ঊনবিংশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

উনিশ

সুধীর ঘোযেৰ ভূতকে আগে প্রায়ই দেখা যেত এখানে সেখানে। আজকাল আর বিশেষ কেউ দেখে বলে শোনা যায় না। আগেকার লোকেরাও আর নেই। বিজলি বাতি এসে গেছে, গাঁয়ে বসতিও কিছু বেড়েছে, ভূতের এখন জায়গার টান পড়েছে।

সুধীর ঘোষ অল্প বয়সেই দেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। তাঁর ছিল অঙ্কে ভাল মাথা। নানা দেশে ঘুরে অবশেষে বিলেতে একটা ইস্কুলে মাস্টারির চাকরিতে থিতু হন। শোনা যায়, সেখানে মাস্টারমশাইদের এখানকার মতো দুর্দশার জীবন নয়। সুধীর ঘোষ ভালই ছিলেন। মোটা মাইনে, বাড়ি, গাড়ি সবই হয়েছিল। কিন্তু অঙ্ক কষতে কষতে আর বিয়ে করার ফুরসত হল না। হঠাৎ একদিন দেখলেন, বেশ বুড়ো হয়ে গেছেন। বিলেতের শীত তেমন সহ্য হচ্ছে না। বার দুই নিউমোনিয়ায় ভুগে উঠলেন। বিলেতের ডাক্তাররা বলল, ট্রপিক্যাল কান্ট্রিতে তিনি ভাল থাকবেন। প্রস্তাবটা পছন্দই হল সুধীর ঘোষের। দেশের সঙ্গে বছর পঁয়ত্রিশ সম্পর্ক নেই। অঙ্কে আচ্ছন্ন মাথায় হঠাৎ দেশ-গাঁয়ের চিত্র সব ভেসে ওঠায় মনটা হু-হু করতে লাগল। আপনজন বলতে ভাই, ভাইপো-ভাইঝিরা সব আছে। তারাও চিঠি লিখল দেশে ফিরে আসতে।

অবশেষে সুধীর ঘোষ বিলেতের পাট চুকিয়ে দেশে ফেরার জাহাজ ধরলেন। মনে খুব আশা, শেষ জীবনটা দেশের বাড়িতে নিশ্চিন্তে থাকবেন।

বিস্তর বাক্স-প্যাঁটরা নিয়ে একদিন সুধীর ঘোষ দেশে ফিরলেন। খুব হইচই হল গ্রামে। বিস্তর লোক এসে দেখা করে গেল। সুধীর ঘোষ যখন বিলেতে যান তখন ভাইপো-ভাইঝিদের বেশির ভাগেরই জন্ম হয়নি। দুটি কি তিনটি যারা ছিল তারা তখন খুব ছোট। তিন ভাইয়ের মধ্যে দাদা অধীরের তিন ছেলে, দুই মেয়ে, দাদার পরে সুধীর, তারপর ভাই রণধীরের দুই ছেলে, ছোটো তপোধীরের দুই ছেলে, দুই মেয়ে। পৈতৃক বাড়িতে গিজগিজ করছে লোক। সুধীরের থাকার মতো আলাদা ঘর-টর কিছু নেই। অধীর ভরসা দিয়ে বলল, ঘাবড়ানোর কিছু নেই, দোতলাটা তুলে ফেললেই হবে।

কিন্তু দোতলাটা কে তুলবে সে বিষয়ে কেউ কিছু বলল না। দায় সুধীরের। বিলেত থেকে এসেছেন সঙ্গে মোটা টাকা। সুধীরের অবশ্য আপত্তি হল না। সংসারের প্রতি দায়দায়িত্ব কিছু পালন করেননি। মা-বাবার তেমন সাহায্যে আসেননি। মাঝে মাঝে কিছু টাকাপয়সা পাঠিয়ে দায় সেরেছেন। সুতরাং নিজের পয়সায় দোতলাটা তুলে ফেললেন। বেশ ভাল করেই করলেন। খাট-টাট কিনলেন, চেয়ার টেবিল দিয়ে সাজালেন।

প্রথম প্রথম আদর যত্নের তেমন অভাব হয়নি। বরং একটু বাড়াবাড়িই হচ্ছিল যেন। সুধীর ঘোষ বেশ খুশি। কিন্তু মাসখানেক যেতে না যেতেই দাদা অধীর হাজারখানেক টাকা ধার নিল। রণধীরেরও ছেলের পরীক্ষার ফি না কী যেন কম পড়ে গেল। তপোধীর একটা ধানজমি কেনার জন্য খুব চাপাচাপি শুরু করে দিল। বউদি আর বউমারা খুব একটা পিছিয়ে রইল না। নানা না-মেটা শখ আহ্লাদের কথা শোনাতে লাগল। অধীরের ছেলে শ্যামল ব্যবসা করার জন্য টাকা চাইতে লাগল। ভাইঝিদের মধ্যে দুজনের বিয়ে হয়ে গেছে। তারা শুনিয়ে গেল বিয়েতে কাকার কাছ থেকে তারা কোনও উপহার পায়নি।

দু মাসের মাথায় সুধীর বুঝতে পারল, এরা তাকে কামধেনু ঠাউরেছে। যার ফলে যে যা নিচ্ছে তার একটি আধলাও শোধ দিচ্ছে না। বরং বাজার হাট, সংসার খরচের টাকা এক রকম চেয়েই নিচ্ছে। এভাবে চললে যে বিলেত থেকে আনা টাকা বেশিদিন থাকবে না, তা অঙ্কবিদ পরিষ্কার বুঝতে পারলেন।

মহিমের বাবা তখন বেঁচে। উঠোনের উত্তর ধারে সকালে শীতের রোদে সুধীর ঘোষ বাঁদুরে টুপি আর তুষের চাদর জড়িয়ে জাম্বুবান সেজে এসে বসতেন। পায়ে হাঁটু অবধি উলের মোজা। হাতে দস্তানা। ঠান্ডার ভয়ে কাবু।

দুঃখ করে বলতেন, ভাল ভেবে দেশে ফিরলুম, কিন্তু এ যে বড্ড খরচের ধাক্কায় পড়ে যাচ্ছি।

মহিমের বাবা বললেন, তুই একটা আহাম্মক। প্রথম কথা বাড়ি ভাগ বাঁটোয়ারা না করেই পট করে দোতলা তুলে ফেললি। কার ভাগে কী পড়বে তা না জেনেই ওসব করতে আছে! এখন হিস্যা নিয়ে গণ্ডগোল লাগলে মুশকিলে পড়বি। তার ওপর ওরা তোকে যেভাবে দুইয়ে নিচ্ছে তাতে সর্বস্বান্ত হতে দেরি হবে না।

এখন কী করি দাদা, একটা পরামর্শ দিন।

যা গেছে তা তো গেছেই। ও নিয়ে ভাবিস না। যা আছে তা নিয়ে ফের বিলেতে পালিয়ে যা।

তা কি হয়? ও পাট যে চুকিয়ে দিয়ে এসেছি।

ফিরে গেলে কি আর চাকরি-বাকরি জুটবে না তোর?

