শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
ব্রহ্মচারী মারা যাওয়ার পর বিজু আর তার ঘরে চড়াইপাখিদের বাসা করতে দিত না। খড়কুটো নিয়ে চড়াইপাখিরা তবু চেষ্টা কিছু কম করেনি। তাদের লক্ষ্য ছিল বিজুর ঘরে সিলিং-এর কাছ বরাবর বইয়ের তাক। বইগুলো তেমন কাজের নয়। কিন্তু বিজুর স্বভাব হল সে কখনও তার পুরনো, বাতিল কোনও বই আজ অবধি ফেলে দিতে পারেনি। এমন কী তার স্কুলের পাঠ্য বই-খাতা সে জমিয়ে রেখেছে। সেগুলোই ওই ওপরের তাকে সাজিয়ে রাখা। চড়াইপাখিদের খুবই প্রিয় জায়গা ওটা। নাগালের বাইরে একটু ঘিঞ্জি, ঘুপসি জায়গায় তারা বাসা করতে ভালবাসে।
কিন্তু বিজু খড়কুটো জড়ো হতে দেখলেই সেগুলো ফেলে দিত। তাতে পাখিরা সাময়িক নিরস্ত হলেও হাল ছাড়েনি কখনও। বারবার চেষ্টা করে গেছে। শেষ অবধি হাল ছেড়েছে বিজুই। ছাদের ঘরে সে একদম একা। মাঝে মাঝে মোতি নামের বেড়ালটা এসে বিজুর বিছানায় আশ্রয় নেওয়ার চেষ্টা করে বটে, কিন্তু বিছানায় বেড়ালের অনুপ্রবেশ একদম পছন্দ করে না বলে বিজু মোতিকে তাড়িয়ে দেয়। মোতির অভ্যাসটা খারাপ করেছে বিজুর মা। আদুরে বেড়ালকে বিছানায় নিয়ে শোয়া তার অভ্যাস। বিজু মাকে অনেক বকেও অভ্যাস ছাড়াতে পারেনি। মোতি তবু মাঝে মাঝেই নির্লজ্জের মতো আসে এবং একবার বিজুর ঘরে সন্তান প্রসবের চেষ্টাও করেছিল। শেষ অবধি মোতির উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়। ছানাপোনা নিয়ে সে আজকাল নীচেই থাকে। তবে মাঝে মাঝে এসে গম্ভীরমুখে ঘরে একটু হাঁটাহাঁটি করে যায়। সেটা তার অধিকার প্রতিষ্ঠাও হতে পারে, বিজুর ওপর মায়াও হতে পারে।
যাই হোক, বিজুর ঘরে চড়াই বা বেড়াল কিছুই ছিল না। এখন চড়াইপাখিরা বাসা করেছে। বিজুর প্রতিরোধ একটু একটু করে মায়াবশে ভেঙে যাচ্ছিল। কে না জানে মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু হল এই মায়া। আবার কে না জানে মায়াই হয়তো মানুষের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুও।
কিন্তু চড়াইয়ের বাসা থেকে যে বিজুর আর এক অশান্তি শুরু হবে তা কে জানত? ঘরের সর্বত্র পুরীষ ত্যাগ এবং পালকের ওড়াউড়ি তো আছেই। তা ছাড়া মাঝে মধ্যেই ডিম ভেঙে পড়া এবং চড়াইছানার আকস্মিক পতন হল আর এক দুশ্চিন্তার কারণ। প্রথম যে চড়াইছানাটা পড়ে গিয়েছিল সেটাকে সযত্নে বইয়ের তাকের বাসায় পুনর্বাসিত করার চেষ্টা করেছিল বিজু। কিন্তু চড়াইরা বোধহয় পতিতজনকে আর গ্রহণ করে না। তুলে দেওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই ক্রুদ্ধ চড়াইরা সেটাকে ফের ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। বারকয়েক পতনের পর অক্কা পেল সেটা। সদ্য-উড়তে-শেখা একটা ছানা কীভাবে যেন জখম হয়ে মেঝেয় পড়ে রইল একদিন। হাঁটতে পারে, কিন্তু উড়তে পারে না। তাকে ধরতে গেলেই খাট বা টেবিলের নীচে পালায়। অবশেষে ধরেও জখমটা ঠিক বুঝতে পারল না বিজু। চড়াইপাখি যে কী খায় তাও তার জানা নেই। অগত্যা খানিকটা চাল এনে ছড়িয়ে দিল মেঝেতে। ছোট বাটিতে জল। দেখা গেল পাখিটা জলে একটু-আধটু মুখ দিলেও চাল খাচ্ছে না। কী যে মুশকিল হল বলার নয়।
মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, হ্যাঁ মা, চড়াইপাখি কী খায় জান না?
কে জানে বাবা কী খায়। পোকামাকড়ই খায় বোধহয়। কেন, চড়াই পড়েছে নাকি?
হ্যাঁ।
সে তো নীচের ঘরেও কতবার পড়েছে।
সেগুলোর গতি কী হয়েছে?
গতি আর কী হবে। মোতিই মুখে করে নিয়ে গিয়ে ফেলে দিয়ে আসে।
মোতিটা একটা যাচ্ছেতাই তো।
তা ওকে দোষ দিয়ে কী হবে। যার যা স্বভাব। বরং ধানুকে জিজ্ঞেস কর। ওরা আদিবাসী, কাকপক্ষী খুব চেনে।
ধানুর বয়স বছর কুড়ি-বাইশ। কালো, রোগাটে চেহারা। সে ঢেঁকি, উদুখল আর কাচাকুচির জন্য বহাল হয়েছে। বেশি কথা কয় না, নিঃশব্দে কাজ করে।
কুয়োপাড়ে ধানু কাপড় কাচছিল। ডাক শুনে উঠে এল।
হ্যাঁ রে ধানু, চড়াইপাখিরা কী খায় জানিস?
কেন গো, চড়াই দিয়ে কী হবে?
বল না।
পোকা খায়, ঘাসের বীজ খায়, ভাতও খায়, ওদের কোনও ঠিক নেই।
আমার ঘরে একটা চড়াইপাখি পড়ে গেছে। বাচ্চা পাখি। কী করব বল তো!
সাদা দাঁত দেখিয়ে হাসল ধানু, বলল, ও কি আর বাঁচবে?
কেন বাঁচবে না?
ওম না পেলে বাঁচে না।
দুর, তুই কিছু জানিস না।
বেশি খেতে দিও না কিন্তু, বেশি খেলে তাড়াতাড়ি মরে যাবে। একটু ভাত দাও। আর জল।
তাই দিল বিজু। অনেকক্ষণ সংকোচের সঙ্গে পালিয়ে থেকে অবশেষে পাখিটা এসে ভাত ঠোকরাতে লাগল। জলও খেল। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল বিজু। কিন্তু এ-ঘরে মোতির আনাগোনা আছে এবং তার আগমন-নিস্ক্রমণের পথ বন্ধ করা প্রায় অসম্ভব। দরজা বন্ধ রাখলে মোতি জানালা দিয়ে আসবে। জানালা বন্ধ রাখলে পাখিদের যাতায়াত বন্ধ হবে। ঘুলঘুলি আছে বটে, কিন্তু তাতে জাফরি দেওয়া বলে পাখি আসতে পারে না। কী যে মুশকিল হল পাখিটাকে নিয়ে!
মোতির হাতে নয়, পাখিটা দিন তিনেক বাদে মরে গেল। ঝি ঘর ঝাঁট দিতে এসে টেবিলের তলা থেকে মরা পাখিটাকে বের করল। বিজুর চোখে জল এসে গিয়েছিল ঘাড় লটকানো, চোখ ওলটানো পাখিটাকে দেখে। মায়া যে কী সর্বনেশে জিনিস! দুদিন মন খারাপ রইল তার। একটা পাখিকে বাঁচানোর মতো সামান্য এলেমও তার নেই কেন? এই সীমাবদ্ধ জ্ঞান নিয়ে বেঁচে থাকাটা তো একটা ডিসক্রেডিট।
জ্যাঠা তাকে ওকালতিতে জুতে দিয়ে গিয়েছিল। গৌরহরির প্রায় সব আইনের বই-ই নিয়ে এসেছে সে। গৌরহরির ঘনিষ্ঠ এক উঁকিলের জুনিয়র হয়ে কিছুদিন কাজ করেছে। এখন দু-একটা মামলা নিজেও করে, অবাক কাণ্ড হল গৌরহরির মক্কেলরা আজকাল তার কাছেই আসতে লেগেছে। এক মক্কেল তাকে বলে ফেলল, মশাই, আমি স্বপ্নে দেখেছি, চাটুজ্যেমশাই বলছেন, ওহে বিজুর কাছে যাও, আমি বিজুর ওপরেই ভর করব।
জ্যাঠামশাই ভর করুন বা না করুন বিজু কথাটার প্রতিবাদ করেনি। মক্কেল আসছে, এটাই বড় কথা। সংখ্যায় তারা বেশি নয়, পাঁচ সাতজন, অন্যরাও লক্ষ রাখছে। হাতযশ দেখলে তারাও এসে জুটবে। নিজের ভবিষৎ জ্যাঠামশাইয়ের কল্যাণে খুব একটা অনুজ্জ্বল দেখছে না বিজু। ওকালতি কাজটা তার ভালও লাগে। কলম পেশার চেয়ে ঢের ভাল। উত্তেজনা আছে, থ্রিল আছে, জয়-পরাজয়ের আনন্দ ও দুঃখ আছে। একঘেয়ে তো নয়।
গাঁয়ের বাড়িতে মক্কেল আসবে না বলে পুজোর পরই বর্ধমানে জি টি রোডের ওপর দোতলায় একখানা ঘর ভাড়া নিয়ে চেম্বার খুলেছে বিজু। কোর্টের পর সেখানেই বসে আজকাল।
সেদিন জনা চারেক লোক ছিল চেম্বারে। মামলামোকদ্দমার ব্যাপার নয়, এরা এমনিই গল্প-সল্প করতে আসে। দু-একজনের কেস করেছে বিজু। পাখিটা মরে যাওয়ায় মনটা সেদিন ভাল ছিল না। সে জিজ্ঞেস করল, আচ্ছা চড়াইপাখিদের লাইফ স্টাইল সম্পর্কে আপনারা কেউ কিছু জানেন? আমার একটা সমস্যা হয়েছে। ঘরে চড়াইপাখি বাসা করেছে। কিন্তু মাঝে মাঝে চড়াইয়ের বাচ্চা পড়ে যায়।
একজন আঁতকে উঠে বলল, চড়াইপাখি! ও তো নুইসেন্স মশাই। তাড়িয়ে দিন! তাড়িয়ে দিন! বাস ভেঙে ঝাঁটাপেটা করে তাড়ান। অতি অসভ্য পাখি। ঘরদোর নোংরা করবে। কোনও কাজের পাখি তো নয়। রাধাকৃষ্ণ বলবে না, দেখতেও হতকুচ্ছিত, পোষ মানাতেও পারবেন না। এক্ষুনি বিদেয় করুন।
ননীবাবু মৃদু একটু প্রতিবাদ করে বললেন, না না, ওরকম করাটা ঠিক হবে না। চড়াইপাখি বাসা করাটা নাকি সুলক্ষণ। সেই বাড়িতে লক্ষ্মীশ্রী থাকে। মা-ঠাকুমার কাছে তাই তো শুনেছি।
বিজু মাথা নেড়ে বলে, আমি ওসব কুসংস্কার মানি না। আমার প্রবলেমটা হচ্ছে হিউম্যানেটেরিয়ান গ্রাউন্ডে।
চড়াই-বিরোধী লোকটা বলে, চড়াইপাখির সঙ্গে আবার হিউম্যানিটি কী মশাই? তাও যদি বুঝতুম যে চড়াইয়ের মাংস খাওয়া যায়। তাও যখন নয় তখন ওদের জন্য হিউম্যানিটি দেখানোর কোনও মানে হয় না। দুনিয়ার নিয়ম কী জানেন? ভাল ভাল জীবজন্তুগুলো সব এক্সটিংট হয়ে যায়, আর নিঘিন্নে, বাজে, ফালতু, নোংরা স্পেসিসগুলো সংখ্যায় বাড়ে। ডোডো পাখি এক্সটিংট না হয়ে চড়াই হলে কী ক্ষতি ছিল বলুন তো!
চড়াইপ্রেমী ননীবাবু এ কথায় ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, যার হিউম্যান ফিলিংস আছে সে সব জীবজন্তুর প্রতিই সিমপ্যাথি ফিল করে। আর চড়াই মোটেই কোনও ভিলেন পাখি নয়। হাত থেকে রসগোল্লা ছোঁ মেরে নেয় না বা ঠোক্কর মারে না। ছোট, নিরীহ একটা পাখির ওপর আপনার যে কেন এত আক্রোশ।
আক্রোশ-টাক্রোশ নয় মশাই। শুধু বলছি চড়াই এক উৎপাত। এদেশে এত গাছগাছালি আছে তাতে গিয়ে বাসা করে থাক না বাপু। মানুষের ঘরদোরে এসে ছিষ্টিনাশ করার স্বভাব কেন? কই, আর কোনও পাখি তো এমনধারা করে না।
বিজু মৃদু হেসে বলল, তাহলে চড়াই সম্পর্কে আপনারা তেমন কিছু বলতে পারলেন না। আমি একজন চড়াই-বিশেষজ্ঞ খুঁজছি।
চড়াইবিরোধী লোকটা বলল, লোকের আর খেয়ে-দেয়ে কাজ নেই মশাই যে চড়াইয়ের ঠিকুজি-কুষ্টি নিয়ে ঘাঁটাঘাঁটি করবে।
ননীবাবু বললেন, না না, আছে। আমার এক শালা আছে পাখি-টাখি পোষে। সে বোধহয় বলতে পারবে।
তাকে একবার বলবেন তো আমি একটু দেখা করতে চাই।
বলবখন। সে কাটোয়ায় থাকে। বর্ধমানে এলে—
এর বেশি আর কথা এগোল না।
কিন্তু ঠিক তিনদিন বাদে ফের চড়াই নিয়ে সমস্যায় পড়ল বিজু। একটা বাচ্চা চড়াই পড়ে গেল। ভালরকম চোট পেয়েছে। তীব্র আর্তনাদে ঘর ভরে গেল। সন্ধেবেলা পাখিটাকে হাতে নিয়ে ভাল করে দেখে বিজুর মনে হল, ঘাড় ভেঙে গেছে কিংবা ঘাড়ে ভালরকম চোট হয়েছে।
মেঝেতে ছেড়ে দিলেই পাখিটা যন্ত্রণায় পাখা ঝাপটাতে ঝাপটাতে চরকির মতো পাক খায় আর আর্ত চিৎকার করতে থাকে। হাতে তুলে নিলে চিৎকার বন্ধ হয় বটে, কিন্তু খিঁচুনির মতো পা টানা দেয়, পাখা ঝাপটানোর চেষ্টা করে। ওর যন্ত্রণাটা বুঝতে পারে বিজু, কিন্তু নিরাময় বা উপশম তো তার জানা নেই। কোনও পক্ষীবিশারদ বা পক্ষীচিকিৎসক হয়তো জানে। সে জানে না। পাখিটাকে নিয়ে অসহায়ের মতো অনেকক্ষণ বসে রইল সে। একটা কৌটোর ঢাকনায় জল নিয়ে মুখের কাছে ধরল। পাখিটা ঠোটে একটু জল ছিটকোল বটে, কিন্তু শান্ত হল না। ওকে কি ঘুমের ওষুধ বা পেইন-কিলার দেওয়া উচিত? ভেবেই চিন্তাটা কত হাস্যকর তা বুঝতে পারল বিজু। মানুষের ওষুধ খাওয়ালে পাখিটা হয়তো মরেই যাবে।
অনেক রাত অবধি পাখিটাকে হাতে নিয়ে বসে নাস্তিক বিজু ভাবছিল, ঈশ্বর নামক অলীক বস্তুর কাছে ওর প্রাণভিক্ষা করা উচিত কিনা। যুক্তিজালে তার কাছে কোনও ঈশ্বরের অস্তিত্ব নেই ঠিক কথা, কিন্তু মানুষের বস্তুজ্ঞানের সীমানার ওপারটা আজও তো আবছা। ওই আবছায়ায় ঈশ্বর বা ভূতের মতো কেউ নেই তো! থাক বা না থাক, প্রার্থনায় তো দোষ নেই!
না, প্রার্থনা করা উচিত হবে না। সামান্য একটা পাখির জন্য যদি সে নিজের বিশ্বাস ও মত বিসর্জন দেয় তাহলে নিজেকেই তার একদিন ঘেন্না হবে।
নাস্তিক হয়েও দুর্গাপুজো কালীপুজো নিয়ে মাতামাতি করে বলে অনেকে তাকে প্রশ্ন করেছে। সে বলে, দুর্গাপুজো কালীপুজো কোনও ধর্মকর্ম নয় রে। ওটা একটা উৎসব মাত্র। একটা উপলক্ষ করে খানিক ফুর্তি করা।
সারা রাত তো আর পাখি নিয়ে জেগে থাকা যায় না। একসময়ে সে পাখিটাকে মেঝেয় ছেড়ে দিন। পাখিটা অবিরল ঘুরপাক খেতে লাগল যন্ত্রের মতো। সঙ্গে সেই আর্তনাদ।
সারা রাত ভাল করে ঘুমোতে পারল না বিজু। বারবার ঘুম ভেঙে যেতে লাগল। বারবারই মনে হতে লাগল, এত কম জেনে বেঁচে থাকার মানেই হয় না। একটা চড়াইপাখি, নিত্যদিনকার চেনা একটা জীব, তারও ব্যথাবেদনা কমানোর উপায় কেন তার জানা নেই?
সকালবেলায় উঠেই সে প্রথম পাখিটার খোঁজ করল। লক্ষ্যহীন, নিয়ন্ত্রণহীন ঘুরপাক খেতে খেতে পাখিটা দরজার কাছ বরাবর গিয়ে নেতিয়ে কাত হয়ে পড়ে আছে। প্রথমে ভাবল মরেই গেছে বোধহয়। কিন্তু ধরতে যেতেই ফের চিড়িক শব্দ করে তার প্রবল ঘুরপাক শুরু করে দিল। জান আছে বটে পাখিটার।
জল ছিল, ভাতও ছিল একটা প্লেটে। পাখিটাকে ধরে খাওয়ানোর চেষ্টা করল সে। খেল না।
পাখিটাকে ফের তার যান্ত্রিক ঘুরপাকে ছেড়ে দিয়ে বসে রইল সে। মা-পাখিটা অপেক্ষা করছিল বোধহয়। সে সরে বসতেই নেমে এসে বাচ্চার কাছে বসল। কিন্তু মাকে দেখেও বাচ্চাটার ঘুরপাক থামল না। মুখে করে দানা জাতীয় কিছু এনেছিল মা-পাখিটা। কিন্তু খাওয়াতে পারল না।
অসহনীয় চিৎকার সহ্য করতে না পেরে নীচে নেমে গেল বিজু।
মা তাকে দেখেই বলে উঠল, কী হয়েছে রে? মুখটা অমন গম্ভীর কেন?
এমনি। কিছু হয়নি।
শরীর খারাপ নয় তো!
না, না ওসব ঠিক আছে।
কী যে হয় তোর মাঝে মাঝে। দেখে ভয় লাগে বাবা।
চা নয়, সকালে এক গ্লাস গোরুর দুধ খেতে হয় তাকে। ছেলেবেলার অভ্যাস। দুধটা কোনওক্রমে খেয়ে সে বাগানে গিয়ে কিছুক্ষণ উদাস মুখে বসে রইল। পাখিটার যন্ত্রণা তাকে সারা রাত বিঁধেছে। একসময়ে তার মনে হচ্ছিল যন্ত্রণাটা তার শরীরের মধ্যেই হচ্ছে।
অনাত্মীয়, ভিন্ন শ্রেণীভুক্ত, নামগোত্রহীন ওই পাখিটার জন্য এই যে টান এটা অ্যানিম্যাল লাভার্সদেরও থাকে। কত লোক রাস্তার কুকুরের জন্য আশ্রয় বানিয়েছে। ওটা বড় কথা নয়। সে অজ বাগানে শীতের রোদ ও ছায়ায় ঘুরতে ঘুরতে আর একটা মহৎ ব্যাপার অনুভব করছিল। সমস্ত পৃথিবী, বিশ্বজগৎ, মহাজগৎ জুড়ে একটা সিস্টেম রয়েছে। তার সঙ্গে সে, ওই চড়াইপাখি, মোতি এবং সবাই ও সব কিছু বাঁধা। কেউ একা নয়, বিচ্ছিন্ন নয়। সব কিছুই সব কিছুর সঙ্গে এক সূক্ষ্ম মাকুর কারসাজিতে পরস্পরের সঙ্গে যোগ হয়ে আছে। ধর্মে এরকমই এক মহা সম্পর্কের কথা বলা হয় বটে। সেটা গাঁজাখুরি হতেও পারে। কিন্তু সম্পর্কও যে একটা আছে—যা মায়া, মোহ, ভালবাসা বা যাই হোক— তাও তো মিথ্যে নয়।
ঘণ্টাখানেক বাদে তার ঘর ঝাঁটপাট দিতে এল কাজের মেয়ে। বিজুর সামনে মেঝের ওপর তখনও পাখিটা অবিরাম চক্কর খাচ্ছে। সে এক অদ্ভুত দৃশ্য। পাখিটা দুপায়ে উঠে দাঁড়াতে পারছে না, উড়তে পারছে না, শুধু আছাড়ি-পিছাড়ি খেয়ে চক্রাকারে ঘুরে যাচ্ছে। যন্ত্রণাটা চোখে দেখা যায় না।
কাজের মেয়েটা ভয় পেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, ও কী গো! ওটা কী মেঝের ওপর?
বিজু ধমক দিয়ে বলল, চেঁচানোর কী হল তোর! ওটা একটা চড়াইপাখি। জখম হয়েছে। কিছু করতে পারিস?
ফের পাখায় ধাক্কা খেয়েছে বুঝি?
আমি কি পাগল যে শীতকালে পাখা চালাব! পাখা চালিয়ে একটাকে তো তুই-ই মেরেছিলি।
আহা, আমার কী দোষ বলো। পাখিগুলো অমন আহাম্মক হলে আমি কী করব?
এটার জন্য কিছু করতে পারিস?
মেয়েটা পাখিটাকে দুহাতের আঁজলায় তুলে নিয়ে বলল, ওর তো হয়ে গেছে। ঘাড় ভাঙলে কেউ বাঁচে?
ঘাড়ই ভেঙেছে বলছিস?
তাই তো মনে হচ্ছে। মাথা সোজা করতে পারছে না যে। ফেলে দিই গে?
না না। ওই ওয়েস্ট পেপার বাস্কেটের মধ্যে আপাতত রেখে দিয়ে তুই ঘরটা ঝাঁটপাট দে। তারপর দেখা যাবে।
তোমাদের বাড়িভর্তি বেড়াল ঘুরে বেড়াচ্ছে। একটা হুলোও রোজ আনাগোনা করে। এটাকে রাখতে পারবে?
দেখা যাক।
রাখা যাবে না সে জানে। বেড়ালে না নিলেও খাদ্য-পানীয় ছাড়া পাখিটা এমনিতেও মরবে। ধীর মৃত্যু। সেটা প্রত্যক্ষ করতে হবে তাকে। বিজু ব্যাপারটা সইতে পারছে না।
কিছু খাওয়ানোর চেষ্টা করবি। ওই যে দুটো কৌটোর ঢাকনায় জল আর ভাত রয়েছে। দেখ না চেষ্টা করে।
মেয়েটা কিছুক্ষণ চেষ্টা করে হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, না এ খাচ্ছে না যে। কুশি বাচ্চা এরা কি নিজে খেতে পারে? মায়ের ঠোঁট থেকে খায়।
বিজু সেটা জানে। তাই সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
কোর্টে গিয়েও তার আজ অন্যমনস্কতা কাটল না। তবে অনেকটা সহজ হল। বুকটা হালকাই লাগছিল। কিন্তু যে-ই সন্ধেবেলায় চেম্বারের পর মোটরবাইকের মুখ বাড়ির দিকে ঘোরাল তখনই সে অলক্ষ্য থেকে সেই প্রাণান্তকর আর্তনাদ অগ্রিম শুনতে পাচ্ছিল। মেঝেময় লাট খেয়ে বোঁ বোঁ করে ঘুরছে ভাঙা শরীরের এক পাখি।
মাসি কিলিং! বাড়ি ফিরে কি পাখিটার যন্ত্রণার অবসান ঘটাতে মেরে ফেলবে ওকে? না, তা পেরে উঠবে না সে।
রাতে ঘরে খুব সাবধানে ঢুকল সে। আলো জ্বালল। ঘরে কোনও শব্দ নেই। মরে গেল নাকি পাখিটা? নিচু হয়ে মেঝের ওপর খুব ক্ষীণ রক্তের দাগ আর আঁশের মতো একটু পালক দেখতে পেল সে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বাইরের দিকের জানালার পাল্লাটা খোলা। মার্সি কিলিং-এর কাজটা হয় মোতি, না হয় আগন্তুক কোনও হুলোই করে গেছে। আপাতত শান্তি। কিন্তু সমস্যার স্থায়ী সমাধান তো নয়। এ-ঘরে যতদিন চড়াইয়ের সংসার থাকবে ততদিন এই ঘটনা বারবার ঘটবে।
জামাকাপড় পালটে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল বিজু। আজ আর পড়াশুনো করতে ইচ্ছে হল না। মোটে আটটা বাজে।
মা রান্নাঘর থেকে জিজ্ঞেস করল, আবার কোথায় চললি?
দেখি, একটু আড্ডা মেরে আসি।
রাত করিস না।
আরে না। কাকার বাড়ি যাচ্ছি।
তবেই হয়েছে। ওরা ঠিক রাতের খাবার খাইয়ে দেবে। শুনেছি পিঠেপায়েস হয়েছে ও-বাড়িতে।
তাহলে তো ভালই। সেঁটে আসবখন।
তাকে দেখেই পান্না এক গাল হাসল, বাব্বাঃ, যা কাজের লোক হয়েছ তুমি! আজকাল টিকিরই নাগাল পাওয়া যায় না।
তোর মতো বসে খেলে আমার চলবে? মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করতে হয়।
ইস! আমি পড়াশুনো করি না বুঝি! দাঁড়াও না, পাস করেই চাকরি করতে লেগে যাব। পারুলদিকে বলে রেখেছি। ওদের কোম্পানিতেই ঢুকে যাব।
দুর! ও তো মিস্তিরির কাজ। তুই পারবি?
না না, ওদের অফিস ওয়ার্কারও লাগে। এ-গাঁয়ে আমি আর থাকছি না বাবা।
কেন, গাঁ আবার কী দোষ করল?
পান্নার মুখ থেকে হাসি উবে গেল। বড় বড় চোখ করে বলল, জানো না বুঝি? আমাদের নতুন রান্নার লোক সুদর্শন রোজ ভূত নামায়।
বিজু হেসে বলল, তুইও তো একটা ভূত।
যাঃ, বাজে কথা বোলো না। রোজ রাতের বেলা সবাই ঘুমোলে ও নাকি মন্তর পড়ে ভূতেদের নামিয়ে আনে। তখন সারা বাড়ি বোঁটকা গন্ধে ভরে যায়। বাসন্তী, হিমি সবাই গন্ধ পেয়েছে।
বটে!
ভয়ে আমি মরে যাচ্ছি বাবা।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন