পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

পঁয়ত্রিশ

গাড়িটা ঠিক করে দিয়েছে কমল। সে সব সুলুকসন্ধান জানে। সুবিধেজনক গাড়ি নয়। বহু পুরনো অ্যাম্বাসাডর ল্যান্ডমাস্টার। সিটে বসলেই বোঝা যায়, ফোম রবার চিঁড়েচ্যাপটা হয়ে গেছে, স্প্রিং ঠেলে উঠছে ওপরে। নানারকম ক্যাঁচকোঁচ শব্দ তো আছেই। মফস্বলের ভাড়ার গাড়ি এরকমই হয়ে থাকে।

সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশে কমল, ধারে বুডঢ়া। পিছনে একধারে সোহাগ, মাঝখানে মোনা, বাঁ ধারে অমল। সবাই চুপচাপ। শুধু কমলই যা কথা বলছে। সে বোকাসোকা সরল মানুষ, কথা একটু বেশিই বলে ফেলে।

বুঝলি বুডঢা, এ-গাড়িতে চোদ্দজন লোক উঠতে আমিই দেখেছি। কী মদন, চোদ্দজন করে নিস না?

মদন একটু খোটকামুখো অল্পবয়সি ছেলে। তেমন হাসে না, কথাও কয় না। দুবার জিজ্ঞেস করার পর বলল, না নিলে পাবলিক ছাড়বে কেন?

কমল বলল, শুনলি তো! এ-গাড়িতে চোদ্দজন, ভাবা যায়?

বুডঢা বলল, পুলিশে ধরে না?

হাটবার বা মেলা-টেলার দিন কোথায় পুলিশ, কোথায় কে? এখানে ওসব আইনকানুনের বালাই নেই। পুলিশ ধরতে এলে পাবলিকই ঠেঙিয়ে বৃন্দাবন দেখিয়ে দেবে। কী বলিস মদন?

মদন জবাব দেয় না।

বুডঢা বলল, ওঃ হাঁটুতে যা গরম লাগছে না!

কমল বলে, লাগবেই তো! ইঞ্জিন থেকে ভাপ আসছে না? পুরনো গাড়ি হলে যা হয়। আজকের গাড়ি নাকি? যখন নিশিবাবু কিনেছিল তখন থেকে জানি। হেসেখেলে পঁচিশ বছর হবে। দিব্যি সাদা রং ছিল গাড়িটার। তখন শুনতুম মরিস গাড়ির পার্টস দিয়ে তৈরি। তাই হবে বোধহয়। দিশি মাল হলে এতদিন চলত না। কী বলিস রে মদন! তুই তো গাড়ির একজন এক্সপার্ট!

মদন জবাব দেয় না।

কমল ওরকমই, ব্যক্তিত্ব বলে কিছু নেই। সকলকেই খাতির মহব্বৎ করে বেড়ায়। আর সেই জন্যই কেউ পাত্তা দেয় না তাকে। তবে তা নিয়ে মাথা ঘামায় না কমল। ভাল মানুষদের যে বাজারদর কম সেটা বুঝবার মতো মস্তিষ্ক তার নেই।

খোঁচা খোঁচা দাড়িওয়ালা চোয়াড়ে চেহারার ছোকরা ড্রাইভারটাকে মোটেই ভাল লাগছিল না অমলের। দাদার ওপরেও বিরক্ত হচ্ছিল সে। কী কাজ গায়ে পড়ে আলাপ জমানোর? ট্রিপ দিয়ে পয়সা নেবে—এর চেয়ে বেশি সম্পর্ক তো আর নয়।

কমল বেশ বড়াই করে বলল, তোর পচা গাড়িতে যাচ্ছে বলে এদের হেঁজি-পেঁজি লোক ভাবিস না। আমার ভাই মস্ত চাকরি করে। বুঝলি?

মদন বুঝল কিনা কে জানে, তবে উচ্চবাচ্য করল না। দাদাকে একটা ধমক দেওয়ার ইচ্ছে অতি কষ্টে সংবরণ করল অমল।

কমল বলে যাচ্ছিল, ওদের নিজেদেরই তো কত দামি গাড়ি আছে। এস্টিম না কী যেন রে বুডঢা?

এস্টিম।

এস্টিম, বুঝলি? এয়ারকন্ডিশন গাড়ি, গায়ে আমাদের রাস্তাঘাট খারাপ, শরৎকাল পেরিয়েও জলকাদা জমে থাকে, তাই গাড়ি আনে না। নইলে কি আর তোর গাড়িতে চড়ে?

এবার মদন বোধহয় একটু প্রভাবিত হল। বলল, এস্টিম ভাল গাড়ি। দুর্গাবাবুর আছে, চালিয়েছি।

পঞ্চায়েত এবার রাস্তাঘাট সারাবে শুনছি, তখন আনবে, দেখিস।

কমলের কথাটা মিথ্যে নয়। বড় রাস্তা ছেড়ে গাঁয়ের পথে পড়লেই খানাখন্দ, জল কাদা। মোনা তাই কিছুতেই গাড়ি নিয়ে গ্রামে আসতে রাজি হয়নি। বলেছে, ও বাবা! ও রাস্তায় গাড়ির বারোটা বেজে যাবে।

গাড়ি নিয়ে এলে ঝামেলা অনেক কম হত। দুর্গাপুর রোড ধরলে কলকাতা থেকে বর্ধমান ঘণ্টা দুয়েকের পথ।

তারা কেউ কথা কইছে না। শুধু কমল একা কথা বলে যাচ্ছে। এবার মদনের কাছে সে ভাইয়ের বিলেতে থাকার কথা ফেঁদে বসল। অমলের ভারী লজ্জা করে, রাগও হয়। না শোনার জন্য সে চোখ বুজে একটু ঘুমিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করল। আজকাল তার যখন-তখন ঘুম এসে যায়। একটু চেষ্টা করলেই এসে যায়। এটা সম্ভবত শুভ লক্ষণ নয়। মস্তিষ্কবিহীন মানুষদেরই চটপট যখন-তখন ঘুম আসে। কলকাতায় রাস্তায় ঘাটে, পার্কে, রকে দিনের বেলায় সে এরকম সব নিষ্কর্মা, নির্বোধ বহু লোককে ঘুমোতে দেখেছে।

আজও অমলের ঘুম চলে এল।

চটকাটা ভাঙল বর্ধমানে গাড়ি ঢোকার পর। হাজারো রিকশা আর গাড়ির হর্ন, ধুলো, গরম, চেঁচামেচি। গ্রামের চেয়ে শহরে গরম বেশ কয়েক ডিগ্রি বেশি। গ্রামাঞ্চল থেকে শহরে এসে ঢুকলেই সেটা টের পাওয়া যায়। কলকাতায় গরমটা আরও একটু বাড়বে।

দু-তিনটে জ্যাম পেরিয়ে স্টেশন চত্বরে যখন পৌঁছল তারা তখন ডাউন শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেস আসতে মিনিট কুড়ি বাকি। কমল ছুটল টিকিট কাটতে। বলে গেল, মালপত্র আমি এসে নামাচ্ছি। তোরা দাঁড়া।

অমল নেমে ড্রাইভারকে দিয়ে লাগেজ বুটটা খোলাল। বিশাল বড় দুটো ফাইবারের স্যুটকেস ছাড়াও রয়েছে গোটা তিনেক ব্যাগ। মাল বড় কম নয়।

মোনা বলল, উনি তো বলেই গেলেন উনি এসে মাল নামাবেন, তুমি টানাটানি করছ কেন?

অমলের একটু রাগ হল। সামান্যই। মোনার দিকে চেয়ে রুক্ষ গলায় বলে, উনি কিন্তু কুলি নন, আমার দাদা। কথাটা মনে রেখো।

আহা, খারাপ কিছু বললাম নাকি? উনি হয়তো একটা ব্যবস্থা করার কথা ভেবে রেখেছেন।

অমল খুব শক্তিশালী লোক নয়। বড় সুটকেস দুটো নামাতে তাকে রীতিমতো কসরত করতে হচ্ছিল।

মদন তাকে ‘আপনি সরুন, আমি দেখছি’ বলে এক ঝটকায় স্যুটকেস দুটো নামিয়ে দু হাতে নিয়ে বলল, চলুন, প্ল্যাটফর্মে দিয়ে আসছি।’

এই লোকটা তার চেয়ে বলবান, একথা ভেবে অমল হঠাৎ একটু ঈর্ষা বোধ করল। তার মস্তিষ্ক প্রখর, সোনার মেডেল-টেডেল পেয়েছে, তবু কত লোকের কাছে কতভাবে সে একজন হেরো।

টিকিটঘরের সামনে সুটকেস দুটো নামিয়ে মদন ভাড়া নিয়ে চলে গেল। স্টেশনটায় গিজগিজ করছে ভিড়। ট্রেনে জায়গা পাওয়া নিয়ে সমস্যা হতে পারে।

অমল একটা স্বগতোক্তির মতো বলল, একটা কুলি নিলে হয়।

বুডঢা কাঁধ ঝাকিয়ে বলে, কুলি! কুলির কী দরকার? আমি একাই পারব।

অমল মৃদু হতাশার গলায় বলে, পারবি না। ওভারব্রিজ পার হতে হবে।

জানি। ঠিক পারব।

কমল টিকিট কেটে এনে বলল, সেকেন্ড ক্লাসই কাটলাম, বুঝলি?

অমল বিরক্ত হয়ে বলে, কেন, সেকেন্ড ক্লাস কাটলে কেন? তোমাকে যে বললাম, এ সি চেয়ারকার কাটতে।

মুশকিল কী জানিস, এ সি মোটে একটা কামরা। সিট না পেলে দাঁড়িয়ে যেতে হবে। আর সেকেন্ড ক্লাস হলে অনেক সুবিধে। করিডোর ট্রেন, একটা কামরায় সিট না পেলে আর একটায় চলে যেতে পারবি।

কিন্তু ভিড় থাকলে মালপত্র নিয়ে ওঠা প্রবলেম হবে না?

কোনও অসুবিধে নেই। এ সি-তেও উঠতে পারিস। টিকিট কনভার্ট করে নিলেই হবে।

এ-দেশে এই যে যাতায়াতজনিত নানা অসুবিধে এসব অমলের ঠিক ধাতে সয় না। লড়াকু লোকেরা এসব ঝঞ্ঝাট হাসিমুখে সয়ে বয়ে নিতে পারে। কিন্তু সে লড়াকু লোক নয়। সামান্য সমস্যাই তার কাছে বিরাট হয়ে দাড়ায়। টেনশন বাড়তে থাকে।

এখানে ট্রেনটা কতক্ষণ দাঁড়ায় বলতে পারো?

দু মিনিট।

মাত্র?

দু মিনিট কি কম সময়?

আবার একটা টেনশন তৈরি হল অমলের। মাত্র দু মিনিটে কি তারা চারজন, দুটো বড় স্যুটকেস, ব্যাগ-ট্যাগ সমেত ভিড়ের ট্রেনে উঠতে পারবে? ধাক্কাধাক্কি হবে না?

স্যুটকেস দুটো কমল আর বুডঢা ভাগাভাগি করে নিল।

কত নম্বর প্ল্যাটফর্ম?

কমল মাথা নেড়ে বলে, এখনও অ্যানাউন্স করেনি। এখন ওভারব্রিজে উঠে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। তিন বা চার নম্বরে দেয়। দুটোই আলাদা প্ল্যাটফর্ম তো!

ঈর্ষাকাতর চোখে অমল দেখল, কমল আর বুডঢা ভারী সুটকেস দুটো নিয়ে দিব্যি ওভারব্রিজে উঠে যাচ্ছে।

না, সে পারবে না। তার গায়ে অত জোর নেই।

ওভারব্রিজের ওপরে এসে মাঝামাঝি জায়গায় তাদের দাঁড় করিয়ে কমল বলল, এখানেই দাঁড়াও সবাই।

অমল দেখল ওভারব্রিজের ওপর বিস্তর লোক দাঁড়িয়ে আছে, কোন প্ল্যাটফর্মে ট্রেন দেবে সেই অপেক্ষায়।

ডিসগাস্টিং! কোন প্ল্যাটফর্ম সেটা পর্যন্ত আগে জানানো যায় না! এটা কি একটা সিস্টেম? দেশটা যে কী ভাবে চলে কে জানে!

বিড়বিড় করে বললেও অমলের কথা কমলের কানে গেল। সে ভাইকে খুশি করার জন্য বলল, ঠিকই তো! এদেশের কি আর সাধে অত অবনতি! তবে তুই ভাবিস না, ঠিক তুলে দেব। লোকাল ট্রেনে গেলে একটু সময় লাগে বটে, কিন্তু কোনও টেনশন থাকে না। দিব্বি হেসে খেলে হাত-পা ছড়িয়ে যাওয়া যায়।

অমল ঝাঁঝের সঙ্গে বলে, তোমাদের লোকাল ট্রেনকেও জানি। হকারের চেঁচানিতে মাথা ধরে যায়। তার ওপর চারদিকে নোংরা, ভিখিরির উৎপাত। তিনজনের সিটে ঠেলে চারজন বসবে, বিড়ি ফুঁকবে, বারবার টাইম জিজ্ঞেস করবে।

কমল দেঁতো হাসি হেসে বলে, হ্যাঁ, খুবই বিচ্ছিরি।

মাইকে কী একটা ঘোষণা হচ্ছিল, গমগমে শব্দের দরুন তার এক বর্ণ বুঝতে পারল না অমল। কিন্তু কমল সোল্লাসে বলে উঠল, চার নম্বরে দিয়েছে! চল, চল, ট্রেন ঢুকল বলে।

ফের টেনশন শুরু হয় অমলের। মালপত্র ওঠানো, নিজেরা ওঠা, জায়গা পাওয়া ইত্যাদি কত যে অনিশ্চয়তা তার ঠিক নেই। এ সময়ে খানিকটা হুইস্কি খেয়ে নিলে হত। কিন্তু সেটা বোধহয় শোভন হবে না।

দুদ্দার করে সিঁড়ি ভেঙে লোক নামছে। তার মানে এরা বেশির ভাগই ওই ট্রেনেই উঠবে। তার মানে ফের টেনশন। এত সব বলবান, তৎপর, উদ্যোগী, রগচটা, ঠেলেঠেলিতে ওস্তাদ মেয়ে-পুরুষের সঙ্গে তারা পেরে উঠবে কি?

লোকের ভিড়ে পিছিয়ে পড়ছিল অমল। সবার আগে স্যুটকেস নিয়ে কমল, তার পিছনে আর একটা স্যুটকেস সহ বুডঢা, একটু পিছিয়ে সোহাগ আর মোনা, সবার শেষে অমল। কিন্তু প্ল্যাটফর্মে নেমে দুরন্ত লোকজনের ভিতরে কাউকেই দেখতে পেল না অমল। আগের দিকে গেল না পিছনে তাও জানে না সে। অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে পড়ে তোকজনের দিশাহীন ধাক্কায় টাল খেয়ে চোখ থেকে চশমাজোড়াই, খসে পড়ছিল তার। অতি কষ্টে সামলে নিল।

প্ল্যাটফর্মে নামতে না-নামতেই সে দূরে গাড়ির মুখ দেখতে পেল। ট্রেন স্টেশনে ঢুকছে।

তার ডান কাঁধে একটা চামড়ার বড়সড় ব্যাগ, বাঁ হাতে অ্যাটাচি কেস। কোন দিকে যাবে তা বুঝতে না পেরে অমল কিছুক্ষণ হতভম্ব মাথায় দাঁড়িয়ে থাকল। ছেলেবেলায় একবার রথের মেলায় বাবার হাত ছেড়ে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে গিয়েছিল অমল। কী কান্না তার। অবিকল সেরকমই একটা অনুভূতি হচ্ছে এখন। সে কি হারিয়ে গেল!

সামনে চলন্ত দেয়ালের মতো ট্রেনটা ঢুকে পড়ছে। চাকার গম্ভীর শব্দে যেন বিপদের পূর্বাভাস। লোকজন জান কবুল করে হামলে পড়ছে দরজায় দরজায়। নামা-ওঠার মর্মান্তিক ঠেলাঠেলি। এই বিপুল উদ্যম তার নেই।।

মাত্র দু মিনিট সময়। ট্রেন ছেড়ে দেবে। এত অল্প সময়ের মধ্যে ওদের খুঁজে বের করা অসম্ভব। তাহলে কি ট্রেনটা ছেড়ে দেবে সে? নাকি উঠবে পড়বে? সিদ্ধান্ত নেওয়া যে কী কঠিন। আচমকা মনে পড়ল, দাদা টিকিট কেটেছিল বটে কিন্তু সেটা তার হাতে দেয়নি। সম্ভবত মোনাকে দিয়েছে। কিন্তু মোনাকে যদি খুঁজে না পায় সে এবং যদি ট্রেনে উঠে পড়ে তাহলে নিশ্চয়ই টিকিট চেকার তাকে ধরবে।

কী যে করবে অমল তা বুঝতে পারছিল না। এর চেয়ে বিদেশে থাকাই তার ভাল। তার মতো বৌদ্ধিক লোকদের পক্ষে এ-দেশ মোটেই উপযুক্ত নয়। আমেরিকার ইস্ট কোস্ট থেকে রুট এইট্টি ধরে সাড়ে তিন হাজার মাইল গাড়ি চালিয়ে যেতে তার কোনও অসুবিধেই হয়নি। আর এখানে বর্ধমান থেকে কলকাতা যাওয়া যেন মঙ্গলগ্রহ যাওয়ার মতোই কঠিন হয়ে উঠেছে তার কাছে।

লোকে তো যাচ্ছে। তবে সে পেরে উঠছেনা কেন? বর্ধমান থেকে কলকাতা কত লোক তো ডেইলি প্যাসেঞ্জারিও করে। ব্যাপারটা তাদের কাছে জলভাত।

সামনের কম্পার্টমেন্টের কাছে একটু এগিয়ে গিয়ে ভিতরটা দেখল অমল। সাংঘাতিক চাপ ভিড় নয়, তবে বেশ কয়েকজন লোক দাঁড়িয়ে আছে। বসার জায়গা নেই।

পিছিয়ে এসে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিল অমল।

হঠাৎ পিছন থেকে কে এসে তার ডান কনুইটা ধরে হ্যাঁচকা টান দিয়ে বলল, আয়, আয়, জায়গা পাওয়া গেছে।

দাদা কমলকে দেখে নিশ্চিন্ত হল অমল। দাদাকে কখনও জীবনে পাত্তা দেয়নি সে। পালে পার্বণে প্রণামও করে না। কথা হয় কালেভদ্রে। কিন্তু এখন মনে হল, দাদা যেন পারের কাণ্ডারী।

জায়গা পাওয়া গেছে?

হ্যাঁ রে হ্যাঁ, পিছন দিকটায় ফাঁকা থাকে।

কত দূর? গাড়ি ছেড়ে দেবে না তো!

আরে না। এখনও এক মিনিট বাকি।

বাস্তবিকই একটা কামরা ছেড়ে পরের কামরাতেই ভিড় বেশ পাতলা।

উঠে পড়।

অমল উঠে পড়ল। পাশাপাশি না হলেও কাছাকাছিই তিনটে সিটে মোনা, সোহাগ আর বুডঢা বসার জায়গা পেয়েছে। বুডঢার পাশের সিটটা ব্যাগ দিয়ে আটকে রাখা হয়েছে তার জন্য। সিটের পাশে দাঁড় করানো স্যুটকেস।

বাবা, বোসো। কোথায় হারিয়ে গিয়েছিলে?

একটু লজ্জা পেয়ে অমল বলল, হারাইনি। আসলে এত ভিড়!

আমি তো ভাবলাম, তুমি পড়েই রইলে বর্ধমানে।

কমল সব ঠিকঠাক আছে কিনা দেখে নিয়ে বলল, মালপত্র সব গুনে নিয়েছিস তো বুডঢা?

হ্যাঁ, সব ঠিক আছে।

নামবার সময় কিছু ফেলে নামিস না!

না তুমি নামো জেঠু, গাড়ি ছেড়ে দেবে।

আমি ঠিক নেমে যাব। ভাবিস না।

গাড়ি নড়ে ওঠার পর কমল দরজার দিকে গেল এবং চলন্ত গাড়ি থেকে টুক করে নেমে পড়ল।

জেঠু তোমার চেয়ে কত বছরের বড় বলো তো বাবা?

একটু অবাক হয়ে অমল বলে, চার বছরের। কেন বল তো!

জেঠু এখনও তোমার চেয়ে অনেক ফিট আছে। তুমি একটু ম্যান্তামারা হয়ে গেছ কিন্তু।

এতগুলো বাংলা কথা একসঙ্গে বুডঢার মুখে কখনও শোনেনি অমল। বিশেষ করে ম্যান্তামারা-র মতো শব্দ। সম্ভবত বেশ কয়েকদিন গ্রামে বসবাসের ফলে ওদের ভোকাবুলারিতে গ্রামীণ বাংলার সঞ্চার ঘটেছে। আজকাল সোহাগকেও বেশ বাংলা বলতে শোনো অমল। তার মধ্যে গেঁয়ো শব্দও থাকে। ভাতের পাতে উচ্ছে সেদ্ধ দেওয়ায় রাগ করে একদিন বলেছিল, উচ্ছের নিকুচি করেছে।

মোনা বলে এখানে থেকে ওর কালচার নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এরপর গেঁয়ো মেয়েদের মতো ঝগড়া করতে শিখবে।

একটু দেরি করে বুডঢার কথার জবাব দিল অমল। হ্যাঁ, আমি যেন এখন কেমন হয়ে গেছি। সামথিং ইজ রং।

পাছে আশেপাশের লোক শুনতে পায় সেইজন্য বুডঢা খুব চাপা গলায় বলে, নাথিং ইজ রং। তোমার একটু ফিটনেস প্রবলেম আছে, আর কিছু নয়। আমাদের যোগ ক্লাসে ভর্তি হয়ে যাও, সব ঠিক হয়ে যাবে।

বলছিস?

হ্যাঁ। যোগে মিরাকল হচ্ছে আজকাল।

অমল গভীর অবসাদ বোধ করছিল। সে তেমন কিছু পরিশ্রম করেনি, দৌড়ঝাঁপ করতে হয়নি, মাল টানেনি, সুতরাং এ অবসাদ শরীরের নয় নিশ্চয়ই। এই অবসাদের উৎস রয়েছে তার মনের মধ্যে। কোথায় কোন অতলগহীন মনোরাজ্যে এই অবসাদের শিকড় তা কে বলবে? যোগ ক্লাস কি তার মনকে সারাতে পারবে? না, এসব নিদানকে সে আজ আর বিশ্বাস করতে পারে না।

বাইরে বেলা তিনটের রোদে ক্ষেত-খামারের চিত্র ফুটে উঠছে। কী সুন্দর যে দেখাচ্ছে তা বলার নয়। উদাস চোখে চেয়েছিল অমল। আজকাল তার মনে হয়, এত লেখাপড়া না শিখলেই হত। দরকার ছিল না যান্ত্রিক জগতে ঢুকে পড়ারপ্রয়োজন ছিল না মোটা মাইনের চাকরি বা সুন্দরী স্ত্রী বা কলকাতার ফ্ল্যাট বা স্ট্যাটাস সিম্বলসমূহের। অনেক সহজ জীবনযাপন করতে পারত সে।।

সোহাগ আড়াআড়ি ওপাশের সারিতে বসে একটা মেয়ের সঙ্গে গল্প করছিল। এটাও নতুন ব্যাপার পথেঘাটে যার তার সঙ্গে ভাব জমানোর অভ্যাস ওর নেই। এবং দিব্যি বাংলাতেই কথা বলে যাচ্ছিল। একটু একটু কানে আসছিল অমলের। ধীরে ধীরে পুরোপুরি বাঙালি হয়ে যাচ্ছে নাকি ওরা? ভাবতে ভাবতে চোখে তন্দ্রা জড়িয়ে এল অমলের। এ সেই মস্তিষ্কহীনের ঘুম। নির্বোধের ঘুম। অনুভূতিহীন মানুষের ঘুম। এই ঘুমটাকে খুব ভয় পায় অমল। আবার ঘুমোয়ও। ভারতের অর্থমন্ত্রীর নামটা তার আজও মনে পড়েনি।

সোহাগ ডাকল, বাবা!

চটকা ভেঙে যায় অমলের।

তার ঘুম মানেই স্বপ্ন। সে দেখছিল একটা কাক তিরবেগে উড়তে উড়তে একটা ইলেকট্রিক তার ভেদ করে চলে যেতে গিয়ে দু আধখানা হয়ে গেল। দুভাগ হওয়া কাকটা তারপর দুটো কাক হয়ে উড়ে যেতে লাগল। তারপরেই দেখল টিকিট নেই বলে টিকিট চেকার তাকে একটা অন্ধকার নির্জন স্টেশনে ট্রেন থেকে ঠেলে নামিয়ে দিয়ে বলল, এটাই শেষ ট্রেন। এবার অন্ধকারে বসে থাকুন, আর কোনওদিন কোনও ট্রেন এখানে আসবে না।

দুঃস্বপ্নই। চটকা ভেঙে যেন বাঁচল অমল। বলল, কী বলছিস?

চা খাবে? লেবু চা?

চা! বলে কিছুক্ষণ শব্দটার অর্থ বুঝবার চেষ্টা করল সে।

আমরা সবাই খাচ্ছি। বেশ ভাল চা।

প্লাস্টিকের কাপে এক কাপ চা এগিয়ে আসে। প্রচণ্ড গরম লাগছিল আঙুলে। একটু হলেই পড়ে যেত। বুডঢা তার রুমালটা এগিয়ে দিয়ে বলে, এটা দিয়ে ধরো। তোমার অভ্যাস নেই, প্লাস্টিকের কাপের কানায় ধরতে হয়।

মুগ্ধ হয়ে শুনল অমল। কতটা বাংলা বলে গেল বুডঢা।

সোহাগ বলে, ঝালমুড়ি খাবে?

ঝালমুড়ি!

খাও না!

একটু অবাক হচ্ছে অমল। তার ছেলেমেয়েরা আজকাল তো এত সহজ নয় তার কাছে। কলকাতার ফ্ল্যাটে তাদের মধ্যে বাক্যবিনিময়ই হয় না বড় একটা। মাঝে মাঝে মায়ে মেয়েতে তুমুল ঝগড়া হয়, ধুন্ধুমার লেগে যায় স্বামী-স্ত্রীতে। যখন কথা হয় না তখন ফ্ল্যাটে শ্মশানের শান্তি বিরাজ করে।

ঝালমুড়ির ঠোঙা এগিয়ে আসে। ক্ষুধার্তের মতোই খায় অমল। এটাও একটা খারাপ লক্ষণ। তার আজকাল বিচ্ছিরি খিদে পায় এবং হামলে খায়। ফলে তার শরীরে চর্বি জমছে, ওজন বাড়ছে।

বাঁ পাশের লোকটা একটা বাংলা খবরের কাগজ পড়ছে। খবরের কাগজ জিনিসটাকে ভুলেই গিয়েছিল অমল। একটু উঁকি মেরে দেখতে ইচ্ছে করছিল তার, ভারতের শিল্পমন্ত্রীর নামটা চোখে পড়ে কিনা। তারপর ভাবল, কী লাভ জেনে?

টিকিট কার কাছে রে?

বুডঢা বলল, ট্রেনের টিকিট! আমার কাছে। কেন?

না, ভাবছিলাম দাদা তাড়াহুড়োয় আবার দিতে ভুলে যায়নি তো!

না না। জেঠু খুব হুঁশিয়ার লোক। টিকিট কেটে ফেরত পয়সা গুনে আমাকে বুঝিয়ে দিয়েছে।

শিডিউলের চেয়ে আধঘণ্টা দেরিতে হাওড়া স্টেশনে যখন ট্রেন ঢুকছে তখন অমলের ফের টেনশন হতে থাকে। দুটো ভারী স্যুটকেস যা টানতে পারার মতো শক্তি তার নেই, একা বুডঢা পারবে কি?

প্রসঙ্গ উঠতেই বুডঢা বলল, ইজি। দু হাতে দুটো ঝুলিয়ে তো নেওয়াই যায়। কিন্তু তুমি ভুলে যাচ্ছ কেন যে দুটো স্যুটকেসেই চাকা লাগানো আছে।

তাই তো! একদম খেয়াল ছিল না অমলের। এসব সহজ ব্যাপার তার মাথায় থাকে না কেন কে জানে!

বুডঢাই বলল, তাড়াহুড়োর দরকার নেই। ভিড় একটু পাতলা হলেই আমরা নামব।

ঠিক কথা। তবু অমলের ভিতরটায় একটা উচাটন ভাব। যেন সে পিছিয়ে পড়ছে, হেরে যাচ্ছে, পৌঁছতে পারবে না, অনিশ্চয়তা। কেন এরকম হয় আজকাল কে জানে।

বেশি দেরি করলে ট্যাক্সি পাব না।

বুডঢা অবাক হয়ে বলে, হাওড়া স্টেশনে ট্যাক্সির অভাব! কী যে বলো!

এর পরের ঘটনাগুলো তার কাছে পারম্পর্যহীন হিজিবিজি। তারা ভিড় ঠেলে এসে ট্যাক্সির লাইনে দাঁড়াল। হাওড়া ব্রিজ পেরিয়ে গাড়ি ঢুকল কলকাতায়। তারপর কেয়াতলা লেনের ফ্ল্যাটে একসময়ে পৌছে গেল তারা। কিন্তু এই গোটা ব্যাপারটা তার কাছে কেমন যেন স্বপ্নদৃশ্যের মতো। রিয়াল নয়। পরাবাস্তব?

বাড়ির কাজের লোক বাসুদেবের ওপর ফ্ল্যাটটা ছেড়ে দিয়ে গিয়েছিল তারা। না দিয়ে গেলে উপায়ও নেই। বাসুদেব বাড়িতে ছিল না। কোথাও বেরিয়েছে। মোনা এই ফাঁকে দামি জিনিসপত্রগুলো ঠিক আছে কিনা দেখে নিচ্ছিল। টি ভি, কম্পিউটার, ফ্রিজ, মাইক্রোওয়েভ ইত্যাদি জিনিস ছাড়া গয়নাগাটি বা টাকাপয়সা বাড়িতে রেখে যায়নি তারা। কিছু বাসনপত্র তো থাকেই।

ঘরে ঢুকেই কম্পিউটার নিয়ে বসে গেছে সোহাগ। ই-মেইল চেক করছে একমনে। বুডঢা বাথরুমে।

ব্যালকনিতে এসে দাড়াল অমল। সামনে কেয়াতলার নির্জন পথ। বিকেলের আলো পড়ে আসছে দ্রুত। কিছুই দেখার নেই নীচে। ওপরে আবহমানকালের স্থির আকাশ। কয়েক কুচি মেঘ ভেসে আছে।

আজ কী বার তা হঠাৎ জানতে ইচ্ছে করল অমলের। কী বার আজ। হাতঘড়িটার দিকে তাকালেই জানা যাবে। কিন্তু ইচ্ছে করেই তাকাল না সে।

শুক্র? শনি? এমন কী রবি? না, মনে পড়ছে না। সোমবার নয় তো আজ? হতেও পারে। আজ যে কোনও বার হতে পারে।

পিছনে হঠাৎ মোনার গলা পাওয়া গেল। তীব্র, জরুরি গলা, শোনো!

ধীরে মুখ ফেরায় অমল, কী বলছ?

ঘরে এসো, কথা আছে।

অমল এগিয়ে গিয়ে বলে, কী?

বা হাতের মুঠো খুলে একটা জিনিস দেখিয়ে মোনা জিজ্ঞেস করে, এটা কী?

অমল কিছুক্ষণ জিনিসটা চিনতে পারে না। তারপর চিনতে পেরে বলে, কন্ডোম। কেন?

এটা আমাদের বিছানায় এল কী করে?

অমল অবাক হয়ে বলে, তা কী করে বলব!

তুমি জাননা না?

অমল মাথা নেড়ে বলে, না।

চাপা হিংস্র গলায় মোনা বলে, আউট উইথ দি ট্রুথ!

সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%