তা জুটবে। কিন্তু বুড়ো হচ্ছি, একা থাকতে কেমন কেমন লাগে। তার ওপর ঠান্ডাটাও সহ্য হচ্ছে না আজকাল।

তোর বয়স কত হল? ছাপ্পান্ন সাতান্ন হবে?

সাতান্ন পুরে গেছে।

গাঁদেশে এই বয়সে লোকে বিয়ে-টিয়ে করে। করবি?

ও বাবা! বিয়ে! পাগল নাকি?

তাহলে তোকে রক্ষে করবে কে? তোর তো একটা জন চাই।

মায়ের পেটের ভাইরাই যদি জন না হয় তাহলে অনাত্মীয় একটা মেয়ে এসে কি জন হতে পারবে?

দুনিয়ার নিয়মই যে তাই। বউ যেমনই হোক, তোর স্বার্থ দেখবে। এরা দেখবে না। ভাল করে ভেবে দেখ।

উঠোনের ওই কোণটায় রোজই শীতে জবুথবু সুধীরকাকাকে বসে থাকতে দেখা যেত। মুখখানা বড্ড কাহিল।

একদিন বললেন, আমার ক্যামেরাটা পাচ্ছি না। ভাল জাতের লাইকা ক্যামেরা, অনেক দাম।

চুরি হয়েছে নাকি?

মুখখানা চুন করে সুধীরকাকা বললেন, মদনা কয়েকদিন ধরেই চাইছিল। বন্ধুদের সঙ্গে নাকি কোথায় বেড়াতে যাবে, ছবি-টবি তুলবে। আমি বললাম, এ খুব কমপ্লিকেটেড জিনিস, তুই হ্যান্ডেল করতে পারবি না। তাতে বাবুর মুখ ভার হয়েছিল। কাল রাত থেকেই দেখছি ক্যামেরাটা সুটকেসে নেই।

মহিমের বাবা বললেন, ভাল করে খুঁজেছিস?

দীর্ঘশ্বাস ফেলে সুধীর বললেন, খুঁজে লাভ নেই দাদা। এর আগেও কয়েকটা জিনিস গেছে। একটা রোলেক্স হাতঘড়ি ছিল, দিন দশেক আগে সেটা হাপিস হয়। জিলেটের রেজার, অডিকোলোন, সাবান, একটা ভাল সোয়েটার, টুকটাক আরও সব জিনিস হাওয়া হয়ে যাচ্ছে। বাড়ির লোককে জিজ্ঞেস করলে সবাই আকাশ থেকে পড়ে। দাদা তো কালকেই বলছিল, সত্যিকারের গেছে, নাকি বানিয়ে বলছিস!

মহিমের বাবা বললেন, আরও যাবে। তোর সবই যাবে। এখনও পালানোর সময় আছে। টাকাপয়সা কেমন গেছে?

ওটা বর্ধমানের ব্যাঙ্কে আছে। নগদ সামান্যই ঘরে থাকে।

বিলেতে যদি নাও যাস অন্তত আলাদা বাড়ি করে থাক। তাতেও খানিকটা রক্ষে পাবি।

কাঁচুমাচু হয়ে সুধীরকাকা বলেন, একা থাকব বলে কি দেশে ফিরে এলুম দাদা?

কী করবি? বাঁচতে তো হবে!

আর একটু ভেবে দেখি।

একটু শক্ত হওয়ার চেষ্টা কর।

কিন্তু সুধীর ঘোষ লড়াইটা হেরে যাচ্ছিলেন অন্য কারণে। বাড়ির সবাইকে চোর ছ্যাঁচড় বলে প্রকাশ্যেই গালমন্দ করায় গোটা পরিবারটাই তাঁর বিরুদ্ধে এককাট্টা হয়ে গেল। “বিলেতের সাহেব” বলে সবাই আওয়াজ দিতে শুরু করল। সুধীর ঘোষ একা হয়ে পড়তে লাগলেন।

সাত আট মাস এভাবেই গেল। একদিন এসে মহিমের বাবাকে বললেন, আপনার পরামর্শই মেনে নিচ্ছি। বিয়ে করব। একজন ঘটক ঠিক করে দিন তো।

মহিমের বাবা সর্বানন্দ ঘটককে খবর দিলেন।

সর্বানন্দ ঘটক মহিমদের বাড়িতে এসেই দেখা করলেন সুধীরের সঙ্গে। বললেন, বয়েসটা তো একটু ঢলেছে, গরিবগুর্বো ঘরের মেয়ে হলে চলবে তো!

চলবে। হাতে আছে?

তা থাকবে না কেন? এদেশে ভিখিরিরও বিয়ে হয়।

তাহলে দেখুন।

সুন্দরী হবে না, তবে কাজের মেয়ে হবে।

সুধীর তাতেও রাজি।

সর্বানন্দ যে সুধীরের জন্য পাত্রী দেখছেন তা চেষ্টা করেও গোপন রাখা যায়নি। একদিন ঘোষ বাড়িতে তুমুল হই-হল্লা হয়ে গেল। সুধীর ঘোষকে প্রায় ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বের করারই জোগাড় করে ফেলল ভাইপোরা। ভাই আর ভাইয়ের বউয়েরাও চেঁচামেচি কিছু কম করল না। বুড়ো বয়সে বিয়ে— ভীমরতি ইত্যাদি বলে গাঁয়েও একটা জনমত তৈরি করে ফেলল তারা। গাঁয়ের মোড়ল মাতব্বররাও রুখে দাঁড়াল সুধীবের বিরুদ্ধে। গাঁয়ের ছেলে হলেও সুধীর বিদেশে ছিলেন, সুতরাং তাঁর দিকে জনমত কম।

মহিমের বাবা বললেন, কী রে, কী করবি এখন?

তাই ভাবছি। দেশে ফিরে যে কী ভুলই করেছি!

মহিমের বাবা বললেন, ভুলটা তোর অন্য জায়গায়। এতকাল বিদেশে পড়ে থেকেছিস বলে দেশ আর আত্মীয়স্বজন সবই তোর পর হয়ে গেছে। প্রবাসী থাকা সেই কারণেই ভাল নয়।

আবার ফিরে যেতে ইচ্ছেও হচ্ছে না। এখন আমার আর বিলেতে থাকতে ইচ্ছে হয় না।

তাহলে কলকাতা বা নিদেন বর্ধমানে গিয়ে থাক। বড় শহরে গাঁয়ের কূটকচালি নেই, আত্মীয়রাও নাগাল পাবে না।

সুধীর ঘোষ থম হয়ে বসে রইলেন। অনেকক্ষণ বাদে বললেন, ওদের কেউই আমার আপন হল না কেন বলুন তো! একই বংশ এক পরিবার, বাবা মাও এক। তবে গণ্ডগোলটা কোথায়?

সংসার মানেই গণ্ডগোল।

তাই দেখছি।

আরও দেখবি।

অঙ্কবিদ সুধীর শেষ জীবনের অঙ্ক মেলাতে হিমসিম খাচ্ছিলেন। সাহেবদের দেশে একা থেকে একটা জীবন কাটিয়ে এসে যে তাকালের মধ্যে পড়েছেন তা সামলে ওঠার কায়দাই তাঁর জানা ছিল না। গাঁয়ের বিজ্ঞ-বিচক্ষণ কিছু মানুষ উভয় পক্ষের মধ্যে একটা সন্ধি স্থাপনের জন্য মিটিং বসাল। সুধীর ঘোষের ভাইরা সেই মিটিং-এ পরিষ্কার বলল, সুধীর সংসারের জন্য এতকাল কিছুই করেননি, এখন উড়ে এসে জুড়ে বসেছেন। এ-বাড়িতে থাকতে হলে তাঁকে মাথা নিচু করেই থাকতে হবে।

বাইরের লোক এসে যে সুধীর ঘোষের সমস্যা মেটাতে পারবে না সেটা মহিমের বাবা ভালই জানতেন। তিনি বললেন, ওরে, ওভাবে হবে না। তোর এখন তফাত হওয়া দরকার।

সুধীর থম মেরে বসে থাকেন। রা কাড়েন না। হয়তো তাঁর একটা ভুল ধারণা ছিল যে, আত্মীয়তাই আসলে সম্পর্ক। কিন্তু সম্পর্ক যে একটা আলাদা জিনিস, সেটা যে রচনা করতে হয় এ ব্যাপারটা তাঁর জানা ছিল না। এই নবোদিত জ্ঞান তাঁকে ঠিক করে না তুলে বিভ্রান্তির মধ্যে ফেলে দিল। অনেকক্ষণ বাদে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, ওরা তো আমাকে চায় না, আমার পয়সাকড়িই চায়। ভাবছি টাকাপয়সাগুলো ওদের দিয়েই দেবো, তাতে যদি মন পাওয়া যায়।

মহিমের বাবা বলেছিলেন, সেটা আর একটা আহাম্মকি হবে।

কিছুদিন পর দেখা যেতে লাগল, বিলেত ফেরত সুধীর ঘোষ একা একা গাঁয়ের পথে পথে ঘুরছেন আর আপনমনে বিড়বিড় করছেন। চোখে গোল রোল্ডগোল্ডের ফ্রেমের চশমার ভিতর দিয়ে অস্থির চোখে চারদিকে তাকান। যথারীতি গাঁয়ের ছেলেরা তাঁর পিছুতে লাগল, ঢিল পাটকেল মারতে লাগল, তাঁকে নিয়ে ছড়া বাঁধতে শুরু করল। পাগলামির প্রথম লক্ষণ দেখা দিলেই এসব প্রতিক্রিয়া হয়েই থাকে। মানুষের ভিতরে করুণা ও নিষ্ঠুরতা দু রকমের বীজই উপ্ত থাকে।

মহিমের বাবা দুঃখ করে বলতেন, এত বড় অঙ্কের মাথা ভূ-ভারতে বিরল। কিন্তু অত প্রতিভাই বোধহয় ওর কাল হল। সাহেবদের দেশে তবু বুঝবার মানুষ ছিল, গাঁয়ে-গঞ্জে ওর দামই বুঝল না কেউ।

ধীরে ধীরে সুধীর ঘোষ রাস্তার পাগলই হয়ে যেতে লাগলেন। চেঁচামেচি করতেন না, কাউকে উলটে তেড়েও যেতেন না। শুধু বিড়বিড় করতেন আর চারদিকে ভিতু চোখে তাকাতেন। বাড়ির লোকেরা তখনও দুবেলা খাবার-টাবার দিত। শোনা যায়, পাগলামির প্রথম দিকেই বর্ধমানের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের টাকাপয়সা তিনি ভাইদের মধ্যে বাঁটোয়ারা করে দেন। সেইজন্যই বোধহয় ভদ্রতাবশে ভরণপোষণটা বন্ধ করা হয়নি।

ঠান্ডার ধাত ছিল। সুতরাং বিলেত থেকে ফেরার বছর দুয়েকের মাথায় সুধীর ঘোষকে শীতকালে একদিন এক মাঠের ধারে গাছতলায় ভোরবেলা পড়ে থাকতে দেখা গেল। গা পুড়ে যাচ্ছে জ্বরে, বুকে প্রবল শ্লেষ্মার শব্দ।

দিন দুই বাদে বর্ধমানের হাসপাতালে সুধীর ঘোষ মারা যান।

লোকটা গাঁ থেকেই মুছেই গেলেন এক রকম। তাঁকে মনে রাখার তেমন কোনও কারণ ছিল না। মহিমের বাবা শুধু মাঝে মাঝে বলতেন, পণ্ডিত মানুষ যে এরকম আঁকাড়া বোকা হয় তা এই প্রথম দেখলুম। ঘটনাটা প্রথম ঘটল একদিন নিশুত রাতে। মহিমের বাবা রাতে পেচ্ছাপ করতে উঠে দক্ষিণের জানালার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট দেখতে পান জানালার ওপাশে এক জোড়া গোল গোল চশমার ফ্রেম চিক চিক করছে।

কে রে, কে ওখানে? বলে চেঁচিয়ে উঠলেন।

তখন গাঁয়ে এত লোকবসতি ছিল না। বাড়ির লোকজন উঠে বাতি-টাতি জ্বেলে দেখল, কেউ নেই। জানালার ওপাশে দুর্ভেদ্য কাঁটা গাছের জঙ্গল বলে সেখানে কারও যাওয়ার কথাও নয়।

পরদিন মহিমকে তিনি বললেন, হতভাগাটাই এসেছিল।

কে বাবা?

সুধীর। আত্মাটা কষ্ট পাচ্ছে।

এক রাতে তপোধীরের বউ বাচ্চার মুতের কাঁথা পালটাতে উঠে সলতে কমানো লণ্ঠনের মৃদু আলোয় কাঠের বড় আলমারির পাশে ঝুঁঝকো আঁধারে হঠাৎ দুখানা গোল চশমা দেখতে পেল। ভয়ে চিৎকার দিয়ে মূর্ছা গিয়েছিল সে। দাঁতকপাটি লেগে নীলবর্ণ হয়ে যায় যায় অবস্থা।

এর পর দেখল অধীর ঘোষ। দোতলার ঘর দুখানা সুধীর ঘোষ মারা যাওয়ার পর সে-ই দখল করেছিল। সেই দোতলার জানালায় একদিন মাঝরাতে রোল্ডগোল্ডের চশমা জোড়া দেখা দিল। ভয় খেয়ে অধীর ঘোষ গয়ায় গিয়ে পিণ্ডদান করে এল।

কিন্তু তাতেও গোল চশমার আবির্ভাব ঠেকানো যায়নি। মাঝেমধ্যেই এ ও সে মাঝরাতে গোল চশমা দেখতে লাগল। এমনকী রাতচরা মানুষের অনেকেই এমনও নাকি দেখেছে যে, সুধীর ঘোষ ফাঁকা রাস্তায় বিড়বিড় করতে করতে হেঁটে যাচ্ছে। গলা খাঁকারির শব্দ, কাশির আওয়াজ এসবও নাকি শোনা যেত ঘোষ বাড়ির আনাচে কানাচে।

কালক্রমে সবই আবার স্বাভাবিক হয়ে যায়। ভূতপ্রেতরাও পুরনো হয়ে নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়ে। ধীরে ধীরে সুধীর ঘোষের প্রেতাত্মাও বিলীন হয়ে গেল।

কত কালের কথা!

বহু বছর পরে তাই হঠাৎ মাঝরাতে পেচ্ছাপ করতে উঠে উঠোনের দিককার ভেজানো জানালার পাল্লাটা খোলা দেখে হ্যারিকেন উসকে মহিম তাকিয়ে দেখে দুখানা গোল ধাতব ফ্রেমের চশমা অন্ধকারে ভেসে আছে।

মহিমের বুকটা ছলাত করে উঠল। আশির কাছাকাছি বয়সে হৃদযন্ত্র এখন তো আর মজবুত নেই। ধড়াস ধড়াস শব্দ হচ্ছিল বুকে, সঙ্গে যেন একটা ক্ষীণ ব্যথাও। মরেই যাবে নাকি সে? আর মৃত্যু সন্নিকট বলেই কি সুধীর ঘোষ এসে হাজির হয়েছে?

কে? কে ওখানে? কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করে মহিম।

বাবা! আমি—আমি অমল!

হাঁ করে বাক্যহারা হয়ে কিছুক্ষণ জানালার বাইরে চেয়ে থেকে মহিম বলে, অমল!

হ্যাঁ বাবা।

তুই এত রাতে বাইরে কেন?

একটু হাঁটতে বেরিয়েছিলাম।

মহিম ঘড়ি দেখল। জাম্বুবান টেবিল ঘড়িটায় রাত আড়াইটে। এই অশৈলী সময়ে তো কেউ প্রাতর্ভ্রমণে বেরোয় না!

তোর কি ঘুম আসছে না?

আজকাল প্রায়ই ঘুম আসে না।

মহিম দরজাটা খুলে দিয়ে বলল, আয়, ভিতরে আয়।

এই ছেলের সঙ্গে মহিমের সম্পর্ক নেই বহুকাল। যখন স্কুলে ভাল রেজাল্ট করে বেরোল, যখন গ্রামে সবাই পঞ্চমুখে সুখ্যাতি শুরু করল তখন থেকেই। মহিম তখন থেকেই তার এই মেধাবী ছেলেটিকে একটু একটু সমীহ করতে আর মৃদু ভয় পেতে শুরু করে। সে নিজে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরিজিতে এম এ হওয়া সত্ত্বেও। আসলে নিজের জ্ঞানগম্যি, ডিগ্রির ওপর তার কোনও ভরসাও ছিল না কখনও, যখন থেকে ছেলেকে ভয় খেতে শুরু করল তখন থেকেই রচিত হল এক অনতিক্রম্য দূরত্ব। অমল বাবাকে বিশেষ গ্রাহ্য করত না। ব্যক্তিত্বহীনদের কপালে সবসময়েই উপেক্ষা জোটে। নিজেদের তারা না পারে জানান দিতে, না পারে তুলে ধরতে। দুর্বলচিত্ত মহিম বাড়ির কারও কাছেই তেমন গুরুত্ব পায়নি কখনও।

অমলের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়ল ওর বিয়ের পর। বিদেশে যাওয়ার পর আরও। পরই হয়ে গেল ছেলেটা।

আজকাল যে মাঝে মাঝে আসে বা বউ বাচ্চাদের গাঁয়ে পাঠিয়েছে এটা ভাল লক্ষণ বটে, কিন্তু মহিমের সঙ্গে সম্পর্কটা আর কাছের হয়নি। কখনও হয়তো খেয়াল হলে একটা দায়সারা প্রণাম করে বা খুব আলগা একটা কুশল প্রশ্ন করেই সরে যায়। মহিম এই আলগোছ আত্মীয়তাটা এক রকম মেনেই নিয়েছে। তার কোনও নালিশ নেই, অভিযোগ বা অভিমান নেই। ওরা ভাল থাকলেই ভাল। ব্যক্তিত্ব জিনিসটা সকলের থাকে না, কেউ কেউ ওটা নিয়েই জন্মায়। জন্মগত না হলে ব্যক্তিত্ব অর্জন করা সম্ভব নয়, এটা বুঝে গেছে মহিম। গৌরহরি চাটুজ্জেকে দেখে দেখেই ব্যাপারটা সে বুঝেছে। ছেলেপুলেরা যে তার আপন হল না, কাছের হল না এটা তার নিজেরই অযোগ্যতা বলে সে মনে করে। এই বয়সে আর স্রোতের ধারাকে উলটেও দিতে পারে না সে।

পুজোতেই শীত পড়েছিল। দুদিনেই শীত আরও তীব্র হয়েছে। কনকনে উত্তুরে হাওয়ায় হাত-পা জমে যাওয়ার জোগাড়। এই বাঘা শীতেও অমলের গায়ে গরম জামা নেই। গায়ে একটা পাতলা গেঞ্জি, তার ওপর ধুতির খুঁট জড়ানো। পায়ে চটি। সংকোচে সে ঘরে ঢুকে চারদিকে চেয়ে দেখছিল। চাউনিটা অস্থির, তাতে কোনও পর্যবেক্ষণ নেই!

এই শীতে গায়ে গরম জামা দিসনি কেন?

অমল মহিমের মুখের দিকে গভীর অন্যমনস্কতায় চেয়ে থেকে বলে, এমনিই। আমার তেমন শীত করছে না।

অমলের চোখের চশমাজোড়া অবিকল সুধীর ঘোষের চশমার মতো। দুটি নিখুঁত গোলাকার কাচ রোল্ডগোল্ডের ফ্রেমে বসানো। বহুকাল বাদে যেন সেই সুধীর ঘোষই ফিরে এসেছে। এরকম গোল ফ্রেমের চশমা কি আজকাল কেউ পরে! কে জানে বাবা, পুরনো সব ফ্যাশন ফিরিয়ে আনাটাই বোধ হয় আজকালকার রেওয়াজ।

এখন বড্ড হিম পড়ে। ঠান্ডা লেগে যাওয়ার ভয় আছে।

মহিম যথেষ্ট জোর বা শাসনের মতো করে কথাটা বলতে পারে না। এমনকী স্নেহেরও যে একটা জোর থাকে সেটাও তার গলায় এল না। অমল এখন বড্ড দূরের মানুষ, একজন জেন্টেলম্যান।

ঠান্ডাটাই আমার দরকার ছিল। মাথাটা গরম লাগছিল খুব।

অকূল পাথারে পড়ে যায় মহিম। জিজ্ঞেস করাটা উচিত হবে কি না, জিজ্ঞেস করলে রেগে যাবে কিনা এসব ভেবে দোনোমোনো করে বলেই ফেলল, মাথা গরম লাগছিল কেন?

ব্যক্তিগত ব্যাপারে বেশি প্রশ্ন করাটা আজকাল কেউ বিশেষ পছন্দ করে না। তাতে তাদের ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ হয়ে যায়।

অমল অবশ্য উদাস মুখে চেয়ে থেকে বলল, নানারকম চিন্তা করে করে এরকম হয় মাঝে মাঝে।

এর পরের স্বাভাবিক প্রশ্ন হতে পারত এই চিন্তা কীসের বা কেন এত চিন্তা করিস গোছের কিছু। মহিম প্রশ্নটা করতে গিয়েও সতর্ক হল। নিজের এই মেধাবী ও উজ্জ্বল ছেলেটির মনোজগৎ তো তার মতো সাদামাটা নয় নিশ্চয়ই! ওর মনের খবর তার মতো গেঁয়ো লোক কীভাবে বুঝতে পারবে? বয়সে ছোট হলেও অমল যে অনেক উঁচু থাকের মানুষ।

মহিম বলল, মানুষের মন সর্বদাই কিছু না কিছু ভাবে। চিন্তা ছাড়া এক মুহূর্ত কাটে না কারও।

আমি একটু বসি বাবা?

শশব্যস্তে মহিম বলে, বোস না, বোস। ওই কাঠের চেয়ারটায় বসবি নাকি বিছানায় লেপ চাপা দিয়ে—?

না না, চেয়ারই ভাল।

অমল বসল। বসার ভঙ্গিতেই বোঝা গেল, খুব ক্লান্ত।

মৃদু একটা অ্যালকোহলের গন্ধ পাচ্ছিল মহিম। দরজাটা বন্ধ করে দিতেই গন্ধটা একটু প্রকট হল। অমল যে একটু আধটু মদ-টদ খায় তা মহিম জানে। খেতেই পারে। আজকাল মদ খাওয়াটাই তো রেওয়াজ। চিন্তার কথা হল মদ খেয়ে ঘুম আসবার কথা, কিন্তু অমলের ঘুম আসছে না।

মহিম বিছানায় অমলের মুখোমুখি বসে ওর দিকে একটু চেয়ে থাকে। ছেলে সিলিং-এর দিকে মুখ করে বসে আছে। চোখ বোজা।

আমি আপনার ঘুম ভাঙাইনি তো!

না। আমি রাতে বার দুই উঠি। এখন উঠতেই যাচ্ছিলাম। আগে টানা ঘুম হত, আজকাল হয় না।

আপনার কত বয়স হল?

আশির কাছাকাছি।

চোখ খুলে সামান্য বিস্ময়ের সঙ্গে অমল বলে, এত!

মহিম সামান্য হাসে, তা হবে না? বয়স কি বসে থাকে!

আমার ধারণা ছিল আপনি সত্তরের কাছাকাছি বোধ হয়।

সত্তর কবে পেরিয়ে এসেছি।

আমি আপনাকে ডিস্টার্ব করছি না তো!

বিলিতি ভদ্রতা। মহিম মাথা নেড়ে বলে, না, ডিস্টার্বের কী আছে? বললাম না, ঘুম এমনিতেই কমে গেছে।

আজ রাতে যখন ঘুম আসছিল না তখন বেরিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু আজ একা একা ঘুরতে ঘুরতে আমার একটু ভয়-ভয় করছিল।

ভয়! ভয় তো হতেই পারে। তোরা শহরে থাকি, সেখানে এত সুনসান হয়ে যায় না। গাঁ নির্জন জায়গা। তার ওপর কুকুর-টুকুর আছে, তাড়া করে।

না, ওসব ভয় নয়।

তবে?

কী জানি, কেবলই মনে হচ্ছিল চারদিক থেকে যেন একটা হাহাকার শুনতে পাচ্ছি।

হাহাকার!

হ্যাঁ, ঠিক বোঝানো যাবে না। এ সেন্স অফ লস। গ্রেট লস।

বহু টাকা মাইনের চাকরি, মাথায় বিদ্যে গিজগিজ করছে, তবে ভয় পায় কেন ছেলেটা? কীসের হাহাকার! ওর তো বগলে চাঁদ!

মহিম গলা খাঁকারি দিয়ে বলে, তোর মনটা কি খারাপ?

হ্যাঁ, খুব খারাপ।

কেন রে, মন খারাপের কী হল?

মনের ওপর তো কারও হাত নেই।

তা তো ঠিকই।

আমার মনটা রোজই একটু একটু করে খারাপ হয়েই যাচ্ছে। কিছুতেই ভালর দিকে যাচ্ছে না।

তোর শরীর কেমন?

শরীরের খবর জানি না। বোধ হয় খারাপ নয়।

শরীর ভাল আছে বলছিস?

বললাম তো, সমস্যাটা শরীরের নয়। মনের।

মহিম চিন্তিত হল। কিন্তু দিশা পেল না। একটু ভেবে বলল, বউমার সঙ্গে কিছু হয়নি তো!

মাছি তাড়ানোর মতো মুখের সামনে হাতের একটা ঝটকা দিয়ে বিরক্তির সঙ্গে অমল বলে, বউমার কথা ছাড়ুন তো। ও কোনও ফ্যাক্টর নয়।

মহিম সতর্ক হল। বেফাঁস কথা বলা চলবে না। একটু ভেবে বলল, মনটা কি গাঁয়ে এসেই খারাপ হল নাকি?

না বাবা। মনটা ইদানীং আমার সবসময়েই খারাপ। সবচেয়ে ভয়ের কথা আমার যে ফোটোগ্রাফিক মেমরি ছিল সেটা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আজকাল অনেক কিছু ভুলে যাই, যা ভুলবার কথা নয়।

মহিম ঘরের কমজোরি বালবের আলোয় নিজের ছেলেটির দিকে চেয়ে খুব অবাক হয়ে ছেলের মুখশ্রীতে আর গোল চশমায় সুধীর ঘোষের ছায়া দেখতে পাচ্ছিল। সর্বনাশ! সুধীর ঘোষই আবার তার ছেলে হয়ে জন্মায়নি তো!

এক মুহূর্তের বিভ্রম কাটিয়ে উঠল মহিম। কী যে সব ছাতামাথা মনে হয় তার। মাথাটাই ভূতগ্রস্ত হয়ে পড়েছে বুড়ো বয়সে। নিজেকে একটা ঝাঁকুনি দিয়ে মনের দুর্বলতাটা কাটিয়ে দেওয়ার একটা চেষ্টা করে সে বলল, তোর টেকনিক্যাল নলেজের মেমারিও কি কমে যাচ্ছে?

মাথা নেড়ে অমল বলে, না, সেসব ঠিক আছে। ভুল হচ্ছে মানুষের মুখ, নাম, ছোটখাটো ঘটনা, ঠিকানা এইসব। কোথাও যেতে যেতে হঠাৎ মাঝপথে মনে হয়, আরে! কোথায় যাচ্ছি আমি! কোথায় যাওয়ার কথা তা মনে পড়তে সময় লাগে।

ওটা বোধ হয় লস অফ মেমারি নয়।

তাহলে কী?

বোধ হয় প্রি-অকুপেশন। একটা কোনও নিবিষ্ট চিন্তা মনকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে বলে স্মৃতি একটু ঢাকা পড়ে যাচ্ছে।

আপনি কি সাইকোলজি জানেন?

না বাবা, জানি না। তবে দীর্ঘদিন বেঁচে থাকলে অভিজ্ঞতা অনেক কিছু শেখায়। তোমরা হয় তো দাম দেবে না তার।

অমল চুপচাপ বসে কিছুক্ষণ ভাবল।

তার পর বলল, কিছু একটা হবে। সামথিং ইজ রং উইথ মি।

নিজেকে নিয়ে অত ভাবিস না। অন্যদের নিয়ে ভাব।

অমল বোধ হয় কথাটা শুনতে পেল না। ঘরের একটা অনির্দেশ্য জায়গায়, একটু ওপর দিকে অন্যমনস্ক চোখে চেয়ে থেকে বলল, মাথাটা গরম লাগছিল বলে রাত দেড়টায় বেরিয়ে পড়েছিলাম। চেনা গ্রাম, চেনা রাস্তা, তবু কিছুক্ষণ হাঁটার পরই মনে হতে লাগল, জায়গাটা আমি একদম চিনতে পারছি না। কোথায় এলাম, কোথায় যাচ্ছি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। তার পর হঠাৎ মনে হল আকাশ থেকে গুঁড়ো গুঁড়ো কী যেন ঝরে পড়ছে চারদিকে। খুব সূক্ষ্ণ, পাউডারের চেয়েও মিহি গুঁড়ো। ভয় হচ্ছিল, গ্রহ নক্ষত্র সব কিছুর আয়ু ফুরিয়ে গেছে, সব গুঁড়ো গুড়ো হয়ে পড়ে যাচ্ছে। এত ভয় পেলাম যে, দৌড়োতে শুরু করলাম।

মহিমের হঠাৎ মনে হল, অমল তাকে উদ্দেশ করে নয়, সম্পূর্ণ বে-খেয়ালে আপন মনেই কথা বলে যাচ্ছে। ও কি একা কথা বলে? ও কি সুধীর ঘোষের পুনর্জন্ম?

মহিম নড়েচড়ে বসে। মন থেকে অলক্ষুণে চিন্তাটাকে দূরে সরিয়ে রাখার চেষ্টা করতে করতে বলে, সব কিছুরই পরিণতি আছে। ধ্বংস হয়, আবার জন্মায়। শাস্ত্রে ওকে কল্পান্ত বলে।

অমল কথাটা কানে তুলল না। শুনতেই পেল না বোধ হয়। তেমনই বিভোর হয়ে বলতে লাগল, একটা হাহাকার শুনতে পাচ্ছিলাম। যেন চারদিকে হায় হায় শব্দ। বিষাদ-সিন্ধুতে যেমন ছিল।

ওসব ভাবতে নেই।

আমি যেন চারদিকে কুলক্ষণ দেখতে পাচ্ছি।

তুই বিজ্ঞানের ছাত্র, বিজ্ঞান আমাদের কাণ্ডজ্ঞান আর বাস্তববুদ্ধিই তো দেয়। মনটাকে দুর্বল হতে দিস কেন, নির্মোহ বিজ্ঞানের চোখে দুনিয়াটাকে বিচার কর। দেখবি মনটা সহজ হয়ে গেছে।

অমল একথাটাও যেন শুনতে পেল না। শুধু আপনমনে বলল, এত ভ্যাকুয়াম, এত ফাঁকা, এত অর্থহীন কেন যে লাগছে!

মহিম বলল, আয়, এখানেই শুয়ে পড়।

একথাটা শুনতে পেল অমল। বলল, শুয়ে পড়ব।

হ্যাঁ, শুয়ে পড়।

এটা তো আপনার বিছানা।

তাতে কী? তুই শো।

আপনি কোথায় শোবেন?

আমি আর শোব না। ঘুম যেটুকু হওয়ার হয়ে গেছে। রাত সোয়া তিনটে বাজে এখন। আমি তো ভোর চারটেয় উঠে পড়ি।

অমল হঠাৎ লোভাতুর চোখে চেয়ে বলল, শোব?

হ্যাঁ। বলছি তো, শুয়ে থাক।

অমল চটিজোড়া ছেড়ে হামাগুড়ি দিয়ে মশারির তলায় ঢুকে গায়ে লেপটা টেনে বাচ্চা ছেলের মতো শুয়ে পড়ল। এবং প্রায় দু মিনিটের মাথায় ঘুমিয়ে পড়ল। ছেলের নাকের ডাক শুনতে পেল মহিম।

মদটা কি একটু বেশি মাত্রায় খেয়ে ফেলেছে আজ? তাই হবে বোধহয়। যদিও কথাগুলো ঠিক মাতালের মতো বলছিল না। কিন্তু মদের একটা ঘোর আছে বোধহয়।

মহিম একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। দূরে দূরে ছিল বেশ ছিল। দুশ্চিন্তা করতে হত না। কিন্তু এই যে আজ রাতে কাছে এল, এত কথা বেরোল পেট থেকে এইতেই মনটা খচ খচ করে। আবার এই বুড়ো বয়সে নতুন নতুন দুশ্চিন্তা এসে মাথায় চাপে।

ভোর হল। তারপর বেলাও গড়িয়ে গেল অনেকটা। মহিম পুজোপাঠ সেরে রোদের উঠোনে চেয়ার পেতে বসে সকালটাকে পেকে উঠতে দেখল। মনটা ভাল নেই। ছেলেটা কষ্ট পাচ্ছে।

আজকাল প্রায় প্রতিদিনই সকালে ধীরেন এসে হানা দেয়। বাড়িতে তার আদর নেই। অভাবের সংসার। সকালে চা-টুকু অবধি জুটতে চায় না। তাই একটু চায়ের লোভে এতটা পথ ঠেঙিয়ে আসে। আজও এল।

এ-বাড়ির কেউ ধীরেনকে পছন্দ করে না। একে তার জামাকাপড় নোংরা। তায় সকলের ধারণা ধীরেন লোভী, হ্যাংলা। মাঝে মাঝে ধারকর্জ চায়, শোধ দিতে পারে না বলে বদনামও আছে তার। তবে ধীরেন পাঁচ-দশ টাকার বেশি ধার চায় না কখনও। তাই দিতে গায়ে লাগে না বড় একটা।

আর কেউ পছন্দ না করুক, ধীরেন এলে মহিম খুশি হয়। লোক যেমনই হোক, পুরনো মানুষ তো! কত কালের চেনা। খানিকটা বন্ধুর মতোই ছিল এক সময়ে। আবার ঠিক বন্ধুও নয়। আজ্ঞাবাহী ছিল খুব। ফাই-ফরমাশ খেটে দিত হাসিমুখে। এখন বুড়ো হয়েছে, কিন্তু সেই বশংবদ ভাবটা যায়নি।

আজ সকালের ফর্সা আলোয় কালো ধীরেনকে দেখে মহিম অন্য দিনের তুলনায় একটু বেশি খুশির গলায় বলল, আয় ধীরেন, বোস।

ধীরেন কষ্টে সসংকোচে মোড়াটা টেনে নিয়ে বসল। মুখে গ্যালগ্যালে হাসি। গায়ে একটা উলোঝুলো পুরনো ঢলঢলে পুলওভার। মাথায় বাঁদুরে টুপি। পরনে ধুতি। বহুরূপীর মতোই দেখাচ্ছে।

পুরনো দিনের কথাই হয় বেশির ভাগ।

হ্যাঁ রে ধীরেন, তোর সুধীর ঘোষের কথা মনে আছে?

খুব। সেই ম্যাথেমেটিশিয়ান তো!

হ্যাঁ।

ওরকম মাথাওলা লোক আর এ-গাঁয়ে হয়নি।

তার কথা সব মনে আছে?

থাকবে না? যত বুড়ো হচ্ছি পুরনো দিনের কথা ততই ফুটে উঠছে। আশ্চর্য ব্যাপার।

তুই কখনও সুধীব ঘোষের ভূতকে দেখেছিস?

খুব দেখেছি।

মহিম হাসল, কোথায় দেখেছিস?

উফ্‌ সে কথা ভাবলে আজও গায়ে কাঁটা দেয়।

বটে!

পাশের গাঁয়ে সেবার যাত্রাপালা এসেছিল নদের নিমাই। কী একটা নামকরা দল এসেছিল। পালা শেষ হতে হতে রাত দুটো। তিনজনে মিলে ফিরছিলাম। সুনসান রাত্তির। সঙ্গের দুজন কুমোরপাড়ার কাছে এসে অন্য দিকে চলে গেল। আমি একা।

হ্যাঁ, তোর যাত্রার খুব নেশা ছিল বটে।

এখনও আছে। হলেই যাই।

তারপর বল।

চৌধুরীদের পুকুরের ধার বরাবর রাস্তা দিয়ে আসছি। ওদিকটায় তখন খুব জঙ্গল ছিল। ফলসা গাছের বন ছিল। মনে আছে?

তা থাকবে না! খুব মনে আছে।

সে জায়গায় দিনমানেও তখন লোক চলাচল ছিল না। আপনমনে গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে আসছিলাম। হঠাৎ সামনে রশিখানেক তফাতে দেখলুম একটা লোক নিচু হয়ে কী যেন কুড়োচ্ছে।

কুড়োচ্ছে?

হ্যাঁ। সেরকমই ভঙ্গি। তা আমি একটু এগিয়ে গিয়ে বললুম, কে ওখানে? কেউ জবাব দিল না। তখন বললুম, কিছু হারিয়ে থাকলে তো আর এই অন্ধকারে খুঁজে পাবেন না মশাই। এখন বাড়ি যান, কাল সকালে খুঁজবেন এসে। তখন লোকটা হঠাৎ সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আমার দিকে তাকাল।

অন্ধকারে দেখলি কী করে?

খুব জ্যোৎস্না ছিল তখন। ফটফটে পরিষ্কার দুধ-জ্যোৎস্না। স্পষ্টই দেখলুম। সুধীর ঘোষ দাঁড়িয়ে। চোখে গোল চশমা। আমার দিকে চেয়ে বিড়বিড় করে কী যেন বলছিল। শরীর এমন ঠান্ডা মেরে গেল ভয়ে যে নড়তে-চড়তে পারি না, গলার স্বর ফুটছে না। হার্টফেল যে হইনি সেই ঢের। তবে বেশিক্ষণ নয়, যেমন হঠাৎ দেখা গিয়েছিল তেমনই হঠাৎ মিলিয়ে গেল বাতাসে। রাম নাম করতে করতে আর ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে বাড়ি ফিরে আসি।

চশমাটা সবাই দেখত। হ্যাঁ রে, ভূত চশমা পরে কেন?

ধীরেন কাষ্ঠ হেসে ফেলে বলে, তা কে বলবে বলুন! তবে কথাটা ভাবার মতো, ভূতের আবার চশমা লাগে কীসে? তা হঠাৎ সুধীর ঘোষের কথা উঠছে কেন? কিছু দেখেছেন-টেখেছেন নাকি?

না। হঠাৎ মনে পড়ে গেল। আজকাল আলটপকা অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে যায়, যেগুলো মনে পড়ার কথাই নয়। একেবারে বিস্মরণ হয়ে যাওয়া কথাও পট করে কেন যে মনে পড়ে। তখন মনে হয় এসব বোধ হয় এ-জন্মের ঘটনাই নয়, আর জন্মে ঘটেছিল। কাল রাতে হঠাৎ সুধীর ঘোষের মুখখানা ভেসে উঠল চোখে। সেই থেকে ভাবছি।

আমিও খুব ভাবি। একাবোকা থাকলে, অন্ধকার ঘরে কি নিরালা রাস্তায় হঠাৎ সেই মিদ্দারের পো যেন কাছাকাছি চলে আসে। যেন ছোঁক ছোঁক করে, গা এঁকে এঁকে পিছু পিছু আসতে থাকে। তার বউটাও যেন ঘুরঘুর করে আশেপাশে। আর তখন সেই বর্ষার রাতটা যেন চোখের সামনে একেবারে জলজিয়ন্ত হয়ে ওঠে। যত বুড়ো হচ্ছি তত যেন মনস্তাপ বাড়ছে।

নাতনি বিন্তি একখানা থালার ওপর দু কাপ চা নিয়ে এল, সঙ্গে শস্তার টোস্ট বিস্কুট। আড়চোখে মহিম দেখল, ধীরেনের জন্য সেই ময়লা হাতলভাঙা কাপেই চা দিয়েছে, ওই কাপটায় বাড়ির কাজের মেয়েটা চা খায়। মনটা খারাপ লাগল। শত হলেও ধীরেন তো আর ওটোলোক ছোটলোক নয়। তাকে এত তাচ্ছিল্য করলে মহিমেরও যেন খানিকটা সম্মানহানি হয়। কিন্তু কাকে কী বলবে মহিম? আর বললেই বা শুনছে কে?

ধীরেনের অবশ্য তাপউত্তাপ নেই। ভারী আহ্লাদের সঙ্গেই সে যত্ন করে মুড়মুড় শব্দে বিস্কুট চিবোয়, সুড়ুত সুড়ুত করে আরামে চা খায়। নিজের বরাদ্দের দুখানা বিস্কুটের একখানা এগিয়ে দেয় মহিম, রোজকার মতোই বলে, নে, খা।

রোজকার মতোই ধীরেন লাজুক গলায় বলে, না, না, থাক। আপনি খান।

রোজের মতোই মহিম বলে, ওরে, আমার যে দাঁতের জোর নেই সেটা কি ভুলে যাস?

ধীরেন এক গাল হেসে বলে, ঠাকুরের দয়ায় আমার দাঁতগুলো এখনও আছে। কোনও গণ্ডগোল নেই দাঁতে। গণ্ডগোল হল, দাঁতের কাজ কমে গেছে।

কেন রে?

বুঝলেন না? চিবোনোর জিনিসই তো জোটে না। মাংস-টাংসর কথা তো ভুলতেই বসেছি, মাছের কাঁটা কি মুড়ো সেসবও তো আর চোখে দেখি না।

মহিম একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। মনটা ভাল নেই। ছেলেটা এখনও তার বিছানায় অসাড়ে ঘুমোচ্ছে।

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%