হওয়ার পর থেকে তার মা যেন তাকে আর ততটা ডাক-খোঁজ করে না। তার ধারণা, এক মায়ের জায়গায় দুটো মা হলে আদর-টাদর ডবল হয়ে যাবে। সুতরাং তার দু নম্বর বর হল, বড়মা আর দাদা-দিদিরা যেন এখানে এসেই থাকে। তিন নম্বর বরটা নিয়ে সে খুব ভাবছে। ভেবে কোনও কূলকিনারা করে উঠতে পারছে না।
সকাল থেকে জিজিবুড়ি বারবার টানা মারছে। মুখ শুকনো। চোখ কপালে উঠেছে, সাতসকালে এসে ধপাস করে বারান্দায় বসে পড়ে খানিক হাঁফ ছেড়ে বলল, ওরে ও বাসি, কাল রাত থেকে বাড়িতে যে সুন্দ-উপসুন্দের লড়াই হচ্ছে। তিষ্ঠোতে দিচ্ছে না যে।
মরণের মা দোতলার বারান্দা থেকে ঝুঁকে বলল, আহা, ভারী নতুন বৃত্তান্ত কিনা। ও তো নিত্যি হচ্ছে।
জিজিবুড়ি কাহিল গলায় বলে, এ তা নয় মা, এবার একটা খুনোখুনি না হয়ে যায়। সারা রাত কুরুক্ষেত্তর হল, সকালেও হচ্ছে। পাড়াসুন্ধু সবাই ঝেটিয়ে এসে মজা দেখছে। এই রঙ্গে লোক।
ছেলেদের যেমন শিক্ষা দিয়েছ তেমনই তো হবে। আমার ধান চাল কম হরির লুট করেছে? ধার বলে টাকা নিয়ে যায়, একটা পয়সা আজ অবধি শোধ করেনি, মায়ের পেটের ভাই বলতে লজ্জা করে।
ওঃ, খুব যে ফোঁটা কেটে বমি হয়েছিস আজ। তুইও তো একই ঝাড়ের বাঁশ। বাঙালের টাকায় দুদিন ধরে না হয় ফুটুনি করছিস, তা বলে নিজের জনদের দিকে চাইবি না? এই কি ধর্মের বিচার?
আমাকে আর ধর্ম দেখিও না মা, তোমার গুণধর ছেলেরা আমার সর্বনাশ করে পথে বসাতে চেয়েছিল, তখন তোমার ধর্ম কি পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছিল নাকি? এখন যেই অশান্তি লেগেছে অমনি নাকি-কান্না কাঁদতে এসেছ! ধর্ম এখনও আছে বলেই দু ভাইয়ে খুনোখুনি হচ্ছে। আরও হোক, সত্যনারায়ণের সিন্নি দেব।
বলতে পারলি ও কথা? অভাবের সংসার বলে ঝগড়া হয়, তা কোথায় না হচ্ছে শুনি? তা বলে নিজের ভাইদের শাপশাপান্ত করবি? এতে কি তোরই ভাল হবে ভেবেছিস?
খবরদার মা, শাপশাপান্ত করবে না বলে দিচ্ছি! সেবারও খুঁড়েছিলে বলে ছেলেটার একশো চার-পাঁচ জ্বর উঠেছিল, তোমার মুখে বিষ আছে, শাপশাপান্ত করলে এ-বাড়িতে ঢোকার দরজা বন্ধ হয়ে যাবে।
জিজিবুড়ির গুণ হল টক করে ভোল পালটাতে পারে। হঠাৎ ভারী নরম হয়ে বলল, ওমা! খুঁড়লুম কোথায়? বলছিলুম যে, মেয়েদের বাপের বাড়ির ওপর কত টান থাকে, তুই যে কেন ওদের ওরকম বিষনজরে দেখিস!
জিজিবুড়ি কিছুক্ষণ বারান্দার থামে মাথা হেলিয়ে বসে রইল। তারপর বলল, তোকে তো ও-বাড়িতে যেতে বলিনি। বলছিলুম, দু ভাইয়ের একটা ব্যবস্থা করে দে। বাঙালকে বল না তার দোকানে কর্মচারী করে নিক।
আর বাঁধানো কথা বোলো না তো মা। তোমার ছেলেরা সেই চরিত্রের মানুষ কিনা! দোকানের টাকা ভেঙে জুয়ো খেলবে, মদ-গাঁজা খাবে, গুণের তো শেষ নেই।
জিজিবুড়ির সঙ্গে সবসময়ে পানের বাটা থাকবেই। এসব কথার পর পান সাজতে সাজতে বলল, বাঙালের ঘর করে করে তোরও মায়া-দয়া সব উবে গেছে। বাঙাল এলে এবার না হয় আমিই তাকে বলব, দু-দুটো হুমদো হুমদো সম্বন্ধী বেকার বসে আছে বাপু, দোষঘাট থাকতে পারে, কুটুম তো, তাদের কথাও একটু ভেব বাপু। না হয় বাসরাস্তায় দুখানা মুদির দোকান করে বসিয়ে দাও।
আহা, একেবারে গিল্টি করা কথা। দোকান করে বসিয়ে দাও। তোমার ভীমরতি হলেও তার তো হয়নি। সম্বন্ধীদের সে খুব চেনে। তুমিই চিনলে না কী ছেলে পেটে ধরেছ!
ভীমরতি কি তোকেও ধরতে বাকি রেখেছে? ক বিঘে জমি আর একটা পাকা বাড়ি পেয়ে আহ্লাদে ডগমগ হয়ে আছিস। বাঙালের যে লাখো লাখো টাকা কারবারে খাটছে তার কাছে এ তো চুষিকাঠি। দেবে ভেবেছিস তোকে সে টাকার ন্যায্য ভাগ? সব ওই বড়বউয়ের গর্ভে যাচ্ছে। বাঙাল চোখ বুজলে উকিল লাগিয়ে আইনের প্যাঁচে তোর সম্পত্তিও এক ঝটকায় নিয়ে নেবে। তাই বলছি, এখনও সময় আছে, সব বুঝে-সুঝে নে। দুটো দোকান না হয় তোর নামেই করে দেবে, ভাইরা খেটেখুটে দোকান চালিয়ে তোর ন্যায্য পাওনা-গণ্ডা মাসকাবারে মিটিয়ে দেবে।
সাধে কি বলে যে, তোমার মুখে বিষ! এর মধ্যে আমার স্বামীর মরণের ভাবনাও ভেবে ফেলেছ! তোমার আর কবে আক্কেল হবে মা? জামাইয়ের বাড়বাড়ন্ত দেখে তোমার চোখ টাটায় কেন? মেয়ে সুখে আছে সেও তোমার সহ্য হয় না। তুমি কেমনধারা মানুষ?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে জিজিবুড়ি উঠে পড়ল। বলল, জামাইয়ের বাড়বাড়ন্ত দেখেই তো বলছি, বেশি বাড়ও তো ভাল নয়। তোর ভাল ভেবেই বলছি, টাকাপয়সা নগদ যা পারিস বেঁকে নে। বাসরাস্তায় দুখানা দোকানঘর বন্দোবস্তে আছে শুনেছি। দশ বিশ হাজারে হয়ে যাবে।
তুমি এখন যাও তো, আমার মাথাটা আর খারাপ করে দিও না।
জিজিবুড়ি গেল, পড়া ফেলে দিব্যি জানালা দিয়ে দৃশ্যটা দেখে খুব হাসছিল মরণ। আজ মায়ের হাতের রান্না খুলবে। রেগে গেলে মা দারুণ রাঁধে।
জিজিবুড়ি আর দুবার এল, শেষবার দশটা নাগাদ। এসে বলল, ও বাসি, কাল রাত থেকে দানাপানি জোটেনি মা, ছোটবউ খানকির মেয়ে ওই নয়নটা এমন ধাক্কা দিয়েছে যে কাঁকলে বড্ড ব্যথা, আজ তোর এখানে দুটো ভাতে ভাত করে দিবি? এক ফোঁটা ঘি দিয়ে—
আজ সুবিধে হবে না মা, আজ তোমার জামাই আসছে।
মোলো যা, আজ আবার বাঙাল আসছে কেন?
তাতে কি তোমার গতরে শুঁয়োপোকা ধবল? তার বাড়িতে সে আসবে, তাতে কথা কীসের?
তাই কি বললুম, বলছি, আজ তো আর শনিবার নয়, কাজকারবার ফেলে আসছে তো!
তার বিশ্বাসী কর্মচারী আছে, তোমার অত মাথাব্যথা কীসের?
ঘরে যে যেতে পারছি না মা, ধুন্ধুমার কাণ্ড দেখে এসেছি একটু আগে। শোনা যাচ্ছে থানা-পুলিশেও খবর গেছে। তারা এল বলে! কী যে হবে কে জানে বাবা।
কী আবার হবে, নতুন বৃত্তান্ত তো নয়। থানা-পুলিশ তো আগেও হয়েছে। চাটুজ্যেদের গোক নিয়ে হাটে বেচে দিয়ে তোমার বড় ছেলে হাজতে গিয়েছিল মনে আছে?
মনে আছে বাবা, সব মনে আছে। কপালের দোষ মা, ও কি খণ্ডায়?
দুধ চিঁড়ে দিয়ে ফলার করতে পার। ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।
মুখটা বিকৃত করে জিজিবুড়ি বলে, ম্যাগো, পেটে এখন ভাতের খিদে, দুধ চিঁড়ে কি গলা দিয়ে নামে বাছা!
ঠিক আছে। মরণের ঘরে গিয়ে বসে থাক, ভাতের কথা বলেছ, গেরস্থের ঘর বলে কথা, খেও খন দুপুর বেলায়।
তবে দুটো পোত্তর বড়া করিস আর একটু টক, টক ছাড়া মুখে রোচে না।
মরণের আজ দুঃখের কপাল, বাবা আসছে, বাবা আসা মানেই যমদূতের আগমন, আজ সকাল থেকেই মা পড়তে বসিয়ে দিয়েছে। পড়ছে তো লবডঙ্কা, কিন্তু পড়ার টেবিলে বই-খাতা মুখে করে এই বসে থাকাও এক যম-যন্ত্রণা। বাইরে খোলা মাঠঘাট আয়-আয় করে ডাকছে। স্কুলটা খোলা থাকলেও হয় হত। কিন্তু কপাল খারাপ, স্কুলের এক প্রাক্তন হেডমাস্টার মারা যাওয়ায় স্কুলও আজ ছুটি।
হ্যাঁ লা বাসি, তোর ঘরে কি পান আছে?
মা দোতলা থেকেই বলল, না মা, আমরা কেউ পান খাই নাকি যে থাকবে?
তবে যে মুশকিল হল। আমার পান ফুরিয়েছে, পান ছাড়া আমার এক দণ্ড চলে না। ও ভাই মরণ, দিবি এনে একটু পান?
মরণ আনন্দে লাফিয়ে উঠল, এক লাফে উঠোনে নেমে বলল, পয়সা দাও এনে দিচ্ছি।
ওপর থেকে মা ধমক দিয়ে বলে, ওকে বলছ কেন মা? ওর বাবা টের পেলে রাগ করবে। ওই মুনিশ-টুনিশ কেউ এলে এনে দেবে খন।
মরণ ঊর্ধ্বমুখ হয়ে করুণ গলায় বলে, আমার পড়া হয়ে গেছে মা, এক ছুটে যাব আর আসব।
তোর বাবা এসে যদি দেখে —
বাঃ, তা বলে সারা দিন পড়ব নাকি? সকাল থেকে তো পড়ছি।
ওঃ, কী রকম পড়া তা খুব জানা আছে। বই খুলে বসে থাকলেই বুঝি পড়া হয়?
যাই না মা।
বাসন্তী আর আপত্তি করল না, বলল, যাবে যাও, দয়া করে তাড়াতাড়ি ফিরো।
পয়সা নিয়ে মরণ দুই লাফে বেরিয়ে পড়ল। ছুটি! ছুটি!
অবারিত মাঠ-ঘাট, আলো-হাওয়ায় এসে বুকটা হাঃ হাঃ করে হেসে ওঠে তার। ছুট! ছুট! হালকা পায়ে খানিকক্ষণ দৌড়ে নেয়, কদমতলায় দুর্গাপূজার প্যান্ডেল হচ্ছে। দাঁড়িয়ে একটু দেখে নেয় সে। দক্ষিণপাড়ায় ফুটবল ম্যাচ। তাও একটু দেখে, তারপর হাটতে থাকে। পান্নাদির বাড়ি থেকে ঘুঙুরের আওয়াজ আসছে। ঘোষ জ্যাঠাইমার বাড়ি থেকে গুড় আর নারকেল পাক দেওয়ার মিঠে গন্ধ। আর রায়বাড়ির বারান্দায় আজও সেই মেয়েটা দাঁড়িয়ে আছে, যাকে দেখলে ঠিক মনে হয় এক রাজপুত্তুর এসে ওকে উদ্ধার করে নিয়ে যাবে বলে অপেক্ষা করে আছে। চাটুজ্যে বাড়ি থেকে খুব হাসিখুশির একটা শব্দ আসছে। খোলা উঠোনে কানামাছি খেলছে একদঙ্গল হুমদো হুমদো মেয়ে-পুরুষ, মাঝখানে ওটা পারুলমাসি না? হ্যাঁ, পারুলমাসিই। রুমালে চোখ বাঁধা পারুলমাসি হাসতে হাসতে টলোমলো পায়ে দু হাত সামনে বাড়িয়ে কাউকে ছোঁয়ার চেষ্টা করছে। মাঝে মাঝে এরকম জমায়েত হয়, আবার সব সুনসান হয়ে যায়। দাদু আর দিদা একা পড়ে থাকত, দাদু ওই একতলার বড় দালানের বারান্দায় ইজিচেয়ারে বসে থাকত সকালের দিকটায়, তাকে দেখলেই ডাক দিত, এই বাঙাল আয় তো দেখি তোর লেজ আছে কিনা। গৌরহরি দাদু বাবাকে বড় ভালবাসত। বলত, বাঙালটার রসকষ কম বটে, কিন্তু লোকটা জব্বর খাঁটি, আর এখন দিদা একদম একা, মরণ মাঝে মাঝে হাজির হয়ে যায় এসে। দিদার নারকেল বা সুপুরি পেড়ে দেয়, গোয়ালঘরের চাল থেকে চালকুমড়ো। দিদা প্রায়ই রাগ করে বলে, তুই তো বড়লোকের ছেলে, তবে কেন চেহারাটা অমন চাষাভুসোর মতো করে রেখেছিস? ভাল জামাকাপড় নেই তোর? দাঁড়া তোর বাবা আসুক, বলব।
কানামাছি খেলায় কাউকে ছুঁতে পারল না পারুলমাসি। একটা টু দিয়ে পালাচ্ছিল বিজুদা, ছুঁতে গিয়ে দক্ষিণের দালানের বারান্দায় উপুড় হয়ে পড়ে গিয়ে হেসে উঠল। কাকে কী ডাকবে তার বেলায় সম্পর্কে ঠিক রাখতে পারে না মরণ। গৌরহরিদাদুর ছোট ভাই রামহরিকে সে ডাকে জ্যাঠামশাই। আবার পারুলমাসির খুড়তুতো বোন পান্নাদিকে তো দিদিই ডাকে সে। মা অবশ্য বলেছে, ওদের সঙ্গে তো আর আত্মীয়তা নেই, যা খুশি ডাকতে পারিস।
বাসরাস্তার কাছে এসে খানিক দাঁড়িয়ে লোজন দেখল মরণ, বেশ লাগে তার। বেঁটে, লম্বা, সরু, মোটা, কালো, ফর্সা কত রকমের যে লোক আছে দুনিয়ায়। কোথা থেকে যে আসে আর কোথায় যায়।
গাঁ গাঁ করে বর্ধমানের একটা বাস এসে ধুলো উড়িয়ে থামল। লোক নামছে। বাবা নামে কিনা তা সতর্ক চোখে দেখছিল মরণ। না, বাবা নামল না। তবে সবার শেষে যে নামল তাকে সে খুব চেনে। তার স্কুল থেকেই অমলদা মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করেছিল। সারা গ্রামে নাকি হুলস্থুল পড়ে গিয়েছিল সেই ঘটনায়। স্ট্যান্ড করা ছেলে দেখলে কি বোঝা যায়? মরণ তো কিছু বুঝতে পারে না। লোকটা কেমন টালুমালু চোখে চারদিকে চাইল, যেন জায়গাটা চিনতে পারছে না। ডান হাতের ভারী অ্যাটাচি কেসটা টানতে লোকটার যেন কষ্ট হচ্ছে। মাথায় বড় বড় চুল, এলমেলো হয়ে কপালে ঝুলে আছে। মুখটায় রাজ্যের দুশ্চিন্তা যেন। মরণের একবার ইচ্ছে হল, গিয়ে বলে, দিন আপনার অ্যাটাচি’ কেসটা পৌঁছে দিয়ে আসি। কিন্তু কেমন যেন সাহস হল না।
দীনু সিংহের এস টি ডি বুথের পাশে দাঁড়িয়ে খানিকক্ষণ লোকের টেলিফোন করা দেখল সে, মাঝে মাঝে তার খুব ইচ্ছে হয় এখান থেকে বড়মার সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলে। কিন্তু সাহসে কুলোয় না। বড়মা তাকে চিনতেই পারবে না।
আর একটা বাস এসে ওই দাঁড়াল। লোক নামছে। আর হঠাৎ সে ভিড়ের মধ্যে এক মাথা উঁচু তার বাবা বাঙালকে দেখতে পেল।
পাঁই পাঁই করে ছুটতে লাগল মরণ, হঠাৎ খেয়াল হল, এই যা, পান কেনা হয়নি যে!
পান কিনতে বাজারের নাবালে নেমে গিয়ে সে একটু আড়াল হয়ে দেখতে গিয়ে দেখল, বাবা একা নয়, সঙ্গে একটা সুন্দরমতো ছেলে, আঠারো-উনিশ বছর বয়স হবে। হাতে স্যুটকেস। ছেলেটার মুখ খুব গম্ভীর।
পানটা কিনেই ফের ছুট লাগাল মরণ। বাড়িতে ঢুকেই অভ্যাসবশে চেঁচাল, ও মা, বাঙাল এসেছে, সঙ্গে বোধহয় দাদা!
দোতলার রেলিং-এর ওপর ঝুঁকে বাসন্তী বলল, সঙ্গে কে বললি?
মনে হচ্ছে দাদা, বেশ লম্বাপানা, সুন্দর দেখতে।
ও মা গো! এখন কী হবে!
কী হবে মা?
কী জানি কী হবে বাবা! বড্ড ভয় করছে। শহুরে ছেলে। ঘরদোর তো গোছগাছও করা নেই, ও মরণ, তোর দিদিমাকে বল যেন এ সময়ে ঘর থেকে না বেরোয়।
আমি কি ফের পড়তে বসব মা?
আর পড়ার দরকার নেই বাবা, বরং ওপরে এসে ফর্সা জামা-প্যান্ট পরে যা, ফিটফাট না দেখলে কী মনে করবে।
একটু বাদে উঠোনের ওপর যে দৃশ্যটা দেখা গেল সেটা যেন যাত্রা- থিয়েটারের একটা সিন। মাকে কোনওদিন সাজতেগুজতে দেখে না মরণ। এমনকী যেদিন বাবা আসে সেদিনও না। কিন্তু মা আজ। পাটভাঙা একটা ঢাকাই শাড়ি পরেছে, চুল আঁচড়ানো, মাথায় ঘোমটা, কপালে টিপ, তাড়াহুড়োয় যতটা করা যায়। মায়ের পাশে ইস্তিরি করা নীল জামা আর খাকি হাফ প্যান্ট পরা মরণ। তারও চুল আঁচড়ানো, পায়ে আবার হাওয়াই চটি—যা সে কস্মিনকালেও পরে না। তিন পা পিছনে বোনটাকে কোলে নিয়ে মুক্তাদি দাঁড়িয়ে। সব কেমন অ্যাটেনশন হয়ে আছে। মায়ের মুখটা দেখে মায়া হচ্ছে মরণের, কেমন কান্না কান্না ভাব, অথচ ঠোঁটে আবার একটু হাসিও। মা ভীষণ ঘাবড়ে গেছে, বারবার ঢোঁক গিলছে।
ও মুক্তা, সব ঠিক আছে তো, উঠোনটা ভাল করে দেখেছিস? কোথাও গোবর-টোবর বা কুকুরের গু পড়ে নেই তো?
না বউদি, সব দেখেছি।
একটু আগে জিজিবুড়ি মরণের ঘর থেকে জানালা দিয়ে উঁকি মেরে দেখে বলেছিল, আদিখ্যেতা দেখে মরে যাই, যেন বড়লাট আসছেন!
মা যেন উঁকিঝুঁকি না দেয়, বলেছিস?
হ্যাঁ, কিন্তু এঃ মা, তুমি যে দু পায়ে দু রঙের চটি পরে আছ।
বাসন্তী নিজের পায়ের দিকে চেয়ে জিব কেটে কাঁদো কাঁদো গলায় বলল, এমা কী হবে?
মুক্তা বলল, দাও তো, কচুগাছের আড়ালে রেখে দিয়ে আসি।
খালি পায়ে থাকব, কেমন দেখাবে?
এর চেয়ে তো ভাল।
মরণ ফিক করে হেসে ফেলেছিল। বাসন্তী তার দিকে চেয়ে ধমকে বলল, ওরকম হাসতে নেই, দাদা উঠোনে এসে দাঁড়ালে গিয়ে পেন্নাম করিস, বাবাকেও, মনে থাকে যেন!
মরণ জানে, এসব তাকে একটু আগেই শিখিয়েছে মা।
হ্যাঁ রে ভুল দেখিসনি তো! আসতে দেরি হচ্ছে কেন?
বাবা তো মাঝে মাঝে কেনাকাটা করতে বাজারে ঢোকে।
যত দেরি হচ্ছে তত আমার বুক কাঁপছে বাবা। ও মুক্তা, মেয়েটা কাজলের টিপটা জেবড়ে ফেলেনি তো!
না বউদি, কাঁধে মাথা রেখেছে, ঘুমোবে মনে হয়।
একটু জাগিয়ে রাখ, ওর বাবা আবার এসে মেয়েকে জাগা না দেখলে খুশি হয় না। আর হাঁক দিয়ে মুনিশটাকে বল তো, এ সময়ে যেন হুট করে গোরু-ছাগল না ঢুকে পড়ে উঠোনে।
জানালা দিয়ে জিজিবুড়ির গলা পাওয়া গেল, গাঁয়ে তো গোরু-ছাগলই থাকে রে বাপু, আর সেসব দেখতেই তো বাবু ভায়েরা আসে।
ফের ফিক করে হেসে ফেলল মরণ, ইস্তিরি করা জামায় তার গরম লাগছে। এমন কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকারও অভ্যাস নেই তার। কেবল মনে হচ্ছে তারা একটা থিয়েটারের পার্ট করতে নেমেছে।
একটু চুপ করবে মা? মুখে আঁচল ঢুকিয়ে বসে থাকো তো, যখন তখন ফুট কেটো না, আমার বলে বুক কাঁপছে আর উনি কুট কুট করে কথা ফোটাচ্ছেন, ও নবীনা তোর হল?
দোতলার বারান্দায় বেরিয়ে এসে নবীনা বলল, হ্যাঁ গো বউদি, ফুলদানিতে ফুল সাজিয়েছি, ছোট কার্পেটটাও পেতে দিয়েছি।
বেডকভারটা টানটান করে পেতেছিস তো!
হ্যাঁ গো, ধূপকাঠিও জ্বালিয়ে দিয়েছি।
বারান্দার কাপড় মেলার দড়িগুলো খুলে ফেল, বিচ্ছিরি দেখাচ্ছে।
মরণেরও একটু বুক কাঁপছে, তেষ্টা পাচ্ছে। সে জানে তাদের পরিবারটা আর পাঁচ জনের মতো নয়। কলকাতা আর পল্লীগ্রাম ভাগ হয়ে যাওয়া একটা ব্যাপার আছে তাদের। একবার ক্লাসে একটা ছেলের সঙ্গে তার ঝগড়া হয়েছিল। ছেলেটা ঝগড়ার সময়ে বলে ফেলেছিল, যা যা, বেশি কথা বলিস না, তোর বাবার তো দুটো বউ।
বাড়িতে এসে সে মাকে জিজ্ঞেস করেছিল, দুটো বউ থাকা কি খারাপ মা?
মা বলেছিল, খারাপ কেন বাবা? যার সাধ্য আছে সে দুটো-তিনটে বিয়ে করতেই পারে। আগে তো আরও কত বিয়ে করত লোকে।
তবে যে ওরা বলে!
বলে বলুক। ওদিকে কান দিও না, বাবার ওপর যেন অশ্রদ্ধা না আসে। তোমার বাবা ভাল লোক।
সে তো জানি। কিন্তু লোকে বলে যে, আইন নেই নাকি!
আইন কি মানুষের জীবনের সঙ্গে সবসময়ে মেলে? দরকার পড়লে মানুষকে কত বে-আইনি কাজ করতে হয়। আমি না থাকলে তোমার বাবার এত বিষয়সম্পত্তি কে যক্ষীর মতো আগলাত বলো তো! লোকের কথায় কান দিও না, বড় হলে নিজেই বুঝতে পারবে সব কিছু।
বাবার দুই বিয়ের কথা আজকাল খুব ভাবে মরণ। মনে হয় তার বাবার দুটো ভাগ। একটা শহরে লোক আর একটা পেঁয়ো লোক। ওই বড়মা, দাদা, দিদি ওরা একটু ওপরতলার লোক। সে তার মা, বোন এরা সব একটু নিচুতলার লোক। তাই তার বুক কাঁপছে, তেষ্টা পাচ্ছে।
উঁচু মাথার লোকটাকে শেফালি ঝোপের ওপর দিয়ে এক ঝলক দেখা গেল।
মরণ চাপা গলায় বলল, ওই আসছে!
সঙ্গে ছেলে আছে ঠিক দেখেছিলি তো!
সেরকমই তো মনে হল।
আগে জানলে একটু আয়োজন করে রাখতাম। কী খেতে ভালবাসে তাই তো ভাল করে জানি না।
মায়ের যে কত উদ্বেগ! ভয়ে ভাবনায় কাঁটা হয়ে আছে। মরণের একটু কষ্ট হয় মায়ের জন্য।
কই গো! আরে দ্যাখো কারে আনছি! বলতে বলতে রসিক বাঙাল আগর ঠেলে উঠোনে ঢুকল। হাতে একটা মস্ত ইলিশ মাছ। সামনেই তাদের এমন নাটুকে ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে থমকেও গেল। পিছনে লম্বাপানা, ফর্সা, ছিপছিপে সুন্দর ছেলেটা, মরণ জানে তার দাদা সুমন উচ্চ মাধ্যমিকে স্টার পেয়ে পাস করেছে। ডাক্তারি পড়বে বলে জয়েন্ট এন্ট্রান্স পরীক্ষাও দিয়েছিল। পাসও করেছে হয়তো। সে মুগ্ধ স্বপ্নাচ্ছন্ন চোখে চেয়ে রইল।
মা হাসি-কান্না মেশানো মুখে বলল, এই বুঝি—?
আরে হ, এই হইল সুমন। হারু বইল্যাই ডাইক্যো, আয় রে হারু, এই হইল গিয়া তর ছোটমা। আরে, বান্দরটা দেখি আইজ সাইজ্যা গুইজ্যা খাড়াইয়া আছে!
মরণ গিয়ে টপাটপ প্রণাম সেরে ফেলল।
দাদা মাকে পা ছুঁয়ে প্রণাম করতে যাচ্ছিল, মা প্রায় সাপ দেখার মতো চমকে গিয়ে পিছিয়ে তার হাত ধরে ফেলে বলল, না না, ছিঃ ছিঃ আমাকে প্রণাম করতে হবে না বাবা, এসো, কতকাল পথ চেয়ে আছি তোমাদের জন্য। আমি এক অভাগী মা।
এসব কথা মা বোধহয় আগে থেকে তৈরি করে রেখেছিল মনে মনে। ‘অভাগী মা’ কথাটা ঠিক খাটল না যেন, ঘাবড়ে গিয়ে মা নাটকের ডায়লগ দিচ্ছে।
তবে হ্যাঁ, দাদাটাকে খুব পছন্দ হল মরণের। হালকা নীল জিনসের প্যান্ট আর খুব কারুকাজ করা লম্বা ঝুলের পাঞ্জাবিতে খুব টং দেখাচ্ছে। নরম পাতলা গোঁফ আছে, অল্পস্বল্প দাড়িও। মাথায় বেশ ঢেউ খেলানো লম্বা চুল, ডান ধারে সিঁথি, কাঁধে একটা ব্যাগ।
ও মরণ দাদাকে দাদার ঘরে নিয়ে যা বাবা।
সুমন ওরফে হারু চারদিকটা চেয়ে দেখছিল। তার দিকে ফিরে বলল, তুমি মরণ?
মরণ কৃতার্থ হয়ে গেল। ঘাড় হেলিয়ে বলল, হ্যাঁ।
আর বোনটা?
মা বলল, ওই তো মুক্তার কোলে। ঘুমিয়ে পড়ল বোধহয়। যাও বাবা, তুমি ঘরে গিয়ে একটু বিশ্রাম করো। জামাকাপড় পালটাও, চা খাবে তো!
না, আমি চা খাই না।
কী খাবে এখন বলল তো! ময়দা মাখা রয়েছে, একটু লুচি-টুচি ভেজে দেব?
না। খেয়ে এসেছি। একেবারে দুপুরে খাব।
গলার স্বরটা বড্ড ভাল দাদার। বেশ গমগমে। একটু লাজুক আছে। চোখ তুলে চাইছে না বেশি।
জড়তা, আড়ষ্টতা, লজ্জা অনেক কিছু মিশে আছে দু পক্ষের সম্বন্ধের মধ্যে।
হাত বাড়িয়ে মাছটা মার হাতে দিয়ে বাবা বলল, ভাপা কইরো তো, প্যাটে ডিম থাকলে ভাইজ্যা দিও।
এখন খাওয়া-দাওয়া নিয়ে মাতে আর বাবাতে কিছুক্ষণ কথা হবে। বাঙালরা খুব খাওয়া নিয়ে কথা কইতে ভালবাসে।
তার পিছু পিছু দাদা উঠে এল ওপরে। দক্ষিণ পশ্চিমের বড় ঘরখানায় ভুরভুর করছে চন্দন ধুপকাঠির গন্ধ। খোলা জানালা দিয়ে আলো-হাওয়া আসছে। এক ধারে বড় খাটের ওপর বিছানা। নতুন একটা ফুলকারি বেডকভার দিয়ে ঢাকা, খাটের পাশে টুল, তার ওপর ঢাকা দেওয়া কাচের গ্লাসে জল, পাশে সাদা স্বচ্ছ প্লাস্টিকের জগে আরও জল। দুটো স্টিলের ফোল্ডিং চেয়ারের ওপর আসন পাতা। ঘরের কোণে একটা টেবিলে কিছু বই। তাদের বাড়িতে বেশি বই নেই। যে কখানা আছে তাই মা টেবিলে সাজিয়ে রেখেছে। টেবিলের ওপর ফুলদানিতে টাটকা কিছু গোলাপ আর গোলাপের ফাঁকে ফাঁকে ছড়িয়ে রাখা শিউলি ফুল। এ-ঘর অনেকদিন ধরেই দাদার জন্য সাজিয়ে রেখেছে মা। যদি কখনও আসে!
দরজায় দাঁড়িয়েই ঘরটা একটু দেখল সুমন। তারপর তার দিকে চেয়ে একটু লজ্জার হাসি হেসে বলল, আমার একটা জিনিস ভুল হয়ে গেছে। বাড়িতে পরার চটি আনিনি। এখানে হাওয়াই চটি পাওয়া যায় না?
হ্যাঁ, বাজারে মাখন দাসের দোকানে ভাল জিনিস পাওয়া যায়। এনে দেব!
পরে হলেও চলবে।
চটি বাইরে ছেড়ে ঘরে ঢুকল সুমন। ব্যাগটা বিছানায় রেখে তার দিকে চেয়ে বলল, এ ঘরে কে থাকে?
আপনি না তুমি কী বলবে ঠিক করতে পারছিল না মরণ, শেষমেশ আপনি করে বলাটাই সাব্যস্ত করে বলল, কেউ থাকে না। এ-ঘরটা আপনার জন্যই রেখে দিয়েছে মা।
তাই বুঝি! বলে অবাক চোখে চারদিকটা ফের দেখল সুমন।
ওইটে বাথরুম। আপনি হাতমুখ ধোবেন না?
সুমন একটু হেসে বলল, তার চেয়ে চলো জায়গাটা একটু ঘুরে দেখে আসি।
কোথায় যাবেন?
বিশেষ কোথাও নয়। এমনিই একটু ঘুরে দেখব।
সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে মরণ বলে, চলুন।
যখন নীচে নামল তারা তখনও মায়ের সঙ্গে বাবার খাওয়া নিয়ে কথা হচ্ছে। বাবা মাকে কইমাছ রান্নার একটা পদ্ধতি শেখাচ্ছিল।
মা বলল, ও মা, দাদাকে নিয়ে এই দুপুরে কোথায় চললি? ওর স্নান-খাওয়া নেই?
মরণ জবাব দেওয়ার আগে সুমনই বলল, একটু ঘুরে আসি।
বাবা বলল, যাউকগা, ঘুইরা-টুইরা আসুক। গ্রামের হাওয়া-বাতাস লাগাইয়া আসুক একটু শরীরে। কইলকাতায় তো অন্ধকূপে থাকে।
বাইরে বেরিয়ে দাদার পাশে পাশে হাঁটতে হাঁটতে মরণের ইচ্ছে হচ্ছিল সবাইকে ডেকে ডেকে বলে, দেখ, দেখ, এই আমার দাদা, স্টার পাওয়া দাদা, কেমন সুন্দর চেহারা দেখেছ? আছে তোমাদের এমন দাদা?
সুমন বেশি কথা বলছিল না। চারদিকে চেয়ে চেয়ে দেখছিল শুধু।
ঘোষবাড়ির পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় উঠোনে টিনের পাতের ওপর বড়ি দিতে দিতে জ্যাঠাইমা চেঁচিয়ে উঠল, ও মরণ, আমার সুপুরিগুলো পেড়ে দিয়ে গেলি না বাবা! কবে থেকে খোশামোদ করছি।
আজ নয় জ্যাঠাইমা। পরে পেড়ে দিয়ে যাব। আজ কলকাতা থেকে আমার দাদা এসেছে।
কথাটা বেশ অহংকারের সঙ্গেই বলেছিল মরণ, কিন্তু তার জবাবটা এল বিছুটির মতো।
ঘোষ জ্যাঠাইমা কপালে হাত দিয়ে নিরীক্ষণ করে বলল, অ বাঙালের আগের পক্ষ বুঝি?
লজ্জায় কান ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল মরণের। ওভাবে বলতে আছে? গাঁয়ের লোকগুলোর মুখের কোনও আগল নেই। দাদা শুনে কী ভাবল? ছিঃ ছিঃ। আর কখনও জ্যাঠাইমার সুপুরি যদি পেড়ে দেয় তো তার নাম মরণই নয়।
সুমনের মুখে অবশ্য খুব একটা ভাবান্তর দেখতে পেল না মরণ। মাথা নিচু করে হাঁটতে হাঁটতে বলল, তুমি গাছে উঠতে পার বুঝি?
হ্যাঁ।
নারকেল গাছে উঠতে পার?
হ্যাঁ। খুব সোজা।
তোমার তো খুব সাহস দেখছি। যদি পড়ে যাও?
প্রথম প্রথম ভয় করত। এখন বেশ ভাল পারি।
আর কী পার?
আর? বলে একটু ভাবল মরণ। তারপর মাথা নেড়ে বলল, আর কিছু পারি না।
খেলতে পার? ফুটবল ক্রিকেট?
তা পারি। আর হ্যাঁ, আমি খুব জোরে দৌড়োতে পারি।
কত জোরে?
তা তো কখনও মাপিনি, এখানে তো স্টপ ওয়াচ নেই। তবে প্রতি বছর স্পোর্টসে আমি তিনটে দৌড়ে ফাস্ট হই।
লেখাপড়াতে?
না। টেনে-মেনে পাস করে যাই।
লেখাপড়া ভাল লাগে না তোমার?
না।
সুমন একটু হাসল, আর কিছু বলল না।
হাওয়াই চটি কিনে যখন তারা ফিরল তখন অনেক বেলা হয়েছে।
মা বলল, ও মরণ, তুই আলাদা বসে রান্নাঘরে খেয়ে নেগে যা। ওদের বাপ-ব্যাটাকে দোতলার ডাইনিং হল-এ দিচ্ছি।
আচ্ছা মা।
কিন্তু খাওয়ার সময় সুমন বাসন্তীকে বলল, মরণ কোথায়?
ও রান্নাঘরে বসে খাবেখন বাবা। তোমাদের জন্য এই ব্যবস্থা।
না না, ওকে ডাকুন, ও আমার পাশে বসে খাবে।
বাসন্তী হেসে বলল, আচ্ছা ডাকছি।
মরণ লজ্জায় মরে গিয়ে ওপরে এল। আসলে বাবার সঙ্গে বসে সে কখনও খায় না। তাই আজ ভারী লজ্জা করছে, এক সঙ্গে দাদা আর বাবার সঙ্গে বসে খাওয়া! আজ তার পেটই ভরবে না।
সুমন বাপকে তেমন ভয় পায় না। অন্তত মরণের মতো তো নয়ই। খেতে বসে কত কথা কইতে লাগল তার সঙ্গে।
দুপুরে মা যখন রান্নাঘরে খেতে বসেছে তখন মরণ গিয়েছিল লেবুপাতা দিতে। মা ছলো ছলো চোখে বলল, দেখলি, এখনও পর্যন্ত একবারও মা বলে ডাকল না আমাকে ছেলেটা!
মরণ বলে, তাতে কী মা! আমি তো মা বলে ডাকি।
মা আঁচলে চোখ মুছে বলল, আমি শওুর বই তো নয়। ডাকবে কেন?
বড় কষ্ট হল মরণের।
দুপুর যখন ঘন হল, বেলা গড়িয়ে গেল তখন মরণ চুপি চুপি কদমগাছটার তলায় এসে দাঁড়াল। এইখানে শিবঠাকুর আসেন। চোখ বুজে মরণ তার তিন নম্বর বরটা চেয়ে ফেলল, ঠাকুর, দাদা যেন মাকে একবার মা বলে ডাকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন