সপ্তত্রিংশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

সাঁইত্রিশ

ডি এন এ, জিন, শুক্রকীট—এসব নিয়ে মাথাটা মাঝে মাঝে বড্ড ভোম্বল হয়ে যায়। কী অশৈলী কাণ্ডকারখানা বাপু! জীবাণুর মতো ছোট এক চিজ, তার মধ্যে প্রাণ। শুধু প্রাণই বা কেন! তার মধ্যে স্বভাব, চরিত্র, মেধা, সব প্রোগ্রাম করা আছে। মাতৃগর্ভের ভ্রণ থেকে কত বড় মানুষটা হয়ে দাঁড়ায় একদিন।

কোথায় পড়েছিল মহিম যে, অত মানে চলা, অর্থাৎ গতি। ওই অত থেকে আত্মা। যে কেবলই চলে। বাপের বীজ থেকে মাতৃগর্ভ হয়ে তার দুর্বার গতি। বেড়ে চলে, বেড়েই চলে। বংশগতির এই প্রবহমানতার কথা যত ভাবে মহিম তত এই বুড়ো বয়সে নতুন করে অবাক হয়। কত কাল, কত যুগ আগে সৃষ্টি হয়েছিল মানুষ, তখন থেকে তার চলা, অলিম্পিক মশালের মতো প্রাণ চলেছে, প্রাণ থেকে প্রাণ, ফের প্রাণ থেকে প্রাণে।

এই যে সে, মহিম রায়, সে কি একজন আলাদা আলটপকা মানুষ? তা তো নয়। কোন হাজার হাজার বছর আগে ছিল তার পূর্বপুরুষ, হয়তো বর্বর, ন্যাংটো, ভাষাহীন, সভ্যতাহীন। কেউ তার নামও জানে না। নামই ছিল না হয়তো। তার থেকে ধারা বয়ে এত দূর এল! তার পরও চলল কমল হয়ে, অমল হয়ে তাদের ছেলেপুলে হয়ে। বিচার করলে, জগতের সব মানুষেরই টিকি বাঁধা কোনও অজানা অন্ধকার যুগের এক অনামা মানুষ আর অজানা নারীর কাছে। আদম বা ঈভ হতে পারে তারা। বা অন্য কেউ।

মহিম ভাবতে ভাবতে থই পায় না। কী করে যে হচ্ছে ব্যাপারটা! কে চালাচ্ছে এই অদ্ভুত সৃষ্টির লীলা! যত বয়স হচ্ছে ততই যেন সব বেড়ে যাচ্ছে মায়া।

কাল ওরা চলে গেছে। আজ সকালে মহিম টুক টুক করে দোতলায় উঠে মুখোমুখি ঘরটায় তালা খুলে ঢুকল। বড্ড অগোছালো রেখে গেছে ঘরখানা। বেডকভার কুঁচকে আছে, মেঝেময় পড়ে আছে নানা বর্জিত জিনিস। দেয়ালে মাথার টিপ সাঁটা। টেবিলের দেরাজ টেনে দেখল, তাতেও মাথার ক্লিপ, রিবন, সেফটিপিন, ফুরিয়ে যাওয়া লিপস্টিক পড়ে আছে। এখনও ঝাঁটপাট হয়নি ঘরটা। সেন্ট পাউডারের গন্ধ বাতাসে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

মাঝখানের দরজাটা এখনও ছিটকিনি দেওয়া। দেখে একটু অবাক হয় মহিম। পাশের ঘরটায় অমল থাকত। কিন্তু মাঝখানের দরজাটা ছিটকিনি এবং বাটাম দেওয়া কেন? কে কাকে আটকাতে চেয়েছিল? স্বামী-স্ত্রী মধ্যে ছিটকিনি-দেওয়া দরজা থাকার তো কথা নয়। তার ওপর অতিরিক্ত সতর্কতার জন্য আবার বাটামটাও আটকানো! দরজাটা খুলে ভিতরে ঢুকতেই ক্ষীণ অ্যালকোহলের গন্ধ পেল মহিম।

অমল মদ খায় তা মহিম জানে। যেদিন মধ্যরাতে মহিমের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়েছিল অমল সেদিনও গন্ধ পেয়েছে। মদ-টদ খাবে সে আর বেশি কথা কি? তবে টেবিলের নীচে পিছনের পায়ার কাছে সাত-আটটা মদের খালি বোতল দেখে মহিম ভ্রূ কোঁচকায়। এত মদের বোতল নিয়ে তো অমল কলকাতা থেকে আসেনি!

বিছানায় একটা ক্যালকুলেটর গোছের জিনিস পেয়ে মহিম হাতে নিয়ে ভ্রূ কুঁচকে দেখল। এসব জিনিস মহিম চেনে বটে কিন্তু ব্যবহার জানে না। ঢাকনা খুলে দেখে, ছোট ছোট অনেক বোতাম। শুধু ক্যালকুলেটর ছাড়াও অন্য সব ব্যবহারও আছে নিশ্চয়ই। একবার ইচ্ছে হল বোতামগুলো এক-আধটা টিপে দেখে কী ঘটনাটা ঘটে।

কিন্তু সাহস হল না। কে জানে বাবা আনাড়ির হাতের টেপাটেপিতে খারাপ-টারাপ না হয়ে যায়। কাজের জিনিসটা ফেলে গেছে, হয়তো অসুবিধেয় পড়বে। রতনকে দিয়ে একটা ফোন করিয়ে দিতে পারলে হয়।

রতনকে ডেকে লাভ নেই। এখন সে ঘুমোচ্ছে। আগে গাঁয়ের ছেলেপুলেরাও ভোর-ভোর উঠে পড়ত। আজকাল রাত জেগে সব টি ভি-তে সিনেমা দেখে মাঝরাত অবধি। দু-একদিন মহিমকেও জোর করে ঘরে নিয়ে গিয়ে হিন্দি, বাংলা সিনেমা দেখানোর চেষ্টা করেছিল। মহিমের বেশিক্ষণ ভাল লাগে না। সিনেমা-টিনেমা একটা বিশেষ বয়সের পক্ষেই বোধহয় ভাল। বয়স গড়িয়ে গেলে ধৈর্যও কমে যায় কিনা।

নিচু হয়ে টেবিলের তলা থেকে বোতলগুলো টেনে আনল মহিম। সব কটায় একই লেবেল আঁটা। ঢাকনা খুলে একটু গন্ধও শুকল মহিম। গন্ধ কিন্তু বিকটেল নয়, একটু ঝাঁঝালো, এই যা। একটা বোতলে দেখল, একটু তলানি পড়ে আছে এখনও। সন্ধ্যাকে ডেকে বোতলগুলো দিয়ে দিলে হয়। ধুয়ে কাসুন্দি-টাসুন্দি রাখতে পারবে। এমনিতে অ্যালকোহল বিশুদ্ধ জিনিস, তাতে জীবাণু বাঁচে না।

খাটের ওপর বসে মহিম অমলের কথাই ভাবছিল। ছেলেপুলে বড় হলে ঘাটের সঙ্গে মাঝদরিয়ার নৌকোর মতো তফাত হয়ে যায়। তবু সেই হামাটানা অমল, সেই পৈতের দিন ন্যাড়ামাথা অমলের চুলের জন্য কান্না, সাঁতার শিখতে গিয়ে হাবুডুবু অমলের সেই বাপের গলা জড়িয়ে ধরা, সব মনে পড়ে যাচ্ছিল আজ। মায়া কি ছাড়তে চায়! অমলের কথা থেকেই আরও কথা এল মনে। জিন, ডি এন এ, বংশগতি। কী সাংঘাতিক সব ব্যাপার-স্যাপার! যতদিন যাচ্ছে ততই যেন দুনিয়াটা বুঝ-সমঝের বাইরে চলে যাচ্ছে। ততই মনে হচ্ছে, জীবনটাকে ওপরসা ওপরসা দেখে তেমন কিছু বোঝা যায় না বটে, কিন্তু তার পরতে পরতে কত যে রহস্য লুকিয়ে আছে!

মদের খালি বোতলগুলো টেবিলের ওপর সাজাল মহিম। তারপর চেয়ে রইল। সে শুনেছে এক এক বোতল বিলিতি মদের দাম অনেক। এই আট বোতল মদের দাম কত তা ভাবতেও ভয় করে। এত পয়সা খরচ করে এত মদ কেন খায় কে জানে! এত মাথা ছেলেটার, অত ভাল রেজাল্ট করা, তারপর মোটা বেতনের চাকরি, তবু মুখখানায় কোনও সুখের ছাপ নেই। লেখাপড়া শিখে তা হলে কী হয় মানুষের? এত শিখে, এত জেনে মদের বোতলে এসে ঢুকতে হয় কেন?

বিছানায় বসে অনেকক্ষণ ছেলেকে অনুভব করল মহিম। না, ছেলেটা বোধহয় সুখী হল না। কেন হল না তার কারণ খুঁজে বের করা হয়তো মহিমের সাধ্য নয়। তার চিন্তা ক্রমে অমলকে ছেড়ে মোনা, বুডঢা, তারপর সোহাগে এসে থামল। কোনও প্যাটার্ন নেই ওদের মধ্যে। এক এক জন এক এক রকম। কিন্তু প্যাটার্নটা নেই কেন? কোথায় গণ্ডগোলটা হচ্ছে?

জানালা দিয়ে নীচের উঠোনে সন্ধ্যাকে দেখতে পাচ্ছিল মহিম। ভাল করে আলো ফোটার আগেই উঠে পড়ে মেয়েটা। তারপর সারাদিন মোযের মতো খাটে। রূপ নেই, গানের গলা নেই, বিয়ে টিকল না—এইসব অভাব শরীর খাটিয়ে পুষিয়ে নিতে চায়। ভাল, ভাল, কিছু নিয়ে মেতে থাক। মনের ক্ষতচিহ্নগুলো নিয়ে বেশি নাড়াচাড়ার সময় না পাওয়াই ভাল।

এই সাত-সকালেই দু-চারজন মাল নিতে চলে এসেছে। বেলা হলে আরও আসবে। সন্ধ্যার জিনিসপত্র আজকাল খুব বিক্রি হচ্ছে। একদিক দিয়ে ভগবান বঞ্চিত করেছেন বটে, তাই কি অন্য দিক দিয়ে পুষিয়ে দিচ্ছেন? বছর খানেক আগেই সন্ধ্যা একদিন মহিমকে কথায় কথায় বলে ফেলেছিল, তার নাকি সত্তর হাজার টাকার ওপর জমে গেছে। গ্রামদেশে একটা মেয়ের পক্ষে ঘরে বসে এত টাকা রোজগার বড় কম কথা তো নয়। এখন হয়তো ওর হাতে লাখ টাকার ওপরেই আছে, মাঝে একদিন বলেছিল, পেষাই মেশিন কিনে গুঁড়ো মশলার ব্যবসা শুরু করবে।

এই টাকার লোভেই কিনা কে জানে, একটা ছোকরা ওর সঙ্গে বোধহয় খানিকটা ঘনিষ্ঠ হয়েছে।

মহিম কানাঘুষো শুনেছে, বিয়েও নাকি করতে চায়। মহিম তাই উদ্বেগ বোধ করে।

এ বিষয়ে সন্ধ্যাকে কিছু জিজ্ঞেস করাটা অনুচিত হবে ভেবে চুপ করেই ছিল মহিম। উদয়াস্ত খাটে মেয়েটা, প্রেম-ট্রেম করার সময়ও তো পায় না। হয়তো রটনাই হবে ভেবে নিয়েছিল মহিম।

সন্ধ্যার ঘর মহিমের ঘর থেকে দু কদম। তবু সন্ধ্যা বাপের সঙ্গে দেখা করার সময় পায় না। কাজের ফাঁকে ফাঁকে চোখাচোখি হয় হয়তো, কিন্তু কথা বলার ফুরসত কই ওর? এখন কয়েকটা মেয়েকে মজুরি দিয়ে রেখেছে, তাদের কাজকর্ম তদারক করা, আদায়-উশুল, হিসেব-নিকেশ সবই তো একা সামলায়।

দিন কয়েক আগে একটু ফাক পেয়ে সন্ধেবেলা এল মহিমের কাছে।

বাবা, তোমার শরীর নাকি খারাপ?

কে বলল তোকে?

সোহাগ বলছিল, দাদুর জ্বর হয়েছে।

মহিম প্রসন্ন হেসে বলল, সেরকম কিছু নয়। ঠান্ডা লেগে সর্দি মতো হয়েছে একটু। সেরে যাবে।

সোহাগ তোমার কাছে খুব আসে, না?

আসে মাঝে মাঝে। গল্প-টল্প করে।

খুব অদ্ভুত মেয়ে, তাই না? আমার ভারী ভাল লাগে ওকে। আমার যদি ওরকম একটা মেয়ে থাকত বেশ হত।

মহিম চুপ করে থাকে। সন্ধ্যার যে ঘর-সংসার-সন্তান হল না তার জন্য নিজেকেই দায়ি বলে মনে হয় মহিমের। পাত্র পছন্দ করেছিল সে নিজেই। এমনিতে পাত্র কিছু খারাপও মনে হয়নি। কিন্তু বুদ্ধি-বিবেচনা-বিচার কত যে ওলট-পালট হয়ে যায়।

কালোজিরে ন্যাকড়ায় বেঁধে ছোট একটা পুঁটুলি করে এনেছিল সন্ধ্যা। আর এক প্যাকেট শুকনো আদাকুচি বাবার হাতে দিয়ে বলল, রাত্রে একটা কাথ তৈরি করে নিয়ে আসব। মা করত, মনে নেই?

মহিম হাসল। সবই মনে আছে। চেয়ার টেনে বাপের বিছানার কাছে বসে সন্ধ্যা বলল, সারাদিন এত ঝামেলা যায় যে তোমার সেবা-টেবা কিছু করতে পারি না। তোমার তো চিরকালের চাপা স্বভাব, মরে গেলেও নিজের অসুবিধের কথা কাউকে বলবে না।

ভাবছিস কেন? অসুবিধে হলে তো বলব! সামান্য সর্দিজ্বর, তা জ্বরটাও এখন নেই।

এ-বাড়িতে তোমার দিকে তাকানোরও কারও সময় নেই দেখছি। মা মরে যাওয়ার পর থেকেই তোমার বড় অযত্ন হচ্ছে।

মহিম একটু হাসল। কথাটা একেবারেই ঠিক নয়। সন্ধ্যার মা কোনওদিনই মহিমকে মূল্য দেয়নি, আমলও দিত না। মহিমের নালিশ ছিল না বটে, কিন্তু অবহেলাটা সে খুব টের পেত। আর সেই অবহেলার মনোভাব মহিমের ছেলেমেয়ের মধ্যেও চারিয়ে গিয়েছিল। স্ত্রী যদি স্বামীকে সম্মান বা শ্রদ্ধা না করে তা হলে ছেলেপুলেরাও বাবাকে শ্রদ্ধা করতে শেখে না। মহিমের যত্ন কেউ কখনও করেনি। তার জন্য তার বিশেষ দুঃখও নেই।

তবে সন্ধ্যার কথাটার প্রতিবাদও করল না মহিম। প্রিয় মানুষরা স্মৃতিতে মহান হয়ে যায়। প্রতিবাদ করবেই বা কেন মহিম! করে লাভ কী?

সে মৃদুস্বরে বলল, আমার তো অসুবিধে হচ্ছে না। তোরা সব কাজকর্ম নিয়ে আছিস। যদি অচল হয়ে পড়ি তখন দেখা যাবে।

তবু মায়ের মতো যত্ন কি আর কেউ করতে পারবে?

মহিম হেসে বলল, আমাকে নিয়ে কেউ ব্যস্ত হয়ে পড়লে বরাবরই আমার অস্বস্তি হয়। মানুষের উৎপাতের কারণ যত না হওয়া যায় ততই ভাল।

না বাবা, তোমার কথা ভেবে মাঝে মাঝে আমার কিন্তু কষ্ট হয়। মুখ ফুটে কিছু বল না বটে, কিন্তু অসুবিধে কি আর না হচ্ছে!

দুর পাগল, অসুবিধে আবার কী? বেশ আছি।

খানিকক্ষণ চুপচাপ বসে থেকে হঠাৎ সন্ধ্যা বলল, বাবা, একটা কথা বলব? আমার বাকি জীবনটা কীভাবে কাটবে বলো দেখি!

মহিমের বুকে যেন শক্তিশেল এসে পড়ল। এটা সন্ধ্যার অনুযোগ নয়, নালিশ নয়। বাপের বিরুদ্ধে অভিমান বা রাগও নয়। খুব স্বাভাবিক গলায় নিরাবরণ একটা প্রশ্ন। তাই বোধহয় সেটা রাখঢাক না করেই সোজা এসে পড়ল হাতুড়ির ঘায়ের মতো।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে মহিম বলল, সেটাই তো ভেবে ভেবে সারা হই।

আমিও ভাবি বাবা। টাকা কিছু কম তো রোজগার করি না। ব্যবসা বাড়বে, কাজকর্ম বাড়বে, রোজগারও বাড়বে। কিন্তু শুধু টাকা দিয়ে কী হবে বল তো!

মহিম এ কথার কী জবাব দেবে? টাকার উপযোগিতা এক এক বয়সে হয়তো এক এক রকম। আশি বছর বয়সে মহিমের এখন টাকা জিনিসটার প্রতি কোনও মোহ নেই। হয়তো অভাবি, উপোসি হলে মোহ থাকত। ঠেকায় না পড়লে টাকার চিন্তা এখন কদাচিৎ মাথায় আসে।

সে মৃদু স্বরে বলল, সেটা তো মস্ত প্রশ্ন মা। টাকা দিয়ে সব সমস্যার তো সমাধান হয় না।

হ্যাঁ বাবা, আমার কত বয়স হল বল তো! এখনও কতদিন বাঁচতে হবে! ভাবলে কেমন মাথাটা পাগল পাগল লাগে। কাজকর্মে নিজেকে ডুবিয়ে রাখি বটে, কিন্তু মাঝে মাঝে বুকটা মুচড়ে ওঠে।

মহিম মেয়ের মুখের দিকে তাকাতে পারল না। অপরাধী চোখ নেমে এল নীচে।

সন্ধ্যা বলল, সেই মানুষটাকে সামনে পেলে একবার জিজ্ঞেস করতাম, আমার দোষটা কী ছিল। কুচ্ছিত! কত কুচ্ছিত হ্যাক-ছিঃ মেয়েও কেমন দিব্যি সুখে ঘর করছে বল তো! আমি কুচ্ছিত হলেও তাকে ভরিয়ে দিতে পারতাম, কোথাও খুঁত থাকত না একটুও।

একটা দীর্ঘশ্বাস মোচন করে মহিম বলে, কতবার ভেবেছি একবার ওর কাছে যাব। গিয়ে কী দেখব কে জানে, হয়তো দ্বিতীয় বিয়েটা সুখের হয়নি। হয়তো তোর কথা মনে করে ওর অনুশোচনা হয়।

সন্ধ্যা বোকা হলেও ব্যবসা-ট্যাবসা করে বাস্তব বুদ্ধি হয়েছে খানিকটা। মুখখানা ভার করে বলল, ও কথা আমারও মনে হত বাবা, পৃথিবীতে কত কিছুই তো ঘটে। কিন্তু আমার কপালে ওরকম হবে না বাবা।

মহিম চুপ করে থাকে।

সন্ধ্যা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, আজকাল তাই বড্ড একাও লাগে। তাই ভাবছি—

কী ভাবছিস রে মা?

সে তোমাকে আর একদিন বলবখন। আগে ভাল করে ভেবে নিই, তারপর বলব। একদিন তো বলতেই হবে।

সেই একদিনটা আজও আসেনি। না আসাই ভাল। সন্ধ্যা যা-ই বলুক সেটা মহিমের খুব পছন্দসই হওয়ার কথা নয়। যে ছোকরাটি আসে সেও আর পাঁচজনের মতোই সন্ধ্যার তৈরি আচার, কাসুন্দি, আমলকী নিয়ে গাঁয়েগঞ্জে দোকানে দোকানে সাপ্লাই দেয়। পরিশ্রমী, কেজো চেহারা। একদিন সোহাগ মহিমের ঘরে বসেছিল দুপুরবেলা। গল্প করতে করতে জানালা দিয়ে কী দেখে থেমে গেল।

তারপর বলল, দাদু, দেখো।

কী দেখব রে?

দেখো না ওই লোকটাকে।

মহিম দেখল। কালো, বৈশিষ্ট্যহীন চেহারার বছর ত্রিশ বয়সি একটা ছেলে।

ও কে রে দিদিভাই?

ভাল করে দেখেছ?

দেখলাম তো!

পিসিকে ওর সঙ্গে মানাবে?

মহিম চমকে উঠে বলে, তার মানে কী রে?

মুখটা খুব করণ হয়ে গিয়েছিল সোহাগের। বলল, পিসিটা না ভীষণ লোনলি।

তা তো জানি। কিন্তু মানানোর কথা কী বললি দিদিভাই?

ও কিছু না।

কথাটা ওখানেই থেমে গিয়েছিল।

কয়েকদিন পর সোহাগ আর একদিন মহিমের সঙ্গে গল্প করতে করতে হঠাৎ বলেছিল, পিসির একজন বয়ফ্রেন্ড হলে ভাল হয়, না দাদু?

মহিম অবাক হয়ে বলেছিল, সে কী! বয়ফ্রেন্ড কেন?

সোহাগ বলল, কোনও কোনও মহিলা আছে যারা সিংগল থাকতেই পছন্দ করে। বিয়ে-টিয়ে পছন্দ করে না, করলেও অ্যাডজাস্টমেন্ট করতে পারে না। আবার কোনও কোনও মহিলা আছে যাদের কাছে ম্যারেজ ইজ এভরিথিং। বিয়ে না করে থাকার কথা তারা ভাবতেই পারে না। জান? পিসি হল এই সেকেন্ড টাইপের।

সেটা যে মহিম জানে না তা নয়। সন্ধ্যা ছেলেবেলা থেকেই ঘর-গোছানো মেয়ে। কাজেকর্মে পরিপাটি, পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন, কখনও আলসেমি বলে তার কিছু দেখেনি মহিম। ওর মাও বলত মুখখানা সুন্দর নয় বটে, কিন্তু যার ঘরে যাবে তার ঘরে লক্ষ্মীশ্রী ফুটে উঠবে।

মহিম বলল, তুই পিসিকে নিয়ে খুব ভাবিস বুঝি?

ভাবব না? শি ইজ এ ডেজার্টেড উওম্যান!

আমিও খুব ভাবি। হ্যাঁ রে দিদিভাই, তোর পিসি কি আবার বিয়ে করার কথা ভাবে?

একটু দ্বিধায় পড়ে সোহাগ বলেছিল, নট একজ্যাক্টলি।

তা হলে?

আমার মনে হয়, পিসি ওয়ান্টস এ ফ্যামিলি অ্যারাউন্ড হার।

এটাও তো একটা পরিবার, তাই না?

না না এরকম নয়। পিসি ওয়ান্টস হার ওন ফ্যামিলি। ক্রিয়েটেড বাই হার।

মহিম চুপ করে গিয়েছিল। সতেরো বছর বয়সি নাতনির সঙ্গে এ বিষয়ে আর অধিক কথা বলাটা শোভন হত না।

কিন্তু হঠাৎ স্বগতোক্তির মতো একটা কথা বলেছিল সোহাগ, জান দাদু, লোকটা কিন্তু পিসিকে দিদি ডাকে।

কে লোকটা?

ওই যে সেই লোকটা।

দিদি ডাকলে ক্ষতি কী? অনেকেই তো ডাকে!

সোহাগ খিলখিল করে হেসে ফেলেছিল। তারপর বলল, তুমি কিছু বোঝো না!

মহিমকে ভাবনার সমুদ্রে ফেলে রেখে উধাও হয়েছিল সোহাগ।

মহিম সেই থেকে ভেবে যাচ্ছে। ভেবেই যাচ্ছে।

বেলা সাতটায় উঠোনে রতনকে দেখতে পেয়ে ডাকল মহিম। রতন ওপরে এলে মহিম বলল, এগুলো তোর পিসিকে দিয়ে আয়। কাসুন্দি-টাসুন্দি রাখতে তো বোতল লাগেই।

রতন হাসল, পিসি ও বোতল নেবে নাকি?

কেন নেবে না?

ও তো মদের বোতল!

মহিম চিন্তিত হয়ে বলে, নেবে না বুঝি? তা হলে থাক।

পিসি নেবে না। আমি তো কালই ওদের মালপত্র নামাতে গিয়ে বোতলগুলো দেখে পিসিকে বলেছিলাম। পিসি যা রেগে গেল!

রেগে গেল কেন?

বলল মদের বোতলে আমি কাসুন্দি বিক্রি করব? ছিঃ ছিঃ! খবরদার ও কথা আর মুখে আনবি না।

আমি ভয়ে আর কিছু বলিনি বাবা! মা বলেছে শিশিবোতলওয়ালা এলে বেচে দেবে। ওরা নাকি মদের বোতলের দাম বেশি দেয়।

মহিম রতনের দিকে চেয়ে থেকে বলল, ওকে এত মদ কে এনে দিত বল তো! তুই?

না, কাকা নিজেই কিনত। তবে আমিই মোটরবাইকে করে কাকাকে বর্ধমান নিয়ে গেছি দুদিন। মদ কিনতে। তুমি মদ নিয়ে এত ভাবছ কেন দাদু? ওসব আজকাল জলভাত, সবাই খায়।

তাই দেখছি।

দুনিয়ায় যে মদ্যপায়ীর সংখ্যা বাড়ছে সে খবর একটু জানে মহিম। যৌবন বয়সে সেও খেয়েছে কখনও-সখনও। তবে শখ করে। কথাটা হল, মদ্যপায়ীর সংখ্যা বাড়ছে কেন?

এমন নয় যে, মদের বিরুদ্ধে মহিমের কোনও জেহাদ আছে। বহু বহু যুগ আগে থেকেই সুরার প্রচলন রয়েছে মানুষের সভ্যতায়। দেবতারাও নাকি খেতেন-টেতেন। তবু যে ক্ৰমে ব্যাপারটা খুব চারিয়ে যাচ্ছে তার মানে কী, আলাদা একটা পিপাসা তৈরি হয়েছে? নাকি মানুষের নানা ব্যর্থতা আর হতাশা থেকেই বাড়ছে মদের আসক্তি!

প্রশ্নটার সমাধান সহজ নয়।

বেলা দশটায় মহিম গৌরহরির বাড়ির উঠোনের রোদে মোড়া পেতে বসা। সামনে একটা জলচৌকিতে বউঠান।

অনেকদিন পরে এলেন ঠাকুরপো! অমলরা ছিল বলে বোধহয় আসার সময় পাননি।

মহিম মাথা নেড়ে বলে, তা নয় বউঠান। ওরা ওদের মতো ছিল, আমি আমার মতো। আসলে গৌরদাই তো নেই, তাই আসতে একটু কেমন কেমন লাগত! বুকটা ছ্যাঁত করে উঠবে হয়তো, সেই ভয়েই আসতাম না।

বলাকার মুখখানা ভারী করুণ হয়ে গেল।

তবেই বুঝুন তাকে ছাড়া আমি কী করে আছি। আমার বুক তো ছ্যাঁত করে ওঠে না, সব সময়ে খাক হয়ে যাচ্ছে।

এত বড় বাড়িটায় একা কী করে থাকবেন বউঠান? গৌরদা ভাইয়েদের অংশ কিনে নিলেন, আমি তখন বোঝানোর চেষ্টা করেছিলাম যে, এত বড় বাড়ি তাঁর কোনও কাজে লাগবে না। তা অন্যের কথা শুনে চলবেন তেমন মানুষ তো ছিলেন না।

সে তো সত্যি কথা। বাড়িটা তো সারাদিন আমাকে গিলে খাচ্ছে। তবু পড়ে আছি। আমার তো অন্য গতি নেই।

কলকাতা বা নেহাত বর্ধমান শহর হলেও না হয় প্রোমোটারকে দিয়ে ফ্ল্যাটবাড়ি বানিয়ে নেওয়া যেত। কিন্তু গ্রামদেশে তো তা হওয়ার জো নেই।।

না ঠাকুরপো, কলকাতা হলেও এ-বাড়ি আমি কক্ষনও প্রোমোটারকে দিতাম না। যার বাড়ি সে এখনও এ-বাড়ির সব জায়গায় ছড়িয়ে রয়েছে। আমি তো সব সময়ে তাকে টের পাই। ওই যেখানে আপনি বসে আছেন ওখানে বসেই এই শীতকালে তেল মাখত। সেই দৃশ্য যে এখনও দেখতে পাই।

আপনি নমস্যা বউঠান। লোকেও বলে, এমন সতীলক্ষ্মী আজকাল আর দেখা যায় না।

বলাকা মিষ্টি করে হেসে বলে, সেসব কিছু বুঝি না, শুধু জানি, সে ছাড়া আমি নেই। সত্যি কথা বলতে কী, এখন আমি নেই-এর দলেই পড়ে গেছি। বেঁচে আছি, আবার নেইও।

এইসব কথা শুনলে কান, মন সব পবিত্র হয়। ভালবাসা নিয়ে আজকাল যত বড় বড় লেকচার দেয় লোকে, কিন্তু ভালবাসা কি সোজা জিনিস! তার পিছনে কত ত্যাগ, ধৈর্য, অধ্যবসায় থাকে, কত সেবা, কত স্বার্থহীনতা। এ যুগে হালকা মনের বেলুন-মানুষেরা তা কী করে বুঝবে! এই বলাকা বউঠানকে সেই কিশোরীবেলা থেকেই তো দেখছে মহিম। এক ফোঁটা একটা রোগাটে গড়নের মেয়ে। মুখখানা তিরতির করত। খুব ফর্সা রং আর মেঘের মতো এক ঢল চুল ছিল। গৌরহরি তখন মধ্যযৌবনের রাঙা এক যুবাপুরুষ। মহিমের চোখের সামনেই সম্পর্কটা গড়ে উঠল। একদিকে একজন নাবালিকা, অন্য দিকে একজন শক্তসমর্থ পূর্ণবয়স্ক পুরুষ। বয়সের তফাত শুনলে এ যুগের ফচকে ছেলেমেয়েরা আঁতকে উঠবে। হয়তো বলবে বাপের বয়সি। তা কথাটা মিথ্যেও তো নয়। পতি আর পিতা একই ধাতু নিষ্পন্ন শব্দ। পাতি নেকটা পিতার মতোই। এখনকার দাম্পত্য সম্পর্কের মধ্যে অনেক ফিচেলপনা ঢুকে গেছে, আকচা-আকচি ঢুকে গেছে, ইয়ারবন্ধুর মতো হাবভাব, ওতে স্বামী-স্ত্রীর ব্যাপারটাই ফুটে ওঠে না মোটেই। যেন সেক্স পার্টনার। সম্পর্কের দফার ওখানেই গয়াপ্রাপ্তি ঘটে যায়।

নাবালিকা বউকে নিয়ে গৌরহরির ঘর করা স্বচক্ষে দেখেছে মহিম। কী স্নেহ আর নরম কথা দিয়ে বাপের বাড়ির বিরহে কাতর বলাকাকে ভুলিয়ে রাখতেন গৌরহরি। বাড়ির লোকের চোখের আড়ালে গোপনে তাকে পড়াতেন, গল্প বলতেন। একবার বাড়ির সবাই তীর্থভ্রমণে গেল, তখন বলাকার হল টাইফয়েড। অন্য কেউ হলে ঝামেলা এড়াতে বউকে ঠিক বাপের বাড়ি পাঠিয়ে দিত বা শাশুড়ি-শ্বশুরকে ডেকে আনত। গৌরহরি তা করেননি। গু-মুত পরিষ্কার করা থেকে পথ্য পর্যন্ত সবকিছু সামলেছেন। একটুও বিরক্ত নেই, ঘিনপিত নেই।

একদিন মহিম বলেই ফেলল, গৌরদা এ যে দেখি বানরে সংগীত গায়, পিংলা জলে ভাসি যায়, দেখিলেও না হয় প্রত্যয়। জীবনে আপনি কখনও এক গ্লাস জল অবধি গড়িয়ে খেয়েছেন বলে তো শুনিনি। তা এত সব শিখলেন কোত্থেকে?

গৌরহরি একটু লজ্জা পেলেন বটে, কিন্তু নরম গলায় বললেন, মেয়েটার আমি ছাড়া কে আছে বল। আমার মুখ চেয়েই তো সব আপনজনকে ছেড়ে এসে আছে। ওর যদি এখন মনে হয় যে, মা বাবা কাছে নেই বলে ওর যত্ন হল না, তা হলে সেটা তো খুব লজ্জার ব্যাপার হবে। তাই ওকে বুঝতেই দিইনা।

একটু সময় লেগেছিল বলাকার মানুষটাকে বুঝতে। যখন বুঝল তখন তার মনোজগৎ জুড়ে গৌরহরি ভাস্বর হলেন। সেই মুগ্ধতা আজও বলাকার চোখে-মুখে ছড়িয়ে আছে। মারা গিয়েও গৌরদা যে কী ভীষণভাবে বেঁচে আছেন তা মহিম রায়ের মতো আর কে জানে! অথচ পরবর্তীকালে খামখেয়ালি গৌরহরি অন্যায্য অত্যাচারও তো কিছু কম করেননি। যখন তখন এটা সেটার ফরমাশ, বায়না, হঠাৎ অতিথি নিয়ে এসে চড়াও হওয়া। কোনওদিন এতটুকু কথা কাটাকাটি অবধি হয়নি দুজনের।

এইসব শিক্ষা নিতেই তো মহিম আসে এবাড়িতে। দেখতে আসে গৌরহরি নিজের আয়ুষ্কাল পেরিয়ে কত দূর পর্যন্ত নিজের ছায়াকে প্রলম্বিত করে রেখেছেন। এইভাবেই মানুষ বাঁচে।

দেবিকাকে যখন বিয়ে করে আনে মহিম তখন মহিমের বয়স পঁচিশ-ছাব্বিশ হবে। দেবিকার কুড়ি-একুশ। পয়সাওলা ঘরের মেয়ে। মেলা দানসামগ্রী, নগদ পেয়েছিল মহিম। ওই অত সব পেয়েই বোধহয় একটু অধমর্ণ ভাব ছিল তার।

না, সম্পর্ক তাদের ভালই ছিল। ভাব ভালবাসার কিন্তু খামতি ছিল না। যেটার অভাব ক্রমশ প্রকট হল তা হল শ্রদ্ধা। আর ওই শ্রদ্ধার অভাব ঘটলে বোধহয় ভালবাসাটাও নিবু নিবু হয়ে আসে। ক্রমে ক্রমে, খুব ধীরে ধীরে সংসারের একজন গুরুত্বহীন সদস্যে পরিণত হচ্ছিল মহিম। তার মতামতের দাম নেই, তার পরামর্শ কেউ চায় না, তার অনুমতিরও প্রয়োজন হয় না কারও।

শীতের রোদে সাদা থান পরা দেবীমূর্তির মতো বসে আছে বলাকা। দেখলে শ্রদ্ধায় মাথা নত হয়ে আসে। তবে যৌবন বয়সে মহিমের মনোভাব মাঝে মাঝে পঙ্কিল পথে ধাবিত হত না যে তা নয়।

মনে আছে বলাকা যখন ষোলো বা সতেরো বছরেরটি হল তখন তার রূপ যেন পেখম মেলে দিল। সেই সৌন্দর্যের যেন লেখাজোখা নেই। ওই আশ্চর্য রূপ দেখতে পিপাসার্তের মতো, দুখানি কাঙাল চোখ নিয়ে রোজ ছুটে আসত মহিম। এ-বাড়িতে তার বরাবরই অবারিত দ্বার। কারও কিছু মনে করার ছিল না। বউঠানের সঙ্গে খুনসুটিরও বাধা ছিল না কোনও।

মনের কথা কে টের পাবে! মনে এক নরকখানায় নিত্য কত পাপের জন্ম হয়, কত পঙ্কিলতা বাসা বেঁধে থাকে সেইখানে। মানুষের ভাগ্য ভাল যে তারা অন্তর্যামী নয়। হলে মানুষের দুঃখ শতগুণে বাড়ত।

কিন্তু মেয়েরা ঠিক টের পায়। কিছু না-কিছু তারা বুঝতেই পারে পুরুষের চোখ দেখে। ও-ব্যাপারে তাদের মেয়েলি মনে ঠিক সংকেত বেজে ওঠে।

বলাকাও কি টের পেয়েছিল?

একদিন, দুপুর গড়িয়ে বিকেলের দিকে বাগানে আম কুড়োচ্ছিল বলাকা।

মহিম হাজির হয়ে বলল, কী হচ্ছে বউঠান?

আম কুড়োতে নিচু হয়েছিল বলাকা, হঠাৎ যখন সোজা হয়ে দাড়াল, তখন তার ফর্সা কপালে কুচো চুল ঘামে আটকে আছে, মুখখানায় যেন নেমে এসেছে স্বর্গের আলো। মহিমের স্বীকার করতে বাধা নেই, ওই একটি মুহূর্তে সে এমন বিহ্বল হয়ে গিয়েছিল সে যা খুশি করে ফেলতে পারত। হঠাৎ যেন বাঁধ ভাঙার জন্য তার ভিতরে প্রলয়ংকর বন্যার জল ফুঁসে উঠেছিল।

কিছু কি টের পেয়েছিল বলাকা? নির্জন আমবাগানে তখন জনপ্রাণী নেই। খর গ্রীষ্মের বিকেলে রৌদ্র-ছায়ার তীব্ৰ নাচানাচি। পাখি ডাকছিল, হাওয়া দিচ্ছিল। বলাকা হঠাৎ তার দিকে চেয়ে হঠাৎ দু পা পিছিয়ে গেল কেন যে!

কম্পিত গলায় মহিম বলল, বউঠান!

বলাকা হঠাৎ পিছু ফিরে লঘু পায়ে দৌড়ে বাগান পেরিয়ে উঠোনে গিয়ে উঠল।

বোকার মতো দাড়িয়ে রইল মহিম। বড্ড গ্লানি হল। ভাগ্যিস সে কিছু করে বসেনি!

দুদিন পর এক সন্ধেবেলা গৌরহরির বৈঠকখানায় যখন বসে আছে মহিম, তখন বলাকা তাকে চা দিতে এসে হঠাৎ মুখ টিপে একটু হেসে বলেছিল, ঠাকুরপো, এবার আপনি একটা বিয়ে করে ফেলুন।

বলাকার কি সেই আমবাগানের কথা মনে আছে? সেই দুপুর গড়িয়ে বিকেলের তীব্র স্মৃতি!

হয়তো আছে। হয়তো নেই। আয়ুর মোহনায় পৌঁছে গেছে মহিম। সেই জল এত দূর গড়িয়ে আসবে না।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%