প্রথম অধ্যায়

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়

এক

ওই এল তার ঘুমের সময়। বাতাসে শীতের শিস, তার দীর্ঘ শরীরে ঘুমের রিমঝিম। আর সময় নেই। শরীরে ভরে নিতে হবে যথাসাধ্য রসদ। তারপর মাটির নীচে কবোষ্ণ অন্ধকারে ঢুকে পড়বে সে। ঘুম আর ঘুম। নেমে আসবে ঘুমের ভারী পর্দা। তার মন নেই, বিবেক নেই, সে কে বা কেমন তাও জানা নেই। তার আছে কেবল শরীর। আছে সন্ধানী চোখ, বিদ্যুতের মতো গতি, আর ক্ষুধা, আর ভয়।

নবীন ভট্চাযের লাকড়িঘরের পিছনে শ্যাওলা-ধরা একটা ইটের খাঁজে ব্যাঙটাকে পেয়ে গেল সে। বিশাল হলদেটে ব্যাঙ। তাকে দেখে ব্যাঙটা প্রাণভয়ে একটা লাফও দিয়েছিল। দ্বিতীয় লাফটা দেওয়ার মুখে প্রায় শূন্য থেকে তাকে সে লুফে নিল মুখে। খাদ্যগ্রহণ তার কাছে সুখপ্রদ নয়। তার জিহ্বা আস্বাদহীন। কম্পিউটারে ভরে দেওয়া তথ্যের মতোই সে শুধু জানে কোনটা খাদ্য, আর কোনটা নয়। আর খাদ্যগ্রহণও কি কম কষ্টের? ধীরে, অতি ধীরে বিশাল গরাসটাকে গিলতে হয় তার। চোয়াল ছিঁড়ে যেতে চায়, গলা আটকে আসে, বঁড়শির মতো দাঁতে আটকানো ব্যাঙটা বারবার ঝটকা মারে আর কাঁপে আর ‘কঁ-অঁ-ক, কঁ-অঁ-ক’ করে প্রাণভয়ে অন্তিম আর্তনাদ করতে থাকে। আস্তে আস্তে তিল তিল করে তাকে আত্মসাৎ করতে হয় জীয়ন্ত গরাস। বড় কষ্ট তার। ঘুমিয়ে পড়ার আগে খেয়ে নিতে হবে আরও খাবার। আরও কষ্ট, আরও অধ্যবসায়।

অনেকক্ষণ সময় লাগল তার। আতাগাছের চিকড়ি-মিকড়ি ছায়ার ফাঁকে ফাঁকে রোদের বল্লম এসে বেঁধে তার চোখে। বাতাসে শীতের নির্ভুল সংকেত, হাওয়া ঘুরছে, ঘুরে যাচ্ছে উত্তরে। সূর্য হেলে যাচ্ছে দক্ষিণে। তার শরীরে সব খবর পৌঁছে যায়।

শত্রুর অভাব নেই তার। ছোট্ট বিচরণভূমি ভরে আছে প্রতিপক্ষে। তাই ঘাসে, ঝোপে, মাটির খাঁজে, গর্তে কেবলই আত্মগোপন করে থাকা। অন্তরালই একমাত্র বাঁচিয়ে রাখে তাকে।

গলার কাছ বরাবর শ্বাসরুদ্ধ করে আটকে আছে ব্যাঙটা। প্রবল পরিশ্রমে শরীর নিথর। মাটিতে সামান্য কম্পন, চোখে একটা ছায়া পড়ল, একটু নড়াচড়া। সে জানে এখন সে বড় অসহায়। অবসন্ন শরীরে সেই বিদ্যুতের গতি নেই, আক্রমণও নেই। সে ভয় পাচ্ছে। সে একবার প্রতিপক্ষকে দেখে নিল। তারপর শরীরের ভার টানতে শুরু করল। প্রতি মুহূর্তেই তাকে আত্মগোপন করতে হয়।

তার দীর্ঘশ্বাসে বাতাস কেঁপে উঠল। পিঙ্গল শরীরটাকে বইয়ে দিল সে। কিন্তু বড় কষ্ট। শরীর জুড়ে যেন ব্যথার মৃদঙ্গ বেজে যাচ্ছে।

পেচ্ছাপের বেগটা ছেড়ে দিয়েই ধীরেন কাষ্ঠ বুঝতে পারল কাজটা ঠিক হয়নি। উঁচু ঢিবিমতো জায়গা দেখে বসে পড়েছিল, চারদিকটা খেয়াল করেনি। ব্যাঙটার প্রাণঘাতী আর্তনাদ শুনে তার চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল। দু চোখেই ছানি বলে নজর ঘষাকাচের মতো। সামনে শুকনো পাতার ডাঁই, গাছের ছায়া। প্রথমে নজরে পড়ল না। ঠাহর করে দেখতে পেল, হাত দেড়েক দূরে পাকা গোখরোটা ব্যাঙটাকে ধরেছে আর তার পেচ্ছাপের ধারাটি ছড়ছড় শব্দ তুলে তেড়েফুঁড়ে ওই দিকেই যাচ্ছে। অতি বিপজ্জনক পরিস্থিতি। চমকে গেলে পেচ্ছাপ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কথা। কিন্তু ধীরেন কাষ্ঠর কপালটাই খারাপ। বয়সকালে এখন পেচ্ছাপ পেলে বেগ চেপে রাখতে পারে না। শরীরের যন্ত্রপাতি ক্রমেই কেলিয়ে পড়ছে। পেচ্ছাপ তার নিজের মনেই হয়ে যাচ্ছে, ধীরেনের সাধ্যই নেই এখন বন্ধ করে। তা হলে কাপড়ে-চোপড়ে হয়ে যাবে। পারবে না জেনেও একটা চেষ্টা করল ধীরেন, মুখ ফসকে একটা কোঁতানির শব্দও বেরোল। কিন্তু আটকানো গেল না। খাওয়ার সময় সাপটা বিরক্ত হচ্ছে। যদি রেগেমেগে তেড়ে আসে তাহলেই হয়ে গেল। না, কাজটা ঠিক হচ্ছে না, ঠিক হচ্ছে না। আজকাল তার এইসব ছোটখাটো কাজে বড় মাপের সময় লাগে। বয়সকালে লাগত না। অসহায় ধীরেন কাষ্ঠ তাই তার বিশ্বঘাতক পেচ্ছাপের ধারাটাকে নজরে রাখছিল। হ্যাঁ, ওই আঁকাবাঁকা হয়ে ব্যাটা ঠিক গিয়ে সাপটার পেটের তলায় ঢুকে পড়ল। ভয়ে চোখ বুজে ফেলল ধীরেন। শরীরটা শক্ত হয়ে এল আতঙ্কে। ভরসার কথা এই, মুখে ব্যাঙটা ধরে থাকায় চট করে ছোবল দিতে পারবে না। তবে সাপকে বিশ্বাসই বা কী?

ঠিক এই সময়ে সাপটা ফস্স্ করে একটা বিচ্ছিরি শব্দ করায় ধীরেন ‘বা প রে’ বলে চেঁচিয়ে উঠে পড়ল। পেচ্ছাপ তখনও হয়ে যাচ্ছে।

ধীরেনের চাপা চিৎকার শুনতে পেল পান্না। ডান হাতের দুটো আঙুল—মধ্যমা আর তর্জনী চোখের সামনে তুলে ধরে সে তখন লটারি করছে—গলায় দড়ি না গায়ে আগুন? গায়ে আগুন না গলায় দড়ি? কদিন হল তার এই চলছে। মনটাকে স্থির করতে পারছে না। তবে করবে সে ঠিকই। কিন্তু কোনটা বাছবে তা ঠিক করতে দেয়ালঘড়ির দোলকটার মতো দোল খাচ্ছে। কখনও মনে হয় গায়ে আগুন, কখনও মনে হয় গলায় দড়ি। উনিশের ভরা যুবতী সে, এই বয়সেই তো মরতে সাধ হয় সবচেয়ে বেশি। মনে একটু টুস্কি লাগলেই মনে হয়, মরি। আকাশে রাঙা চাঁদ উঠলে কি একটু ভালবাসা না পেলে, কি শীতের দুপুরে মন হু হু করলেই হল, মরণ মুচকি হেসে শ্যামের বাঁশি বাজাতে থাকে।

সে মরলে কী কী হবে ভাবতেই আনন্দে গায়ে কাঁটা দেয় তার। লুটোপুটি খেয়ে কাঁদবে মা, ও পান্না, ফিরে আয়। বেশ হবে। যত অবিচার করেছে মা তা শোধ হবে চোখের জলে। আর কখনও বলবে না, গতরখাকী মর না। আর বাবা? বাবা এমন স্তম্ভিত হয়ে যাবে যে কাঁদতেও পারবে না। মাথায় হাত দিয়ে বসে থাকবে দাওয়ায় আর অবিশ্বাসভরে মাথা নাড়বে, এ হয় না, এ হয় না। আর হীরা, হীরার কথা কিছু বলা যায় না। হিংসুটিটা কে জানে বাবা খুশিও হতে পারে। আবার হয়তো দিদির শোকে লুটোপুটি খেয়ে কাঁদতেও পারে। মনে হয় কাঁদবেই। কাঁদলে খুব কাঁদবে। আর ‘সে’? ‘সে’ কী করবে তা জানে না। পান্না। তবে খুব বিষণ্ণ আর আনমনা হয়ে যাবে। হু-হু করবে বুক, চোখ ভিজে যাবে বারবার। এ কী করলে পান্না, আমাকে একা রেখে গেলে নির্বান্ধব পৃথিবীতে? এই ‘সে’-টা যে কে তা আজও জানে না পান্না। ‘সে’-র সঙ্গে তার চেনাই হয়নি। ‘সে’ যে কেমন তাও ঠিক করে ভাবেনি সে। আবছা আবছা একটা মুখ কল্পনা করে নেয়। আবার মুখটা কেমন বদলেও যায়।

মরার কথা ভাবতে ভাবতে দুপুরের নিরালা যখন একরকম সুখে ভরে উঠছিল তখনই চিৎকারটা শুনতে পেল সে। বুড়ো মানুষের গলায় ‘বাপ রে!’ শোওয়া অবস্থাতেই শরীরটা গড়িয়ে উপুড় হয়ে জানালা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে সে দেখতে পায়, ধীরেন কাষ্ঠ দাঁড়িয়ে। হাতে ধরা ধুতির খুঁট, ছড়ছড় করে ধুতি ভিজিয়ে পেচ্ছাপ পড়ে যাচ্ছে পায়ের লালচে রঙের ক্যাম্বিসের জুতোর ওপর। এঃ মা!

লজ্জায় মুখটা সরিয়ে নিয়ে পান্না বলে, কী হয়েছে জ্যাঠামশাই?

সাপ।

কামড়েছে নাকি?

না, আর একটু হলেই কামড়াত।

কোথায় সাপটা?

ধীরেন কাষ্ঠ হাত তুলে লাকড়িঘরের দিকে দেখিয়ে বলল, ওইখানে।

ঘোষবাড়ির সুপুরিগাছের ডগায় উঠে মরণ নানা দৃশ্য দেখছিল। আফ্রিকার ম্যাপের মতো দেখতে একটা বড় মেঘ একটা শ্রীলংকার মতো ছোট মেঘকে আস্তে আস্তে গিলে ফেলল আর তারপর দুটিতে মিলে হয়ে গেল অস্ট্রেলিয়া। আর দেখল, নয়নদের বাড়ির উঠোনে শীতের লেপকাঁথা বের করে চাটাই পেতে রোদে দেওয়া হয়েছে। আর চাটুজ্যেবাড়ির গৌরহরিদাদুর শ্রাদ্ধের সাদা ম্যারাপ ফুলে ফুলে উঠছে হাওয়ায়। আর সন্ধ্যাদির বাড়ির দোতলার গ্রিল দেওয়া বারান্দায় আজও সেই ফুটফুটে মেয়েটা উদাসভাবে দাঁড়িয়ে আছে। আর সন্ধ্যাদির উদুখলের ধুপ ধুপ ধুপ ধুপ শব্দটা পৃথিবীর হৃৎপিণ্ডের শব্দের মতো উঠে আসছে। গাছের ঘষটানিতে বুকের নুনছাল উঠে গিয়ে জ্বালা করছে। ঘোষ জ্যাঠাইমা তাড়া দিচ্ছে, ও মরণ, তোর হল? তাড়াতাড়ি কর বাবা। সুপুরিগুলো গোছ করে রেখে শ্রাদ্ধবাড়িতে যাব যে!

মাঝে মাঝে এত আনমনা হয়ে যায় বলেই তার বিপদ। একবার আমগাছ থেকে পড়ে বাঁ হাত ভেঙেছিল তার। তবু ওই আনমনা হওয়া তাকে ছাড়ে না। পেকে ওঠা সুপুরির গোছ মাত্র দুটো কেটে ফেলেছে, তারপর কেমন সব ভুলে বিস্ময় ভরা চোখে দেখছে তো দেখছেই। আর নানা কথার ভুড়ভুড়ি উঠছে মনের মধ্যে।

হঠাৎ সাপে ধরা ব্যাঙের ডাকটা কানে এল তার। কী করুণ আর্তরব! কঁ-অ-ক, কঁ-অ-ক। হাতের দা-টা ঠাঙাৎ করে নীচে ফেলে দিল সে। দু পায়ে দড়ির ফাঁস ছিল, নাড়া দিয়ে সেটাও ফেলে দিয়ে তাড়াতাড়ি নামতে লাগল সে।

ও মরণ, নামছিস যে! পাড়বি না?

দাঁড়ান জ্যাঠাইমা, আগে সাপটাকে মারি।

সাপ মারবি কী রে? কোথায় সাপ?

আছে।

সে জানে মানুষ বিপদে পড়লে যে বিপদসংকেত পাঠায় তাকে বলে এস ও এস। সেভ আওয়ার সোল। আমাদের প্রাণরক্ষা করো। ব্যাঙটাও সেই বার্তা পাঠাচ্ছে চারদিকে। জলে জঙ্গলে, ঘাটে আঘাটায় এমনই সব তুচ্ছ নানা ঘটনা ঘটে যাচ্ছে, মানুষ টেরই পায় না। কিন্তু ব্যাঙটা কার কাছে পাঠায় ওই বিপদসংকেত? ওর কি ভগবান আছে? নাকি আছে কোনও কমিউনিটি? অন্য ব্যাঙেরা কি এসে বাঁচাবে ওকে কখনও? তবে ও কাকে ডাকে? মরণ জানে সাপের মুখ থেকে ব্যাঙটাকে ছাড়িয়ে নিলেও বাঁচবে না! কিন্তু সাপটাকে যে তার মারতেই হবে।

শেফালী বউদি বলে, তুই কেমনধারা ছেলে রে? প্রজাপতির পাখা ছিঁড়ে দিস, চড়াইপাখির বাসা ভাঙিস, ফড়িং-এর পায়ে সুতো বেঁধে ওড়াস, সাপ মারিস! এমন পাষাণ কেন রে তুই?

সে ভাল ছেলে নয়, সে জানে।

গাছ থেকে নেমে দুটো ইটের ঢেলা কুড়িয়ে নিয়ে ছুটছিল মরণ। ভট্চাযবাড়ির লাকড়িঘরের সামনে ধীরেন জ্যাঠার মুখোমুখি।

ধীরেন কাষ্ঠ বলল, দেখ বাবা কী কাণ্ড। শ্রাদ্ধবাড়িতে নেমন্তন্ন খেতে যাচ্ছি, পথে এই বিপত্তি।

এঃ জ্যাঠামশাই, আপনি যে পেচ্ছাপ করে ফেলেছেন।

বুড়ো বয়সে কিছুই কি আর বশে থাকে রে বাবা। আর সাপটাও এমন ফোঁস করে উঠল যে, পালাতে গিয়ে কাপড়ে-চোপড়ে হয়ে গেল। দিবি বাবা একটু টিউবওয়েলটা পাম্প করে? এখানেই একটু ধুয়ে-টুয়ে নিই। গায়ে গায়ে শুকিয়ে যাবে। কাপড় পালটাতে হলে আবার মাইলটাক হেঁটে যাওয়া। যা খাড়া রোদ।

আসুন জ্যাঠামশাই, পাম্প করে দিচ্ছি।

রাস্তার কলে ধুতিটা ধুতে ধুতে ধীরেন কাষ্ঠ বলছিল, আজকাল আর কেউ ডাকখোঁজ করেও না তেমন। গৌরহরিদার পরিবার তবু তো ডেকেছে।

সাপটা এ যাত্রায় বেঁচে গেল। বিশাল গরাসটা কণ্ঠায় আটকে আছে তার। ধীরে সে একটা পরিত্যক্ত জমি আর ভাঙা বাড়ি পার হল। তারপর বেগুনক্ষেত। বাঁশের বেড়া। আগাছার জঙ্গল। ধীরে ধীরে পিছল গতিতে পার হয়ে যাচ্ছে সে। তার শীতল রক্তে শীতের পদধ্বনি। আর সময় নেই।

ঝিরঝিরে চঞ্চল নিমের ছায়ায় বসে একমনে সর্ষে গুঁড়ো করছে সন্ধ্যা। মস্ত এলো খোঁপা ভেঙে পড়েছে পিঠে। দামাল বাতাসের দিন আজ। মাঝে মাঝে দমকা বাতাস এসে উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে শুকনো পাতা আর উড়ছে তার চুল।

উদুখলের ডান্ডাটা রেখে যখন খোঁপা ফের বেঁধে নিচ্ছিল সন্ধ্যা তখন সাপটাকে দেখতে পেল। ঘন জঙ্গল থেকে উঠে উঠোনের কানা দিয়ে দীর্ঘ শরীরটা খুব আস্তে টেনে নিয়ে খড়ের মাচানের নীচে তার অন্ধকার জগতে ঢুকে যাচ্ছে। গলার কাছটায় একটা ঢিবি। ব্যাঙ বা ইঁদুর গিলে এসেছে এইমাত্র।

মাই গড! ইটস এ বিগ কোবরা!

সন্ধ্যা মুখ তুলে বুডঢাকে দেখল।

বুডঢা বলল, দেখতে পাওনি? জাস্ট বিলো দি হে স্ট্যাক।

দেখব না কেন? চোখের সামনে দিয়েই তো গেল।

লাঠি-ফাঠি কিছু নেই বাড়িতে?

থাকবে না কেন? লাঠি দিয়ে কী করবে?

বাঃ, মারতে হবে না সাপটাকে?

ওটা বাস্তুসাপ মারতে নেই।

হোয়াট ডু ইউ মিন বাই বাস্তুসাপ? এ স্নেক ইজ এ স্নেক। ইট মে বাইট এনিবডি এনিটাইম।

খুব ক্ষতি না করলে কামড়ায় না। তিনটে আছে, আজ অবধি কাউকে কামড়ায়নি।

গড! ও মাই গড! ক্যান এ স্নেক বি ওয়ান অফ দি ফ্যামিলি!

কদিন যাবৎ ইংরিজিতে ঝাঁঝরা হয়ে যাচ্ছে সন্ধ্যা। মায়ে মেয়েতে ছেলেতে মিলে দিনরাত ইংরিজিতে কথা কইছে, তার এক বর্ণও সন্ধ্যা বোঝে না। তবে এটা বুঝতে পারে, ওরা তিনজনে মিলে এ-বাড়ির লোকেদের নিয়ে ঠাট্টাইয়ার্কি করে। ভাল কথা যে বলে না তা মুচকি হাসি, বাঁকা চাউনি আর ঠোঁট ওলটানো দেখে টের পাওয়া যায়। বড্ড অপমান লাগে, কান-টান ঝাঁ-ঝাঁ করে। কিন্তু কিছু করারও তো নেই।

বুডঢা ওপর দিকে চেয়ে চেঁচিয়ে বলে, ডিড ইউ সি ইট দিদি? এ বিগ কোবরা।

ইয়াঃ, আই স ইট। মে বি এ ক্রাইট।

নো, ইট ওয়াজ এ কোবরা। দিস ফুলিশ উওম্যান সেজ ইটস এ রেসিডেনশিয়াল স্নেক। এ মহাত্মা। ডাজ নট বাইট।

শি ইজ এ মোরোন।

সন্ধ্যা বুঝতে পারছে, তাকে নিয়ে কথা কইছে ওরা। খারাপ কথা। সে ভারী ডান্ডাটা তুলে নিল। শক্ত চোয়ালে অপমানটা গিলে ফেলতে চেষ্টা করল। আর সব আক্রোশ নিয়ে দুম দুম করে গুঁড়ো করতে লাগল সর্ষে। ঝাঁঝ আসছে নাকে, সর্ষের গুঁড়ো ছিটকে যাচ্ছে চারদিকে। ঠোঁট নড়ছে সন্ধ্যার, কী কেলেঙ্কারি করে এসেছ তোমরা সে কি আর জানি না! পাঁচকান তো করতে পারি না। হাটে হাঁড়ি ভাঙলে টের পেতে বাপু। দিনরাত মায়ে মেয়েতে যে ইংরিজিতে ঝগড়া করছ সে কি এমনি এমনি? আমরা কথাগুলো বুঝতে না পারি, ঝগড়া যে হচ্ছে তা তো বুঝতে বাকি নেই। ছিটেফোঁটা বুদ্ধি আমাদেরও আছে বাপু। কলকাতা ছেড়ে গাঁয়ের বাড়িতে এসে ঘাপটি মেরে আছ সে তো সোহাগ করতে নয়, গা-ঢাকা দিতে। সোহাগ-সুন্দরী, তোমার মুখখানা সুন্দর হলে কী হবে, মনে বিষ।

সোহাগ ওপর থেকে অনুচ্চ স্বরে বলল, শি হেটস মি।

বুডটা নীচে থেকে বলল, শি হেটস মি টু। অ্যান্ড আই লাইক দ্যাট।

সর্ষে গুঁড়ো করতে করতে সন্ধ্যা বিড়বিড় করতে থাকে, কেমন ইংরিজি বলিস তোরা জানি। বাবা তো কালকেই বলছিল, ওরা যতই ফটাফট ইংরিজি বলুক না কেন, গ্রামারে ভুল আছে। নিমাই মাস্টারের ছেলে অঞ্জনকে নিয়ে এসে সামনে দাঁড় করিয়ে দিলে তো চুপসে যাবি তোরা। ইংরিজিতে সে আশি নব্বই নম্বর পায়…

অনেকক্ষণ ধরেই সোহাগ সাপটাকে দেখছিল। বাঁ ধারে জঙ্গুলে মাঠটার মাঝখানে একটা ছাগল বাঁধা। সেটাই কেমন যেন হঠাৎ ম্যা ম্যা করে ছুটে পালাবার চেষ্টা করছিল। সোহাগের আজকাল কোনও কৌতুহল নেই। কোনও ব্যাপারেই নেই। সে উদাসভাবেই চেয়ে দেখছিল। ঘাস খেতে খেতে শান্ত ছাগলটা হঠাৎ ভয় পেল কেন? ছুটতে গিয়ে পায়ে দড়ি জড়িয়ে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল, ডাকতে লাগল। তখনই লম্বা শরীরটা ধীরে আঁকাবাঁকা হয়ে চলে আসছে। ছাগলটার কাছ ঘেঁষেই এল। তারপর তকতকে উঠোনের কোণ দিয়ে ধীরে ধীরে খড়ের মাচানের নীচে চলে যেতে লাগল। সোহাগ উদাস চোখে সাপটাকে দেখল শুধু। সাপ দেখলে কেউ ভয় পায়, কারও গা ঘিনঘিন করে। তারও ওরকম হয়। এখন হল না। ধীরে ধীরে সে ভেজিটেবল হয়ে যাবে। সে জানে।

সোহাগ, ভিতরে এসো। তোমার খাবার দেওয়া হয়েছে।

মা ডাকছে। সোহাগ। উদাস মুখটা ফিরিয়ে বলল, এখন খাব না। খিদে নেই।

তুমি তো চাওমিন খেতে চাইলে। তাই করা হয়েছে।

রেখে দাও। পরে খাব।

পরে গরম করবে কে? এখানে তো মাইক্রোওয়েভ নেই। নুড্লস জোগাড় করতেই কমলদাকে বর্ধমান যেতে হয়েছিল। এখানে এসব ফ্যান্সি ফুড অ্যারেঞ্জ করা মুশকিল।

গরম করতে হবে না। ঠান্ডাই খাব।

এসব ভাল হচ্ছে না সোহাগ। তুমি কোনও রুটিন ফলো করছ না।

আই হ্যাভ নো অ্যাপেটাইট। প্লিজ।

তার মানে ইউ উইল স্কিপ দি লাঞ্চ। ব্রেকফাস্টে মোটে একটা বয়েলড ডিম খেয়েছ। এখন বেলা বারোটা বেজে গেছে।

বেলা বারোটা ইজ নট টু লেট।

রাগ করে না খেয়ে থাকাটা প্রিমিটিভনেস। ইট উইল নট হেলপ।

না খেয়ে থাকব কেন? খাচ্ছি তো।

মোটেই খাচ্ছ না। ইউ আর লুজিং ওয়েট। তোমার স্কিন ড্রাই হয়ে যাচ্ছে।

আমি বেশ ভাল আছি। ডোন্ট বদার।

আজ তোমার বাবা আসছেন। তাকে সব বলব।

বোলো। হি ইজ নট এ মেসায়া।

তিনি তোমার বাবা।

সো হোয়াট?

ডোন্ট ডিগ সোহাগ। ডিগিং উইল নট হেলপ। বলছি খেয়ে নাও।

খাব না বলিনি তো। পরে খাব।

ইউ আর ইমপসিবল।

ও কথা কেন বলছ? আই অ্যাম ডুয়িং হোয়াট এভার আই অ্যাম টোল্ড টু ডু। যদি হুকুম করো তা হলে ছাদে উঠে নীচে লাফিয়েও পড়তে পারি। কিন্তু খিদে না থাকলে কিছুতেই খাওয়া যায় না।

খিদে নেই তো সবসময়েই বলছ। এক্সারসাইজ করছ না, মেডিটেশন করছ না, শুধু ঘরে বসে আছ, খিদে না পাওয়ার তো দোষ নেই।

আমার ওসব ভাল লাগছে না।

এই যে বললে ইউ আর ডুয়িং হোয়াটএভার ইউ আর টোল্ড টু ডু?

তুমি কি আমাকে এক্সারসাইজ করতে বলছ?

বলছি। শরীরের জন্য করতে দোষ কী?

আমার ইচ্ছে করে না। মানুষ তো শুধু শরীর নয়।

অন্তত ইউ মে টেক এ ওয়াক।

আমার ভাল লাগে না। লোকেরা তাকায়।

সে তো কলকাতাতেও তাকায়। তাকায় না?

এমন হাঁ করে তাকায় না। আমার হাঁটতে ভাল লাগে না।

সোহাগ, আর ইউ ট্রায়িং টু কিল ইওরসেলফ?

আমার এত কথা বলতে ভাল লাগছে না মা, আমি নীচে যাচ্ছি।

পারুল আজ সকাল থেকে পথ চেয়ে আছে। এক বুক তেষ্টা কেন তার আজও? না, এ বোধহয় তেষ্টা নয়, আকাঙক্ষা নয়, এ এক গভীর কৌতুহল। বাঁধা পড়ে গেছে কবেই পারুল। এখন সংসারে জেবড়ে আছে। আর অমলদাও তো কী ভীষণ ব্যস্ত মানুষ।

পারুল চ্যাটার্জি আর অমল রায়ের গভীর প্রেমের ঘটনা মোটেই চাপা থাকেনি। বিশ বাইশ বছর আগে এই ঘটনায় সারা গাঁ তোলপাড় হয়ে গিয়েছিল। পথেঘাটে মজলিশে আলোচনা হত। বিয়েতেও কোনও বাধা ছিল না। সবর্ণ, পালটি ঘর। কিন্তু ঘটনা সবসময়ে সোজা পথে ঘটতে চায় না।

অমল রায় মাধ্যমিকে স্ট্যান্ড করেছিল। এই গাঁয়ের মুষ্টিমেয় কৃতী ছেলেদের মধ্যে সে একজন। হয়তো সর্বশ্রেষ্ঠ। মাধ্যমিকের পরও দুরন্ত অমল অনেক বেড়া টপকাল। যা চায় তাই পায় অবস্থা। পারুলকেও পেয়ে গিয়েছিল অনায়াসে। প্রায় কৈশোরকাল থেকে।

ঘটনাটা ঘটেছিল যে সময়ে সে সময়ে আই আই টি-র শেষ পরীক্ষা দিয়ে অমল গাঁয়ে ফিরেছে। দুজনের দেখাসাক্ষাৎ ছিল পরস্পরের বাড়িতে। যাতায়াতের তেমন কোনও বাধা ছিল না। কিন্তু সেই সময়ে অমলের চোখেমুখে একটা ঘোর পরিবর্তন দেখতে পায় পারুল। কেমন খিদে ফুটে থাকে মুখে, চোখের দৃষ্টি সরু হয়ে আসে। কামুক পুরুষের দৃষ্টি চিনতে মেয়েদের কোনও অভিজ্ঞতার দরকার হয় না। তারা ও ক্ষমতা নিয়েই জন্মায়। পারুল নির্ভুল বুঝতে পেরেছিল, অমল যে কোনও দিন তাকে চাইবে। আর তখনই একটু ভয় হয়েছিল তার।

একদিন এক প্রচণ্ড গরমের দুপুরে অমল উদভ্রান্তের মতো এসে হাজির। পারুল তার দোতলার পড়ার ঘরে নিরিবিলি বসে পরীক্ষার পড়া করছিল। অমলের চেহারা দেখে সে শিউরে উঠেছিল। মাথায় বড় বড় চুল উড়ছে, মুখখানা রোদে পুড়ে লাল, আর দুখানা চোখে ধক ধক করছে এমন একটা দৃষ্টি যা বুঝতে কোনও মানে-বইয়ের দরকার হয় না।

অমলদা, কী হয়েছে?

অমল হাঁফাচ্ছিল। এত জোরে হেঁটে এসেছে, এত উদভ্রান্ত, এতই দেহতাড়িত যে সে আর স্বাভাবিক নেই। চাপা গলায় সে বলল, পারুল আমি আর পারছি না।

পারুল প্রবল আতঙ্কে সিঁটিয়ে গিয়ে বলে, কী বলছ আমি বুঝতে পারছি না।

বুঝতে হবে না, শুধু চুপ করে থেকো।

প্রবল এক পুরুষ শরীর, সেই শরীরের ঘাম, উত্তাপ, আবেগ, আশ্লেষ আচমকা আক্রমণ করেছিল তাকে। সে শুধু চাপা চিৎকার করেছিল, না না না না

দরজাটা বন্ধ করতেও ভুলে গিয়েছিল অমল। তখন সে উন্মাদ, কাণ্ডজ্ঞানহীন। কাম ছাড়া তখন আর তার কোনও অনুভূতিই কাজ করছে না।

সে এক তুমুল লড়াই হয়েছিল। দুজনের মধ্যে। আক্রমণ আর প্রতিরোধ। আর তার ভিতর থেকেই পারুলের মনে জন্ম নিচ্ছিল ঘৃণা।

বিধ্বস্ত পারুলকে ফেলে পালিয়ে গিয়েছিল অমল। অনুতাপ হয়েছিল পরে।

পারুল তবু মা করে দিতে পারত অমলকে। নিশ্চয়ই পারত। ভালবাসলে ওটুকু পারাই যায়। জোর একটা ধাক্কা খেয়ে হয়তো মানুষটা সম্পর্কে তার ধারণা একটু খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তখন তার সতেরো বছর বয়স, ও বয়সের আবেগ অনেক কিছুকে উপেক্ষা করতে পারে। তার ওপর সেই দুপুরের দুর্ঘটনায় সে যদি মা হয়ে পড়ত তাহলে অমলকে ক্ষমা করা ছাড়া তার উপায়ও থাকত না।

পরদিন সকালে শান্ত ভদ্র অমল লাজুক মুখে এসে হাজির।

ইস্। কাল কী কাণ্ডই না করে ফেললাম পারুল।

পারুল সারা রাত কেঁদেছিল, ঘুমোয়নি, রাতে খায়ওনি। শরীর ভীষণ খারাপ লাগছিল সকালে। ফুপিয়ে উঠে বলল, কেন করলে এরকম? বিয়ের আগে কেউ ওসব করে? ছিঃ ছিঃ, এখন কী যে হবে।

ভয় পেও না।

ভয় পাব না? তুমি পুরুষমানুষ বলে কত সহজে কথাটা বলে ফেললে। মেয়ে হলে পারতে না। সব দায় তো মেয়েদেরই বইতে হয়। তাদের নামেই নিন্দে হয়, তাদেরই জীবনভর কলঙ্ক থেকে যায়। বাচ্চা। নষ্ট করতে গিয়ে তারাই তো মরে।

ওভাবে ভাবছ কেন? প্রেগন্যান্সির লক্ষণ দেখলে বোলো, বিয়ের ব্যবস্থা করব।

সেটাই বুঝি খুব সহজ সমাধান? সবাই ঘাসে মুখ দিয়ে চলে না। প্রেগন্যান্সি হলে বাড়ির সবাই টের পাবে। ফিসফাস হবে, লোক জানাজানি হবে। অমলদা, তুমি আমার খুব ক্ষতি করলে। তোমার কথা ভাবলেই আমার ভিতরে একটা আলো জ্বলে উঠত। সেই আলোটা নিবে গেছে। আর জ্বলবে না।

কী করব পারুল, তোমার পায়ে ধরে ক্ষমা চাইব?

না, ক্ষমা চাইবে কেন? ক্ষমা চাইতে হয় কেন তোমাকে? একটু ধৈর্য ধরে রাখতে পারলে না কেন?

অপরাধী মুখ নিচু করে কিছুক্ষণ বসে রইল অমল। তারপর বলল, আমি মাঝে মাঝে বড্ড বেসামাল হয়ে পড়ি। কাণ্ডজ্ঞান থাকে না। অনেক চেষ্টা করেছি নিজেকে সামলাতে। পারিনি। এমন পাগল হয়ে যাই তখন যে মাথায় খুন চেপে যায়। এ ব্যাপারে আমি এত হেলপলেস। ভাবছি ডাক্তার দেখাব। এ বোধহয় কোনও ডিজিজ।

তুমি যদি আমাকে ভালই বাসো তা হলে রেপ করো কী করে? এরকম কি কেউ করে?

যা হয়েছে হয়েই তো গেছে। কিছুতেই তো আর সেটাকে মুছে ফেলা যাবে না। বরং পজিটিভ কিছু ভাবি এসো।

না অমলদা, আমার মাথার ঠিক নেই। ভয়ে আতঙ্কে আমি মরে যাচ্ছি। আমি কিছু ভাবতে পারছি না। এ-বাড়িতে এরকম ঘটনা আর কারও ঘটেনি। বিয়ের আগে— এ মা।

অমল মিনমিন করে ফের বলল, আমাদের বিয়ে তো হবেই। তখন তো আর এসব দুশ্চিন্তা থাকবে না।

থাকবে। তোমাকে নিয়ে আমার ভয় থাকবে। তোমার সংযম নেই, তুমি বেহাল হয়ে যাও, মেয়েরা তাদের পুরুষকে ওরকম দেখতে ভালবাসে না।

আমার মনে হয় এটা আমার একটা অসুখ। চিকিৎসা করালে নিশ্চয়ই সেরে যাবে।

এসব কথায় বুকের জ্বালাপোড়া একটুও কমল না পারুলের। তার ভিতরটাই যেন হঠাৎ মরে গেছে। ভালবাসা যেন খোঁটা উপড়ে পালিয়ে গেছে কোথায়। শুধু এক জৈব ভয় তাকে দিনরাত নখে দাঁতে ছিঁড়ে খাচ্ছে। শরীর যে তাদের মধ্যে এমন দেওয়াল তুলে দেবে কে জানত।

কুড়ি দিন দম বন্ধ করা টেনশন। পারুল ঘর থেকে বেরোত না। শুধু কাঁদত, মন খারাপ করে বসে থাকত, সারা রাত ভয়ে তার ঘুম হত না। আর ঠাকুর-দেবতাদের ডাকত। নিজের পেটে হাত রেখে অনুভব করার চেষ্টা করত সেখানে কোনও সম্ভাবনার জন্ম হচ্ছে কিনা। ওই কুড়িটা দিন তার জীবনের সবচেয়ে খারাপ সময়। দুঃস্বপ্নের মতো। একুশ দিনের দিন রজোদর্শন করে সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। সে আর কুমারী নেই বটে, কিন্তু লোকলজ্জা থেকে বেঁচে গেল এ যাত্রা। বেঁচে গেল তার পরিবারও।

তাদের ঠিকে ঝি হেনার মা একদিন রান্নাঘরে মশলা পিষতে পিষতে পারুলের মায়ের সঙ্গে কথা কইছিল। পারুল সেটা শুনে ফেলে।

ওই ছেলের সঙ্গেই কি বিয়ে দেবে নাকি গো মা?

হ্যাঁ, সেরকমই তো কথা চলছে। ছেলে তো রত্ন। কপালে আছে কি না দেখি।

রত্ন কিনা জানি না বাপু, তবে বলে রাখছি ছেলের কিন্তু আলুর দোষ আছে।

কীসের দোষ?

আলুর দোষ গো। স্বভাব ভাল নয়।

কেন কী করেছে?

খড়্গপুরে যখন পড়ত রোজ বেশ্যাবাড়ি যেত।

অ্যাঁ!

আমার বর তো আই আই টি-তেই ঠিকাদারের কাছে কাজ করে। সে বলেছে। একটু ভেবেচিন্তে এগিয়ে বাপু।

সেদিন মায়ের ব্লাড প্রেশার বেড়ে শয্যা নেওয়ার জোগাড়। কিন্তু পারুল একটুও অবাক হল না। যে অত অসংযমী তার পক্ষে এটাই তো স্বাভাবিক। সঙ্গে সঙ্গে পারুলের আর একটা ভয় হল। বেশ্যাবাড়ি যখন যায় তখন আবার খারাপ রোগ-টোগ হয়নি তো! সেই রোগ যদি পারুলের শরীরেও ঢুকে থাকে!

এইভাবেই গাঁয়ের উজ্জ্বল যুবকটির প্রতি তার দুরন্ত প্রেমের অবসান ঘটে গেল একদিন। এমনকী আই আই টি-র পরীক্ষায় অমলের ফার্স্ট ক্লাস পাওয়ার খবরেও বিন্দুমাত্র উত্তেজিত হল না সে।

ওদের বাড়ি আর যেত না পারুল। অমল কিন্তু প্রায়ই আসত। পাসের খবর নিয়েও হাসিমুখে অমল এসেছিল। তখনও পারুলকে বিয়ে করার কথা ভাবছে। বসে বসে অনেক ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার কথা বলছিল সেদিন।

বিদেশে তো আমাকে যেতেই হবে। ভাবছি তোমার পাসপোর্ট এখনই করিয়ে রাখলে হয়।

কেন?

তোমাকে নিয়েই যেতে চাই।

কেন, ওদেশে কি প্রস কোয়ার্টার নেই?

স্তম্ভিত অমল তার দিকে হাঁ করে চেয়ে থেকে বলল, কী বলছ?

কথাটা বলে লজ্জা পেয়েছিল পারুল। কাউকে সে চট করে অপমান করতে পারে না। মাথা নিচু করে বলল, কিছু না।

কিছুক্ষণ ম্লানমুখে চুপ করে বসে রইল অমল। তারপর দুখানা করুণ চোখে তার দিকে চেয়ে বলল, কে তোমাকে এসব বলেছে জানি না। তুমি কি এসব বিশ্বাস করো?

বিশ্বাস করব কিনা তা বুঝতে পারছি না। আমার মন ভাল নেই।

ভাবলাম আমার ভাল রেজাল্টের খবর পেয়ে তুমি খুশি হবে।

খুশি হইনি কে বলল? তবে নতুন কিছু তো নয়, তুমি বরাবরই ভাল ছেলে।

আবার কিছুক্ষণ মনোকষ্টে বসে থেকে ম্লান মুখে অমল বলল, তুমি আমার ভাবী স্ত্রী। ব্যাপারটা তুমি এভাবে দেখো। ধরো আমি একজন মনোরুগি, আমার রুচি এবং শালীনতাবোধ দিয়েও আমি আমার ভয়ংকর প্যাশনকে ঠেকাতে পারছি না। তুমি যদি সাহায্য করতে পারব।

তুমি কি স্বীকার করছ তুমি প্রস কোয়ার্টারে যাও?

অনেকেই যায়। অনেক ভাল লোকে, গণ্যমান্য মানুষও যায়।

তুমি যাও কিনা সেটা নিয়েই আমার দুশ্চিন্তা।

যাই পারুল। আমাকে নিশিতে পায়। কিন্তু বিয়ের পর এভরিথিং উইল চেঞ্জ।

পারুল মাথা নিচু করে বলল, আমার মন ভাল নেই অমলদা। আমার মাথায় কিছু আসছে না।

আমি তোমাকে বড্ড ভালবাসি যে পারুল। সবসময়ে আমি তোমাকে চিন্তা করি। তোমাকে ছাড়া বেঁচে থাকা যে আমার পক্ষে অসম্ভব।

তাই তো জানতাম।

তুমি কত নরম-সরম মেয়ে ছিলে, আমাকে দেখলেই তোমার মুখে খুশির ঝাপটা লাগত, কত লজ্জা পেতে আমাকে। এখন তুমি কেমন শক্ত হয়ে গেছ, কেমন মনমরা। ওই একটা শরীরের ঘটনা কি আমার এত বড় অপরাধ? কত ছেলেমেয়েই তো বিয়ের আগে—

ওসব বোলো না অমলদা, পায় পড়ি।

আচ্ছা পারুল, বলব না। তবে এটুকু বলে যাই, আজকের দুনিয়ায় ওসব কেউ গায়ে মাখে না। ওটা খুব তুচ্ছ ব্যাপার।

অনেকের কাছে হয়তো তাই।

হতাশায় মাথা নেড়ে বিষণ্ণ অমল বলল, না পারুল, তোমার চোখ বলছে তুমি আমাকে আর চাও না। কিন্তু আমার জীবনটা যে তাহলে বড্ড একার হয়ে যাবে। তোমাকে ছাড়া যে পারব না আমি। কিছুতেই পারব না। আমাকে কি তাহলে আত্মহত্যা করতে হবে?

ওসব বোলো না অমলদা। আমি এখনও তো তোমাকে কিছু বলিনি। আমাকে ভাবতে দাও। বড্ড মনে কষ্ট দিয়েছ আমায়। আমাকে এখন ভাবতে হবে।

ভেবে লাভ নেই পারুল। তোমার মনের কথা আমি বুঝতে পেরেছি। একটা ভুল করে ফেলেছি। কী আর করব।

একটু মায়া কি অবশিষ্ট ছিল না পারুলের মনে? ছিল। খুব ছিল। অমল রায় যে তাকে গভীর ভালবাসে তাও সে বোঝে। কিন্তু অমল রায়ের দিকে নিজেকে এগিয়ে দিতে কিছুতেই সে পারছে না। বাধা হচ্ছে।

অমল বোম্বেতে চাকরি পেয়ে চলে গেল। যাওয়ার আগে দেখা করে বলল, যদি ক্ষমা করতে পার তবে করো পারুল। চাকরি পেয়েছি। মাস দুয়েকের ভিতরে বিদেশেও চলে যেতে পারি। আমার খুব ইচ্ছে তোমাকে নিয়ে যাই। আমার কথা একটু নরম মন নিয়ে ভেবো পারুল।

পারুল ডাকের সুন্দরী। সারা তল্লাটে তার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না। বিজু বলত, তুই মিস ইন্ডিয়া হতে চাইলে ইজিলি পারবি ছোড়দি। কথাটা মিথ্যেও হয়তো নয়। নানা জায়গা থেকে তার বহু ভাল বিয়ের প্রস্তাব এসেছে। অমল রায়ের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠতার কথা জানাজানি হয়ে যাওয়ার পর আর বিশেষ প্রস্তাব আসত না।

অমল রায় বোম্বে চলে যাওয়ার পরই একদিন পারুল তার মাকে বলল, তোমরা যদি আমার বিয়ে দিতে চাও তাহলে আর দেরি কোরো না।

মা ভ্রূ তুলে বলল, অমলকে?

না মা, তোমরা পছন্দ করে দেখো।

মা একটা স্বস্তির শ্বাস ফেলে বলল, বাঁচালি মা। ও ছেলে সম্পর্কে যা সব কানে আসছে আমার বুকটা কেমন দুরদুর করে। তোর জন্য তো পাত্রের অভাব হবে না।

হয়ওনি। পাত্রের গাদি লেগে গিয়েছিল। সুন্দরী মেয়েদের জন্য যা বরাবরই হয়। বিলেত আমেরিকা বা প্রবাসী বাঙালি সরিয়ে রেখে একজন ভালমানুষ, কর্মঠ, স্বনির্ভর লোককে বেছে নেওয়া হয়েছিল। পারুলের আপত্তি হয়নি। মানুষটি খুব সুপুরুষ নয়, কিন্তু তার চোখে একটা যোগীচক্ষুর ভাব ছিল। কষ্ট করে ওপরে উঠেছে। জামশেদপুরে তার নিজস্ব কারখানা। ছোট যন্ত্রাংশ তৈরি করে। সবচেয়ে বড় কথা, কর্মচারীরা তাকে ভীষণ পছন্দ করে।

বিয়ে হয়ে গেল। কাজটা অমল রায়ের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা হল কি না তা ভেবে পেল না পারুল। কিন্তু মনটা মেঘমুক্ত হয়ে গেল, সে হাঁফ ছেড়ে বাঁচল এবং লোকটাকে হঠাৎ ভালও বেসে ফেলল। স্বামী জ্যোতিপ্রকাশ গাঙ্গুলি তাকে স্পোকেন ইংলিশ শেখাল, সেক্রেটারিয়েটশিপ প্রশিক্ষণ নেওয়াল, এবং ঘরে বসিয়ে না রেখে ব্যবসার সঙ্গী করে নিল। কী সাংঘাতিক পরিশ্রমী মানুষটা! আর ভীষণ সৎ। কথার নড়চড় করে না কখনও। রাগ বলে কিছু নেই। একবারও ভালবাসার সাজানো বানানো মিথ্যে কথাগুলো বলেনি তাকে, কিন্তু পরম বিশ্বাসে নির্ভর করেছে পারুলের ওপর। এরকম সংবর্ধনা কটা স্বামী দিতে পারে তার স্ত্রীকে!

পারুল আজ অপেক্ষা করছে অমল রায়ের জন্য। এতদিন পর কেমন লাগবে মানুষটাকে? হয়তো তার জন্য কেঁদেছে লোকটা, মন খারাপ করেছে। কে জানে কী। এই কৌতূহল নিশ্চয়ই ক্ষমার যোগ্য। তারা বদলে গেছে।

গৌরহরি চট্টোপাধ্যায়ের শ্রাদ্ধে আজ আসবে অমল রায়। মস্ত প্যান্ডেলের নীচে লোক জড়ো হচ্ছে ধীরে ধীরে। বহু লোক আসবে। পারুলের আজ ব্যস্ত থাকার কথা। তবু পারুল এক ফাঁকে আজ এসেছে বাগানে। একা। আজ সেই কিশোরীবেলার পারুলকে খুব মনে পড়ছে তার। কী ছেলেমানুষ ছিল সেই পারুল! কী বোকা।

হঠাৎ একটু শক্ত হয়ে গেল পারুল। মাত্র দু হাত দূর দিয়ে একটা লম্বা, প্রকাণ্ড গোখরো সাপ চলে যাচ্ছে। গলায় একটা ঢিবি। যেতে যেতে তাকে একবার পাশ-চোখে দেখে নিল কি? পারুল নড়ল না। পলকহীন চোখে চেয়ে রইল সাপটার দিকে। উচ্চাবচ ভূমি আর গাছ আর পাতার আড়ালে মিলিয়ে যাচ্ছে সাপটা।

বিড় বিড় করে পারুল বলল, আস্তিক মুনি, আস্তিক মুনি, আস্তিক মুনি।

অধ্যায় ১ / ৭৫
সকল অধ্যায়
১.
প্রথম অধ্যায়
২.
দ্বিতীয় অধ্যায়
৩.
তৃতীয় অধ্যায়
৪.
চতুর্থ অধ্যায়
৫.
পঞ্চম অধ্যায়
৬.
ষষ্ঠ অধ্যায়
৭.
সপ্তম অধ্যায়
৮.
অষ্টম অধ্যায়
৯.
নবম অধ্যায়
১০.
দশম অধ্যায়
১১.
একাদশ অধ্যায়
১২.
দ্বাদশ অধ্যায়
১৩.
ত্রয়োদশ অধ্যায়
১৪.
চতুর্দশ অধ্যায়
১৫.
পঞ্চদশ অধ্যায়
১৬.
ষোড়শ অধ্যায়
১৭.
সপ্তদশ অধ্যায়
১৮.
অষ্টাদশ অধ্যায়
১৯.
ঊনবিংশ অধ্যায়
২০.
বিংশ অধ্যায়
২১.
একবিংশ অধ্যায়
২২.
দ্বাবিংশ অধ্যায়
২৩.
ত্রয়োবিংশ অধ্যায়
২৪.
চতুর্বিংশ অধ্যায়
২৫.
পঞ্চবিংশ অধ্যায়
২৬.
ষড়বিংশ অধ্যায়
২৭.
সপ্তবিংশ অধ্যায়
২৮.
অষ্টাবিংশ অধ্যায়
২৯.
ঊনত্রিংশ অধ্যায়
৩০.
ত্রিংশ অধ্যায়
৩১.
একত্রিংশ অধ্যায়
৩২.
দ্বাত্রিংশ অধ্যায়
৩৩.
ত্রয়োত্রিংশ অধ্যায়
৩৪.
চতুর্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৫.
পঞ্চত্রিংশ অধ্যায়
৩৬.
ষট্ত্রিংশ অধ্যায়
৩৭.
সপ্তত্রিংশ অধ্যায়
৩৮.
অষ্টত্রিংশ অধ্যায়
৩৯.
ঊনচল্লিশ অধ্যায়
৪০.
চল্লিশ অধ্যায়
৪১.
একচল্লিশ অধ্যায়
৪২.
দ্বিচল্লিশ অধ্যায়
৪৩.
ত্রিচল্লিশ অধ্যায়
৪৪.
চতুর্চল্লিশ অধ্যায়
৪৫.
পঞ্চচল্লিশ অধ্যায়
৪৬.
ষট্চল্লিশ অধ্যায়
৪৭.
সপ্তচল্লিশ অধ্যায়
৪৮.
অষ্টচল্লিশ অধ্যায়
৪৯.
ঊনপঞ্চাশ অধ্যায়
৫০.
পঞ্চাশ অধ্যায়
৫১.
একান্ন অধ্যায়
৫২.
বায়ান্ন অধ্যায়
৫৩.
তিপ্পান্ন অধ্যায়
৫৪.
চুয়ান্ন অধ্যায়
৫৫.
পঞ্চান্ন অধ্যায়
৫৬.
ছাপ্পান্ন অধ্যায়
৫৭.
সাতান্ন অধ্যায়
৫৮.
আটান্ন অধ্যায়
৫৯.
ঊনষাট অধ্যায়
৬০.
ষাট অধ্যায়
৬১.
একষট্টি অধ্যায়
৬২.
বাষট্টি অধ্যায়
৬৩.
তেষট্টি অধ্যায়
৬৪.
চৌষট্টি অধ্যায়
৬৫.
পঁয়সট্টি অধ্যায়
৬৬.
ছেষট্টি অধ্যায়
৬৭.
সাতষট্টি অধ্যায়
৬৮.
আটষট্টি অধ্যায়
৬৯.
ঊনসত্তর অধ্যায়
৭০.
সত্তর অধ্যায়
৭১.
একাত্তর অধ্যায়
৭২.
বাহাত্তর অধ্যায়
৭৩.
তিয়াত্তর অধ্যায়
৭৪.
চুয়াত্তর অধ্যায়
৭৫.
পঁচাত্তর অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%