শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
টাইম শ্যাফ্টের সামনে দাড়িয়ে আছেন বৈজ্ঞানিক। ভ্রূ কুঞ্চিত, দুশ্চিন্তার বলিরেখা কপালে, পিছনে জড়ো করা দুটি হাত বারবার মুষ্টিবদ্ধ হচ্ছে এবং খুলে যাচ্ছে। কাচতন্তুর সুড়ঙ্গপথটির দিকে চেয়ে আছেন তিনি। চোখে অনিশ্চয়তা, ভয়, সম্ভাব্য ব্যর্থতার গ্লানি। গত কয়েক বছর চুল কাটেননি, দাড়ি কাটেননি। তাঁর চেহারা হয়েছে পাগলের মতো। নিয়মিত আহার করেননি বলে শরীর রুগ্ণ ও দুর্বল। তাঁর গবেষণা শেষ হয়েছে, শুধু ফলাফলের অপেক্ষা। দিনের পর দিন তিনি ধৈর্য ধরে অপেক্ষা করেছেন। সময়ের সরণি বেয়ে আজ অবধি কেউ আসেনি অতীত বা ভবিষ্যৎ থেকে। হয়তো আর আসবেও না। হয়তো টাইম-ট্র্যাভেল বাস্তবিকই অলীক কল্পনা। সময়কে কি অতিক্রম করা যায়?
বৈজ্ঞানিক অবশ্য মনে করেন সময় এক অবাস্তব ধারণা। সময় বলেই কিছু নেই। আছে গতি, আছে অবস্থানগত পরিবর্তন, আর মানুষ তাই থেকেই সময়কে কল্পনা করে নিয়েছে। যেখানে পরিবর্তন নেই, গতি নেই বা বস্তু নেই, বস্তুর জন্ম ও বিনাশ নেই সেখানে সময়ের ধারণাও অসম্ভব। গতি এবং পরিবর্তনই সময় নামক তৃতীয় ধারণার জন্ম দিয়েছে। একটি শিশু জন্মাল, বড় হল, বুড়ো হল, মরে গেল, এ সবই হল সেই শিশুটির গতি ও পরিবর্তন মাত্র। শরীরের হ্রাস, বৃদ্ধি, ক্ষয়। বৈজ্ঞানিকের দৃঢ় বিশ্বাস অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ আসলে একই সঙ্গে বিরাজমান। চলন্ত ট্রেন থেকে যেমন বাইরের দৃশ্য প্রতীয়মান হয় তেমনই। বাইরের দৃশ্যগুলি ফলিত হয়েই আছে, চলন্ত ট্রেন থেকে শুধু পর্যায়ক্রমে তাদের দেখা যায়। সুতরাং ভবিষ্যৎও বর্তমান, অতীতও বর্তমান শুধু একটু টিউনিং-এর প্রয়োজন। তা হলেই ভবিষ্যৎও বর্তমানের মতোই প্রতীয়মান হবে। অতীতও তাই।
কিন্তু সময়-সুড়ঙ্গে এখনও কেউ আবির্ভূত হল না। অতীত বা ভবিষ্যতের কোনও কল্পনা না, কোনও সাড়া না।
হতাশায় বৈজ্ঞানিক মাথা নাড়লেন। নিজের লম্বা চুল হাত দিয়ে সটান করলেন, দাড়ি আঁচড়ালেন আঙুল দিয়ে। তারপর ঘরময় পায়চারি করতে লাগলেন। তাঁর অস্থির চটিজুতোর শব্দ চারদিকে প্রতিধ্বনি তুলছিল।
জানালার ধারে দাঁড়িয়ে উদাস চক্ষে বৈজ্ঞানিক কিছুক্ষণ তারাভরা আকাশের দিকে চেয়ে রইলেন। ওই যে নক্ষত্রমণ্ডলী, ওইসব বস্তুপুঞ্জ যদি সরিয়ে নেওয়া যায় তা হলে এই অসীম অন্ধকার শূন্যতায় সময় বলে কিছু কল্পনা করা যায় কি? না, সেটা অসম্ভব। ওই স্থির পরিবর্তনশীল অন্ধকার পরিসরের কাছে সব ধারণাই মিথ্যে হয়ে যায়। দূরত্ব, সময়, গতি, বিবর্তন সব কিছু।
একটা শব্দ শুনে বৈজ্ঞানিক ফিরে দাঁড়ালেন। ঘরের মাঝখানে একজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। বৃদ্ধ মানুষ, তার খালি গা, গলায় শুভ্র উপবীত, পরনে পরিষ্কার এক থান ধুতি, মস্তক মুণ্ডিত।
অবাক বৈজ্ঞানিক বললেন, আপনি কে? কী করে এ-ঘরে ঢুকলেন?
লোকটি সাষ্টাঙ্গে তাঁকে প্রণাম করে উঠে দাঁড়িয়ে করজোড়ে বললেন, পিতা, আমার এবং আমাদের সশ্রদ্ধ প্রণাম গ্রহণ করুন।
বৈজ্ঞানিক অপ্রস্তুত। প্রণাম-টনাম নেওয়ার অভ্যাস নেই তাঁর। তার ওপর লোকটি যথেষ্ট বৃদ্ধ। তাঁর চেয়েও অন্তত বিশ-পঁচিশ বছরের বড়। বাবার বয়সি মানুষের প্রণাম অস্বস্তিকর বইকী!
বৈজ্ঞানিক বললেন, প্রণাম করছেন কেন? আপনি বয়োজ্যেষ্ঠ, আমারই তো আপনাকে প্রণাম করার কথা। তবে আমি প্রণামে বিশ্বাস করি না।
লোকটি শশব্যস্তে বলল, ছিঃ ছিঃ, কী যে বলেন! আপনি আমাদের পরম প্রণম্য। পরম শ্রদ্ধার পাত্র। পিতা, আপনার দর্শনলাভে আমি ধন্য।
বৈজ্ঞানিক বিরক্ত ও বিস্মিত। বললেন, আপনি আমাকে পিতা সম্বোধন করেছেন! আশ্চর্য! আপনিই তো আমার বাবার বয়সি!
লোকটি জিভ কেটে বলে, হিসাবমতো আপনি আমার চেয়ে একশো আশি বছরের বড়।
বৈজ্ঞানিকের বিস্ময়ে কথা সরল না। অনেকক্ষণ বাদে বললেন, একশো আশি বছর! আপনি কি পাগল?
লোকটি মাথা নেড়ে বলে, না পিতা, আমি পাগল নই। আমি আপনার অধস্তন সপ্তম পুরুষ।
বৈজ্ঞানিক হাঁ করে চেয়ে রইলেন। ব্যাপারটা তাঁর বোধগম্য হচ্ছিল না। কিন্তু তিনি বৈজ্ঞানিক। বৈজ্ঞানিকের মন সর্বদাই যুক্তিযুক্ত পথ ধরে চলে। তাঁর মস্তিষ্কে হঠাৎ একটা উদ্ভাস ঘটল। তবে কি লোকটা তাঁর আবিষ্কৃত ওই সময়-সুড়ঙ্গ ধরে এসে হাজির হয়েছে? তিনি কি তা হলে গবেষণায় সাফল্য লাভ করেছেন? আনন্দে বৈজ্ঞানিক নিজের লম্বা চুল মুঠোয় চেপে ধরে বললেন, তা হলে কি আপনি আমার যন্ত্রের ভিতর দিয়ে এলেন?
পিতা, আমাকে আপনি-আজ্ঞে করে বলবেন না। আমি আপনার প্রপৌত্রের পৌত্র।
ও হ্যাঁ হ্যাঁ, তা তো বটেই বাছা, তুমি তো দুধের শিশু আমার কাছে। আমার গবেষণা তা হলে সফল।
লোকটির মুখ একটু ম্লান হল। হাতজোড় করে বলল, আপনার গবেষণা শতকরা একশো ভাগ সফল বলতে পারলে আমি খুশিই হতাম। কিন্তু পিতা, ঘটনাটা তা নয়।
নয়?
না পিতা। আপনার গবেষণা সম্পূর্ণ সফল না হলেও ব্যর্থ হয়েছে এমন কথা বলা যায় না।
তার মানে কী বাছা?
আপনার গবেষণা সফল না হলেও চেষ্টা বৃথা যায়নি। অতীত বা ভবিষ্যৎকে বর্তমানে ফলিত করতে পারলেও আপনার বার্তা আমাদের কাছে পৌঁছেছে।
সেটা কী রকম?
আমাদের গবেষণাগারে সময় পাড়ি দেওয়ার যন্ত্রে আপনার নিরলস চেষ্টার একটা সংকেত পৌঁছেছে। আমরা বুঝতে পেরেছি অতীতের কেউ আমাদের নাগাল পাওয়ার চেষ্টা করছে।
তারপর?
আমরা—অর্থাৎ ভবিষ্যতের বিজ্ঞানকর্মীরা সময় নামক বাধা বা প্রাচীর অতিক্রম করার কৌশল জানতে পেরেছি। কিন্তু বিনা প্রয়োজনে—অর্থাৎ অত্যন্ত প্রয়োজন না হলে আমরা কখনওই সময়কে অতিক্রম করার চেষ্টা করি না।
কেন করো না?
কাজটা বিপজ্জনক পিতা। তাতীত বিপজ্জনক। পৃথিবীব অতীত বর্তমান ও ভবিষ্যৎ একটি অতি সূক্ষ্ম ভারসাম্যের ওপর পরিকল্পিত হয়ে আছে। তার সামান্য একটুখানি বিচ্যুতি ঘটালেই পুরো ছকটা ভীষণভাবে ওলটপালট হয়ে যাবে। সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে লহমায়। ইতিহাস মুছে যাবে।
বলো কী হে?
পিতা, আপনার অনুমান মিথ্যা নয়। অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ সবই গতি ও পরিবর্তন মাত্র। গীতার শ্রীকৃষ্ণের কথা স্মরণ করুণ। মুখ ব্যাদান করে অর্জুনকে শ্রীভগবান বিশ্বৰূপ প্রদর্শন করে বলেছিলেন, যা ঘটার তা ঘটেই আছে, তুমি কেবল নিমিত্তমাত্র হও, অর্জুন শ্রীকৃষ্ণের মুখের গহ্বরে ভবিষ্যৎকে প্রত্যক্ষ করেছিলেন। অর্থাৎ ভবিষ্যৎও বর্তমানই, ঠিক তো? বর্তমান না হলে অর্জুন তা প্রত্যক্ষ করতে পারতেন না!
হ্যাঁ, বোধহয় ঠিক।
আপনার প্রজ্ঞা আমাদের কাছে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। আপনার এই গবেষণা সম্পূর্ণ সফল না হলেও তা আমাদের গবেষণায় বিশেষ ইন্ধন সরবরাহ করেছে। বলতে গেলে এ ব্যাপারে আপনি আমাদের পথিকৃৎ।
বাপু হে, আদত কথাটা বলো। আমার টাইম মেশিন যদি সফল না হয়ে থাকে তা হলে তুমি এলে কী করে?
পিতা, ক্রুদ্ধ হবেন না। আপনার মৃদু সংকেত আমাদের যন্ত্রে ধরা পড়ার পর আমরা অনেক পরামর্শ করে অবশেষে আমাদের যন্ত্রের সাহায্যে আপনার কাছে একজন প্রতিনিধি পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিই। আমি আপনার বংশধর বলে বিশেষজ্ঞরা আমাকেই আপনার কাছে পাঠিয়েছে।
ভ্রূ কুঁচকে বৈজ্ঞানিক ঘৃণাভরে বললেন, বংশধর! আমার বংশধর! কিন্তু সেটা কী করে সম্ভব? আমি তো বিয়েই করিনি! এবং করার কোনও ইচ্ছেও নেই। চিন্তাশীল এবং কর্মব্যস্ত ললাকের পক্ষে মেয়েমানুষ এক মস্ত ঝঞ্ঝাট।
কাঁচুমাচু হয়ে বৃদ্ধ লোকটি বলল, আপনি বিবাহ না করলে আমার জন্ম সম্ভব হত না।
বৈজ্ঞানিক খিঁচিয়ে উঠে বললেন, সম্ভব না হলে হবে না। তাতে আমার কী যায় আসে বাপু? মেয়েমানুষ হল ঝগড়ুটে, হিংসুটে, ন্যাকা, মিথ্যেবাদী, লোভী, চিন্তাশক্তিশূন্য, স্বার্থপর, আত্মকেন্দ্রিক এবং সর্বনাশা। মেয়েমানুষের ছায়া মাড়ানোও পাপ। সুতরাং আমার বিয়ে করার কোনও সম্ভাবনা নেই এবং বংশধরও কেউ হবে না।
বৃদ্ধ মানুষটি বিবর্ণ মুখে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। তারপর স্খলিত কণ্ঠে বলল, পিতা, ঠিক এই কারণেই আমরা সময়-ভ্রমণ পারতপক্ষে করি না। যা কিছু ঘটে আছে, ঘটনার যেসব নকশা তৈরি হয়ে আছে তা এই সর্বনাশা সময়-ভ্রমণের ফলে যদি সামান্যতম বিচ্যুত হয় তা হলেই প্রলয় কাণ্ড ঘটে যেতে পারে। সমস্ত সৃষ্টির ভারসাম্যই কেন্দ্রচ্যুত হয়ে পড়বে। সেই পরিণতির কথা ভাবলেও শরীর শিহরিত হয়। আপনি বিবাহ না করলে—
ক্রুদ্ধ বৈজ্ঞানিক তীব্র স্বরে বললেন, তাই বলে কি অস্পৃশ্য মেয়েমানুষকে ঘরে তুলে আনব? নিমকহারাম, বেইমান, পাপিষ্ঠা মেয়েমানুষের কাছে আত্মবিক্রয় করব? সুন্দর মুখের ছলনায় তারা পৃথিবীকে কতবার ছারখার করেছে তুমি জানো? ইতিহাস, পুরাণ, মহাকাব্যাদি পড়নি? মেয়েমানুষের ইতিহাস মানুষের জীবনে কল্পনাস্বরূপ। তারা স্বভাবতই বিশ্বাসঘাতক এবং অকৃতজ্ঞ। ছলাকলা এবং চাতুর্যে পুরুষকে বশীভূত করে তার জীবনীশক্তি শোষণ করে নেয়। মেয়েমানুষ হল পরগাছা এবং মস্ত জঞ্জাল। মেয়েমানুষ না থাকলে পৃথিবী অনেক বেশি বাসযোগ্য হত।
বৃদ্ধ মানুষটি ভয়ে প্রায় কাঁপতে কাঁপতে করজোড়ে বলল, হে শ্রদ্ধাস্পদ মহাবোধ, হে জ্যেষ্ঠ পিতা, আপনি ক্রোধ সংবরণ করুন। আপনি ক্রুদ্ধ হলে সৃষ্টির অঙ্ক মিলবে না।
তাতে আমার বয়েই গেল। মেয়েমানুষের কথা শুনলেই আমার মাথায় আগুন জ্বলে যায়।
লোকটি বিনীত কণ্ঠে বলল, জানি প্রভু।
বৈজ্ঞানিক হুংকার দিয়ে বললেন, কী জানো?
আপনার বয়স তখন আঠেরো বছর দুই মাস। সদ্য শ্মশ্রুগুম্ফের উদগম ঘটেছে। আপনি ক্ষীণকায়, গৌরবর্ণ ও অতীব সুপুরুষ ছিলেন। তখনও আপনি ছিলেন চিন্তাশীল, অন্যমনস্ক, বাস্তববোধ বর্জিত, মেধাবী ও প্রজ্ঞাবান। আপনার চিন্তার বিষয় ছিল মহাশূন্য, সময় সৃষ্টিতত্ত্ব ইত্যাদি। বয়সোচিত চিত্তচাঞ্চল্য আপনার ছিল না, নারীর রূপ সম্পর্কে আপনি তখনও সচেতন ছিলেন না। আপনার বিচরণ ছিল মহান এক চিন্তারাজ্যে।
তুমি এই কথা জানলে কী করে?
আমরা সময়-ভ্রমণ করি না বটে, কিন্তু বিশেষ প্রয়োজন হলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহের জন্য আমরা যন্ত্রদূত পাঠাই। এই যন্ত্রদূতগুলি কখনও কবুতর, কখনও বেড়াল, কখনও বা নেড়ি কুকুরের রূপ ধরে আসে। এদের নিজস্ব ইচ্ছা বা চিন্তাশক্তি না থাকায় এরা ঘটনার ওপর কোনও প্রভাব বিস্তার করতে পারে না। শুধু তথ্য সংগ্রহ করে নিয়ে যায়। আপনার পক্ষে এদের চিহ্নিত বা শনাক্ত করা অসম্ভব।
তোমরা তো বেশ সেয়ানা দেখছি। আমার পিছনে কাকে লেলিয়েছিলে? কুকুর না বেড়াল?
একটি নেড়ি কুকুর। আপনার আঠেরো বছর বয়সে একটি নেড়ি কুকুর আপনাকে সর্বদাই অনুসরণ করত।
বৈজ্ঞানিক একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন, হ্যাঁ, তার নাম ছিল ভুলু। আমি ভাবতাম কোনও রহস্যময় কারণে সে আমার প্রতি আসক্ত। তাই সর্বদাই পিছু পিছু ঘুরত। রাতে আমাদের বাইরের বাবান্দায় শুয়েও থাকত। তবে তাকে কিছু খেতে দিলে খেত না।
সেই ভুলুই আমাদের যন্ত্রদূত।
বৈজ্ঞানিক হঠাৎ একটু লাল হলেন। যেন হঠাৎ অস্বস্তি বোধ করতে লাগলেন। ক্রোধের বদলে তাঁর একটু একটু লজ্জা করতে লাগল।
বৃদ্ধ মানুষটি করজোড়েই দাঁড়িয়ে তাঁকে লক্ষ করতে করতে বললেন, পিতঃ, দুশ্চিন্তা করবেন না। আমরা বিস্তারিত বিবরণে যাব না। আপনি একজন মহান বৈজ্ঞানিক ও মহৎ মানুষ। তবু রক্তমাংসের মানুষ তো, প্রকৃতির নিয়মে, বয়োধর্মে চিত্তচাঞ্চল্য ঘটতেই পারে।
থামো, ডেঁপো ছোকরা। আমার মোটেই চিত্তচাঞ্চল্য ঘটেনি। ঘটেছিল বেতসীরই৷
বৃদ্ধ মানুষটি বিনীতভাবে চুপ করে রইল।
বৈজ্ঞানিক ফের সলজ্জ মুখে বললেন, কথাটা বিশ্বাস হল না বুঝি?
আপনার সম্পর্কে আমাদের তথ্য অনুমাননির্ভর নয় পিতঃ, তথ্যনির্ভর।
বৈজ্ঞানিক খিচিয়ে উঠে বললেন, একটা নেড়ি কুকুরের সাক্ষ্যেই বুঝি কিছু প্রমাণ হয়?
পিতঃ, ক্রুদ্ধ হবেন না। আপনি আদেশ করলে আমি রসনা সংযত করব।
ওহে বাপু, তোমরা হলে হাড়বজ্জাত, বাইরে ভিজেবেড়ালটি সেজে আছ, আর মনে মনে হাসছ সে আমি জানি।
জিব কেটে লোকটা বলে, না না পিতঃ, আমি হাসছি না।
লজ্জিত মুখে বৈজ্ঞানিক বললেন, ওই একবারই আমার পদস্খলন হয়েছিল।
ব্যথিত মুখে বৃদ্ধ লোকটি বলল, পদস্খলন বলছেন কেন পিতঃ?
বৈজ্ঞানিক দৃপ্ত স্বরে বললেন, পদস্খলন নয়। আমার মতো একজন চিন্তাশীল মানুষ কী করে যে মস্তিষ্কহীন নির্বোধ একটি কিশোরীর প্রতি আকৃষ্ট হয়ে পড়েছিল আজও তা ভেবে পাই না।
মহাশয়, আমার স্পর্ধা ক্ষমা করবেন। বেতসী রায় অসহনীয় রূপসী ছিলেন। সেই রূপ অপ্সরাদের থাকে, দেবীদের থাকে। ওই রূপ অনেক বর্ম বেদ করতে পারে, নিরস্ত্র করতে পারে দুর্ধর্ষ বীরকে, তপোভঙ্গ করতে পারে ঋষিরও।
থামো, থামো, অকালপক্ক ছোকরা। রূপ! রূপের গভীরতা তো গাত্ৰচর্মের চেয়ে গভীর নয়। রূপের স্তাবকতা করে মূর্খেরা। সেই বয়সে আমি যে কেন রূপের ফাঁদে পড়লাম কে জানে। আজও ভাবলে মনে বৃশ্চিক দংশন হয়।।
প্রভু, রাগ করবেন না। আত্মগ্লানির কোনও কারণ ঘটেনি।
ঘটেনি! বলো কী! সেই আত্মগ্লানি যে আজও আমাকে তাড়া করে।
জানি প্রভু। তাই আজও আপনার কানন কুসুমহীন।
কাব্য কোরো না, ওসব আমার ভাল লাগে না। মেয়েদের সঙ্গে ফুলের তুলনা করা ফুলের পক্ষে অপমান।
বৃদ্ধ পিতা, বেতসী রায় কিন্তু নির্দোষ।
বৈজ্ঞানিক হুংকার দিলেন, নির্দোষ!
চোদ্দো বছরের সেই কিশোরী আপনার বাড়ির সামনে দিয়েই রোজ স্কুলে যেত। আপনি তখন আপনার সামনের বারান্দায় গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে বসে থাকতেন। আপনি ভুলে যাবেন না যে, আপনিও তখন ছিলেন অতি সুদর্শন যুবা। বেতসী তাই প্রতিদিন আপনাকে লক্ষ করত। আপনি করতেন না। চিন্তায় কুয়াশাচ্ছন্ন ছিল আপনার চোখ, মগ্নতায় আবিষ্ট ছিল আপনার মস্তিষ্ক, সৃষ্টিতত্ত্বের রহস্য আপনাকে বাস্তব থেকে সুদূর করে রেখেছিল। সব ঠিক, কিন্তু বেতসীর অসহনীয় রূপ প্রতিদিন আপনার হৃদয়ের বন্ধ দরজায় মৃদু ও ভীরু করাঘাত করে যেত।
ফের কাব্য?
মহাশয়, কাব্যোচিত ঘটনার বিবরণে একটু কাব্যের স্পর্শ না থাকলে গ্রহণযোগ্য হয় না।
বাড়াবাড়ি মানেই বুঝি কাব্য?
যথার্থই বলেছেন। কাব্য মানেই বাহুল্য, কাব্য মানেই হল অতিশয়োক্তি, কাব্য মানেই উপচে পড়া হৃদয়াবেগ।
তাই হবে। সেই জন্যই কাব্য আমি পছন্দ করি না।
প্রভু, কঠিন গবেষণা, জটিল অঙ্ক এবং প্রবল বিদ্যা আপনার অন্তরকে খানিকটা শুষ্ক করে তুলেছে বটে, কিন্তু একদা আপনা হৃদয়ের অর্গল ভগ্ন হয়েছিল।
বৈজ্ঞানিক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলেন, হ্যাঁ
দিনের পর দিন বেতসীর দুই অপরূপ চক্ষু আপনাকে লেহন করে যেত, তার রূপের ঢেউ এসে আছড়ে পড়ত আপনার দুর্গের পরিখায়, তার হৃদয় নীরবে নিবেদিত হত আপনার চরণে। হতে হতে একদিন আপনার বর্ম ভেদ হল।
বৈজ্ঞানিক বিরক্ত হয়ে বলেন, ওরে বাপু, অত কাব্য করে বলার কিছু নেই। সোজা কথায় বলে ফেল, পচা শামুকে আমার পা কেটেছিল।
না পিতা, ওরকমভাবে বলবেন না। বেতসী রায়ের রূপ তো দোষের ছিল না, সেও তো ঈশ্বরের দান।
ঈশ্বর! ওহে, তোমরা ঈশ্বর-টিশ্বর মানো নাকি? আমি কিন্তু মানি না।
যারা নিজেদের ঈশ্বরের সমতুল ভাবে তারা ঈশ্বরকে মানতে চায় না। যেখানে অহং প্রবল সেখানে ঈশ্বর বাস করেন না।
ভাল জ্বালা হল রে বাপু! তোমরা ঈশ্বর মাননা কেন?
তার কারণ আমরা জ্ঞানমার্গে আপনাদের চেয়ে অনেকটা অগ্রসর জাতি। বিজ্ঞানও এখন অগ্রসর। যতই মানুষ জ্ঞানার্জন করবে ততই অহং বিলীন হবে, এবং ঈশ্বরের অস্তিত্ব ততই অনুভূত হবে।
তোমরাও তা হলে ওই হাওয়ার নাড়ু খেয়ে বসে আছ? তাই তো তোমার গলায় পৈতে দেখছি।
আমি তো পৈতে-টৈতে কবে ফেলে দিয়েছি। যত সব কুসংস্কার।
আপনি ফেলে দিয়েছেন বলেই আপনার উত্তরপুরুষদের তার জন্য প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছে। এমন কাজ করা আমাদের উচিত নয় যার জন্য উত্তরপুরুষদের দায়ভাগ বহন করতে হয়।
বামুনদের ইতিহাস জানো? সমাজের শোষক, চতুর প্রতারক, অত্যাচারী, হৃদয়হীন, খল, কুসংস্কারাচ্ছন্ন এবং ঘৃণ্য একটা শ্রেণী।
প্রকৃত ব্রাহ্মণ তো তা নয়।
আমি ওসব জানতে চাই না। আমি নিজেকে ব্রাহ্মণ বলে কখনও বোধ করিনি।
বিতর্ক থাক প্রভু। আমরা বেতসীর কথায় ফিরে আসি। অবশেষে একদিন আপনি বেতসীকে অকস্মাৎ লক্ষ করলেন। আপনার কাননে হঠাৎ মর্মরধ্বনি উঠল, পরভৃৎ শিষ দিতে লাগল। আপনি স্তম্ভিত হয়ে বসে রইলেন।
হ্যাঁ মনে হয়েছিল আমার মাথায় বাজ পড়েছে।
পিতা, উপমাটি অযথার্থ নয়। বজ্রাঘাতের সঙ্গে এই মুগ্ধতার কিছু সাদৃশ্য আছে।
বড় ধানাই-পানাই করছ হে। সোজা কথাটা বললেই তো হয়।
যে আজ্ঞে। আপনার সমস্যা হল প্রেম কাকে বলে আপনি তা জানতেন না। আপনি যে প্রেমে পড়েছেন তাও আপনি বুঝতে পারছিলেন না। শুধু অস্থির, উচাটন, উদ্বেগ আপনাকে গ্রাস করেছিল। সঙ্গে ভয়ও। কারণ নিজের ভিতরকার পরিবর্তনগুলিকে আপনি অনুধাবন করতে পারছিলেন না।
বাঃ, বেশ বলছ তো। ওরকমই হয়েছিল বটে। আমার চিন্তারাজ্যে যেন বাজপাখির ছায়া।
প্রভু, ওরকম কঠিন বাক্য বলবেন না। বিষয়টি পেলব।
ছাই পেলব।
আপনাদের চক্ষু রোজ মিলিত হতে লাগল। আপনি আরও উন্মন হলেন, আরও চঞ্চল, আরও উদ্বিগ্ন, আরও ভীত। আপনার হৃৎপিণ্ড দামামা বাজাত।
বেঁধে! বেঁধে! অতটা বলার দরকার নেই।
যে আজ্ঞে! রেখেঢেকেই বলছি তা হলে। আদত কথাটা হল আপনারা দুজনেই দুজনকে ভালবেসে ফেলেছিলেন।
মূর্খ! ওকে ভালবাসা বলে না। রূপতৃষ্ণা কি ভালবাসা? কামনা কি ভালবাসা?
তা নয় পিতা, তবে ভালবাসার মধ্যে ওসবও একটু-আধটু থাকে।
ওসবই থাকে। নারীপ্রেম আসলে কাম আর রূপতৃষ্ণা।
আপনি বড় কঠোর সমালোচক।
আমি মধুর মিথ্যেবাদী নই তোমার মতো।
আপনাদের ওই প্রেম আপনাকে এতটাই চঞ্চল করেছিল যে, আপনি একদিন সোজা রাস্তায় নেমে মেয়েটির পথ আটকে দাঁড়ান।
হ্যাঁ। ভ্যানতারা আমি পছন্দ করি না।
কিন্তু প্রভু, প্রেমেরও একটা রচনা আছে। প্রথম দৃষ্টি বিনিময়, তারপর কটাক্ষ, তারপর মৃদু হাস্য, তারপর সন্তর্পণ বাক্যালাপ, তারপর প্রস্তাবনা।
তাই বুঝি! প্রেম করতে সময়ের এত অপব্যবহার এবং শক্তিক্ষয়।
নইলে যে ব্যাপারটা মোহমুদগরের মতো হয়ে দাঁড়ায়। ঠিক যেমনটি আপনার ক্ষেত্রে হয়েছিল।
বৈজ্ঞানিক লজ্জিত হয়ে বললেন, কাজটা যে ঠিক হয়নি তা অবশ্য স্বীকার করতে হবে।
না প্রভু, কাজটা মোটেই ঠিক হয়নি। আপনি দুহাতে বেতসীর দুই কাঁধ চেপে ধরে প্রবল ঝাঁকুনি দিয়ে দাঁতে দাঁত ঘষে বলেছিলেন, তোমাকে আমার দরকার… তোমাকে আমার দরকার… তোমাকে আমার দরকার…
কুণ্ঠিত বৈজ্ঞানিক বললেন, অ্যাপ্রোচটা একটু রাফ ছিল বটে, কিন্তু সোজা কথাটা তো ওটাই।
হ্যাঁ প্রভু। তবু মোদ্দা কথাটা এসব ক্ষেত্রে একটু ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে বলতে হয়। বেতসী ঝাঁকুনি খেয়ে ভয়ে আর ব্যথায় কেঁদে ফেলেছিল এবং দৌড়ে পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আপনি কিছুতেই বুঝতে পারলেন না যে, আপনার প্রস্তাবটায় খারাপ কী ছিল।
বাস্তবিক তাই।
এরপর ওই মেয়েটিকে পাওয়ার জন্য আপনি ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন এবং সম্ভব অসম্ভব নানা পন্থা নিতে শুরু করেন। আপনি মেয়েটির বাড়িতে হানা দিয়ে তার বাবার কাছে বেতসীকে বিয়ে করার প্রস্তাব দেন। আপনার দুর্বিনীত কথাবার্তায় বেতসীর বাবা চটে যান এবং প্রত্যাখ্যান করেন। এরপর আপনি লোক লাগিয়ে বেতসীকে চুরি করার মতলব আঁটেন। অথচ সামান্য কূটকৌশল ও একটু ধৈর্য অবলম্বন করলে ব্যাপারটা কত সহজেই ঘটে যেত।
ওসব নিষ্কর্মারা পারে। আমার অত ধৈর্য নেই।
তবু আপনি কিন্তু তখন বেতসী-পাগল। যত প্রত্যাখ্যান আসে তত আপনি ক্ষিপ্ত থেকে ক্ষিপ্ততর হয়ে ওঠেন। বেতসীকে সর্বত্র আপনি অনুসরণ করতেন। এক বিয়েবাড়িতে ভিড়ের মধ্যে আপনি তার হাতও চেপে ধরেছিলেন।
আহা, আবার অত ডিটেলসে যাচ্ছ কেন?
আচ্ছা প্রভু, এটুকুই থাক।
বৈজ্ঞানিক একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, মেয়েরা নির্বোধ। তাই ওই মেয়েটি আমার হৃদয়ের বার্তা বুঝতেই পারল না।
যথার্থই প্রভু। হৃদয়ের বার্তা বোঝার সাধ্য কজনেরই বা থাকে, তাই মেয়েটি আপনার কাছ থেকে পালাতে থাকে। এবং বোধহয় রাহুর হাত থেকে আত্মরক্ষার জন্যই মাত্র পনেরো বছর বয়সেই মেয়েটি পাত্রস্থ হতে রাজি হয়ে যায়। আপনি উন্মাদের মতো সেই বিয়ের আসর ভাঙচুর করতে গিয়ে প্রহৃত হন। আপনার কিছুদিন হাজতবাসও হয়েছিল।
ইয়ে, ওসব পুরনো কথা থাক। বিয়ে-টিয়ে আমি আর করছি না বাপু।
তাই কি হয় প্রভু? আপনি বিয়ে না করেন তা হলে সৃষ্টি স্থিতি লোপ পাবে। তাই আমার ওপর হুকুম হয়েছে আপনি রাজি না হলে আপনাকে কালের সরণি বেয়ে সেই আঠারো বছর বয়সে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার।
বলো কী?
আপনি রাজি হবেন?
বৈজ্ঞানিক হঠাৎ মৃদু একটু হাসলেন। তারপর মাথা নেড়ে বললেন, না। একবার ঘটে-যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃত্তির প্রয়োজন নেই।
তা হলে কী বার্তা নিয়ে ফিরে যাব প্রভু?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বৈজ্ঞানিক বললেন, কী একটা কথা আছে যেন, পুত্রার্থে ক্রিয়তে ভাৰ্যা, না?
হ্যাঁ প্রভু।
তাই হবে বাপু। ঘিনপিত ঝেড়ে ফেলে, তোমাদের মুখ চেয়ে বরং বরণমালায় ফাঁসিই হোক আমার।
প্রণাম, প্রভু, প্রণাম।
রাতে ঘুম হয়নি। ভোররাত অবধি ডায়েরিতে কাহিনীটা লিখে অমল কিছুক্ষণ বসে বসে ভাবল। কী লিখছে সে এসব? কেন লিখছে?
ভোরের আলো ভাল করে ফোটার আগেই সে রাপার মুড়ি দিয়ে বেরিয়ে পড়ল। আজ কলকাতায় ফিরে যাবে তারা। একটু ঘুরেফিরে গ্রামটা দেখে নিলে হয়। কলকাতায় এমন অঢেল সময় আর পরিসর নেই। কলকাতা তার ভালও লাগে না আর। প্রচুর টাকা মাইনের চাকরিও তাকে আকর্ষণ করে না। কেন যে এসব হচ্ছে!
অনেকটা হাঁটল অমল। হেঁটে হেঁটে বাসরাস্তা অবধি চলে গেল। দোকানে বসে ভাঁড়ে চা খেল দুবার। লোকজনের যাতায়াত দেখল। অর্থহীন সময় বয়ে যাচ্ছে। কর্মহীন সময়। আসলে সময় বলে তো কিছু নেই। আছে গতি ও অবস্থান। আছে অবস্থানগত পরিবর্তন। সব ঘটে আছে, পর্যায়ক্রমে সেগুলি সামনে আসে বা পিছনে সরে যায়।
সে যখন পারুলকে ভালবাসত, কিংবা পারুল তাকে, সেটা কি অতীত? নাকি সেটাও বর্তমান, কিন্তু পরিদৃশ্যমান নয়। ঘটনাটা এখনও ঘটছে, শুধু তা দৃশ্যমান নয়। পৃথিবীর জন্ম ও মৃত্যু, মহাজগতের জন্ম ও মৃত্যু সবই একই সঙ্গে ঘটে আছে। শুধু তা খণ্ড খণ্ড করে দেখা যাচ্ছে—এই যা।
গভীর অন্যমনস্কতায় ফিরে আসছিল অমল। চেনা রাস্তায় পা তাকে নিয়ে যাচ্ছে মাত্র, সে কিছু দেখছে না। চলছে।
অমলদা।
চোখ তুলে অমল হঠাৎ দেখল কুড়ি বছর আগে সে দাঁড়িয়ে রয়েছে। সামনে পারুল।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন