শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
গভীর রাত, না ভোরের কাছাকাছি তা বুঝতে পারছিল না অমল। তবে পাখিদের শব্দ নেই। চারদিক নিঃঝুম। আর হিমযুগের মতো শীত। আজকাল দিক ঠিক রাখতে পারে না সে। জানালা বন্ধ করে শোওয়ার অভ্যাস নেই বলে পায়ের দিকের জানালাটা খোলা রেখে দিয়েছিল সে। এখন ঘুম ভেঙে একটু ভেবে দেখল যে, ওটাই উত্তর দিক। আর সেইজন্যই এত হিম হয়ে আছে ঘরখানা।
হাতে ঘড়ি নেই। কটা বাজে বুঝতে পারছিল না সে। সময়ের বোধ তার ভিতরে আজকাল কাজ করে না। আগে করত। আগে ঘড়িতে বাঁধা জীবন ছিল তার। কখনও অফিসে যেতে দেরি হয়নি, অ্যাপয়েন্টমেন্ট ফেল হত না, ট্রেন বা প্লেন কখনও মিস করেনি সে। এখন সেই লোকটাকে আর চেনা বলেই মনে হয় না। মনে হয় ওটা পূর্বজন্ম।
অন্ধকারে উঠে বসল সে। সকালে সে কলকাতায় যাবে। কেন যাবে, গিয়ে কী হবে তা সে পরিষ্কার বুঝতে পারছে না। মোনা ডিভোর্সের মামলা করার জন্য উঠেপড়ে লেগেছে। ডিভোর্সই বা করতে চায় কেন? তারা যেমন পরস্পরকে মনে মনে প্রত্যাখ্যান করে এক ফ্ল্যাটেই বসবাস করছে ডিভোর্স কি তার চেয়ে বেশি কিছু লাভজনক হবে? এও তো ডিভোর্সই। এবং তারা যে যা খুশি করতে পারে। বিয়ে বা সম্পর্ক না মানলেই তো হয়। কোর্ট-কাছারি করার দরকারই বা কী। একগাদা পয়সা খরচ এবং অনভিপ্রেত পাবলিসিটি। মোনা আর তার মধ্যে বন্ধনই তো নেই, তা হলে এই ভাগভিন্ন হওয়ার পরিশ্রমই বা কেন?
লজিকটা খুঁজে পায় না অমল। ডিভোর্সের প্রয়োজন সম্পর্কে সে তেমন অবহিত নয়। তবু সে কলকাতা যাবে। কিছু সইসাবুদ করতে হবে হয়তো। করে দেবে অমল। তারপর মোনা সরে যাবে। তারপর কী হবে তা অমল জানে না।
উঠে সে বাতি জ্বালতে গিয়ে দেখল, বাতি জ্বলছে না। বাতি কেন জ্বলছে না সেটা খুব অবাক হয়ে বুঝতে চেষ্টা করল সে এবং অনেকক্ষণ পরে বুঝতে পারল, এখানে প্রায়ই সুইচ টিপলে বাতি জ্বলে না। এখানে লম্বা লম্বা লোডশেডিং হয়। তা হলে সেটা বুঝতে এত সময় লাগল কেন তার?
চেনা ঘর। হাতড়ে টেবিলের ড্রয়ার খুলে ঘড়িটা বের করল সে। রেডিয়াম ডায়ালের ঘড়ি অন্ধকারে বেশিক্ষণ থাকলে আর ঝলমল করে না, আলো নিভে যায়। ঘড়ির ডায়ালের দিকে চেয়েও তাই সময়টা বুঝতে পারল না সে। হতাশ হয়ে কিছুক্ষণ বসে মশার কামড় খেল।
হঠাৎ নীচে কোথাও দরজার হুড়কো খোলার একটা শব্দ হল। কান খাড়া করে শুনল সে। একটা কাশির মৃদু শব্দ। তারপর কুয়োতলায় জলের শব্দ। বাবা উঠল নাকি? তা হলে এখন ব্রাহ্মমুহূর্ত। ভোর চারটে।
দপ করে আলো জ্বলে উঠল ঘরে। কারেন্ট এল।
খুব বেশি কিছু গোছানোর নেই তার। সম্বল একটা অ্যাটাচি কেস মাত্র। বাড়তি জামা-প্যান্ট অবধি নেই। বাবার দুটো পুরনো ধুতি চেয়ে নিয়ে তাই লুঙ্গির মতো করে পরতে হয় ঘুরিয়েফিরিয়ে। এসবে আর কোনও অসুবিধে হয় না তার। সম্মানে লাগে না। এক সময়ে লাগত। এক সময়ে সে দিনে দুবারও দাড়ি কামিয়েছে। এক সময়ে সে যা ছিল ভাবলে আজকের সে খুব অবাক হয়।
নীচে নামতেই মুখোমুখি বাবা। বাবার হাতে টর্চ।
কোথায় যাচ্ছিস?
কলকাতা।
কলকাতা! তা এত ভোরে কেন?
যাই। সকালে যে গাড়ি পাব তাতেই যাব।
এখানে এত ভোরে বাস পাবি কোথায়!
পাব না?
সাড়ে ছটা-সাতটার আগে বাস-টাস পাওয়া যায় না। খামোখা গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে।
যেন ভারী সমস্যায় পড়ল অমল এমন উদ্বেগের গলায় বলল, তা হলে?
সকাল সকাল যাওয়ার দরকার নাকি? তা হলে কাল যেতে পারতিস।
অমল অনেক ভেবে বলল, না, সকাল সকাল যাওয়ার দরকার নেই তো! ভাবলাম বেরিয়ে পড়ি, তাই বেরিয়ে পড়েছি।
বরং ঘরে এসে বোস। আর ঘণ্টা দেড়েক পরে বেরোলেই হবে। রাস্তাঘাট এখন অন্ধকার।
অমলের আপত্তি হল না। বাবাকে তার আজকাল ভালই লাগে। সংসারের সাতেপাঁচে নেই, নিজের মনে নিজের ঘরখানায় একাবোকা সময় কাটিয়ে দেয়। বায়নাক্কা নেই। নিজের মনেই পুজো-টুজো করে। কিন্তু বাড়াবাড়ি নেই। সোহাগ তার দাদুকে খুব পছন্দ করে। বলে, এ ম্যান অফ উইজডম। সোহাগ খুব কম লোককেই পছন্দ করে। দুনিয়ার বেশির ভাগ লোককেই সে সহ্য করতে পারে না।
বাবার ঘরটার মধ্যে যেমন ওম তেমনি একটা বেশ প্রাচীনতার গন্ধ। গন্ধটা কী দিয়ে তৈরি তা সে বলতে পারবে না। আসবাব বা জিনিসপত্রের কোনও বাহুল্য নেই। শুধু একখানা চৌকি, একখানা আলনা, দুটো কেঠো চেয়ার, একধারে কুলুঙ্গিতে ঠাকুরের আসন। হ্যারিকেনটা উসকে দেওয়ায় ঘরের দৈন্যদশা প্রকট হল।
বোস।
অমল চেয়ারে বসল।
বউমার সঙ্গে কি বনিবনা হচ্ছে না তোর?
হ্যাঁ।
কী নিয়ে গণ্ডগোল?
কিছু নিয়ে নয়। সব নিয়েই।
বড় বউমার কাছে শুনলাম ডিভোর্সের মামলা করবে। সত্যি নাকি?
হুঁ। সেই রকমই তো কথা।
তুই কি বউমার সঙ্গে ঝগড়া করে এসেছিলি?
ঝগড়া! না, ঝগড়া করিনি তো!
তা হলে চলে এসেছিলি কেন?
ভাল লাগছিল না। ওদের কাছে থাকলে আমার কেবল ভয়-ভয় করে।
ভয় করে?
হ্যাঁ।
ভয় তো করেই লোকের। আমারও তো ভয় হত।
আপনার ভয় হত বাবা?
হত না? তোর মাকে ভয় পেতাম, ছেলেমেয়েদের ভয় পেতাম। সব থেকে বেশি ভয় পেতাম তোকে।
আমাকে! বলে ভারী অবাক হয়ে বাবার দিকে চেয়ে থাকে অমল।
তোকে সবচেয়ে বেশি। পরীক্ষায় ভাল ফল-টল করলি। সে এত ভাল যে এ-বংশের কেউ কখনও স্বপ্নেও ভাবতে পারে না। তার পর তোর নিজের মতামত হল। লোককে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করতে শিখলি। তখন তোকে এত ভয় হত যে কথাটথা বিশেষ কইতে পারতাম না। মানুষ যখন গৌরব করার মতো কিছু করে তখন তার অহংও বেসামাল হয়ে ওঠে কিনা। একটা জীবন আমারও তো কত ভয়ভীতি নিয়ে কাটল।
ভাবী অবাক হয়ে অমল তার বাবার দিকে চেয়ে রইল। তাই তো! বাবা তো মিথ্যে কথা বলছে না। যখন স্কুলে সে ঝুড়ি ঝুড়ি নম্বর পাচ্ছে, যখন মাস্টারমশাইরা তার মেধায় বিস্মিত এবং আপ্লুত তখন তার চারদিকে একটা ভয়, শ্রদ্ধা, সংশয় ও বিস্ময়ের বলয় কি রচিত হয়নি? ঘনিষ্ঠ তুইতোকারির বন্ধুরা পর্যন্ত যেন একটু সন্তর্পণে দূরে সরে যেতে লাগল। তাদের সাধারণ বোধবুদ্ধির জগতে হঠাৎ এক অতি-মগজ আবির্ভূত হওয়ায় তারা কিছুটা হতচকিত। এই তফাতটা সে তার বাড়িতেও টের পেতে শুরু করে। তার ভাইবোনদের ব্যবহারে, মায়ের পক্ষপাতিত্বে তার মেধাব পূজা কি তখনই সে টের পায়নি? বাবার সঙ্গেও তখন থেকেই তার দূরত্ব শুরু হয়। সত্যি কথা বাবার বোধবুদ্ধি, পরামর্শ বা উপদেশকে তখন থেকেই সে তুচ্ছতাচ্ছিল্য এবং অগ্রাহ্য করতে শুরু করে। তার বাবা যে ইংরিজিতে এম এ পাস সেটাও বোধহয় সে গুরুত্ব দেয়নি।
হ্যাঁ, এসবই সত্য। কোনও ভুল নেই।
সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাবার দিকে চেয়ে বলল, আজ আমার পতন কি কোনও কর্মফল বাবা?
পতন! পতনের কথা বলছিস কেন?
আমার পতন আপনি দেখতে পান না?
মহিম অবাক হয়ে বলে, পতন আবার কীসের? চাকরি যায়নি তো!
না।
ডিভোর্সের কথা ভেবে বলছিস? সেটা তো আর একতরফা কারও দোষ নয়।
সেটাও বলছি না। আমার মাথাটাই যে ঠিক নেই। কী সব আবোল তাবোল ভাবি, বলি, আমার সব বোধবুদ্ধি যেন তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। কর্মফল কিনা বুঝতে পারছি না।
তোর চেয়ে অনেক বেশি অকাজ করেও কত লোক দাবড়ে বেড়াচ্ছে। তুই আর এমন কী করেছিস? আজকাল মা-বাপকে ভক্তিশ্রদ্ধা করে আর কজন? ওসব নিয়ে ভাবার কিছু হয়নি। বউমার কথা বল। সে কী চাইছে?
ঠোঁট উলটে অমল বলে, কী জানি। একদিন এসেছিল। গটমট করে অনেক কথা বলে গেল। সবটা বুঝতে পারলাম না।
মহিম মশারি চালি করে তুলে ফেলে বিছানায় বসে ছেলের দিকে চেয়ে বলল, বুড়ো বয়সের এই একটাই কষ্ট। ছেলেপুলেরা কষ্ট পেলে স্বস্তি থাকে না।
আপনার বয়স কত হল বাবা?
আশি।
অনেক বয়স, না?
হ্যাঁ। অনেক বয়স। সামর্থ্য থাকলে বয়সটা সমস্যা নয়। কিন্তু অপটু হয়ে পড়লে বয়স হল ভেজা কম্বল।
আপনার বয়সে আমি কোনওদিন পৌঁছব না। তার অনেক আগেই আমি যেন বুড়ো থুথুরে হয়ে গেছি।
তোর মনে শান্তি নেই বলে ওরকম মনে হচ্ছে।
শান্তি নেই কেন, সেটাই তো খুঁজে বেড়াচ্ছি। কী হল আমায় একটু বলুন তো!
মাথা নেড়ে মহিম বলে, সত্যি কথা বললে বলতে হয়, আমি জানি না। তোর জীবনটা তো অন্যরকম। অনেক বেশি জটিল, ঘটনাবহুল। তার ওপর শিক্ষাদীক্ষা, কালচারাল মিক্স-আপ, সেসব আমি কি আর বুঝতে পারব? তবে জানি, তোর ভিতরে অনেক গাদ জমে আছে। নিজের জোরে ঝাঁকি মেরে উঠে দাঁড়াতে পারছিস না। তাই তোর কষ্ট আড়াল থেকে দেখি। কিছু বলতে ভরসা পাই না।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অমল বলে, আমার জন্য কারও কিছু করার নেই।
শুধু একটা কথা বলার আছে। ভেবে দেখতে পারিস।
কী কথা?
ডিভোর্স জিনিসটা ভাল নয়।
হুঁ।
অনেকক্ষণ বসে রইল অমল। বসে বসে ঘুমিয়ে পড়ল ঘাড় কাত করে।
মহিম করুণ চোখে দৃশ্যটা দেখে ফুলের সাজিটা নিয়ে উঠে গেল বাগানে। অনেক সময়েই তার মনে হয় কূপমণ্ডুক হয়ে এই গাঁয়ে জীবনটা কাটিয়ে দেওয়া ঠিক হল না। দুনিয়াটাকে আরও একটু জানার আর বুঝবার দরকার ছিল। মানুষের যে কত রকমের জ্বালাপোড়া আছে তার খতেন নিতে পারলে আজ এই অচিন ছেলের জন্য একটা নিদান দেওয়ার মতো বোধবুদ্ধি গজাত।
ফুল তুলে ঘরে এসে মহিম দেখল, চেয়ার ফাঁকা। অমল চলে গেছে।
না, ছেলেটার জন্য তার কিছু করার নেই। মাঝে মাঝে মনে হয় তার শরীর থেকে জন্মালে কী হয়, এই ছেলে যেন কোন আজব দেশের আজগুবি বাস্তবতার মানুষ, নিজের ছেলে বলে চেনা যায় না যায় না। ভারা যায় না। ভাবটা, ভাষাটা অবধি বুঝে উঠতে পারে না মহিম।
অন্ধকার কাটেনি এখনও, তবে আবছায়া একটু ঘোলাটে আলো ক্ষীণ আভায় চারদিকের অন্ধকারকে একটু হালকা করেছে মাত্র। তবে কুয়াশা আছে। চারদিকের গাছপালা থেকে টুপটাপ শব্দে ঝরে পড়ছে হিম।
চণ্ডীমণ্ডপ ঘেঁষে এই রাস্তাটা দিয়েই সবাই বাসস্ট্যান্ডে যায়। পথটা একসময়ে খুব জঙ্গুলে ছিল। বর্ষাকালে জলকাদায় হাঁটাই যেত না। সাপ-খোপ, জোঁক বেরোত যখন-তখন। চণ্ডীমণ্ডপটা ভেঙে পড়েছিল প্রায়। পঞ্চায়েত হওয়ার পর রাস্তা বাঁধানো হয়েছে, চণ্ডীমণ্ডপ তৈরি হয়েছে নতুন করে। খুব আনমনে হলেও গাঁয়ের এইসব উন্নতি লক্ষ করে অমল। তাতে ভাল হয়েছে, না মন্দ, তা অমল বলতে পারবে না।
হঠাৎ খুব কাছ থেকে একটা বাজখাই গলার আওয়াজে চমকে উঠল অমল। বুকটা ধড়াস-ধড়াস।
আরে! বড়ভাই নাকি? কই চললেন মশয়?
এই কাকভোরের কুয়াশায় আলো বিশেষ ফোটেনি বটে, কিন্তু লোক চেনা যায়। রসিক বাঙালের গায়ে প্রিন্স কোট, মাথায় কান অবধি ঢাকা রাশিয়ান টুপি, গলায় মাফলার।
অমল কাষ্ঠহাসি হেসে বলল, কলকাতা যাচ্ছি।
আহেন, আহেন। লন, একলগেই যাই।
রসিক বাঙালকে তার কিছু খারাপ লাগে না। লোকটার মনের মধ্যে কোনও ঘুরঘুট্টি নেই, গোলোকধাঁধা নেই। লোকটা পয়সা রোজগার করতে ভালবাসে, খরচ করতে ভালবাসে, খেতে আর খাওয়াতে ভালবাসে। অমল একজন বউ নিয়েই হিমসিম খাচ্ছে, আর এই লোকটা দু-দুটো দুরকমের বউ সামাল দিয়ে দিব্যি বহাল তবিয়তে আছে। সে শুনেছে রসিকের একটা বউ বাঙাল, শহুরে এবং খাণ্ডার। অন্য বউটা ঘটি, পেঁয়ো এবং ভিতু। কী করে সামলায় কে জানে। হয়তো এও একটা প্রতিভা কিংবা এ একরকমের মস্তিষ্কহীনতা। সেটা যাই হোক, অমলের তা নেই।
দাড়িদুড়ি ফ্যালান নাই ক্যান মশয়? শোকাতাপা মাইনষের লাহান লাগে!
নিজের গালের খড়খড়ে দাড়িতে একটু হাত বুলিয়ে নিয়ে অমল বলল, ইচ্ছে হয়নি। আজকাল খেয়ালই থাকে না।
গালখান চকচকা থাকলে মাইনষে খাতির করে, বোঝলেন?
সেটা বোঝে অমল। ফিটফাট থাকার যে দাম আছে সেটা তার মতো আর কে জানে। তবে কিনা, সে সেই যুগ পার হয়ে এসেছে।
সে মৃদু স্বরে বলল, হুঁ।
শীত লাগে না আপনের বড়ভাই?
অমল মাথা নেড়ে বলল, লাগে। শীতটা খুব পড়েছে এবার।
আমার ব্যাগে একখানা আলোয়ান আছে, দিমু আপনেরে?
লজ্জা পেয়ে অমল বলে, আরে না, তার দরকার নেই।
ঘিন্না পাইলেন নাকি বড়ভাই? বোয়াকাচা আলোয়ান, গন্ধ-গুন্ধ পাইবেন না।
অমল বাঙালের দিকে চেয়ে বলল, আপনি বড় ভাল লোক তো!
কী যে কন বড়ভাই! এই কাল ঠান্ডাটার মইধ্যে আপনের গায়ে তো দ্যাখত্যাছি একখান স্যান্ডো গেঞ্জির মতো সোয়েটার। অসুখ-বিসুখ কইরা ফালাইব। নামডাকের মানুষ আপনে, আপনের লগে লগে যে হাটতাছি, কথা কইত্যাছি হেইবে কি কম কথা নাকি?
বসিক দাঁড়িয়ে তার ব্যাগের চেন খুলে আলোয়ানটা বের করল।
বেশ নরম, মোলায়েম নস্যি রঙের ওম-ওলা চাদরখানা গায়ে জড়াতেই ভারী আরাম বোধ করল অমল। বলল, বাঃ, বেশ আলোয়ানটি তো!
আইজ্ঞা, পাঞ্জাবের জিনিস। আলোয়ানটা পরম স্নেহে অমলের গায়ে ঠিকঠাকমতো জড়িয়ে দিতে দিতে রসিক বলল।
রসিককে ধন্যবাদ দেওয়ার কোনও মানেই হয় না, ওসব রসিক বাঙাল বুঝবেও না। কিন্তু অমল ভারী কুষ্ঠিত এবং কৃতজ্ঞ বোধ করছিল। এ লোকটার জন্য কখনও সে কিছু করেনি, কখনও করবেও না হয়তো। কিন্তু আজ তার ভারী ইচ্ছে করছে কিছু প্রতিদান দিতে। সেটা কীভাবে দেওয়া সম্ভব তা অবশ্য মাথায় এল না তার। কিন্তু কুণ্ঠাটা রয়ে গেল।
আলোয়ানখান লইয়া যান বড়ভাই। আপনেরে দিলাম। একরকম নৃতনই কইতে পারেন। গায়ে দিলে মাঝেমইধ্যে আমাগো কথা মনে পড়ব।
না না, আমার আলোয়নের দরকার নেই। আপনি জোর করে গায়ে দেওয়ালেন বলে দিলাম।
জানি বড়ভাই, আপনের মেলা আছে।
শাল আলোয়ান তো আমার লাগে না।
আইচ্ছা মশয়, কইলকাতায় গিয়া ফিরত দিলেই হইবে। অখন লন একটু গরম চা খাই দুইজনে। বাস আইতে মেলা দেরি।
আলোয়ান গায়ে দিয়ে এখন আরামের চেয়ে অস্বস্তিই বেশি হচ্ছে অমলের। রসিক তাকে একটা সেকেন্ডহ্যান্ড আলোয়ান দান করতে চাইল কেন? সে কি ওর এতটাই করুণার পাত্র? আচ্ছা বেয়াদব তো লোকটা! মন থেকে কৃতজ্ঞতা আর কুণ্ঠার ভাবটা তো উড়ে গেলই, বরং কান গরম হয়ে উঠছিল অপমানে।
আজকাল নিজের বোধ, বুদ্ধি, আবেগের ওপর কোনও নিয়ন্ত্রণ নেই অমলের। অপমানের বোধটা তীব্র ঝিঝি পোকার মতো আওয়াজ করছিল মাথার মধ্যে। সে অসুস্থ হয়ে পড়বে নাকি?
বাসস্ট্যান্ডে চায়ের দোকান কম করেও চার-পাঁচটা। ভোরবেলার যাত্রীরা এই শীতকালে চা খায় বলে সকালেই দোকানে উনুন ধরানো হয়েছে। খদ্দেরও আছে মন্দ নয়।
আহেন মশয়, শীতলের দোকানে বহি। হ্যায় চা-টা খুব ভাল কইরা বানায়।
শীতলের দোকানের বেঞ্চে বসে পড়ল অমল। তার এখন গরম লাগছে। তার এখন ভাল লাগছে না। বসেই চাদরটা খুলে ফেলে পাশে জড়ো করে রাখল সে। রসিক লক্ষ করল না। সে তখন শীতলকে বোঝাচ্ছে, আমার লগে কেডা বইয়া আছে জাননি শীতল? মস্ত মাপের মানুষ। গ্রামের মানুষ তোমরা, এই মানুষের দাম তোমরা কী বুঝবা! অখন ভাল কইরা চা বানাইয়া খাওয়াও তো বাবুরে।
শীতল দাস একটু বিরক্ত হয়ে বলে, কার কথা কইছেন বাবু? এ যে মায়ের কাছে মাসির গপ্পো। অমলকে আমি এত্তটুকুন বেলা থেকে চিনি। ওদের বাড়ির চেলাকাঠ ফেড়ে দিতুম, মহিমকর্তার সঙ্গে মাছ ধরতে বড় ঝিলে গেছি কতবার। অমল তখন কতটুকু? ব্যাঙাচির লেজ খসল এই তো সেদিন! পাস-টাস করে জলপানি পেয়েছিল, বিলেত গেল, এই তো সেদিনের কথা সব। বিয়েতে নেমন্তন্ন খেয়েছিলুম।
বাঙালরা না চেঁচিয়ে কথা কইতে পারে না, তাদের হাসি মানেই অট্টহাসি। রসিকের গলা যেমন বাজখাঁই, হাসিও তেমন বিকট। সেই হাসিটা হেসে রসিক বলল, খুব চিনছ হে শীতল! আমি কই, বাবুরে ল্যাংটাবেলা থিক্যা তো দেইখ্যা আইতাছ, কিন্তু মানুষটার দাম জাননি? কত বড় বহরের মানুষ হেইটা নি ট্যার পাইছ কোনওদিন? যাউকগা, কথা বাড়াইয়া লাভ নাই। চা-খান একটু প্রেমসে বানাও দেখি।
দুজনের এই ছেলেমানুষি চাপান-উতর শুনতে শুনতে অমলের চিনচিনে অপমানবোধটা উবে গেল। খানিকটা হেঁটে এসেছে বলে শরীরটা গরম হয়েছিল বটে, কিন্তু এখন খোলামেলা রাস্তার পাশে বসতেই উত্তুরে হাওয়ায় কেঁপে উঠছিল অমল। না, বাঙাল তাকে অপমান করতে চায়নি বোধহয়। আসলে লোকটার আদরের প্রকাশ ওরকমই। কাণ্ডজ্ঞান কম হলেও রসিক লোকটা তেমন খারাপ নয়। এই তো সেদিন তাকে ধরে নিয়ে গিয়ে বাড়িতে কত যত্ন করল।
আলোয়ানটা ফের গায়ে জড়িয়ে নিল অমল। তার তেমন অপমান লাগছে না আর।
রসিক তার পাশে বসে বলল, বড়ভাই, কিছু মনে কইরেন না, মুখখান শুকনা লাগে ক্যান? কিছু হইছে নাকি?
না, কিছু হয়নি। এমনিই মনটা ভাল নেই।
গ্রামের মাইনষে নানান আকথা-কুকথা কয়।
একটু অবাক হয়ে অমল বলে, কী বলে তারা?
কয় যে আপনের লগে নাকি ওয়াইফের বনে না। মামলা মোকদ্দমার কথাও শুনি! নাকি?
অমল ম্লান একটু হেসে বলে, হ্যাঁ।
মাইয়ালোক লইয়া সমস্যা কার নাই মশয়? যত ঝুট-ঝঞ্ঝাট তো তারাই পাকাইয়া তোলে। তবে কিনা মাইয়ালোক বশ মানলে এক্কেবারে গঙ্গাজল। তারাই তখন বৃষ্টির দিনের ছাতা, শীতের বালাপোশ, গরমের শীতলপাটি। বোঝলেন?
বুঝলাম। তবে আমি তো ওসব পেরে উঠিনি।
ঝঞ্ছাট কি আমারও কিছু কম গেছে মশয়? মাইরধইরও খাইছি, কিন্তু ডিভোর্স করি নাই। বিয়া করা বউ, তারে ছাড়ুম ক্যান কন? জজসাহেব রায় দিলেই হইব? তা হইলে তো বিষয়সম্পত্তি ছাইড়্যা ল্যাংটা- চ্যাংটা হইয়া বিবাগী হইয়া যাইতে হয়। বউও আমার সম্পত্তি, পাজি হউক ব্যাচাইল্যা হউক, তারে ছাতুম ক্যান?
জোর করে কি রাখা যায়?
আরে মশয়, কথায়ই তো আছে জোর যার মুল্লুক তার। আমি যখন বাসন্তীরে বিয়া করলাম তখন বড়বউ মেলা চিল্লামিল্লি করছিল, উকিলবাড়ি হাটাহাঁটিও শুরু করল। আমি তখন কইলাম আমি যদি আরও চাইরটা বিয়াও করি তবু তোমারে ছাড়ুম না। দেখি তুমি কেমনে যাও!
এতটা মস্তিষ্কহীন হওয়া তার পক্ষে সম্ভব কিনা তা একটু ভাবতে গিয়ে হেসে ফেলল অমল। বলল, হ্যাঁ, ওভাবেও হয়তো হয়। গুহামানবদের যুগে হত।
আইজও হয় মশয়। না হইলে আমার দুই সংসার টিক্যা আছে কেমন কইরা। নেন, চা খান। লগে দুইখান মুড়মুড়া বিস্কুট খাইবেন নাকি? টোস্ট বিস্কুট খাইতে কিন্তু আচিমিৎকার।
আচিমিৎকার শব্দটা ভারী নতুন ঠেকল অমলের কানে। বলল, না, কিছু খেতে ইচ্ছে করেছে না। আপনি খান।
যারা মাথার কাম বেশি করে তাগো ক্ষুধা কম।
অমল বলল, না না, আমার তো ভীষণ খিদে পায়।
নাকি? ক্ষুধা পাওন ভাল। আমি তো রাইক্ষসের মতন খাই। বড়ভাই, একখান কথা কমু? বলুন না।
আপনের পোলাপান কয়টা?
দুটো। এক ছেলে, এক মেয়ে।
দুর মশা, আপনের মতো মাইনষের পোলাপান যত বেশি হয় ততই ভাল।
কেন?
মগজওলা মাইনষের পোলাপানও মগজওলাই হয়। দুঃখের কথা কী জানেন, আমাগো দ্যাশে ছোটলোকগুলারই পোলাপান বেশি হয়। তাতে লাভ কী কন? দ্যাশে ছোটলোকের সংখ্যা বাড়ে।
রসিকের এইসব বৈপ্লবিক কথাবার্তায় একটু হাসে অমল। তারপর মৃদুস্বরে বলে, আমার মগজ এখন আর কাজ করে না।
চা খেয়ে তারা উঠল। বাস আসছে।
ভারী যত্ন করে তাকে হাত ধরে বাসে তুলল রসিক। সকালের বাস বলে এতটা ফাঁকা। তাকে টিকিটটা অবধি কাটতে দিল না রসিক। বলল, আরে মশয়, টিকিটের দাম আর কয়টা পয়সা, হয়লেই দিতে পারে। মাইনষের দাম দেই ক্যামনে?
অমল জোরাজোরি করল না। সেটা পণ্ডশ্রম হবে।
বউয়ের লিগগ্যা কী লইয়া যাইবেন মশয়?
অবাক হয়ে অমল বলে, কিছু নেব না তো!
ওইটাই তো ভুল করেন বড়ভাই।
তাই নাকি? কেন বলুন তো!
মাইয়ালোকে জিনিসপত্র পাইতে ভালবাসে। তাগো কাছে খালি হাতে যাইতে নাই। যা হউক একটু কিছু লইয়া যাইতে হয়।
অমল অবাক হয়ে বলে, ওর জিনিসপত্র সব তো ও-ই কেনে, এমনকী আমার জিনিসপত্রও কেনে। আমি কেনাকাটা পারি না।
রসিক হেসে বলে, আপনেরে লইয়া আর পারুম না মশয়। আমার বউও তো গড়িয়াহাট থিক্যা বড় বাজার ইস্তক টানা মাইরা হাবিজাবি কিন্যা ঘরবাড়ি ছিটাল করতাছে। তবু মশয় আমি তার লিগ্যা কিছু না কিন্যা ঘরে ঢুকি না। যেদিন আর কিছু না পারি এক ঠোঙ্গা চিনাবাদাম কিন্যা লইয়া যাই। খুশি হয়, বোঝলেন! খুশি হয়। জিনিসটা বড় কথা না, আসল হইল অ্যাটেনশন। তারে যে ভুইল্যা যাই না এইটা হইল তার প্রমাণ।
তাই বুঝি?
হ বড়ভাই। পিরিতের সার কথাই হইল লেনদেন। যত লেনদেন তত আঠা। লেনদেন ছাড়া পিরিত হইল বন্ধ্যা। বোঝলেন! যতই মিঠা মিঠা কথা কন না ক্যান, শুকনা লাগব। লগে একখান গোলাপফুল গুইজা দেন, দ্যাখবেন মুখে হাসি ফুটছে।
স্ত্রীর জন্য উপহার কেনা এই ব্যাপারটিকেই অমলের মস্তিষ্কহীনতা বলে মনে হয়। ঘুষ ছাড়া সেটাকে আর কী বলা যায়? জিনিসের উপযোগই বা কতক্ষণ থাকে?
বউ কি কম নাকি বড়ভাই? সাক্ষাৎ ভগবতী। মাঝে মাঝে খাণ্ডারনি হইয়া খাড়য় ঠিকই, কিন্তু তারাই তো বাচ্চা দেয়, সংসার বাইন্ধ্যা রাখে। কী কন? কাইজ্যা করে আবার আগলাইয়াও তো রাখে।
বর্ধমানে পৌঁছে আবার তাকে লজ্জায় ফেলল রসিক। অমলের টিকিটও সেই কেটে ফেলল চট করে।
এটা বড় বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে রসিকবাবু।
দুই-চাইরটা টাকা লইয়া মাথা ঘামাইয়েন না বড়ভাই। বড় বড় জিনিস লইয়া চিন্তা করেন। পাবলিকের কি আপনের লিগ্যা কিছু করনের নাই?
অমল ভদ্রতার লড়াই পারবে না জেনেই আর কথা বাড়াল না।
বেশি ভোরের ট্রেন বলেই ভিড় ছিল না তেমন। কোণের সিটে তাকে ঠেলে বসিয়ে দিয়ে রসিক বলল, এইবার জুইৎ কইরা বইয়া ঠাইস্যা একটা ঘুম দেন। আমিও ট্রেনে উঠলেই ঘুমাই।
কথাটা ভারী পছন্দ হল অমলের। সে খাঁজের মধ্যে মাথা রেখে দিব্যি ঘুমিয়ে পড়ল।
হাওড়ায় যখন নামল তখন সোয়া নটা।
লন, আপনেরে একটা ট্যাক্সিতে উঠাই দিয়া যাই।
আমি ধরতে পারব ট্যাক্সি।
আপনি হগ্গলই পারবেন। কিন্তু আমারও তো করন উচিত।
বাবা যেন ছোট ছেলেটিকে আগলে নিয়ে যাচ্ছে এমনভাবেই রসিক তাকে ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে নিয়ে এসে বসিয়ে দিল ট্যাক্সিতে। অমল বলল, আপনিও তো বড়বাজারেই যাবেন? চলুন নামিয়ে দিয়ে যাই।
আরে না, আমার তো হাঁটা রাস্তা। একটু মর্নিং ওয়াকও হইয়া যাইব।
অমল আর সাধাসাধি করল না। সে এসব পেরে ওঠে না।
ট্যাক্সি বাড়ির দিকে রওনা হতেই বুকে একটা দুরুদুরু শুরু হল অমলের। সামনেই কি যুদ্ধক্ষেত্র? ধর্মক্ষেত্রে কুরুক্ষেত্রে সমবেতা যুযুৎসব? কোন ধুন্ধুমার অপেক্ষা করছে তার জন্য? তার মুখের কথা ক্রমে ফুরিয়ে যাচ্ছে। তার মনেও আজকাল কথা আসে না। তার মন কি ধীরে ধীরে বোবা হয়ে যাবে? গেলেই ভাল। গেলেই শান্তি।
বাইরে হিজিবিজি কলকাতা শহর বয়ে যাচ্ছে। সকালের কবোষ্ণ রোদেও বাইরেটাকে বাস্তব মনে হয় না তার।
যেতে যেতে দূরত্ব কমছে। বাঘিনীর গর্জন শোনা যাচ্ছে কি নেপথ্যে? মাটিতে ল্যাজ আছড়ানোর শব্দ? গাঁয়ের গন্ধ? বাতাসে কি বারুদের ঘ্রাণ?
গড়িয়াহাটার কাছে সে চেঁচিয়ে উঠল, থামো! থামো!
তাড়াহুড়ো করে ভাড়া মিটিয়ে নেমে পড়ল সে।
সবে বেলা দশটা। দোকানপাট এখনও খোলেনি। তবু সামনে যে দোকানটা খোলা পেল তাতেই ঢুকে পড়ল সে। দোকানে এখন ধূপধুনো দেওয়া হচ্ছে। প্রস্তুত নয়। সে শো-কেসে সাজানো শাড়ি দেখতে লাগল। শাড়ির কিছুই বোঝে না সে। কেনেওনি কোনওদিন। তবু দেখতে লাগল।
একটা বাফ্ রঙের শাড়ির ওপর জমকালো এমব্রয়ডারির কাজটা বেশ পছন্দ হল তার।
এটার দাম কত?
আড়াই হাজার।
অ্যাটাচি কেস খুলে টাকাটা দিয়ে দিল সে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন