সপ্তদশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সতেরো

মানুষের শরীরের ভিতরে যেসব হাজারো জটিলতা রয়েছে তার খবর পান্নার জানা নেই। কিন্তু কণ্ঠনালির ভিতরে শ্বাস আর খাদ্যের নলের মধ্যে যে একটি ভয়ংকর বিপজ্জনক ফোকর রয়েছে সে খবরটা সে খুব ভাল জানে। যখন ছোট ছিল, অস্পষ্ট স্মৃতির সেই সময়ে কেউ তাকে ভয়টা দেখিয়ে রেখেছিল, খাদ্যনালি থেকে মাঝে মাঝে ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল শ্বাসনালিতে গিয়ে আটকে দম বন্ধ করে দেয়। সেই শৈশবের শেখা ভয় পান্নাকে আজও ছাড়েনি। বরং যত বয়স বাড়ছে তত ভয় বাড়ছে। জ্ঞানবয়সে আজ অবধি ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল গিলে খেতে পারল না পান্না।

এ-বাড়ির বাঁধা ডাক্তার ছিলেন মণিরাম। ধুতি জামা পরা ডাক্তার আজকাল আর দেখা যায় না। মণিরাম সেই বিরলবেশের ডাক্তার। কে জানে ওই পোশাকের জন্যই শেষ দিকটায় মণিরামের পশার কমে গিয়েছিল কিনা। ধুতি পরা ডাক্তার দেখে অকারণেই এ যুগের রুগিরা নাক সিঁটকোয়। ঠিক ঠিক নির্ভর করতে পারে না বোধহয়। কিন্তু মণিরাম বিচক্ষণ ডাক্তারই ছিলেন। বর্ধমান থেকেও তাঁর ডাক পড়ত। ইদানীং জনা দুই ছোকরা প্যান্ট-শার্ট পরা ডাক্তার এসে মণিরামকে অস্তাচলে ঠেলে দিয়েছিল।

মণিরামই পান্নাকে বলেছিলেন, ক্যাপসুল গিলতে পারিস না, কিন্তু অত বড় ভাতের গরাসটা গিলিস কী করে?

ভাতের গ্রাস আর ক্যাপসুল কি এক হল জ্যাঠামশাই?

না, তা হল না। কারণ ক্যাপসুল ভাতের গরাসের চেয়ে অনেক ছোট।

তা হোক, ক্যাপসুল বলে কথা। ও আমি গিলতে পারব না। জলে গুলে খেয়ে নেব।

মণিরাম মাথা নেড়ে বলতেন, সে তো অশৈলী কাণ্ড। সব ট্যাবলেট আর ক্যাপসুল কি গুলে খাওয়া যায়? খাওয়া উচিতও নয়। খা দেখি আমার সামনে, কেমন না পারিস!

পান্না পারেনি। চেষ্টা করেছিল, কিংবা বলা ভাল চেষ্টা করার ভান করেছিল, তারপর জলসুদ্ধ ক্যাপসুল ফেলে দিয়েছিল মেঝেয়। মা সেই ভেজা ক্যাপসুল কুড়িয়ে শেষে জলে গুলেই খাইয়েছিল। মণিরাম মাথা নেড়ে বলেছিলেন, এভাবে তো সারাজীবন পারবি না। এখন থেকে ছোট ছোট হোমিওপ্যাথিক বা বায়োকেমিক ট্যাবলেট গিলে গিলে প্র্যাকটিস কর। নইলে পরে বিপদে পড়বি।

প্র্যাকটিস আর করা হয়নি। কণ্ঠনালির রহস্যময় জটিলতা তাকে আজও আতঙ্কিত করে।

ডা. মণিরাম বেঁচে নেই। তাঁর পুরনো স্টেথোস্কোপ, প্রেশার মাপার যন্ত্র, গোরু-ছাগল-পুকুর-জমি-বাড়ি সব পড়ে আছে। ছেলেরা কেউ ডাক্তার হয়নি বলে স্টেথো আর প্রেশারের যন্ত্রে ধুলো পড়ছে।

পান্নার জ্বর এল বিজয়া দশমীর শেষ রাতে। জ্বর যে আসবে তা পান্নার জানাই ছিল। বিজয়া দশমীর বিকেলে নিগ্রোর চুলের মতো কোঁকড়া ও কালো একটা মেঘ দিগন্তে আততায়ীর মতো উঠে এল। তখন প্রতিমা লরির খোলে তোলা হয়ে গেছে আর মেয়েরা সব হাঁচোড়-পাঁচোড় করে উঠছে লরিতে। লরিতে ওঠাও যেন এক যুদ্ধ। টুলের ওপর দাঁড়িয়ে শাড়ি সামলে উঠতে গিয়ে সে মুখ থুবড়ে পড়ল লরির নোংরা পাটাতনে।

মা অবশ্য বারণ করেছিল, যাসনি পান্না। দহে অনেক জল। তুই কিন্তু সাঁতার জানিস না।

মায়ের বারণ তেমন না শুনলেও চলে। মা কিছু নরম মানুষ। আর বাড়ির লোকের তো সবটাতেই বারণ। শুনলে কি চলে? তাদের তিন বাড়ির প্রায় সব মেয়েই যখন যাচ্ছে তখন পান্নাই বা পড়ে থাকবে কেন?

কিন্তু নিগ্রোর মাথার মতো মেঘটা একটু চিন্তায় ফেলেছিল পান্নাকে। মেঘটা ফুঁসে ফুলে উঠেছিল ক্রমে। যেন হঠাৎ এক অদৃশ্য আগ্নেয়গিরি মাটি ফুঁড়ে উঠে এসেছে, ওগড়াচ্ছে তার ভিতরের চেপে-রাখা রাগ।

বাদ্যিবাজনাসহ সামনে একটা পদাতিক মিছিল, পেছনে প্রতিমাসহ মেয়েদের লরি, তার পিছনে আরও দুটো লরিতে ক্লাব আর পাড়ার ছেলেমেয়েরা। লরির খোলের মধ্যে পাতা শতরঞ্চিতে ঠাসাঠাসি বসে বন্ধুদের সঙ্গে গল্প করতে করতে এক একবার আততায়ী মেঘটাকে দেখছিল পান্না। দেখেছিল পরমাণু বোমার মতো বিশাল ছত্রাকে আকাশের অর্ধেক ঢেকে ফেলেছে প্রায়, ছত্রাকের নীচে পাঁশুটে এক অতিকায় স্তম্ভ। সত্যিই কি অ্যাটম বোমা ফেলল নাকি কেউ?

দুটো কারণে মেঘটাকে ভয় পাচ্ছিল পান্না। এক তো আজকের ভাসান ভাসিয়ে দেবে। দ্বিতীয়ত, তার সর্দির ধাত। একটু ঠান্ডা লাগলেই ফুচফুচ হাঁচি আর খুকখুক কাশি আর ঘুসঘুসে জ্বর আর টিপটিপ মাথা ধরা। বৃষ্টির জল তার একদম সয় না। আর কেউ তার মতো নয়। আর সবাই বৃষ্টিতে ভিজে ঠিকঠাক থাকবে, পান্না থাকবে না। তবু বিজয়া দশমী বলে কথা। আজ একটু হুল্লোড় না করলে চলে? পান্না চেপে বসে রইল।

বৃষ্টির আগে একটা বাতাস আসবেই। অগ্রদূত। বাতাসে বৃষ্টির মিঠে গন্ধটা থাকে, আর থাকে হিম। ঝোড়ো বাতাসটা ওই ভিড়ের মধ্যেও ঠিক পান্নাকে খুঁজে নিয়ে ছুঁয়ে ফেলল, চোর চোর খেলার চোরের মতো। গায়ে কাঁটা দিল পান্নার।

মেঘ গম্ভীর গলায় সিংহের মতো ডেকে উঠল দূরে। তারপর গর্জন করতে করতে এগিয়ে আসতে লাগল। এসব ঘটনা কেউ গায়ে মাখল না, কিন্তু পান্না আঁচল তুলে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টায় মাথা ঢাকা দিয়েছিল। বৃথা চেষ্টা।

পান্নাকে লক্ষ করে বরফকুচির মতো প্রথম বৃষ্টির ফোঁটাটি নিক্ষেপ করল মেঘ। পান্না কেঁপে উঠল শীতে। তারপর সরু, ঠান্ডা ভূতের অজস্র আঙুলে তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলল বৃষ্টি। নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা ছেড়ে অসহায়ভাবে পান্না শুধু বলেছিল, হায় ভগবান!

আর সেই বৃষ্টিতে আনন্দে অনেকেই কোলাহল তুলেছিল। বিশেষ করে বাচ্চারা। তারা যে-কোনও অঘটনই খুব পছন্দ করে। ভিজছে আর আনন্দে হি-হি করে হাসছে। হাত বাড়িয়ে চেটো পেতে ধরার চেষ্টা করছে বৃষ্টির জল।

আনন্দ পান্নাও করেছিল কিছুক্ষণ।

বৃষ্টির মধ্যেই দহের ফুটন্ত জলে প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে জলে নেমে দাপাদাপি করেছিল অনেকে। পান্না নামেনি। শরীর জুড়ে জ্বরের ঝংকার টের পাচ্ছিল সে।

পারুলদি বলল, এমা! তোর কী হবে রে পান্না?

কী আবার। জ্বর আসবে।

তুই যে কেন এলি! ছাতা-টাতা কিছু আনিসনি?

পাগল! বিসর্জনে কেউ ছাতা আনে?

শোন, তুই বরং ড্রাইভারের পাশে গিয়ে বোস। আর ভিজিস না। যা ঠান্ডা জল!

ওখানে বসলে যে আলাদা হয়ে যাব।

কিছু আলাদা হবি না। সবাই তো সঙ্গেই রয়েছে। দাঁড়া, বিজুকে বলছি তোকে সামনে তুলে দিক।

তাই হল শেষ অবধি। ড্রাইভারের পাশে তার অ্যাসিস্ট্যান্ট ছিল। আরও জনা দুই বুড়োবুড়ি। তাদের পাশে ঠাস হয়ে বসে ফেরার সময়ে পান্নার শরীর ভেঙে আসছিল। ভেজা শাড়ি শায়া, ভেজা শরীরে বাতাস লেগে শিহরিত হচ্ছিল গা।

যখন বাড়িতে এসে পৌঁছল তখন একশো দুই জ্বর। সকালে উঠল চারে। এবং দুপুরে সাড়ে চারে উঠে গেল। চিন্তিত মা ঘর-বার করছে। মা মানেই বকুনি, মা মানেই শাসন।

কতবার বারণ করলুম যেতে, তবু শুনলি সেই কথা। তোর কি আর পাঁচটা মেয়ের মতো স্বাভাবিক ধাত? পচা শরীর তোর যখন-তখন ঠান্ডা লাগে, টনসিল ফোলে, তার ওপর ওরকম মুষলধারের বৃষ্টিতে অতক্ষণ ভেজা!

আরও চলত কিছুক্ষণ।

হঠাৎ সেই চিরাচরিত ঝ্যালঝ্যালে লম্বা ঝুলের বিচ্ছিরি জামা পরা একটা মেয়ে এসে দাঁড়াল দরজায়।

মাই গড! তোমার কি জ্বর? চোখ দুটো তো খুব লাল দেখাচ্ছে!

আবছা একটু হাসল পান্না। ক্ষীণ গলায় বলল, ওই চেয়ারটা টেনে বোসো।

কাল খুব ভিজেছ বুঝি?

হ্যাঁ।

শুনেছি তোমরা সব ভাসানে গিয়েছিলে।

তুমিও গেলে না কেন সোহাগ? কতবার বললুম।

অত ভিড় আমার ভাল লাগে না। আর যা শব্দ।

খুব আনন্দ হয়েছিল কিন্তু।

মুখ টিপে হেসে সোহাগ বলে, একটু একটু ইচ্ছেও হচ্ছিল। শেষ পর্যন্ত ভাবলাম, আমি তো অনেককেই চিনি না।

যাঃ, না চেনার কী আছে! প্রতিমার লরিতে তো আমরাই সব ছিলাম বাবা। সব মেয়েরা। তোমার গডেসও ছিল।

সোহাগ একটু হাসল। তারপর ফের বলল, একটু একটু ইচ্ছে যে হয়নি তা নয়। চুপি চুপি গিয়ে প্যান্ডেলের কাছে দাঁড়িয়েছিলাম। কিন্তু কেউ ডাকল না দেখে আর এগোইনি৷

আমি দেখতে পেলে ঠিক তোমাকে তুলে নিতাম।

তোমাকেই খুঁজছিলাম। দেখতেই পেলাম না ভিড়ের মধ্যে। এই জন্যই ভিড় আমার ভাল লাগে না। ভিড়ে আইডেন্টিটি হারিয়ে যায়।

সবুজ সংঘের পুজো অনেকটা বাড়ির পুজোর মতোই। অচেনা তো কেউ নয়।

আমার কাছে সবাই প্রায় অচেনা।

তা অবশ্য ঠিক।

তোমরা চলে যাওয়ার পর আমার একটু মন খারাপ লাগছিল। মনে হল, আমি আর একটু মিশুক হলে ভাল হত।

তুমি কি লাজুক?

ঠিক তা নয়।

তবে কি অহংকারী?

একটু বোধহয় তাই। সবাইকে ইনফিরিয়র ভাবা ভীষণ অন্যায় জানি। কিন্তু আমার ওই এক স্বভাব।

যাঃ, তুমি মোটেই অহংকারী নও। আমার সঙ্গে ভাব হল কী করে বলো?

তুমি বোধহয় অন্যরকম।

একটুও না। তবে আমিও কিন্তু একটু অহংকারী। কীসের অহংকার জানি না বাবা। তবে আছে একটু। বন্ধুরা বলে, তোর ভীষণ দেমাক।

তুমি কথা বলতে গিয়ে হাঁফিয়ে পড়ছ। আর কথা বোলো না। চুপ করে চোখ বুজে শুয়ে থাকো। আমি কি তোমার জন্য কিছু করতে পারি?

কী করবে?

মাথা টিপে দিতে পারি বা আইসব্যাগ ধরতে পারি।

না, না, তুমি বসে থাকো। আমার এখন একটু ভাল লাগছে। অসুখ হলে বড্ড একা লাগে।

পান্না বাস্তবিক বড্ড ক্লান্ত বোধ করছিল। চোখ বুজতেই কেমন যেন এক আচ্ছন্নতায় তলিয়ে গেল কিছুক্ষণের জন্য। হিজিবিজি স্বপ্নে ভরে গেল মাথা। তারপর চটকা ভেঙে চেয়ে দেখল, সোহাগ তখনও বসে আছে, চলে যায়নি। একটা হাত রেখেছে তার কপালে।

পান্না ক্ষীণ হেসে বলে, আমি একটু ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। আর তার মধ্যেই একটু স্বপ্নও দেখে ফেললাম।

তুমি ঘুমোও।

তুমি থাকবে তো?

একটু থাকব। আমার তো কোনও কাজ নেই।

চুপচাপ বসে থেকো না। কথা বলো। নিস্তব্ধতা আমার ভাল লাগে না।

তোমাকে একটা কথা জিজ্ঞেস করব?

করো না।

একটা লম্বামতো ছেলে, খুব ফর্সা, কাঁধে একটা বাঁদর নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, ছেলেটা কে বলো তো!

পান্না হি হি করে হেসে ফেলল, ও তো বিজুদা, ওর অদ্ভুত অদ্ভুত সব কাণ্ড। কোথা থেকে একটা বাঁদর এনেছে পুষবে বলে। আমাদের গায়ে ছেড়ে দেয় মাঝে মাঝে। ভয় পাই না।

দ্যাট হিরো!

বিজুদা কিন্তু ভীষণ ভাল। ব্রিলিয়ান্ট ছাত্র।

উনি একজন ডু গুডার, তাই না?

হ্যাঁ। কেন বলো তো?

কাল যখন তোমরা ভাসানে যাচ্ছিলে তখন আমাকে একা প্যান্ডেলের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উনি এসে বললেন, তুমি যাবে না খুকি?

এই যে তুমি বললে তোমাকে কেউ ডাকেনি? বিজুদা তো ডেকেছিল।

মাথা নেড়ে সোহাগ বলল, মোটেই ডাকেনি।

তা হলে?

উনি কথাটা এমনভাবে বলেছিলেন যাতে আমি খুব অপমান বোধ করেছি।

সে কী? বিজুদা তো সেরকম নয়।

জুতোর পেরেক কোথায় ফোটে তা টের পায় শুধু জুতোটা যে পরে। আর আমি কি খুকি?

ওঃ, খুকি বলায় তুমি রাগ করেছ বুঝি?

সেটাও একটা কারণ। আর বলার ধরনটাও ছিল ঠাট্টার মতো। আমার একটুও ভাল লাগেনি।

তুমি ভুল বুঝেছ সোহাগ। বিজুদা সেরকম ছেলেই নয়।

সেটা তোমার চোখে। আমার চোখে নয়।

তোমাকে বিজুদা অপমান করবে কেন বলো তো! তুমি তো কিছু করোনি।

করেছি। আমি ওঁর সাহায্য রিফিউজ করেছি। যে বাজে ছেলেগুলো আমাকে দেখে কমেন্ট করত উনি তাদের শাসন করতে চেয়েছিলেন। আমি বড়মাকে বলে দিয়েছি ওর সাহায্যের কোনও প্রয়োজন আমার নেই।

ওঃ, তুমি ভীষণ একগুঁয়ে মেয়ে। ছেলেগুলোকে যে একটু ভয় দেখানো দরকার সেটা কেন বোঝে না। প্রশ্রয় দিলে যে বাড়াবাড়ি করতে থাকবে। তোমাকে দেখে যে ভীষণ খারাপ খারাপ কথা বলছিল সেদিন।

সবাই ওকথা বলে। কিন্তু আমার কথা হল, লড়াই যদি করতেই হয় তবে আমিই করব। আমার কোনও বডিগার্ডের দরকার নেই।

পান্না খুব ক্লান্তি বোধ করে চোখ বুজল। সোহাগকে তার মাঝে মাঝে খুব ভাল লাগে, মাঝে মাঝে খুব খারাপ। এখন খারাপ লাগছে।

সন্ধেবেলা একজন ডাক্তারকে ধরে নিয়ে এল বাবা। নতুন ডাক্তার। জ্বরের ঘোরে খুব আবছা চেহারাটা দেখতে পেল পান্না। লোডশেডিং বলে হ্যারিকেনের আলো জ্বলছে। সেই আলোয় বড় বড় ছায়া পড়েছে চারদিকে। ভূত-ভূত আলো-আঁধারিতে সবকিছুই যেন ভাসমান।

মাথার যন্ত্রণায় চোখে জল আসছে। সেই অস্পষ্ট চোখে সে হঠাৎ আবিষ্কার করল, ডাক্তারের মুখটা খুব গম্ভীর। তার কি তবে সাংঘাতিক কিছু হয়েছে? সে কি মরে যাবে?

আমার কী হয়েছে ডাক্তারবাবু?

স্টেথোস্কোপ বুকে লাগিয়ে ডাক্তার গম্ভীর গলায় বলল, কথা বলবেন না। জোরে শ্বাস নিন।

আমার সারা গায়ে খুব ব্যথা।

জানি। ব্যথা হওয়ারই কথা। জোরে শ্বাস নিন।

বুকে লাগছে যে শ্বাস নিতে।

যতটা জোরে পারেন।

আমি মরে যাচ্ছি না তো!

মরা কি মুখের কথা? দেখি পাশ ফিরে শোন তো একটু।

ম্যালিগন্যান্ট ম্যালেরিয়া নয় তো! কিংবা মেনিনজাইটিস!

আজকাল রুগিরা বেশ ভাল ডাক্তারি বুঝে গেছে দেখছি।

একটু আগে আমার মা পাশে বসে কাঁদছিল যে! মায়েরা অল্পেই কাঁদে।

আপনি গম্ভীর কেন? বাবার মুখেও হাসি নেই।

আপনি চোখ বুজে থাকলেই ভাল হয়। আপনার কিছু হয়নি তেমন। পালসটা একটু দেখি।

লেপের তলা থেকে হাতখানা বের করে দিতেই যেন কত পরিশ্রম হল পান্নার।

এবার জিবটা বের করুন।…এবার হাঁ করুন তো, গলাটা একটু দেখব।

প্লিজ চামচ ঢোকাবেন না কিন্তু, আমার বমি হয়ে যাবে।

আচ্ছা আচ্ছা, চামচ ছাড়াই দেখে নিচ্ছি। বড় করে হাঁ করুন।

মণিরাম জ্যাঠাও এইভাবেই দেখতেন। খুব মন দিয়ে। নাড়ি ধরে অনেকক্ষণ চোখ বুজে থাকতেন। স্টেথোস্কোপ বসাতেন চেপে চেপে। নানারকম প্রশ্ন করতেন। পায়খানা, পেচ্ছাপ, খিদে সবকিছুর খতেন নিয়ে তবে প্রেসক্রিপশন লিখতেন। এ ডাক্তার অবশ্য অত সময় নিল না। প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে বলল, জ্বর খুব বাড়লে ঠান্ডা জলে গা স্পঞ্জ করে পাখার বাতাস করবেন। জ্বর নেমে যাবে। প্যারাসিটামলটা দুবারের বেশি দেবেন না।

মা অবাক হয়ে বলে, ঠান্ডা জলে?

হ্যাঁ। ভয় নেই, কিছু হবে না।

ডাক্তারটা বোধহয় পাগল। এমনিতেই শীতে মরে যাচ্ছে পান্না, ঠান্ডা জল গায়ে দিলে সে তক্ষুনি হার্টফেল করবে।

পথ্যি কী দেব ডাক্তারবাবু?

কেন, ভাতরুটি যা খেতে চায়?

এই জ্বরে ভাত?

হ্যাঁ, ভাতে কোনও ক্ষতি হবে না।

ডাক্তারটার মাথা খারাপ। মণিরাম জ্যাঠা জ্বর সারবার পরেও আরও দুদিন ভাত পথ্য দিতেন না। স্নান নিষিদ্ধ ছিল বেশ কয়েকদিন। বার্লি ছাড়া পথ্য ছিল না।

কী দিলেন ডাক্তাবাবু? ক্যাপসুল?

হ্যাঁ। কেন বলুন তো।

আমি ক্যাপসুল গিলতে পারি না।

সে কী? ক্যাপসুল না খেলে অসুখ সারবে কেমন করে?

লিকুইড নেই?

লিকুইড। না, এই হাই পোটেনসিতে লিকুইড পাওয়া যায় না।

আমি যে গিলতে পারি না। ক্যাপসুল গুলে খেতে রয়।

ডাক্তারবাবুটি হাসলেন। কিন্তু উপদেশ দেওয়া বা জবরদস্তির চেষ্টা না করে বললেন, সেভাবেই খাবেন। তবে একটু তেতো লাগবে হয়তো। অরেঞ্জ স্কোয়াশ থাকলে তাতে গুলেও খেতে পারেন।

ক্যাপসুল গিলতে পারি না বলে আপনি কই বকলেন না তো!

ডাক্তারবাবুটি ফের হাসলেন, অনেকের সাইকোলজিক্যাল প্রবলেম থাকে, ওষুধ গিলতে ভয় পায়। বকবার মতো কিছু তো নয়। আমার এক জামাইবাবু আছেন, তিনিও ট্যাবলেট গিলতে পারেন না।

বাঁচল পান্না, শ্বাস ফেলল একটা।

আচ্ছা এনকেফেলাইটিস বলে একটা অসুখ আছে, না! সেটা হলে কী হয়?

খারাপ হয়।

মরে যায়?

মরতেও পারে।

আমার এনকেফেলাইটিস হয়নি তো!

আপনি খুব খারাপ খারাপ অসুখের কথা ভাবতে ভালবাসেন বুঝি?

আমার যে মনে হচ্ছে আমি মরে যাব।

অসুখ হলেই অনেকের ওরকম মনে হয়।

টাইফয়েড হয়নি তো!

সেটা এত আর্লি স্টেজে তো বলা যাবে না। তবে আপনার জ্বর হয়েছে ঠান্ডা লেগে। বুকে সর্দি জমেছে। ভয় পাওয়ার কিছু নেই।

কয়েক মুহূর্তের জন্য তন্দ্রার ভিতরে চলে গেল পান্না। দেখতে পেল মণিরাম ডাক্তার ঘোড়ায় চেপে রুগি দেখতে যাচ্ছেন, সাদা জামার ওপর ফর্সা রোদ পড়েছে।

কিন্তু মণিরাম জীবনে কখনও ঘোড়ায় চড়েননি। তাঁর ছিল একখানা বশংবদ সাইকেল। তা হলে ঘোড়াটা এল কোথা থেকে?

পান্না যখন চোখ মেলল তখনও ডাক্তার যায়নি। তবে উঠে দাঁড়িয়েছে। এবার যাবে। কারেন্ট আসায় ডাক্তারবাবুটিকে স্পষ্ট দেখতে পেল পান্না। বেশি বয়স নয়। ত্রিশ-বত্রিশ হবে হয়তো। তার দিকে চেয়ে হেসে বলল, দু-একদিনের মধ্যেই ঠিক হয়ে যাবেন। ভয় নেই।

পান্না চোখ বুজল এবং সঙ্গে সঙ্গে স্বপ্নের মধ্যে চলে গেল। মণিরাম জ্যাঠা পাশে এসে বসেছে। চোখে নিবিষ্ট দৃষ্টি।

দেখি, হাতখানা দে তো!

উঃ জ্যাঠা, আপনার হাত এত ঠান্ডা কেন?

ঠান্ডা! ঠাণ্ডাই তো হওয়ার কথা। তোর গায়ে যে জ্বর।

জ্যাঠা, আপনার কি ঘোড়া আছে?

হ্যাঁ। থাকবে না কেন?

ঘোড়ায় চেপে আপনি রুগি দেখতে যান?

হ্যাঁ। এই তো বিদ্যাধরীপুর থেকে এলুম। সেখানে কলেরা হচ্ছে।

ইস্। তা হলে আমার হাতটা ছাড়ুন। আপনার হাতে যে কলেরার জীবাণু রয়েছে।

তা আছে। খুব আছে।

এখন আমাকে যে সাবান দিয়ে হাত ধুতে হবে!

হ্যাঁ, ধোয়া ভাল। হাত ধোয়া খুব ভাল।

কতক্ষণ কে জানে। ফের চোখ মেলল সে। মাথার আইসব্যাগ থেকে সমস্ত শরীরে শীত ছড়িয়ে পড়ছে।

ওঃ মা, আইসব্যাগটা সরিয়ে নাও। ঠান্ডা লাগছে যে!

তোর যে জ্বর।

কত জ্বর?

একশো দুই-টুই হবে।

মোটেই না। আমার এখন একশো ছয় সাত হয়ে গেছে।

না না, অত নয়।

ডাক্তারবাবু কী বলে গেল?

কী আর বলবে?

আমার কী হয়েছে?

কী আবার হবে। জ্বর হয়েছে।

সাধারণ জ্বর নয় মা, আমি জানি।

এতই যদি জানো বাছা, তবে জ্বরটাকে ডেকে আনতে ভাসানে না গেলেই তো পারতে।

একটা দিন ভাসানে আনন্দ করব না?

আনন্দ তো এখন বেরোচ্ছে। এখন চিঁচিঁ না করে আনন্দ করলেই তো হয়।

তুমি একটা বিচ্ছিরি মা। পচা মা। অসুখ হলে কাউকে বকতে হয় বুঝি?

বকব না তো কি আহ্লাদ করব নাকি? পই পই করে বারণ করলুম, শুনলি সে কথা!

শোনো মা, আমি একটু আগে মণিরাম জ্যাঠাকে স্বপ্নে দেখেছি, জ্যাঠা এসে আমার নাড়ি দেখছিল। আমি কিন্তু আর বাঁচব না। মরা মানুষের স্বপ্ন দেখা খারাপ, তা জানো?

দুর্গা দুর্গা। ওসব কথা বলে না। বলতে নেই। বড় ডাক্তার দেখে গেছে। ভয়ের কী আছে মা?

ডাক্তারটি কে বলো তো! কখনও দেখিনি।

বর্ধমানের ডাক্তার। অনেক ডিগ্রি।

বর্ধমানের ডাক্তার যা বলে গেল শুনবে তো! জ্বরের মধ্যে আমাকে ভাত খেতে দেবে?

বড্ড ভয় পাই মা। কোনওকালে এমন অশৈলী কথা তো শুনিনি। আজকালকার তেজালো ওষুধের জোরে ওসব হয়তো চলে। কিন্তু ভাত না হয় জ্বর সারলেই খাস।

তা হলে ডাক্তার দেখিয়ে কী হবে?

পান্না ফের আচমকা স্বপ্নের জগতে চলে গেল। ঝোপের আড়াল থেকে কে একটা পাগলি তাকে ঢিল মেরেই লুকিয়ে পড়ল। ঢিলটা ঠং করে কপালে এসে লাগতেই মাথাটা ঝনঝন করে উঠল ভয়ংকর ব্যথায়।

কে? কে রে তুই?

পাগলিটা হি হি করে হেসে একটা ঝোপের আড়াল থেকে যখন আর একটা ঝোপের আড়ালে ছুটে গেল তখনই পান্না দেখতে পেল তার পরনে ঝ্যালঝ্যালে একটা বিবর্ণ জামা।

তুমি সোহাগ।

হি হি হি।

এমা! তুমি পাগল হলে কী করে?

ওরা যে আমাকে রেপ করল!

কারা রেপ করল তোমাকে?

ওই তো ওরা।

তুমি আমাকে ঢিল মারছ কেন?

ওরা পাজি। ভীষণ পাজি।

তোমাকে তো বলেইছিলাম ওদের একটু ভয় দেখানো দরকার। তুমি শুনলে না। বিজুদাকে কিছু করতেও দিলে না।

তোমার বিজুদা কি ভগবান?

তা কেন? বিজুদা একজন ডু গুডার।

ওকে আমার চাই না, বলে দিও। বেশ করেছে রেপ করেছে।

কাছে এসো সোহাগ। ঢিল মেরো না। আমি তো তোমার বন্ধু।

হি হি হি হি।

ফের চটকা ভেঙে গেল।

ওষুধটা খেয়ে নে!

তেতো বিচ্ছিরি ওষুধটা খেয়ে নিয়ে পান্না বলল, ইস, অরেঞ্জ স্কোয়াশ দাওনি। ডাক্তারবাবু বলে গেল যে!

ভুল হয়ে গেছে মা। এর পর থেকে দেব। আরও ওষুধ আছে। একটা ট্যাবলেট আর একটা ক্যাপসুল।

ভীষণ বেশি ওষুধ দেয় তো লোকটা।

তা দেবে না কেন। অসুখটাও তো ভালই বাধিয়েছ।

স্বপ্ন আর জাগরণের মধ্যে একটা মজার যাতায়াত চলছে তার। মায়ের সঙ্গে কথা বলতে বলতেই সে দুর্গা প্রতিমার মুখ দেখতে পাচ্ছিল কিন্তু মুখটা জলে ডুবে আছে। মা দুর্গা যেন চিৎকার করে বলছে, এই! এই! আমি ডুবে যাচ্ছি যে! আমি সাঁতার জানি না, আমাকে তোলো!

এক দঙ্গল ছেলেমেয়ের চেঁচামেচিতে মা দুর্গার চিৎকার চাপা পড়ে গেল। আর তখন মুষলধারে বৃষ্টি হচ্ছে। পান্না একজনের বুকে দুম দুম কিল মারতে মারতে বলল, কী করছ তোমরা! মা দুর্গাকে তোলো শিগগির! মা দুর্গা ডুবে যাচ্ছে যে!

লোকটা বলল, মা দুর্গাকে তুলতে নেই। আপনি ঘুমোন।

কেন ঘুমোব?

আপনি ঘুমিয়ে পড়ুন। সব দিকে নজর রাখার দরকার কী?

অবাক হয়ে পান্না দেখল, লোকটা নতুন ডাক্তারবাবুটি।

সে লজ্জা পেল। জ্বর নেমে যাচ্ছিল তার। মাথা ধরা কমে যাচ্ছে। গা ঠান্ডা হয়ে আসছে। শীত লাগছে না তেমন। প্যারাসিটামল খেলে এরকম হয় কিছুক্ষণের জন্য। সে জানে। জ্বর কমল বলেই বোধহয় স্বপ্নও আর তেমন দেখল না সে।

মা।

কী রে?

জল দাও।

মা জল দিল।

এখন রাত কত মা?

বারোটা।

আমাকে ওষুধ খাওয়াবে না?

খাওয়াব। তার আগে বার্লি।

ওয়াক।

ওরকম করতে হয় না মা।

ডাক্তারবাবু কি কাল আবার আসবে।

না তো! বড় ডাক্তার কি রোজ আসে?

পান্না একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। সে যদি বিয়ে করে একজন ডাক্তারকেই করবে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%