শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
চোখ চেয়েই জানালার বাইরে একজোড়া চোখ দেখতে পেল সে। চমকে উঠল। জানালার কপাটের আড়ালে লুকোনো মুখ। শুধু দুখানি চোখ নিবিড় দৃষ্টিতে চেয়েছিল। সে তাকাতেই সরে গেল টপ করে। সঙ্গে কাচের চুড়ির একটু ঠিন ঠিন শব্দ।
কে ওখানে?
প্রথমে জবাব নেই।
গায়ের লেপটা সরিয়ে উঠতে উঠতে সে ফের প্রশ্ন করে, কে রে?
ক্ষীণ জবাব এল এবার, আমি।
আমি কে?
আমি হিমি।
বড্ড সাহস হয়েছে তো মেয়েটার! গত কয়েকদিন শুধু বারবার এ-বাড়িতে নানা ছুতোয় হানা দিয়েছে আর সুযোগ পেলেই হাঁ করে দেখেছে তাকে। মুচকি হাসি, চোখের ইশারাও শুরু হয়েছে ইদানীং। কিন্তু এটা একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে না কি!
আজ কেউ বাড়িতে নেই। বাবা গেছে মরণ, হাম্মি আর মরণের মাকে নিয়ে বর্ধমানে কী সব গেরস্থালির জিনিস কেনাকাটা করতে। ফাঁকা বাড়িতে আছে শুধু দুটো কাজের মেয়ে, গোটাকয় মুনিশ আর কুকুর বেড়াল। এই অবস্থায় মেয়েটা কেন এল?
কী চাও?
এমনিই এসেছিলাম। খুড়িমা নেই?
ওরা যখন বর্ধমানে রওনা হচ্ছিল তখন দোতলা থেকে হিমিকে সদর দরজার আগলের কাছে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে সুমন। ন্যাকা! জানে না যেন!
না, নেই।
মেয়েটা চুপ। সুমন টের পেল, এখনও জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
মেয়েদের অভিজ্ঞতা সুমনের কম নেই। নারীসঙ্গ তার প্রিয়। কলকাতায় তার একগাদা মেয়েবন্ধু আছে। বলতে কী, ছেলেবন্ধুর চেয়ে তার মেয়েবন্ধুই বেশি। এখানে এসে অবধি সে নারীসঙ্গের একটু অভাববোধ করছে ঠিক। সে অভাব মেটানোর সাধ্য তো হিমির নেই। একটা সুন্দর চেহারার ছেলে দেখে ঢলে পড়া এবং বিয়ের লাইনে চিন্তা করা ছাড়া ওসব মেয়ের মন আর কোনও চিন্তা করতে পারে না। এইট না নাইনে পড়ে বলে শুনেছিল যেন একবার।
সুমন একটু ভাবল। একটা ধমক দিলেই মেয়েটা চলে যাবে। কিন্তু ধমক না দিয়ে ডেকে একটু কথা বললে কেমন হয়? ঠিক এই ক্লাসের কোনও মেয়ের সঙ্গে তো তার বন্ধুত্ব হয়নি।
ওখানে দাঁড়িয়ে আছ কেন? ভিতরে এসো।
মেয়েটা খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে বলে, আসব?
এসো। ডাকলাম তো!
খুব বাধো বাধো পায়ে মেয়েটা এসে দরজার ফ্রেমে দাঁড়াল। পশ্চিমের জানালা দিয়ে শীতের ঢলানি রোদ অনেকটা মেঝে পার হয়ে দরজার কাছে গিয়ে থেমেছে। সেই আলোয় সুমন দেখল, মেয়েটা এই দুপুরেও একটু সেজেছে। জংলা ছাপা শাড়ি, কপালে টিপ, চুল বিনুনিতে বাঁধা। ঠোঁটে একটু লিপস্টিকও কি? এতদিন তাচ্ছিল্যে তাকায়নি সুমন ভাল করে। এখন দেখল, সুন্দরী না হলেও হ্যাক ছিঃ নয় মোটেই। যৌবনে কুক্কুরী ধন্যা।
চৌকাঠে থমকে গেছে মেয়েটা। আর এগোতে সাহস পাচ্ছে না।
সুমন বলল, আরে এসো, এসো।
মেয়েটা কেমন থতমত খেয়ে একটু হাসল, মাথা নত করল।
হঠাৎ এই দুপুরে এলে যে! কী ব্যাপার?
সুমন ধমকায়নি। কড়া গলাতেও বলেনি। মেয়েটা তবু যেন ঘাবড়ে গিয়ে বলল, আমাকে পাঠাল যে!
সুমন অবাক।
পাঠাল! কে তোমাকে পাঠাল?
দিদিমা।। দিদিমা? কে দিদিমা?
মরণের দিদিমা, জিজিবুড়ি।
সুমন জিজিবুড়িকে দেখেছে। রোগা চেহারার একজন বিধবা মহিলার আনাগোনা আছে এ বাড়িতে। সুট করে আসে, আর ফুট করে চলে যায়। গতিবিধি কিছুটা সন্দেহজনক। মহিলা কে তা বুঝতে না পেরে একদিন সে মরণকে জিজ্ঞেস করেছিল, বুড়িটা কে রে?
ও তো জিজিবুড়ি।
জিজিবুড়ি আবার কে?
আমার দিদিমা। আমি জিজিবুড়ি বলে ডাকি।
ওঃ। বলে আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি সুমন।
মরণ নিজের থেকেই বলল, জানো তো, জিজিবুড়ি রোজ দুধ খেতে আসে আর মায়ের সঙ্গে ঝগড়া করে।
ঝগড়া করে কেন?
ক্যাট ক্যাট করে অনেক কথা শোনায় মাকে। বলে মার সঙ্গে নাকি বাবার মোটে বিয়েই হয়নি। ও বিয়ে নাকি ভড়ং।
বাবার দ্বিতীয় বিয়েটা সম্পর্কে সুমনের তীব্র বিদ্বেষ আছে। যখন তার বাবা বিয়েটা করেছিল তখন সুমনের বয়স কম। ফুঁসে উঠবার মতো ব্যক্তিত্ব তখনও অর্জন করেনি সে। বাড়িতে যে বিশাল গণ্ডগোল হয়েছিল, মা আর বাবার মধ্যে, তার অনেকটারই সাক্ষী ছিল সে। তার মা তার বাবাকে এত গালাগাল করেছিল যে বলার না। পুলিশ এসে বাবাকে ধরেও নিয়ে গিয়েছিল। রসিক সাহা জামিন না নিয়ে কিছুদিন পুলিশের হেফাজতে থেকেও গিয়েছিল। সেটা বোধ হয় বাড়িতে অশান্তি এড়ানোর জন্যই। তারপর অবশ্য কাজ কারবার লাটে উঠছে দেখে জামিন নিয়ে বেরিয়ে আসে। বাড়িতে টিকতে না পেরে কোনও আত্মীয়বাড়িতে গিয়েও কিছুদিন ছিল। বাড়িতে মায়ের তখন পাগলের মতো অবস্থা। কখনও কাঁদে, কখনও বাসন-কোসন ছুড়ে ভাঙে, কখনও তাদের ভাইবোন দুটোকে অনর্থক পেটায় আর পাড়া প্রতিবেশীদের কাছে ভ্যাড়ভ্যাড় করে বাবার কীর্তি কাহিনী বলে। প্রথম প্রথম পাড়ার মেয়েরা দল বেঁধে শুনতে আসত। কিছু দিন পরে অবশ্য একই কথা শুনতে শুনতে তাদের উৎসাহে ভাঁটা পড়তে থাকে। এমন দুঃসময় তাদের জীবনে আর আসেনি। শেষ অবধি কালক্রমে ধীরে ধীরে চেঁচামেচি কমতে লাগল। বাবাও বাড়ি ফিরতে পারল একদিন। বাইরের উত্তেজনা কমলেও পরিবারটা আর স্বাভাবিক রইল না। তাদের চারজনের যে পরিবারটি ছিল তার বাইরেও যে আর একটা লজ্জার সম্পর্ক তৈরি হয়ে রইল সেইটে মেনে নিতে বা সয়ে নিতে সময় লাগছিল তাদের। বাবাকে তখন তার খুব অপছন্দ হত।
তার বাবা অনেকদিন মায়ের ভয়ে গাঁয়ে আসেনি। তখন একবার খবর পাওয়া গেল যে, গাঁয়ের বিষয় সম্পত্তিতে লুটমার হচ্ছে। বাবার দ্বিতীয় বউ সামলাতে পারছে না। তার বাবা বিষয়ী, একরোখা লোক। দেশভাগ হয়ে ঠাঁইনাড়া মানুষের দঙ্গলে মিশে এদেশে এসে বহু কষ্ট করেছে। ক্যাম্পে থাকার সময় ভিক্ষে অবধি করেছে পেটের দায়ে। তারপর নিজের রোখে উঠে দাঁড়িয়েছে। এইসব লোকের কাছে বিষয়সম্পত্তি হল প্রাণ। তার বাবা মায়ের রাগের তোয়াক্কা না করে ছুটে এল গাঁয়ে। মারধর খেয়েছিল, শত্রুতাও কম হয়নি। গোটা তিন চার মোকদ্দমাও লড়তে হয়েছে। কিন্তু রসিক সাহা হার মানেনি।
এই যে সুমনের হঠাৎ গাঁয়ে আসা এর পিছনেও তার মায়ের প্ররোচনা আছে। দশ-বারো বছর ধরে রসিক সাহার একটা সিস্টেম তৈরি হয়েছে। সপ্তাহান্তে শনিবার সে গাঁয়ে আসে দ্বিতীয় পক্ষের কাছে। সোমবার ফিরে যায়। এই নিয়েও বাড়িতে প্রথম প্রথম কুরুক্ষেত্র বড় কম হয়নি। শুক্রবার রাত থেকে মায়ের মাথা গরম হত। সে কী চেঁচামেচি আর শাপশাপান্ত। একবার একটা ভারী তালা ছুড়ে মেরে তার বাবার থুতনি ফাটিয়ে দিয়েছিল। তবু রসিক সাহার সিস্টেম ভাঙেনি। এখন সব গা সওয়া হয়ে গেছে। মা তাকে কয়েকদিন ধরেই বলছিল, একবার যা, গিয়ে দেখে আয় সেই বেশ্যাটার তবিলে কত টাকা ঢালছে।
সুমন রাগ করে বলেছিল, আমি যাব কেন? তোমার জানার হলে তুমি যাও।
আমি! আমি গেলে যে ওকে খুন করে আসব।
তা হলে আমাকে পাঠাতে চাইছ কেন?
তোদের ভালর জন্যই চাইছি। শেষ অবধি যদি সবই ওই মাগীর গর্ভে যায় তা হলে তোদের কী হবে?
আমাদের জন্য তো বাবা কম করছে না!
ছাই করছে। আমি জানি, ওই মেয়েমানুষটার পিছনে আরও টাকা ঢালছে।
ঢালুক। আমি যেতে পারব না।
ঢাললেই হল! আমি উকিলের সঙ্গে কথা কয়েছি। দ্বিতীয় বিয়েটা বিয়েই নয়। ওসব বিষয়সম্পত্তিও আমাদেরই। তুই গিয়ে শুধু ওদের মতলবটা বুঝে আয়।
রোজ এইসব কথা শুনতে শুনতে অবশেষে সুমন রাজি হয়েছিল। এখানে এসে অবধি সে এখনও কিছু বুঝতে পারে না। দিব্যি একটা পাড়াগাঁয়ের গেরস্থের সংসার। বাবার দ্বিতীয় বউকে খুব অপছন্দ হবে বলে মনে হয়েছিল সুমনের। কিন্তু কাছে এসে দেখছে মহিলা ভারী ভিতু আর নিরীহ। আজ অবধি উঁচু গলায় কথা কইতে শোনেনি। আর মহিলা সুমনকে সবসময়ে খুশি করতে একটা প্রাণপণ চেষ্টা করে। কিছু খারাপ লাগছে না সুমনের। মানুষের দুবার বিয়ে করাটা হয়তো খারাপ। কিন্তু সেই খারাপের চিহ্ন বা লক্ষণগুলি খুঁজে বের করতে চেষ্টা করেও সে পেরে ওঠেনি।
জিজিবুড়ি বা তার মা বিয়েটা স্বীকার না করলেও সুমনের মনে হয়েছে, তার বাবা এখানে এসে বেশ ভালই থাকে। মুখে হাসি-টাসি দেখা যায়। কলকাতার বাড়িতে বাবা ভীষণ গোমড়ামুখো।।
সে মরণকে বলেছিল, তোর দিদিমা ওসব কথা কেন বলে?
জিজিবুড়ি তো ওরইমই। সবসময় মুখে খারাপ খারাপ কথা।
জিজিবুড়ি কেমন লোক তা অবশ্য সুমন ভাল করে জানে না। এখনও আলাপ পরিচয় হয়নি।
সে দিকে চেয়ে বলল, দিদিমা তোমাকে পাঠাল কেন?
হিমি চৌকাঠ থেকে এক পাও এগোয়নি, মুখও তোলেনি। আঙুলে আঁচল জড়াচ্ছে আর খুলছে। ওইভাবে থেকেই বলল, জিজিবুড়ি বলছিল, ছেলেটা একা একা থেকে হাঁপসে পড়ছে, যা না গিয়ে একটু গল্প-টল্প কর। শহরের ছেলে তো, ওদের সঙ্গে কথা কইলেও একটা শিক্ষে হয়।
সুমন হাসল, তাই বুঝি?
জিজিবুড়ি বলছিল।
আর কিছু নয়?
না।
তা হলে ঘরে ঢুকছ না কেন? আমি তো তোমাকে খেয়ে ফেলব না।
মেয়েটা ফিচিক করে একটু হাসল। তারপর লতানে পায়ে একটু এঁকেবেঁকে ঘরে ঢুকল। ইচ্ছে আর লজ্জায় ভাগাভাগি হয়ে।
ওই চেয়ারটা টেনে বোসো।
মেঝেতেই বসি।
দুর! মেঝেতে কেন বসবে? মেঝে ভীষণ ঠান্ডা। চেয়ারে বসতে দোষ কী?
আমরা যে গুরুজনদের সামনে চেয়ারে বসি না।
গুরুজন! বলে সুমন হেসে ফেলে, আমি আবার কোন সম্পর্কে তোমার গুরুজন হলাম?
বাঃ, আপনি বি এ পড়েন না!
বি এ পড়লেই গুরুজন হয় বুঝি? অদ্ভুত যুক্তি তো!
তা হলে দাঁড়িয়েই থাকি।
সুমন মাথা নেড়ে বলে, অত সংকোচের কারণ নেই। আমাকে বন্ধু বলে ধরে নাও।
উরেব্বাস!
ভয় পেলে নাকি?
আপনি কী করে বন্ধু হবেন! আপনি যে বড়!
বড়! সেটা কোনও ফ্যাক্টর নয়। তোমার চেয়ে আমি হয়তো দু-চার বছরের বড়। বুড়োমানুষ তো নই।
মেয়েটা অগত্যা চেয়ারে বসল। মাথা নিচু।
তুমি তো আমাকে সঙ্গ দিতে এসেছ?
হ্যাঁ তো।
সঙ্গ দিতে হলে কথা কইতে হয়।
কী বলব?
সেটাও কি আমি শিখিয়ে দেব? বন্ধুদের সঙ্গে কী করে কথা বলো?
ও সেসব আজেবাজে কথা।
কীরকম আজেবাজে বলো তো!
আমরা কি ভাল কথা জানি!
তুমি অত সেজেছ কেন?
মেয়েটা অবাক হয়ে বলে, সেজেছি!
হ্যাঁ তো!
মেয়েটা লজ্জা পেয়ে বলে, সে তো একটুখানি। এখানে আসব বলে একটা টিপ পরেছি৷ টিপ না পরলে মা রাগ করে।
লিপস্টিকও দেখতে পাচ্ছি যেন!
মেয়েটা মুখ নিচু করে হি হি করে হাসল।
আজকাল মেয়েরা সাজে না জান তো? কলকাতার মেয়েরা লিপস্টিকও মাখে না বড় একটা।
ওমা! তাই?
কেন জান? তারা এখন ভাবে শরীরে রং মাখার চেয়ে শরীরটাকেই সুন্দর করে তোলা ভাল। তাই তারা যোগব্যায়াম করে, ধ্যান করে আর স্কিনের যত্ন নেয়।
আপনি এত জানেন কী করে?
বাঃ রে, আমার যে অনেক মেয়েবন্ধু আছে।
কজন?
অনেক। দশ-বারোজন তো হবেই।
উরেব্বাস!
অবাক হওয়ার কী আছে? তোমার ছেলেবন্ধু নেই?
মেয়েটা এবার মুখ তুলে বলে, আছে দু-চারজন। ঠিক বন্ধু নয়, চেনাজানা আর কী।
সমান বয়সি?
হ্যাঁ।
তা হলে ওরা তোমার ছেলেবন্ধুই। তাদের সঙ্গে আড্ডা হয় না?
ঘাড় কাত করে হিমি বলে, খুব হয়।
তা হলে তো তুমি স্মার্ট মেয়ে। অত লজ্জা পাচ্ছিলে কেন?
সুমন যে লজ্জার কারণটা জানে না তা নয়। তার আন্দাজ, এ মেয়েটা তার প্রেমে পড়েছে। আর দুর্বলতা থেকে ওই লজ্জা। প্রেমে পড়লেও কাঁচা প্রেম। চোখের আড়াল হলেই কেটে যাবে। এরা বেশ মেয়ে, শতেকবার প্রেমে পড়ে আর ওঠে।
শীতের এই দুপুরে গেঁয়ো মেয়েটার সঙ্গ তার বেশ ভালই লাগছিল। বিপজ্জনক না হলে লঘু এই প্রেম-প্রেম লাজলজ্জার খেলা খারাপ তো কিছু নয়।
আপনি একটা গল্প বলুন।
গল্প! না, আমি গল্প-টল্প বলতে পারি না। গল্প শুনতে চাও কেন?
এমনি।
তুমি আমাকে সঙ্গ দিতে এসেছ, গল্প তো তোমার বলার কথা।
আপনার মেয়েবন্ধুরা কেউ সাজে না?
কেউ কেউ সাজে। তবে বেশির ভাগই সাজে না।
তারা শুধু ব্যায়াম করে?
হ্যাঁ। যোগব্যায়াম কাকে বলে জান?
জানি। আমাদের শিখা দিদিমণি শেখায়।
তুমি শেখ নাকি।
হ্যাঁ। আমি অনেক আসন জানি।
বাঃ, তুমি তো তা হলে প্রোগ্রেসিভ মেয়ে। নাচ গান কিছু জান?
আমার গানের গলা নেই। আর এখানে একজন মাত্র নাচ জানে। তবে শেখায় না।
কে বল তো?
চাটুজ্জেবাড়ির মেয়ে পান্না।
পান্না নামটা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে সুমনের বুকটা ধক করে ওঠে। কানটা সামান্য গরম হয়।
তবু সে একটু অবাক হওয়ার ভান করে বলে, পান্না?
পুজোর ফাংশনে নেচেছিল, দেখেননি?
সুমন একটু উদাস ভাব দেখিয়ে বলে, তা হবে। মনে নেই।
কিন্তু মনে আছে, ভীষণ মনে আছে সুমনের। মনে আছে শুধু নয়, সারাদিন পান্না তার মনে আনাগোনা করে।
পান্না নাচে, তা বলে আনা পাভলোভা নয়। তালজ্ঞান থাকলে যে কোনও মেয়েই অল্পবিস্তর শরীর দোলাতে পারে। বড় পুজোর ফাংশনে যে নৃত্যনাট্যটা হয়েছিল তাতে পান্নাকে যখন ফুলের সাজ আর মেকআপে দেখেছিল সুমন তখনই সে খরচ হয়ে যায়। নাচের ব্যাকরণ সুমন জানে না বটে, কিন্তু দেখেছিল কী বিভোর হয়ে সম্মোহিতের মতো সারা স্টেজ জুড়ে ঢেউ হয়ে বয়ে যাচ্ছে মেয়েটা।
তারপর থেকেই ছুতোনাতায় কতবার যে ওদের বাড়ির পাশ দিয়ে যাতায়াত হল।
হ্যাঁ রে মরণ, তুই না আগে চাটুজ্জেবাড়িতে নারকোল আর সুপুরি পাড়তিস!
পাড়তুম তো। কিন্তু তুমিই যে বারণ করে দিয়েছ!
ওঃ হ্যাঁ, তাই তো!
ওদের বাড়ি যাবে?
সুমন লজ্জা পেয়ে বলে, না না, আমি কেন যাব?
পান্নাদিরা খুব ভাল লোক। গেলে খুশি হবে কিন্তু।
যাঃ, খুশি হলেই যেতে হবে নাকি?
আসলে মেয়েদের ব্যাপারে সুমনের কোনওদিন লজ্জা সংকোচ ছিল না। আজও নেই। সে ছেলেবেলা থেকে কো-এডুকেশন আর ইংলিশ মিডিয়ামে পড়েছে। মেয়েদের নিয়ে তার লজ্জা সংকোচ কেটে গেছে কবে! তবু জীবনে এই প্রথম এবং এই একটি জায়গায় সে কেমন আটকে গেছে যেন। একটা বাধা হচ্ছে।
পাকা মরণটা অবশেষে বলে বসল, চলো না, বিজয়া করে আসি!
বিজয়া! বলে বিস্ময় প্রকাশ করে সুমন।
বাঃ, বিজয়া করতে তো আমরা সব বাড়ি যাই।
তোর চেনা বাড়ি, তুই যেতে পারিস। আমি কেন যাব?
তোমাকেও সবাই চিনে গেছে। পান্নাদি তোমার কথা জিজ্ঞেস করেছিল একদিন।
কী জিজ্ঞেস করেছিল?
বলল, ওই সুন্দরমতো ছেলেটা কে রে তোর সঙ্গে ঘোরে?
ওঃ।
আমি তখন বললাম আমার দাদা।
গাঁয়ে এসে কি গেঁয়ো হয়ে যাচ্ছে সুমন? এত সংকোচ, লজ্জা, বুক কাঁপা, দুর! দুর! এরকম মেয়ে তো কতই তার বগলের তলা দিয়ে পার হয়ে গেছে।
কিন্তু নিজের মনে এত দেমাক করেও চৌকাঠটা ডিঙোনো যাচ্ছিল না।
তোমার পান্নাদি নাচে বুঝি?
খুব ভাল নাচে। সবাই বলে কলকাতায় গেলে নাম হবে।
তোমাদের শেখায় না কেন?
বলে দুর, আমিই ভাল করে শিখিনি, তোদের কী শেখাব!
ওঃ।
আচ্ছা, আপনি তো খুব ভাল গাইতে পারেন, তাই না?
ওসব বাথরুম সং।
আমি শুনেছি। ঠিক হেমন্তর মতো গলা।
দুর। কোথায় হেমন্ত, কোথায় আমি!
আমাদের তো বেশ লাগে। কাল সন্ধেবেলায় গাইছিলেন, আমার মা বলল, কী সুন্দর যে গায় ছেলেটা। আমরা টিভি বন্ধ করে দিয়ে আপনার গান শুনছিলাম!
এ মা, ছিঃ ছিঃ। কী কাণ্ড!
আপনার ক্যাসেট নেই?
দুর পাগল! কে আমার ক্যাসেট করবে?
দেখবেন আপনি ঠিক একদিন প্লে ব্যাক করবেন।
ওরে বাবা! মস্ত সার্টিফিকেট দিয়ে ফেললে যে!
দেখবেন।
মেয়েটাকে বেশ লাগল সুমনের। আড় ভেঙে দিল, আর উঁকিঝুঁকি দেবে না, চোখ মটকাবে না। ওসব ভাল লাগে না সুমনের। তার চেয়ে সোজা স্পষ্ট সম্পর্ক অনেক ভাল।
কিন্তু ব্যাপারটা একটু ঘোরালো হয়ে দাঁড়াল তার বাবা ফেরার পর।
বাসন্তী রাতে তার ঘরে এসে বলল, হ্যাঁ বাবা, এই হিমি মেয়েটা নাকি তোমাকে আজ দুপুরে এসে জ্বালাতন করে গেছে?
জ্বালাতন! বলে হেসে ফেলল সে, না জ্বালাতন করেনি। গল্প করতে এসেছিল।
আমরা বাড়িতে নেই, এ সময়ে আসে কেউ? তোমার কাঁচা ঘুমটা মাটি করে গেছে তো!
আরে না না। আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল।
মেয়েটার একটু গায়ে পড়া স্বভাব আছে বাবা। কিছু মনে কোরো না।
কিছু মনে করিনি। ও তো আমার বন্ধু হয়ে গেছে।
ভারী অবাক হয়ে বাসন্তী বলে, বন্ধু!
হ্যাঁ। মেয়েটা খারাপ নয় তো! একটু লাজুক।
তা হোক বাবা, ওকে বেশি পাত্তা দিয়ো না। পেয়ে বসবে।
আসে আসুক না। আমারও কথা বলার একটা সঙ্গী হয় তা হলে!
কিন্তু বাবা—বলে বাসন্তী চুপ করে গেল।
কী বলুন না।
ভাবছি, মেয়েটার মতলব তো জানি না।
একটু গম্ভীর হয়ে সুমন বলে, ওকে নাকি আপনার মা আমার কাছে পাঠিয়েছিল।
আমার মা!
হ্যাঁ। তাঁকে অবশ্য আমি ভাল চিনি না।
বিহ্বল মুখে একটু দাঁড়িয়ে থেকে চলে গেল বাসন্তী।
রাত্রিবেলা খাওয়ার টেবিলে যখন বাসন্তী সবাইকে পরিবেশন করছিল তখন সুমন লক্ষ করল, ভদ্রমহিলার মুখে স্পষ্ট কান্নার ছাপ। ঠোঁটে হাসির আভাসটুকুও নেই। কথাও কইছে না। এই প্রথম সুমনের একটু মায়া হল ভদ্রমহিলার জন্য। মানুষটা খুব বুদ্ধিমতী নয়। কিন্তু বোধ হয় মানুষটা ভালই।
মানুষ সম্পূর্ণ পক্ষপাতশূন্য অনাবিল চোখ দিয়ে কোনও কিছু বিচার করতে পারে না সবসময়। সুমনকে বহুকাল ধরে তার মা বুঝিয়েছে, তার বাবার দ্বিতীয় পক্ষ একজন ঘড়েল ও বদমাশ মহিলা। তার চরিত্রেরও ঠিক নেই। তার বাবাকে হিপনোটাইজ করে, বশীকরণ বা তুকতাক করে দখলে রেখেছে। এই ভদ্রমহিলা নানা ফিকির করে তাদের টাকাপয়সা বিষয়সম্পত্তি গ্রাস করে নিচ্ছে।
সুমন সেইরকম পূর্বধারণা নিয়েই ভদ্রমহিলাকে লক্ষ করত। ওই যে শান্ত, নিরীহ মুখ, নরম কথাবার্তা, ভিতু ভাব ওর আড়ালেই আছে সেই দাঁত নখঅলা ভ্যাম্পটা।
কিন্তু গত কয়েকদিনে ধারণাটা এক জায়গায় বসে থাকেনি। সরে গেছে। ভদ্রমহিলাকে তার ততটা খারাপ ভাবতে ইচ্ছে হচ্ছে না। এর ভালমানুষি কিছুতেই অভিনয় নয়।
সকালে রান্নাঘরে জলখাবার তৈরি করতে যখন বাসন্তী ভীষণ ব্যস্ত তখন হঠাৎ সুমন রান্নাঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
আপনি খুব ব্যস্ত?
চোখ তুলে এমন অবাক হল বাসন্তী যে কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারল না। তারপর ভারী ব্যস্ত হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, ও বাবা, তুমি রান্নাঘরে যে! কী দরকার বলো বাবা, একটা হাঁক দিলেই তো হত।
সুমন হেসে বলে, এমনিই এলাম। আপনার রান্নাঘরটা তো বিরাট বড়!
হ্যাঁ বাবা, গাঁদেশে রান্নাঘর তো বড়ই হয়। এসো না ভিতরে, জলচৌকি পেতে দিচ্ছি, বোসো।
সুমন বিনা আপত্তিতে বসল।
আপনি সারাদিন খুব কাজ করেন!
বাসন্তীর মুখে একটা স্বর্গীয় হাসি ফুটে উঠল। বলল, সংসার মানেই তো কাজ। কত কী সামলাতে হয়। গোরু, বাছুর, হাঁস-মুরগি, বেড়াল-কুকুর, মানুষজন। কার দিকে নজর না দিলে চলে বলো!
রান্নার লোক পাওয়া যায় না এখানে?
পাওয়া যাবে না কেন? উনি তো আমাকে প্রায়ই রান্নার নোক রাখতে বলেন। আমি রাখতে দিই না।
কেন বলুন তো! কলকাতায় আমাদের বাড়িতে তো রান্নার লোক আছে।
বাসন্তী যেন একটু অপ্রস্তুত হাসি হেসে বলে, মাইনে করা বাইরের লোকের তো তেমন দায় নেই। কী রাঁধতে কী রাঁধল, বাসি কাপড়ে হাঁড়ি ছুঁল, কি নাকের শিকনি ঝেড়ে সেই হাতেই কাজ করল। তাই আমি নিজেই করি। আমার বড় ঘিনপিত বাবা। শুচিবায়ুও বলতে পার।
সুমন একটু হাসল। কিছু বলল না।
হঠাৎ একটা ছায়া পড়ল দরজায়। সুমন তাকিয়ে দেখল, দরজায় জিজিবুড়ি দাঁড়িয়ে। তাকে হাঁ করে দেখছে। আর চোখ দুটো যেন গিলে খাচ্ছে তাকে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন