শৈলেন ঘোষ

আমার দাদা গান জানে। দাদার ইচ্ছে, আমিও গাই দাদার মতো। কিন্তু দাদা যা পারে, আমি তা পারি না। কী মিষ্টি গলা দাদার। চেষ্টা করলেও আমার হয় না। আমি গান গাইলেই গলাটা কেমন যেন বেসুরে তালগোল পাকিয়ে যায়। তাই, দাদার সামনে গাইতে আমার লজ্জা করে। এ মা, দাদার সামনে কেউ আবার লজ্জা পায় নাকি! এ-কথা তোমরা বলতেই পারো। কিন্তু সত্যি কথা বলতে কী, দাদার সঙ্গে যখন আমি খুনসুটি করি, তখন দেখলে তোমরা ভাবতেই পারবে না আমার শরীরে এককণা লজ্জা আছে। দাদার সঙ্গে তো আমার লেগেই আছে। কখনও কাড়াকাড়ি করে খাচ্ছি। হেসে গড়িয়ে পড়ছি। মারামারি করছি। দাদা চুল ধরে টানলে খামচে দিচ্ছি। আর যখন পারছি না, মায়ের কাছে নালিশ করছি। আরও যে কত কাণ্ড হয়! সব কথা বলতে গেলে সাতকাণ্ড রামায়ণ হয়ে যাবে। অথচ গান গাইতে বললেই আমি লজ্জাবতী লতা। আবার গান গাইবার জন্য খুব যদি সাধাসাধি কর, তখন আমার চোখভর্তি কান্না টসটস করবে। এই বুঝি ভ্যাঁ করে কেঁদে ফেলি! তখন আমায় দেখলে কে বলবে একটু আগে আমিই দাদার পিঠে গুম করে ঘুঁষি মেরেছি হাসতে হাসতে। আমার চোখে জল দেখলে দাদা কিন্তু ‘আহা-উহু’ করে আদর করে না। হো-হো করে হাসে। তখন আমার আরও কান্না পেয়ে যায়। আরও কান্না দেখলে দাদা বারণ করে না। কী করলে যে আমার কান্না থামবে, সেটা দাদা ভালই জানে। ম্যান্ডোলিনটা হাতে নিয়ে বাজাতে শুরু করে দেবে। গেয়ে উঠবে:
আমি যদি ওই আকাশ হতাম,
অথবা আকাশ-তারা,
মিটিমিটি যেন আলোর চমক
আনন্দে দিশেহারা।
আমি যদি ওই বাতাস হতাম,
অথবা ঝঞ্ঝাবায়,
মেঘের মাদল বাজিয়ে তখন
বাদলের গান গাই।
আমি যদি হই সূর্যের রোদ,
অথবা রোদের মায়া,
ছুঁয়ে-ছুঁয়ে যাই তোমার দু’চোখ।
খুশিভরা আলো-ছায়া।
দাদার গলায় গান শুনলে, সত্যিই, আমার চোখে ছড়িয়ে যায় খুশির আলো-ছায়া। আঃ! কী মিষ্টি! আমার কান্না থামে। অনেকক্ষণ কথা বলতে পারি না। সুরের গুনগুনানি আমার যেন মিতা। মন বলে হায় রে, আমিও যদি দাদার মত গাইতে পারতুম! পারতুম না বলেই দাদা যখন থাকত না, নিজে নিজে চেষ্টা করতুম গুনগুন করে লুকিয়ে। একলাটি।
আমি বলি, যার দাদা নেই, তার কিচ্ছু নেই। কিংবা যার দাদা আছে অথচ গান জানে না, হায় হায়, কী দুর্ভাগ্য তার! হয়তো দাদাও ভাবে, যার সব আছে অথচ একটি বোন নেই, তার কিচ্ছু নেই। বটেই তো, দাদা না থাকলে কার ওপরে এমন রাগ করে আবার ভাব করব! কে আমায় গান শুনিয়ে আমার কান্না থামাবে! অবশ্য আমার দাদা গান গাইতে পারে বলে সবার দাদাই যে গান গাইতে পারবে, সে-কথা বলি না। তবে পারলে ভাল। না-পারলে দাদার হাসি, দাদার ভালবাসা সেও কি কম?
আশ্চর্য, দাদাকে কেউ গান শেখায়নি। নিজে নিজেই শিখেছে। আমাদের তো আর অনেক পয়সা নেই যে, পয়সা খরচ করে গান শিখবে দাদা। আমাদের তেমন মস্ত বাড়ি-ঘরও নেই। নেহাতই দরমা-বাঁধা ঘর। একটার পর একটা এমন অনেক ঘর নিয়েই আমাদের পাড়া। আমাদের ঘরটার ঠিক গা ঘেঁষে একটা মস্ত কদমগাছ। ডালপালা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কত পাখি যে সকাল থেকে সন্ধে পর্যন্ত উড়ে যায়, উড়ে আসে। সন্ধেবেলায় বাসায় ফিরে পাখিদের সে কী কাকলি। থামতেই চায় না। থামবে সেই অন্ধকার নামলে। তখন সেই নিঝুম সন্ধেবেলায় দাদার গলায় যদি একটা গান শোনো, তোমাদের মনে হবেই-হবে, যেন গানের সঙ্গে ভেসে আসছে কদমফুলের গন্ধ। আঃ। সে-গান পাখির কাকলির চেয়ে কম কীসের।
আমি ইস্কুলে পড়ি। এ-বছরই ক্লাস ফাইভে উঠলুম। মাইনে লাগে না। ফ্রি ইস্কুল। আমার বাবা রিকশ চালান। দাদা যে ইস্কুলে পড়ত, সেখানে মাইনে দিতে হত। বাবা পারতেন না। তাই দাদার বেশিদূর পড়াশোনা হয়নি। যখন দাদা ইস্কুল ছাড়ল তখন ক্লাস নাইনে পড়ছে। আর দুটো বছর কোনওরকমে টানতে পারলে, দাদা অন্তত মাধ্যমিকটা দিতে পারত। কিন্তু হল না। শেষ যেদিন ইস্কুল গেছল, সেদিন দাদা খুব কেঁদেছিল। পাছে আমি দেখতে পাই, তাই চোখদুটো লুকিয়ে রেখেছিল বালিশের নীচে। কিন্তু আমার চোখকে ফাঁকি দিতে পারেনি দাদা। আমি দাদাকে অমন করে বিছানায় শুয়ে থাকতে দেখেই বুঝেছি। আমি গায়ে হাত দিয়েছিলুম দাদার। আলতো গলায় জিজ্ঞেস করেছিলুম, “কাঁদছিস দাদা?”
দাদা মুখ তোলেনি।
আমি নিজেই আমার ছোট্ট হাত দিয়ে দাদার মুখখানা টেনেছিলুম। আমার হাতের দুটি আঙুল দিয়ে দাদার দুটি চোখের অশ্রুফোঁটা মুছে দিয়ে বলেছিলুম, “তোর বইগুলো আমি যত্ন করে গুছিয়ে রেখেছি।”
দাদা কথা বলল না। আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল। কেমন করুণ সে চাউনি। আমার ভারী কষ্ট হল। আমিও কথা বলতে পারলুম না আর। চেয়ে রইলুম দাদার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে।
দাদা অবশ্য লেখাপড়ায়, খুব ভাল ছেলেদের মতো খুব ভাল ছিল না। তাই বলে মনে কোরো না, দাদা খুব খারাপ ছিল। প্রতি বছর দাদা ক্লাসে উঠেছে। উঠেছে মানে ভাবছ হয়তো টায়েটোয়ে নম্বর পেয়ে। মোটেই না। দাদার নম্বর দেখলে হিংসে করার লোকের অভাব হয় না। হবেই তো। আমরা যে দরমার দেওয়াল-ঘেরা ঘরে বাস করি। আমার মাঝে মাঝেই মনে হয়, অত লোকের অত বড় বড় বাড়ি কেমন করে হয়! এই ধরো না, আমাদের পাড়াটা ছাড়িয়ে একটু গেলেই দেখতে পাবে মল্লিকদের চারতলা বাড়িটা। অনেকক্ষণ তাকিয়ে দেখতে হয়। অথচ দ্যাখো, ওদের কেউ তো আর লেখাপড়ায় দিগ্গজ নয়। থাক সে-কথা। তবে একটা কথা বলি, বাবার যদি সাধ্যে কুলোত তবে দাদাকে কেউ আটকাতে পারত না। কিন্তু যা হওয়ার নয়, শত চেষ্টাতেও তা হয় না। কাজেই পড়া ছাড়তে হল দাদাকে।
দাদা যখন ইস্কুলে পড়ত, সেবার ইস্কুলের প্রাইজের ফাংশনে প্রথম গান গেয়েছিল দাদা। কত লোক সেই ফাংশন দেখতে এসেছিলেন। অত লোকের সামনে দাদা যে কেমন করে গান গেয়েছিল, সে-কথা ভাবলে এখনও আমার গায়ে কাঁটা দেয়! সেদিন দাদার গান শুনে কী প্রশংসাই না করেছিলেন সবাই। আমি মায়ের সঙ্গে সেই ফাংশন দেখতে গেছলুম। বাবা যাননি। বাবা যতক্ষণ ফাংশন দেখবেন, ততক্ষণই ক্ষতি। ওই সময়ে রিকশ না চালালে ক্ষতির টাকাটা তো আর অন্য কেউ পুষিয়ে দেবে না। দিলেই বা নেবেন কেন বাবা! একটা মিনিট নষ্ট করার জো নেই। ঝাঁ-ঝাঁ রোদে তুমি ঘেমে-নেয়ে একশা হও, কি বৃষ্টির জলে নাকানি-চোবানি খাও, তোমার নিস্তার নেই। রিকশ তোমাকে চালাতেই হবে। সত্যি, এক-একদিন এত ক্লান্ত হয়ে বাবা ঘরে ফেরেন, দেখলে ভীষণ মায়া হয়। বাবা যখন বিশ্রাম নেন, আমি অনেকক্ষণ ধরে বাবার গায়ে-মাথায় হাত বুলিয়ে দিই। বাবা ঘুমিয়ে পড়েন। সেই সময় বাবার ঘুমন্ত মুখখানির দিকে তাকালে এত কষ্ট হয়! আমার বাবা, আমার বন্ধু। আমার দাদা, আমার একটি ভাই, আপন। আর মা, আমার মন। আমার মনের সব কথা মা জানেন। আমি না-বললেও যে মা কেমন করে জেনে ফেলেন, আমি অবাক হয়ে ভাবি।
ইস্কুলের ফাংশনে একটা প্রাইজ পেয়েছিল দাদা। খুব ভাল গান গাওয়ার প্রাইজ। প্রাইজটা কী বলো তো? আমি জানি তোমরা কেউ বলতে পারবে না। তোমরা কেন, আমরাও কি ভাবতে পেরেছিলুম! নাম ডাকার পর দাদা যখন প্রাইজটা নিল, তখনও আমরা জানতুম না কী ওটা! কারণ দাদার হাতে তুলে দেওয়া হয়েছিল একটা মস্ত বড় বাকসো। মাইকের সামনে মুখ এনে যখন হেডস্যার বললেন, “সুমিতকে এই প্রাইজ দেওয়া হল তার চমৎকার সংগীত-প্রতিভার জন্যে। তার মধুর কণ্ঠস্বরের জন্যে। ভবিষ্যৎ জীবনে সে একজন মহান শিল্পী হয়ে উঠুক, এই শুভেচ্ছার উপহার এটি।”
আমার দাদার নাম সুমিত, সে তো তোমরা শুনলেই। আমার নামটাও বলা হয়নি এতক্ষণ। আমি বিনি। আমি হেডসারের সব কথার মানে বুঝতে পারিনি সেদিন। জানতুম না, ‘প্রতিভা’ কাকে বলে। ‘মহান শিল্পী’ই বা কী। কিন্তু একটা কথা বুঝতে পারছিলুম, দাদা খুব ভাল গান গাইতে পারে তাই এই পুরস্কার তাকে দেওয়া হল। দাদা প্রাইজ নিচ্ছে যখন, তখন খুশিতে মায়ের দিকে মুখ ফিরিয়েছি। ফেরাতেই দেখি, মায়ের চোখে জল। মা আঁচল দিয়ে চোখ ঢেকে ফেললেন। অমনই আমার চোখ ছলছল করে উঠল। অথচ তখনও জানি না, কী প্রাইজ পেয়েছে দাদা। কী আছে ওই বাকসের ভেতরে? বাহারি কাগজ জড়ানো, সোনালি ফিতে দিয়ে বাঁধা বাকসোটা। সেই বাকসোটা হাতে নিয়ে দাদা যখন সবাইকে নমস্কার করল, হইহই করে চারদিক থেকে হাততালি। দাদার মুখখানি হাসিতে উছলে উঠল। আমিও জল-টুপটুপ চোখে হেসে উঠলুম। তারপর মাকে জড়িয়ে আনন্দে হাঁপাতে লাগলুম।
ইস্কুল থেকে বাড়ি ফেরার ওই হাঁটা-পথটুকু যেন শেষ হতে চায় না। যেন মনে হচ্ছে হাঁটছি তো হাঁটছি। আমরা তিনজন, মা, দাদা, আমি। দাদার হাতে বাকসো। একটা সোনালি গন্ধ নাকে আসছে। যেন বাকসেরই গা থেকে সে-গন্ধ ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে। আমি দাদার হাতটা চেপে ধরলুম। আমার হাত কাঁপছে। দাদা হেসে উঠল, “কাঁপছিস কেন?”
আমি কেমন থতমত খেয়ে গেলুম। আচমকা বলে বসলুম, “বাকসোটার ভেতর কী আছে রে দাদা?”
দাদা উত্তর দিল, “না খুললে বলব কেমন করে?”
আমি বললুম, “মনে হচ্ছে, দামি কিছু আছে।”
দাদা হাসল। বলল, “এটা তোর।”
আমি হাসতে হাসতে উত্তর দিলুম, “বা রে, পেলি তুই, আমার কেন হবে?”
দাদা বলল, “তোর জন্যেই তো পেলুম। তুই আমায় গান গাইতে শিখিয়েছিস।” বলে দাদা আবার হাসল।
আমি বললুম, “গাইতে পারি না বলে আমায় ঠাট্টা করা হচ্ছে, না?”
দাদার মুখ-চোখে হাসির ঝলক। বলল, “ঠাট্টা করব কেন? তুই রাগ করে না-কাঁদলে আমি কি গান গাইতে পারতুম, বল? তোর জন্যেই তো আমি গাই।”
আমি আবার লজ্জা পেলুম।
বাড়ি ফিরে আর সবুর সইল না। আমি দাদার হাত থেকে বাকসোটা প্রায় ছিনিয়ে নিলুম। বাকসে বাঁধা ফিতেটা হাঁকপাক করে খুলতে গেলুম। যাঃ! গিঁট পড়ে গেল। ইস! অত তড়বড় করার কী আছে! ধীরেসুস্থে টান মারলেই তো খুলে যেত! বোঝে এবার!
না, শত চেষ্টা করেও খুলতে পারলুম না। টেনেও ছিঁড়তে পারি না ফিতেটা। কী শক্ত! অগত্যা কাঁচি দিয়ে কাটতে হল। তারপর বাহারি কাগজটা খুলে ফেলতেই বাকসের ঢাকনা নজরে পড়ল। ঢাকনা খুলতেই দেখি, একটা বাজনা। তারের। নতুন। ঝকঝক করছে। আমি অবাক হয়ে দাদার মুখের দিকে তাকালুম। দাদার মুখখানা আনন্দে উছলে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “আরে, এটা যে একটা ম্যান্ডোলিন।”
আমি আগে কখনও ম্যান্ডোলিন দেখিনি। দেখলেও খেয়াল নেই। ম্যান্ডোলিনের কেমন শব্দ তা-ও আমার জানা ছিল না। আমি লোভ সামলাতে পারলুম না। ম্যান্ডোলিনের একটা তারে দিলুম টান। টুং! আমার সারা গা শিরশির করে উঠল। দাদাকে জিজ্ঞেস করলুম, “এইটা বাজিয়ে বুঝি গান গাইতে হয়?”
দাদা উত্তর দিল, “হ্যাঁ।”
আমি সন্দেহের চোখে দাদার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “তুই পারবি?”
দাদা উত্তর দিল, “দেখি।” বলে দাদা নিজেই তারগুলো একটা একটা টেনে টুং-টাং করে বাজাতে লাগল। আর আমি মায়ের আঁচল ধরে দেখতে লাগলাম। কিন্তু টুং-টাং শব্দগুলো যে শুধুই শব্দ, গানের সুর নয়, সে আর কে না বুঝতে পারে। তাই মনে মনে ভাবতে লাগলুম, না শিখলে এটা বাজিয়ে দাদা গান গাইবে কেমন করে!
কিন্তু এখন কে আর শেখার কথা নিয়ে মাথা ঘামায়! দাদার প্রাইজটা নিয়ে আমি হুলুস্থুলু শুরু করে দিলুম। একে ডাকি তাকে ডাকি। এ-বাড়ি ও-বাড়ি যাকে পাই তাকেই বাজনাটা দেখিয়ে চেঁচাই, “দাদা গান গেয়ে প্রাইজ পেয়েছে, দাদা প্রাইজ পেয়েছে।” আমার সে কী আনন্দ। আমার আনন্দ দেখে পাড়ার সবাই যে একেবারে খুশিতে ডগমগ করে উঠল, তা আমি বলব না। কিন্তু সুধন্যকাকুকে দেখলুম অন্যরকম। ভীষণ খুশি। সুধন্যকাকু আমাদেরই পড়শি। আমার বাবার মতোই হয়তো বয়েস হবে। বাবার মুখে শুনেছি, সুধন্যকাকু আগে নাকি গান গাইতেন। বাজনাও বাজাতেন। এখন আর অভ্যেস নেই। যখন অভ্যেস ছিল তখন আমি এতই ছোট ছিলুম যে, সে-সময়কার কথা আমার একফোঁটাও মনে নেই। তাই ভাল গাইতেন, না, ভাল বাজাতেন, তার উত্তর আমি দিতে পারব না। কিন্তু সুধন্যকাকু আমার হাত থেকে ম্যান্ডোলিনটা নিয়ে যখন টুং-টাং শুরু করে দিলেন, তখন আমি অবাক না হয়ে পারিনি। সুধন্যকাকু আমার সঙ্গেই আমাদের ঘরে হইহই করে ছুটে এসেছিলেন। দাদাকে জড়িয়ে ধরে “শাবাশ, শাবাশ” বলে হুল্লোড় শুরু করে দিলেন। আমি তাঁর ফুর্তি দেখে নিজেই কেমন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলুম। কিন্তু তিনি যখন ম্যান্ডোলিনের তারগুলো বেঁধে নিয়ে দাদাকে বললেন, “তুই একটা গান গা, আমি বাজাই,” তখন সত্যি বলছি আমার বুকের ভেতরটা আনন্দে উথাল-পাথাল করতে লাগল।
এইসব কথা সেই কবেকার। যখন দাদা ইস্কুল ছেড়েছে সেই তখনকার। সেই তখন দাদা সুধন্যকাকুর কাছে ম্যান্ডোলিন বাজাতে শিখেছে। এখন দাদা গান গাইছে নিজে নিজে ম্যান্ডোলিন বাজিয়ে। দাদার নাম হয়েছে। ফাংশানে গান গায় দাদা। সবাই বলে, “কার ভেতরে কী গুণ লুকিয়ে থাকে, কে বলতে পারে। সুমিত রিকশওলার ছেলে। কিন্তু ছেলেটা গান গায় রাজপুত্তুরের মতো।” এখন সুধন্যকাকু আমাদের ঘরে আসেন রোজ। তিনি বলেন, “আমি যা পারিনি, সুমিত তা পেরেছে। আরও পারবে, আরও অনেক পারবে।”
সেদিন দাদার কী হয়েছিল কে জানে। মাঝেমাঝেই কেমন যেন অন্যমনা হয়ে কী ভাবছিল। আমি ঠিক বুঝতে পেরেছি। কিন্তু জিজ্ঞেস যে করব, কিছুতেই পারছিলুম না। আমার মনের কথা মাকে তো বলতেই হয়। তাই একফাঁকে মায়ের কাছে গিয়ে বললুম, “জানো মা, আজ না দাদার একটা কিছু হয়েছে।”
“কী হয়েছে?” মা ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
আমি উত্তর দিলুম, “সেইটাই কথা। কী হয়েছে বুঝতে পারলে তো হয়েই যেত।” বলে, একটু থেমে আবার বললুম, “তুমি ডেকে জিজ্ঞেস করো না!”
দাদাকে ডেকেছিলেন মা। জিজ্ঞেস করেছিলেন। দাদা মনের কথাটি মাকে বলতে একটুও কাঁচুমাচু করেনি। দাদা বলেছিল, “জানো মা, এখন সবাই বলে আমি খুব ভাল গান গাই। সবাই বলে, আমি ইচ্ছে করলে অনেক পয়সা রোজগার করতে পারি। শখ করে গান গেয়ে কী লাভ বলো! তার ওপর বাবার কষ্ট দেখে আমারও ভীষণ কষ্ট হয়। বাবাকে বলল, আমি বড় হয়েছি। আর দরকার নেই রিকশ চালানোর। আমি গান গেয়ে রোজগার করে আনব। আচ্ছা বলো, আমি কী শুধু অন্যকে আনন্দ দেওয়ার জন্যেই গান গাইব? আর আমার বাবা রিকশ চালাবেন কষ্ট করে?”
দাদার কথা শুনে মা কেঁদে ফেলেছিলেন। মায়ের কান্না দেখে দাদারও চোখভর্তি জল উপচে পড়েছিল। আমি দাদাকে জড়িয়ে ধরেছিলুম। আমি কার চোখের জল মুছিয়ে দেব? কাকে বলব, কেঁদো না? মা আর দাদার চোখে জল দেখে আমি নিজেই যে কেঁদে ফেলেছি। একটা ঘরে তিনটে মানুষ একসঙ্গে কাঁদছে। আমাদের কেউ সান্ত্বনা দেওয়ার নেই। জানি না, কীসের জন্যে কাঁদছি আমরা। আমাদের কি দুঃখ হয়েছে? না, আনন্দ? বুঝতে পারছি না আমি।
আজ ভীষণ ঠান্ডা পড়েছে। বাবা অন্য দিনের চেয়ে আজ আগে ফিরেছেন। শীতকালে ঠান্ডা পড়বেই। তবে আজ পড়েছে হাড়-কাঁপানো ঠান্ডা। এই ঠান্ডার কামড় খেতে খেতে কতক্ষণই বা মানুষ ফাঁকা ধু-ধু রাস্তায় রিকশ চালাতে পারে! ঘরে ঢুকে পড়তে না পারলে নিস্তার নেই। তবে আমাদের ঘর তো আর ইটে গাথা নয়। দরমার দেওয়াল। ফুটোফাটা দিয়ে ফুরফুর করে হাওয়া ঢুকে পড়ছে। ঘরের ভেতর হি-হি করতে করতেই ঠান্ডার সঙ্গে লড়াই করছি। আমাদের অভ্যেস আছে। একবার মুড়িসুড়ি দিয়ে বিছানায় ঢুকে পড়তে পারলে আর পায় কে! ঘুম, ঘুম আরামসে ঘুম।

কিন্তু সে-রাতে আমাদের কারও চোখে ঘুম আসেনি। সে ছিল এক ভয়ংকর রাত!
দাদা গান গাইতে গেছে অনেক দূরে। বলে গেছে রাত হবে আসতে। ম্যান্ডোলিনটা অবশ্য নিয়ে যায়নি। বাবা সবে বাড়ি ফিরেছেন। আমাদের ঘরটার লাগোয়া একচিলতে জায়গা। ওইটাই বাবার রিকশ রাখার আস্তানা। তালা দিয়ে বাঁধা থাকে। বলা তো যায় না! হাত-মুখ ধুয়ে বাবা বিছানায় গড়িয়ে পড়লেন। মায়ের রান্না শেষ হতে আর দেরি নেই। এতক্ষণ হ্যারিকেনের আলোয় আমি পড়ছিলুম। বাবা ঘরে এসেছেন, আর কে পড়ে! আমি পড়া ছেড়ে উঠে গেলুম বাবার কাছে। চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বাবা হি-হি করতে করতে বললেন, “আজ জব্বর ঠান্ডা পড়েছে রে বিনি।”
আমি বাবার কপালে হাত রেখে বললুম, “আজ নিশ্চয়ই তোমার খুব কষ্ট গেছে।”
বাবা উত্তর দিলেন, “কষ্ট? দুর বোকা। সেই কবে থেকে রিকশ চালাচ্ছি। এসব কষ্ট কষ্টই নয়। সয়ে গেছে।” বলে একটু থামলেন। তারপর জিজ্ঞেস করলেন। “সুমিত কোথায় রে?”
“গান গাইতে গেছে।” আমি উত্তর দিলুম।
“এই ঠান্ডায়,” বলে একটু ভাবলেন বাবা। আচমকা জিজ্ঞেস করলেন, “তুই ম্যান্ডোলিনটা বাজাতে পারিস?”
আমি হাসলুম। বললুম, “খুব শক্ত।”
বাবা বললেন, “শিখিসনি কেন? দ্যাখ তো, সুমিত কেমন শিখেছে! তার কাছেও তো শিখতে পারিস। ভারী ভাল বাজায় ছেলেটা।”
আমি বললুম, “বলো, দাদার গলাও কেমন মিষ্টি?”
“কখন আসবে বলে গেছে?” বাবা জিজ্ঞেস করলেন।
আমি উত্তর দিলুম, “বলে গেছে দেরি হবে।”
বাবা বললেন, “বয়েস হচ্ছে আমার। ভাবনা হয়।”
“জানো বাবা, কাল না দাদা মাকে বলছিল, তুমি আর নাই-বা রিকশ চালালে।”
বাবা হেসে উঠলেন। বললেন, “যতদিন পারে ততদিন মানুষকে কাজ করতেই হয়। নিজের জন্যে নয়, নিজের ছেলেমেয়েদের জন্যে। পয়সা না হলে তোর জামাটা, জুতোটা হবে কেমন করে? দু’বেলা দুটো মুখে না দিলে বাঁচবি কী করে? দ্যাখ আমার কত ইচ্ছে ছিল, সুমিতকে অনেক লেখাপড়া শেখাব। তুইও শিখবি। মনে মনে ভাবতুম, আমি যা পারিনি, তোরা যেন তা পারিস। কিন্তু আমার পয়সা নেই বলেই তো তাকে ইস্কুল ছাড়তে হল। এ কী আমার কম দুঃখ!” বলে থামলেন বাবা কিছুক্ষণ। আমার মাথায় হাত দিলেন। তারপর বললেন, “তোর দাদা নিজের চেষ্টায় ম্যান্ডোলিন বাজিয়ে গান গাইতে শিখেছে। এ কথা যখন ভাবি, আমার মনে আর দুঃখ থাকে না। আমি জানি, ইচ্ছে করলে সে অনেক পয়সা উপায় করতে পারে এখনই। এও তো বিদ্যে। লেখাপড়ার মতোই বিদ্যে। জানিস তো এ-বিদ্যেও মানুষকে বড় করে! দেখিস, সুমিত একদিন অনেক বড় হবে।”
হঠাৎ বাবা থমকে গেলেন কথা বলতে বলতে।
আমি চমকে উঠলুম বাবার কথা শুনতে শুনতে।
মা আচমকা চিৎকার করে উঠলেন, “আগুন! আগুন!”
বাবা লাফিয়ে উঠলেন।
পড়িমরি করে মায়ের কাছে ছুটে যাওয়ার জন্যে পা বাড়ালুম। শুনতে পেলুম, চারদিক থেকে মানুষের আর্তনাদ “আগুন! আগুন!”
বাবা আমার আর মায়ের হাত ধরে টানতে টানতে বাইরে নিয়ে এলেন। বাইরে বেরিয়ে দেখি, সারা পাড়া দাউ-দাউ করে জ্বলছে। নিমেষে ছড়িয়ে পড়ল আগুন আমাদের ঘরেও। বাবা পাগলের মতো ছুটে ঢুকতে গেলেন ঘরের ভেতর। আমি বাবাকে জড়িয়ে ধরলুম। বাবা চিৎকার করে উঠলেন, “আমায় যেতে দে, সুমিতের ম্যান্ডোলিনটা পুড়ে যাচ্ছে। ওটাকে রক্ষা করতে দে আমায়!”
না, বাবা ঢুকতে পারলেন না। আমাদের ঘরের খোলার ছাদটা হুড়মুড় করে ভেঙে পড়ল। দাউ-দাউ করে পুড়ে ছাই হয়ে গেল বাবার রিকশটা। বাবা কেঁদে উঠলেন, “ওরে, আমার এ কী সর্বনাশ হল রে!”
বাবার কান্না দেখে মাও কেঁদে উঠলেন। আমি যেন বোবা হয়ে গেলুম। স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে দেখছি, আমাদের ঘরটা মুখ থুবড়ে পড়ে পড়ে জ্বলছে। জ্বলছে দাদার ম্যান্ডোলিন। বাবার রিকশ। মায়ের বাকসো-প্যাটরা। আমার বই। কাপড়। জামা। জুতো। বিছানা। তক্তপোষ। কিছুই করার নেই। ঠায় দাঁড়িয়ে দ্যাখো জ্বলন্ত আগুনের সর্বনাশা কাণ্ড।
জল ছড়িয়ে দেওয়ার অনেক আগেই সব শেষ। এখন সব ছাই। ওই ছাইটার নাম দাদার ম্যান্ডোলিন। এই ছাইটার নাম রিকশ। ওইটা আমার বইয়ের ছাই। এইটা মায়ের বাকসো।
একটু আগে বাবা কাঁদছিলেন। এখন বোবা। একটু আগে মা কাঁদছিলেন। এখন কান্না নেই মায়ের চোখে। এতক্ষণ আমি ছিলুম হতবাক। হঠাৎ আমি চিৎকার করে উঠলুম, “দাদা-আ-আ।” চিৎকার করে আমি ছুট দিলুম। জ্বলন্ত ছাইয়ের ওপর আমার পা পড়ল। পা পুড়ছে কি না খেয়াল নেই। বাবা চকিতে আমায় জড়িয়ে ধরলেন। ধমক দিলেন, “কোথায় যাচ্ছিস?”
“দাদাকে ডাকতে।” আমি আর্তনাদ করে উত্তর দিলুম।
“না, তোকে যেতে হবে না। মায়ের কাছে যা। আমি তাকে খুঁজে আনছি।” বাবা যেন গর্জে উঠলেন। আমি থমকে গেলুম বাবার সেই মূর্তি দেখে।
বাবা চলে গেলেন।
আমি মা’র কাছে দাঁড়িয়ে আছি। মায়ের গলায় এখন আর কোনও কান্নার শব্দ নেই। মা’র চোখে কেমন উদাস চাউনি। সে-চোখ দেখে আমার ভয় করে। এতক্ষণ আগুনের ঝলকায় চারদিক ঝলসে ছিল। এখন অন্ধকারেই মায়ের মুখখানা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। মা, আমার মা। আমার এই মা-ই তো কত যত্ন করে সাজিয়ে রেখেছিলেন এই ঘর। মায়ের হাতের নরম ছোঁয়ায় ভরে উঠেছিল আমাদের সংসার। আমাদের সাধ-আহ্লাদ! মায়ের স্বপ্ন! মায়ের আদরে, ভালবাসায় বেড়ে উঠেছি আমরা। মায়ের শাসনে, অভিমানে বড় হয়েছি আমরা। আমদের সেই মা’র, সেই স্বপ্নে গড়া ছোট্ট সংসার নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল। ছাই হয়ে গেল সব। আমি গুমরে গুমরে কেঁদে উঠলুম। আমার কান্নার শব্দটা আরও অনেক অসহায় মানুষের কান্নার শব্দে হারিয়ে যাচ্ছে। হাহাকার, চারদিকে হাহাকার। কে কার কান্না শুনবে! কে কার কান্না শুনে কার কাছে ছুটে যাবে!
বাবা তো এখনও এলেন না! গেছেন তো অনেকক্ষণ! দাদারই বা কী হল! এখনও এল না! এদিকে রাত বাড়ছে। একপাশে দলা পাকিয়ে বসে আছি আমি আর মা। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আর কতক্ষণ অন্ধকারে চোখ মেলে থাকা যায়! আমিই প্রথম কথা বললুম, অনেকক্ষণ পর, “মা, এখনও বাবা এলেন না, দাদাও এল না।”
আমার কথা শুনে মা শান্ত গলায় উত্তর দিলেন, “তুই বোস! আমি একটু দেখে আসি।”
আমি বললুম, “না, তোমায় কষ্ট করে যেতে হবে না। আমি দেখে আসি।”
মা বললেন, “তুই একা কোথায় যাবি? না।”
“তবে চলো, আমরা দু’জনেই যাই।”
“দু’জনে গেলে মানুষদুটো এসে কাউকে দেখতে না পেলে আবার খুঁজতে ছুটবে। সে আর-এক বিপত্তি। তই বোস। আমি এক্ষুনি দেখে আসছি।”
ঠিক কথাই। আমি আর বেশি জোরাজুরি করলুম না। মাকে বললুম, “বেশিদূরে যাওয়ার দরকার নেই। কাছাকাছি দেখে চলে এসো।”
মা চলে গেলেন। আমি একা বসে রইলুম। পাড়াসুদ্ধু মানুষের আর্তনাদ শান্ত হয়ে আসছে। ধীরে ধীরে। এখন নিশ্চয়ই অনেক রাত। আকাশভর্তি তারা। দেখছি আর ভাবছি, এত রাতেও দাদা ফিরল না কেন! কোথায় গান গাইতে গেছে দাদা। এমন যে একটা সাংঘাতিক কাণ্ড হয়ে গেল, দাদার কানে কি পৌঁছয়নি? একটা-দুটো রাতের পাখি উড়ে যাচ্ছে ডাকতে ডাকতে। আমাদের ঘরের লাগোয়া কদমগাছটা একদম ঝলসে গেছে। আহা! বাঁচলে হয়! পাখিরা আর কি আসবে? বাসা বাঁধবে? ডাকাডাকি করবে? সুধন্যকাকু তো একবারও এলেন না! বটেই তো, আসবেন কেমন করে! এই বিপদে তাঁর কী সর্বনাশ হল তার খোঁজ কে রাখে! আমার বোধহয় ইস্কুলের পাট চুকে গেল। বাবার রিকশটা চোখের সামনে দাউ-দাউ করে পুড়ে ভস্ম হয়ে গেল। এই রিকশটা এতদিন আমাদের সব সাধ মিটিয়েছে। এবার কী হবে! এবার হয়তো বাবার সব কষ্টটা দাদাকেই নিতে হবে। দাদা তো মাকে সে-কথা আগেই বলেছে। কিন্তু বললে কী হবে! বাবা কি আর ছেলেমেয়েকে কষ্ট দিতে চান! কিন্তু এবার বাবা কী করবেন? এখন মাথা গোঁজার একটা ঠাঁইও নেই আমাদের। একটা কাপড় নেই, জামা নেই, কিচ্ছু নেই। এই যা গায়ে পরে আছি। আশ্চর্য, এত যে শীত, এখন একটুও গায়ে লাগছে না। অবশ্য বুঝতে পারছি শিশির পড়ছে। গায়ের জামাটা ভিজে শপশপ করছে। দূরে একটা কুকুর ডেকে উঠল। একটা ডাকলে, সবাই জানে, আরও পাঁচটা ডেকে উঠবে। ওদের যত দস্যিপনা রাতদুপুরে। মানুষকে ঘুমোতে দেবে না। আজ অবশ্য আমার চোখে ঘুম আসছে না। কার আসে বলো? কে নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারে এই আগুনে-পোড়া ধ্বংসের ওপর? দ্যাখো তুমি, অন্ধকারেও দেখতে পাবে গোটা পাড়াটা একেবারে মাঠ হয়ে গেছে। খাঁ খাঁ করছে। সকাল হলে আরও স্পষ্ট হবে। দেখতে পাবে ছারখারের চেহারাটা কী ভয়ংকর!
রাত কাটছে, সে তো বুঝতেই পারছি। কিন্তু কই, মা, বাবা, দাদা তিনজনের একজনও তো এখনও এলেন না! আরও কতক্ষণ একা একা বসে থাকতে হবে? এখন কি কেউ কাউকে খুঁজে পাননি! আমিও কি হারিয়ে গেলুম এই অন্ধকারে? মনে পড়ে গেল দাদার সেই হারিয়ে যাওয়ার গানটার কথা। দাদা কী সুন্দর গায় সেই গানটা! দাদার মুখখানা স্পষ্ট ভেসে উঠল আমার চোখের ওপর। দাদা গান গাইছে। আমি গুনগুন করছি।
ভয় নেই কিছু হারিয়ে যাবার,
ঝরে গেলে ফুল ফুটবে আবার,
ভোরের সূর্য উঠবে,
মৌমাছি এসে জুটবে।
কে বলে মিথ্যে এ-গান গাওয়া,
এ যে বাধা ভেঙে এগিয়ে যাওয়া,
মশাল নিয়েছি হাতে,
কে যাবে আমার সাথে।
যদি ভাঙে বাঁশি আছে তো সেতার,
তারই সুরে শোনো দুঃখ জেতার,
ঝংকার আলাপন,
ভরে যায় ভাঙা মন।
“বিনি।”
কে আমার গা ছুঁয়ে ডাকল। আমি থতমত খেয়ে গেছি। আমি চোখের পলকে ফিরে তাকিয়েছি। দাদা! আমি চিৎকার করতে গেলুম, পারলুম না। এ কী, আমার গলায় স্বর নেই কেন? দাদার মুখেও কথা নেই কেন? থমথম করছে দাদার মুখখানা। আমার কষ্ট হচ্ছে। ভীষণ কষ্ট। দাদা আমার মুখের দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে আছে। আমিও। অনেকক্ষণ। আরও অনেকক্ষণ।
হঠাৎ একটি পাখি ডেকে উঠল।
আমার চমক ভাঙল।
হঠাৎ একটি কচিগলার কান্না কানে এল।
আমি আচমকা জড়িয়ে ধরলুম দাদাকে। চিৎকার করে কেঁদে ফেললুম। আমার কান্নার জল গড়িয়ে পড়ল দাদার গায়ে।
দাদা আমার মাথায় হাত দিয়ে আদর করল। ধরা-ধরা গলায় বলল, “আকাশে ভোরের আলো ফুটছে।”
আমি এবার কথা বলতে পারলুম। কাঁদতে কাঁদতে বললুম, “তোর ম্যান্ডোলিনটা ছাই হয়ে গেছে রে দাদা।”
দাদা উত্তর দিল, “তোর বইগুলোও তো গেছে বিনি।”
আমি বললুম, “বাবার রিকশটাও গেছে।”
দাদা খানিক থমকে থেমে তারপর জিজ্ঞেস করল, “কোথায় গেছেন বাবা? মা?”
“তোকে খুঁজতে।”
“বাবার খুব কষ্ট হয়েছে না রে?” দাদা কান্না-ভেজা গলায় জিজ্ঞেস করল।
আমার চোখ ছলছল করে উঠল। বললুম, “বাবাকে কোনওদিন কাঁদতে দেখিনি। আজ কাঁদছিলেন।” তারপর দাদার বুকে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে উঠলুম, “আমাদের কী হবে রে দাদা?”
দাদা উত্তর দিল, “বিনি, একটু আগে তুই গুনগুন করছিলি, “ভয় নেই কিছু হারিয়ে যাবার...। না রে বিনি, আমরা কিছুই হারাতে দেব না। সব বাধা ঠেলে আমরা এগিয়ে যাব। তোর জন্যে আজ আমি কী জয় করে এনেছি দ্যাখ!”
আমি চমকে তাকালুম।
“সোনার মেডেল। কাল গান গেয়ে পেয়েছি।”
সোনা! দাদা সোনার মেডেল জয় করে এনেছে! আমার সারা শরীর থরথর করে কেঁপে উঠল। আমি চিৎকার করে উঠলুম, “দাদা-আ-আ।”
দাদা বলল, “রিকশটা পুড়ে গেছে ভালই হয়েছে। আজ থেকে বাবা আর রিকশ চালাবেন না। তার বদলে আমি গান গাইব। গানই দেবে আমাদের ধন-দৌলত।”
দাদার কথা শুনে আমার মন তোলপাড় করে উঠল। আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে উঠলুম, “আমিও গাইব দাদা তোর সঙ্গে।”
দাদা বলল, “আমরা মায়ের জন্যে, বাবার জন্যে এক নতুন স্বর্গ গড়ে তুলব। পারবি না বিনি?”
আমি হাতের মুঠি শক্ত করে বললুম, “পারব, পারব, পারব।”
দাদা হাত বাড়িয়ে দিল। বলল, “তবে আমার হাত ধর।”
আমি দাদার হাত ধরলুম।
দাদা বলল, “সামনে চেয়ে দ্যাখ!”
আমি সামনে তাকালুম। দেখি, শুধু ছাই আর ছাই। দেখতে পেলুম সেই ছাই পায়ে দলতে দলতে আমার মা আসছেন। আমার বাবা আসছেন। দাদার হাত ধরে আমিও এগিয়ে গেলুম সেদিকে। মনে হল, আজকের সকালটা যেন অন্যরকম। একেবারেই নতুন, আর-একরকম। আঃ!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন