শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
টুপুকে সে পুকুরে স্নান করতে দেখেছিল। টুপু বেশ দীঘল, লম্বাটে ঢলঢলে মুখ। চোখ দুখানা খুব ঝকঝকে। এসব আগে কখনও দেখেনি সে। পরশু দেখল। দুপুরবেলা সে উঠেছিল মনু পিসিমার আমগাছে ভীমরুলের চাক ভাঙতে। কষে ঘুঁটে আর ভেজা তুষ এবং কাঠকুটোর ধোঁয়া দিয়েছিল মনুপিসি। শীতের দুপুরে থম-ধরা বাতাসে ধোঁয়ার কুণ্ডলি পাকিয়ে উঠতেই ভোঁ ভোঁ করে একটি দুটি ভীমরুল উড়ে যেতে লাগল। ধোঁয়া মোটে সহ্য হয় না ওদের। উড়ন্ত কীট পতঙ্গরা ধোঁয়া সহ্য করতে পারে না কখনও।
মনুপিসি কদিন ধরেই বলছিল, সবাইকে বলে বলে মুখ ব্যথা হয়ে গেল বাবা, ভীমরুলের চাক ভাঙতে কেউ সাহস পায় না। তুই তো ডাকাবুকো আছিস, দে বাবা ভেঙে, নইলে কবে কোন দুষ্টু ছেলে দূর থেকে ঢিল মেরে পালায়, তখন কি রক্ষে আছে? ভীমরুলের হুল যমের দোর। শয্যে নিতে হবে। দে বাবা ভেঙে, পেট ভরে পিঠেপায়েস খাওয়াব।
মরণ এসব কাজ খুব পারে। বোলতা, ভীমরুল, মৌমাছির হুল কতবার খেয়েছে সে। ওসব তার তেমন লাগে না। গতবার যখন একটা প্রায় এক ফুট লম্বা পাকা তেঁতুলবিছে তাকে কামড়েছিল তখন তো ব্যথায় নাকি তার হার্টফেল করার কথা। কিন্তু সেই আশ্চর্য সাংঘাতিক ব্যথাও প্রায় নীরবে সহ্য করেছিল সে। পাড়ার লোকে তাকে বর্ধমান মেডিক্যাল কলেজে নিয়ে যায় ভয় পেয়ে। সেখানকার ডাক্তারবাবু পর্যন্ত তাকে অবশ করার ইনজেকশন দেওয়ার সময়ে বলেছিল, এ ছেলেটির ব্যথা সহ্য করার শক্তি তো সাংঘাতিক! এসব কেসে ব্যথায় তো অনেকে মরেও যায়।
মরণ মরেনি। বরং তার মনে হয়েছে, সে এর চেয়েও বেশি ব্যথা অনায়াসে সহ্য করতে পারে। মানুষ ব্যথাকে খুব ভয় পায়। মরণ পায় না। বরং ব্যথাকে তার কখনও কখনও বন্ধু বলে মনে হয়।
আমগাছটা বড্ড পুরনো। বর্ষাকালে মনুপিসির এই আমগাছের কোটর থেকে সে একটা সাপকে বেরোতে দেখেছিল। কে জানে সাপটা হয়তো এখন কোটরের মধ্যে শীতঘুম ঘুমোচ্ছে। মোটা আমগাছটায় হালকা শরীরে দিব্যি উঠে গেল মরণ। কোমরে দা। ভীমরুলের মস্ত মাটির চাকটা অনেক ওপরে। এক-আধটা ভীমরুল থেকেও যেতে পারে হয়তো। কিন্তু এসব ভয় মরণের নেই। সে বিশাল চাকটাকে দা দিয়ে কুপিয়ে ভেঙে ফেলতে লাগল টুকরো টুকরো করে। একটু মায়াই বরং হচ্ছিল তার। কী সুন্দর মসৃণ চাকটা বানিয়েছে ভীমরুলরা, কত কষ্ট করে।
আর তখনই নীচের পুকুরে তাকিয়ে সে টুপুকে দেখতে পেয়েছিল। জলে ডুব দিয়ে উঠছে। লম্বা চুল লেপটে আছে গালে, কপালে। ভেজা ফ্রক আঁকড়ে ধরেছে লতানে শরীর। বুকে সদ্য ফুটে ওঠা দুটি স্তন। দেখতে নেই। ওসব দেখতে নেই। লজ্জার কথা। তবু কি চোখ মানে! পাপ হচ্ছে। “শিবঠাকুর! শিবঠাকুর!” বলে যে বিড়বিড় করল কয়েকবার। কিন্তু এ যেন আঠাকাঠিতে আটকে পড়া পাখি। তার চোখ বারবার ধেয়ে যায় টুপুর দিকে।
ডুব দিয়ে উঠে ফের সাঁতার কাটছিল টুপু। গাঁয়ের মেয়েরা ভাল সাঁতার জানে না। ঘুপ্ ঘুপ্ করে জল ভেঙে ভেঙে এগোয়। আমগাছে ডালপালার আড়ালে বসে চোরের মতো দেখছিল মরণ।
নীচে উর্ধ্বমুখ হয়ে দাঁড়িয়ে আছে মনুপিসি।
ও মরণ! সবটা ভেঙেছিস তো বাবা? ভাল করে জায়গাটা চেঁছে দে। বাসার গোড়া থাকলে আবার না এসে জোটে।
না পিসি, আর জুটবে না। ভাল করে চেঁছে দিয়েছি।
তাহলে নেমে আয় বাবা। পরের ছেলে, পড়ে-উড়ে গেলে বড় পাপ হবে।
মরণ তবু একটু অপেক্ষা করল, টুপু জল থেকে উঠে গামছা নিংড়োচ্ছ, দুটো হাত তুলে মাথা মুছছে। চুলে গামছার ঝটকা মারছে। মুগ্ধ চোখে দেখছিল সে।
টুপুকে সে পুকুরে স্নান করতে দেখছে। টুপুর বয়স চৌদ্দ। তার চেয়ে দু বছরের বড়। কিংবা তাও নয়। এক বছর কয়েক মাস।
কেউ তাকে বারণ করেনি তবু তার মনে হয়, বড় মেয়েদের এভাবে দেখতে নেই। ড্যাব ড্যাব করে চেয়ে থাকলে মেয়েরা রাগ করে। দোষ হয়। টুপু অবশ্য তেমন বড় মেয়ে নয়। মরণের চেয়ে একটু বড়। ওরও ক্লাস সিক্স। এই তো সেদিনও টুপু গোল্লাছুট কি দড়ি লাফানো কি চারা ছুড়ে এক্কাদোক্কা খেলত, দুই বেণী দুলিয়ে স্কুলে যেত। কতবার তাদের বাড়ি এসেছে নুন, তেল, চিনি ধার করতে। মায়ের সঙ্গে যোলো গুটি খেলেছে দুপুরে। কখনও তাকিয়েও দেখেনি মরণ। আজ সেই গুয়ের গ্যাংলা মেয়েটার ভিতর থেকে কি রাজকন্যা বেরিয়ে এল? রাজকন্যা বললে বাড়াবাড়ি হয়ে যাবে। রাজকন্যাদের থাকে দুধে-আলতায় গায়ের রং—সেটা কীরকম রং তা অবশ্য মরণ জানে না। আর থাকে কুঁচবরণ কেশ। কুঁচফল খুব চেনে মরণ, তাদের বাড়ির বেড়াতেই তো কত লতিয়ে ওঠে। ছোট্ট দানার আধখানা লাল, বাকি অর্ধেক কালো। এত সুন্দর ফল যে কেন খাওয়া যায় না কে জানে। কুঁচবরণ কেশকি লাল না কালো তা নিয়ে ধন্ধ আছে মরণের। রাজকন্যাদের আরও কী কী সব যেন থাকে। না, টুপু মোটেই রাজকন্যার মতো নয়। তবু টুপুর ভিতর থেকে এক অচেনা টুপু বেরিয়ে এসে ওই চান করছে পুকুরের জলে। মরণ তাকে দেখছে, আর পাপ করছে। শিবঠাকুর এত পাপ সইবে কি? শিবঠাকুরকে তার বড্ড ভাল লাগে। সব দেবতার মধ্যে শিবঠাকুর তার সবচেয়ে প্রিয়। আর শিবঠাকুরকে মরণ যখনই ডাকে তখনই যেন এসে হাজির হন। না, চোখ খুললে দেখা যায় না ঠিকই, কিন্তু কষে চোখ বন্ধ রাখলে ঠিক তাঁর গায়ের সুন্দর বোঁটকা গন্ধটা পায় মরণ। শিবঠাকুর তো আর সাবান মাখে না, তার ওপর শ্মশান-মশানে পড়ে থাকে, গায়ে ছাই-টাই মাখে, বোঁটকা গন্ধ হতেই পারে। সেই গন্ধটা খুব ভাল লাগে মরণের।
শিবঠাকুরের কাছে মরণ যা চায় তাই শিবঠাকুর দিয়ে দেন। না, সব দেন না। আসলে শিবঠাকুর তো বড্ড ভুলো মনের মানুষ। আধখানা হয়তো দিলেন, বাকি আধখানা দিতে ভুলেই গেলেন। তবুমরণ যা চায় তার সবটাই প্রায় তাকে দিয়ে দেন শিবঠাকুর। তাঁর বরেই না তার মাকে মা বলে ডেকে ফেলল দাদা। দিদিটা তেমন সুন্দর হল না ঠিকই, কিন্তু কেমন ভাব করে গেল মরণের সঙ্গে! তাকে দাদা আর দিদির খুব পছন্দ হয়েছে। তারা বলে গেছে আবার আসবে। হয়তো বড়মাও আসবে একদিন। শিবঠাকুরের কাছে এই বরটা চেয়ে রেখেছে মরণ। হে ঠাকুর, বড়মা এসেও যেন আমাকে খুব ভালবাসে। আমি তো বাঁদর ছেলে, লেখাপড়ায় নম্বর পাই না, আবার নামটাও ভারী বিশ্রী, তবু যেন বড়মা আমাকে অপছন্দ না করে। যেন বলে, ও মরণ, আমার সঙ্গে কলকাতায় চল তো বাবা! তোকে আমিই মানুষ করব। না, তা বলে মরণ হুট করে চলেও যেতে পারবে না। ঠিক বটে, মায়ের ওপর রাগ হলে সে মাঝে মাঝে কলকাতায় বড়মার কাছে চলে যাবে বলে ঠিক করে ফেলে। আবার এও মনে হয়, মাকে ছেড়ে সে তো থাকতেও পারবে না। মা কেঁদে কেঁদে মরেই যাবে। আর মাকে ছেড়ে তারও খুব মন খারাপ হবে।
জিজিবুড়ি অবশ্য খলখল করে হেসে বলে, ওরে, ও ডাইনি এল বলে। আগে ছানাপোনা পাঠিয়ে তত্ত্বতালাশ নিয়ে রাখল। ওরা হচ্ছে ডাইনির চর। তারপর সে এসে মুষলপর্ব শুরু করবে। তোর মেনিমুখো মা পারবে তার সঙ্গে যুঝতে? বেড়াল কুকুরের মতো তাড়াবে। কত করে বললুম, ওলো, ভাইদের হাতে দলিল-টলিলগুলো সব দিয়ে রাখ। তারা ভাল উকিল লাগিয়ে সব বুঝে রাখবে। তা শুনল আমার কথা? কিছু কিছু করে টাকাপয়সা সরিয়ে আমার কাছে গচ্ছিত রাখতে বললুম, তা মেয়ের কী রাগ! ওরে গর্ভধারিণী মাকে অবধি তোর বিশ্বাস হয় না এমন গুণ তোকে কে করল বল তো!
মরণ জানে জিজিবুড়ির অনেক দোষ আছে। কিন্তু মরণের তাকে মোটেই খারাপ লাগে না। জিজিবুড়ি তাকে অনেক গল্প শোনায়। আর কাছে বসলেই জিজিবুড়ির গা থেকে দোক্তার মিষ্টি গন্ধ আসে। আর জিজিবুড়ি খারাপ লোক হলেও মরণকে ভালবাসে খুব। অসুখের সময় তার শিয়রে বসে কী কান্না!
সংসারের এই খারাপ, ভাল লোকের বিচারটা ভাল বুঝতে পারে না মরণ। জিজিবুড়িকে বাড়ির সবাই খারাপ বলে, কিন্তু বুড়িটার জন্য মরণের বড় মায়া। সে অনেক সময়ে চুরি করে জিজিবুড়িকে জিনিসপত্র দেয়। বাঙাল কলকাতা থেকে ফি সপ্তাহে রাজ্যের জিনিস নিয়ে আসে। সংসারের যাবতীয় জিনিস— দড়িদড়া থেকে আচার আমসত্ত্ব সোনামুগের ডাল অবধি। সব জিনিসেরই অবশ্য হিসেব থাকে তার মায়ের। বাবা বেহিসেবি কেনাকাটা করলেও মা সব গুছিয়ে গুনেগেঁথে খাতায় লিখে রাখে। তাই থেকে মাঝে মাঝে জিজিবুড়ি চায়। মা দেয় না। তখন হয়তো চুপি চুপি মরণকে বলে, দিবি ভাই, এক শিশি মধু? বাঙাল নাকি কোথা থেকে খাঁটি চাকভাঙা মধু আনে। তা বাঙালরা খাবার জিনিস খুব চেনে। ওরা রাক্ষসের জাত ত, খেতে-টেতে খুব ভালবাসে।
তা দেয় মরণ। কিন্তু মায়ের কাছে ধরাও পড়ে যায়। মা একদিন গুম করে তার পিঠে কিল দিয়ে বলেছিল, অত আদিখ্যেতা কীসের রে? তুই দিতে যাস কেন? মাকে যখন যা দেওয়ার আমিই তো বুঝে- সুঝে দিই। কাঙাল ভিখিরির মতো হাত তো পেতেই আছে সব সময়। সব খাঁই মেটাতে গেলে তো আমার সংসার লাটে উঠবে। দানছত্র তো খুলে বসিনি।
তা জিজিবুড়ির জন্য একটু কষ্ট আছে বটে মরণের। মা বলে, জিজিবুড়ির কথায় নাকি এমন ধার যে লোহা কাটতে পারে। কটর কটর কথা বললেও জিজিবুড়ির কি গুণও নেই? মহাভারতের অত কথা জিজিবুড়ির মতো কেউ জানে? কত অবাক করা গল্প শোনায় তাকে জিজিবুড়ি!
তবে হ্যাঁ, যখন জিজিবুড়ি বড়মাকে ডাইনি ডাকে তখন তার কষ্ট হয়। কিংবা বলে, ওই বড় মাগী কি আর তোর মায়ের মতো বোকা মাথার মানুষ? শহুরে মেয়েছেলে বাবা, জাঁহাবাজ মানুষ, সাত হাটে তোর মাকে বিক্রি করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। তার ওপর যদি সেও বাঙাল মেয়েছেলে হয়ে থাকে তবে তো আরও চিত্তির। শুনি তো নাকি হুগলির মেয়ে। ও বাপু, আমার বিশ্বাস হয় না। বাঙালরা কত ফেরতাই জানে। দ্যাখ গে খোঁজ নিয়ে, সে মাগীও বাঙাল। এসব শুনলে মরণের ভারী রাগও হয়। বড়মার একটা ছবি সে তার মনের মধ্যে টাঙিয়ে রেখেছে। বড় বড় শান্ত চোখ, মুখে একটু প্রশ্রয়ের হাসি, আর ভারী ঢলঢলে দুর্গা প্রতিমার মতো মুখ। তবে না বড়মা! যদি সত্যিকারের বড়মা ওরকম নাও হয় তবু মরণ ঠিক মানিয়ে নেবে। জিজিবুড়ি যে কেন ওসব বলে।
মা কিন্তু কখনও বড়মা সম্পর্কে খারাপ কথা বলে না। তবে একটু ভয় পায়। মা অবশ্য সব কিছুতেই ভয় পায়। ভয়ের শেষ নেই মায়ের। দাদাকে ভয়, দিদিকে ভয়। বড়মাকে দেখেনি, কেমন মানুষ তাও জানে না। ভয়টা সে কারণেই। কিন্তু মরণ বড়মাকে ভয় পায় না। সে ঠিক জানে, শিবঠাকুর তার বড়মাকেও ঠিক মনের মতোই করে একদিন এই গাঁয়ে নিয়ে আসবেন।
সবাই জানে সে বাঁদর ছেলে। টুপুও তাই জানে। এ-গাঁয়ে মরণের কোনও সুনাম নেই। অনেকদিন আগে টুপুদের বাড়িতে বর্ষাকালে একদিন মেঘ কেটে রোদ ওঠায় তোশক বালিশ রোদে দেওয়া হয়েছিল উঠোনে। বিকেলবেলায় তোশক তুলবার সময় মস্ত এক কেউটে সাপ বেরিয়ে এসেছিল তোশকের ভাঁজ থেকে। প্রবল চিৎকার আর চেঁচামেচি শুনে দৌড়ে গিয়েছিল মরণ। বাড়ির সবাই বারান্দায় উঠে পড়ে তারস্বরে চেঁচাচ্ছিল। বিশাল সাপটা বুকসমান ফণা তুলে দুলছিল উঠোনের মাঝমধ্যিখানে।
এসব মরণের কাছে জলভাত, কত সাপ মেরেছে সে। যদি বুদ্ধি থাকত তাহলে সাপেরা মরণের বিরুদ্ধে মিটিং বসাত। সে একখানা আধলা ইট তুলে ঘাঁই করে মেরে দিয়েছিল। তার হাতের টিপ কখনও ফসকায় না। একবারেই সাপের মাথা থেঁতলে দিয়েছিল সে। কিন্তু দুঃখের বিষয় তখন তার ওই বাহাদুরিতে বাহবা দেওয়ার মতো বড় ছিল না টুপু। আর তখন লক্ষ করে দেখার মতোও ছিল না হাড় জিরজিরে মেয়েটা। এই টুপু অন্য আর একজন, যেন এ-গাঁয়ে নতুন আসা মেয়ে। একে কী বাহাদুরি দেখাতে পারে মরণ? ধারেকাছে তো ফণা-তোলা সাপ নেই!
গাছের একটা আড়া ডাল অনেকখানি এগিয়ে ঝুঁকে আছে পুকুরের ওপর। মরণ হিসেব করে দেখল ওই ডালটা বেয়ে যদি একেবারে শেষপ্রান্তে যাওয়া যায় তাহলে পুকুরের জলে লাফিয়ে পড়া সম্ভব। তবে একটু ভুলচুক হলে ঘাটের সান বাঁধানো সিড়িতে পড়ে যাওয়া বিচিত্র নয়। বাহাদুরিটা দেখাতে পারলে এই নতুন টুপু কি নতুন চোখে তাকে দেখবে না? একটু হিরোর মতো ভাববে না তাকে?
আড়া ডালটায় নামা কঠিন নয়, কিন্তু মুশকিল হল, গাছটা পুরনো, পোকা-টোকা লেগে যদি আড়া ডালটার গোড়া কমজোরি হয়ে গিয়ে থাকে তাহলে আগার দিকে মরণের ভার বইতে না পেরে মড়মড় করে ভেঙে পড়তে পারে। তা পড়ুক, তাহলেও তো মরণের জন্য একটু আহা উহু করবে ওই নতুন টুপু!
ওপরের ডাল থেকে হাতের ঝুল খেয়ে তলার ডালটায় নেমে পড়ল মরণ। আড়া ডালটা মোটা, মরণ গাছের চরিত্র খুব ভাল চেনে, মোটা ডাল মানেই ভারী জিনিস। অনেকখানি ঠেকননাহীন ক্ষীণ ঝুলে আছে বলে এসব ডালই বেশি বিপজ্জনক, যখন তখন ভেঙে পড়তে পারে। কিন্তু অত হিসেব করার সময় নেই। টুপুর চুল ঝাড়া হয়ে গেছে। এবার চলে যাবে। হাওয়াই চটি জোড়া জলে ধুতে সিঁডিতে নেমে টুপু জলেনামা অন্য কয়েকজন মেয়েছেলের সঙ্গে কথা কইছে। বিশ্বাস বাড়ির বড়বউ রাধিকা, নয়নের বুড়ি পিসি, কাদুর মা।
মরণ বুক হেঁচড়ে ডালটা বেয়ে বেয়ে ঠিক চলে এল ডগায়। ডালটা দোল খাচ্ছে খুব জোর। সামনে কোথাও কাকের বাসা আছে বোধহয়। কাকগুলো খুব ডেকে উঠল হঠাৎ। তাদের ক্রুদ্ধ ডানার শব্দ শোনা যাচ্ছে। বিপুদ বুঝলে ঠিক এসে ঠুকরে দেবে মরণকে।
ডালটার ডগায় এসে মরণ বুঝতে পারল ফুটখানেকের হিসেব গোলমাল হয়েছে। লাফ দিলে জলে পড়তে পারে। আবার পৈঠাতে পড়াও বিচিত্র নয়। কিন্তু হিসেব করলে আর বাহাদুরিটা কী হল?
মরণ ডালটা ধরে ঝুলে পড়ল প্রথমে। তারপর ট্রাপিজের খেলোয়াড়ের মতো শরীরটা বারকতক দুলিয়ে নিল ভাল করে। তারপর জলের দিকে ঝুল খেয়ে হাত ছেড়ে লাফিয়ে পড়ল জলে। অনেকটা ওপর থেকে। এত ওপর থেকে কখনও যে জলে লাফায়নি সে এ কথাটা খেয়াল ছিল না তার। টুপ আজ মাথাটা গোলমাল করে দিয়েছে যে!
জলে পড়ার কিছু নিয়ম আছে। খাড়া হয়ে সরু হয়ে না পড়লে মসৃণভাবে জলে ঢুকে যাওয়া যায় চিৎপাত হয়ে পড়লে জলের চাটি খেতে হয়। মরণের জুটলও তাই। ডাইভ দিতে জানলে এরকমটা হত না। সে পড়ল নিরালম্ব চিৎপাত হয়েই। জলের প্রচণ্ড চাটি লাগল পিঠে, মাথায়। দম বন্ধ হয়ে এল তার ব্যথায়। সবজে নীল জল কলকল করে ঢুকল কানে, নাকে, চোখে। কয়েক ঢোঁক জল গিলেও ফেলল সে। চোখে অন্ধকার ঠেকল কিছুক্ষণ। কোন তলানিতে চলে যাচ্ছিল সে কে জানে। হাত-পা অসাড় লাগল কিছুক্ষণ। কিন্তু তবু গাঁয়ের পুকুরে দীর্ঘদিন স্নান করার অভ্যাস আছে বলে সে সামলেও গেল। ভুরভুরি কেটে ভুস করে যখন ভেসে উঠল তখন পুকুরধারে “গেল গেল” বলে শোরগোল উঠে গেছে।
সবার আগে মরণের চোখ পড়ল টুপুর ওপর। ভারী অবাক হয়ে চেয়ে আছে টুপু। মুখে ভয়, চাউনি অবাক।
বাহাদুরিটা ভালই দেখিয়েছে মরণ। সে হি হি করে হেসে উঠল আনন্দে।
কে যেন বলে উঠল, আ মোলো ওটা কি মরণ নাকি রে? পিলে যে চমকে দিয়েছিলি বাবা।
কোথা থেকে জলে পড়লি রে, ও ভূত!
কী অসভ্য ছেলে রে বাবা।
সবচেয়ে আশ্চর্য কথা বলল টুপু, কী বদমাশ ছেলে রে বাবা!
বলেই মুখটা ফিরিয়ে পৈঠা বেয়ে উঠে গেল ওপরে। তারপর আর দেখাই গেল না তাকে।
ভেজা গায়ে উঠে এল মরণ। জামা প্যান্ট সব ভেজা। কেমন বোকা বোকা লাগছে নিজেকে। তাপমানও বোধ হচ্ছে। তোর জন্যই লাফ দিলাম টুপু, আর তুই-ই ওরকম করলি? তোদের বাড়িতে যে কেউটে সাপ মারলুম, মনে নেই? আমার মতো গাছ বাইতে পারে কেউ? জোরে ছুটতে পারে আমার মতো কেউ? পারে কেউ আমার মতো তেঁতুলবিছের কামড় সহ্য করতে? পারুক তো কেউ দেখি!
ঘরের কাজে ব্যস্ত ছিল বলে মা লক্ষ করল না তাকে। করলে জামা ভিজিয়ে এসেছে বলে বকুনি দিত। গা মুছে জামা প্যান্ট ছেড়ে নিজের পড়ার ঘরখানায় এসে চুপটি করে বসে রইল মরণ। টুপু কি আর কখনও তার দিকে তাকাবে? দেখলেও হয়তো অবহেলায় চোখ ফিরিয়ে নেবে। পাত্তাও দেবে না তাকে! না দিক। তারই বা কী গরজ! এই তো সেদিনও টুপুকে পাত্তা দিত না মরণ। ভারী তো মেয়ে। রোগা, কেলটিস মাকা। উচ-কপালি, চিরনদাতি কোথাকার। অবশ্য উঁচ-কপালি আর চিরুনদাঁতি কাকে বলে তা জানে না মরণ।
লেখাপড়ায় ভাল হলে তাকে কি কেউ এত তুচ্ছতাচ্ছিল্য করত? এটা মরণ আজকাল খুব টের পায়। কিন্তু তার যে মোটে পড়তে ইচ্ছে যায় না। কী যে করবে তা বুঝতে পারছিল না সে।
দুপুরবেলা খেয়ে-দেয়ে মা যখন শুতে গেল তখন মবণ চুপ করে গাছতলায় তার নিজস্ব শিবঠাকুরের থানে এসে ঘাসের ওপর বসল। এখানে মন্দির নেই, শিবলিঙ্গ নেই, কিছু নেই। তবু মরণের এটাই শিবঠাকুরের থান। এখানেই সে ডাকলে শিবঠাকুর এসে হাজির হন।
আজও সে চোখ বুজে শিবঠাকুরকে খুব প্রাণভরে ডাকল, শিবঠাকুর আজ কি পাপ করে ফেললাম? ক্ষমা করে দিও ঠাকুর। তোমাকে বলছি, আমাকে কিন্তু কেউ ভালবাসে না। আমি কি খুব খারাপ? আজ যদি পুকুরে ডুবে মরে যেতাম তাহলে বুঝি ভাল হত?
শিবঠাকুরের গায়ের বোঁটকা গন্ধটা আজও পেল মরণ। তার সামনেই শিবঠাকুর ব্যোম ভোলানাথ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। চোখ না খুললেই তাঁকে দেখা যায় ভাল।
একটু থেমে খুব লজ্জায় লজ্জায় মরণ বলল, ও যেন আমার দিকে একটু তাকায়-টাকায় ঠাকুর।
এই বলেই ছুটে পালিয়ে এল ঘরে।
এই তো সেদিন জিজিবুড়ি সকালে রোজকার মতো এসে বসে ছিল উঠোনে। রোদ পোয়ানোর নাম করে রোজই আসে, যদিও তাদের বাড়িতে রোদের অভাব নেই। চোখ কুঁচকে মরণকে দেখে বলেছিল, তুই কি একটু ঢ্যাঙা হয়েছিস নাকি রে ভাই?
ভারী লজ্জা পেয়েছিল মরণ। সে যে একটু ঢ্যাঙা হচ্ছে, তা সে খুব টের পায়। শরীরে আরও নানা বদল ঘটছে তার। সুড়সুড়ি বাড়ছে, হাতে পায়ে কেমন একটা অস্বস্তি যেন, চামড়ায় কখনও কখনও ফাটলের মতো দাগ। এসব কী হচ্ছে তা ঠিক বুঝতে পারে না মরণ।
জিজিবুড়ির কথাটা কানে গিয়েছিল বাসন্তীর। ঝেঁঝেঁ উঠে বলল, নজর দিও না তো মা। এটা তো বাড়েরই বয়স। বাড়বে না তো কী? অত তাকিয়ে থাকার মতো কিছু হয়নি।
মায়ের নানা ভয় আছে। নজর লাগার ভয়, শনির দৃষ্টি, ফাঁড়া, আরও কত কী। মাঝে মাঝেই তার আঙুল কামড়ে, শরীরে থুথু ছিটানোর ভান করে কী সব যেন তুকতাক করে মা। তার নামে বারের পুজো দিতে শনি মন্দিরে যায় ফি শনিবার।
আমাকে নিয়ে তোমার এত ভয় কেন মা?
আমার বাপু সবাইকে নিয়েই ভয়।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন