শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
কথা ছিল না। তবু হয়ে গেল। পারুলের শরীর জুড়ে তৃতীয় সন্তানের আগমনবার্তা ছড়িয়ে পড়ছে। শরীরের মধ্যে আর একটা শরীর ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে। গর্ভের অঙ্কুর। পারুলের শরীরে নানা অসোয়াস্তির সঞ্চার ঘটছে। মধ্যরাতে উঠে বেসিনে বমি করার পর হাঁফ ধরা গলায় সে তার পেটে হাত রেখে মায়াভরে বলে, দুষ্ট ছেলে, মাকে বুঝি এরকম কষ্ট দিতে হয়?
ছেলে! মেয়েদের অন্ধ সংস্কারবশে সেও ছেলেই চায় নাকি? না বাবা, না। মেয়ে হোক, পারুলের একটুও আপত্তি নেই। পেটে হাত রেখে সে ফিস ফিস করে বলে, মেয়ে নাকি তুই! লক্ষ্মী হয়ে থাক।
এখনও আকার নেয়নি, চোখ মুখ কিছু তৈরি হয়নি, গর্ভের অন্ধকারে একটি রক্তাক্ত পিণ্ড মাত্র, তবু কত মায়ায় যে ভরে ওঠে বুক!
কথা ছিল না, তবু হল। কিন্তু তৃতীয় সন্তান মোটেই অ্যাকসিডেন্ট নয়। বললে লোকের অদ্ভুত লাগবে, এই সন্তান চেয়েছিল পারুল নিজেই। চল্লিশের কাছাকাছি বিপজ্জনক এই বয়সে কেউ কি মা হতে চায়? ডাক্তারও ভ্রূ কুঁচকেছিল। কিন্তু পারুল চেয়েছিল ঠিকই। চিন্তিত জ্যোতিপ্রকাশ বলেছিল, পারুল, ব্যাপারটা সেফ হবে কি? এক ছেলে এক মেয়ে তো আছেই আমাদের, আর কী দরকার?
দরকার কথাটার নানারকম ব্যাখ্যা হতে পারে। হিসেবি মানুষের দরকার একরকম, বেহিসেবির অন্যরকম। পারুল হেসে বলেছিল, সেই পুতুলখেলার বয়স থেকে আমার শখ ঘরভরা ছেলেপুলের।
জ্যোতিপ্রকাশ শান্ত হেসে বলেছিল, আশ্চর্য! আজকাল কেউ ওরকম ভাবে না।
আমার শখ যে! কী করব বলো!
সমস্যা কী জানো? এ বয়সে মেয়েদের শরীরে স্টিফনেস দেখা দেয়। কোনও কমপ্লিকেশন হলে কী হবে?
কিছু হবে না। অত ভেবো না।
তাদের ছেলেমেয়ে দুটিই খুব ভাল। তারা কেউ দুষ্ট নয়, দুজনেই মেধাবী, শান্ত, বাধ্য। দুজনের চোখের দৃষ্টিই স্নিগ্ধ। দেখতেও তারা সুন্দর। বিয়ের পর তারা দীর্ঘ দিন সন্তানের কথা ভাবেনি। তখন জ্যোতিপ্রকাশ আর পারুল লড়াই করছে ব্যবসা নিয়ে। ব্যবসা তখনও অস্থিরতায় ভুগছে। পারুলের বয়স তখন নিতান্তই কম। আঠেরো পূর্ণ হয়নি। বিয়ের ছয় বছর বাদে তাদের সময় হয়েছিল। ছক কষেই তারা এনেছিল প্রথম সন্তান। ঠিক তিন বছর বাদে দ্বিতীয় এল। সব কিছুই প্ল্যানমাফিক করা উচিত— এটা তারা দুজনেই বিশ্বাস করত। আত্রেয়ীর বয়স এখন পনেরো, শুভমের বারো।
সবই ঠিকঠাক ছিল। সংসার বেঁধে নিয়েছিল নিজেদের ছকে। গত বছরই ঘটল একটা ঘটনা। সেটাও শীতেরই এক রাত। জামশেদপুরে সাংঘাতিক শীত পড়েছিল সেই রাতে। একটা বা দেড়টা হবে বোধহয়। পারুল লেপের গরমের ভিতরে গভীর ঘুমের মধ্যে হঠাৎ চমকে জেগে উঠল। কে ‘মা’ বলে ডাকল হঠাৎ? খুব কচি গলার ডাক। কিন্তু তার ঘুমের মধ্যে সেই ডাক যেন তার শরীরে ঝংকার দিয়ে গেল।
দুরুদুরু বুকে লেপ সরিয়ে উঠে বসল সে। আত্রেয়ী বা শুভম ডাকছে না তো! কিন্তু ওরা তো অত ছোট নয়! তবু আলো জ্বেলে সে গিয়ে পাশের ঘরে ঢুকে দেখল, দুটো সিংগল খাটে ভাইবোন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। তবে ডাকল কে?
শব্দটা বাইরে থেকেও আসার কথা নয়। কাছাকাছি বাড়ি নেই এবং এই নির্জন পাড়ায় নিশুত রাতে মা ডাকার মতো কেউ থাকবে—এটাও ভাবা যায় না। তবু নিঃশব্দে টর্চ জ্বেলে জ্বেলে বাড়ির ভিতরটা ভাল করে দেখে নিল পারুল। তারপর চুপচাপ বসে খানিকক্ষণ ভাবল। ভেবে ভেবে তার মনে হল, বাইরে থেকে নয়, এ ডাক এসেছে তার ভিতর থেকে। ভিতর থেকেই।
কিন্তু তাও কি হয়? তার ভিতর থেকে কে তাকে মা বলে ডাকবে?
নিশ্চিত হওয়ার জন্য সকালে সে তার ছেলেমেয়েদের জিজ্ঞেস করল, রাতে ভয়ের স্বপ্ন দেখে তারা কেউ মাকে ডেকেছিল কিনা।
তারা দুজনেই অবাক হয়ে বলল, না তো!
অথচ পারুল শুনেছে, স্পষ্ট শুনেছে, খুব কচি গলায় কে যেন আর্তরবে ডেকেছিল মা! সেই ডাক তার সমস্ত শরীরে ঝংকার দিয়ে গেছে। ঘুমের মধ্যে সে শিউরে কেঁপে উঠেছিল।
পারুল ভাবের মানুষ নয়। স্বামীর ব্যবসায় তাকে মাথা খাটাতে হয়, সংসার সামলাতে হয়, ছেলেমেয়ের দিকে নজর দিতে হয়। অলস সময় বলতে তার কিছু নেই। তবু ওই নিশুত রাতের একটা ডাক তাকে নিশির মতো পেয়ে বসল। প্রতিদিন ঘুমোবার আগে তার মনে হত, আজও যদি ডাকে! ইস্, আর একবার যদি ডাকে!
আর ডাকল না বটে, কিন্তু সারাদিন নানা কাজকর্ম ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে ওই স্মৃতি এসে বারবার হানা দেয়। আর কোমল এক আলোয় ভরে যায় পারুলের অভ্যন্তর। নরম হয়ে আসে মন, শরীর। কেউ কি তার শরীরে ভর করে কোল জুড়ে আসতে চায়? কোনও নিরাশ্রয় অনিকেত আত্মা?।
ওই চিন্তা ভূতের মতো পেয়ে বসল তাকে। বারবার নিজের বয়সের হিসেব করল। শরীরের কথা ভাবল। রিস্ক ফ্যাকটরের কথা ভাবল। তার দুটি ছেলেমেয়েই নরমাল ডেলিভারি। শরীরে কাঁটাছেঁড়া হয়নি কখনও। গড়ানে বয়সে যদি একটু কাটাকুটি হয় তো হোক না।
দ্বিধা ছিল, বাধা ছিল, অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা ছিল। তবু সব যেন ভেসে যেতে লাগল। একটা অচেনা কচি গলার একটা মাত্র ডাক তাকে উন্মনা করে দিল বড়। পাগল করল। বেহিসেবি করে দিল।
ওই ডাকটার কথা সে কাউকেই বলেনি। শুনলে সবাই হাসবে। জ্যোতিপ্রকাশ গম্ভীর কাজের মানুষ, সব ব্যাপারটাকেই খুব সিরিয়াসলি নেয়, কিছুই উড়িয়ে দেয় না। তবু তাকেও বলল না পারুল। তার মনে হয়েছিল, তার ভাবী সন্তান শুধু তাকেই ডেকেছে, আর কাউকে তো নয়। ওই গোপন তীব্র আকাঙক্ষার ডাকটিকে সে পাঁচ কানে ছড়াবে কেন?
তবু বেশ কিছুদিন অপেক্ষা করার পর অবশেষে সে তার স্বামীকে বলল। লজ্জা, দ্বিধা তো ছিলই, ভয়ও কি ছিল না একটু? এই বয়সে সন্তান হতে গিয়ে সে যদি মরেটরে যায় তাহলে তার বাচ্চা দুটোর কী হবে? জ্যোতিপ্রকাশও কি ভেঙে পড়বে না!
কিন্তু যে আসতে চায় তার পথ অবারিত না করেও যে পারুলের উপায় ছিল না! কী করবে পারুল তাকে না এনে? পাপ হবে না? অপরাধ হবে না?
আজকাল বলাকার রাতে ভাল ঘুম হয় না। শরীরে ঘুমের প্রয়োজনটাই তৈরি হয় না বোধহয়। একটু আধটু চটকামতো আসে, বিনা কারণেই ভেঙে যায়। তখন কেবল এপাশ ওপাশ। ঘুম ছিল কম বয়সে। কী ঘুম বাবা! বিছানা যেন চুম্বকের মতো টানত। বিছানা না হলেও চলত তখন। বিয়ের পর সেই বালিকা বয়সে স্বামীর গায়ে পা তুলে কি কম দিয়েছে ঘুমের ঘোরে? সকালে উঠে অবশ্য প্রণাম করত রোজ।
আজ রাতে পাতলা ঘুমের মধ্যে দরদালানে বমি করার শব্দ পেয়ে চটকাটা ভাঙল বলাকার। দিন দুই হল লক্ষণটা শুরু হয়েছে। এ বয়সে কেন যে আবার ছেলেপুলে হচ্ছে তা বুঝতে পারে না বলাকা। এ যুগের রেওয়াজ তো এটা নয়। আজকাল তো একটা করেই হয় বেশির ভাগ।
বলাকা উঠে মশারি তুলে বাইরে এল। রাতে প্রায় কিছুই খায়নি মেয়েটা। এক পিস মাছ আর একখানা রুটি। একটু দুধ সাধাসাধি করেছিল বলাকা, খায়নি। ওই সামান্য খাবারটাও পেটে থাকল না। তাহলে প্রসবের ধাক্কা সামলাবে কী করে? রক্ত হবে না শরীরে। আগের দুবারও একই অবস্থা হয়েছিল। বলাকা ভেবে মরে। তবু যা হোক, বয়স কম ছিল তখন, কিন্তু এখন তো তা নয়।
দরদালানে পা দিয়ে বলাকা দেখল, বেসিনের কাছে তখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে পারুল।
কী রে? আরও হবে?
না মা। ঠিক আছে।
চোখে মুখে একটু জল দে।
দিয়েছি।
পেট তো খালি হয়ে গেল, রাত কাটবে কী করে তোর? একটু দুধ গরম করে দিই, খা।
না মা, গা গুলোচ্ছে এখনও।
কী যে করি তোকে নিয়ে! আয়, আমার খাটে এসে শুয়ে থাক।
না মা, তোমার যেটুকু ঘুম হয় আমি শুলে সেটুকুও হবে না। তুমি শুয়ে পড় গে, আমি এখন ঠিক আছি।।
তোর ঠিক আমার ধাত! চারটে ছেলেমেয়ের প্রত্যেকটা হতে গিয়ে আমি অর্ধেক হয়ে গেছি। মনে আছে গাঁদাল পাতা খুব ভাল লাগত। তোকেও কাল গ্যাঁদালের ঝোল করে দেবোখন।
মৃদু লাজুক হাসি হেসে ঘাড় নাড়ল পারুল, দিও।
আজকাল একটু লজ্জা হয়েছে পারুলের। তার যে আবার ছেলেপুলে হবে এটা বোধহয় কারও কাছেই প্রত্যাশিত ছিল না। সব চেয়ে বড় লজ্জা ছেলেমেয়ের কাছে। আতু অর্থাৎ তার মেয়ে কালও জিজ্ঞেস করেছিল, মা, তোমার কী হয়েছে?
পারুল বলেছিল, অম্বল।
কিন্তু রোজ তো আর অম্বল বললে হবে না। তবু যা হোক মেয়ের কাছে ব্যাপারটা কবুল করা যাবে। কিন্তু শুভ? তার কাছে যে ভারী লজ্জায় পড়তে হবে পারুলকে। বড্ড অবাক হবে যে ছেলেটা। ভারী অস্বস্তি তাই পারুলের।
পারুল আর জ্যোতিপ্রকাশ কারওরই তেমন অবসর নেই বলে আতু আর শুভ বড় হয়েছে আয়া আর ঝি-এর হেফাজতে। ভালই থাকত তারা, কোনও সমস্যা হয়নি। কিন্তু অন্য সমস্যা না হলেও মা-বাবার সঙ্গে খুব সামান্য একটু দূরত্ব তৈরি হয়েছে তাদের—এটা খুব টের পায় পারুল। সে বা জ্যোতিপ্রকাশ কখনও হামলে দামলে ওদের আদর করেনি, বুকে নিয়ে শোয়ওনি বড় একটা। নজর রেখেছে, রক্ষণাবেক্ষণ করেছে, কিন্তু সময় দিতে পারেনি। সময়ের ওই টানাটানিই তাদের একটু তফাতে রেখেছে আজও। এই ফাঁকটুকু অতিক্রম করা আজ বড় কঠিন।
তিন নম্বরের বেলায় সেটা পুষিয়ে নেবে পারুল। কক্ষনো ঝি বা আয়ার হাতে ছেড়ে দেবে না। বুকে বেঁধে নিজের হাতে সেটাকে নাওয়াবে খাওয়াবে ছোঁচাবে। এর সঙ্গে দূরত্ব থাকবে না তার।
বলাকা বলে, এখন রাত দুটো। সারা রাত খালি পেটে কাটাবি কী করে? খালি পেটে আবার বায়ু অম্বল হবে।
কিছু খেতে পারব না মা। মুখে রুচি নেই।
শুকনো আমলকী খাবি? সন্ধ্যা বেশ বানায়। নানারকম নুন-টুন দিয়ে। খুব সোয়াদ। এক প্যাকেট দিয়ে গিয়েছিল। আয়, দুটো মুখে দিয়ে দেখ দেখি।
সন্ধ্যার আমলকী মুখে দিয়ে পারুল নিজের ঘরে এল। পাশের ঘরে আতু আর শুভ ঘুমে ঢলাঢল। একা কিছুক্ষণ বসে থাকে পারুল। শরীরটা ঝিমঝিম করছে বটে, কিন্তু তার ভিতরটা আলোয় ভরে আছে। সে যেন মৃদু গোলাপি একটা আলো। মায়ায়, ভালবাসায় ভরে আছে মন। খুব মৃদু একটা আঙুলে কে যেন তার শরীরে সেতারের ঝংকার তুলছে।
খুব দুষ্টু হবি নাকি তুই? দামাল, দস্যি, পাজি? দুষ্টু দুষ্ট চোখে তাকাবি, মিষ্টি মিষ্টি হাসবি আর দৌড়ে বেড়াবি বাড়িময়? আর আমি তোকে ধরতে ছুটে ছুটে হয়রান হব?
হোক, তার তিন নম্বরটা একটু দুষ্টু হোক, দামাল হোক, ডাকাবুকো হোক। বড় দুজন শান্ত, সভ্য, সুন্দর। তাদের নিয়ে কোনও ঝামেলা পোয়াতে হয়নি তাকে। তিন নম্বরটা হোক অন্যরকম।
মধ্যরাতে নিজের নিভাঁজ পেটে হাত রেখে মৃদু মৃদু হাসছিল পারুল। এখনও অনেক দেরি। অত দেরি যেন সইছে না পারুলের।
কী সুন্দর যে ভোর হল আজ! আকাশে একটা অন্যরকম ময়ূরকণ্ঠী আলো পেখম মেলে দিল। কুয়াশা মাখানো সেই আলো-আঁধারিতে পারুল খুব ধীর পায়ে বাগানে পায়চারি করছিল। ভাল ঘুম হয়নি রাতে। শরীর দুর্বল, মাথায় ঝিমঝিম। কিন্তু মনটা বড্ড ভাল লাগছে তার।
একা নই, আর আমি একা নই। এখন নয় মাস তুই আর আমি সবসময়ে একসঙ্গে। সবসময়।
পারুল!
পারুল একটু চমকে উঠল।
কে?
ফটকের পাশেই শিউলি গাছ। তার আড়াল থেকে আবছা আলোয় মেয়েটা এগিয়ে এল।
আমি সোহাগ।
হঠাৎ এই সুন্দর ভোরবেলার ময়ূরকণ্ঠী অপরূপ আবছায়া যেন ছাইবর্ণ হয়ে গেল পারুলের কাছে। বিস্বাদে ভরে গেল মন। শরীরে যেন অশুচিতার স্পর্শ। যেন গু মাড়িয়েছে এমনভাবে থমকে গেল পারুল।
কণ্ঠস্বর আপনা থেকেই কঠিন হয়ে গেল, তুমি! কী চাও বলো তো!
সোহাগ ভারী অবাক হয়ে বলে, কিছু চাই না তো!
মুখ ফিরিয়ে নিল পারুল, বিরাগে। বলল, ও, এত সকালে—?
মাঝে মাঝে আমি খুব ভোরে উঠে পড়ি, তখন ঘরে থাকতে একটুও ভাল লাগে না। বেরিয়ে পড়ি।
সোহাগকে যে কেন এত অপছন্দ করে? একটাই কারণ। এ মেয়েটা জানে, আজ থেকে কুডি বছর আগে ওর বাবার সঙ্গে তার দেহগত সম্পর্ক হয়েছিল। হতে পারে সেটা জবরদস্তি, হতে পারে অবলার ওপর প্রবলের অত্যাচার, তবু হয়েছিল। আর সে কথা মনে পড়লেই সমস্ত শরীরে যেন এক অপবিত্রতার স্পর্শদোষ ঘটে যায়। যতই সোহাগ তাকে গডেস বলুক, ওকে দেখলেই তার ভিতরটা কুঁকড়ে যেতে চায়। মেয়েটা জানে, সব জানে বলেই পারুলের বড় ছোট মনে হয় নিজেকে।
অথচ সে জানে, সোহাগ ভাল মেয়ে। বলাকা ওর প্রশংসা করে, পান্না করে। মেয়েটা একটু পাগলাটে হলেও ব্যক্তিত্ব আছে, খারাপ নয়। তবু ওর একটাই অপরাধ, ও জানে। ও পারুলের গোপন পাপস্পর্শের কথা জানে।।
ময়ূরকণ্ঠী থেকে ছাইরঙা হয়ে যাওয়া এই ভোরে আচমকা পারুলের বড্ড ভয় হল। কুড়ি বছর আগের শরীরী অপবিত্রতা কি তার আতু বা শুভকেও স্পর্শ করবে? স্পর্শ করবে তার পেটে সদ্য অঙ্কুরিত দুষ্টুটাকে?
আমি যদি এখন একটু একা থাকতে চাই, তাহলে কি তুমি কিছু মনে করবে?
গালে থাপ্পড় মারার মতোই অপমান। কিন্তু সোহাগ মৃদু হেসে বলল, না না, কিছু মনে করব না। আই অ্যাম লিভিং।
ফটকের দিকে যখন পা বাড়িয়েছে মেয়েটা তখন হঠাৎ পারুলের একটু মায়া হল। মেয়েটার মুখ এই ভোরের আবছা আলোতেও বড় করুণ দেখাচ্ছিল।
সোহাগ।
বলুন।
আসলে কী জানো, কাল রাত থেকে আমার শরীরটা ভাল নেই। তাই কিছু ভাল লাগছে না। কিছু মনে করনি তো!
মেয়েটা একটুও রাগ প্রকাশ করল না। সঙ্গে সঙ্গে এগিয়ে এসে খুব নরম গলায় বলল, কী হয়েছে আপনার?
তেমন কিছু নয়। হয়তো বদহজম।
বদহজম মানে স্টমাক আপসেট?
অনেকটা তাই।
কিন্তু আপনাকে বেশ সুন্দর দেখাচ্ছে।
তাই?
নট সিক্ল।
কিছু বলবে আমাকে?
না তো! আমি এখান দিয়ে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ আপনাকে দেখে এত ভাল লাগল।
আমাকে দেখে কেন যে তোমার এত ভাল লাগে, বুঝি না বাবা।
আমি তো তা জানি না। আপনাকে দেখেই আমার মন ভাল হয়ে গেল। ভাবলাম আপনার সঙ্গে একটুক্ষণ থাকি। কিন্তু আপনি তো আমাকে পছন্দ করেন না।
লজ্জা পেয়ে পারুল হেসে ফেলে, কে বলল পছন্দ করি না?
আমি জানি।
তুমি ভুল জান। তোমাকে অপছন্দ করব কেন? তুমি তো একটা ভাল মেয়ে।
মাথা নেড়ে সোহাগ বলে, সবাই কেবল ভাল আর খারাপ নিয়ে কথা বলে। ভাল না খারাপ তা যে কা করে বোঝা যায় সেটাই আমি বুঝতে পারি না। আমাকে আমার মা বলে খারাপ, বাবা বলে খারাপ। আমি খুব ভাবি আমি কেন খারাপ। কিন্তু কিছু বুঝতে পারি না।
তুমি খারাপ নও তো।
তাহলে আমাকে অপছন্দ করেন কেন? অথচ আমি আপনাকে কী ভীষণ অ্যাডোর করি! ভাবি আমি পারুলের মেয়ে হয়ে কেন যে জন্মাইনি!
কথাটা সে আগেও শুনেছে। শুনে আহ্লাদিত হয়নি একটুও। কিন্তু এখন একটু মায়া হল। বলল, এসো, দুজনে পায়চারি করি একটু।
আপনার খারাপ লাগবে না তো! একা থাকতে চাইছিলেন।
না, খারাপ লাগবে না।
আজ আমার মন ভাল নেই।
কেন বল তো!
আজই মা বাবা কলকাতায় ফিরে যাবে। আমাকেও যাওয়ার জন্য ইনসিস্ট করছে।
তুমি কলকাতায় যেতে চাও না?
না।
ওমা! কেন? এই গাঁ-গঞ্জে ভাল লাগে বুঝি তোমার? ওঃ, তোমার তো বোধহয় একটা পলিউশন অ্যালার্জি আছে, তাই না?
হ্যাঁ আছে। এমনিতেও শহর আমার ভাল লাগে না।
কিন্তু পড়াশুনো?
সেটাই প্রবলেম। কলকাতায় ফিরে গিয়েই আমাকে ক্লাসে যেতে হবে, মিউজিক লেসন নিতে হবে, কম্পিউটার, ব্যায়াম এসব নিয়ে এনগেজড থাকতে হবে। কোয়াইট সাফোকেটিং। আমি কি একটু বেশি কথা বলছি?
না তো!
আপনি একা থাকতে চাইছিলেন। এসব কথায় হয়তো আপনি বিরক্ত হচ্ছেন।
না। বিরক্ত হচ্ছি না।
দুজনে নীরবে পাশাপাশি ধীর পায়ে খানিকক্ষণ হাঁটল।
আপনাদের এই জায়গাটা বেশ।
তোমার ভাল লাগে আমাদের গ্রাম?
শুনেছি এটা আমারও গ্রাম। আমাদের রুটস এইখানে।
হ্যাঁ হ্যাঁ, ঠিকই তো। শুধু আমাদের নয়, এটা তোমাদেরও গ্রাম।
সেটা আমি আগে ফিল করতাম না।
এখন কর?
একটু একটু।
পারুল মৃদু হাসল। কিছু বলল না।
আচ্ছা পারুল, আমি যদি আপনার কাছে থাকি?
অবাক পারুল চোখ বড় বড় করে বলল, আমার কাছে? ও মা? কেন বল তো!
আমার মায়ের সঙ্গে তো আপনার ভাব আছে!
পারুল এই ছেলেমানুষি প্রস্তাবে হেসে ফেলে বলে, তা একটু আছে। দু দিনের তো আলাপ।
আপনি মাকে বলুন না, সোহাগ আমার কাছে কয়েকদিন থাক।
যাঃ। তোমার মা সে কথা শুনবেন কেন?
আপনি বললে হয়তো শুনবে।
কেন, আমার কথা উনি কেন শুনবেন?
আমি জানি মা আপনাকে অন্য চোখে দেখে।
কী চোখে বল তো!
শি ওলসো অ্যাডোরস ইউ।
ওসব তোমার ভুল ধারণা। আমার মধ্যে কিছু নেই সোহাগ। আমি খুব সাধারণ একটা মেয়ে।
বলুন না একবার মাকে।
সেটা খুব খারাপ দেখাবে সোহাগ। তা কি হয়? আর আমার কাছেই কেন থাকবে তুমি?
আমি জানি আপনি আমাকে একটুও পছন্দ করেন না। কিন্তু আপনাকে যে আমার কী ভাল লাগে।
শুধু চেহারাটা ছাড়া আমার কী আছে বল তো!
ইউ আর এ গডেস। আমার মনে হয়, আপনি হঠাৎ একদিন আকাশ দিয়ে উড়ে যেতে যেতে ঝুপ করে এখানে নেমে পড়েছেন।
পারুল প্রমাদ গুণে বলল, সাধে কি তোমাকে লোকে পাগল বলে? আমার কি পাখা আছে যে উডর।
মাথা ঠান্ডা করো, মা-বাবার সঙ্গে কলকাতায় যাও।
ইজ ইট এ সারমন?
না সোহাগ, আমার সম্পর্কে ওটা তোমার ভুল ধারণা। ধারণাটা এবার পালটে ফেল।
আমার আপনাকে আরও কাছে থেকে দেখতে ইচ্ছে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আপনার দিকে চেয়ে থাকতে ইচ্ছে করে।
যাঃ।
ইফ ইউ আর নট এ গডেস, আই শ্যাল ক্রিয়েট ওয়ান ইন ইউ।
তাই কি হয়? কাছ থেকে দেখলে তোমার ধারণা দু দিনেই ভেঙে যাবে।
মানুষ তো চিরকাল এভাবেই তার ভাগবানকে তৈরি করে নিয়েছে তাই না?
তাই বুঝি?
আমার তো তাই মনে হয়। আজ ভোরবেলা আমি কোথায় যাচ্ছিলাম জানেন?
কোথায়?
পালিয়ে যাচ্ছিলাম।
সে কী?
আপনাকে হঠাৎ দেখে দাঁড়িয়ে না পড়লে এখন আমি কোথায় যে চলে যেতাম তার ঠিক নেই।
কেন সোহাগ, পালিয়ে যাচ্ছিলে কেন?
আমি মা-বাবার সঙ্গে কলকাতায় যেতে চাই না যে!
পারুল ভ্রূ কুঁচকে একটু ভাবল। তারপর হঠাৎ ভোরের মতো একটু হেসে বলল, তুমি আমাকে গডেস বলে মনে কর তো?
করিই তো।
গডেসের সঙ্গে কেমন ব্যবহার করতে হয় জান?
জানি না।
গডেস যা বলে তা শুনতে হয়।
সোহাগ একটু হেসে বলল, আমি জানি আপনি আমাকে কলকাতায় যেতে বলবেন, তাই না?
শুনবে না তো!
শুনব।
শুনবে?
হ্যাঁ।
তাহলে চলো আমরা রাস্তায় গিয়ে একটু হাঁটি। তারপর আলো ভাল করে ফুটলে তোমাকে আমি নিজে গিয়ে তোমাদের বাড়িতে রেখে আসব।
সোহাগ খুব সরলভাবে হেসে বলল, ইন এক্সচেঞ্জ অফ হোয়াট?
পাকা মেয়ে, গড়েদের সঙ্গে ব্যবসা করতে চাও বুঝি?
তাহলে বলুন, আমাকে আর অপছন্দ করবেন না?
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পারুল বলে, তোমাকে আমার অপছন্দ হচ্ছে না তো! শুধু একটা জিনিস একটু অপছন্দ।
কী সেটা?
আমাকে তুমি নাম ধরে পারুল বলে ডাক কেন?
তাহলে কী বলে ডাকব?
পিসি মাসি যাই হোক।
এঃমা, তাহলে যে আমার গডেস পিসি মাসিই হয়ে যাবে। গডেস আর গডেস থাকবে না।
পারুল হেসে ফেলল। তারপর বলল, আচ্ছা থাক বাবা। পারুল বলেই ডেকো। আমার বোধহয় আর খারাপ লাগবে না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন