চুয়াত্তর অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

চুয়াত্তর

স্বপ্নহীন এক দীর্ঘ ঘুমের পর সে জেগে উঠল মাটির গভীর তলদেশে। সমস্ত শরীর জুড়ে বেজে যায় ক্ষুধার মাদল। অন্ধকারে সে কিছুই দেখতে পায় না। দেখার দরকারও নেই তার। তার চঞ্চল চেরা জিব মুহুর্মুহু ছোবল দিচ্ছে বাইরের বাতাসকে। বার্তাবহ ওই জিব তার কাছে অনেক সংবাদ পৌঁছে দেয়। নিজের দীর্ঘ চিত্রল শরীরের আলস্য এবার ঝেড়ে ফেলতে হবে। ফের জীবন ধারণ, ফের অন্বেষণ, ফের পলায়ন আর আত্মগোপন, ফের আত্মরক্ষার্থে আক্রমণ, স্মৃতিহীন, বোধ ও বিবেচনাহীন সে তার শরীরের সংকেত পেয়ে ধীর গতিতে একটু একটু করে এগোয়। শীতঘুমের পর তার শরীরে এখনও জড়তা, গতি শ্লথ। দীর্ঘ ঈষৎ আঁকাবাঁকা গর্তের মুখে গেলে অস্পষ্ট দিবালোকের একটা চাকতি। অন্ধকার থেকে বেরিয়ে এসে সে নিঃশব্দে তার চারদিকটা দেখে।

ধানের উঁচু করা মরাইয়ের মাচানের তলায় বিষয়কর্মে ব্যস্ত ইঁদুরের যাতায়াত। শোনা যায় তাদের দুর্বোধ্য কিচকিচ শব্দ। একটি ইঁদুর গর্তের মুখ দ্রুত পেরিয়ে গেল, তার মুখের ওপর দিয়েই। সে তার ক্ষীণ মস্তিষ্কের সামান্য জৈব প্রয়োজনভিত্তিক সতর্কতায় তার চারদিকটা অনুধাবন করে নিল। নিয়তি-তাড়িত দ্বিতীয় ইঁদুরটি সামান্য অনভিজ্ঞতাবশে এসে গিয়েছিল গ্রাসের দূরত্বে। খর দাঁতে কয়েক দানা ধান জিবোচ্ছিল সে। বিদ্যুতের গতিতে সে মুখে তুলে নিল তাকে। আঁকুশির মতো দাঁতে বিদ্ধ ইঁদুরটা প্রাণপণে চেঁচাল খানিক। তারপর কম্পিত, চমকিত ছোট্ট শরীরটা অতি কষ্টে প্রাণপণ আয়াসে সে গিলতে লাগল। দীর্ঘ উপবাসের পর এ কোনও সুস্বাদ নয় তার কাছে। এ শুধু প্রয়োজন। শুধুই প্রয়োজন। আর কষ্ট। মুখ থেকে গলা অবধি টেনে নিতেও কষ্ট। গলা থেকে পেট। তার আহার্য গ্রহণও এক ধৈর্যশীল, ক্লেশকর, ধীর প্রক্রিয়া। আহারের কোনও স্বাদ ও আনন্দ নেই তার।

সতর্ক ইঁদুরেরা সরে গেছে নিরাপদ আড়ালে। সে ঝিম ধরে পড়ে রইল অনেকক্ষণ। মাচার তলাকার আবহাওয়ায় ভ্যাপসা গরম। এই তার বহির্গমনের উপযুক্ত ঋতু। ক্ষীণ দৃষ্টির চোখে সে মাচানের বাইরে রোদের ঝকঝকে তলোয়ার দেখতে পাচ্ছে, আলো ও ছায়াকে দ্বিখণ্ডিত করে সে এখন অপেক্ষা করছে তার জন্য।

সে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল।

চোখের কি আনন্দ হয়? মনে হয় সব অঙ্গপ্রত্যঙ্গেরই নিজস্ব আনন্দ, দুঃখ, বিষাদ ও উল্লাস আছে। হয়তো সবাই টের পায় না, কিন্তু সে পায়। ধীরেন জানে, অন্য সবাই তাকে ছিটিয়াল বলেই মনে করে। তা আছে বোধহয় তার মাথায় একটুছি্‌ট। যে মাথায় কাজের চিন্তা নেই, যে মাথায় বিদ্যে নেই, সৎ- কথা নেই, যে মাথা নিজের অস্তিত্বের বাইরে বাদবাকি দুনিয়াটা নিয়ে ভাবল না সে মাথায় ছিট হবে না তো কি? তা আছে একটু ছিট। দুনিয়াটাও তো বড্ড ছোট তার। আগে তবু এ-গাঁ ও-গাঁ গতায়াত ছিল, গত কয়েক বছর এই গাঁয়ের গাছেই বড় আটক পড়ে গেছে।

এই যে দুনিয়াটা দেখা যাচ্ছে এটা কিন্তু এক মাপের নয়, এক চৌহদ্দিও নয় এর। লোক বুঝে দুনিয়াও ছোট-বড় হয়। এই গৌরহরিদা ছিলেন, তাঁর দুনিয়াটা কি ধীরেনের মতো ছোট রে বাবা! কত লোকজন আসছে যাচ্ছে, এসোজন-বোসোজন, মক্কেল-মুরুব্বি, উকিল-মুৎসুদ্দি, জজ-ব্যারিস্টার নিয়ে বিরাট ব্যাপার। কত লোকের সঙ্গে নিত্যি যোগাযোগ, কত জীবনের কত কথা এসে যোগ হচ্ছে জীবনে, যেমনটা খালবিল নদীনালার জল এসে দরিয়ায় পড়ে, তবে না বারদরিয়ার অত বড় প্রসার। সেই তুলনায় ধীরেনের ডোবায় জলই নেই মোটে। ছোট্ট এঁদো-পুকুর বই তো নয়।

পাঁচটা লোকের সঙ্গে কথা কইতে আর শুনতে বরাবর বড্ড ভালবাসে ধীরেন। কিন্তু তার সঙ্গে কথা কইবে কে? কার গরজ! তাই সে গিয়ে সন্ধেবেলার দিকে গৌরহরিদাদার চেম্বারে এক কোণে চেপে বসে থাকত। কথা শুনত। মামলা-মোকদ্দমার কূট কথাই সব। তবু তাইতেও ভারী আনন্দ হত তার। কত কী শোনা হয়ে যাচ্ছে, জীবনে যোগ হচ্ছে কিছু। গৌরহরিদা কিছু বলত না। কথা শোনা আর লোকের মুখচোখ হাবভাব দেখা। নেশার মতো ছিল ব্যাপারটা! গৌরহরিদাদা মাঝে মাঝে তাকে জিজ্ঞেস করত এই লোকটাকে দেখে কিছু বুঝলি? কেমন গোলগাল ভালমানুষের মতো মুখ, দেখে বোঝা যায় যে আটটা খুন করেছে? বড় মাপের মানুষের সঙ্গে মেলামেশা করলে নিজের মাপটাও একটু একটু করে বাড়ে।

কিন্তু কথা হল, ধীরেনেরও একটা আলাদা ছোট দুনিয়া আছে, যেমন সব মানুষেরই থাকে। সেই দুনিয়ায় ধীরেনের বোকা-বুদ্ধিতে নানা অদ্ভুত জিনিষ ধরা দেয়। এই সেদিন রাখাল রায়ের বাড়িতে দ্বাদশ ব্রাহ্মণ খাওয়াল। মায়ের বাৎসরিক, ধীরেন বামুন নয়, তবু পুরনো একটু আত্মীয়তা ছিল বলে তাকেও ডেকেছিল খেতে। ধীরেন এখন তু বললেই যায়। তা খাসির মাংস হয়েছিল সেদিন! হাড় চিবোতে গিয়ে ধীরেন টের পেল যৌবনকালে মাংস খাওয়ার সময়ে দাঁতের একটা আলাদা আনন্দ হত। মোটা মোটা হাড়ের মধ্যে ননী লুকিয়ে থাকে। চুষলে বেরোতে চায় না। পিছন দিকটা ভেঙে ভেন্টিলেশন না করে নিলে ওই ব্যাটা ননী বেরোবেও না। তা তখন দাঁতের জোর ছিল বটে, কড়াক করে মোটা হাড়ের গোড়া ভেঙে হাড়ের ভিতরে লুকিয়ে থাকা ননী বের করত। রাখালের বাড়িতে সেদিন খেতে বসে দেখল দাঁতের আর আনন্দ হচ্ছে না। হাড় ভাঙতে গিয়ে দাঁতই ভেঙে যাওয়ার দশা, ননীচোরা হাড় পাতে ফেলেই উঠতে হল।

বুড়ো হলে কোনও কোনও প্রত্যঙ্গে আনন্দ কমে যায় বটে, তবে কিছু থাকেও। এই যে তার চোখ দুখানা, দুটোতেই ছানি পড়েছিল। যত মলিন হল দৃষ্টি ততই যেন চোখ দুখানা মন খারাপ করে থাকত। এখন বাঁ চোখের ছানি কাটার পর একটা চোখে আনন্দ নেচে বেড়াচ্ছে। দেখে দেখে যেন আর ফুরোতে চায় না দেখা। কত কী দেখতে পায় ধীরেন এখন, মনে হয় যেন যৌবনকালেও এত ভাল দেখতে পেত না। সবই ভারী নতুন নতুন লাগে আজকাল।

নিজের বউয়ের মুখখানা সেদিন ভাল করে দেখছিল। সোজাসুজি নয়, সোজাসুজি তাকাবে অত সাহস আর নেই ধীরেন কাষ্ঠের। বউ পাঁজি না কী একটা উলোঝুলো চটি বই খুলে দেখছিল দাওয়ায় বসে। পাশ থেকে বাঁ চোখ দিয়ে খুব মন দিয়ে দেখছিল ধীরেন। কিছু ইতরবিশেষ মনে হল না। যৌবনের মুখটা তো নেই, সেই জায়গায় কোন কুমোর এসে যেন আর একখানা মুখ বসিয়ে দিয়ে গেছে। যৌবনেও খ্যাঁকানো স্বভাব ছিল, তবে একটা চটক ছিল তখন। দেখতে তেমন খারাপ ছিল না, স্বভাবটা আরও তিরিক্ষে হয়েছে, আর মুখটা যেন অন্য মানুষের মুখ। তবু এই বউকে নিয়েই তো তার উত্তাল যৌবন ভারী উদ্দীপ্ত হত।

আজও কি হয়? নির্লজ্জ ধীরেন কাষ্ঠ সেই রাতে, এই বৃদ্ধ বয়সে তার বউয়ের কাছে শরীর চেয়েছিল। ওই বয়সে ভাঁটিয়ে-যাওয়া শরীর। তার বউ খুব অবাক হয়ে তার দিকে হ্যারিকেনের নিবু-নিবু আলোয় চেয়ে থেকে বলেছিল, গলায় দড়ি দাও গে। বেহায়া বেল্লিক পুরুষ।

না, অপমান আর গায়ে লেগে থাকে না আজকাল। তবে অপমানে পুরুষের কামজ্বর ছেড়ে যায়। সুরুত করে পারদ নেমে যায় নীচে। তবে ধীরেনের আত্মগ্লানি নেই। চেয়েছিল, দিল না, ব্যস।

তবে এই যে অনেকদিন পর কাম ভাবটা, এটা বোধহয় ছানি কাটানো চোখটারই গুণ। নইলে হয় কী করে?

ধীরেন ভেবেছিল, বাকি জীবনটা এক চোখেই কাটিয়ে দেওয়া যাবে। ডান চোখ কাটানোর হাঙ্গামায় আর যাবে না। আজকাল ভাবে, তা কেন, এবার ডান চোখটাও কাটিয়ে নেওয়া যাক। শুধু দেখাই তো নয়। চোখের ভিতর দিয়ে নানা দৃশ্য এসে তার ভিতরটাকেও বোধহয় ঝাড়পোঁছ করে দিচ্ছে। পুরনো ঘরে নতুন রং লাগাচ্ছে। চোখের আনন্দে তার ভাঁটিয়ে-যাওয়া বয়সও ফিরে আসছে বুঝি।

দুজনে কফি খেতে খেতে মহিম গম্ভীর মুখ করে সব শুনল। তারপর একটু হেসে বলল, তোর মাথাটাই গেছে। পাগল কোথাকার! অঙ্গপ্রত্যঙ্গের আবার আলাদা করে আনন্দ হয় নাকি? যত সব বাহাত্তুরে কথা।

ধীরেন কাষ্ঠ তর্ক করে না। তার পেটে বিদ্যে আর মাথায় বুদ্ধি কোনওটাই নেই। বড় মানুষদের সঙ্গে তাই সে কখনও কথার লড়াইতে নামে না। সে জানেই বা কতটুকু, বোঝেই বা কি। কিন্তু প্রকাশ্যে মেনে নিলেও মনে মনে সে যা বুঝেছে তাই বুঝেছে। যদি তা ভুলও হয় তাতেই বা কী? কত ভুল আঁকড়ে থেকে মানুষ বেমালুম জীবন কাটিয়ে দেয়। সব সত্য জানতেই হবে এমন কী মাথার দিব্যি দেওয়া আছে? দুনিয়াটা যে যার নিজের মতো করেই বোঝে। দুনিয়া তো আর একটা নয়। যত মানুষ তত দুনিয়া। ওই যে সব কুকুর বেড়াল পশুপাখি ওদের দুনিয়াও আলাদা রকমের। ধীরেন এরকমই বোঝে। আর বুঝটা যদি একদিন ভেঙে যায় তবে তার খুব কষ্ট হবে।

মহিম দুলে দুলে হাসছিল, বউমার ওপর চড়াও হয়েছিলি এই বয়সে, তোর আক্কেলটা কী রে?

কাঁচুমাচু হতে গিয়েও হতে পারল না ধীরেন। হেসে ফেলল, কফিতে একটা চুমুক দিয়ে বলল, একটা তাড়নার মতো হল, ভাবলাম দোষের তো কিছু নয়।

তোর বয়স আশি ছাড়িয়েছে না?

তা তো হবেই।

ওসব করতে গেলে হার্ট অ্যাটাক না হয়ে যায়। পাগল কি আর গাছে ফলে! আহাম্মক কোথাকার।

বীরেন আহাম্মকের মতোই হাসছিল। তার পেটে কোনও কথা থাকতে চায় না। কাউকে-না-কাউকে বলে ফেলে, আগে গৌরহরিদাদাকে সব বলত। আজকাল মহিমদাদাকে বলে। বলে ফেলার মধ্যে একটা খালাস আছে। বললেই মনের ভারটা কমে যায়। অনুতাপ-টাপও থাকে না তেমন।

এই চোখটা কাটিয়ে ইস্তক আমার কীসব যেন হচ্ছে। ঠিক আগের মতো আর নেই আমি। মাঝে মাঝে ভারী ফুর্তির ভাব আসে। শরীরেও কীসব চাগাড় দিয়ে উঠছে।

দুনিয়ায় কত লোক ছানি কাটাচ্ছে তাদের এরকম ধারা হচ্ছে বলে শুনিনি তো! তোরই সব উদ্ভুটে ব্যাপার হয় কেন?

সেটাই তো ভাবছি।

এই বয়সে অত উচাটন ভাল নয়। সামলে সুমলে থাক। ঠাকুর-দেবতার নাম করলেও তো পারিস।

ভগবানের কথা উঠলে ধীরেন সত্যিকারের কাঁচুমাচু হয়ে পড়ে। ওই একটা ব্যাপারে সে বরাবর ফাঁকিতে থেকেছে। তার কেবলই মনে হয়, ও নাগালের বাইরের ব্যাপার। ধীরেন ঠিক নাস্তিক নয়, তবে ভাবে, তিনি যদি আছেন তো সবই দেখছেন-টেখছেন, সবই বুঝছেন, আর যা করার করবেনই। ডাকাডাকি করে লাভ নেই। ধীরেনের ডাকে বাড়ির পোষা কুকুরটাও নড়তে চায় না, ভগবান কোন ছাড়।

কফিতে আরও একটা চুমুক দিয়ে ধীরেন বলে, ভগবানকে ডেকে তেমন জুত পাই না দাদা। পাপীতাপী মানুষ তো। কত অপকর্ম করে বসে আছি, ভগবান তেমন খেয়াল করেননি হয়তো। ডাকাডাকি করলে হয়তো নড়েচড়ে বসবেন, ভাববেন, দেখি তো ব্যাটার খাতাখানা খুলে পাপপুণ্যির হিসেবটা। তাহলেই তো হয়ে গেল। একেবারে চিৎপাত করে ফেলে দেবেন।

তোকে নিয়ে আর পারা যায় না।

হেঁঃ হেঁঃ করে একটু হাসে ধীরেন কাষ্ঠ। তারপর বলে ধর্মকর্ম করতে বড় দেরিও হয়ে গেছে। এখন ওসব করতে গেলে ভগবান ভাববেন, মশকরা করছি। আরও একটা কথা দাদা।

কী কথা! বলে ফেল।

ভিতু মানুষের কি ধর্মকর্ম হয়? সব ব্যাপারেই যারা জুজুবুড়ি দেখে তাদের ধর্মকর্মেও জুজুবুড়ি ঘাপটি মেরে থাকে। ডাকছে হয়তো কালী বা কেষ্ট ঠাকুরকে, কিন্তু মনের মধ্যে খাপ পেতে আছে জুজুবুড়ির ভয়। তাই পুজো শেষ অবধি ওই জুজুবুড়ির পায়ে গিয়েই পড়ে।

দামড়া কোথাকার। তবে কথাটা খুব খারাপও বলিসনি। আমার এক বিধবা পিসিমাকে দেখেছি ধর্মের নামে এমন শুচিবায়ু করে বেড়াত যে শেষ অবধি মাথার গোলমাল দেখা দিয়েছিল। তবু বলি ধর্ম না করিস অধর্মও করতে যাস না।

কফির কাপটা জগের জল দিয়ে ধুয়ে সাবধানে রেখে ধীরেন উঠল।

বড্ড রোদ ওঠে আজকাল, ছাতা নিয়ে বেরোসনি?

পুরনো ছাতাটার শিক-টিক ভেঙে রয়েছে দেখলাম। না সারালে চলবে না।

এই রোদ বেশি মাথায় না লাগানোই ভাল। তোর যে বয়স হয়েছে সে খেয়ালটা রাখিস তো!

রেখেই বা হবে কী? বয়সকে তো কেউ খাতির করছে না। রোদে জলে মরব কিনা বলতে পারি না। তবে মনে হয়, মরণ এখনও দূরে আছে।

ভাল, দূরে থাকাই ভাল।

কিন্তু খুব দূরেও ছিল না মরণ। সেটা মহিমদাদার বাড়ি থেকে বেরিয়ে শর্টকাটে যাবে বলে ঘাসজমিতে কয়েক কদম হাঁটার পরই টের পেল ধীরেন।

দুদিন বৃষ্টি গেছে মাঝখানে। তাইতেই ঘাসগুলো যেন তেজালো হয়েছে একটু। চটিসুদ্ধ ডান পা বাড়িয়ে ফেলতে গিয়েও তার সদ্য কাটানো বাঁ চোখ ঘাসের গভীরে চিত্রল একটি হিলিবিলি চকিতে দেখতে পেয়ে গিয়েছিল।

বাপ রে! বলে ধীরেন পিছোতে গিয়ে বেকায়দায় চিত হয়ে পড়ে গেল পিছনে। সাপটা প্রায় গা ঘেঁষে ফিসফাস করে আপন মনে কথা কইতে কইতে চলে গেল দূরে।

মাজায় বেশ লেগেছে। ধীরেন উঠে বসল। একটু দম নিয়ে হাঁটুতে ভর করে দাঁড়াল। না, তেমন কিছু নয়। অল্পের ওপর দিয়েই চোটটা গেছে। সে ঘাসজমি ছেড়ে রাস্তা ধরল।

বাঁ চোখই বাঁচিয়ে দিল তাকে। বেঁচে গিয়ে বড় আনন্দ হচ্ছে তার। অনেকটা কামভাবের মতোই যেন একটা কিছু, ভারী অদ্ভুত লাগছে বটে। আনন্দটা একটা যেন সুড়সুড়ির মতো। সাপের বিচিত্র শরীরের এই গতি ওর মধ্যে কামের কোনও অনুষঙ্গ আছে নাকি রে বাবা! আশির কাছাকাছি বয়সে এসব আবার কীরকম ভাবসাব?

একবার ভাবল ফিরে গিয়ে কথাটা মহিমদাদাকে জিজ্ঞেস করবে। তারপর ভাবল, কাজ কী, তার কথাকে তো কেউ গুরুত্ব দেয় না। এই আবছা মাথায় সে যা বুঝেছে ওটুকুই তার থাক। বেশি বুঝে হবে কী।

তোমার হাতে পোস্টকার্ডটা দেখে আমার ভীষণ অবাক লাগছে।

কেন রে?

সেদিন স্বপ্ন দেখছিলাম তোমার বর তোমাকে একটা চিঠি দিয়েছে আর তুমি তার কাছে চলে যাচ্ছ। সব ছেড়েছুড়ে।

ও মা! বলিস কী? সত্যি স্বপ্ন দেখেছিলি?

হ্যাঁ পিসি। আমি তোমার ওপর খুব রাগ করছিলাম।

অবাক কাণ্ড তো!

কেন পিসি?

এ তো সত্যিই তার চিঠি রে! আজকের ডাকেই এল! হ্যাঁ রে, তোর মধ্যে তো ভগবান অনেক ক্ষমতা দিয়েছেন!

দুর! ওসব কিছু নয়। এটা সত্যিই তোমার হাজব্যান্ডের চিঠি?

হ্যাঁ। তবে এটা প্রথম নয়। মাস তিনেক আগে আরও একটা লিখেছিল। তাতে শুধু কুশল প্রশ্ন ছিল। আমি অবশ্য জবাব দিইনি।

এবার চিঠিতে কি তোমাকে যেতে লিখেছে?

করুণ একটু হেসে সন্ধ্যা বলল, না রে, সে আর আমাকে চায় না। তবে আমার টাকা চায়। পড়ে দেখ না। প্রেমপত্র তো নয়।

ও বাবা। আমি ছাপা বাংলা পড়তে পারি, কিন্তু হাতের লেখা বাংলা পড়তে পারি না। আর এই ভদ্রলোকের হ্যান্ডরাইটিং ভীষণ জড়ানো। তুমিই পড়ো না।

ও আর পড়ে কী হবে। দুর্গাপুরের কাছে কোথায় যেন বাড়ি করছে। টাকার জন্য কাজ আটকে গেছে। খুব করুণ করে কিছু ধার চেয়ে পাঠিয়েছে।

হি ইজ শেমলেস, তাই না?

আমি ভাবি, আমার আর কোনও খবর তার কাছে না পৌঁছলেও আমার টাকার খবর কিন্তু ঠিক পৌঁছে গেছে। টাকার কত ক্ষমতা দেখেছিস?

খবরটা কে দিল পিসি?

কত লোক আছে। মেয়েমানুষ ব্যবসা করে পয়সা করছে দেখে কত লোকের আঁতে লাগে, চোখ কটকট করে। তাদেরই কেউ জানিয়ে দিয়েছে।

দেবে নাকি টাকা?

এখনও ভাবিনি কিছু। আমার তো আর তার সংসার করা হল না, টাকাও জমে যাচ্ছে। কী করব বল তো! দেওয়া উচিত হবে কিনা সেইটেই ভেবে পাচ্ছি না।

ধার নিয়ে যদি শোধ না দেয়?

সেটা যে দেবে না তা খুব জানি। ধার বলে দেবও না। আমি শুধু উচিত অনুচিতের কথা ভাবছি।

এই একটা জায়গায় তোমার ভীষণ উইকনেস, তাই না পিসি? নইলে এমনিতে তুমি বেশ হার্ডেনড মেয়ে।

তোরা হলে সে চাইতেই সাহস পেত না। সে লোক চেনে। সে আমার সঙ্গে সম্পর্ক রাখে না বটে, কিন্তু আমি তো মন থেকে উপড়ে ফেলতে পারিনি সম্পর্কটা। তাই দুর্বল হয়ে পড়ি।

তোমরা একটু কেমন যেন আছ। তাই না? তুমি, বলাকা।

এই ধিঙ্গি মেয়ে, বলাকা কী রে? আমরাই জেঠিমা ডাকি।

তা হোগ গে, আমার তো খুব বন্ধুর মতো মনে হয়।

দেব মাথায় গাঁট্টা, তা জেঠিমার আবার কী হল?

তোমার মতোই। একজন পুরুষকে কিছুতেই ভুলতে পারছেন না। এটা কী করে হয় তাই ভাবছি। তোমাদের অবস্থা তো দাসী-বাঁদির চেয়েও খারাপ।

সন্ধ্যা মাথা নেড়ে বলল, তা নয় রে।

তাহলে?

সমাজের নিয়ম কি সব সময়ে সকলের ক্ষেত্রে খাটে? মানুষের মনের ভিতরটায় কত কী আছে, বাইরে থেকে টের পাওয়া যায় না।

তা বলে তুমি লোকটাকে টাকা দেবে?

দেবো বলিনি। ভাবছি। আমার তো অনেক টাকা জমে আছে, আমি মরলে সে টাকার কী গতি হবে কে জানে। তা সেই লোকটার যদি উপকার হয় সে কথাই ভাবছি। টাকা দিলে লোকটার হয়তো একটু আক্কেলও হবে। আয়নায় নিজের মুখ দেখতে লজ্জাও করবে। তাই না, বল!

সেসব আমি জানি না। শুধু জানি, তোমার কিচ্ছু হবে না। তুমি এক্কেবারে যা-তা।

সন্ধ্যা হেসে ফেলে। তারপর হঠাৎ চোখের জল সামলাতে শাড়ির আঁচল চেপে ধরে চোখে। একটু চুপ করে থাকে। তারপর ধরা-ধরা গলায় বলে, তবু যা হোক আমার একটা দাম হয়েছে তো তার কাছে, এতদিন বাদে। একটু গুরুত্ব তো দিচ্ছে, হাত পাতছে।

তোমার যা খুশি কর গে। আমি তোমাকে নিয়ে আর পারি না।

সত্যিই বলেছিস, আমি একেবারে যাচ্ছেতাই। বড্ড সেন্টিমেন্টাল। কিন্তু কী জানিস, কয়েকদিন আগে বড়দার ঘরে টি ভি-তে একটা সিনেমা দেখছিলাম। ইংরেজি ছবি। তাতে একটা মেমসাহেব একটা সাহেবের জন্য যা ল্যালামি করছিল দেখলে তোর রাগ হত। ছেলেটা মেয়েটাকে একদম পাত্তা দিচ্চিল না, একবার তো ধাক্কা মেরে ফেলেই দিল। গালাগালও করছিল যেন। তবু মেয়েটা এমন হ্যাংলামি করছিল যে বলার নয়। ইংরিজি তো ভাল বুঝি না। ছবিটা দেখে ভাবলাম, সাহেবদের দেশেও তো এরকম হয়। ওরা অবশ্য স্বামী-স্ত্রী ছিল না, প্রেমিক-প্রেমিকাই হবে।

সেই ছবিটাই বুঝি তোমার ইনস্পিরেশন?

না রে। ছবিটা দেখে মনে হল, এরকম হয়, হতে পারে। ও-দেশে যেমন হয়, এ-দেশেও তেমন হয়।

সোহাগ হেসে ফেলল। বলল, এই জন্যই তোমাকে এত সুইট লাগে আমার।

সন্ধ্যা লাজুক হেসে বলে, বোকা বলে তো!

একজ্যাক্টলি। তুমি একদম বুদ্ধু আর বোকা। তাই এত সুইট। বুঝলে?

ভাগ্যিস বুদ্ধিমতী হইনি, তাহলে তো আমার সঙ্গে তোর এত ভাব হত না। হত, বল?

বোধহয় না।

হ্যাঁ রে, আমার পুষ্যি মেয়ে হবি?

ও আবার কী কথা পিসি? আমি তো তোমার মেয়েই।

মা বলে তো ডাকিস না!

তা ডাকতে পারি। কিন্তু তুমি যে মায়ের মতো বড় নও।

আমার বয়সই বুঝি বসে আছে!

তাহলেও তুমি আমার মা হওয়ার পক্ষে একটু বেশি ইয়ং।

সন্ধ্যা লাজুক হেসে বলে, তা অবিশ্যি ঠিক। আমি মা আর বাবার বুড়ো বয়সের সন্তান। বেশি বয়সে সন্তান হওয়াতে নাকি মা-বাবার নিন্দে হয়েছিল। থাক বাবা, পিসিই ডাকিস। মা ডাকলে আবার পাঁচটা কথা উঠবে। বউদিও পছন্দ করবে না। আসল কথা কী জানিস? একটা ভালবাসার লোক থাকলে কাজকর্ম করে একটা আনন্দ হয়। আমি ভেবে রেখেছি আমার সব টাকা-পয়সা, ব্যবসা-ট্যাবসা সব তোকেই দিয়ে যাব।

সে তো বুঝলাম। কিন্তু তুমি যাবেটা কোথায়?

যখন মরব তখনকার কথা বলছি।

হ্যাঁ পিসি, তোমার বুঝি ইচ্ছামৃত্যু?

কেন রে, একদিন কি মরব না?

ইউ আর ইন মিড থার্টিজ। মরার বয়স হতে যে ঢের দেরি। ততদিনে আমি কোথা থেকে কোথায় চলে যাব তার কি ঠিক আছে? হিসেব করলে তোমার যখন মরার বয়স হবে তখন আমিও বুড়ি হয়ে যাব।

দুজনেই খুব হাসল।

কথা হচ্ছিল নিমের ঝিরঝিরে ছায়ায় দুটো মোড়া পেতে বসে। পাশেই ধানের মরাই। সামনে অনেকটা ঘাসজমি। একটা ভুঁই কুমড়োর গাছ লতিয়ে গেছে অনেক দূর অবধি। কুমড়ো ফলেছে অনেক। সবজে-সাদা কচি কুমড়ো বয়ার মতো ভেসে আছে ঘাসের ওপর। কী সুন্দর যে দেখাচ্ছে সকালবেলার রোদে ওই ঘাসজমিটা।

মুগ্ধ হয়ে চেয়ে ছিল সোহাগ। অবাক হয়ে দেখল ঘাসজমিটার মাঝামাঝি জায়গায় হঠাৎ একটা হাত উঠে আসছে শূন্যে। যেন ডুবন্ত কোনও মানুষ জলের ওপর অসহায় তার হাতখানা তুলে দিয়েছে। অবাক চোখের বিভ্রম খসে পড়তেই ঝট করে উঠে দাঁড়াল সোহাগ।

সন্ধ্যা বলল, কী রে? কী হল?

দ্যাট স্নেক! আই লাভ দ্যাট স্নেক।

সন্ধ্যাও দেখতে পেল। প্রকাণ্ড পাকা বয়সের গোখবোটা ফণা তুলে আছে।

কোথায় যাচ্ছিস! বলে আর্তনাদ করে ওঠে সন্ধ্যা।

দাঁড়াও। আই মাস্ট হ্যাভ এ ক্লোজ লুক। বলেই ঘাসজমির দিকে ছুটে গেল সোহাগ।

করিস কী পাগল! মরবি নাকি? বলে সন্ধ্যা ছুটে গিয়ে একটা হাত ধরে ফেলে টেনে আনে সোহাগকে।

সোহাগ হিহি করে হেসে বলে, তুমিই না বলেছ ওটা বাস্তুসাপ! আমাদের পোষা!

দুর বোকা! বাস্তুসাপ বলেই কি আর বিষ নেই নাকি?

তুমি যে বলেছিলে ওরা কামড়ায় না!

সন্ধ্যা ভয়ার্ত চোখে সোহাগের দিকে চেয়ে বলে, সর্বনাশী মেয়ে বাবা তুই! বাস্তুসাপ বলে কি বুকে টেনে নিতে হবে নাকি? ক্ষেপি কোথাকার!

আমার যে খুব বিশ্বাস হয়েছিল, ওটা আমাদের পোষমানা সাপ।

ঘাসজমিতে উঁচু হয়ে থাকা হাতখানা বাতাসে খানিক দোল খাচ্ছিল। তার সাদাটে বুকে রোদ। চারদিকটাকে পেরিস্কোপের ভঙ্গিতে বুঝবার চেষ্টা করছিল সে। তারপর ধীরে ধীরে ডুবে গেল ঘাসের গভীরে।

আমার অনেকদিন ধরে একটা সাপ পুষবার শখ।

আচ্ছা মেয়ে রে বাবা! তুই বোধহয় সব পারিস। আমার বুকটা এখনও ধকধক করছে।

হি হি করে হাসল সোহাগ, কেন ভয় পাও পিসি? আমার তো একটুও ভয় করে না। আমি একদিন সাপটাকে ফলো করব। দেখব ও কোথায় কোথায় যায়, কী কী করে, ওর লাইফ স্টাইলটা কীরকম। হাত নেই। পা নেই। শুধু একটানা একটা শরীর, আশ্চর্য না?

এবার সন্ধ্যাও হেসে ফেলে, তার পর গম্ভীর হয়ে বলে, ওসব যদি করিস তাহলে আমার মরা মুখ দেখবি, এই বলে রাখলাম।

কেমন আছো পারুলদি?

একটু আগেই রাত এগারোটা বেজেছে, পারুল জানে। তবু একবার দেয়ালঘড়িটার দিকে তাকাল। এগারোটা কুড়ি। বলল, অ্যাই হনুমান, রাত সাড়ে এগারোটায় ফোন করে কুশল প্রশ্ন করা হচ্ছে? ব্যাপারটা কী তোর?

আহা, রাত সাড়ে এগারোটায় একটা লোক কেমন আছে তা জানার কৌতূহল কি হতে পারে না? ধরো সকালে হয়তো লোকটা ভাল আছে, বিকেলে খারাপ, রাত এগারোটায় হয়তো খুব ভাল। সেইজন্যই কুশল প্রশ্নও বিভিন্ন সময়ে, এমনকী আনগডলি আওয়ারেই করা উচিত।

থাপ্পড় খাবি।

শুয়ে পড়েছিলে নাকি?

না রে। ইয়ার এন্ডিং আসছে, হিসেবপত্তর নিয়ে বসেছি।

তোমার ছোটো ছেলেটা? হাউ ইজ হি?

ছেলের নামে একটু উথলে ওঠে পারুল। মাত্র তিন মাস বয়েস। তবু তার মধ্যে অনেক সম্ভাবনা দেখতে পায় পারুল। মায়েরা দেখে।

আর বলিস না ভাই, যা দুষ্টু হয়েছে। ওকে নিয়েই তো সারাদিন ব্যস্ত থাকতে হয়।

কেন, তোমাদের আয়া-টায়া নেই?

তা আছে। দুজন। তবু এটাকে আমি নিজের মতো করে মানুষ করতে চাই বলে আমাদের কাছে বেশি দিই না। হ্যাঁ রে বিজু, এত রাতে ফোন করলি যে হঠাৎ!

আরে আজকাল কেবল টিভি-র গুণে কোনও বাড়িতেই কেউ রাত বারোটা-একটার আগে শুতে যায় না। তাই ভাবলাম, তোমাকে একটু ফোন করে খবর নিই।

আসলে বেশি রাতে ফোন এলে বুকটা ধক করে ওঠে। কার কী হল সেই চিন্তা হয়।

আরে না না। ঘাবড়ানোর কিছু নেই।

তোর খবর কী?

নাথিং নিউ। যথাপূর্বং।

বাজে বকিস না। সব জানি।

কী জানো?

পান্নার সঙ্গে ফোনে আমার কথা হয়।

পান্না! ও আবার কী লাগিয়েছে তোমার কাছে?

যা সত্যি তাই বলেছে।

দুর দুর। যা শুনেছ সব বাজে কথা।

কী শুনেছি তা জানলি কী করে? এখনও তো বলিনি কিছু।

আসলে ওই সোহাগকে নিয়ে তো!

হ্যাঁ তো!

গাঁয়ের লোকেরা কূপমণ্ডুক হয়, জানো তো! মুখরোচক কিছু পেলেই হল।

তাহলে কি ঘটনাটা কি সত্যি নয়?

আরে না। আমার কম্পিউটারে ই-মেল চেক-টেক করে! বেশি কথাও হয় না আমাদের। বিশ্বাস করো।

করলাম। সোহাগ অন্য রকমের মেয়ে। অন্য সব মেয়ে যা করে ও তা কিছুতেই করবে না। সত্যি কথা বল তো, ওকে তোর ভাল লাগে?

এমনিতে ঠিকই আছে।

পছন্দ?

আহা, পছন্দের কথা উঠছে কেন?

বল না, আমি অনেকদিন আগেই মনে মনে তোর জন্যই ওকে বাছাই করে রেখেছিলাম।

তোমাদের কি সব সম্পর্কের একটা হেস্তনেস্ত না করে শান্তি নেই?

হেস্তনেস্ত আবার কী? মেয়ে পুরুষের দুজনের দুজনকে পছন্দ হলে বিয়ের কথা তো উঠবেই।

পারুলদি, তুমি কিন্তু কিছুদিন আগেও এত সেকেলে ছিলে না।

তোর আর বেশি একেলে হওয়ার দরকার নেই। তৈরি হ।

পাগল নাকি! এখনও আমার প্র্যাকটিস জমেনি।

বাজে কথা বলিস না। সব খবর জানি।

কী জানো?

বাবার সব মক্কেল এখন তোর হাতে। বাবার অর্ধেক করা মামলাগুলো সব তুই হাতে নিয়েছিস এবং এখন তোর রোরিং প্র্যাকটিস—ঠিক বলেছি?

যা শুনেছ ততটা নয়। যে কোনও গল্পের চারাগাছই বর্ধমান থেকে জামশেদপুর যেতে যেতে মহীরুহ হয়ে যায়।

গাড়িও তো কিনেছিস শুনলাম। সেটা কি আকাশ থেকে পড়ল?

আরে সেকেন্ডহ্যান্ড মারুতি এইট হান্ড্রেড, ও তো আজকাল হকারদেরও থাকে।

বাজে বকিস না, গাড়ির বাজার আমি ভালই জানি। সেকেন্ড হ্যান্ড কিনলি কেন? পান্না যে বলল, নতুন গাড়ি।

এক রকম নতুনই। আমার এক মাড়োয়ারি ক্লায়েন্ট কিনেছিল। হাজার কিলোমিটারও চলেনি।

হাজার কিলোমিটার! তাহলে তো একদম নতুন!

ওই এক রকম।

আর বিনয় করতে হবে না। গাড়িতে সোহাগকে চড়িয়েছিস?

সাহস পাইনি।

তার মানে?

ও ওসব গাড়িবাজি পছন্দ করে না।

তাহলে কী পছন্দ করে?

চুপচাপ বসে থাকা।

ওমা! তোদের মধ্যে ভালবাসার কথা হয় না?

পাগল নাকি?

তোরা কী রে?

এসব পোস্ট মডার্ন পারুলদি, তোমরা বুঝবে না। বড্ড সেকেলে আছ এখনও।

একটু পাগলি আছে ঠিকই, কিন্তু শি ইজ ভেরি গুড অ্যাট হার্ট, আমাকে কেন যে গডেস ভাবত কে জানে!

তোমাকে অনেকেই গডেস ভাবত পারুলদি।

মারব গাঁট্টা। কে আমাকে গডেস ভাবত রে?

এ-গাঁয়ের তৎকালীন ব্যর্থ যুবকেরা।

তোর মুন্ডু। শোন, তোদের ওই পোস্ট মডার্ন সম্পর্কটা যেন কেটে না যায়। আজকাল ছেলেতে-মেয়েতে ভাবসাব হতে না হতে বড্ড ছাড়কাট হয়ে যায়। তুই তো আবার কাঠখোট্টা গোঁয়ারগোবিন্দ গোছের, তার ওপর পিউরিটান। তোর যে কী হবে কে জানে বাবা।

আমার কিছু হওয়ার নয়।

সেই জন্যই তো ভয়। তুই যেমন বেরসিক, তেমনি জুটেছে তোর সোহাগ পাগলি৷

ইয়ে পারুলদি, কাল পরশু একবার চলে এসো না।

দুর পাগল! এখন কি আর যাওয়ার উপায় আছে! বললাম না ইয়ার এন্ডিং।

আরে রাখো তো ইয়ার এন্ডিং। ওসব করার জন্য তোমাদের অনেক কর্মচারী আছে। শোনো, বড়মার আজ একটু ব্রিদিং ট্রাবল হচ্ছে।

সর্বনাশ! এতক্ষণ বলিসনি?

আরে অ্যালার্মিং কিছু নয়। ডাক্তার এসে দেখে-টেখে গেছে।

আমি তো সন্ধেবেলাতেই মার সঙ্গে কথা বললাম। তখন তো—

তখন ছিল না। রাত আটটা নাগাদ ব্যাপারটা হয়। নাথিং সিরিয়াস।

সিরিয়াস না হলে আমাকে তুই যেতে বলতিস কি?

বড়মা নিজেই একটু নার্ভাস হয়ে পড়েছে। তোমাদের দেখতে চাইছে।

দাঁড়া আমি মায়ের সঙ্গে কথা বলব।

আরে দাঁড়াও, শি ইজ আন্ডার সেডেটিভ। আমি তো বড়মার কাছেই আছি। শি ইজ পিসফুলি অ্যাস্লিপ, পারলে চলে এসো।

হ্যাঁ রে, সত্যি করে বল তো সিরিয়াস নয়?

আরে না।

দাদাদের খবর নিয়েছিস?

হ্যাঁ, ফোন করেছিলাম। দে উইল বি হিয়ার বাই টুমরো।

আমার বুকটা কাঁপছে রে। ডাক্তার কী বলল?

ডাক্তার বলেছে, ব্রংকিয়াল ব্লক থেকেও হতে পারে। কাল আমি বড়মাকে ই সি জি করাতে নিয়ে যাব বর্ধমানে। সকালবেলায়।

তুই আছিস, এটাই যা ভরসা।

আমি আছি পারুলদি। চিন্তা কোরো না। বড়মা উইল বি অলরাইট।

ফোনটা যখন রাখতে গেল পারুল তখন তার হাত শিথিল। চোখে জল। মা বাঁচবে তো!

দুপুরের খরসান আলোয় সে স্রোতের মতো বয়ে এল এতদূর। সে কি একটু পরিশ্রান্ত? দীঘল শরীর কিছু শ্লথ। সামনে কিছু জটিলতা। ডালপালা আগাছার অবরোধ। সে ধীর গতিতে পেরোল। তারপরই একটা বাধা। বিপদ কি?

সামনেই সাদা, মসৃণ একজোড়া পা। ভারী সুন্দর পা। কোনও সুন্দরীর পা। কিন্তু তার কোনও সৌন্দর্যের বোধ নেই। নারীর মর্মও সে বোঝে না। সে শুধু বোঝে বিপদ, বোঝে বাধা।

সন্দিহান, কুটিল চক্ষুর দৃষ্টিতে সে লক্ষ করল সাদা পা দুখানাকে। শত্রুপক্ষ? খাদ্য? প্রতিরোধ?

একটু অপেক্ষা করল সে। শরীরে তার ভয়ের সংকেত। সে ভয় পায়।

পা দুটো নড়ে। একটু এগোয়, ফের পিছোয়। বিরক্তিকর। সে একটা শ্বাস ছাড়ল। তারপর ধীরে উত্তোলিত করতে লাগল তার ফণা।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%