শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
লোকটার সাহস এবং স্মার্টনেস দেখে অবাক হন অমল। একজন সৎ ও সাহসী লোকের যে-গুণগুলো থাকে আজকালকার বদমাইশরাও কি সেইসব গুণ অর্জন করছে নাকি? অন্যের ফ্ল্যাটে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে ঢুকে অন্যের বিছানায় পরস্ত্রীর সঙ্গে ফুর্তি করতে গিয়ে ধরা পড়ে গেছে। পরিস্থিতি ওর সম্পূর্ণ প্রতিকূল। এই অবস্থায় লোকে ঘাবড়ে যায়, তোতলায়, উলটোপালটা মিথ্যে কথা বলে, হাতে- পায়ে ধরে বা কাকুতি-মিনতি করে। এ তো অকুতোভয়, বিন্দুমাত্র ঘাবড়ায়নি এবং বেশ হিসেব করে তেজের সঙ্গে মুখে মুখে জবাব দিচ্ছে! এর তো পিঠ চাপড়ে দেওয়া উচিত।
আর একটা হতাশার চড় তুলেছিল বুডঢা, অমল গিয়ে তাকে আটকাল। বলল, এসব করা ঠিক নয়। ঘরে যা, আমি দেখছি।
বুডটাকে না আটকালে বুডঢা হয়তো আবার মারত। সেটা বুদ্ধিমানের কাজ হত না। অবাঙালি ছেলেটা বুডঢার চেয়ে অনেক লম্বা এবং অ্যাথলেটিক চেহারার মানুষ। উলটে সে বুডঢাকে মারলে বিপদ ঘটবে। মারপিট ব্যাপারটা অমল একেবারেই সহ্য করতে পারে না।
স্কাউড্রেল! ইতর! বদমাশ! বলে গালাগাল দিতে দিতে বুডঢা গিয়ে তার ঘরে ঢুকে একটা বেসবল ব্যাট হাতে করে বেরিয়ে এল।
লোকটা অমলের দিকে সটান তাকিয়ে বলল, আপনার ছেলেকে ঝামেলা করতে বারণ করুন। আই অ্যাম সরি। আমি জানতাম এ-ফ্ল্যাট এসব কাজে ভাড়া দেওয়া হয়।
অমল শান্ত থাকার চেষ্টা করছিল, কিন্তু উত্তেজনায় তার গলা কাঁপছে এবং স্বরভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে। সে বলল, আপনি এই ফ্ল্যাটে আগেও এসেছেন?
তিন চারবার।
আমি যদি পুলিশ ডাকি?
ছেলেটা অসহায়ভাবে কাঁধ ঝাকিয়ে বলল, ডাকলে ডাকবেন। কী আর হবে বলুন, পুলিশ কিছু টাকা খাবে। তার চেয়ে ইফ ইউ ওয়ান্ট মানি, আই শ্যাল পে ইউ। কেন ওসব ঝামেলায় যাবেন? এটা ফ্যামিলি অ্যাপার্টমেন্ট জানলে আমি আসতাম না।
এ-ফ্ল্যাটের সন্ধান আপনাকে কে দিয়েছে?
উনি। বলে পিউকে ইশারায় দেখিয়ে দিল।
পিউ বেরোতে পারেনি, কারণ, বুডটা দরজাটা আটকে দাঁড়িয়েছিল তখন থেকে। সে দেওয়ালের দিকে সরে গিয়ে নতমুখে দাঁড়িয়ে আছে। চুপচাপ।
এবার মোনা তাকে জিজ্ঞেস করল, এসব কী পিউ?
আই অ্যাম সরি বউদি। এক্সট্রিমলি সরি।
সে তো বুঝলাম। কিন্তু সরি বললেই তো হল না। তুমি কী কাণ্ড করছ তা তুমি জানো?
আমি পরে এসে আপনাকে সব বুঝিয়ে বলব। প্লিজ, এখন এটা নিয়ে চেঁচামেচি করবেন না।
মোনা অত্যন্ত ক্ষোভের সঙ্গে বলল, পিউ, তোমার একটা পাঁচ বছর বয়সের মেয়ে আছে। তুমি একজন হাউজওয়াইফ। এই লোকটাকে কোথা থেকে জুটিয়েছ?
আপনাকে পরে বলব বউদি।
তুমি যেমন মেয়েই হও তাতে আমার কিছু যায় আসে না। কিন্তু ওসব নোংরামি আমার ফ্ল্যাটে কেন?
পুজোর সময় আপনারা অনেকদিন ছিলেন না। তখন বাসুদেব—
ফ্ল্যাট খালি ছিল বলেই সেটাকে অপবিত্র করতে হবে? তোমার বিবেক কি তাই বলে?
পিউ আর কথা বলল না। চুপ করে নতমুখী হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।
মোনা অমলের দিকে চেয়ে বলল, তুমি থানায় ফোন করে দাও। পুলিশ এসে যা করার করুক।
এতক্ষণ বাদে হঠাৎ সোহাগ বলল, আমাদের ফোন তো ডেড।
তাহলে বুডঢা, তুই যা তো দারোয়ানদের ডেকে আন।
স্মার্ট ছেলেটা মোনার দিকে চেয়ে বলল, ম্যাডাম, ব্যাপারটা এত বেশি সিরিয়াসলি নিচ্ছেন কেন?, আমি কলকাতায় একা থাকি। আই নিড গার্লফ্রেন্ডস।
তার জন্য তো হোটেল আছে, গেস্ট হাউস আছে, ব্রথেলস আছে। আমার ফ্ল্যাটে কেন, উড ইউ এক্সপ্লেন?
প্লেসটা মেয়েরাই ঠিক করে। ওটাই সিস্টেম। আপনার ফ্ল্যাটে আসাটা আমার ভুল হয়েছে বুঝতে পারছি। আমি বরং কিছু টাকা দিয়ে যাচ্ছি ফর এনি ড্যামেজ আই হ্যাভ ডান। লেট আস মেক পিস। ফাইফ থাউজ্যান্ড ম্যাডাম? ইজ দ্যাট ওকে?
এবার বেসবল ব্যাটটা নিয়ে আর একবার এগিয়ে এল বুডটা। তাকে ফের ঠেকিয়ে অমল বলল, আপনার নাম কী?
অরুণ মালিক। বিজনেসম্যান। আমার কার্ডটা রেখে দিন বরং। নাথিং টু হাইড অন মাই সাইড। আমি পাটনার লোক। কলকাতায় মাসে দু-চারবার আসতে হয়।
ফুর্তি করতে নাকি?
না স্যার। বিজনেসে আসি।
ছেলেটা তার দামি ওয়ালেট খুলে একটা সুদৃশ্য কার্ড বের করে অমলের হাতে দিয়ে বলল, আই অ্যাম এ জেনুইন পারসন। নট এ ফ্রড। ইচ্ছে করলে আমার মোবাইল ফোন-এ আপনি পাটনার নম্বর ডায়াল করে জেনে নিতে পারেন।
আপনি ম্যারেড?
না স্যার। আমি এখনও ব্যাচেলর। পুলিশ ডেকে যদি ধরিয়ে দেন তাহলেও আমার কিছু হবে না। পুলিশ টাকা পেয়ে ছেড়ে দেবে, কে দেবে না। তার চেয়ে আমি ফাইভ থাউজ্যান্ড অফার করেছি, প্লিজ হাস ইট আপ।
অমলের খুব ক্লান্ত লাগছিল। আজ সে অনেকক্ষণ টানা গাড়ি চালিয়েছে। চাইনিজ ডিনারটাও বেশি খাওয়া হয়ে গেছে। ঘুম পাচ্ছে। সে মোনার দিকে চেয়ে বলল, কী করবে মোনা?
তুমি কী করতে চাও?
বুঝতে পারছি না। এরকম অদ্ভুত সিচুয়েশনে তো পড়িনি কখনও।
ছেড়ে দাও। কিন্তু কাল সকালেই মিস্টার মজুমদারকে তুমি নিজে গিয়ে ব্যাপারটা জানাবে।
হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।
এরপর লোকটার দিকে চেয়ে অমল বলল, নাউ ইউ মে গো।
হিপ পকেট থেকে একগোছা পাঁচশো টাকার নোট বের করেছিল ছোকরা। অমল সেদিকে তাকিয়ে বলল, আপনি খুব টাকায় বিশ্বাসী, না?
ছোকরা থমকে গিয়ে বলল, না স্যার, ব্যাপারটা ওভাবে নেবেন না। আই অ্যাম জাস্ট ট্রায়িং টু কমপেনসেট।
আপনার কি মনে হয় আমরা যে-শকটা পেয়েছি তা টাকা দিয়ে কমপেনসেট করা যাবে? বিশেষ করে আমাদের ছেলেমেয়েরা যে-শকটা পেয়েছে?
আই আম রিয়েলি সরি স্যার। ভেরি সরি।
টাকাটা পকেটে রেখে দিন। অ্যান্ড প্লিজ গেট আউট।
ইয়েস স্যার। অ্যাজ ইউ প্লিজ।
মোনা পিউয়ের দিকে চেয়ে বলল, তুমিও যাও।
মোনা আর অরুণ দুজনে দরজার দিকে নিঃশব্দে এগোল। দরজার কাছ থেকে ফিরে অরুণ হঠাৎ বলল, স্যার, যদি কিছু না মনে করেন তবে একটা কথা বলব?
কী?
শুনলাম আপনাদের ফোনটা খারাপ আছে। আপনি ইচ্ছে করলে আমার মোবাইল ফোনটা রেখে দিতে পারেন। রোমিং সিম কার্ড লাগানো আছে। আমার আরও দুটো মোবাইল ফোন আছে, কোনও অসুবিধে নেই। কয়েকদিন কাজ চালিয়ে নিন, আমি কাল সকালে চার্জারটা পাঠিয়ে দেব।
না, আমার মোবাইল ফোনের দরকার নেই।
রেখে দিন স্যার। আমি কয়েকদিন পরে এসে নিয়ে যাব।
না, আমি আর আপনার মুখ দেখতে চাই না। প্লিজ গো।
অ্যাজ ইউ প্লিজ, বলে ছোকরা বেরিয়ে গেল। পিছু পিছু পিউ।
বুডঢার মুখ রাগে ফেটে পড়ছিল। বলল, তোমরা লোকটাকে ছেড়ে দিলে বাবা? ধোলাই দেওয়ার দরকার ছিল।
কী লাভ? একটা সিন ক্রিয়েট করা হত। লোকটা বদমাশ, কিন্তু ওর চেয়ে বাসুদেব বেশি ক্রিমিন্যাল। আর এই পিউ।
সোফায় বসে মোনা ক্লান্ত স্বরে বলল, আমার শরীর ভীষণ খারাপ লাগছে। বোধহয় প্রেশার বেড়ে গেছে।
সোহাগ গিয়ে তার মায়ের পাশে বেড়ালের মতো গুটিসুটি হয়ে বসে মাথায় হাত বোলাতে বোলাতে বলল, চলো আমার বিছানায় একটু শুয়ে থাকবে। ইউ লুক সিক!
ঘেন্নায় গা রি রি করছে। এই বেডরুমে আজ আর আমি ঢুকতেই পারব না। মা গো! কী জানোয়ার হয়ে গেছে মানুষ! আমি এখনও বুঝতে পারছিনা, পিউ এরকম কাজ কী করে করতে পারে। দেখা হলে এমনিতে তো কত ন্যাকা ন্যাকা কথা!
এসব নিয়ে এখন ভাবতে হবে না। একটা সেডেটিভ খেয়ে শুয়ে থাকো। টেক রেস্ট।
মোনা উঠে অমলের দিকে চেয়ে বলল, বাসুদেব এখনও ফিরল না। ও ফিরলে আমাকে ডেকো তো।
অমল বলল, বাসুদেবের ফেরার চান্স খুব কম। আমরা যে এসে গেছি তা ও হয় দারোয়ানদের কাছে জেনে যাবে না হয় তো গ্যারাজে গাড়ি দেখে বুঝবে। সুতরাং হি উইল স্ক্র্যাম।
কী সাংঘাতিক শয়তান বলো তো!
তাই তো দেখছি।
তুমি বরং বাইরের ঘরে সোফাতেই শুয়ে রাতটা কাটিয়ে দাও। কাল বেডরুম ভাল করে ডেটল ফিনাইল দিয়ে পরিষ্কার না করিয়ে ও-ঘর আমি ব্যবহার করব না। ওয়াশিং মেশিনে চাদর বালিশের। ওয়াড় সব কাচতে হবে।
হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে। তুমি সোহাগের ঘরে গিয়ে ঘুমিয়ে থাকো।
মোনা সোহাগের ঘরে গিয়ে শুল।
বুড়ঢা বলল, বাবা, সোফায় বরং আমি শুচ্ছি, তুমি আমার বিছানায় শুয়ে থাকো।
আরে না। আমার ঘুম চটে গেছে। আমি বরং বসে একটু বই-টই পড়ি, তুই শুয়ে পড় গিয়ে।
সবাই শুয়ে পড়ল। ঘুমিয়েও পড়ল বোধহয়।
একা অমল বাইরের ঘরে সোফায় অনেকক্ষণ বসে রইল। নৈতিক অধঃপতনের কথাই ভাবছিল সে। অনেক বছর আগে সে কি ওই অরুণ মালিকের চেয়ে উচ্চতর মানুষ ছিল? এক দুরন্ত দুপুরের স্মৃতি যেন হাউড় বাতাসের মতো ধেয়ে এসে তার শ্বাসনালি আটকে দিচ্ছিল। তার হাতে একটি প্রস্ফুটিত ফুল্ল কুসুম ঝরে পড়ে গিয়েছিল। এক সুন্দরকে মলিন করে দিয়েছিল সে।
পতিতাগমনের অভ্যাস তার তৈরি হয়েছিল ইনজিনিয়ারিং পড়ার সময়েই। তারপর পারুল তাকে প্রত্যাখ্যান করায় প্রতিহিংসায় পাগলের মতো হয়ে সে আরও ভেসে গিয়েছিল। আজ মধ্যবয়স্ক, শান্ত ও নির্জীব বটে সে, কিন্তু অনেক প্রায়শ্চিত্তই তার বাকি।
তার কাল অতিক্রান্ত। অরুণ মালিকের মতো এ-যুগের লম্পটরা লুকোছাপার ধার দিয়েও যায় না। তাদের গোপন করার মতোও কিছু নেই। ধরা পড়লেও তারা চোখে চোখ রেখে দিব্যি ঠান্ডা মাথায় কথা কইতে পারে। এ-বিদ্যে অমলের নেই। আজ একটি ঘটনার গ্লানি তার গায়ে এঁটেল মাটির মতো লেগে আছে।
জেনারেশন গ্যাপটা বড্ড বিশাল। মাত্র কুড়ি বছরের তফাতে এ-দেশের মানুষ কত পালটে গেছে।
তার অন্যমনস্কতার সুযোগে চোখের সামনেই মানুষ কতটা পালটে গেছে তার প্রমাণ অমল পেল পরদিন সকালে।
পিউয়ের স্বামী সুহাস মজুমদার একজন চোখা চালাক মধ্য ত্রিশের লোক। বেশ স্মার্ট হাসিখুশি। ওদের ফ্ল্যাটে প্রায়ই পার্টি-টার্টি হয়। তার একটা কনসালটেনসি ফার্ম আছে বলে অমল জানে। তবে সেটা কীসের কনসালটেনসি তা জানা নেই। একখানা ফিয়াট গাড়ি আছে। সুতরাং পয়সাওলা লোক। বলেই মনে হয়। এইসব তথ্য দিয়ে একটা মানুষ সম্পর্কে কোনও অঙ্কই মেলানো যায় না।
অঙ্কটা আজ সকালে আরও বিপথে চলে গিয়ে গোলমেলে হয়ে দাঁড়াল।
অমল মুখোমুখি সুহাসকে ব্যাপারটা বলতে সংকোচ বোধ করছিল বলে সকালে কাছে-পিঠের একটা বুথে গিয়ে ফোন করল।
সুহাসের আহ্লাদিত গলা বলে উঠল, হেল্লো! মজুমদার হিয়ার।
সুহাসবাবু, আমি অমল রায় কথা বলছি।
গলায় আরও একটু আহ্লাদ মিশিয়ে সুহাস বলল, আরে হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন। কী খবর?
ইট মে বি শকিং টু ইউ। কীভাবে বলব তা ভেবে পাচ্ছি না। কিন্তু বলাটাও দরকার।
আরে, সংকোচ করছেন কেন? বলেই ফেলুন না।
ইট ইজ রিগার্ডিং ইওর ওয়াইফ পিউ।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, বলুন।
আমরা কলকাতায় ছিলাম না।
হ্যাঁ, আপনারা তো উইক এন্ডে কোথায় একটা র্যানচ হাউসে যান বলে শুনেছি।
র্যনচ হাউস নয়, আমাদের গ্রামে যাই।
দ্যাটস গুড। তারপর বলুন।
কাল একটু আন-এক্সপেকটেডলি আমরা রাত বারোটা নাগাদ ফিরে আসি। এসে দেখি আমাদের বেডরুমে পিউ আর একটি ছেলের সঙ্গে শুয়ে আছে।
সুহাস মজুমদারের শক অ্যাবজর্ভারগুলো বোধহয় খুবই ভাল। বিন্দুমাত্র না চমকে খুবই আপসসাসের ভান করে একটা চুকচুক জাতীয় শব্দ করে সে বলল, দ্যাটস ব্যাড, ভেরি ব্যাড।
আপনি কি কাল রাতে বাড়িতে ছিলেন না?
ছিলাম। তবে নট ইন মাই সেনসেস। বুঝতেই তো পারছেন। তাজ-এ পার্টি ছিল। ড্রাইভার ধরে ধরে এনে ফ্ল্যাটে তুলে দিয়ে যায়।
বলে খুব আগ্লাদের হাসি হাসল সুহাস মজুমদার।
আপনার জানা দরকার যে ছোকরার নাম অরুণ মালিক।
ও। ইটস ওকে মিস্টার রায়। আমি দেখছি।
সুহাসবাবু, আপনার কথা শুনে মনে হচ্ছে, ব্যাপারটা আপনি গায়ে মাখছেন না।
সুহাস মজুমদার একটু চুপ করে থেকে বলল, পিউ তো একজন স্বাধীন মহিলা মিস্টার রায়, তাই না?
তাই নাকি? স্বাধীন মহিলা কাকে বলে আমি অবশ্য জানি না। তাদের কি লাভার নিয়ে অন্যের ফ্ল্যাটে অনধিকার প্রবেশ করে ফুর্তি করার স্বাধীনতা আছে?
আই অ্যাম সরি ফর দ্যাট। কিন্তু কমপেনশেসন দিলে চলবে?
তার মানে?
আরে মশাই, উই আর নাউ ইন এ পারমিসিভ সোসাইটি। এসব কি কেউ মাইন্ড করে?
আপনি না করলেও আর কেউ যে করবে না তা তো নয়।
সে যাই হোক, মিস্টার রায়। আমরা দুজনেই খুব দুঃখিত।
আমার সন্দেহ হচ্ছে পিউ যা করেছে তা আপনার অজানা ছিল না।
বললাম তো মিস্টার রায়, পিউ একজন স্বাধীন মহিলা, আমার কেন বাঁদি তো নয়। আমিও নই তার কেনা গোলাম। উই হ্যাভ আওয়ার পারসোন্যাল লিবারটিজ।
অবশ হাত থেকে প্রায় খসেই পড়ে যাচ্ছিল ফোনটা। না, দুনিয়া তাকে এক জায়গায় বসিয়ে রেখে অনেক দূর এগিয়ে গেছে। স্ত্রীর ব্যাভিচারের খবরেও যে-মানুষ দেবশিশুর মতো নিরুদ্বেগ ও অবিচল থাকে তার কাছে কি অমলের অনেক কিছুই শেখার নেই?
সে নিজেকেই প্রশ্ন করল, ব্যাপারটা কী?
অঙ্কটা যে মিলবে না তা সে জানত, কিন্তু এতটাই গরমিল হবে বলে বুঝতে পারেনি। খানিকক্ষণ ভ্রু কুঁচকে থেকে অমল হঠাৎ হেসে ফেলল একা একাই। সাহেবরা অনেক বেশি পারমিসিভ বটে, কিন্তু তাও এতটা সহ্য করে না। পৌরুষে লাগে।
বাড়ি ফিরে অফিসের জন্য তৈরি হচ্ছিল অমল। বাসুদেব না থাকায় আজ মোনা আর সোহাগ রান্নায় নেমেছে। এজেন্সিকে ফোন করে দেওয়া হয়েছে, তারা কাজের লোক পাঠিয়ে দেবে। আজ সকালেই তারা স্থির করেছে আর উটকো কাজের লোক রাখা হবে না। এজেন্সির লোক বরং ভাল, কিছু করলে এজেন্সি দায়ি থাকবে।
মোনা তাকে খাবার দিতে এসে বলল, একটু আগে পিউ এসেছিল।
তাই নাকি? কী চায়?
ভিতরে আসেনি। দরজা খুলে দেখি, দাঁড়িয়ে আছে। পরনে নাইটি। মুখেচোখে লজ্জা সংকোচের বালাই নেই। বলল, কাল আমি একটা জিনিস ফেলে গিয়েছি। নিতে এলাম।
কী জিনিস?
বলল, আংটি। আমি বললাম, ও-ঘরে আমরা এখনও ঘেন্নায় ঢুকিনি। আজ ঘর পরিষ্কার করা হবে। তখন পাওয়া গেলে পাঠিয়ে দেব।
আর কিছু বলল না?
মনে হয় বলতে চাইছিল। আমি মুখের ওপরেই দরজা বন্ধ করে দিয়েছি। তুমি বরং অন্য কোথাও ফ্ল্যাট দেখ। এই ঘটনার পর আমার আর এখানে ভাল লাগছে না।
কেয়াতলার মতো ভাল জায়গা কোথায় পাবে? আর এসব এলিমেন্ট সব জায়গাতেই আছে।
মোটেই না। এসব মেয়েকে কী বলে জান?
জানি। হাফ গেরস্ত।
হ্যাঁ। অনেক মেয়ে বউ আছে যারা পার্ট টাইম প্রস্টিটিউশন করে সংসার চালায়। কিন্তু পিউরা তো তা নয়। ওদের পয়সার অভাব নেই।
কে বলল নেই?
আছে! দেখে তো মনে হয় না। সুহাস মজুমদারের নাকি অনেক পয়সা শুনতে পাই।
পয়সা থাকলে কী হবে? অভাব তো মনে। পয়সার অভাব থেকে তো পয়সার অভাব আসে না। আসে মন থেকে।
সুহাস তোমাকে কী বলল?
খুব সারপ্রাইজিং কথাবার্তা বলল।
কীরকম?
মনে হল, সবই জানে। অবাক হল না।
দেখ তো, হয়তো বউ ভাঙিয়ে কাজ আদায় করে নিচ্ছে। পুরুষমানুষরা সব পারে।
হ্যাঁ, এবার অঙ্কটা মিলে গেল অমলের। তাই তো! এরকম তো হতেই পারে। অরুণ মালিক তো সুহাস মজুমদারের একজন কাস্টমারও হতে পারে। আর বিজনেসের ব্যাপারে মেয়েদের কাজে লাগানো নতুন কিছু নয়।
আজ বাজার করল কে বল তো!
বুডঢা।
বুডঢা বাজার করতে পারে বুঝি?
করল তো! শুধু পরিমাণটা একটু গোলমাল করেছে। পাঁচশো গ্রাম উচ্ছে নিয়ে এসেছে। মাছটা ভালই কিনেছে।
এইভাবেই তারা চারজন প্রাণী ক্রমে আরও একটু কাছাকাছি হচ্ছে বলে মনে হয় অমলের। আক্রমণ প্রতি-আক্রমণের ব্যাপারটা কমছে, উদাসীনতা বা উপেক্ষা কমছে। একটা ঘরের মধ্যে যে কত কুরুক্ষেত্র লুকিয়ে থাকে!
অফিস থেকে ফিরে অমল দেখল একজন মধ্যবয়স্কা গ্রাম্য চেহারার মহিলা কাজে বহাল হয়েছে। বেতন আটশো টাকা। মুখখানা দেখে ভালমানুষ বলেই মনে হয়। বাসুদেব ফিরে আসেনি, তবে তার দেশের একজন লোক এসেছিল। সে খবর দিয়েছে, বাসুদেবের মায়ের খুব অসুখ। খবর পেয়ে সে দেশে চলে গেছে। সে আর কাজ করবে না। তার জিনিসপত্র আর বকেয়া বেতন যেন লোকটার হাতে দেওয়া হয়। মোন তাকে বলে দিয়েছে, বাসুদেবের নামে পুলিশে ডায়েরি করা হয়েছে, সে এলেই পুলিশ তাকে ধরবে। টাকা-পয়সা বা জিনিস কিছুই দেওয়া হবে না।
রাতে দুজনে এক বিছানায় শোয়ার পর মোনা বলল, জান, আমার এখনও কেমন যেন ঘেন্না করছে।
ঘেন্নার কী আছে? ওরা তো আদিম নরনারীর পবিত্র কাজটাই করছিল।
পবিত্র কাজ বুঝি? মুখে আটকাল না বলতে?
তা নয়তো কী? ওর ভিতর দিয়েই সন্তান আসে।
ওরা তো আর সেজন্য অসভ্যতা করছিল না।
তা অবশ্য ঠিক। ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলে?
হ্যাঁ।
কী হল?
আজকালকার ডাক্তাররা যা করে। একগাদা টেস্ট করাতে বলল।
কিন্তু ডাক্তার তো আজই বিদেশে চলে যাচ্ছে বলছিলে।
হ্যঁ। তবে এক মাসের জন্য।
ততদিন অপেক্ষা করতে হবে? বাজারে কি ডাক্তারের অভাব?
আসলে একে একজন রেফার করেছিল।
কী হয়েছে তোমার?
মোনা একটু হাসল। অমলের গলাটা দুহাতে জড়িয়ে ধরে বুকে টেনে নিয়ে বলল, বউকে নিয়ে পুরুষের দুশ্চিন্তা কখন শুরু হয় জান?
কখন?
বুড়ো হলে। তাই বলি, তুমিও বুড়ো হচ্ছ নাকি?
তা তো হচ্ছিই। কী হয়েছে তোমার?
হয়তো কিছুই নয়।
হয়তো কেন?
পরীক্ষা করলে জানা যাবে।
আমাকে বলতে চাইছ না কেন?
ইউটেরাসে টিউমারিক গ্রোথ বলে আলট্রাসোনোতে ধরা পড়েছে।
বিপজ্জনক কিছু?
কে জানে কী। বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল মোনা।
এটা এমন কিছু গোপন করার মতো ব্যাপার তো ছিল না। তাহলে আমার কাছে গোপন করছিলে কেন মোনা?
একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিল। তোমার সঙ্গে একটা দূরত্ব ছিল তো। তখন সব কথা চেপে রাখতাম। সেই থেকে অভ্যাসে দাঁড়িয়ে গেল।
মোনাকে হঠাৎ প্রগাঢ় আলিঙ্গনে বেঁধে অমল বলল, কাছে এসো, আরও কাছে। কত কাছে আসতে পার।
এ বাবা! দম বন্ধ হয়ে আসছে যে! পাগলটা কোথাকার।
অমলের মনে হল, এত কাছে, তবু কি দূরত্ব নেই?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন