শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
শাড়ি কেনাটা একটু নাটকীয় হয়ে গেল নাকি?
তা হোক। তার জীবনে তো কোনও নাটকীয়তা নেই। নিতান্তই ভ্যাতভ্যাতে ঘটনাহীন জীবনযাপন। মদ্যপান ছাড়া নিজের লেভেলকে ছাড়িয়ে যাওয়ার উপায় নেই।
গড়িয়াহাটার মোড় থেকে সে জটিল কলকাতার দৃশ্য দেখল খানিক। চট করে বাড়িমুখো হতে পারল না। শাড়িটার জন্যই বাড়ি যেতে একটু লজ্জা হচ্ছে তার। কোনওদিন এভাবে কিছু উপহার দেয়নি মোনাকে। কী বলবে, কী বলতে হয় বা আনুষ্ঠানিকভাবে কী করে উপহার দিতে হয় তা তো অমল জানে না। তাই পা চলছিল না তার। মোনা কি বিদ্রুপের হাসি হাসবে? ঘুষ বলে মনে করবে? গ্রহণ করবে, নাকি ছুড়ে ফেলে দেবে আক্রোশে, এইসব জরুরি প্রশ্ন ও সমস্যায় ভারী পীড়িত হচ্ছিল সে।
রসিক বাঙালের কথাকে গুরুত্ব দেওয়াটা কি ঠিক হল?
এর পর যা-ই ঘটুক, তার তো হারানোর কিছু নেই। এই ভেবে সে বাড়ির দিকে পা বাড়াল, গড়িয়াহাট থেকে তার বাড়ি হাঁটাপথ। শীতের রোদে কলকাতা এখনই বেশ তেতে উঠেছে। গাঁয়ে শীত অনেক বেশি। রোদ যেন তেজালো হতেই চায় না। অমল খুব আস্তে আস্তেই হাঁটছিল। মনে মনে একটু প্রস্তুতির দরকার, একটু রিহার্সাল। কিন্তু ইদানীং তার মুখে কথাই আসতে চায় না। অনেক অন্যায় অভিযোগেরও যথাযোগ্য জবাব দিতে পারে না সে।
শোওয়ার ঘরে কন্ডোম পাওয়ার পর তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মোনা। তার গূঢ় সন্দেহ, তার অনুপস্থিতিতে অমল অন্য মেয়েমানুষ এনেছিল ফ্ল্যাটে। অমল সেই অভিযোগের জবাবই দিতে পারল না। আজও রহস্যময় সেই ঘটনাটার সমাধান খুঁজে পায়নি। সমাধান খুঁজে বের করার জন্য মাথাও ঘামায়নি সে। নিজেকে কলঙ্কমুক্ত করার কোনও তাগিদ সে আর অনুভব করে না। সে যা আছে তা-ই আছে, ক্রমে ক্রমে অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। এই অস্ত থেকে আর উদয় হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।
একটি থান-পরা বুড়ি ভিখিরি তার সামনে এসে মুখপানে চেয়ে হঠাৎ বলল, ও তুমি! তুমি তো বাপু দাও না।
বলে বুড়ি পিছু ফিরল। গড়িয়াহাটার প্রায় সব ভিখিরিকেই মুখ চেনে অমল। তবে কস্মিনকালেও সে কাউকে ভিক্ষে দেয় না। ভিক্ষে করা ব্যাপারটাকেই যে ভীষণ অপছন্দ করে।
আজ হঠাৎ মনে হল, এ-দিনটা অন্য রকম হোক। সে ডাকল, ও বুড়ি! ও বুড়ি মা!
বুড়ি একটু অবাক হয়ে ঘুরতেই অমল পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে বলল, নাও।
বুড়ি বলল, ও বাবা! দশ টাকা!
বুড়িটা একটু ঠ্যাটের মানুষ। আশীর্বাদ-টাশির্বাদ করল না। এরকম ভাল। ভড়ং নেই।
অমল একটু হাসল।
যত বাড়ির কাছাকাছি হচ্ছিল অমল তত অস্বস্তি বাড়ছে। যত নষ্টের গোড়া এই শাড়িটা। এটা না কিনলে অনেক সহজ হত ফেরাটা। কিন্তু যতই যাচ্ছে ততই যেন শাড়িটা বোঝা হয়ে উঠছে। জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকী এসব তাদের নেই। কেন কে জানে প্রথম থেকেই ওসব পালন-টালন করে না তারা। ফলে উপহারের ঝঞ্ঝাটও নেই। পুজো উপলক্ষে কিছু কেনাকাটা করা হয় বটে, কিন্তু সেটা মোনা একাই করে। কেন তারা বিবাহবার্ষিকী বা জন্মদিন পালন করে না সেটাও অমল বলতে পারবে না। কিন্তু অন্যেরা করে এবং অন্যের বিবাহবার্ষিকী বা জন্মদিনে তারা নেমন্তন্নও খেয়েছে।
এমনকী নিজের ছেলেমেয়ের জন্মদিনও পালন করে না মোনা। কথাটা এখন হঠাৎ মনে পড়ায় অমল একটু অবাক হয়। মোনা কি একজন সংস্কারমুক্ত মহিলা? তার কি কোনও সেন্টিমেন্ট নেই? এসব প্রশ্ন আগে অমলের মনে আসেনি, আজ এই শাড়ি কেনার সূত্রে এসব অনেক প্রশ্ন মনের তলায় স্থিতাবস্থা থেকে হঠাৎ ভুড়ভুড়ি কেটে উঠে আসছে। মোনাকে হয়তো আর একটু স্টাডি করা উচিত ছিল তার। কাছাকাছি বাস করেও হঠাৎ মোনাকে কেন যে এত অচেনা মনে হচ্ছে।
ফ্ল্যাটবাড়িতে পৌঁছে সে দেখল, গ্যারাজে তার গাড়িটা নিশ্চল পড়ে আছে। গায়ে ধুলোর পুরু আস্তরণ পড়েছে। ড্রাইভারটাকে হয়তো ছাড়িয়ে দিয়েছে মোনা। নইলে সে এসে রোজ গাড়িটা ঝাড়পোঁছ করত।
লিফটে ওপরে উঠতে উঠতে নিজের বোকা-বোকা ভাবটা ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করছিল অমল। তাতে আরও বোকা-বোকা লাগতে লাগল নিজেকে।
ডোরবেলের সুইচে হাত দিয়ে আবার একটু দ্বিধা।
তারপর ডোরবেলের মিষ্টি শব্দটা বেজে গেল ভিতরে। ল্যাচ ঘোরানোর শব্দ।
দরজায় মোনা। পরনে হাউসকোট, একটু অবাক চোখ।
দরজাটা ছেড়ে তাকে ভিতরে যেতে দিল মোনা। তারপর দরজাটা প্রায় নিঃশব্দে বন্ধ করে দিয়ে খুব স্বাভাবিক গলায় বলল, ওটা কার চাদর গায়ে দিয়ে এসেছ! এটা তো আমাদের চাদর নয়!
চাদরের কথাটা খেয়ালই ছিল না অমলের। মেয়েদের চোখ এড়ানো মুশকিল।
থতমত খেয়ে বলল, রসিকবাবু দিল।
রসিকবাবুটা আবার কে?
গাঁয়ের একজন লোক।
নাক কুঁচকে মোনা বলল, অন্যের চাদর গায়ে দিতে ঘেন্না হল না?
অমল কথাবার্তার এই ঝোঁকটা চালিয়ে যেতে চায়। নইলে সহজ হওয়া যাবে না। মোনার সঙ্গে একমত হয়ে বলল, ঘেন্না করছিল, উনি জোর করে দিলেন।
ওটা খুলে রাখো, কেচে ফেরত দিয়ে দিতে হবে।
অমল সঙ্গে সঙ্গে বাধ্য ছেলের মতো চাদরটা খুলে ফেলল।
শাড়ির বাক্সটা দেখে মোনা অবাক হয়ে বলল, ওটা কী?
অমল খুব কাঁচুমাচু হয়ে বলল, তোমার জন্য।
আমার জন্য!
হ্যাঁ।
আমার জন্য কী?
তোমার জন্য আনলাম।
মোনা কিছুক্ষণ বড় বড় চোখে তার দিকে চেয়ে বলল, কী ওটা?
একটা শাড়ি।
হঠাৎ?
এমনি পছন্দ হয়ে গেল। তাই।
ডিভানের ওপর থেকে বাক্সটা তুলে নিল মোনা। বাঁধন খুলে বাক্সর ঢাকনা তুলে দেখল প্রথমে। তারপর শাড়িটা বের করে আলোয় একটু খুলে দেখে নিয়ে তার দিকে তাকাল।
অমল জানে, শাড়িটা ওর পছন্দ হবে না। সে তো আর শাড়ি চেনে না। চোখে যেটা লেগেছে সেটাই কিনে এনেছে। মেয়েদের পছন্দ-অপছন্দের খবর সে আর রাখল কই?
কিন্তু তাকে ভীষণ অবাক করে দিয়ে মোনা শাড়িটা নিরীক্ষণের পর বলল, বাঃ, বেশ পছন্দ আছে তো তোমার!
খারাপ হয়নি তো!
নাঃ, খুব আনইউজুয়াল রং। কাজটাও ভারী সুন্দর। কে পছন্দ করে দিল?
কেউ না।
তুমি নিজেই পছন্দ করলে?
হ্যাঁ।
হঠাৎ আমার জন্য শাড়ি কেনার কী হল?
এমনি। মনে হল, তোমাকে তো কখনও কিছু দিই না।
সেটাই তো আমার অভ্যাস হয়ে গেছে। হঠাৎ ঘটা করে শাড়ি-টাড়ি দিলে কেমন যেন সন্দেহ হয়। সন্দেহ! সন্দেহ কীসের মোনা?
অতি-ভক্তি চোরের লক্ষণ কিনা।
চোরা মারটা হজম করে নিল অমল। দুজন মুষ্টিযোদ্ধা যখন লড়ে তখন তারা পরস্পরকে মারে এবং পরস্পরের মার হজমও করে। দুটোই দরকার। শুধু মারতে জানলেই হয় না, অম্লান মুখে মার হজমও করতে পারা চাই।
আমি কিছু ভেবে কিনিনি কিন্তু। হঠাৎ ইচ্ছে হল তাই।
নাকি কেউ বুদ্ধি পরামর্শ দিচ্ছে আজকাল!
অমল ভয় পেল। কথা যেভাবে এগোচ্ছে তাতে মোনা তাকে কোণের দিকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে। এরকম চললে হয়তো সে কবুল করে ফেলবে যে, নিজের বুদ্ধিতে সে কাজটা করেনি।
আচ্ছা, একটু চা-টা কিছু কি পাওয়া যাবে? খুব ভোরে বেরিয়েছি, গাড়িতে ভীষণ ঠান্ডা লাগছিল।
মোনা তার দিকে সেকেন্ড দুয়েক চেয়ে রইল। মেয়েদের মন, শত শত্রুতা থাকলেও একটা জায়গায় দুর্বল। তারা যে পুরুষের আশ্রয়দাত্রী এটা শেষ অবধি ভুলতে পারে না।
বাইরের জামাকাপড় বদলাও। চা দিচ্ছি।
আমার খুব খিদেও পেয়েছে।
জানি। পাওয়ারই কথা। হাত-মুখ ধুয়ে খাওয়ার টেবিলে বোসো।
তুমি কি বাড়িতে একা? ওরা কই?
দুজনেই স্কুলে গেছে। বাসুদেব তিন দিনের ছুটি নিয়েছে।
ওঃ, তাহলে?
তাহলে কী?
চা-টা করবে কে?
কেন, আমি কি নুলো, না অচ্ছুৎ?
কষ্ট হবে।
বাব্বাঃ, আমার কষ্টের কথা ভেবে তেরাত্তির ঘুম হবে না বোধহয়?
তা নয়।
একা ঘরে আমাকে আবার ভয় হচ্ছে না তো! ঘাড় মটকে দিই যদি!
অমল হাসল। বলল, তোমাকে ভয় কীসের?
তা তো জানি না। চোখমুখ দেখে তো মনে হচ্ছে বাড়িতে আর কেউ নেই জেনে খুব অস্বস্তিতে পড়েছ।
তা পড়েছে অমল। কিন্তু সেটা তার মুখভাবে প্রকাশ পাচ্ছে জেনে তার আরও দুশ্চিন্তা হচ্ছে, সে বোকার মতো বলল, না না, আমি ভীষণ টায়ার্ড।
মোনার দিকে চোখ তুলে তাকাতে পারছিল না অমল।
তাকে এই অস্বস্তিতে বেশিক্ষণ রাখল না মানা। হঠাৎ ঝটকা মেরে মুখ ফিরিয়ে রান্নাঘরে চলে গেল।
অমল শোওয়ার ঘরে এসে পোশাক পালটাল। মস্ত আয়নায় তার প্রতিবিম্ব দেখতে পেল হঠাৎ। দাড়ি-গোঁফ এবং বড় চুলে তাকে বনমানুষের মতো দেখাচ্ছে। তবু ভাল। তার চেহারায় এমনিতে কোনও বৈশিষ্ট্য নেই। তার উচ্চতা সাড়ে পাঁচ ফুটের চেয়েও একটু কম। হিল পরে পাশে হাঁটলে মোনাকেও তার চেয়ে লম্বা লাগে। তার গায়ের রং ময়লা না হলেও ফর্সা নয়। মুখশ্রী নয় আকর্ষক। বন্য পুরুষালি আকর্ষণ তার একটুও নেই। দাড়ি-গোঁফ হওয়ায় বরং একটু কৃত্রিম বন্যতা এসেছে। দাড়ি-গোঁফের একটা আরোপিত গাম্ভীর্যও আছে।
কিছুক্ষণ নিজের প্রতিবিম্বের দিকে চেয়ে রইল অমল। হঠাৎ একটা কণ্ঠস্বরে চমকে উঠল সে। কে যেন বলে উঠল, উই আর ইন ট্রাবল। উই আর ইন এ জ্যাম।
কে বলল কথাটা? ঘরে দ্বিতীয় কেউ তো নেই! তাহলে কি সে নিজে?
হ্যাঁ, কথাটা বোধহয় সেই বলেছে। নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে অমল। কী আর করা।
একা এই ফ্ল্যাটে সে আর মোনা। যেন বাঘিনী আর তার শিকার। ছেলে-মেয়েরা থাকলে হয়তো কিছু ডাইভারশন থাকত। তারা নেই, ফলে একা অমলের ওপরেই মোনা তার শব্দভেদী বাণগুলো প্রয়োগ করবে। বড্ড ভয়-ভয় করছে তার। একসময়ে যৌবনে মোনার সঙ্গে তার মাঝে মাঝেই তর্ক বা ঝগড়া হয়েছে। তখন মোনাকে তার ভয় হত না। এখন হয়। এখন সে মানসিকভাবে দুর্বল, শারীরিকভাবেও। তার ভিতরে কোনও লড়াই আর অবশিষ্ট নেই। মোনা দয়া করে যদি তাকে বাক্যবাণ থেকে রেহাই দেয়। এই দয়াটুকু সে হাঁটু গেড়ে বসে চাইবে কি?
বাথরুমে হাতমুখ ধুতে গিয়েছিল অমল। কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে থেকে ভাবতে লাগল, স্নান করে নেবে কিনা। সিদ্ধান্ত নিতে বেশ সময় লাগে তার আজকাল। খুব সামান্য বিষয় নিয়েও তার মন দুভাগ হয়ে দুরকম মত প্রকাশ করতে থাকে।
বাথরুমের দরজায় একটু শব্দ।
কে?
তোমার হল? কফি ঠান্ডা হয়ে যাবে যে!
ও আচ্ছা।
সে শাওয়ারটা খুলে নীচে দাঁড়িয়ে গেল। বোধহয় আরও কিছু শীতলতাই তার দরকার।
স্নান করে একরকম ভালই লাগছিল তার। শরীরে একটু কাঁপুনি হচ্ছে বটে, কিন্তু বেশ লাগছে।
বেরিয়ে এসে দেখল, খাওয়ার টেবিলে মোনা কফি সাজিয়ে বসে আছে।
পরোটা আর আলুভাজা খাবে?
অমল হ্যাঁ বলবে কিনা ভাবতে লাগল।
আমি বলি এত বেলায় ভারী জলখাবারের দরকার নেই। বরং একবারে ভাত খেও। এখন বিস্কুট দিয়ে কফি খাও। কেমন?
এই আশ্চর্য সদ্ব্যবহারে বিগলিত হয়ে গেল অমল, বলল, সেই ভাল।
তুমি কি স্নান করলে?
শীতে কাঁপছ। তোমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। গিজারে গরম জল তো ছিল, নাওনি?
না। খেয়াল হয়নি।
আজকাল তোমার মন কোথায় থাকে?
কফি একটু চলকে গেল অমলের। নরখাদকদের দুন্দুভি বেজে উঠল নাকি? ঝলসাবে, তারপর ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে, হাড়গোড় চিবোবে।
দুপুরে কী খাবে?
নতমুখে অমল বলল, যা হয়।
আমি রাঁধতে যাচ্ছি। বাসুদেব চলে যাওয়ায় বাজারহাট হচ্ছে না। ডিপ ফ্রিজে শুধু খানিকটা মাছ আছে।
ব্যগ্র হয়ে অমল বলল, ওতেই হবে। ব্যস্ত হওয়ার কিছু নেই।
আমি রাঁধতেও ভুলে গেছি। তোমার মুখে রুচবে কি না জানি না।
একসময়ে তোমার রান্নাই তো খেতাম। চিন্তার কিছু নেই।
চিন্তার আছে বইকী! রান্না মনের মতো না হলে আবার হয়তো না বলেকয়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যাবে।
অমল নতমুখে বসে রইল।
তোমার একটা চাকরি আছে, সেটা ভুলে যাওনি তো! তারা তোমাকে মোটা মাইনে দেয়। সেখানে তোমার বেশ দায়িত্বের কাজ আছে বলেই শুনেছি। তোমার কি ধারণা তারা এরপর থেকে তোমাকে মুখ দেখে মাইনে দেবে?
অমল একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল। কথাটা মিথ্যে নয়। তার কোম্পানি তাকে বিরাট অঙ্কের মাইনে দেয়। কিন্তু চাকরি করার জন্য একটা মোটিভেশন দরকার। সেটা কোথায় যে উবে গেছে কে জানে। তার কেবলই মনে হয় তার আর কিছু দেওয়ার নেই। তার বিদ্যা, তার বুদ্ধি, তার উর্বর মস্তিষ্ক কিছুই আর কাজ করে না।
দয়া করে অফিসে একটা ফোন করো। এই ভদ্রতাটুকু তারা আশা করতেই পারে। পরশুদিন তোমাদের এম ডি ফোন করে তোমার হোয়ারঅ্যাবাউটস জানতে চেয়েছিলেন। আমাকে এক গাদা মিথ্যে কথা বলতে হল।
কী বললে?
বললাম ওঁর বাবা হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় দেশের বাড়িতে গেছেন। সেই সঙ্গে এও বলতে হল যে, আমরাও গাঁয়ের বাড়িতে গিয়েছিলাম এবং সেখানে ফোন নেই। ইত্যাদি। ভদ্রলোক বলেছেন, ফিরে এসে তুমি যেন ওঁর সঙ্গে যোগাযোগ করো।
ঠিক আছে।
তোমার ভাল-মন্দ তুমি বুঝবে। কিন্তু আমার মনে হয়, তোমার এখন বয়স হচ্ছে। নিত্যনতুন চাকরি করা তোমার পক্ষে কি ভাল হবে? এরা যদি তোমাকে ছাড়িয়ে দেয় তা হলে কী করবে তুমি? আর একটা নতুন চাকরি তো? সেটা যদি কলকাতায় না হয়ে দিল্লি, বোম্বে বা ব্যাঙ্গালোরে হয় তা হলে আবার এখানকার বাস তুলে আমাদের অন্য জায়গায় গিয়ে সেটল করতে হবে।
এই প্রথম অমল মোনার চোখের দিকে সরাসরি চাইল। চেয়ে রইল। কী বলছে মোনা? তার শেষ বাক্যটায় “আমাদের” শব্দটা ছিল না? তার মানে কি ডিভোর্সের কথা ভুলে গেছে মোনা? সিদ্ধান্ত বদল করেছে? বুকটা ধুকপুক করছিল তার।
অমল আলটপকা বলে উঠল, আচ্ছা আমরা, মানে আমাদের এই পরিবারে কখনও জন্মদিন বা বিবাহবার্ষিকী করিনি, না?
ভীষণ অবাক হয়ে মোনা তার দিকে চেয়ে রইল। তারপর বলল, হঠাৎ এ কথা কেন?
এমনি, মনে হচ্ছিল।
না, ওসব ফর্মাল ব্যাপার আমার ভাল লাগে না। পার্টি-টার্টি আমার কোনওদিনই পছন্দ নয়। তুমিও তো কখনও বলোনি ওসব করতে।
না না, এটা আমার কোনও অভিযোগ নয়। জাস্ট কৌতূহল। অনেকেই ওসব সেলিব্রেট করে কি না তাই।
ভ্রু কুঁচকে মোনা বলল, সেলিব্রেশনের কী আছে বুঝি না বাবা। একটা বিশেষ তারিখে জন্মানো বা বিশেষ দিনে বিয়ে করা কী এমন একটা আহামরি ব্যাপার যে বছর বছর সেটার জন্য আহ্লাদ করতে হবে!
তা তো ঠিকই।
তোমার কি এখন জন্মদিন বা ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি করতে ইচ্ছে হয়েছে নাকি?
আরে না। ফরগেট ইট।
হঠাৎ এমন এক একটা প্রশ্ন করো যে চিন্তায় ফেলে দাও। তোমার হল কী বলো তো!
কিছু হয়নি।
কেউ নতুন কোনও ফর্মুলা দেয়নি তো!
কীসের ফর্মুলা?
গৃহশান্তির!
না, কেউ এ ব্যাপারে কিছু বলেনি আমাকে।
একবার তো শুনেছিলাম আমার জা তোমাকে একটা ফর্মুলা শিখিয়েছিল।
কী বলো তো!
তোমাকে শেখায়নি বউয়ের সঙ্গে এক বিছানায় শুলে ভাব হয়?
অমল সামান্য লজ্জা পেয়ে বল, ওঃ হ্যাঁ, বউদি গাঁয়ের মেয়ে, তার সেকেলে সব ধারণা।
তাই ভাবছিলাম এই নতুন ফর্মুলাটা আবার কেউ শেখাল কি না।
ফর্মুলা নয়। আজ হঠাৎ তোমার জন্য শাড়িটা কেনার পর মনে হচ্ছিল তোমাকে কোনও অকেশনে কিছু কখনও দিইনি। তখনই ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি আর বার্থ ডে-র কথা মনে হল।
তুমি আমাকে আজ খুব অবাক করে দিয়েছ। তোমার হঠাৎ শাড়ি নিয়ে ঘরে ঢোকার দৃশ্যটা আমার অনেক দিন মনে থাকবে।
অমল কফিটা শেষ করে বলল, শাড়িটা কি পছন্দ হয়নি?
সেটা পরের কথা! শাড়ি নিয়ে আসাটাই তো অভিনব ব্যাপার। কত দাম নিল?
আড়াই হাজার।
গড়িয়াহাটার এই দোকানটা দাম একটু বেশিই নেয়।
তা নিক। এটাই তো প্রথম।
হ্যাঁ। তবে তোমার ভয় নেই। শাড়িটা আমার খুব পছন্দ হয়েছে।
অমল একটু তৃপ্তির হাসি হাসল।
খুশি হয়েছ?
মোনা হঠাৎ করুণ একটু হেসে বলল, খুশিই তো হওয়ার কথা।
কিছুক্ষণ দুজনে চুপচাপ।
তারপর মোনা বলল, ভাবছি শাড়িটার বদলে তোমাকে এখন আমি কী দিই!
অমল ব্যস্ত হয়ে বলে, আরে না, আমাকে আবার তুমি কি দেবে?
মোনা একটু হেসে বলল, আমি তো আর রোজগার করি না যে নিজের পয়সায় তোমাকে কিছু কিনে দেব। যা দেব তা তো তোমার পয়সাতেই কেনা। সে দেওয়ার কথা তো বলিনি।
তা হলে?
তা ছাড়াও কি কিছু দেওয়ার নেই?
অমল একটু ধন্দে পড়ে বলে, কিছু দিও না মোনা, প্লিজ। শোধবোধ হয়ে গেলে কি দেওয়ার আনন্দ থাকে?
একটা রহস্যময় হাসি হেসে মোনা বলল, থাকতেও পারে।
এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটে গেল যে প্রস্তুত হওয়ার সময়ই পেল না অমল। চেয়ার থেকে উঠে হঠাৎ একটা ঝলকের মতো তার ওপর এসে পড়ল মোনা। দুটো হাতে গলা জড়িয়ে ঠোঁটে ঠোঁট চেপে ধরল। ওই আলিঙ্গনের ধাক্কায় ডাইনিং টেবিলের পলকা চেয়ার উলটে পড়েই যেত অমল। মোনাই পড়তে দিল না তাকে। ধরে রইল।
পরের পনেরো মিনিট তারা কোনও মনুষ্য ভাষায় কথা কইল না। দুজনের মুখ দিয়ে শুধু অদ্ভুত জান্তব সব শব্দ বেরিয়ে এল। কীভাবে হলঘর থেকে শোওয়ার ঘরের বিছানা অবধি এল তারা তাও স্পষ্ট মনে নেই অমলের।
পনেরো মিনিট পরে তাদের দুজনেই সামান্য হাঁফাচ্ছিল। শিথিল বাহুতে তখনও ধরে আছে পরস্পরকে।
মোনা মৃদু হেসে বলল, শোধ হল?
অমল ম্নান একটু হেসে বলল, শোধবোধের দরকার কী?
আমি কেমন?
তুমি! তুমি তো ভালই।
এই বয়সেও আমার শরীরে একটুও ফ্যাট নেই, দেখেছ? দুটো ছেলেমেয়ের মা হওয়া সত্ত্বেও!
দেখেছি। তুমি বোধহয় ব্যায়াম করো।
করি। তুমি আমার কোনও খবর রাখো না।
অমল উঠল। দীর্ঘ দিনের পর স্বামী-স্ত্রীর এই হঠাৎ মিলন যে কোনও সমস্যারই সমাধান করতে পারে না তা সে জানে। শরীরে শরীর মিশিয়ে দিলেই কি দূরত্ব ঘোচে? সাহেবরা বলে লাভ মেকিং। আদিখ্যেতা, মিথ্যাচার। সেক্স হ্যাজ নাথিং টু ডু উইথ লাভ। সাহেব শালারা ওসব বোঝে না। ওদের ভালবাসা বড় বেশি লিঙ্গ-নির্ভর। বউ নিয়ে যেমন লোক-দেখানো আশনাই করে, হনিমুনে যায়, তেমনি টপাটপ খারিজ করে দেয় পরস্পরকে।
মোনা আর তার যা সম্পর্ক তাতে কবেই ডিভোর্স হয়ে যেতে পারত, হয়নি, তারা সাহেবদের মতো নয় বলেই।
পাশাপাশি খাট থেকে পা ঝুলিয়ে কিছুক্ষণ বসে রইল তারা। নগ্ন, চুপচাপ
খিদে পায়নি?
না তো! এই তো কফি খেলাম
খোঁপা বাঁধতে বাঁধতে মোনা বলল, তোমাকে শেভ করতে বলিনি, কেন জানো?
কেন?
দাড়ি আর গোঁফে তোমাকে বেশ ভালই লাগছে। দাড়িটা বরং রাখো, তবে ট্রিম করা দরকার।
অমল মোনার দিকে চেয়ে বলল, আমাকে কি তুমি সত্যিই ডিভোর্স করতে চাও?
মোনা একটু গম্ভীর হয়ে গেল। বলল, তুমি চাও?
আমি! না তো! আমি চাই না।
কেন চাও না? এ সম্পর্ক টিকিয়ে রেখে কী লাভ?
সেটা ভেবে দেখিনি কখনও। কিন্তু মনে হয় সম্পর্ক ভেঙে দিয়েও তো কোনও লাভ নেই।
মোনা উঠে অলস হাতে হাউস কোটটা তুলে নিয়ে বলল, আমি ডিভোর্স চেয়েছিলাম ঠিকই। উঁকিলের পরামর্শও নিয়েছিলাম। কাগজপত্র তৈরি হচ্ছিল। একদিন বিকেলে সোহাগ বলল, তুমি বাবাকে ডিভোর্স করতে চাইছ, করো, কিন্তু তোমার কি ধারণা তোমাদের দুজনের সম্পর্ক শুধু তোমাদের দুজনকে নিয়েই? স্বামী আর স্ত্রী? তার মধ্যে কি আমরাও নেই? আমাদের এতকাল একসঙ্গে থাকার অভ্যাস নেই? বিয়ের এত বছর পরও যদি তোমাদের মনে হয় যে ইট ইজ এ ফেইল্ড ম্যারেজ তা হলে তার জন্য তো তোমরাই দায়ি। আর সেজন্য তোমাদের প্রায়শ্চিত্ত করা উচিত। ট্রাই এগেইন টু রিকনস্ট্রাক্ট ইট।
বিস্মিত অমল বলল, সোহাগ!
হ্যাঁ। কথাগুলো আমার কাছে অদ্ভুত শোনাল। তারপর আমি কেবল কদিন ধরে ভেবেছি। তাই তো! স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা তো শুধু তাদের দুজনের নয়। তাদের জড়িয়ে আরও কত কিছু গড়ে ওঠে। সবসময়ে যে ভালবাসা থাকবেই তাও তো নয়। থাকে দায়দায়িত্ব, থাকে কর্তব্য, থাকে নির্ভরতা। সংসার গড়ে তোলা কি কম কথা? দাবার ঘুঁটি হলে না হয় হাটকে-মাটকে দেওয়া যায়।
অমল চুপ করে মোনার দিকে চেয়ে রইল। এ কথা ঠিক যে, এই ভদ্রমহিলার প্রতি তার তেমন কোনও আকর্ষণ নেই, একে খুশি করার কোনও উদ্যমও নেই তার, একে গভীরভাবে জানার চেষ্টাও সে কখনও করেনি। তবু মোনা যদি চলে যায় তা হলে একটা অদ্ভুত শূন্যতার সৃষ্টি হবে। সেটা বোধহয় তার ভাল লাগবে না।
মোনা ভারী উদাস গলায় বলে, সোহাগের ধারণা আমি চলে গেলে তুমি বেশি দিন বাঁচবে না, একদিন বলছিল, বাবা তোমাকে ভালবাসে কিনা আমি জানি না, কিন্তু তুমি চলে গেলে বাবা ঠিক মরে যাবে। নিজের দেখাশোনা করার মতো শক্তিই বাবার নেই। না খেয়ে-খেয়ে, অযত্নে শেষ হয়ে যাবে লোকটা। নিজের ভাল-মন্দ বাবা তো বুঝতে পারে না।
নিজেকে ভারী বেকুবের মতো লাগছিল অমলের। এরা তাকে নিয়ে ভাবে তা হলে? একটু হলেও ভাবে! সে তো ধরে নিয়েছিল, সে মরে গেলেও এদের তেমন কিছু যাবে আসবে না।
মোনা বিষণ্ণ মুখে বলল, তুমি আমাকে চাও বা না চাও, আমি তবু ওদের মুখ চেয়ে সিদ্ধান্ত বদল করেছি। আরও কিছুদিন দেখা যাক। কী বলো?
হ্যাঁ, মোনা, আরও কিছুদিন দেখা যাক।
কী করব আমরা?
তা তো জানি না। তুমি যা বলবে আমি তাই করতে রাজি।
লক্ষ্মীছেলে হয়ে গেলে নাকি?
না মোনা। লক্ষ্মীছেলে নয়। আমার মাথা বিভ্রান্ত, বুদ্ধি ঘোলাটে, চিন্তা বিক্ষিপ্ত, আমি নিজে কোনও সিদ্ধান্তই নিতে পারি না আজকাল। আমার মনে হয়, কারও ওপর নির্ভর করাটা এখন বড্ড দরকার, কিন্তু কার ওপর করব মোনা? আমার তো কোনও বন্ধু নেই!
আমারও মনে হচ্ছে তুমি ঠিক স্বাভাবিক নেই।
না। আমি স্বাভাবিক নেই।
মোনা তার দিকে নিবিড় স্নিগ্ধ চোখে চেয়ে থেকে হঠাৎ বলল, একটা সত্যি কথা বলব?
বলো।
ঠিক এখনই কিন্তু তোমাকে আমার সবচেয়ে ভাল লাগছে। এত ভাল কখনও লাগেনি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন