শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
গত দশদিন যাবৎ বড় জ্যাঠামশাইয়ের ভূত চারদিকে আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়াচ্ছে। চটির শব্দ শোনা যায়, গলাখাঁকারির শব্দ পাওয়া যায়, নিশুত রাতে দীর্ঘশ্বাস অবধি ভেসে বেড়ায়। দশ দিন আগে বড় জ্যাঠামশাই যখন মারা যান তখন ভরসন্ধেবেলা। চারদিকে ধোঁয়াটে আবছা অন্ধকার নেমে আসছে। সন্ধেবেলাটা হল সবচেয়ে মন খারাপ করার সময়। কালিঝুলিমাখা এক ডাইনি বুড়ি যেন এসে হাজির হলেন। প্রত্যেক দিন এই সময় তার খুব মরার কথা মনে হয়।
এক ছুটের রাস্তা। অবস্থা খারাপ শুনে তারা সব গিয়েছিল দেখতে। কয়েকজন মুরুব্বিগোছের পাড়াপ্রতিবেশী, বর্ধমান থেকে গাড়ি-চেপে-আসা গম্ভীরমুখো ডাক্তার আর আত্মীয়স্বজনে বারান্দা আর ঘর ভর্তি। তাদের জ্যাঠার ঘরে ঢুকতেই দেওয়া হয়নি। নিঃশব্দ ঘরে জ্যাঠা একা একা মারা যাচ্ছিল যখন, সেই সময়ে দুটো-তিনটে বাড়ি থেকে শাঁখের আওয়াজ এল, জ্যাঠামশাইয়ের গোয়ালঘর থেকে একটা গোরু গাঁ গাঁ করে ডাকছিল। সে বোধহয় আলো। সাদা ধবধবে আললা বড় জ্যাঠামশাইয়ের এমন বাধুক যে, জ্যাঠা গায়ে হাত রেখে পাশে না দাঁড়ালে সে দুধ ছাড়ে না, আটকে রাখে। আলো কি কিছু টের পেয়েছিল? অবোলা জীবরা বোধহয় ঠিক বুঝতে পারে। জাম্বো কুকুরটা যেমন। জ্যাঠার বারান্দার এক কোণে কেমন ঝুম হয়ে বসা। সামনের দু পায়ের ফাঁকে মাথাটা রাখা। নড়ছে না, চড়ছে না। এত লোক দেখেও একটা ঘেউ পর্যন্ত দিল না।
আর বাড়ির বাতাসটা কেমন ভারী হয়ে উঠছিল ক্রমে। শূন্য থেকে সাদা প্রেতের মতো একটু কুয়াশা যেন হঠাৎ নেমে এসে ঝুলে থাকল উঠোনের ওপর। কেমন ছমছম করছিল চারধার। যেন প্রেতলোকের ছায়া চারধারে। পান্না সিঁড়িতে বসেছিল চুপচাপ। বড় জ্যাঠা মরে যাচ্ছে। কেন যে মরে যাচ্ছে! আর ওই ভুতুড়ে সন্ধ্যা আর ওই আলোর করুণ ডাক আর ওই কুয়াশার পাতলা সর, সব মিলিয়ে কান্না পাচ্ছিল।
আর তখন উঠোনের উত্তর ধারে মরা আলোয় একমনে এক্কাদোক্কা খেলে যাচ্ছিল দুখুরি। কালো রোগা মেয়েটার পরনে একখানা কার যেন মস্ত ঢলঢলে ফ্রক। শোকাহত বাড়িতে আসন্ন মৃত্যুর নিস্তব্ধতার মধ্যে শুধু ওই মেয়েটা একমনে খেলে যাচ্ছে। এখন তাকে কেউ কাজে ডাকছে না, ফাই-ফরমাশ করছে না। এই ফাঁকটুকুতে সে আপনমনে খেলে নিচ্ছে। মৃত্যুহিম বাড়িটায় ওই একটু যেন জীবনের লক্ষণ— হৃৎপিণ্ডের মতো। লাফিয়ে লাফিয়ে খেলছে মেয়েটা।
প্রথমে শাঁখের আওয়াজ বলেই ভুল হয়েছিল। এক ঝটকায় ভুল ভাঙল। জ্যাঠাইমা কেঁদে উঠল না? ওঁ-ওঁ-ওঁ শব্দের একটা লম্বা টানা শব্দ। কে একজন বলে উঠল, সময়টা লিখে রাখো, লিখে রাখো, ছটা বেজে সতেরো মিনিট। আর একজন বলল ও ভট্চামশাই, লগ্নটা কী পেল দেখুন তো, দোষ-টোষ কিছু পেল নাকি? নবীন ভট্চাযের গলা পাওয়া গেল, তেমন কিছু নয়, গৌরহরিদা ভালই গেছেন।
জ্যাঠাইমার সঙ্গে গলা মিলিয়ে অনেকগুলো কান্নার আওয়াজ উঠল আর গম্ভীরমুখো ডাক্তার বেরিয়ে এসে সিঁড়ি বেয়ে উঠোনে নেমে চলে গেলেন। কান্না শুনে দুখুরি খেলা থামিয়ে মুখের ওপর থেকে ঝুরো চুল সরিয়ে পান্নার দিকে চেয়ে বলল, মরে গেছে?
মরা মানুষ দেখবে না বলে পান্না আর দাঁড়ায়নি। এক ছুটে বাড়ি। আর বাড়িতে তার জন্য অপেক্ষা করছিল ফাঁকা, অন্ধকার, হাঁ-হাঁ করা ঘর, উঠোন জোড়া অন্ধকার, আর ধোঁয়াটে অশরীরী কুয়াশার কুণ্ডলী। পান্না উঠোনে দাঁড়িয়ে, চোখ বুজে, শক্ত হয়ে প্রাণপণে চিৎকার করেছিল, বাসন্তী… বাসন্তী… বাসন্তী…
বাসন্তী গিয়েছিল পুকুরঘাটে। বাসনের পাঁজা ফেলে রেখেই উঠে এল।
কী হয়েছে গো? চেঁচাচ্ছ কেন?
আমার ভয় করছে।
ও মা! ভরসন্ধেবেলা ভয়ের কী?
বাড়িতে কেউ নেই দেখছিস না? সব ও-বাড়িতে।
তা তুমি চলে এলে যে! গৌরকর্তার কি হয়ে গেল?
হ্যাঁ। আমার ভীষণ ভয় করছে।
সেদিন সন্ধেবেলা কারেন্ট ছিল না। বাসন্তী লণ্ঠন জ্বেলে দিয়ে বলল, আমার তো বসে থাকলে চলবে না, বাড়ি ফিরতে হবে। ছেলেটার জ্বর দেখে এসেছি। একা যদি না থাকতে পারো তা হলে ভশ্চায খুড়িমাকে ডেকে দিয়ে যাচ্ছি।
ভয়! ভয়ের কি শেষ আছে! কোথা থেকে যে হঠাৎ হঠাৎ তার ভয়েরা এসে হাজির হয় তা সে নিজেও জানে না। কিন্তু ভয় তার অমনি হয় না। তার ভয়ের পিছনে সবসময়েই গূঢ় কারণ থাকে। কিন্তু সেটা কেউ বুঝতে চায় না। ভয়ের জন্য কত বকুনি খায় সে।
মানুষ মরে যে কেন ভূত হয় কে জানে বাবা! ভটচায় খুড়িমা বলল, মরার পর আত্মা দশ দিন প্রেতলোকে থাকে, শ্রাদ্ধের পর দেবলোকে চলে যায়। আর প্রেতলোকটা বেশি দূরেও নয়, আশেপাশেই।
কী যে গা ছমছম করল তার। রাতে মায়ের সঙ্গে লেগে শুয়েও ঘুম এল না। নিশুত রাতে জ্যাঠামশাইয়ের দীর্ঘশ্বাস ঘুরে বেড়াতে লাগল উঠোনে। শুকনো পাতার সড়সড় শব্দে কীসের যে সঞ্চার ঘটছিল। তাদের কুকুরটা অকারণে কেঁদে উঠেছিল একবার বারান্দায়। অকারণে নয়, পান্না জানে। ঠিক জ্যাঠামশাইকে দেখতে পেয়েছিল।
দাহকাজ শেষ করে তার বাবা রামহরি চাটুজ্যে ফিরল শেষ রাতে। আগুন ছোঁয়ানো, লোহা ছোঁয়ানো এসব করতে উঠে গেল মা। তখন পান্নার চোখ জুড়ে ঘুম এল।
বিয়ে করলে আমি বাপু, কলকাতায় করব। মেলা লোক, আলো, ভিড়ভাট্টা, অত গা ছমছম করবে না। আমার যা ভয়।
নিতু বলে, দুর! কলকাতা আমার ভাল লাগে না। তুই কী রে ভিড় ভালবাসিস! আমার ভাল লাগে পাহাড়, উপত্যকা, শীত-শীত ভাব আর খুব নির্জন, গাছগাছালি…
সেসব আমারও ভাল লাগে। কিন্তু একা থাকলে ভয়েই মরে যাব।
তোর যে কী অদ্ভুত ভয়। আর কলকাতায় বুঝি ভয় নেই। কত খুনখারাপি, অ্যাকসিডেন্ট।
তাও ভাল বাবা।
আজ বড় জ্যাঠার শ্রাদ্ধ। সকাল থেকে বাবা ও-বাড়িতে। মাও একটু আগে গেল। পান্নাকে ডেকে বলে গেল, দেরি করিসনি যেন। চানটা করেই চলে আয়। যা মাঠো মেয়ে তুই।
তা আছে একটু পান্না। মাঠোই বোধহয়। সব কাজে তার গড়িমসি। শরীরটা নড়তে-চড়াতে ভালই লাগে না তার। তার ভাল লাগে বসে বসে ভাবতে।
শরীরের গভীর আলসেমি যেন মদের নেশার মতো। আর মাথার মধ্যে লাগাম-ছাড়া উদ্ভট সব ভাবনা। পান্না ঘণ্টার পর ঘণ্টা শুয়ে বসে গড়িয়েই কাটিয়ে দিতে পারে। আর মনে মনে সে যে কোথায় কোথায় উড়ে উড়ে ঘুরে ঘুরে বেড়ায় তার ঠিক-ঠিকানা সে নিজেও জানে না।
আজ কোনও সাজ নেই। শ্রাদ্ধবাড়ির নেমন্তন্নে কেউ তো সাজে না। সাদামাটা একটা সাদা খোলের শাড়ি, মুখে একটু পাউডার, চুলে সামান্য চিরুনি। ব্যস হয়ে গেল। তাই আজ একটু গড়িমসি করে নিচ্ছে পান্না। মোটে সাড়ে এগারোটা বাজে। হাতে এখনও অনেক সময়। কাজের বাড়িতে আগে-ভাগে গিয়ে হাজির হলে লোকে বড্ড ফাই-ফরমাশ করে। এটা নিয়ে আয়, ওকে ডেকে দে, পানগুলো সেজে ফেল, আরও কত রকম। আর অত ভ্যাজর ভ্যাজর, কূটকচালি ভাল লাগে না তার।
গনগনে পুরুষের মতো দুপুর, নির্জন বাড়ি, আর অন্যরকম এক দামাল হাওয়া। আজ তার খুব “সে”-র কথা মনে হচ্ছে। এই ফাঁকা বাড়িতে পান্না এখন একা, এ সময়ে যদি “সে” এসে সামনে দাঁড়ায়! মাগো, ভাবতেই গা সিরসির করে, রোঁয়া দাঁড়িয়ে যায়। কেমন হবে সে? আজও স্পষ্ট কোনও চেহারা মনে পড়ল না পান্নার। না বাবা, কার্তিক ঠাকুরটার মতো সুন্দর চেহারা চাই না। তবে পুরুষমানুষের মতো। একটু অগোছালো, একটু আনমনা, ভুলো মন, একটু পাগলাটে হোক না তাতেও ক্ষতি নেই। খুব সুন্দর ঝকঝকে মসৃণ দাঁত আর হাসিটা হবে খুব সুন্দর। হাসলে যেন মাড়ি না বেরিয়ে পড়ে বাবা। পান্নাকে খুব ভালবাসবে, কিন্তু বউ-মুখো যেন না হয়।
বউ-মুখো একদম দেখতে পারে না পান্না। শেফালী বউদি তো বরকে নিয়ে ওইজন্যই ভাজা-ভাজা হল। বরুণদা যা মাগী-মার্কা পুরুষ, বউয়ের মাথা টিপে দেয়, কুটনো কুটে দেয়। গন্ধ শুঁকে শুঁকে ঘোরে। শেফালী বউদি মাঝে মাঝে ধৈর্য হারিয়ে বলেই ফেলে, ও বাবা, এ যেন একটা মেয়েমানুষকেই বিয়ে করেছি রে!
পান্না বলে, তা কেন বউদি, বরুণদা তোমাকে কত ভালবাসে, মাথা টিপে দেয় জ্বর হলে।
দেয় কেন? মাথা টিপে না দিলে কি মরে যাব?
অত ভালবাসা তোমার বুঝি সয় না?
তোরও সইবে না। পুরুষমানুষ যদি সবসময়ে গায়ে গায়ে লেগে থাকে মেনি বেড়ালের মতো, যদি সংসারের সব ব্যাপারে নাক গলায় তা হলে কি ভাল লাগে বল? ঘেন্নায় মরে যাই ভাই, কী সুন্দর রিপু করতে পারে, উল বুনতে পারে, কুরুশকাঠিতেও দিব্যি হাত।
বলে হেসে গড়িয়ে পড়ে শেফালী বউদি।
আর মনে মনে পান্না বলে, হে ঠাকুর, আমার পুরুষমানুষটা যেন কিছুতেই বরুণদার মতো না হয়।
নয়না শিবেনদার সঙ্গে ছুঁকছুঁক করছে, পায়েল তার মাস্টারমশাই জিতু সমাদ্দারের সঙ্গে লাইন দিচ্ছে, শুধু পান্নারই গাল উঠল না। এ নয়, ও নয়, সে নয়। তার “সে” এদের কারও মতো নয়। অন্যরকম। এই অন্যরকমটা রোজ রোজ বদলে যায়।
হীরা বলে, অত খুঁতখুঁত হলে তোর কেউ জুটবে না শেষ অবধি, দেখিস। তোর জন্য কি বর কলে তৈরি হবে? মেড টু অর্ডার?
তাও বটে।
কিন্তু এই নির্জন দুপুরে সেই আবছা পুরুষের কথা খুব মনে আসে পান্নার। তার বান্ধবীরা খুব সেক্স নিয়ে কথা বলে। পান্নার ও ব্যাপারটা ভাবতে ভাল লাগে না। শরীরের গ্যাদগ্যাদে ব্যাপারটা তো আছেই বাবা। কিন্তু ওটাই সব নয়। সে চায় ভাবের পুরুষ, শরীরের পুরুষ নয়।
ইলাবতী আর সোমেশ্বর প্রেমে পড়েছিল। ইলাবতীর পনেরো, সোমেশ্বরের কুড়ি। জানাজানি হওয়ার পর ইলাবতীকে তার মা বাবা খুব মেরেধরে বেঁধে রাখল ঘরে আর সোমেশ্বর রাস্তায় রাস্তায় পাগলের মতো ঘুরতে লাগল। তারপর একদিন ফাঁক পেয়ে দুজনেই পালাল। শ্মশানের ধারে দুজনকে পাওয়া গেল পরদিন। জড়াজড়ি করে মরে পড়ে আছে।
কী যে কেঁদেছিল পান্না। হ্যাঁ, ভালবাসা হবে ওইরকম। কেমন মরে গেল দুজনে। আর তারপর দুজনেই তুচ্ছ শরীর ছেড়ে ফেলে হাত ধরাধরি করে ঘুরে বেড়াত মনের আনন্দে। কত লোক তাদের দেখেছে। নদীর ধারে বা হাট মুকুন্দপুরের জঙ্গলে, নিশুত রাতে অলকেশ স্মৃতি সংঘের ফুটবল খেলার মাঠে। পান্না দেখেনি, কিন্তু পান্না তাদের ফিসফাস মধ্যরাতে কতদিন শুনেছে। স্বর নেই, শুধু শাসের শব্দে কথা। গায়ে কাঁটা দেয়।
হ্যালো! এনিবডি হিয়ার!
ঝিমঝিম দুপুরে তন্দ্রাচ্ছন্ন তন্তুজাল ছিঁড়ে সপাটে উঠে বসল পান্না। বুকটা ধক ধক করছে। মেয়ে গলায় ইংরিজি বলছে কে? এরকম তো হওয়ার কথা নয়! কণ্ঠা পর্যন্ত আতঙ্ক উঠে এল তার।
উঠোনের জানালাটা দিয়ে উকি দিতেই সে সোহাগকে দেখতে পেল। অমল রায়ের মেয়ে। খুব দেমাক, ইংরিজি ছাড়া কথাই বলে না। সন্ধ্যাদি আরও বলেছে, কলকাতায় নাকি কেলেঙ্কারি করে এসেছে। সন্ধ্যাদি পান্নাকে খুব ধরেছিল, যা না, গিয়ে ওদের ইংরিজিতে দুটো কথা শুনিয়ে দিয়ে আয়। বুঝবে আমরাও মুখ্যু নই। পান্না রাজি হয়নি। সে ইংরিজি বলবে কি, ভয়েই মরে যাবে। কথাই ফুটবে না।
অবাক হয়ে বারান্দায় বেরিয়ে এল পান্না, কিছু বলছ?
মেয়েটার তেমন সাজগোজ নেই, পরনে একটা লম্বা ঝুলের ফ্রকমতো ম্যাদাটে পোশাক, চুল উড়োখুড়ো। তার দিকে চেয়ে বলল, সরি, আমি ভুল করে তোমাদের কোর্ট ইয়ার্ডে ঢুকে পড়েছি বোধহয়। এখানে কোনটা রাস্তা আর কোনটা নয় তা বোঝা মুশকিল। এখান দিয়ে কি রাস্তায় যাওয়া যাবে?
যাবে। তুমি কোথায় যাচ্ছ?
মেয়েটা কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, এনি হোয়ার। নাথিং ম্যাটারস।
তুমি তো সোহাগ। অমল রায়ের মেয়ে!
হ্যাঁ। আর তুমি?
আমি পান্না চট্টোপাধ্যায়। আমাদের বাড়িতে একটু বসবে?
মেয়েটা ঠোঁট উলটে বলল, বসতে পারি, ইফ ইউ আর নট ডিস্টার্বড।
পান্না মাথা নেড়ে বলল, না না, ডিস্টার্বড হব কেন? এসো।
মেয়েটা বারান্দায় উঠে এসে পেতে রাখা কাঠের চেয়ারে বসল।
খুব সাহস হয়ে যাচ্ছে পান্নার। এই ইংরিজি বলা বিলেত ফেরত মেয়েটার সঙ্গে টক্কর দেওয়া তার কর্ম নয়। তবু কী জানি সুন্দর মেয়েটার এমন মলিন চেহারা দেখে তার মায়া হচ্ছিল।
কোথায় যাচ্ছিলে ভাই?
কোথাও না। বাড়ির বাইরে বেরোতে ইচ্ছে করছিল।
এক গেলাস জল দেব? খাবে?
মেয়েটা অবাক হয়ে বলে, জল খাব কেন? আমার তেষ্টা পায়নি তো!
তুমি তো বেশ বাংলা বলতে পার। আমি ভেবেছিলাম তুমি বোধহয় বাংলা জানোই না।
মেয়েটা হাসল, বলতে পারি, পড়তে পারি, লিখতেও পারি একটু একটু।
বিদেশে যারা থাকে তাদের ওরকম হয়।
মেয়েটা একটু হাসল। হাসলে এত সুন্দর দেখায় ওকে।
দু চোখে তৃষিতের মতো মেয়েটাকে দেখে নিচ্ছিল পান্না। যেন এক পরি এসে আলগোছে বসেছে তাদের বাড়িতে। একটু পরেই উড়ে যাবে।
তোমরা কি বেড়াতে এসেছ?
মেয়েটা ভ্রূ কুঁচকে বলল, বেড়াতে! তাও বলতে পার, সর্ট অফ এ চেঞ্জ। কলকাতার পলিউশনে আমার অ্যালার্জি হয়। অ্যাজমার মতো। ডাক্তার বলেছে মাঝে মাঝে বাইরে গিয়ে থাকতে হবে।
কিছুদিন থাকবে তো?
না। আই হ্যাভ মাই স্টাডিজ। আজ বাবা আসবে। তারপর আমরা হয়তো ফিরে যাব।
এ-জায়গাটা তোমার ভাল লাগছে না?
ভাল, কিন্তু একটু হ্যাপহ্যাজার্ড। কোনও প্যাটার্ন নেই। আর নেই বলেই আমি ভুল করে তোমাদের বাড়িতে ঢুকে পড়েছি।
ভাগ্যিস নেই। থাকলে তোমার সঙ্গে ভাবই হত না। তুমি কিছু খাবে?
না তো! আই অ্যাম নট হাংরি।
মুখ দেখে পান্নার মনে হল মেয়েটা মিথ্যে কথা বলছে। মুখটা শুকনো, খিদের ছাপ আছে।
তোমরা কি ভাত ডাল খাও?
কেন খাব না? তবে আই প্রেফার চাইনিজ।
উঃ, চাইনিজ আমারও ভীষণ ভাল লাগে। কলকাতায় গেলেই আমি চাইনিজ খাই। তবে অনেকে বলে কলকাতার চাইনিজ নাকি আসল চিনে খাবার নয়।
হ্যাঁ। অন্যরকম।
আমাদের বাড়িতে অনেক রকম আচার আছে। খাবে?
মেয়েটার চোখদুটো একটু উজ্জ্বল হল। মুখে একটু হাসি। বলল, ইউ আর এ রিয়েল চার্মার।
খাবে?
মেয়েটা এক গাল হেসে ঘাড় কাত করে বলল, খাব।
তা হলে এসো, কোন আচারটা খাবে পছন্দ করে দাও।
মেয়েটা লক্ষ্মীর মতো উঠে তার সঙ্গে এল। সহবত জানে। ঘরে ঢোকার সময় চটিজোড়া বাইরে ছেড়ে রাখল।
পান্না যখন তাক থেকে আচারের বয়ম নামাচ্ছে তখন সোহাগ ঘরের চারধারটা তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছিল। পান্নারা গরিব নয়। তবে ঠাঁটবাটও তেমন কিছু নেই। সাধারণ মধ্যবিত্ত ঘরদোর।
ওয়া! সোনি টু থাউজ্যান্ড মিউজিক সিস্টেম! বিগ সাউন্ড।
পান্না একটু হাসল, হ্যাঁ, বড্ড আওয়াজ ওটার।
ক্যাসেটের কেসটা দেখতে দেখতে সোহাগ বলল, রক মিউজিক, জ্যাজ এসব তুমি শোনেনা বুঝি?
না বাবা, ওসব আমার দাদা শোনে। আমাকেও জোর করে বসিয়ে শোনায়। আগে কিছু বুঝতাম না, শুনতে শুনতে এখন একটু-আধটু বুঝতে পারি।
তোমার দাদা কোথায়?
ও তো কলকাতায়। যাদবপুরে ইলেকট্রিক্যাল ইনজিনিয়ারিং পড়ে। আচ্ছা, আচার খেলে তোমার আবার অ্যাজমা বাড়বে না তো?
না। আমার অ্যালার্জিটা পলিউশন থেকে হয়। ডাস্ট, স্মোক এইসব থেকে।
পাঁচরকম আচার প্লেটে সাজিয়ে দিয়ে পান্না ভাবল এই ফুলপরিকে আর কী দেওয়া যায়। তার আরও কিছু সাজিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে যে!
এই সোহাগ, তুমি শুধু আচার কী করে খাবে?
সোহাগ অবাক হয়ে বলল, আচারটাই তো খাবার।
পান্তাভাত আছে। খাবে?
সোহাগ হেসে ফেলল, তুমি ভারী সুইট মেয়ে তো!
খেয়েছ কখনও? লেবুপাতা দিয়ে মেখে খেতে বেশ লাগে। খাও না।
সোহাগ লক্ষ্মী মেয়ের মতো ঘাড় কাত করে বলল, দাও।
পান্না এক ছুটে রান্নাঘরে গিয়ে পান্তাভাত একটা চিনেমাটির বাটিতে করে নিয়ে এল। সঙ্গে লেবুপাতা, নুন।
মাখতে পারবে? না মেখে দেব?
মৃদু হেসে সোহাগ বলে, তুমিই মেখে দাও।
ঘেন্না পেও না কিন্তু। আমার হাত পরিষ্কার। তবু সাবান দিয়ে ধুয়ে আসছি।
যখন সোহাগ খাচ্ছিল তখন খাওয়ার ধরন থেকে তার খিদেটা বুঝতে পারল পান্না। সামান্য পান্তাভাত কত যত্ন করে খাচ্ছে।
একটা ডিম ভেজে দেব তোমাকে? এক মিনিট লাগবে।
সোহাগ মিষ্টি করে হেসে বলে, এর সঙ্গে ডিম ম্যাচ করবে না। ইটস ভেরি টেস্টফুল। তোমার হাতের গুণ আছে।
আমার হাতের কোনও গুণ নেই। পান্তাভাত দিতে হল বলে লজ্জা করছে।
কেন, লজ্জা কীসের? আমরা বিদেশেও পান্তাভাত খেয়েছি। বাবা খুব ভালবাসে কি না। আচ্ছা, তোমার বাড়ির লোকেরা সব কোথায় বললা তো! কাউকে দেখছি না।
আমার জ্যাঠামশাই গৌরহরি চট্টোপাধ্যায় মারা গেছেন তো, আজই তাঁর শ্রাদ্ধ। সব সেই বাড়িতে।
ইউ মিন পারুলের বাড়ি!
অবাক হয়ে পান্না বলে, তুমি চেনো নাকি?
সোহাগ একটু হাসল, চিনি। শি লুকস লাইক এ গডেস।
হ্যাঁ। আমাদের বংশে ওরকম সুন্দরী আর কেউ নেই। তারপর একটু লজ্জা-লজ্জা মুখ করে রাঙা হয়ে পান্না বলে, জান তো একসময়ে তোমার বাবার সঙ্গে পারুলদির বিয়ে হওয়ারও কথা হয়েছিল। সেসব অবশ্য আমার জন্মেরও আগেকার ঘটনা। বিয়েটা হলে আজ তুমি আমার বোনঝি হতে, জানো? আমি হতুম তোমার মাসি।
খুব হাসল সোহাগ, মাসি? তোমার বয়স কত বলো তো!
সতেরো চলছে।
সতেরো প্লাস?
না, ষোলো প্লাস।
আমার সতেরো প্লাস। তোমার চেয়ে আমি বড়। ভেরি ইয়ং মাসি।
ভারী ভালই তো মেয়েটা। একটুও তো দেমাক দেখাচ্ছে না। সন্ধ্যাদিটা যে কী আজেবাজে বলে! তবে মেয়েটার এঁটোকাঁটার বিচার নেই। ভাত খেতে খেতে কতবার যে চুলে হাত দিয়ে পাট করল, কোলের ওপর বাটিটা রাখল। তা হোক, ওরা কি অত সব শিখেছে তাদের মতো?
মাঝে মাঝে একটু উদাস হয়ে যায় মেয়েটা। মুখে একটা বিষণ্ণতা ফুটে ওঠে। ভাত খেয়ে মেয়েটা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে কুলুঙ্গিতে গণেশের মূর্তিটার দিকে চেয়ে রইল। হঠাৎ মুখ ফিরিয়ে তার দিকে চেয়ে বলল, দে ওয়্যার ইন লাভ, বাট দে ডিড নট ওয়েড। পারুলের মেয়ে হলে আমি অন্যরকম হতাম। তাই না? কী অদ্ভুত!
পান্না কথাটা ভাল বুঝতে পারল না। আবছা মনে হল, পারুলের মেয়ে হয়ে জন্মায়নি বলে ওর একটু বুঝি দুঃখ আছে।
মেয়েটা ফের যেন, পান্নাকে নয়, আকাশ বাতাসকে বলল, ইউ ক্যান্ট চুজ ইওর পেরেন্টস। ক্যান ইউ?
এ কথাটাও পান্না বুঝল না। মেয়েটার মনে বোধহয় একটা কষ্ট আছে। কিন্তু পান্না কী বলবে! মুখখানা হাসি-হাসি করে বসে রইল, যদিও কথাটা মোটেই হাসির নয়।
বাটিটা রেখে মেয়েটা উঠল। বলল, থ্যাংক ইউ ফর এভরিথিং।
আবার আসবে না?
হাসি মুখে সোহাগ বলে, আসব। ইউ আর সিম্পলি চার্মিং। তুমিও চলে আসতে পার। তবে ইউ মে নট লাইক আওয়ার লট। আমরা একটা আনহ্যাপি ফ্যামিলি।
পান্না জানে, এখন কৌতূহল প্রকাশ করা উচিত নয়। তাই সে বলল, তোমাকে আমার খুব ভাল লেগেছে।
থ্যাংক ইউ।
তোমাকে পথ দেখিয়ে দেব? নইলে ফের রাস্তা গুলিয়ে ফেলে অন্য কারও উঠোনে গিয়ে উঠবে হয়তো।
সোহাগ হেসে ফেলল, না না, পারব।
মানুষ চলে গেলেও তার একটা রেশ থেকে যায়। কিছুক্ষণ রেশটা বাতাসে অনুভব করল পান্না। দু-একটা কথা যেন গুনগুন করে উড়ে বেড়াতে লাগল তার চারপাশে।
কালো কলকা পাড়ের সাদা খোলের শাড়িটা পরে নিতে নিতে সে দেয়ালঘড়ির দিকে চাইল। একটা পাঁচ। আজ মায়ের বকুনি খেতে হবে। বড্ড দেরি করে ফেলেছে সে।
ফুল ফুটলেই যেমন মৌমাছি এসে জোটে তেমনই যেন পারুলদিকে ঘিরে মেয়েপুরুষের একটা ছোট্ট ভিড়। একে সুন্দরী তায় বড়লোকের বউ। বাবার কাছে শুনেছে ওদের নাকি বছরে দশ বারো কোটি টাকার টার্নওভার। টার্নওভার কথাটার মানেই জানে না পান্না। ব্যবসাবাণিজ্যের কথা সে কী বুঝবে? তবে ওদের যে অনেক টাকা সেটা আঁচ করতে পারে।
এই, কাছে আয় তো! বাঃ, দিব্যি মিষ্টি হয়েছিস তো দেখতে!
যাঃ, তোমার কাছে আমি! কী যে বলো!
বেশি সুন্দরী হওয়া কি ভাল? এরকমই ভাল। রোগা কেন রে!
পান্না লজ্জা পেয়ে বলে, এমনি। আমার গায়ে মাংস লাগতেই চায় না।
শেষবার যখন তোকে দেখেছিলুম তখনও ফ্রক পরতিস।
এখনও পরি।
পরিস? তোর মতো বয়সে আমিও পরতুম। কিছুতেই বড় হতে ইচ্ছে হত না। কিন্তু বয়স কি আটকানো যায় বল! চোরাপথে ঠিক বয়স বেড়ে যায়।
কিন্তু পারুলদি, তোমার তো একটুও বয়স বাড়েনি।
তোর চেয়ে আমি কুড়ি বছরের বড় তা জানিস? তুই যদি যুবতী তো আমি থুত্থুড়ি।
হি হি করে হেসে ফেলে পান্না। কী মিষ্টি গন্ধ আসছে পারুলদির গা থেকে। আজ সাজেনি একদম, তবু চারদিকে যেন রূপের ঢেউ ভেঙে পড়ছে। চারদিকে মুগ্ধ দৃষ্টির ভিড়।
পান্না সরে এল। এটুকুই ভাল। এর চেয়ে বেশি ভাল নয়। পারুলদি ঈশ্বরীর মতো। সাঁইত্রিশেও ব্যালেরিনার মতো শরীর, গজদন্তের মতো রং, ভগবানের অনেক পরিশ্রমে তৈরি মুখের ওই কারুকার্য। এত সুন্দরীর নাকি সুখী হওয়ার কথা নয়। কিন্তু কপাল। স্বামীর সোহাগ যে মেয়েদের মুখে ফুটে থাকে। তাকে কি লুকোনো যায়। দূর থেকে ওই সোহাগের আলো স্পষ্ট দেখতে পেল পান্না পারুলের মুখে। ওর মেয়ে হয়ে জন্মায়নি বলে সোহাগের কি খুব দুঃখ?
বড় জ্যাঠামশাইয়ের আত্মা আজ প্রেতলোক ছেড়ে দেবলোকে চলে গেল। ভিড়ে ভিড়াক্কার মণ্ডপ। লুচি ভাজার গন্ধে গা গুলিয়ে উঠল পান্নার।
এই, তুই কোথায় ছিলি রে এতক্ষণ! খুঁজে খুঁজে মরছি।
এক দঙ্গল মেয়ে ধেয়ে এল। পনেরো ষোলো সতেরো আঠেরোর পায়েল, নয়না, ঝুমুর, রুমকি, পুকু। তারপর হা-হা, হু-হু, হি-হি। দমকা বাতাসে মনের সব ধুলোময়লা উড়ে গেল। তারপর একসঙ্গে বসে খাওয়া আর খেতে না পারা।
তারও পর একসময় নির্জন আর একা হয়ে যেতে হয়। সন্ধ্যা নামে। শাঁখ বাজে। প্রেতলোকের অন্ধকার থেকে ধোঁয়াটে ভূতেরা নেমে এসে ঝুলে থাকে একটু ওপরে। তখন কান্না পায়। তখন রোজ মরতে ইচ্ছে করে। তখনই মন কু-ডাক ডাকতে থাকে, গায়ে আগুন, না গলায় দড়ি? গলায় দড়ি, না গায়ে আগুন?
দশ দিন গান-টান গাওয়া নিষেধ ছিল অশৌচ বলে। আজ হারমোনিয়াম নিয়ে বসল একটু। অমনি মা এসে হাজির।
এখন আবার হারমোনিয়ম নিয়ে বসলি কেন? সামনে পরীক্ষা না?
মনটা খারাপ লাগছে মা।
রোজই মন খারাপ, রোজই শরীর খারাপ, এ কেমনধারা কথা? গতর বসিয়ে রাখলে যে শুঁয়োপোকা ধরবেই।
মা তাকে দু চোখে দেখতে পারে না। মা সবচেয়ে বেশি ভালবাসে দাদাকে, তারপর হীরাকে। পান্না তার দু চোখের বিষ, যেন সৎ মেয়ে। আজ কেন যে কান্না পেল খুব। হারমোনিয়াম তুলে রেখে পড়ার টেবিলে বসে সে বই খুলে চেয়ে চোখের জলে বুক ভাসাতে লাগল। মরবে, সে একদিন মরে সবাইকে ঠিক এইরকম কাঁদিয়ে ছাড়বে।
কান্না থেকে ঢুলুনি, দুলুনি থেকে ঘুম।
মাস ছয়েক আগে এরকমই এক সন্ধেবেলা সাঁঝঘুম থেকে তাকে ঠেলে তুলেছিল মা। বকাঝকা নয়, বরং খুব আহ্লাদের গলায় বলেছিল, ওরে ওঠ, ওঠ, দেখ কারা এসেছে।
অবাক হয়ে বলল, কারা এসেছে মা?
ওরে তারা মস্ত মানুষ, বিরাট গাড়ি নিয়ে এসেছে। তাড়াতাড়ি চোখে মুখে জল দিয়ে আয় দেখি।
কিচ্ছু বুঝতে পারেনি সে। চোখে জল দিয়ে আসতেই মা বলল, ওই শাড়ি বের করে রেখেছি। চুল-টুল আঁচড়ে একটা টিপ পরো, শাড়িটা ঠিকমতো পরবে কিন্তু, কুঁচি-টুচিগুলো লক্ষ রেখো। মুখে একটু পাউডার দিয়ে নিয়ে বাইরের ঘরে এসো। হড়বড়িয়ে এসো না, ধীরে সুস্থে।
কিছু বুঝতে পারেনি পান্না। ঘুমচোখে সাজতে কারও ভাল লাগে।
হীরা এসে উত্তেজিত চোখমুখে বলল, ইস, কী বিরাট গাড়ি রে দিদি, একেবারে ঝকমক করছে। উর্দিপরা ড্রাইভার।
ওরা কারা?
তোকে দেখতে এসেছে।
দেখতে এসেছে! দেখতে এসেছে কেন?
এ মা, তোর বিয়ের কথা হচ্ছে না?
মাথায় বজ্রাঘাত হলে বোধহয় এরকমই অবশ হয়ে যায় মানুষ। ছয় মাস আগে যে সবে যোলো পেরিয়েছে, এর মধ্যেই বিয়ে? সে বিছানায় বসে পড়ে খাটের বাজুতে মাথা রেখে ঝিম ধরে রইল। বুকে ধড়ফড়ানি তো ছিলই, তার ওপর বমি-বমি ভাব হতে লাগল। তখনও মনে হয়েছিল, মরি।
কী সুন্দর সুন্দর সব চেহারা ওদের। ফর্সা টকটক করছে। গিন্নিমার গা ভর্তি গয়না। সেজে আয় না একটু।
একটুও নড়েনি পান্না। ঝিম ধরে বসেই ছিল। মাথা ঘুরছিল তখন।
মা এসে বলল, এ কী! শরীর খারাপ করল নাকি? সর্বনাশ। ওঁরা যে বেশিক্ষণ বসবেন না। ওঠ ওঠ, লক্ষ্মী মা আমার। অমন করতে নেই। ব্যস্ত মানুষ ওঁরা, সময় করতে পারেন না বলে অসময়ে এসেছেন। এই রাতেই ফের বর্ধমানে ফিরে যাবেন। উঠে পড় মা।
কেমন বোধহীন, যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো সে উঠল, সাজল এবং বৈঠকখানায় গেল।
বৈঠকখানা আলো করেই কর্তা-গিন্নি, দুজন যুবক যুবতী এবং একজন বয়স্ক মানুষ বসা। চা খাবার দেওয়া হয়েছিল, ছোঁয়ওনি। তবে তাকে দেখেছিল ভ্যাব ড্যাব করে।
বাবা বলে উঠল, গান জানে, লেখাপড়াতেও ভাল।
কর্তা বোধহয় তার নাম জিজ্ঞেস করেছিল, গিন্নি জিজ্ঞেস করেছিল তার বয়স কত। খালি গলায় একটা গানও শোনাতে হয়েছিল, মনে আছে। অমন শুকনো গলায় প্রাণান্তকর গান সে জীবনে গায়নি।
তারা বাবাকে জানিয়ে গিয়েছিল, এই মেয়ে তাদের খুব পছন্দ হয়েছে। এখন কোষ্ঠী মিললেই হয়।
বাবার সেই রাত্রে কী আস্ফালন, বড়দা ভেবেছে তার মেয়ের মতো পাত্র আর কারও জুটবে না? অ্যাঁ! এই যে পাত্রপক্ষ দেখে গেল এরা দশটা জ্যোতিপ্রকাশ গাঙ্গুলিকে কিনতে পারে।
কিছুদিন বাবাকে ওই পাগলামি পেয়ে বসেছিল। গৌরহরি চাটুজ্যে দুই ভাইকে টাকা দিয়ে পৈতৃক বাড়ির দুটো অংশ কিনে নেন। সেখানে কোনও গোলমাল ছিল না। দুই ভাই নরহরি আর রামহরি কাছাকাছি নিজেদের বাড়ি করে ফেলেছিল। গোলমাল বেঁধেছিল জিনিসপত্র, বাসন-কোসন এবং গয়নাগাঁটি ভাগাভাগি নিয়ে। গৌরহরি চাটুজ্জে তিন ভাইয়ের মধ্যে সবচেয়ে বিত্তশালী এবং প্রবল ব্যক্তিত্বওলা লোক। তার ওপর দুঁদে উকিল। মামলা মোকদ্দমা না হলেও সালিশির বিচারে দুই ভাই হেরে গেল। রামহরির সেই থেকে হঠাৎ হীনম্মন্যতা দেখা দেয়। তার হঠাৎ মনে হয়েছিল বড়দা যেন বড় উঁচুতে উঠে গেছে। এর একটা বিহিত করতেই হবে। নানাভাবে রামহরি গৌরহরিকে টপকানোর একটা অক্ষম চেষ্টা করেছিল কিছুদিন। তার মধ্যে একটা ছিল বড়লোক হওয়ার চেষ্টা। লটারির টিকিট কেনা, পলিটিক্সে নাম, ঠিকাদারি, পতিত জমি কিনে চাষ আবাদ। তাতে রামহরি কোনওটায় সফল, কোনওটায় বিফল হলেও গৌরহরিকে ছাড়িয়ে যেতে পারেনি। গৌরহরির মেয়ের বিয়েটাও তার চক্ষুশূল হয়েছিল। জামাই ছোটখাটো শিল্পপতিই শুধু নয়, অতিশয় সজ্জনও। রামহরি জামাই-ধরা প্রতিযোগিতায় বড়দাকে হারিয়ে দিতে কিছুদিন মরিয়া হয়ে নাবালিকা মেয়ের জন্য বড় বড় পাত্র ধরতে লেগে গিয়েছিল।
ভাগ্যিস এই পাগলামি দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। হলে এতদিনে পান্না কোনও বড়লোকের বাড়ির বউ হয়ে নির্বাসনে যেত। কে জানে বাবা। জীবনের রহস্যময় নানা আনন্দের শিহরন কোথায় হারিয়ে যেত। একদিন বিবেচক গৌরহরিই এসে রামহরিকে ঠান্ডা মাথায় কথা বলে শান্ত করলেন। বললেন, ভাগজোখ যদি তোর অন্যায্য বলেই মনে হয়ে থাকে তবে আমাকে এসে বলিস না কেন? যা চাস পাবি। পরিবারটাকে বিপদে ফেলিস না।
ভাব হয়ে যাওয়ায় তারা স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেছিল।
এই মুখপুড়ি, সন্ধেবেলায় ঘুমুচ্ছিস যে!
মুখে জোরালো টর্চের আলো পড়তেই ধড়মড় করে উঠে বসে পান্না।
ও মা! পারুলদি!
কাল চলে যাচ্ছি, তাই দেখা করতে এলাম।
এ সময়ে ভোল্টেজ কম থাকে বলে ঘরের টিমটিমে আলোয় ভাল করে কিছু দেখাই যায় না। তবু এই ম্লান আলোতেও যেন জ্যোতির্ময়ীর মতো দেখাচ্ছে পারুলদিকে।
তুমি যে কী করে এত সুন্দর থাকো কিছুতেই বুঝতে পারি না।
দুর বোকা, সুন্দর আর কোথায়! মা বলছিল রং নাকি অনেক কালো হয়ে গেছে। বয়সও কি কম হল? সাঁইত্রিশ। ও বাবা, সাঁইত্রিশ মানে তো বুড়ি।
তোমার একটুও বয়স হয়নি পারুলদি।
হয়েছে হয়েছে। অনেক কষ্ট করে ফিট রাখতে হয়। এক চুল এদিক ওদিক হলেই ওজন চট করে বেড়ে যেতে চায় আজকাল।
একটা মেয়ের সঙ্গে আজ ভাব হল, জানো! তার নাকি খুব ইচ্ছে ছিল তোমার মেয়ে হয়ে জন্মায়।
পারুল অবাক হয়ে বলে, সে কী রে! কে সেই মেয়েটা?
অমলদার মেয়ে সোহাগ।
পারুল একটু গম্ভীর হয়ে বলে, মেয়েটি এঁচোড়ে পাকা। ওর সঙ্গে বেশি মিশিস না।
মিশব কী? আজ পথ ভুল করে এসে পড়েছিল বলে আলাপ হয়ে গেল। অমলদা আজ আসবে, কালপরশুই চলে যাবে ওরা।
অমল রায় আসেনি। ওদের মধ্যে একটু গণ্ডগোল চলছে বোধহয়। তুই বেশি মাখামাখি করতে যাস না। ওরা অন্যরকম। মাথা গুলিয়ে দেবে।
কিন্তু পারুলদি, মেয়েটাকে যে আমার ভীষণ ভাল লাগল। সে বলছিল, তুমি নাকি একজন গডেস।
পারুল একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে চুপ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। তারপর বলল, গডেস হওয়া কি অত সোজা? মেয়েমানুষ হয়ে জন্মালে কত পাপ চারদিক থেকে ফণা তোলে। গডেস হয়ে থাকতে দেয় কই?
একটু আনমনা হয়ে গেল পারুলদি। হাতের বড় টর্চটা কয়েকবার ছেলেমানুষের মতো জ্বালাল, নেবাল।
তোর কত বয়স হল রে পান্না?
সতেরো।
সতেরো! বলে একটু ভাবল পারুলদি। ওই সতেরো শব্দটাই যেন পারুলদিকে একটু দূরে নিয়ে গেল। বোধহয় সতেরোয় ফিরে যাচ্ছিল সে।
তখনও জন্মায়নি পান্না। কুড়ি বছর আগে পারুলদির সঙ্গে প্রেম হয়েছিল অমল রায়ের। কীরকম প্রেম ছিল ওদের কে জানে। বিয়ে হয়নি। তাতে ভালই হয়েছে। বিয়ে হলে হয়তো প্রেমটা গ্যাদগ্যাদে হয়ে যেত।
তার খুব জিজ্ঞেস করতে ইচ্ছে হল, পারুলদি এখনও অমল রায়ের কথা ভেবে মাঝে মাঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিনা। ট্র্যাজেডি বড় ভাল লাগে পান্নার। ট্র্যাজেডির মতো এমন রোমহর্ষ আর কীসে আছে?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন