শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
চড়াই পাখিটা ছিল ব্যাচেলার। গত বছর দুয়েক ধরে তাকে লক্ষ করছে বিজু। তার দোতলার একটেরে ঘরে জানালার ধারে কাঠের আলমারির ওপর রাখা একটা পটের পিছনে সন্ধেবেলায় এসে আশ্রয় নিত। সকালে উড়ে যেত বিষয়কর্মে। বাসা-টাসা করেনি। কোনও ঝামেলা ছিল না তার।
পাখিটা মরল হারানির দোষে। দোষ কিছুটা মায়েরও। পাখিটা মরতে পারে এই ভয়ে ঘরের সিলিং ফ্যানটা কখনওই চালায় না বিজু। যদিও অভ্যাস ও স্বাভাবিক আত্মরক্ষার তাগিদে চড়াইপাখিরা সিলিং ফ্যান এড়িয়ে ওড়াউড়ি করতে পারে। তবু সাবধানের মার নেই। হারানিকে পই পই করে বলা আছে, ঘর মোছার পর শুকনোর জন্য যেন সিলিং ফ্যান না চালানো হয়। এখন শীতকাল, শুকনো জলীয় বাষ্পহীন বাতাসে চট করে ঘর শুকিয়ে যায়।
দোতলায় এই একটিই ঘর। তা বলে চিলেকোঠা নয়। আসলে একতলা হওয়ার পর দোতলাও তুলে ফেলছিল নরহরি। তিন ভাইয়ের মাথাতেই ছিট আছে। তাদের জীবনে মাপজোখ বা হিসেবনিকেশের বালাই নেই। তিনজনেরই ঝোঁকের ওপর চলা। আবার সঙ্গে চণ্ড মেজাজও আছে, কেউ কিছু তাদের বোঝাবে তার জো নেই। দোতলা যখন তেড়েফুঁড়ে উঠছে তখন বিজুর মা প্রমাদ গুনল। কারণ একতলাটাই পেল্লায়। পাঁচখানা শোওয়ার ঘর, বৈঠকখানা, দর-দালান সব হাঁ-হাঁ করছে। দুটি মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে, আছে শুধু ছেলেটা। তিনটে প্রাণীর জন্য একতলাটাই তো বড্ড বড়। কিন্তু নরহরিকে সে কথা বোঝাবে কে? অগত্যা বিজুর মা গিয়ে মহিম রায়কে ধরে পড়ল, দাদা, আপনাদের ভাইকে একটু বোঝাবেন আসুন। কী কাণ্ড যে করছে। অত বড় একতলাটাই আমি সামাল দিতে পারছি না, দোতলা তো আমাদের গিলে খাবে। টাকারও শ্রাদ্ধ হচ্ছে।
মহিম রায় শুনে বলেছিল, বংশের ধারা যাবে কোথায় বউমা, সব যে এক ছাঁচে গড়া। ওদের মাথায় যা চাপে তা মানায় কার সাধ্য। গৌরদাকেও তো দেখি, উঠল বাই তো কটক যাই।
তা মহিম রায় এসেছিল।
নরহরি মহা আহ্লাদে নতুন বাড়ি তাকে ঘুরিয়ে দেখাল।
কেমন দেখছেন দাদা?
এ যে তাজমহল বানিয়ে ফেলেছিস!
কী যে বলেন! চিরকাল বড় বাড়িতে থেকে অভ্যেস তো, তাই একটু বড় করেই বানালাম।
তা বেশ। কিন্তু বড়রও তো একটা মাপ থাকবে, না কি?
কেন, একটু বেশি বড় বয়ে গেল নাকি?
ওরে আহাম্মক, বড় বাড়িতে ছিলি, তা সেখানে বড় সংসারও ছিল। জনমনিষ্যি ছিল। কিন্তু তোর জন কোথায়? পাঁচখানা শোওয়ার ঘর তোর কোন কাজে লাগবে? একটাতে স্বামী-স্ত্রী, একটাতে বিজু, আর দুখানা ঘরে দুই মেয়ে-জামাই এলে থাকবে—এ পর্যন্ত বোঝা যাচ্ছে। কিন্তু আরও দুখানা শোওয়ার ঘর দিয়ে কী হবে?
আহা অতিথ-বিতিথও তো আসতে পারে। ও দুটো গেস্টরুম বলেই ধরে নিন।
ধরলুম। তাহলে দোতলাটা কী করবি?
নরহরি থমকাল। ভেবে-টেবে বলল, লেগে যাবেখন কাজে।
ওরে, এত বড় বাড়ি ভরতে গেলে যে তোকে আবার সংসার করতে হয় বাঙালের মতো। সেরকমই ইচ্ছে নাকি?
ছিঃ ছিঃ কী যে বলেন।
তাহলে আর টাকার শ্রাদ্ধ করিসনি। এ হল গ্রামদেশ, বাড়তি ঘরে যে ভাড়া বসাবি তাও হবে না।
গৌরদা তোকে পৈতৃক বাড়ির ক্ষতিপূরণ বাবদ অনেক টাকা দিয়েছে জানি, কিন্তু সব টাকাই যে ঢালতে হবে তার কোনও মানে নেই। টাকাটা হাতে রাখ।
সেটা কি দাদার সঙ্গে বেইমানি হবে না?
দুর পাগল! গৌরদা কি বলে দিয়েছে সব টাকা ঢেলে এত বড় বাড়ি করতে? যা না, গৌরদার সঙ্গেই কথা বলে দেখ।
গৌরহরি অবশ্য মহিমের মতে মত দেননি। নরহরির কাছে সব শুনে-টুনে বলেছিলেন, মহিমটা হল চিটেগুড়ের পিঁপড়ে। হিসেবনিকেশ ছাড়া এক পা চলে না। ঠিক আছে, বাড়ি কেমন হল আমি কাল গিয়ে দেখে আসব।
গৌরহরি সব দেখেশুনে অবশ্য রায় দিলেন, আজকাল কাজের লোকের খুব সমস্যা শুনতে পাই। এতগুলো ঘর ঝাড়পোঁছ করতে বউমার কষ্ট হবে। দোতলাটা বরং থাক।
নরহরি বলল, তোমার দেওয়া টাকার যে অনেকটাই তাহলে থেকে যাবে। ও টাকা তাহলে ফেরত নাও।
গৌরহরি গম্ভীর হয়ে বলেছিলেন, গৌর চাটুজ্জে দেওয়া জিনিস কখনও ফেরত নেয় দেখেছিস? টাকা আছে থাক। ওটা আমার আশীর্বাদ।
দোতলাটা তাই আধখ্যাঁচড়া হয়ে রইল। একখানা বড় ঘর, লাগোয়া বাথরুম। বাকিটা খোলা ছাদ। ছাদের চারদিকে পিলারের মাথা শিকসমেত খাড়া হয়ে আছে। রেলিং নেই।
দোতলার ঘরটা দখল করেছিল বিজু। ভারী নিরিবিলি তার এই ঘর। সারাদিন শব্দহীন এই ঘরে তার সারি সারি বন্ধু হল র্যাক ভর্তি বই। গল্পের বই ছাড়াও আছে বিজ্ঞান আর আইনের বই। ইনকাম ট্যাক্স প্র্যাকটিস শুরু করার পর থেকে সেইসব বইও বিস্তর ঢুকেছে। আর আছে মিউজিক সিস্টেম, কম্পিউটার, অসময়ে চা খাওয়ার জন্য স্টোভ আর চায়ের সরঞ্জাম।
চড়াইপাখিরা বাসা বাঁধবার কম চেষ্টা করেনি এ-ঘরে। কিন্তু একবার বাসা বাঁধলে ঘরদোর নোংরা হতে শুরু করবে বলে বাসা ভেঙে দেওয়া হত। বারবার বাধা পেয়ে চড়াইপাখিরা হাল ছেড়ে দিয়েছে। এখন একতলার ফাকা ঘরগুলোর ঘুলঘুলিতে তারা দিব্যি জাঁকিয়ে আছে।
শুধু এই একটা পাখিই দলছুট হয়ে থেকে গিয়েছিল। এ বাসা-টাসা বানানোর চেষ্টাই করেনি। একা একা থাকত। যখন-তখন আসত যেত। কাঠের আলমারির ওপর একখানা কালীঘাটের পট রয়েছে কতকাল। তারই পিছনে রাত কাটাত। বিজুর সঙ্গে দেখাসাক্ষাৎ হত প্রায়ই। বিজু তার নাম দিয়েছিল ব্রহ্মচারী।
জানালার ধারে নিজের টেবিলচেয়ারে বসে পড়াশুনো করার সময় কতবার ব্রহ্মচারী তার কাঁধের ওপর দিয়ে যাতায়াত করেছে। খুব একটা ভয় পেত না তাকে। পাখিরাও শত্রুমিত্র চেনে, পছন্দ বা বিদ্বেষ বুঝতে পারে। ব্রহ্মচারীকে সে নানাভাবে নির্ভয় করার চেষ্টা করেছে। তবে মাঝে মাঝে হুমকি দিত। একা থাকো, ওয়েলকাম। কিন্তু গার্লফ্রেন্ড জোটালে মুশকিল আছে।
ব্রহ্মচারী মারা পড়ল ভোরবেলা। তখন বিজু বাথরুমে। ওই সময়েই হারানি এল ঘর ঝাড়পোঁছ করতে। পিছনে মা।
শীতকাল বলে জানালা বন্ধ ছিল। সেটা খুলে দেওয়ার কথাটাও মনে ছিল না কারও। ঘর ঝাঁট দিয়ে জল-ন্যাতায় যখন ঘর মুছছিল হারানি তখন মা বলল, ওরে ছেলেটা এখনই বাথরুম থেকে বেরিয়ে আসবে। ভেজা মেঝেতে পায়ের ছাপ পড়বে। পাখাটা খুলে দে, তাড়াতাড়ি শুকোক।
আর ব্রহ্মচারী তখন ঘরে আগন্তুকের সাড়া পেয়ে বাইরে বেরোবার জন্য পটের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে চক্কর কাটছিল বাতাসে। ফুল স্পিডে পাখা খুলে দিয়েছিল হারানি। আর বলেছিল, হুশ, হুশ…
বিভ্রান্ত ব্রহ্মচারী ভয় খেয়ে পাখার চক্করে গিয়ে একটিমাত্র টং শব্দ তুলে ছিটকে পড়েছিল মশারির চালিতে।শবদেহ। ওইটুকু পাখি কি পারে অত বড় চোট সহ্য করতে? কতটুকু শরীর তার? কতই বা প্রাণশক্তি?
বাথরুম থেকেই ঘটনাটা আঁচ করতে পেরে বিজু চেঁচিয়ে বলেছিল, পাখা বন্ধ করো! পাখা চালিও না।
সে কথা শুনতেই পায়নি কেউ।
যখন বেরিয়ে এল তখন অপরাধী মুখ করে মা দাঁড়িয়ে। হারানি ব্যস্ত সমস্ত হয়ে মৃত পাখিটাকে খুঁজছে।
লম্বা বিজু একবার দৃষ্টিক্ষেপেই ব্রহ্মচারীর মৃতদেহটা দেখতে পেয়েছিল। হাত বাড়িয়ে পাখিটাকে করপুটে নিয়ে মায়ের দিকে চেয়ে সে শোকাহত গলায় বলল, কী করলে বল তো মা?
কী করব বল! বোকা পাখিটা যে ওরকম পাগলের মতো ওড়াউড়ি করবে তা কি জানতুম! পাখা তো বন্ধ করেছিলাম, কিন্তু তার আগেই—
হারাণি মুখ নিচু করে ঘর মুছে যাচ্ছিল। সেও জানে, কাজটা ঠিক হয়নি।
বিজু তার দিকে চেয়ে বলল, দুঃখের কথা কী জানিস হারাণি? মানুষ মারলে ফাঁসি বা যাবজ্জীবন হয়, কিন্তু পশু-পাখির বেলায় হয় না। আইনে থাকলে আজ তোরও ওরকম সাজা হতে পারত।
হারানি অতি ছলবলে ও ফিচেল এক কিশোরী। দীপ্ত ডাগর চেহারা। টানা টানা চোখ, মুখের ডৌলটিও চমৎকার। বিজুর প্রতি তার বয়সোচিত আকর্ষণ যে আছে তা সে প্রায়ই কটাক্ষে প্রকাশ করে। একটু-আধটু ঠাট্টাইয়ার্কি করতেও ছাড়ে না। আজ বুঝল, সে একটা ঘোরতর অন্যায় করে ফেলেছে।
করুণ মুখ তুলে বলল, আমার খুব পাপ হল, না?
খুব পাপ করেছিস। পাখিটা আমার বন্ধু ছিল।
তুমি রাগ করলে দাদা! কিন্তু পাখিটা যে কেন অমন ভয় খেল!
ভয় তো খাবেই। ওরা যে তোদের বিশ্বাস করতে পারে না।
ভারী ছলছলে হয়ে গেল হারানির চোখ। আর একটিও কথা না বলে ঘর মোছা শেষ করে উঠে হাত বাড়িয়ে বলল, দাও।
বিজু তখন চেয়ারে বসে করপুটে ধরা ব্রহ্মচারীর মৃত শরীরের দিকে চেয়ে ছিল। বলল, কী চাস?
পাখিটা দাও।
কী করবি?
দাতাবাবার কাছে নিয়ে যাব।
সে কে?
একজন গুণীন।
অবাক হয়ে বিজু বলে, সে কী করবে?
সে মরা জিনিস বাঁচাতে পারে।
ধুস। এখন যা, আমার মন ভাল লাগছে না।
মা যায়নি। দরজার কাছেই দাঁড়িয়েছিল। বলল, দে না ওকে। গুণীন-টুনিনরা তো অনেক কিছু পারে।
কী যে সব আনসায়েন্টিফিক কথা বলো তার ঠিক নেই।
চেষ্টা করতে দোষ কী? দুনিয়ায় কত কিছু হয়, আমরা কি তার খোঁজ রাখি!
এসব করে কি আমাকে ভোলাতে পারবে? আমি তো আর বাচ্চা ছেলে নই।
হারানি হাতটা বাড়িয়েই ছিল। বলল, দাও না আমাকে।
বিরক্ত বিজু মৃত পাখিটা ওর হাতে দিয়ে বলল, গুণীনের কাছে যেতে হবে না। মাটিতে গর্ত করে পুঁতে দিস।
সকাল থেকে মনটা বড় খারাপ বিজুর। তার নির্জন ঘরে পাখিটার আনাগোনা বন্ধ হয়ে গেল। যতদিন না আর কোনও ব্রহ্মচারীর আগমন ঘটে।
পিছনে বিরাট বাগান করেছে নরহরি। ওটা তার বরাবরের নেশা। বাগানে সবজি ফলাবে। যত না খাবে তার বহুগুণ বেশি বিলোবে। মুলো, পালং, কপি, আলু অবধি। এই সময়টায় বাবা বাগানে বহুক্ষণ কাটায়। সঙ্গে জনা দুই মুনিশ থাকে। ঘরের জানালাগুলো খুলে দিল বিজু। পুবের জানালা দিয়ে শীতের রোদ এসে পড়ল অনেকখানি মেঝে আর বিছানা জুড়ে।
মা মশারি খুলে ভাঁজ করে রেখে বিছানায় বেডকভার ঢাকা দিতে দিতে বলল, অমন মন খারাপ করে বসে আছিস কেন? মানুষ তো মশা-মাছিও মারে। পায়ের তলায় পিঁপড়েও তো মরে। তা বলে কি পাপ হয় নাকি?
বিজু জবাব দিল না। মাকে নিয়েও তার সমস্যা বড় কম নয়। তার মা হল পুত্রগতপ্রাণ। ছেলের প্রতি মার পক্ষপাত দৃষ্টিকটু পর্যায়ের। তার দুই দিদিই বহুবার কথাটা বলেছে। বিয়ের আগে মাঝে মাঝে বিজুকে নিয়ে মার সঙ্গে প্রায়ই খিটিমিটি বাধত তাদের। দিদিদের যুক্তি যথেষ্ট জোরালোই ছিল। বিজু মাকে কতদিন বকেছে, তোমার এত পারশিয়ালিটি কেন মা?
আজও, ছেলের প্রতি মার ওই দুরারোগ্য পক্ষপাত বিজুকে বিরক্তই করে। বিজু একটু চুপ করে বসে থাকলে, বাড়ি ফিরতে একটু দেরি করলে বা কোথাও ট্রেকিং কি বেড়াতে গেলে মা অস্থির হয়ে পড়ে। তার মার জন্যই সে আজ অবধি অনেক ইচ্ছেকে চেপে রেখে দিয়েছে।
টান ভালবাসা যে মানুষকে কখনও কখনও কত অপদার্থ করে দেয় তা বিজু ভালই জানে। দশ-বারো বছর বয়স অবধি সে নিজের হাতে খেতে পারত না, পোশাক পরতে পারত না। এই যে সে দোতলার ঘরে একা থাকে তাতে মার স্বস্তি নেই। দিনে শতেকবার নানা ছুতোয় এসে তাকে দেখে যায় মা। সবসময়ে সামনে আসে না, সবসময়ে জানান দেয় না। কিন্তু গোয়েন্দার মতো নজর রাখে। তার এই ঘরের একাকিত্ব আজও নিরঙ্কুশ নয়।
মাঝে মাঝে মার ওপর রেগে যায় বিজু। আবার মায়াও হয়।
সে মার দিকে চেয়ে বলল, এখন আমাকে একটু একা থাকতে দাও তো। আমার ভাল লাগছে না।
মা চলে যাওয়ার পর খোলা ছাদে রোদের মধ্যে কিছুক্ষণ ঘুরে বেড়ায় বিজু। মন ভাল নেই। মন ভাল নেই। দুদিন ঝড়জলের পর আজ ভারী সুন্দর দিন। তীব্র উত্তরে বাতাস আর রোদ মিলে ঝলমল করছে একটা ধোয়ামোছা সকাল। গাছে গাছে বাতাসের ঝোড়ো শব্দ। চারদিকে পাখির ডাক। মন ভাল নেই।
এই যে এত সহজেই তার মন খারাপ হয়ে যায়, এটা সুলক্ষণ নয়। আইনস্টাইন একবার বলেছিলেন, ব্যক্তিগত মৃত্যুচিন্তা আমার নেই। কারণ চারদিকে যে প্রাণের লীলা, প্রাণের এত প্রকাশ তার মধ্যেই আমিও একজন মাত্র। আমি এই প্রাণবন্যারই একটি ক্ষুদ্র অংশ মাত্র।
কী বলতে চেয়েছিলেন তিনি? সে কি এই যে, একটাই সত্তার প্রকাশ ঘটছে ঘটে ঘটে, নানা বিভঙ্গে, মূর্তিতে, আকারে, বিশিষ্টতায়? এই যে ব্রহ্মচারী আজ মারা পড়ল এটা কিছু নয়। একটি প্রাণ নিবে গেলেও যৌথ প্রাণ জেগে আছে? কিংবা এরকমই কিছু?
বিজুদা! এই বিজুদা!
কে রে?
আমি। ন্যাড়া ছাদের ধারে এগিয়ে গিয়ে বিজু দেখে, পান্না। ঊর্ধ্বমুখে দাঁড়িয়ে হাত দিয়ে চোখের রোদ আটকাচ্ছে।
কী রে?
একটু ওপরে আসব?
আয় না! অনুমতি নেওয়ার কী হল?
কী জানি বাবা। ছোটমা বলল, পাখি মরেছে বলে তোমার নাকি মন খারাপ৷
তা খারাপ একটু আছে। মা কি তোকে আসতে বারণ করল নাকি?
না। শুধু বলল, মেজাজ বিগড়ে আছে, বুঝেসুঝে যাস।
আসতে পারিস।
তোমার বাঁদরটা কি ওপরে নাকি?
আরে না। ও তো রাতেরবেলায় গোয়ালে বাঁধা থাকে।
ভারী অসভ্য বাঁদর।
কেন রে?
বাঃ রে, সেদিন তোমার কাঁধ থেকে নেমে আমাকে তাড়া করেছিল না?
তুই ওকে ক্ষ্যাপাচ্ছিলি বলেই তাড়া করেছিল। এমনি নয়।
বাঁদরকে সবাই ক্ষ্যাপায়।
তাহলে তাড়াও খেতে হয়।
আসছি, দাঁড়াও।
পান্না ওপরে উঠে এল।
এই সাতসকালে কী এমন কথা রে তোর?
তোমার তো ইন্টারনেট আছে, তাই না?
ইন্টারনেট! পাগল নাকি? তোর কি ধারণা পশ্চিমবঙ্গে গাঁয়ে গাঁয়ে ইন্টারনেট পৌঁছে গেছে?
এ মা! আমি যে একজনকে বললাম তোমার ইন্টারনেট আছে!
কাকে বললি?
সেটা বলা যাবে না। কারণ আছে। নেই তাহলে?
না। ইন্টারনেট দিয়ে কী হবে?
একটা ওয়েবসাইট ধরতে হবে।
কোন ওয়েবসাইট?
ডিপ্রেশন ডট কম।
ডিপ্রেশনটা কার হল? তোর নাকি?
ডিপ্রেশন কার নেই বলো। আমার, তোমার, সকলেরই আজকাল খুব ডিপ্রেশন। এই যে চড়াইপাখিটা মরে গেল তুমি ডিপ্রেসড।
চড়াইপাখিটা আমার একজন ভাল বন্ধু ছিল, জানিস? আসত, যেত, কোনও ঝামেলা ছিল না। ভদ্র, সভ্য, একা একটা পাখি।
বাব্বাঃ, তোমার যে কাব্য বেরোচ্ছে বিজুদা! ক্রৌঞ্চমিথুনের দুঃখে বাল্মীকির যেমন ধারা হয়েছিল।
তোর মাথা।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পান্না বলে, একটা পাখির জন্য তোমার যা দরদ তার একশো ভাগের এক ভাগও যদি আমাদের জন্য থাকত।
কেন রে, তোর আবার আলাদা দরদের দরকার হল কেন? দিব্যি তো আদরে আহ্লাদে বখা হয়ে যাচ্ছিস। কাকা আর কাকিমা আসকারা দিয়ে মাথাটা চিবিয়ে খেয়েছে।
আহা, আর বোলো না। বাবা মা দেবে আমাকে আসকারা! উঠতে বসতে মা চুলের মুঠি ধরতে আসে, জানো? আর বাবা তো কবেই আমাকে বেড়াল পার করতে চেয়েছিল গৌরীদান করে। সব ভুলে গেছ?
তাই তো! তোর তো তবে বড্ড দুঃখ।
ইয়ার্কি কোরো না, ভাল লাগে না।
তোতার মাথা আরও একজন চিবিয়ে খাচ্ছে।
ওমা! আবার কে চিবিয়ে খাবে গো! আমি কি রুইমাছ নাকি যে সবাই আমার মুড়ো চিবোবে!
রুইমাছ নোস, তুই হচ্ছিস হদ্দ বোকা আর গেঁয়ো একটা মেয়ে।
কেন ওকথা বলছ! আমার যে ভয় লাগছে!
ভয় লাগছে না হাতি! ও মেয়েটার সঙ্গে তোর অত মাখামাখি কীসের?
কোন মেয়ে? কার কথা বলছ?
কার কথা বলছি ভালই জানিস।
বুঝেছি। সোহাগ তো!
ও মেয়েটার নামে নাকি তোর নাল গড়ায়! এই তো সেদিন কাকিমা বলছিল, রাত নেই দি নেই যখন-তখন এসে হামলে পড়ে। তারপর দরজা বন্ধ করে গুজগুজ ফুসফুস।
যাঃ, মোটেই না। মা ওরকমই। তিল থেকে সবসময়ে তাল বের করে।
তার মানে কি সোহাগ তোর কাছে আসে না?
আসবে না কেন? মাঝে মাঝে আসে।
এসে তোর পড়াশুনো নষ্ট করে?
মোটেই না। খুব এটিকেট মেনে চলে। ও আসে দুপুরবেলা, তখন আমি পড়ি না।
কী মন্ত্রে দীক্ষিত করছে তোকে?
যাঃ, কী যে বলো না। সোহাগ খুব ভাল মেয়ে। খুব দুঃখী। একটু পাগলাটে আছে বটে, কিন্তু খারাপ নয় তো! তোমার বাপু, সোহাগের ওপর বড্ড বেশি রাগ।
অকারণে রাগ তো নয়। যেসব ছেলেরা ওর পিছনে লাগত, আজকাল দেখছি তাদের সঙ্গে মাঠেঘাটে বসে আড্ডা দিচ্ছে।
তাতে কী হয় বিজুদা? ছেলেগুলোর সঙ্গে ভাব করায় ওরা আর তো ওর পিছনে লাগে না।
মাঝখান থেকে ছেলেগুলোকে শাসন করতে গিয়ে আমিই আহাম্মক হলাম। ডিসগাস্টিং।
রাগ করছ কেন? দোষটা ওর নয়।
তবে কার?
একটু ভেবে পান্না বলল, বোধহয় আমার।
তোর দোষ কেন হবে?
ছেলেগুলো একদিন আমার সামনেই ওকে যা-খুশি বলছিল। তাতে আমি ভীষণ রেগে গিয়ে তোমার কাছে নালিশ করে দিই। সোহাগ কিন্তু বারণ করেছিল।
জানি৷ বড়মার কাছেও বলে গেছে ওর নাকি আমার সাহায্যের দরকার নেই। খুব দেমাক। এখন হয়তো আমার মুখে চুনকালি মাখানোর জন্যই ওই ছেলেগুলোকে জুটিয়ে মক্ষীরানি সেজেছে।
ওর ওপর তোমার খুব রাগ, না?
কথাটা দুবার বললি। রাগ হওয়ার কারণ ঘটলেই রাগ হয়।
কথাটা একটু বোঝার চেষ্টা করো। সোহাগ বলে, পৃথিবীর সব জায়গায় তো বডিগার্ড নিয়ে ঘুরে বেড়ানো যাবে না। তাই মেয়েদের নিজেদেরই আত্মরক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। আর আত্মরক্ষার সবচেয়ে ভাল উপায় হল শত্রুকে বন্ধু করে নেওয়া।
বেশ কথা। মেয়েদের বন্ধু জোটাতে সময় লাগে না, বিশেষ করে যদি একটু চটক থাকে। ও যেসব ছেলেদের সঙ্গে মেশে তারা কী ধরনের ছেলে তা কি ও জানে? তা ছাড়া এসব বেলেল্লাপনা কি গাঁদেশে চলে?
দিনকাল পালটে গেছে বিজুদা৷
কবে পালটাল? আর পালটালে তুই টের পেলি, আমি পেলাম না কেন?
বড্ড রেগে আছ তুমি। আজ পাখিটা মরে যাওয়ায় সত্যিই তোমার মাথা গরম।
হ্যাঁ, গরম। আজ আমার মন ভাল নেই। পাখি, জীবজন্তু, কীটপতঙ্গ, গাছপালা এসব নিয়েই পৃথিবীর পরিমণ্ডল। সবাইকেই পৃথিবীর দরকার। নইলে এত সব প্রাণীর বৃথা সৃষ্টি হত না। মানুষ সেটা বুঝতে বড় সময় নিচ্ছে। ওই যে লোকটা—কী নাম যেন— জিম করবেট, তাকে প্রায় মহাপুরুষ বানানো হয়েছে। লোকটার শিকারকাহিনী এখনও রাশি রাশি বিক্রি হয়। লোকটার মস্ত কৃতিত্ব হল বন্দুক দিয়ে বাঘ মারা। এটা কোনও বীরত্বের কাজ? আমি সেসময়ে ক্ষমতায় থাকলে লোকটিকে দেশ থেকে বের করে দিতাম। ওরা হচ্ছে সেই জাত যারা বছরে একবার শেয়াল মারার উৎসব করে।
ওঃ, আজ তুমি বড্ড রেগে আছ বিজুদা।
রাগলে কী হবে? এ হল ফান্টুস রাগ। এ রাগ দিয়ে কাজ হয় না। শুধু হাত কামড়ে মরি। পাখিটা মরল কেন জানিস? মা আর হারানির বুদ্ধির দোষে। পাখাটা চালানোর দরকার ছিল না, জানালাটা খুলে দেওয়া উচিত ছিল। বেরোতে না পেরে পাখিটা ভয় খেয়ে দিশেহারা হয়ে পাখাটায় ধাক্কা খেল। হি ওয়াজ গুড ম্যান।
ম্যান?
আমার কাছে পাখিটা তাই ছিল। এ ম্যান, এ জেন্টেলম্যান।
মেয়ে পাখিও তো হতে পারে।
তা পারে।
মেয়েই হবে।
কী করে বুঝলি?
হি হি করে হেসে পান্না বলে, ওটা ছিল তোমার গার্লফ্রেন্ড।
মারব থাপ্পড়। যা ভাগ এখন।
ওয়েবসাইটটার কী হবে?
কিছু হবে না। তোর বন্ধুকে কলকাতায় যেতে বল।
আচ্ছা, একটা কথা বলবে?
আবার কী কথা?
সেদিন বৃষ্টির মধ্যে তোমাদের ভিতর কী হয়েছিল?
আচমকা বিজুর কান গরম হয়ে গেল। মুখখানা লাল। পান্নার চোখ থেকে চোখ সরিয়ে নিল সে।
বিজু ভেবেছিল, দৃশ্যটা কেউ দেখেনি। ক্ষীণ আশা ছিল, সোহাগ কাউকে ঘটনাটার কথা বলবে না। তাই ধরা পড়ে গিয়ে নিজের ওপরেই রাগ হচ্ছে তার।
বিজু বলল, কেন বল তো! তোকে সোহাগ কিছু বলেছে?
খুব বেশি বলেনি।
কী বলেছে?
বলেছে, তোমাদের মধ্যে একটা বিচ্ছিরি ইনসিডেন্ট হয়েছে।
ওভাবে বললে লোকে অন্য কিছু ধরে নিতে পারে।
তোমরা কি ঝগড়া করেছ?
বরং ঝগড়াই ভাল ছিল। এটা তার চেয়েও খারাপ।
কী হয়েছিল বিজুদা?
মেয়েটা যে পাগল তা জানিস?
আছে একটু। সকলের মতো তো নয়। ও একটু অন্যরকমভাবে চিন্তাভাবনা করে।
পাগলরাও তো তাই। তারা আর পাঁচজনের মতো নয়, তাদের চিন্তার জগৎ আলাদা। তাই তো!
পায়ে পড়ি, বলো না!
মেয়েটা সেদিন ওই ঠান্ডায় আর ভয়ংকর বৃষ্টির মধ্যে কাঞ্জিলালের জমিটায় নেচে বেড়াচ্ছিল।
হ্যাঁ, এরকম সব কাণ্ড ও করে তো।
দোষের মধ্যে আমি গিয়ে ওকে অ্যালার্ট করার চেষ্টা করি।
ভালই তো করেছিলে।
করুণ একটু হেসে বিজু বলল, ভাল আর হল কই? আমি বারবার ডাকছিলাম। সাড়া না পেয়ে গিয়ে হাত ধরে ঝাঁকুনি দিতেই ও কেমন অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছিল। তারপর উঠে সে কী রাগ! পাগল আর কাকে বলে!
একটু চুপ করে থেকে পান্না বলল, হ্যাঁ, ওর নাকি মাঝে মাঝে একটা ট্রান্সের মতো হয়। সে সময়ে কেউ ওকে ধরলে অজ্ঞান হয়ে যায়।
ও হল মৃগি রোগ, বুঝলি! মৃগির সঙ্গে পাগলামি।
সবাই তো একরকম হয় না বিজুদা। ও ওর মতো।
বন্ধুর হয়ে ওকালতি করতে এসেছিস?
তা নয়। একটু বুঝবার চেষ্টা করো। ও খুব দুঃখী একটা মেয়ে।
দুঃখী!
খুব দুঃখী। তুমি বুঝবে না বিজুদা। মা-বাবার কাছ থেকে ও কোনও প্রশ্রয় পায় না। খুব অশান্তি ওদের সংসারে। সবাই নাকি সবাইকে ঘেন্না করে।
আমার ওসব জেনে কী হবে?
একটু চুপ করে থেকে পান্না বলে, ও তোমার কাছে ক্ষমা চেয়েছে।
নাটক নাকি?
সত্যিই চেয়েছে।
আর নাটকের দরকার নেই। ঘটনাটা আমি ভুলে যাব।
ওকে কী বলব?
কিছু না।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন