শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়
চা জুড়িয়ে গেল যে! খাও।
চুপচাপ চা শেষ করল অমল। তারপর বউদির দিকে চেয়ে একটু মলিন হেসে বলল, এখন আমাকে কী চোখে দেখছ ঠাকরোন? ঘেন্না হচ্ছে?
না বাপু, পুরুষমানুষের ওরকম একটু আধটু দোষঘাট হতেই পারে। ঘেন্না হবে কেন? বিয়েই তো হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। পারুল দেমাক দেখিয়ে বিয়ে করল না। না হলে কি এটা নিয়ে কথা উঠত, বল?
অমল মাথা নেড়ে বলে, না, উঠত না। পারুল না হয়ে অন্য কোনও মেয়ে হলে বিয়েও করত। পারুল কেন করল না বল তো!
দেমাক বাপু, বড্ড দেমাক।
না বউদি। এটা দেমাকের ব্যাপার নয়, তবে কাছাকাছি। পারুল আমাকে যে অপমানটা করল সেটা করার জন্য বুকের পাটা চাই। খুব বুকের পাটা চাই। সেদিন পারুলের ওপর রাগ হয়েছিল বটে আমার। কিন্তু এখন ওই জন্যই পারুলের ওপর আমার শ্রদ্ধা হয়। পুরুষের গায়ের জোর বেশি, জোর খাটাতেও সে পিছপা হয় না। চিরকাল মেয়েরা এই প্রবল পুরুষের ইচ্ছের কাছে নত হয়ে আসছে। ওইটাই রেওয়াজ। পারুল সেটা হতে দিল না। ঝগড়া-তর্ক করেনি, ভাষণ দেয়নি, নারীমুক্তির বুলি কপচায়নি, শুধু নীরবে আমাকে নাকচ করে দিয়েছে। ঠাকরোন, ভেবে দেখো, পারুলের মতো এমন কঠিন প্রতিবাদ কটা মেয়ে করতে পারে?
ও বাবা, তুমি যে পারুলের গুণকীর্তন শুরু করলে! আমার বাপু, ওসব মনে হয় না। মেয়েদের অত অহংকার তো ভাল নয়। যার সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েই আছে সে যদি একটু বাড়াবাড়ি করেই ফেলে তাহলে কি মহাভারত অশুদ্ধ হয় নাকি?
বললাম তো, বেশির ভাগ মেয়েই এসব ক্ষেত্রে মেনে নেয়, আসকারাও দেয়। পারুল যে দেয়নি তাতে প্রমাণ হয় যে সে বেশির ভাগ মেয়ের মতো নয়। তার জাত আলাদা।
অবাক কাণ্ড বাপু। তোমার বউও এরকমই কী যেন বলছিল।
কী বলছিল?
আমার মাথায় বাপু, এত সব ব্যাপার ঢুকতে চায় না। গেঁয়ো মানুষ তো। মোনারও দেখলুম, পারুলের ওপর একটুও রাগ নেই। বরং বলছিল তোমরা সবাই নাকি পারুলের মধ্যে একটা দেবী-দেবী ভাব দেখতে পাও। হ্যাঁ ঠাকুরপো, তোমাদের সবারই কি একসঙ্গে একটু মাথার দোষ হল?
তা নয় ঠাকরোন। পারুলকে আমি ভোগ্যবস্তুর মতো ব্যবহার করে যে মস্ত ভুল করেছিলাম তা ধীরে ধীরে বুঝতে পারছি। মেয়েরা তো শুধু ভোগ্যবস্তু নয়, যদিও বেশির ভাগ পুরুষই তাই মনে করে। পারুল আমাকে গ্রহণ না করে সেটাই বুঝিয়ে দিয়েছিল। আর মোনার কথা বলব? আমার মনে হয় পারুলের মধ্যে মোনা সেই মেয়েটাকেই দেখতে পায় যে রকমটা সব মেয়েই হতে চায়।
উঃ বাপরে! এবার তুমি আমার মাথাটাই খারাপ করে দেবে। যা ভেবে নিয়েছ তোমরা তা সব মনগড়া। পারুলকে টং-এ চড়িয়ে কেন যে পুজো করতে লেগেছ জানিনে বাপু। যত সব পাগুলে কাণ্ড। একটু মর্ত্যে নেমে এসো তো এখন।
মৃদু হেসে অমল বলে, আচ্ছা, নামলাম। এবার বলো।
আমি বলি কী, মোনা যখন গাঁয়ে আর থাকতে চাইছে না তখন ওকে নিয়ে কলকাতায় যাও না কেন? এখানে বেচারার একঘেয়ে লাগছে।
যেতে তো হবেই। ছুটি ফুরিয়ে এল।
দু-একদিনের মধ্যেই চলে যাও।
মোনা তোমাকে জপিয়েছে বুঝি? তোমাদের এত ভাব হল কী করে বল তো! আগে তো ও তোমাদের দিকে ফিরেও তাকাত না।
ভাব হয়েছে বটে, তবে ভালবাসাটা এখনও হয়নি।
কী করে হল?
হয়ে গেল। কারও কাধে মাথা রেখে কাদতে হবে তো!
ও, তাও তো বটে। মোনা তোমার কাঁধটাই বেছে নিয়েছে তাহলে?
ওরকমই ধরে নাও না কেন?
পারুল আর আমার ঘটনাটা তোমাকে মোনা বলল কেন ঠাকরোন? ও কি চাইছে ব্যাপারটা চাউর হোক?
দুঃখে দুঃখে বলে ফেলেছিল। ভয় নেই, কথাটা পাঁচকান হবে না।
হলেই বা আমার কী বল! আমার কিছু আর যায় আসে না। কিন্তু পারুলের সম্পর্কে রটনা হলে আমার খারাপ লাগবে। ওর তো দোষ ছিল না!
একেবারেই ছিল না?
না ঠাকরোন।
আমি বিশ্বাস করি না।
কেন করো না?
আমিও মেয়েমানুষ বলেই।
অমল হাসছিল। বলল, দুনিয়ার সব ঘটনাই মানুষ নিজের নিজের মতো ব্যাখ্যা করে নেয়।
তুমি তোমার মতো বুঝেছ, আমি আমার মতো করে বুঝে নিয়েছি।
ঠাকরোন, আলোচনাটা আজ থাক। ঘটনাটা তো সুখের স্মৃতি নয়। যত ঘাঁটব তত মনটা খারাপ হবে।
তোমার বাপু, সবটাতেই বড় বাড়াবাড়ি। কবে কী হয়েছে তাই নিয়ে একেবারে দুঃখদাস হয়ে বসে আছ, বউকে ভালবাসতে পারলে না, সংসার মন দিলে না। নিজের দোষ ভেবে মনমরা হয়ে থাক। এমন কী ঘটনা যে আউল-বাউল হয়ে যাচ্ছ?
মাথা নেড়ে অমল বলে, আউল-বাউল নই, দুঃখদাসও নই।
তাহলে আবার কী! ওই যে বলেছিলাম, মনে আছে?
কী বলেছিলে?
বর-বউ এক বিছানায় শোও এখন থেকে।
তাতেই হবে?
শুয়েই দেখো না। আর কলকাতায় যাও।
অমল হেসে ফেলে বলে, তোমার প্রেসক্রিপশন বড্ড সহজ-সরল। আমাদের সমস্যাটাও যদি তাই হত।
আচ্ছা মশাই, বউকে ভালবাসা কি এতই কঠিন কাজ?
ভালবাসা কখন কঠিন হয় জান?
কখন?
যখন ভালবাসা জিনিসটাই বুকের ভিতর থেকে উবে যায়। তুমি বউকে ভালবাসার কথা বলছ, আমার যে কোনও কিছুর প্রতিই আর ভালবাসা নেই। বেঁচে থাকাটাও আর ভাল লাগে না।
বলে কী গো! শুধুই পারুল! আর কিছু নয়?
মৃদু হেসে অমল বলে, না ঠাকরোন, পারুলও নয়।
তবে তোমাকে খেলো কে?
সেইটেই তো ভাবি।
আর ভাবনা-কাজী হয়ে বসে থেকো না। মোনাকে নিয়ে কলকাতায় যাও।
কেন যে কলকাতায় যাওয়ার জন্য হুড়ো দিচ্ছ! কলকাতাতেই কি আমি ভাল থাকি?
সে জন্য নয়।
তাহলে?
পারুল এখন গাঁয়ে আছে। পুজোর পর চলে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু শুনছি তার নাকি আবার ছেলেপুলে হবে। সবে অন্তঃসত্ত্বা হয়েছে। কিছুদিন থাকবে এখন। ছেলেমেয়েদের পাঠিয়ে দিচ্ছে জামশেদপুরে। ব্যাপারটা বুঝেছ?
না তো! পারুল গায়ে থাকবে বলেই কি আমাকে কলকাতায় তাড়াতে চাইছ?
এই তো বুঝেছ!
তার মানে কি পারুল আর আমার এক গাঁয়ে থাকাতেও তোমাদের আপত্তি?
আমার আপত্তি নয় ভাই। মনে হয় মোনা এটাকে ভাল চোখে দেখছে না।
তোমাকে তাই বলেছে বুঝি?
বলা নয়, তবে আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে দিয়েছে।
সন্দেহটা অমূলক ঠাকরোন, তবু তোমার কথা আমি মানব।
কবে যাবে?
কাল সকালেই।
যেও। তোমাকে যেতে বলছি বলে রাগ করলে না তো ভাই?
না। তুমি তো ভাল ভেবেই বলেছ. রাগ করব কেন?
আর যা বললাম তা মনে রেখো। চল্লিশের ওপর বয়স হল তোমার। এই বয়স থেকেই কিন্তু পুরুষদের বউকে খুব দরকার হয়।
তাই নাকি?
নিজের অভিজ্ঞতা থেকেই বলছি ভাই। যত বয়স বাড়ে ততই বউকে বেশি বেশি দরকার হয়। পুরুষদের উড়নচণ্ডী, বারমুখো ভাবটা তো বয়স হলে কমে যেতে থাকে। তখন একটু আসকারা চায় বউয়ের কাছে। তুমি টের পাও না?
না তো!
ও কেমন কথা!
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অমল বলে, এখন আমার কাউকেই দরকার হয় না তেমন। অফিস থেকে ফিরে নেশা করি। তার পর ঘুমোই।
ওটা কি একটা কথা হল? নেশা করে পড়ে থাকলে কি সমস্যার সমাধান হয়?
তুমি মোনার উকিল হয়েছ, ভাল কথা। কিন্তু আমি যে মোকদ্দমায় হেরেই বসে আছি ঠাকরোন, আমার জন্য আর কারও কিছু করার নেই।
তুমি যে কেমন হয়ে গেলে ভাই। বড্ড কষ্ট হয় তোমার জন্য। কত রোখাচোখা চালাক-চতুর ছিলে! এখন কেমন ভ্যাবলার মতো চুপচাপ বসে থাক! কী হয়েছে তোমার? একটু ডাক্তার দেখাও না।
ঠিক আছে, তাই না হয় দেখাব।
তুমি হাসছ! তার মানে ডাক্তারও দেখাবে না।
তুমি তো একটা প্রেসক্রিপশন দিয়েছ। সেটাই ফলো করে দেখি।
দেখো গো দেখো। তাতে ভালই হবে।
প্রেসক্রিপশন কাজে লাগানোর কোনও ইচ্ছেই ছিল না অমলের। বউদি চলে যাওয়ার পর সে তার ডায়েরি টেনে নিয়ে বসল। কিছু একটা লিখতে ইচ্ছে করছে। আজকাল নানা উদ্ভট কথা বা আইডিয়া তার মাথায় আসে। এগুলো কারও কোনও কাজে লাগার কথা নয়। অমল তবু লিখে রাখে, নিজের মনের একটা চিত্র রেকর্ড হয়ে থাকে। সে যদি অনেকদিন বেঁচে থাকে— যদি তাকে বেঁচে থাকতেই হয়— তাহলে বুড়ো বয়সে সে ডায়েরির পাতা উলটে এই অচেনা অমলকে খুঁজে বের করবে, বিচার করবে, বিশ্লেষণ করবে। সিরিয়াস কিছু নয়, একটা খেলা বলেই ধরে নেওয়া যাক। লিখতে লিখতে মগ্ন হয়ে গিয়েছিল।
রাতে খেয়ে এসে নিজের ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে ফের লিখছিল সে। একটু বেশি রাতের দিকে দরজায় মৃদু টোকার শব্দ হল৷
চমকে উঠে অমল বলল, কে?
আমি। দরজাটা খোলো।
মোনা কাছাকাছি এলেই আজকাল সে ভয় পায়। মনে মনে নানা ব্যারিকেড রচনা করতে থাকে। কোন কথার কোন জবাব দেবে বা কতটা নীরব থাকবে। শেষ অবধি ব্যারিকেড কাজে লাগে না। আজকাল নীরবতাই তার একমাত্র ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সে দরজা খুলে দেখল, মোনা এই শীতেও একটা হলুদ রঙের নাইটি পরে দাঁড়িয়ে।
কিছু বলবে?
মোনা তার গা ঘেঁষে ঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল। তারপর মুখোমুখি হয়ে বলল, শুনলাম কাল কলকাতায় ফিরতে রাজি হয়েছ!
হ্যাঁ, আরও দুদিন ছুটি ছিল। ভাবছি ফিরেই যাই।
হঠাৎ সুমতি হল কেন?
সুমতি কুমতি নয় মোনা। ফিরে গেলেও হয়।
জিনিসপত্র সব গুছিয়ে ফেলেছ?
বিস্মিত অমল বলে, তুমি তো জানোই আমার জিনিসপত্র বলতে ওই অ্যাটাচিকেসটা। এ-ঘরে তো আর কিছু নেই।
কী করছিলে? ডায়েরি লেখা?
হ্যাঁ।
কী লিখছ ডায়েরিতে? আমার সম্পর্কে কিছু?
হঠাৎ অমল বুঝতে পারল, মোনা যুদ্ধ করতে আসেনি। এসেছে সন্ধি করতে। সম্ভবত বউদি ওকেও তাব গ্রাম্য প্রেসক্রিপশনটা গিলতে বাধ্য করেছে।
ডায়েরি আর কলম রেখে দিল অমল। বলল, না, তোমার সম্পর্কে বা কারও সম্পর্কেই কিছু নয়। মাথায় অনেক কথা আসে। লিখে রাখি।
মোনা দু হাতে তার এলোচুল গোছ করছিল। মুখাবয়বে একটু ভ্রূকুটি। ঠোঁট দুটো চেপে বসে আছে। দেহ মিলনের প্রস্তাবটা দিতে লজ্জা বা সংকোচ বোধ করছে। স্বামী ও স্ত্রীর মধ্যে মাঝে মাঝে এত দুস্তর ব্যবধান রচিত হয় যে, কিছুতেই সহজ হওয়া যায় না।
বোসো মোনা।
বসব?
যদি আপত্তি না থাকে।
মোনা বসল।
কথাটা বউদিকে না বললেও পারতে।
কোন কথাটা?
আমার আর পারুলের।
মোনা মাথা নিচু করে কিছুক্ষণ বসে রইল। জবাব দিল না।
ধীর স্বরে শান্তভাবে অমল বলে, বউদি গাঁয়ের মেয়ে তো। কথা ছড়ানো ওদের স্বভাব।
মোনা তার চুলের একটা গুছি সামনে এনে নীরবে পাক খাওয়াতে লাগল।
তোমার ইচ্ছে হলে অবশ্য পাঁচজনকে বলতে পার। আমার আর তাতে কোনও লজ্জা বা ভয় নেই। কিন্তু স্ক্যান্ডালটা হয়তো দুটো পরিবারের ক্ষতি করবে। যদিও অনেকদিন আগেকার ঘটনা তবু তারও কিছু প্রতিক্রিয়া তো আছেই। পাড়াগাঁয়ের নিষ্কর্মা মানুষ এসব কেচ্ছা নিয়ে খুব কথা চালাচালি করে।
দিদি বলবে না। কথা দিয়েছে।
অমল ম্লান একটু হেসে বলে, তুমিই তো সিক্রেটটা রাখতে পারলে না, অন্যে রাখবে সেটা কি আশা করা যায়?
আই অ্যাম সরি।
দোষ আমার বড় কম নয় মোনা। তবে আমি এখন এমন একটা মেন্টাল স্টেটে আছি যে এসব আমাকে তেমন স্পর্শ করে না। তোমাকে সত্যিই বলছি, পারুল ভাল মেয়ে। তার দোষ ছিল না। সে আমাকে বিয়ে না করে তার প্রতিবাদও জানিয়েছে। আমি যেমনই হই, পারুলকে খারাপ বলতে পারি না।
মোনা কিছুক্ষণ বসে থেকে বলল, আজ আমি তোমার কাছে অন্য কিছুর জন্য এসেছিলাম। পারুলের কথাটা না তুললেই হত না?
অমল ম্লান হেসে বলে, কেন এসেছ মোনা?
মোনা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, আজ থাক। কাল সকালে তাহলে আমরা কলকাতা যাচ্ছি?
হ্যাঁ যাচ্ছি। পাক্কা।
তোমার মেয়েও কি যাবে?
তা তো জানি না। ও কি থাকতে চাইছে?
আমার সঙ্গে কথা হয়নি।
তুমি কী বলো? ওকে রেখে যাবে?
না। এখানে ওর পড়াশুনো হবে না। ব্যায়াম হবে না। মিউজিক ক্লাস বা কম্পিউটার তেমন কিছুই হবে না। ও কেন থাকতে চাইছে এখানে জানো?
না।
ও বাজে ছেলেদের সঙ্গে আড্ডা মারবে। যেমন খুশি চলবে, যা খুশি করবে। এ বাড়ির লোকদেরও তো দেখছি। ভীষণ আনকালচার্ড।
তাহলে জোর করে নিয়ে চলো।
বিস্মিত মোনা বলে, তুমি জোর করতে বলছ?
বলছি। আর কি কোনও উপায় আছে?
জোর করারই বা উপায় কী? চুলের মুঠি ধরে নিয়ে যাবে?
অমল নিভে গিয়ে বলল, ভায়োলেন্সের কথা বলিনি।
ও যেতে চাইবে না, আমি জানি। বকে ঝকে বুঝিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে কোনওভাবেই রাজি করাতে পারিনি। ও তো আমাকে শত্রু বলে ভাবে।
অমল দুর্বল গলায় বলে, তাহলে কী উপায়?
আমি বুঝতে পারছি না।
অমল চুপ করে বসে রইল। তার বলতে ইচ্ছে হচ্ছিল, যেতে যখন চাইছে না তখন থাক। কিন্তু এর আগে একবার কথাটা বলে ফল ভাল হয়নি। তাই বলল না।
তুমিই জোর করার কথা বলছিলে। জোর কীভাবে করবে?
যদি বুঝিয়ে বলা যায়?
বুঝিয়ে বলা আর জোর করা এক ব্যাপার নয়। বুঝিয়ে বললে ও রাজি হবে না। তখন কী করবে?
অমলের মাথা কাজ করে না আজকাল। তবু হঠাৎ বিদ্যুচ্চমকের মতো একটা কথা মনে পড়ে গেল তার। সে বলল, কয়েকদিন আগে বুডঢা আমাকে বলছিল, দিদির ই-মেল-এ অদ্ভুত অদ্ভুত মেসেজ আসছে। তার কোনও কোনওটা নাকি খুব অশ্লীল জাঙ্ক মেল।
আমাকে বলেনি তো বুডঢা ।
বুডঢাকে জিজ্ঞেস করলেই বলবে। ওর কথা শুনে আমিও সোহাগের ই-মেল চেক করেছি। কথাটা মিথ্যে নয়।
কোথা থেকে আসছে? আমেরিকা?
মোস্টলি।
খুব খারাপ কথা?
একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে অমল বলে, খুব খারাপ। লেসবিয়ান সম্পর্কের কথাও আছে। সেগুলো আমি ডেস্ট্রয় করে দিয়েছি। কিন্তু মনে হয় এরকম আসতেই থাকবে।
জাঙ্ক মেল তো আমারও আসে, তোমারও আসে৷
হ্যাঁ, সেগুলো কারা পাঠায় তা আমরা জানি না। কিন্তু সোহাগের কাছে যারা পাঠায় তারা সবাই ওর অচেনা নাও হতে পারে।
ভ্রূ কুঁচকে একটু ভাবল মোনা। তারপর বলল, কিন্তু জাঙ্ক মেল-কে ভয় পেলে তো আমাদের চলবে না। ওটা কোনও বড় ফ্যাক্টরও নয়। তার চেয়ে ওর কলকাতায় যাওয়াটা অনেক জরুরি।
হ্যাঁ, আমিও তো তাই বলছি।
তাহলে এখন কী করব?
তৈরি হও।
আমি তৈরিই আছি। তোমার মেয়ে অঘোরে ঘুমোচ্ছে। ওকে ঘুম থেকে তুলে কাল কলকাতায় যাওয়ার কথা বলা ঠিক হবে কি?
তা কেন? ঘুমোচ্ছ ঘুমোক। কাল সকালেই বলে দেখো।
রাজি না হলে?
তখন ভাবা যাবে।
ভাবার সময় হবে কি?
আমরা কাল সকালে না গিয়ে দুপুরে বা আফটারনুনেও যেতে পারি। সময় পাওয়া যাবে।
সকালে একটা ভাল ট্রেন ছিল।
বর্ধমান থেকে কলকাতায় যাওয়ার কি ট্রেনের অভাব মোনা? দুপুরে শান্তিনিকেতন এক্সপ্রেসও তো আছে।
মেয়েকে কী বলবে তা তৈরি করে রেখো।
আচ্ছা।
আমি যাচ্ছি।
অমল একটু দ্বিধাগ্রস্ত গলায় বলে, যাবে?
উঠে দাঁড়িয়েও বসে পড়ল মোনা, থাকতে বলছ?
ভাগ্যক্রমে দেহমিলনের জন্য ভালবাসার দরকার হয় না এবং কাম প্রেমের দাস নয়। এবং বেশির ভাগ দম্পতিই বিয়ের বহু বহু বছর পরে প্রেমহীন চুম্বন, ভালবাসাহীন মিলনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে।
গভীর রাতে ক্লান্ত দুই নরনারী বিভিন্ন হল।
আমি ও-ঘরে যাচ্ছি।
যাও।
উঠে দরজাটা বন্ধ করে দাও।
ভেজিয়ে রেখে যাও, কিছু হবে না।
সামনে সমস্যাসংকুল এক সকাল আসছে। কী হবে কে জানে। মনে দুশ্চিন্তা নিয়েও ঘুমিয়ে পড়ল অমল।
একটা রোগা সাদা ছোট্ট ঘোড়া এসে নীচের উঠোনে চুপ করে দাড়িয়ে আছে। একেবারে চুপ। নড়ছে না, চড়ছে না। মাঝে মাঝে শুধু ঝামরে উঠছে লেজ।
ওপর থেকে দেখছিল সোহাগ। এত রোগা যে দেখলে মায়া হয়। হাড় জিরজিরে শরীর, বড্ড ছোটোখাটো।
একটা কালোমতো ফ্রক-পরা মেয়ে কোথা থেকে খানিকটা ঘাস ছিঁড়ে এনে মুখের কাছে ধরল। ঘোড়াটা খেল না। মুখ ফিরিয়ে নিল। সেই মেয়েটাই গিয়ে ঝপাং করে কুয়ো থেকে এক বালতি জল এনে ধরল মুখের সামনে। ঘোড়াটা জলও খেল না।
মেয়েটা ওপর দিকে চেয়ে বলল, ও সোহাগদিদি!
কী রে?
ঘোড়াটা কিছু খাচ্ছে না যে!
ওর মাথায় একটু হাত বুলিয়ে দে।
ও বাবা, যদি কামড়ে দেয়?
ঘোড়া কি বাঘ যে কামড়াবে?
কামড়ায় গো। আমার মামাকে কামড়েছিল যে!
দে না একটু হাত বুলিয়ে।
তার চেয়ে বরং তাড়িয়ে দিই।
আহা, তাড়াস না। বড্ড রোগা যে!
মেয়েটা খুব ভয়ে ভয়ে ঘোড়ার মাথায় একটু হাত দিতেই ঘোড়াটা হঠাৎ সামনের দু পা তুলে প্রবল গর্জন করে উঠল, চিঁ হিঁ হিঁ…
মেয়েটা লাফ দিয়ে সরে এসে হিহি করে হাসল।
হাসছিস কেন?
কী বলল শুনলে না?
কী বলল?
বলল, আমি সোহাগের জন্য এসেছি।
যাঃ। ও তো শুধু চি হিঁ হিঁ করে ডাকল!
তুমি কিচ্ছু জান না। আমি ঘোড়ার কথা বুঝতে পারি।
আমাকে ওর কী দরকার?
তা কী জানি! তোমার ঘোড়া তুমি এসে দেখো।
এ কথা শুনে সিঁড়ির দিকে পা বাড়িয়েই সোহাগ দেখল সে উঠোনে ঘোড়াটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। ঘোড়াটা পরিষ্কার মানুষের গলায় বলল, উঠে পড়ো, উঠে পড়ো। সময় নেই…
সোহাগ কখন উঠল কে জানে, হঠাৎ দেখল সে ঘোড়ার পিঠে বসে আছে আর ঘোড়াটা টগবগ টগবগ করে চলেছে।
কোথায় নিয়ে যাচ্ছ আমাকে বল তো!
ঘোড়াটা জবাব দিল না। চলল আর চলল। টগবগ টগবগ।
সামনেই একটা গভীর সবুজ জঙ্গল। এত সবুজ যে মনে হয় সদ্য কেউ সবুজ রঙে চারদিককে চুবিয়ে গেছে। আর এরকম অদ্ভুত গাছপালা সে কখনও দেখেছে কি? দেখেছে, তবে ছবিতে। গাছপালা একটাও তার চেনা নয়। বিশাল বড় বড় পাতা, খুব বড় বড় সব গোল ফল চারদিকে ফলে আছে। আর দেখল মস্ত আকাশের আধখানা জুড়ে কী বিশাল চাঁদ উঠছে। চাঁদ কি এত বড় হয়? কে জানে বাবা, হয়তো হয়।
চারদিকে আলো আর আলো। আর গাছপালা। আর তার ফাঁকে ফাঁকে ফর্সা আলোয় ঘুরে বেড়াচ্ছে খরগোশ, হরিণ, ময়ূর, টিয়ার ঝাঁক, জেব্রা, ন্যু, নীল গাই।
বড্ড ভাল তো জায়গাটা। এখানে একটা চড়ুইভাতি করলে কেমন হয়?
ঝুমঝুম করে একটা ঝুমঝুমির শব্দ হচ্ছিল। জঙ্গলের ভিতর দিয়ে একটা লোক দৌড়পায়ে আসছে। তার কাছাকাছি এসে লোকটা হাত তুলে বলল, এই যে! আপনার একটা চিঠি আছে।
লোকটার পোশাক দেখে ভারী মজা পেল সোহাগ। পরনে একটা খাকি হাফ প্যান্ট আর গায়ে স্যান্ডো গেঞ্জি।
আপনি বুঝি ডাক হরকরা?
হ্যাঁ। অনেক চিঠি বিলোতে হবে। যাই।
খামের চিঠিটা হাতে নিয়ে সে দেখল খামের মুখটা খোলা। চিঠিটা বের করে দেখল নীল কাগলে কে যেন অনেক অসভ্য কথা লিখেছে ভুল ইংরিজিতে। সে রেগে গিয়ে চিঠিটা ছিঁড়ে ফেলে দিল।
ও মা! পান্না!
পান্না অভিমানভরে বলে, সেই কখন থেকে তোমার জন্য দাঁড়িয়ে আছি। এত দেরি করলে যে!
কী করব, ঘোড়াটাই যে দেরি করে গেল আমাকে আনতে।
এবার নামো। দেখছ কেমন সুন্দর জায়গা।
এই জায়গায় আমরা পিকনিক করব, তাই না পান্না?
হ্যাঁ। এখন চলো, কাজ আছে।
জঙ্গলে আবার কী কাজ?
বাঃ, মনে নেই? সেই যে—
কী বল তো!
এসো আমার সঙ্গে, দেখবে।
পান্নার পিছু পিছু হেঁটে সোহাগ গভীর জঙ্গলের মধ্যে পৌছে দেখতে পেল, ঘাসের ওপর একটা কম্পিউটার। তার সামনে একজন লোক বসে আছে। সে কাছে যেতেই লোকটা মুখ ফেরাল। আর বড্ড চমকে উঠল সোহাগ। বুকটা ধকধক করছে। লোকটা হেসে বলল, তুমি ইন্টারনেট খুঁজছিলে খুকি? এই তো ইন্টারনেট। অ্যান্ড ইউ হ্যাভ এ মেসেজ।
লোকটা বিজু।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন