শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
হুট বলতেই রাজ্যের ইষ্টিগুষ্টি খাওয়ানোর ধুম পড়ে যায়, কী কাণ্ড বাবা! শুনেছিস কখনও পঞ্চামৃত না কোন গুষ্টির পিণ্ডি বলেও আবার কাণ্ড আছে! যত বাঙাল দেশের নিয়মকানুন বাবা, সাতজন্মে শুনিনি। তা সে না হয় হল। কিন্তু এই রাজ্যের বউ ঝি, ভিখিরি কাঙালিদের গান্ডেপিণ্ডে গেলানোর মতো কী মচ্ছব পড়ল বল তো!
হিমি পালানোর ফাঁক পাচ্ছে না। বাইরে কত কী হয়ে যাচ্ছে। উলু শোনা যাচ্ছে, শাঁখ বাজছে, আরও সব কী কী হয়ে যাচ্ছে, কে জানে। সে অত শত না জেনে একটা পিঁড়ি খুঁজতে এ-ঘরে ঢুকে পড়েছিল। কদিন হল ছেলে আর বউদের তাড়া খেয়ে বুড়িটা এ-বাড়িতে এসে জুটেছে। উত্তরের দালানে মরণের পড়ার ঘরের পাশে এই একটেরে ঘরখানায় রাজ্যের জিনিসপত্র ঠাসা থাকে। হেন জিনিষ নেই পাবে না। কোদাল, কুড়ুল, দা, দড়িদড়া, ডাঁই করা মাদুরি, পিঁড়ি, তক্তা থেকে যা চাও। ছুঁচো, ইঁদুর, আরশোলা আর মাকড়সার আঁতুড়ঘর। এ-ঘরেই মরণদের দুটো বেড়াল বছর বছর বাচ্চা বিয়োয়। এই গুদোমের মধ্যেই কবেকার একটা তক্তপোশ পড়ে ছিল। সেটাই এখন বুড়ির ঠেক। পিঁড়ি খুঁজতে এসে ঘরে ঢুকতেই বুড়ি খপ করে ধরে বসিয়েছে। আর ছাড়া পাচ্ছে না হিমি। সে বলল, তা কেন দিদিমা, পঞ্চামৃত এদেশেও হয়। এই তো সুবলদের বাড়িতেও হল সেদিন, ওর কাকীমার পঞ্চামৃত। এত ঘটা হয়নি অবশ্য।
ওরে সেই কথাই তো বলছি। কত টাকা গচ্চা গেল জানিস? বলি নতুন তো মা হচ্ছে না। আরও তিনবার তো বিইয়েছে! নতুন পোয়াতি হলেও না হয় কথা ছিল।
এখন ছাড়ো তো দিদিমা, মনা জেঠিমা কাজে পাঠিয়েছে।
আহা, বোস না একটু। কাজের বাড়ি সে না হয় বুঝলুম, কিন্তু সকাল থেকে একটা কাজেও ডেকেছে কেউ আমায়? আমার পেটের শত্রুরটা অবধি নয়। এত আম্পদ্দা কি ভাল বল? এই জন্যই মেয়ে-জামাইয়ের কাছে থাকতে নেই।
তাহলে কি ও-বাড়ি যাবে?
কী বলব ভাই, এ-বাড়িতে আজ মচ্ছব, তা ভাই দুটোকেও তো একটু ডাকতে পারত! বড্ড গুমোর হয়েছে মেয়েটার। জামাইয়ের কথা বলছি না, সে হল মগ দেশের লোক। ওরা অদ্রতা-ভদ্রতা জানে না, শেখেওনি। বনজঙ্গলের লোক তো, জাতজন্মেরও ঠিক নেই। কিন্তু মেয়েটা তো মানুষের মতো হবে। জামাইয়ের পাল্লায় পড়ে সেও এমন গোল্লায় যাবে কে জানত বল!
কেন দিদিমা, বাঙাল মেসসা তো খুব ভাল। সবাই বলে অমন দরাজ বুকের তোক হয় না। কত লোককে খাওয়ায়, আপদেবিপদে দেখে।
ওটা তো ভড়ং। লোককে ভুলিয়ে ভালিয়ে মন্তর করে ফেলে, তারপর রক্ত শুষে খায়। তা এত লোকের জন্য করে, নিজের শালা দুটোর জন্য করেছে কিছু আজ অবধি? দুটো জোয়ান ছেলে হাত-পা গুটিয়ে বসে আছে, ঘরে হাঁড়ির হাল, আর এ-বাড়িতে নিত্যি ভূতভুজ্যি হচ্ছে। এত অবিচার কি ভগবান সইবে রে?
ও দিদিমা, বলাই মামাকে তো কালও দেখলুম কাঁটাপুকুরের ধারে মাতাল হয়ে পড়ে আছে সকালবেলা।
তা কী করবে বল! মনের দুঃখেই খায়। ছেলে তো খারাপ ছিল না। অভাবে স্বভাব নষ্ট।
তোমাকে নাকি তাড়িয়ে দিয়েছে?
বউ দুটো তো দুটো ডাইনি। ছেলেদের দুষলে তো হবে না। তারা সাতেপাঁচে থাকে না। খোঁড়ে তো ওই দুটো পাজি মাগী। কোন আঘাটা থেকে ধরে এনেছে কে জানে বাবা। মুখ নয় তো আস্তাকুঁড়।
এখন আমি যাই দিদিমা? দেরি হলে জেঠিমা বকবে। পিঁড়ি দিয়ে যেন কী কাজ আছে।
আর একটু বসে যা। কী হালে রেখেছে আমাকে দেখছিস তো। এই ঘরে মানুষ থাকতে পারে বল দেখি! আমাকে ওদের ঘরদোরে অবধি ঢুকতে দেয় না। কেন রে বাপু, আমি কি সোনা-দানা চুরি করব? বাড়ির ঝি মুক্তা অবধি কী মুখনাড়া দেয় না শুনলে বিশ্বাস করবি না। পাঁচজনকে যদি ডেকে বলি তাহলে ওদের মুখে থুথু দেবে না লোকে?
হিমি করুণ গলায় বলল, এসব কথা আমায় বলছ কেন দিদিমা? আমি কি এত সব জানি? তুমি বাড়ি ফিরে যাও না কেন?
তাই যাবো বাছা। ভাঙা ঘরদোর হোক, সংসারে অশান্তি থাক, তবু সে আমার জোরের জায়গা। এখানে অপমানের ভাত কে খায় বল!
তাই যাও না কেন? এবার আমার হাতটা ছাড়ো, বড্ড দেরি হয়ে যাচ্ছে।
আ মোলো, অত ছটফট করছিস কেন? বলি, যা বুঝলি তা পাঁচজনকে গিয়ে বলিস। সবাই এসে আমার হেনেস্তাটা দেখে যাক। বেড়ালের মুতের গন্ধে নাক জ্বলে যায়। তার ওপর পোকামাকড়। কী জ্বালায় যে জ্বলছি।
বলবখন সবাইকে। বলে লাফ দিয়ে বেরিয়ে এল হিমি। হাঁফ ছেড়ে বাঁচল।
বুড়িটাকে তার মোটে ভাল লোক বলে মনে হয় না। মরণের সুন্দর দাদাটা যখন ছিল তখন হিমিকে ওই বুড়িই তুতিয়ে-পাতিয়ে ওর ঘরে পাঠিয়ে দিয়েছিল একদিন দুপুরবেলা। বলেছিল, যা না, ওরা শহুরে ছেলে, ওদের কাছে বললেও কত শিক্ষে হয়।
তা হিমিরও একটু দুর্বলতা ছিল। সুমন একে দেখতে সুন্দর, তার ওপর কী ভাল যে গান গায়। বুড়িটা রোজই তাকে উসকে দিত। গুরুজন মানুষ, খারাপ কথা তো আর বলবে না, এই বিশ্বাসে গিয়েছিল হিমি। বাড়িতে কেউ ছিল না সেদিন। সুমন খারাপ ছেলে হলে সেদিন তার সর্বনাশ হয়ে যেতে পারত। হয়নি। সুমন তাকে মোটেই পছন্দ করেনি তা ওর চোখ দেখেই বুঝতে পেরেছিল হিমি।
কিন্তু পরে বুড়ি তাকে অনেক জেরা করেছিল। ভারী অসভ্য সব ইঙ্গিত, হ্যাঁ রে, ও ঘরে যে গেলি, গায়ে হাত-টাত দেয়নি তো।
না তো দিদিমা! ওসব আবার কী কথা!
আহা, ওই বলছিলাম আর কী। কাঁচা বয়সের ছেলে তো!
তুমিই তো পাঠালে!
আহা, আমি তো ভাল ভেবেই তোকে যেতে বললাম। তা বলে কি আর নজর রাখিনি! বলি, কী বলল-টলল? রসের কথা-টথা কিছু বলেনি?
তুমি যেন কী দিদিমা! সুমনদা তো এমনি গল্প-টল্প করল।
আহা, ওর মধ্যেই কথা চাপা কথা থাকে। তা বিছানায় বসলি নাকি?
না, চেয়ারে।
মাথা-টাথা টিপে দিতে বলেনি?
খুব রাগ হয়েছিল হিমির। বলেছিল, বললেই টিপব নাকি?
আহা, তাতে তো আর দোষের কিছু নেই। আবার যাস না হয় ফাঁক বুঝে।
কেন যেতে বলছ?
ওরে, তোর হিল্লের জন্যই বলছি।
পরদিন তাকে ডেকে বাসন্তীমাসি সব জিজ্ঞেস করেছিল। বলেছিল, খবর্দার মায়ের সঙ্গে কথা কইবি না। দেখলে অন্য দিকে চলে যাবি। মা যে কী সর্বনাশা মানুষ তা আমি জানি।
মেয়েরা কি সর্বনাশ চায় না? সর্বনাশকে ভয় পায়? মেয়েমানুষের যে সর্বনাশটা নিয়ে সমাজে এত চিন্তা-ভাবনা, এত সাবধানী হওয়া, এত শাসন আর আঁটবাঁধ তা কি লুকিয়ে রাখা আচারের শিশির মতোই লোভ দেখায় না মাঝে মাঝে? ভেসে যেতে ইচ্ছে করে না? হিমির মতো বয়সে পারে কি একটা মেয়ে নিজেকে অত সামলে-সুমলে রাখতে? শরীরেরও কত খবর সে জানে না। জানে না এখনও চুম্বনের সুস্বাদ, এখনও নিবিড়ভাবে পায়নি পুরুষের স্বেদগন্ধ। তাই ওই অত নিষেধ, অত ভয় সত্ত্বেও সে মাঝে মাঝে সুযোগ বুঝে সুমনের ঘরে গেছে।
গিয়ে দেখেছে, ছেলেটা হয় মোটা-সোটা বই পড়ে, নয় তো ঘুমোয়।
তবে হিমিকে একেবারে তাচ্ছিল্যও করেনি। বসে হেসে কথা বলেছে, চোখে চোখ রেখেছে। কিছু চোখের কথাও হয়েছে তাদের। প্রেম ব্যাপারটা হিমি এই চোদ্দো পনেরো বছর বয়সে ততটা বোঝে না। সে জানে, সব প্রেমেরই পরিণতি হয় বিয়ে, না হয় ছাড়াছাড়ি।
সুমন কেবল বন্ধুদের কথা বলত। ছেলের সঙ্গে মেয়ের বন্ধু-বন্ধু সম্পর্ক হয় বটে, কিন্তু শেষ অবধি বন্ধুত্বই তো ঝুল খেয়ে সেই প্রেমের কোলে গিয়েই পড়ে। আর প্রেম ঢলে পড়ে বিয়ের গায়ে। তাই না?
জিজিবুড়ি নজর রাখত ঠিকই। ধরল একদিন জামতলায়।
ওলো ও হিমি, বলি খবর-টবর কী রে?
কীসের খবর চাও?
বলি, কতদূর এগোলি?
কী বলছ বুঝতে পারছি না।
কচি খুকিটি তোনোস বাছা, সবই তো জানিস। বলি কী, বেশি সতীপনা থাকলে কিন্তু ফসকাবি।
তার মানে কী গো দিদিমা?
পুরুষমানুষকে একটু আসকারাও দিতে হয়। একটু হাত-টাত ধরলে, কি কাছে ঘেঁষলে চেঁচাসনি যেন বোকার মতো। ওতে তো আর মহাভারত অশুদ্ধ হচ্ছে না রে বাপু। ওভাবেই খেলিয়ে তুলতে হয়।
যাঃ, কী যে সব অসভ্য কথা বলো দিদিমা।
খারাপ কিছু বলিনি, তলিয়ে ভাবলে বুঝবি। তোর বাপের যা অবস্থা মেয়ে পার করতে কোমর বেঁকে যাবে। তিন তিনটে বোন তোর, সেদিকটাও তো ভাববি। নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নে না কেন। মাখামাখি যদি করতে চায় তো ভালই তো। গেঁথে তুলতে সুবিধেই হবে। শহুরে ছেলে ওরা, খুব চালাক। পিছলে যাতে না যায় তার ব্যবস্থা করে রাখবি। বুদ্ধি খাটিয়ে চললে দেখিস, কাজ ফর্সা।
দিদিমা যে ভাল লোক নয় তা সবাই জানে, হিমিও জানে। আর কথাগুলোর মধ্যে ভারী অসভ্য ইঙ্গিত। তবু কিন্তু শরীরে একটু শিহরণ দিয়েছিল তার।
খুব ভালমানুষের মতো বুড়ি বলেছিল, তুই তো হাঁদা, তাই বলি, অত গা বাঁচিয়ে চললে কাজ হবে না। কাছ ঘেঁষে বসবি। মাথায় চুলে হাত বুলিয়ে দিবি, ওই সব যা করে আর কী। একটু হাত-টাত ধরলে ঝটকা মেরে সরে আসিস না যেন।
ইস, তুমি ভারী অসভ্য দিদিমা। বলে পালিয়ে এসেছিল হিমি।
কী করলে কী হয় তা কি অত জানে নাকি হিমি?
তবে সে তার সাধ্যমতো, যতদূর সাহসে কুলোয়, লজ্জার মাথা খেয়ে করেনি যে তা নয়।
একদিন দুপুরে নির্জন ঘরে সে বলেছিল, আপনার মাথা টিপে দেব?
খুব অবাক হয়ে সুমন বলল, কেন? আমার তো মাথা ব্যথা করছে না!
হিমি জব্দ হয়ে বসে রইল।
সুমন একটু হেসেছিল। সেটা যে করুণার হাসি তাও বুঝেছিল বোকা হিমি।
একদিন সুমন তাকে জিজ্ঞেস করল, তুমি পান্নাকে চেনো?
পান্না! রামহরি জ্যাঠার মেয়ে?
হ্যাঁ।
আপনি তাকে চেনেন?
না। তবে চিনতে চাই। তুমি চেনো?
চিনব না কেন? পান্নাদির কাছে আমি গান শিখতাম।
এখন শেখো না?
না। আমার গলা সাধতে ভাল লাগে না।
গান খুব ভাল জিনিস। শিখলে পারতে।
আমার গলা একটু চড়া।
তাতে কী? সাধতে সাধতে সুর এসে যায়।
পান্নাদির কথা জিজ্ঞেস করলেন কেন?
মেয়েটা বেশ গায়।
হ্যাঁ, দেখতেও সুন্দর। পান্নাদিকে আপনার কথা বলব?
না না, আমার কথা বলতে হবে না।
বোকা হিমি কী করে যেন বুঝতে পেরেছিল, সুমন পান্নার প্রেমে পড়েছে। বুঝতে পেরে তার ভারী হিংসে হল পান্নার ওপর। হওয়ারই কথা। পান্নারা একে বড়লোক, তার ওপর সুন্দরী, তার ওপর গান জানে, তারও ওপর ওরা একটু অন্য জগতের মানুষ। অনেকটা পরি-টরির মতো। সবাই ওদের সঙ্গেই ভাব করতে চায়, প্রেম করতে চায়, বিয়ে করতে চায়। যদি তাই হয়, তাহলে পৃথিবীতে হিমিদের কী হবে? সুমন পান্নার সঙ্গে ভাব করার জন্য বসে আছে। আর হিমি যে রোজ তার সঙ্গে ভাব করতে আসে সেটা বুঝি কিছুই নয়?
চোখ ফেটে জল আসতে চাইছিল হিমির।
বিকেলেই সে পান্নাকে গিয়ে বলল, জানো তো পান্নাদি, রসিক বাঙালের আগের পক্ষের ছেলেটা ভীষণ অসভ্য।
কেন রে, কী করেছে?
তোমার ওপর নজর আছে।
পান্না হাসল, কী করে বুঝলি?
তোমার কথা বলছিল খুব। খুব হ্যাংলা কিন্তু।
পান্না রাগ করল না। করবেই বা কেন, ওর সঙ্গে তো কত ছেলেই ভাব করতে চায়। সেটা অহংকারেরই ব্যাপার তো। হিমির সঙ্গে যদি রাজ্যের ছেলে ভাব করতে চাইত তাহলে কি হিমির রাগ হত? বরং বুক ফুলে উঠত অহংকারে।
পান্না বলল, শুনেছি, ছেলেটা গান গায়। তাই নাকি রে?
হ্যাঁ তো। হেমন্তের মতো গলা।
তুই কত গান বুঝিস!
না বুঝলে কী! শুনি তো। সবাই বলে।
একদিন নিয়ে আসিস তো! শুনবো!
শুনবে?
হ্যাঁ। দোষ কী?
বেশি লাই দিও না। ওরা কিন্তু বামুন নয়।
ওমা! বামুন নয় তো তাতে কী?
তোমরা তো বামুন, তাই বলছিলাম আর কী।
পান্না খুব হেসেছিল, বামুন হলে কী হত রে হিমি?
বোকা হিমি খুব লজ্জা পেয়েছিল। কিন্তু সে করবেই বা কী? ওই যে পান্না সুমনের গান শুনতে চাইল ওতেই তার ভিতরে একটা পাগলাঘণ্টি বেজে গিয়েছিল। যদি গান শুনে পান্নাও ঢলে পড়ে সুমনের দিকে!
আসলে ওই পান্না, ওই সুমন ওরা যেন মেঘের ওপরে থাকে। অত দূর নাগাল পোঁছোয় না হিমির। হিমির মতো মেয়ের কাছে ওরা স্বপ্নের ঘোরের মতো। ওদের জগতে হিমির কোনও জায়গা নেই।
আজকাল আবছাভাবে হিমি বুঝতে পারে, ইচ্ছে মতো কিছু পেতে হলে মেয়েদের নিজস্ব কিছু গুণ থাকা দরকার। অনেক টাকা, না হয় রূপ, গানের গলা, বুদ্ধি এইসব। তার যে কিছুই নেই। তার যে বিয়ে হবে না তা নয়। কালো, মোটা বিচ্ছিরি চেহারার একজন মিস্ত্রি-টিস্ত্রি গোছের বা পানওয়ালা, মাছওয়ালা, মুদি যা হোক একজন জুটবে। সে তাকে ধামসাবে, চিবিয়ে খাবে, বাচ্চা পয়দা করবে, তারপর খুব নির্বিকার হয়ে যাবে। যেমন তার নিজের বাপ মা। ওরকমই তো হয়।
হ্যাঁ রে হিমি, বললি না ছেলেটা বামুন হলে কী হত!
হিমি হেসেছিল একটু। বলল, তোমাকে সাবধান করে দিলাম আর কী। বেশি প্রশ্রয় দিও না।
আচ্ছা, তা না হয় দেব না। ছেলেটাকে বলিস তো আমার সঙ্গে একদিন দেখা করতে।
ইস্। বলবে বই কী! কেন বলবে হিমি? হিমি কি পান্নার ক্রীতদাসী না দূতী? কক্ষনও বলবে না হিমি। তোমরা দুজনে উড়ে বেড়াবে আর আমি বুড়ো আঙুল চুষব বুঝি?
পান্নাদিকে আপনার কথা বলেছিলাম।
সুমন অবাক হয়ে বলল, কী বলেছ?
আপনি যে ভাব করতে চাইলেন।
এ মাঃ, তোমাকে বারণ করলাম যে! ইস্, প্রেস্টিজ তো একদম ঢিলে করে দিলে দেখছি।
আহা, দোষের তো কিছু নয়।
দুর! তুমি খুব বোকা মেয়ে। কী বলেছ শুনি।
এই আপনি দেখতে খুব সুন্দর, খুব ভাল গান করেন।
কেন বলতে গেলে?
ভাবলাম পান্নাদি হয়তো ভাব করতে চাইবে।
কী বলল শুনে?
পাত্তাই দিল না।
তুমি আর এরকম কোরো না।
খুব অন্যায় হয়েছে?
তা হয়েছে। কথা চালাচালি হলে খুব মুশকিল হয়। এখানে সবাই খুব অন্যের ব্যাপারে নাক গলায় তো।
পান্নাদিরা কিন্তু বামুন। চাটুজ্জে।
জানি তো! বামুন কায়েতের কথাও তুলল নাকি?
না, আমিই বলছি।
ও, তাই বলো। বামুন কায়েতের কথা মনে হল কেন তোমার?
বাঃ, মনে হবে না?
কেন হবে?
তাই তো! কেন হবে? হিমি যে সবসময়ে ছেলেতে মেয়েতে বিয়ের কথাই ভাবে ওরা হয়তো সেরকম ভাবে না। এরা তো মেঘলোকের মানুষ, হিমির মতো তো নয়। হিমির একটাই সুবিধে, সে সুমনদের স্বজাত। তারাও বৈশ্য। কিন্তু তাতে যে খুব একটা সুবিধে করা যায় না তাও সে বোঝে।
সুমনের কাছাকাছি আর এক কদমও এগোতে পারেনি হিমি। শুধু চলে যাওয়ার দুদিন আগে তাকে ডাকিয়ে এনে সুমন খুব নরম গলায় বলেছিল, তুমি বেশ ভাল মেয়ে। ভাল করে লেখাপড়া করো, গান শেখো। নিজেকে ছোটো করে রাখতে নেই। আমি আবার যখন আসব তখন যেন তোমাকে অন্যরকম দেখি।
এটা প্রেমের কথা কিনা তা অনেক ভেবেও পরিষ্কার হয়নি হিমির কাছে। সুমন কি বলতে চাইছিল যে, এরকম হিমিকে নয়, হিমি যদি আরও একটু তার মনের মতো হয় তাহলে সে হিমিকে ভালবাসতেও পারে? তাই বলতে চেয়েছিল সুমন?
তার পর থেকে হিমি একটু অন্যরকম হিমি হওয়ার চেষ্টা করেই যাচ্ছে। হারমোনিয়াম নিয়ে ভোরবেলা বসে গলা সাধে। পান্নার কাছে গান শিখতে যায়। পড়াশুনোয় খুব মন দিয়েছে সে যদিও ফল ফলতে শুরু করেনি। মুখে দুই মাখলে নাকি ভাল, তাই সে আজকাল মুখে মাঝে মাঝে টক দই মাখে। তাদের ব্যায়ামের দিদিমনি তাদের মাঝে মাঝে বলে, ফিটনেসই হচ্ছে আসল সৌন্দর্য। যারা কসমেটিক মেখে সুন্দর হতে চায় তারা বোকা। ভাল, ছিপছিপে শরীর, সতেজ চামড়া, চলায় ফেরায় ছমছমে ভাব, চটপটে হাত পা, ভাল দাঁত, ভাল চুল এসবই হল আসল সৌন্দর্য। আর সঙ্গে চাই ব্যক্তিত্ব।
অত শক্ত শক্ত কথা তার মাথায় থাকে না। তবে সে আজকাল স্কিপিং করে, নাচের ক্লাসে যায়। এসব করে সে খানিকটা খানিকটা এগিয়েছে কিনা তা অবশ্য বুঝতে পারে না।
একদিন সে ব্যায়ামের দিদিমনিকে জিজ্ঞেস করল, ব্যক্তিত্বটা কী জিনিস দিদিমনি?
নিজের মতামতকে শ্রদ্ধা করাই হল ব্যক্তিত্ব। অন্যের কথায় বা পরামর্শে ঢলে পড়তে নেই। সব সময়ে হাঃ হাঃ হিঃ হিঃ করতে নেই, বিপদে পড়লে মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। এইসব আর কী।
নিজের মতো করে হিমি এসবও যে প্রাকটিস করছে না তা নয়। কিন্তু কতটা কী ফল হচ্ছে তা বুঝতে পারছে না। এখনও কেউ মুগ্ধ চোখে তাকায়নি তার দিকে। কেউ বাহবা দিয়ে বলেনি, বাঃ রে, তোকে তো বেশ দেখাচ্ছে! সে যে একটু হলেও বদলে গেছে সেটাও কেউ লক্ষ করেনি আজও।
বাহবা না পেলে সেই কাজটা করে যেতে উৎসাহ থাকে কারও?
এখন সে সুমনের অপেক্ষায় আছে। যার জন্য এত করা সে যদি একটু নরম চোখে তাকে খুঁটিয়ে দেখে একটুখানিও খুশি হয় তাহলেই ঢের।
কিন্তু সে যে কবে আসবে, কখনও আসবে কিনা তা জানবে কী করে হিমি? কাউকে জিজ্ঞেস করতে তার ভয় হয়, বুক ঢিবঢিব কবে। লজ্জার মাথা খেয়ে মরণকে জিজ্ঞেস করলে মরণ শুধু বলে, আমার দাদার কত কাজ! কী করে আসবে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন