শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
প্রথম দৃশ্য। বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক জীবনের উপান্তে পৌঁছে গেছেন। জরাজীর্ণ শরীর, বিরলকেশ মাথা, বেশবাসের ঠিক নেই। মধ্য রাতে বৈজ্ঞানিক একটি পুরনো, প্রকাণ্ড, কীটদষ্ট, জীর্ণ পুঁথির ওপর ঝুঁকে বসে আছেন। উত্তেজনায় তাঁর হাত-পা কাঁপছে, চোখ বারবার ঝাপসা হয়ে আসছে অতি পঠনের ফলে, বুক ধড়ফড় করছে আবেগে। জরাজীর্ণ এই প্রাচীন পুঁথির ভিতরেই তিনি নানা সংকেত পেয়ে যাচ্ছেন এবং জীবনের বহু সাধনা, অধ্যবসায়, অনেক বিনিদ্র রাত্রি ও বিশ্রামবিহীন দিন কাটিয়ে অবশেষে তিনি তাঁর অভীষ্টের কাছাকাছি পৌঁছে গেছেন প্রায়। এই বিরল, অজ্ঞাত পুঁথির ভিতরেই লুকোনো রয়েছে মানুষের অমরত্ন লাভের বীজ। আর কয়েকটি পৃষ্ঠা অতিক্রম করলেই সেই বাতিঘর, যা মৃত্যুর অন্ধকার মহাসাগরে মানুষকে অনন্তকাল বেঁচে থাকার গুপ্তমন্ত্রের সন্ধান দেবে।
একটা মাছি বিরক্ত করছে বারবার। নাকের ওপর, চোখের সামনে ঘুরে ঘুরে যাচ্ছে, টাকের ওপর বসে সুড়সুড়ি দিচ্ছে। বৈজ্ঞানিক বিরক্ত হয়ে পতঙ্গ নিধনের জন্য চামড়ার ফলক লাগানো শলাকাটি তুলে ফটাস করে মাছিটাকে টেবিলের ওপরে মেরে ফেললেন। অতি ব্যগ্রতায় ঝুঁকে পড়লেন পুঁথির ওপর।
একটা বাতাস এল জানালা দিয়ে। দমকা বাতাসের ঝটকায় পুঁথির জীর্ণ পাতা পট করে উলটে গেল। বৈজ্ঞানিক বিরক্ত হয়ে ধমক দিলেন, থামো! এ সময়ে বিরক্ত কোরো না।
দ্বিতীয় দমকা হাওয়াটি আরও একটু জোরালো। ফড়ফড় করে পুঁথির পাতা উলটে গেল কয়েকটা, বৈজ্ঞানিকের নোটবই পড়ে গেল মেঝের ওপর। কলম গড়িয়ে যেতে লাগল।
বৈজ্ঞানিক ধমক দিলেন, এসব কী হচ্ছে এ সময়ে?
তৃতীয় দমকা বাতাসটা এল হা-হা রবে প্রবল ঝঞ্ঝার বেগে, জানালা দরজার কপাট প্রবল ঝাপটায় আর্তনাদ করে উঠল। বৈজ্ঞানিক পাগলের মতো উঠে জানালা বন্ধ করতে গেলেন আর তখনই লুঠেরা বাতাস জীর্ণ পুঁথির পাতার বাঁধন ছিন্ন করে উড়িয়ে নিয়ে যেতে লাগল। বিপরীত জানালা দিয়ে কাটা ঘুড়ির মতো উড়ে যাচ্ছে পাতাগুলি, অমূল্য পাতাগুলি। বৈজ্ঞানিক আর্তনাদ করে উঠলেন, থামো ছিন্নপত্র, স্থির হও! আমার কাজটুকু শেষ করতে দাও দয়া করে।
কেউ শুনল না তাঁর কথা। বাইরের অন্ধকার মুক্তাঞ্চলে পাতাগুলি উড়ে যাচ্ছে। বৈজ্ঞানিক পাগলের মতো দরজা খুলে ছুটে গেলেন বাইরে। অসহায় চোখে চেয়ে দেখলেন, মহার্ঘ পাতাগুলি অন্ধকারে কোন অদৃশ্য ঠিকানায় ভেসে চলে যাচ্ছে, গাছের মগডালে, পুকুরের জলে, বিছুটি বনে, আকাশে। বজ্রপাত হল, মেঘ ডেকে উঠল গম্ভীর কণ্ঠস্বরে, প্রবল বৃষ্টি ছুটে এল তার অসংখ্য খরসান বল্লমে চতুর্দিক বিদ্ধ করতে করতে। বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক বজ্রাহতের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন।
শরীর কেঁপে উঠল বয়সের শীতে। বিধ্বস্ত বৈজ্ঞানিক ফিরে এলেন ঘরে। স্মৃতিভ্রংশ, স্থাণুর মতো বসে রইলেন নিজের আসনে। হাতে একটি পানীয়পাত্র। সেটি মুখে তুলতে ভুলে গেছেন। তাঁর চোখের জল ফোঁটা ফোঁটা ঝরে পড়ছে পাত্রের ভিতরে।
দ্বিতীয় দৃশ্য। অন্ধকার মঞ্চে একটি নারীকণ্ঠ চিৎকার করে উঠল, আমি শ্রেষ্ঠীকন্যা অম্বালিকা। দুষ্কৃতীরা অপহরণ করে নিয়ে গিয়েছিল আমাকে। নগরবাসীগণ, তোমরা অবহিত হও, আমার পিতা এক কোটি টাকা মুক্তিপণ দিয়ে আমাকে মুক্ত করেছেন। দেখ, আমি অম্বালিকা, এক মহার্ঘ মেয়ে। আমার দাম কোটি টাকা।
মঞ্চ আলোকিত হল। গাছতলায় দুটি কাঙাল ভিখিরি মেয়ে বসে আছে। কিশোরী। মঞ্চের মাঝখানে একটি বেদির ওপর দাঁড়িয়ে শ্রেষ্ঠীকন্যা অম্বালিকা হাত তুলে জনতার অভিনন্দন গ্রহণ করছে।
কাঙাল মেয়েদের একজন আর একজনকে বলে, হ্যাঁ লা দিদি, এক কোটি টাকা কত টাকা রে?
তা কী জানি! হাজার টাকা অবধি জানি, তা সেও অনেক টাকা। গুণে শেষ করা যায় না।
আর মুক্তিপণটা কী বল তো!
ওই তো, একজনকে ধরে নিয়ে যায়, তারপর টাকা আদায় করে ছেড়ে দেয়।
ছোট মেয়েটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আমাদের কেউ ধরে নেবে না কখনও।
সে কথা বলিসনি, আমাদেরও মাঝে মাঝে ধরে বইকী। ভিক্ষে বা বেশ্যাবৃত্তি করাতে নিয়ে গিয়ে লাগায়। এই যে আমাদের রোগাভোগা, কালো চেহারা, মেয়ে-শরীর বলে মনেই হয় না, এই শরীরেরও কিছু ব্যবহার আছে। মেয়ে বলেই একটু-আধটু কাজে লাগি আজও। দুখানা রুটি একটু গুড় খাইয়ে আমাকেও একজন আধবুড়ো লোক ভোগ করেছিল।
আমাকে ভোগ করেছিল একজন মাতাল। আমার তুচ্ছ শরীর নিয়ে সে যখন ব্যস্ত ছিল তখন আমি তার পকেট থেকে টাকা তুলে নিই।
শ্ৰেষ্ঠীকন্যা অম্বালিকাকে ঘিরে ধরেছে সাংবাদিকরা। একজন বাচাল সাংবাদিক বলল, মুক্তির জন্য অভিনন্দন অম্বালিকা। দয়া করে বলুন, দুষ্কৃতীরা আপনাকে ধর্ষণ করেনি তো!
অম্বালিকা অবিচলিত হয়ে বলল, আমি এ কথার জবাব দেব না। আমি শুধু বলতে চাই, মুক্তি কীসের? কেমন মুক্তি? এক বন্দিদশা থেকে আর এক বন্দিদশায় গমন করা ছাড়া মেয়েদের কোনও মুক্তি কি কোথাও আছে? ভদ্রমহোদয়গণ, ওই দেখুন, দক্ষিণ দিকে একটু দূরে ওই দাঁড়িয়ে আছেন আমার প্রেমিক, আমি ওঁর বাগদত্তা। যখন আমাকে হরণ করা হয় তখন নগর-উদ্যানে মনোরম এক অপরাহ্ণে আমি ও আমার প্রেমিক বিশ্রম্ভালাপে রত ছিলাম। গদগদ ভাব, পরস্পরের শ্বাসবায়ুতে ঘটে যাচ্ছিল প্রগাঢ় ভালবাসার আশ্চর্য সংক্রমণ। সেই সময়ে সশস্ত্র দুষ্কৃতীরা অস্ত্র উদ্যত করে আমাদের ঘিরে ফেলে। না, আমার প্রেমিক কোনও প্রতিরোধ করেননি। আত্মরক্ষা সকলেরই জীবনধর্ম। উদ্যত অস্ত্রের সামনে তাঁর কিছুই করার ছিল না। কোটি টাকা মুক্তিপণ দিয়ে আমাকে মুক্ত করা হয়েছে বটে, কিন্তু দেখুন, আমার প্রেমিকের মুখে কোনও হাসি নেই, আনন্দ নেই। বিষণ্ণ ও দ্বিধাগ্রস্ত মুখে ওই তিনি দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ওই বিষণ্ণতা অকারণ নয়। উনি চেয়েছিলেন এক শুদ্ধ ও অনাঘ্রাতা নারী। কিন্তু দুষ্কৃতীদের ডেরায় কী ঘটেছিল তা উনি জানেন না। আমার শুদ্ধতা নিয়ে উনি আজ বিচলিত, দোলাচলায়মান, দ্বিধাগ্রস্ত। পৌরাণিক সীতাই কখনও সন্দেহপাশ থেকে মুক্ত হননি, আমি তো সামান্যা নারী। ভদ্রমহোদয়গণ, আমি তাই প্রশ্ন করতে চাই, নারীর মুক্তিপণ এক ব্যর্থ প্রয়াস। তার মুক্তিই যে আদপে নেই। বরং ওই দেখুন, গাছতলায় ওই যে দুটি ভিখিরি মেয়ে বসে আছে ওরাও আমার চেয়ে কত স্বাধীন, কত সুখী …
ওলো দিদি, মাগী কী বলছে শুনলি?
ভদ্দরলোকেরা ওরকম কত আজগুবি কথা কয়। আয়, বরং একটু ঘুমিয়ে নিই দুজনেই।
তাই ভাল। জেগে থাকলেই খিদে চাগাড় দেয়।
তৃতীয় দৃশ্য। বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক চারধারে পাগলের মতো পুঁথির নিরুদ্দেশ পাতাগুলি খুঁজছেন। এক-আধটা পেয়ে যাচ্ছেন। হতাশায় মাথা নেড়ে বলছেন, না, না, সব মুছে গেছে। সব মুছে গেছে।
বুড়োটা কী খুঁজছে রে দিদি?
পাগল-টাগল হবে। ছেঁড়া ভেজা কাগজ কুড়োচ্ছে।
বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক এগিয়ে এলেন তাদের দিকে, ওহে, তোমরা একটা পুঁথির কিছু ছেঁড়া পাতা পেয়েছ কুড়িয়ে?
বড় জন হাই তুলে বলল, ঝড়বৃষ্টির সময় কতক উড়ে যাচ্ছিল দেখেছি। কাগজ কুড়িয়ে কী হবে? আমরা কি পড়তে জানি!
মূর্খ বালিকা। কী অমূল্য সম্পদ যে ওই কাগজের মধ্যে ছিল তা তোমরা জান না।
লটারির টিকিট নাকি রে পাগলা-বুড়ো?
তার চেয়ে অনেক বেশি মূল্যবান। ওতে লেখা ছিল মানুষের মৃত্যুর প্রতিষেধক। মৃত্যুহীনতার মোহনায় মানুষকে পৌঁছে দিচ্ছিলাম আমি। বিধি বাম। মৃত্যুকে রোধ করা গেল না।
কী বলছে রে দিদি?
বলছে এমন ওষুধ বের করবে যাতে মানুষ আর মরবে না।
মরণ! একটু আগে ঝড়বৃষ্টির সময় ওই তালগাছে যে বাজটা পড়ল সেটা আমাদের মাথায় পড়লেও কি মরব না?
ওগো ও বিটলে বুড়ো, মানুষ মরবে না তো খাবে কী?
বৈজ্ঞানিক হতবাক হয়ে বললেন, তার মানে?
বলি মানুষকে যে বাঁচিয়ে রাখতে চাও তার খোরাকির জোগাড়টা আগে করে রাখ বাপু।
মূর্খ বালিকা, মৃত্যুর হাত থেকে মুক্তি চাও না তোমরা?
দুই বোন হেসে গড়িয়ে পড়ল। বড় জন বলল, বেঁচে আছি কিনা সেটাই যে টের পেলুম না এখনও। আয় তো বিটলে বুড়ো, গায়ে একটা চিমটি কেটে দেখ তো বেঁচে আছি কিনা।
নাটকের নাম “মুক্তিপণ”। কিংবা ঠিক নাটকও নয়। ঈষৎ নাটকীয় গদ্য। কী এটা, কী সে বলতে চাইছে তা অমল নিজেও জানে না। কিন্তু কাজকর্মের ফাঁকে ফাঁকে তার আজকাল এরকম কিছু কিছু লেখার ঝোঁক চেপেছে। শুরু হয়, কিন্তু প্রায়ই শেষ হয় না। তবে নানা ছদ্মবেশে এসব লেখার মধ্যে সে নিজে ঢুকে যায়, আর চলে আসে পারুল। পারুলের সঙ্গে কখনও আর কেউ মিশে যায়, যেমন তার নিজের আদলেও আসে অন্যের আদল।
অম্বালিকা কি পারুল? না, ওর মধ্যে সোহাগও রয়েছে কিছুটা। কীভাবে যে মিশে গেল দুজন কে জানে। ছয় সাত বছর আগে তাদের কলম্বাস শহরের বাড়ি থেকে উধাও হয়ে গিয়েছিল সোহাগ। তখনও সে নিতান্তই বালিকা। দশ এগারো বছর বয়স। এইলিন নামে একজন ব্রাজিলীয় মেয়ে আসত তাদের বাড়িতে। সে এক এজেন্সির মাধ্যমে বুডঢার বেবি সিটিং-এর কাজ পায়। সেই থেকে যাতায়াত। এইলিন প্রায়ই ব্ল্যাক ম্যাজিক হিপনোটিজম এবং অদ্ভুত সব বিষয়ে কথা বলতে ভালবাসত। ভুডুর প্রতি ছিল অমোঘ আকর্ষণ। সোহাগকে নিয়ে গিয়েছিল সে-ই।
সোহাগকে অপহরণের পরই বাড়িতে ফোন আসত যাতে তার খোঁজখবর করা বা পুলিশে জানানো না হয়। আশ্বাস দেওয়া হত, সোহাগকে নিরাপদে ফেরত দেওয়া হবে। উদ্বিগ্ন অমল আর মোনা পুলিশকে জানায়, কিন্তু তাতে লাভ হয়নি। এইলিনের চিহ্নও খুঁজে পায়নি তারা। দিন সাতেক বাদে এক ভোরবেলায় একটা গাড়ি সোহাগকে বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে যায়। যে সোহাগ ফেরত এল সে যেন ঠিক আগের সোহাগ নয়। একটু গম্ভীর, একটু ভাবুক, একটু বিষণ্ণ আর উদাসীন। অমল আর মোনা এবং পুলিশের লোকেরা তাকে প্রশ্নে প্রশ্নে জেরবার করেছে। সে নানা উলটোপালটা জবাব দিত। রেপ করা হয়েছে কিনা। তার ডাক্তারি পরীক্ষাও হয়। রেপ না হলেও তার গায়ে বিশেষ জায়গায় কয়েকটি উল্কি পাওয়া যায়। পুলিশ বলেছিল, কোনও ধর্মোন্মাদ গোষ্ঠীর কাজ। কথাটা হয়তো মিথ্যে নয়। সোহাগ গোপনে নানা প্রক্রিয়া করত, অদ্ভুত ভাষায় মন্ত্রোচ্চারণ করত এবং কখনও কখনও তার অর্ধচেতন অবস্থা হত। অনেক সময় মধ্যরাত্রে সে নিশি-পাওয়ার মতো সারা ঘর ঘুরে ঘুরে নাচত। মোনা মাঝে মাঝে মারধরও করেছে ওকে। সোহাগের ই-মেল-এ কিছু অদ্ভুত ও দুর্বোধ্য বার্তা আসতে শুরু করেছিল। অমলের কলকাতায় ফিরে আসার কতকগুলো কারণের মধ্যে সোহাগও একটা কারণ।
সোহাগ ফিরল, কিন্তু তার সত্তার খানিকটা অংশ রয়ে গেল অন্য কোথাও, কোনও এক রহস্যময় গোষ্ঠীর কাছে। এখনও সোহাগের ই-মেল মার্কিং করলে সেই সব অদ্ভুত বার্তা পাওয়া যায়। কী যে হল মেয়েটার! কোন বিটকেল মানুষদের পাল্লায় পড়ল তার সমাধান আজও করতে পারেনি অমল রায়।
শ্ৰেষ্ঠীকন্যা অম্বালিকার মধ্যে পারুলই রয়েছে বটে, একটু সোহাগও আছে যেন। আর ওই বৃদ্ধ বৈজ্ঞানিক কি তারই প্রতিচ্ছবি নয়? স্বপ্ন আর সম্ভাব্যতার মধ্যে কী বিপুল ফাঁক? এখন সে মাসে এক কাঁড়ি টাকা মাইনে পায়। দেড় লাখেরও কিছু বেশি। দিল্লি বা বম্বে বা বিদেশে গেলে আরও অনেক বেশি পেত। কিন্তু শুধু টাকা রোজগারের যন্ত্র হওয়ার ইচ্ছে তো ছিল না তার। সে হতে পারত একজন আবিষ্কারক, একজন দার্শনিক বা না হয় একজন কবিই। এখন তার মনে হয় এত টাকাই তার সব সম্ভাব্যতা নষ্ট করে দিল। বানিয়ারা মগজ কিনে আনে, নষ্ট করে দেয়। এর চেয়ে কত ভাল ছিল গবেষণাগার, ভাল ছিল একাগ্র চিন্তার গৃহকোণ।
শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসের এ.সি. চেয়ারকারে বসে অমল রায় কিছুতেই ভারতের শিল্পমন্ত্রীর নামটা মনে করতে পারছিল না। গত কয়েক দিনে অফিসের বিভিন্ন মিটিংয়ে কয়েকবারই নামটা শুনেছিল সে। এখন কিছুতেই নামটা যে কেন মনে আসছে না। মনে করার কোনও জরুরি কারণও নেই। শরতের এই সুন্দর সকালে শিল্পমন্ত্রীর নাম নিয়ে কে-ই বা মাথা ঘামায়? কিন্তু সে ভিতরে ভিতরে অস্পষ্ট একটা তাগিদ টের পাচ্ছে, নামটা তার মনে পড়া উচিত। ইদানীং তার স্মৃতিশক্তি কমে যাচ্ছে। সন্দেহ হয়, এখন ফের মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসলে, স্ট্যান্ড করা তো দূরের কথা, সে আদৌ সেকেন্ড ডিভিশনেও পাস করবে কিনা। আজকাল হঠাৎ যেন বিস্মৃতি এসে বন্ধুর মতো পাশে দাঁড়ায়, মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়, লোপাট করে দেয় মাথার যত প্রোগ্রামিং, যত ডাটা, যত ফাইল। কী যে হয় মাঝে মাঝে। যত দিন পরেই দেখা যোক, চেনা মানুষের মুখ দেখলেই তার নাম ঠিক মনে পড়ে যেত অমলের। মাসখানেক আগে একসঙ্গে ওয়ান থেকে টেন অবধি পড়া সহপাঠী এবং গলাগলি বন্ধু গৌরাঙ্গ যখন তার অফিসে দেখা করতে এসেছিল, কিছুতেই নামটা মনে পড়ল না তার। ঠিক বটে, গৌরাঙ্গর সঙ্গে মাধ্যমিকের পর আর দেখাই হয়নি। তবু তার স্মৃতিশক্তি কখনও এরকম ডিলিট হয়ে যায়নি কখনও। তিনটে ক্ষিপ্র জিনিস ছিল তার। ক্ষিপ্র চিন্তা, ক্ষিপ্র স্মৃতি, ক্ষিপ্র কাজ।
হঠাৎ অমল টের পেল, আজ যেন এ.সি. চেয়ারকারে প্রার্থিত নিস্তব্ধতাটা নেই। বড্ড বেশি কথাবার্তা হচ্ছে চারদিকে। সামনে পিছনে। সুবেশ ও সুভদ্র কয়েকজন এক রকমের স্যুট-পরা তোক আইল দিয়ে ঘন ঘন যাতায়াত করছে। অমল বিরক্ত হয়ে সদ্য কেনা ইংরিজি খবরের কাগজটা খুলে খুঁজতে লাগল, যদি কোথাও ভারতের শিল্পমন্ত্রীর নামটা পাওয়া যায়। খুবই হাস্যকর এই চেষ্টা। কারণ নামটা জানার কোনও প্রয়োজনই নেই তার। কিংবা সূক্ষ্মভাবে আছেও। শিল্পমন্ত্রী নয়, সে খুঁজছে তার স্মৃতির হারানো তথ্যগুলিকে। কেন হারিয়ে যাচ্ছে তারা, কেন উবে যাচ্ছে অকারণে?
আজকাল কি এ.সি. চেয়ারকারে ব্রেকফাস্ট দেওয়া হয়? তাই তো মনে হচ্ছে। সুবেশ ও সুভদ্র স্যুট-পরা লোকগুলো ট্রে-ভর্তি বাক্স সাজিয়ে এনে বিলি করছে, সঙ্গে সিল-করা বোতলে জল। ভাল, বেশ ভাল। এরা এ.সি-র যা ভাড়া নেয় তাতে ব্রেকফাস্ট তো দেওয়াই উচিত। খাবারের আমিষ-গন্ধে অমলের পেটের ভিতরটা কেমন করে ওঠে। সে আজ সকালে এক কাপ কফি ছাড়া কিছুই খেয়ে আসেনি। বাসুদেব ব্রেকফাস্ট করে দিতে চেয়েছিল, তার তখন খাওয়ার ইচ্ছে হয়নি। আজ সকালে কিন্তু ক্লান্ত ও অবসন্ন ছিল অমল। কাল রাতে একটা দুঃস্বপ্ন দেখার পর শেষ রাতে ঘুম আসেনি আর।
দুঃস্বপ্ন! ঠিক দুঃস্বপ্নও বলা চলে না সেটাকে। একটা অন্ধকার গলি। এক প্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে অমল। গলির অন্য প্রান্তে একটা মরা আলোর মলিন চৌখুপি। গোধূলির মতো পাঁশুটে আলো। কেউ কোথাও নেই। ওপরে নিরেট কালো অন্ধকার আকাশ। কিংবা হয়তো আকাশ বলেও কিছু ছিল না। শুধু ওই জনহীন গলিটাই দেখতে পেয়েছিল অমল। ঘেয়ো কুকুর বা রাস্তার বেড়ালও ছিল না, ছিল না দৌড়ে-যাওয়া ইঁদুর কি আরশোলা। এত প্রাণহীন গলি আর কখনও দেখেনি অমল। গলির ও-প্রান্তে ওই পাঁশুটে আলোর চৌখুপিও যেন এক নিষ্প্রাণতা। কোনও যাতায়াত নেই কারও, ছায়া নেই, গাছ নেই, প্রাণ নেই, শব্দ নেই। অমল দাঁড়িয়ে আছে তো আছেই, এক পা-ও এগোনোর সাধ্য নেই তার। আর তার চোখ বেয়ে অঝোরে জল পড়ে যাচ্ছিল।
অন্ধকারের চেয়েও ভয়ংকর ওই পাঁশুটে আলো। সম্মোহিতের মতো চেয়ে থেকে অমল টের পাচ্ছিল, এখানেই সব শেষ। এখানেই মানুষের সব আয়াস ও প্রয়াসের শেষ, সভ্যতার শেষ, মানুষের স্বপ্ন ও সাধ্যের শেষ। আর কোথাও যাওয়ার নেই তার। বৃথা তার বেঁচে থাকা, বৃথা তার দর্শন বিজ্ঞান। এই গলিমুখ আর ওই পাঁশুটে আলোর চৌখুপি এক ভয়ংকর সংকেতের মতো নিশ্চুপে বলে দিচ্ছে, কিছু নেই, আর কিছু নেই।
একটুও বাতাস ছিল না, শ্বাসের শব্দও নয়, জ্যোৎস্না নয়। এত কান্না আসছিল তার। এইভাবে শেষ হয়ে যায় বুঝি সব কিছু?
যখন জেগে উঠল অমল তখন তার আকাশপাতাল জুড়ে ভয়। এত ভয় সে কখনও পায়নি। কিন্তু ভয়ের স্বপ্ন তো নয়! আশ্চর্য! তবে সে এত ভয় পেল কেন? পিপাসায় ব্লটিং পেপার হয়ে গিয়েছিল জিব। ভয় আর অজানা এক হাহাকার ঘুরে বেড়াচ্ছিল তার শূন্য বুকের খাঁচায়। চোখে জল ছিল তখনও। হাত-পা কাঠ হয়ে ছিল।
বারবার স্বপ্নটার কথা ভাবছে। ভাবছে স্বপ্নটার মধ্যে ভয়ের বীজ কীভাবে ছড়ানো ছিল? কোন সর্বনাশের সংকেত ছিল তার মধ্যে? কোন কূট আভাস?
এখনও ভাবছে সে। যদিও একটা স্বপ্নের জন্য এত বিচলিত হওয়ার কোনও মানেই হয় না। স্বপ্নের মধ্যে সত্য থাকে না কখনও। আবার কোনও জটিল প্রক্রিয়ায় হয়তো থাকেও। স্বপ্নটা নিয়ে অনিচ্ছের সঙ্গেও সে হয়তো আরও কয়েকদিন ভাববে।
যে লোকটা খাবারের বাক্স দিচ্ছিল সে অমলের ডান ও বাঁপাশের দুজনকে দুটো বাক্স দিয়ে অমলকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে চলে যাচ্ছিল। অমলের রাগ হল। তাকে কি দেখতে পায়নি নাকি লোকটা! আশ্চর্য তো!
সাধারণত সে যা করে না আজ তাই করে ফেলল অমল। হয়তো হঠাৎ নিজের খিদেটাকে আবিষ্কার করেই সে ধৈর্য হারিয়ে হঠাৎ এগিয়ে যাওয়া লোকটার দিকে হাত বাড়িয়ে বলল, এই যে, এখানে দেননি কিন্তু।
লোকটা একটু বিস্মিত চোখে ফিরে তাকাল তার দিকে। লোকটার মাথায় টাক এবং বেশ ভারী গোঁফ। হঠাৎ একটু হেসে লজ্জিতভাবে বলল, সরি, আপনাকে দেওয়া হয়নি। বলে একটা বাক্স এগিয়ে দিল তার হাতে।
লোকটাকে ক্ষমা করে দিয়ে অমল ফোল্ডিং টেবিলটা নামিয়ে তার ওপর রেখে বাক্সটা খুলল। চমৎকার ব্যবস্থা। বড় একটা পরোটা রোল, দুটো চিকেন স্যান্ডউইচ, ডিমসেদ্ধ, এক টুকরো চিজ, দুটো সন্দেশ, একটা কলা। অমল খেতে খেতে হঠাৎ একটু অস্বস্তিবোধ করছিল কেন যেন। তার মনে হল দুপাশের দুজন যাত্রী তাকে মাঝে মাঝে কৌতূহলের সঙ্গে দেখছে। আইলের ওপাশের সিট থেকেও যেন দুজন একটু ঝুঁকে চকিতে দেখে নিল তাকে। হঠাৎ তাকে ঘিরে একটু নিস্তব্ধতাও ঘনিয়ে উঠল যেন।
হঠাৎ ডানপাশের লোকটা খুব বন্ধুর মতো তাকে জিজ্ঞেস করল, আপনার এজেন্সিটার নাম কী?
অমল বিরক্ত হল। গায়ে-পড়া তোক তার পছন্দ নয়। বলল, আমার এজেন্সি নেই।
ও! লোকটা আর কিছু বলল না।
হঠাৎ যেন বোধবুদ্ধির একটা ঝিলিক জেগে উঠল মাথার মধ্যে। কাণ্ডজ্ঞান ফিরে এল, যখন সে লক্ষ করল, কামরার সবাই ব্রেকফাস্টের বাক্স পায়নি। তার সামনের সিটের অন্তত দুজন, আড়াআড়ি সামনের ডানদিকের সারির তিনজন এবং লক্ষ করলেই, আরও অনেকেই খাচ্ছে না। জলের বোতলটা খুলে দু ঢোঁক জল খেয়ে অমল তার ডানদিকের লোকটাকে জিজ্ঞেস করল, সামথিং ইজ রং, ইজনট ইট! আপনারা কারা?
লোকটা খেতে খেতে মুখ তুলে একটু হেসে বলে, আমরা একটা ইলেকট্রনিক গুডস কোম্পানির সাব এজেন্ট। ইয়ারলি কনফারেন্সে শান্তিনিকেতনে যাচ্ছি।
ইস ছিঃ ছিঃ, আমার বড্ড ভুল হয়ে গেছে—
লোকটা হাসিমুখেই বলল, তাতে কী? ইউ আর ওয়েলকাম—
বিস্তারিত ক্ষমাপ্রার্থনা বা ক্ষতিপূরণের সময় ছিল না। বর্ধমান এসে গেছে। অমল অ্যাটাচি কেসটা তুলে নিয়ে দ্রুত পায়ে আইল পেরিয়ে স্প্রিং-এর দরজাটা ঠেলে বেরিয়ে আসার সময়ে পিছনে, কামরার ভিতর থেকে একটা বড়সড় হাসির রোল শুনতে পেল।
তার কান গরম, লজ্জায় ঝাঁঝা করছে মাথা। একদল ডেলিগেট কনফারেন্সে যাচ্ছে, তাদের জন্য কোম্পানি রাজকীয় ব্রেকফাস্ট আয়োজন করেছে এই সহজ ব্যাপারটা অমল রায়ের মতো বুদ্ধিমান, দুনিয়া-চষা একজন লোক বুঝতে পারল না!
ঘটনাটা হয়তো সামান্যই। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের “গিন্নী” গল্পের সেই ছোট ছেলেটির মতো তার আজ মনে হচ্ছিল, এ ঘটনাটা ওরা কেউ হয়তো কোনওদিনই ভুলতে পারবে না।
লজ্জা, নিজের ওপর বিরক্তি আর রাগ নিয়ে অমল স্টেশনের ফটক পেরিয়ে এল, নিজেকে চোর, লোভী, বেকুব ও অপদার্থ ভাবতে ভাবতে আনমনা অমল তার অ্যাটাচি কেসটার একটা গুঁতো লাগাল একজনকে হাঁটুতে। লোকটা বাপ-রে বলে চেঁচিয়ে উঠতেই অমলের ইচ্ছে হল দৌড়ে পালায়। আজ তার এসব কী হচ্ছে?
সামনে একটা অ্যাবস্ট্রাক্ট মডার্ন আর্ট। অবিশ্বাস্য রিকশার জড়াজড়ি, সাইকেল, গাড়ি, মানুষ, হর্ন, চিৎকার, ধুলো। এই জটিলতার দিকে হতাশভাবে চেয়ে দাঁড়িয়ে রইল অমল। সুশৃঙ্খল লন্ডন শহর থেকে সদ্য ফিরে এসে এই ভিড়ে ভিড়াক্কার, রিকশা-গাড়ি-মানুষের বিশৃঙ্খলা বড় ক্লান্তিকর মনে হয়। এই জটাজাল পার হয়ে বড় রাস্তায় গিয়ে ভিড়ের বাসে ঠেলে ওঠা গন্ধমাদন বহন করার মতোই কঠিন ব্যাপার। অমলের হাল ছেড়ে দিতে ইচ্ছে করে। মনে হয় সে কখনওই কোথাও গিয়ে পৌঁছতে পারবে না।
পৌঁছনোর কোনও তাড়াও নেই তার। ভিড় একটু হালকা হওয়ার জন্য থাম ঘেঁষে সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। নিজের গন্তব্য বিষয়ে সে যেন নিশ্চিত নয়। বউ, ছেলে, মেয়ের প্রতি সাধারণ গৃহস্থের যেমন টান থাকে কেন তার সেরকম নেই তা সে ভেবেও পায় না।
এর মূলে কি পারুল? ওই নামটা তার মনের মধ্যে উচ্চারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই অ্যাড্রেনালিন প্রবাহ বেড়ে যায়। এখনও। বাড়ে অস্থিরতা। আর আচমকা অন্ধ রাগ তাকে ছোবল মারতে থাকে। পারুলকে তার খুন করতে ইচ্ছে করে, আর কাঁদতে ইচ্ছে করে পারুলের জন্যই।
মোনালিসা বিয়ের সাত দিনের মধ্যেই জেনে গিয়েছিল সব কিছু।
নতুন বউয়ের প্রতি আদিখ্যেতার অভাবই মোনালিসাকে হয়তো একটু সন্দিহান করে থাকবে। তারপর উড়ো কথা, ফিসফাস, রটনা এসব থেকেও কিছু আঁচ করে নিয়েছিল। গোয়ায় মধুচন্দ্রিমা যখন নিতান্ত ম্যাড়ম্যাড়ে, রসকষহীন একটা সাইট সিয়িং-এ পর্যবসিত হয়ে যাচ্ছিল তখনই কথাটা তুলেছিল মোনালিসা।
পারুল কে?
পারুল! পারুল একটা বন্ধ দরজা।
দরজা বন্ধ হলেও ওপাশে কেউ তো থাকতেও পারে।
সে আছে। পারুলের কথা নিয়ে আমাদের ভাববার দরকার নেই।
তুমি রবীন্দ্রনাথের মধ্যবর্তিনী গল্পটা পড়েছ?
না। কিন্তু প্লিজ, গল্পটা আমাকে আবার শোনাতে বসো না।
যে মানুষটা অ্যাবসেন্ট তার প্রেজেন্স অনেক সময়ে খুব স্ট্রং হয়ে ওঠে।
এসব তো ফিলজফি।
তাই কি? ফিলজফিও কিন্তু ফ্যালনা নয়।
লিভ পারুল অ্যালোন, প্লিজ মোনা।
তোমার আর আমার মধ্যে পারুল যে বড্ড বেশি ঢুকে বসে আছে।
উত্তেজিত অমল বলেছিল, না, নেই! নেই!
অত জোর দিয়ে বলছ বলেই সন্দেহ হচ্ছে।
পারুলের কথা মনে হলেই আমার মাথায় আগুন জ্বলে ওঠে। ও আমাকে ভীষণ অপমান করেছিল।
আমি পারুলের বিষয়ে আরও একটু জানতে চাই। বলবে?
পারুল একটা নষ্ট মেয়ে।
নষ্ট? কীরকম নষ্ট?
শি ওয়াজ নট ফেইথফুল।
তোমার বোন ছায়া বলছিল, পারুল দেখতে খুব সুন্দর আর খুব ভাল মেয়ে। আমাকে ঠেস দেওয়ার জন্যই বলছিল। কথাটা কি মিথ্যে?
অ্যাপারেন্টলি লোকে ওকে ভালই বলবে।
তুমি বলছ না?
না। পারুল ভাল নয়।
তোমাকে রিফিউজ করেছে বলে?
কেন যে এসব কথা খুঁচিয়ে তুলছ মোনা! অকারণ অশান্তি করে লাভ কী তোমার?
স্বামী আর স্ত্রীর মধ্যে এসব গোপন থাকলে পরে আমাদের অসুবিধে হবে। বরং ফ্র্যাঙ্ক হওয়া ভাল। তাতে আমরা আমাদের প্রবলেমগুলো সর্ট আউট করতে পারব।
তোমাকে নিয়ে আমার কোনও প্রবলেম নেই। আমি তোমাকে ভালবাসি। আমি এখন একজন সুখী মানুষ।
সে তো খুব ভাল কথা। ভালবাসাটা কীরকম জানো? মুখের কথা নয় কিন্তু। কেউ ভালবাসলে সেটা ফিল করা যায়। আমি সেটা ফিল করছি না।
ফিল করছ না, তার কারণ পারুলকে নিয়ে তোমার সন্দেহ দেখা দিয়েছে। সন্দেহ এক মারাত্মক ব্যাধি।
আমি তা জানি। আমার এক কাকিমা স্বামীকে সন্দেহ করত। শেষ অবধি স্বামীর এমন সব অসম্ভব যৌন সম্পর্কের কথা বলত যে আমরা কানে আঙুল দিয়ে পালাতাম। মিথ্যে সন্দেহটাই হল ব্যাধি। আমি তো তোমাকে সন্দেহ করছি না। কাউকে ভালবাসা তো অপরাধ নয়। সন্দেহের কী আছে বল!
এতই ফর্সা ছিল মোনা যে ওর গায়ের তিলগুলো পর্যন্ত তেমন কালো হয়ে উঠতে পারেনি ফর্সা রঙের ঠেলায়। সেগুলো ছিল লালচে বা বাদামি। মুখের একটা খর সৌন্দর্য ছিল। নাকটা পুরুষালি রকমের তীক্ষ্ণ। কিন্তু ওর রূপ চেয়ে দেখার মতো মুগ্ধতা কখনওই অমলকে পেয়ে বসেনি। অসহায় এক দেহভোগের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল মোনার প্রতি তার মনোভাব।
পারুলের কথা তুমি না তুললেই আমি স্বস্তি বোধ করব।
সেটা হবে অভিনয়। পারুলের কথা জেনেও তার কথা কখনও তুলব না সে কি হয়?
অতীত নিয়ে পড়ে থাকলে লাভ কী?
অতীত যে কখনও কখনও বর্তমানকে বিষিয়ে দেয়।
তাহলে কী জানতে চাও বলো!
সব জানতে চাই। বলবে?
কোন একটা উপন্যাসে যেন পড়েছিলাম, একটি মেয়ে তার প্রেমিক সম্পর্কে বলছে, আমরা এক বৃন্তের দুটি ফুল, আমাদের ছিড়িলেন কেন?
এতটা?
হয়তো এতটাই। ছেলেবেলা থেকে চেনাজানা, যাতায়াত। সেই থেকে একটা বোঝাপড়া। পারুলের সঙ্গে আমার বিয়ে হবে এটা সকলেই জানত। অন্যরকম যে হতে পারে এটা ভাবাই যেত না।
তাহলে অন্যরকম হল কেন? কী নিয়ে তোমাদের বনল না?
আমি জানি না।
অন্য কোনও পুরুষ?
আমি জানি না। শুধু জানি হঠাৎ একদিন পারুল আমাকে ঘেন্না করতে শুরু করে।
তাই কি পারা যায়?
হল তো! আমার কিছু করার ছিল না।
তুমি কোনও দোষ করনি?
না। কোনও দোষ করিনি। তুমি বড্ড উকিলের মতো জেরা করছ। জেনে রাখো, এসব ঘটনা আমাকে আর স্পর্শ করে না।
শুনেছি পারুল তার মা-বাবার পছন্দ করা পাত্রকে বিয়ে করেছে।
হ্যাঁ।
ওর বাবা-মা জোর করে বিয়ে দেয়নি তো!
না। ওঁরা ওরকম লোক নন।
ব্যাপারটা অদ্ভুত। তোমাকে হঠাৎ ঘেন্না করার কী হল?
অহংকারীদের অনেক প্রবলেম মোনা।
পারুল কি অহংকারী?
ভীষণ। শি ইজ অলসো এ পিউরিটান।
পিউরিটান! তার মানে কী?
আমাকে কখনও ওর হাতটাও ধরতে দিতে চাইত না।
মাই গড! তাহলে কি তুমি কখনও ওর পিউরিটি নষ্ট করার চেষ্টা করেছিলে?
এ কথায় আতঙ্কিত হয়ে অমল প্রায় আর্তনাদ করে উঠেছিল, না, না। আমি কিছু করিনি।
কথার চক্করে ফেলে সেদিনই মোনা তার মুখ থেকে সত্যটা প্রায় বের করে ফেলেছিল। আর সেইদিন থেকেই এই চালাক, গোয়েন্দার মতো তদন্তে ওস্তাদ, প্রোবিং, ন্যাগিং মেয়েটিকে সে ভয় পেতে শুরু করে। ভয়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘেন্নাও।
যেই ঘেন্না শুরু হল অমনি অমলের নজরে পড়তে লাগল অদ্ভুত সব ব্যাপার। মনে হত, ওর গালে কি মেচেতা আছে? মাথার চুল তেমন ঘেঁষ নয় তো, টাক পড়ে যাবে কি? নীচের ঠোঁটটা একটু ঝুলে-পড়া না? ইস্, দাঁতের সেটিং কী বিচ্ছিরি! বেশ মোটা কিন্তু। লোকে কি ওর মুখখানা একটু চোয়াড়ে দেখে না? হাতে বেশ লোম আছে তো! আর ও কি একটু গোঁফের রেখা?
অথচ অমল জানে নিরপেক্ষ বিচারে তা নয়। মোনা বেশ সুন্দরী। খুবই সুন্দরী। ওর এত বেশি চোখধাঁধানো রূপটাও যেন একটা অপরাধ বলে মনে হত তার।
জার্মানিতে বা ইংল্যান্ডে বা আমেরিকায় তাদের বিবাহিত জীবন যখন পুরনো হচ্ছে তখন তাদের ঝগড়াও হতে লাগল খুব। মোনা মাঝে মাঝেই বলত, তোমাকে বিয়ে না করে পারুল ঠিক কাজই করেছে। পারুলই ঠিক চিনেছিল তোমাকে।
পারুলের নাম মুখে আনার যোগ্যতাও তোমার নেই।
সে যোগ্যতা তোমারও নেই।
এইভাবেই তাদের সম্পর্ক থেকে মুছে-যাওয়া পারুল আবার স্পষ্ট হয়ে উঠত, জেগে উঠত। নবীকরণ হত পারুলের, পারুল তাই পুরনো হতে পারল না, বিস্মৃত হতে পারল না কখনও।
শেষ অবধি ধরা পড়ে গিয়েছিল অমল। একদিন নেশার ঘোরে সে ঘটনাটা প্রকাশ করে দেয়। বউয়ের সামনে, মেয়ের সামনে।
পরদিন মোনা তাকে বলেছিল, আমার এরকম সন্দেহ ছিলই। ছিঃ ছিঃ!
তোম্বা মুখ করে অমল বসে রইল কিছুক্ষণ। তার পর মুখ তুলে বলেছিল, সো হোয়াট! উইল ইউ ডেজার্ট মি?
আমি তোমাকে ছেড়ে গেলেও তো শূন্য স্থান ভরাতে পারুল ফিরে আসবে না।
আমি তোমাকে ঘেন্না করছি মোনা।
তার চেয়ে ভাল হত তুমি যদি নিজেকে ঘেন্না করতে কাপুরুষ।
আশ্চর্যের বিষয় হল, মেয়েদের সহজ সংস্কারবশে মোনার রাগ হওয়ার কথা পারুলের ওপর। কিন্তু অবাক কাণ্ড, সে কখনও পারুলের বিরুদ্ধে একটি কথাও বলেনি কখনও। বরং পারুলের ছবিখানা আলাদা করে সযত্নে অ্যালবামের একটা আলাদা পৃষ্ঠায় সেঁটেছিল সেই। সে জানত, মাঝে মাঝে অমল ছবিটা খুলে দেখে। ধরা পড়লে সংকোচ বোধ করত অমল। কিন্তু মোনা বলত, দেখ, দেখ, ওই ছবি দেখে তোমার বিবেক জাগ্রত হোক।
ভিড় কমেছে। অমল ক্লান্ত পায়ে স্টেশনচত্বর পার হল। এখন তার কানে এত কোলাহল কিছুই ঢুকছে না। বড্ড আনমনা সে আজ। দিনটা বিচ্ছিরিভাবে শুরু হল। দিনশেষে কী ঘটবে আরও, বলা যায় না। শরীরের ভার টেনে নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। অফুরান মনে হচ্ছে পথ। পথের শেষে কেউ নেই তার। কেউ নেই।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন