অরুর বিকেল হারিয়ে গেল

শৈলেন ঘোষ

অরু বড় হচ্ছে। বাবা বলেছেন, ক’দিন পরে অরু উঁচু ক্লাসে উঠবে। উঁচু ক্লাস, কত উঁচু জানে না অরু। তাই ভয় পায়। এই নিচু ক্লাসেই একগাদা বই। উঁচু ক্লাসে না-জানি আরও কত বই। নিচু ক্লাসের সব বই পড়ে শেষ করতে পুরো একটা বছর লেগে গেল। তা হলে কেমন করে উঁচু ক্লাসের সব পড়া শেষ হবে একবছরে? তবে কি অরু উঁচু ক্লাসে উঠে শুধুই পড়বে? খেলবে না? ছবি আঁকবে না? দাদুর ওই কোলের ওপর মাথা রেখে গল্প শুনবে না?

দাদু ভারী মজা করে গল্প বলেন। গল্প বলতে বলতে তিনি নিজেই হয়ে যান কখনও রাজা, না-হয় রাজপুত্র। ডাকাত, নয়তো বাজিকর। তখন দাদুর মুখের চেহারাটাই কেমন পালটে যায়। এক-একবার এক-এক রকম। তিনি যখন ডাকাতের গল্প বলেন, তখন তাঁর চোখদুটো ঠিক যেন ডাকাতের মতো কটমটে। আবার যখন বাজিকরের গল্প শোনান, তখন তাঁর চোখে যেন কত রহস্য! জ্বলজ্বল করছে! বাজিকরের গল্প শুনলে গায়ে কাঁটা দেয় অরুর। দাদুর মুখে বাজিকরের গল্প যে কতবার শুনেছে সে। যতবারই শোনে, ততবারই মনে হয়, আবার শোনে। সত্যি, আশ্চর্য গল্প বটে: এক ছিল বাজিকর। গায়ে একটা কালো জোব্বা। মাথায় লাল টুপি। ঝাঁক-ঝাঁক চুলের রাশি টুপির ফাঁক দিয়ে ঘাড়ের ওপর লুটিয়ে পড়েছে। লাল টকটক করছে চোখ। নাকের নীচে তাগড়াই গোঁফ। সঙ্গে খুবই ছোট একটি সঙ্গী। তাকে নিয়েই যত রাজ্যের গল্প দাদুর মুখে।

একবার কিন্তু দাদুর মুখে শোনা গল্প অরু নিজের চোখে দেখেছে। অরুদের বাড়ি থেকে একটু দূরে একটা ছোট্ট মাঠ। একদিন এক বাজিকর ওই মাঠে জাদুর খেলা দেখাচ্ছিল। সেই সময় দাদুর হাত ধরে অরু যাচ্ছিল বেড়াতে। বাজিকরকে দেখে দাঁড়িয়ে পড়লেন দাদু। অরুকে বললেন, “ওই দ্যাখ, আমার গল্পের বাজিকর খেলা দেখাচ্ছে! চ, দেখবি চ।”

অরুর বুকের ভেতরটা খুশিতে উছলে উঠল। দাদুর মুখে শোনা গল্প এক জিনিস। আর সেই গল্প চোখে দেখা আরএক জিনিস। এমন সুযোগ হাতছাড়া করে! অরুর তর সইল না। দাদুকে প্রায় টানতে টানতে নিয়ে চলল মাঠের দিকে। একমাঠ লোক। জাদুকর হই-হই করে খেলা দেখাচ্ছে। অরু দাদুকে নিয়ে এর হাতের ফাঁক গলে, ওর গায়ে ঠেলা মেরে, একেবারে সামনে পৌঁছে গেল। দু’-চারজন যে দু’-চার কথা বলল না, তা যেন ভেবো না। একে ভিড়। তার ওপর পেছন থেকে ঠেলা মেরে কেউ যদি সামনে যায় তা এমন সুজন কে আছে যে, ঠেলা খেয়ে মুখ বুজে সহ্য করবে? মুখ বুজে সহ্য করুক আর না-ই করুক, অরু ততক্ষণে দাদুর হাত ধরে খেলা দেখতে শুরু করে দিয়েছে সামনে দাঁড়িয়ে।

অরু কেমন অবাক হয়ে দেখছে বাজিকরকে! আরে, এ যে ঠিক দাদু যেমন বলেছিল এক্কেবারে তেমন দেখতে! এই বাজিকরের সঙ্গেও তো তেমনই এক ছোট্ট সঙ্গী। অরুর কী ভাগ্য বলো! কেন না এক্ষুনি খেলা শেষ হয়ে যাবে। শুধু একটা খেলাই বাকি। অরু শেষ খেলাটা দেখার ঠিক আগেই এখানে হাজির হয়েছে। এই খেলার গল্পটা দাদুর মুখে শুনেছে অরু অনেকবার। শুনলেই অরুর বুক শুকিয়ে যায়। এখন চোখের সামনে গল্পের সেই ঘটনা দেখলে কী যে হবে অরুর, কে বলতে পারে।

অরু সামনে এসে দাদুকে একেবারে জড়িয়ে ধরে দাঁড়িয়ে থাকল। দেখছিল, বাজিকরের মুখখানা। তার লাল টকটকে চোখদুটো থেকে থেকেই এধার-ওধার ঘুরে ঘুরে সবাইকে দেখছে। আর তার ছোট্ট সঙ্গীটি মাঠের মধ্যিখানে দাঁড়িয়ে বাজিকরের দিকে তাকিয়ে আছে। হয়তো বাজিকর এক্ষুনি কিছু হুকুম করবে। সেই হুকুম শোনার জন্যে সে তৈরি।

যা ভাবা ঠিক তা-ই। বাজিকর আচমকা গলা ছেড়ে হাঁক পাড়ল, “এ ছেলিয়া!”

সঙ্গে সঙ্গে সেই ছোট্ট সঙ্গীটি চেঁচিয়ে সাড়া দিল, “ওস্তাদজি?” বোঝা গেল ওস্তাদজি, মানে বাজিকর, সঙ্গীটিকে ‘ছেলিয়া’ বলে ডাকে।

ওস্তাদজি ছেলিয়ার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। আগের মতো হাঁক পেড়েই আবার বলল, “ছেলিয়া-আ-আ।”

ছেলিয়া উত্তর দিল, “হাঁ জি।”

বাজিকর ভাঙা ভাঙা হিন্দিতে জিজ্ঞেস করল, “কভি তিমিমাছ দেখা হ্যায়?”

“না জি।”

“তিমিমাছ কী ধারে থাকে মালুম আছে?”

“সমুন্দুরে।”

“কভি জিরাফ দেখা হ্যায়?”

“না জি।”

“জিরাফ কী ধারে থাকে মালুম আছে?”

“জঙ্গলে।”

বাজিকর আবার চেঁচাল, “এ ছেলিয়া-আ-আ।”

“হাঁ জি।” সাড়া দিল সঙ্গীটি।

“এখোন যদি তোকে আমি সুমুন্দুরের পানিতে ফেলে দিই, কী হোবে?”

“ডুবে যাব।”

“তোকে যদি এখোন জঙ্গলমে ছেড়ে আসি, কী হোবে?”

“বাঘে খাবে।”

“এ ছেলিয়া-আ-আ।”

“হাঁ জি।”

“তোবে তুই সুমুন্দুরে যাবি না?”

“ডুবতে কে যায়?”

“এ ছেলিয়া-আ-আ।”

“হাঁ জি।”

“তোবে তুই জঙ্গলমে যাবি না?”

“বাঘের পেটে যেতে কে চায়?”

“তবে কী ধারে যাবি?”

“আকাশে যাব।”

“আকাশে? কেনো যাবি?”

“আকাশ নীল। আকাশে পাখি ওড়ে। তারা জ্বলে। চাঁদ ওঠে। আমার ভাল লাগে।”

“তুই কেমোন কোরে আকাশে যাবি? তুই তো পঞ্ছি না।”

“ওস্তাদজি!”

“বোলোজি।”

“তুমি তো মানুষকে পাখি করার মন্ত্র জানো।”

“ঠিক বাত।”

“তবে আর কী, আমাকে পাখি করে দাও।”

“তোর মা-বাবা হামাকে পুলিশে দিবে না?”

“আমার মা, বাবা, ভাই, বোন কেউ নেই।”

“কেউ নেহি আছে তো শুয়ে পড় ওহি কম্বলটার উপরে।”

সঙ্গে সঙ্গে বাজিকরের খুদে সঙ্গীটি শুয়ে পড়ল কম্বলের ওপরে। বাজিকর এবার মানুষের ভিড়ের দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে উঠল, “দেখেন বাবুরা, হামাকে কোনও দোষ দিবেন না। এ ছেলিয়া পঞ্ছি হোয়ে আকাশে উড়বে। আপনারা সোব কথা শুনিয়াছেন। দেখেন বাবুরা, হামার হাতের এই কালা কাপড় কা ভিতর জাদু আছে। এখোন আমি এই কালা কাপড় দিয়ে ছেলিয়াকে ঢাকিয়া দিচ্ছি। দেখেন বাবুরা, ছেলিয়াকে আর নেহি দেখা যাচ্ছে। বাবুরা, জোরসে তালি বাজান।”

তালি বেজে উঠল।

বাজিকরের কথা শুনে সবাই আকাশের দিকে তাকিয়ে রইল। বাজিকর মন্ত্র পড়তে শুরু করল। সঙ্গে সেই সারা দেহ কালো কাপড়ে ঢাকা সঙ্গীটির চারদিকে ঘুরপাক খেতে লাগল। খেতে খেতে মন্ত্র পড়তে লাগল:

ইতিমারু তাকা সিকি

উসুখুসু ফুস

কাকা কিচু চাকা চিকি

যা যা উড়ে হুস।

মানা সিকি সামু দাসা

মারি থাপ্পড়

দেখো, দেখো উড়ে গেলো

সাদা কবুতর!

মন্ত্র শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে বাজিকর তার ছোট্ট সঙ্গীটির ওপর চাপা দেওয়া কাপড়টা ফস করে তুলে নিল। যাচ্চলে! কোথায় সেই ছোট্ট সঙ্গীটি! কাপড়টা টানতেই তার ভেতর থেকে বেরিয়ে এল একটা সাদা ধবধবে পায়রা! বেরিয়েই ফুড়ত! উড়ে গেল আকাশে! সঙ্গে সঙ্গে হাততালি। সারা চত্বরটা হাততালিতে ফেটে পড়ল।

আশ্চর্য, অরু কিন্তু হাততালি দিল না। তার মুখখানা কেমন যেন গম্ভীর হয়ে গেল।

এদিকে আরও এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটে গেল। নিমেষের মধ্যে সেই ছোট্ট সঙ্গীটি সাদা ধবধবে পায়রাটাকে হাতে নিয়ে সেখানে হাজির। আশ্চর্য, কোথা থেকে এল কেউ বুঝতেই পারল না। আবার একচোট হাততালি। তার পরেই খেলা শেষ। বাড়ি ফেরার পালা।

দাদু বললেন, “দেখলি, কেমন খেলা?”

অরু বলল, “দেখলুম।” তারপর নিমেষ চুপ করে থেকে বলল, “দাদু, তুমি আমাকে একটা সাদা পায়রা কিনে দেবে?”

“পায়রা!” দাদু অবাক হলেন, “কী করবি?”

“আমিও বাজিকরের মতো খেলা দেখাব। আমিও তোমাকে পায়রা করে দিতে পারি।” উত্তর দিল অরু।

“তুই কেমন করে পারবি? বাজিকরের মতো তোর মন্ত্র জানা আছে?” জিজ্ঞেস করলেন দাদু।

অরু উত্তর দিল, “মন্ত্র একটা শিখে নেব। আমার চাই শুধু একটা পায়রা।”

দাদু বললেন, “ঠিক আছে দেব। কিন্তু তুমি উঁচু ক্লাসে ভাল নম্বর পেয়ে যদি ওঠো, তবে দেব।”

অরু বলল, “তার মানে সাতদিন পর দেবে। সাতদিন পরেই তো রেজাল্ট বেরোবে। ঠিক আছে। তা-ই সই।”

হ্যাঁ। ঠিক তা-ই। সাতদিন পর রেজাল্ট বেরিয়েছিল। অরু যে শুধু ভাল নম্বরই পেয়েছে তা-ই নয়, অরু ফার্স্ট হয়েছে। সুতরাং অরুর আদর বাড়ল। মা, বাবা, দাদু, ঠানদি সবাই কী খুশি। দাদুকে জড়িয়ে ধরে অরু বলল, “আমার পায়রা?”

দাদু হাসলেন। কেন না, অরু জিজ্ঞেস করার আগেই সাদা পালকের একটি ঝলমলে পায়রা কিনে এনেছেন দাদু। খুশিতে উছলে উঠে অরু চিৎকার করে উঠল, “দাদু—আমার দাদু।”

দাদু জিজ্ঞেস করলেন, “পায়রা তো এল, এবার কী করবি?”

“এবার আমি হব বাজিকর। তুমি হবে আমার সঙ্গী। ফুসমন্তরে তোমাকে আমি পায়রা করে দেব। বাজিকরের কেরামতি আমি সব দেখে ফেলেছি।” বলে অরু জিজ্ঞেস করল, “কোথায় রেখেছ পায়রাটা?”

দাদু বললেন, “আয়।”

অরু চলল দাদুর সঙ্গে সেই ছাদের চিলেকোঠায়। সেইখানে বাঁধা আছে পায়রা। দাদু পায়রার বাঁধন খুলে দিতেই অরু তাকে দু’হাত দিয়ে ধরে ফেলল। তারপর পায়রার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “দ্যাখো, দ্যাখো দাদু, পায়রার চোখদুটো কেমন চকচক করছে।”

দাদু বললেন, “দেখিস, হাত ফসকে উড়ে না-পালায়! পোষ মানাতে এখনও ক’টা দিন লাগবে!”

“অবশ্য বাজিকরের খেলাটা শিখতে তোমার একমিনিটও লাগবে না।” উত্তর দিল অরু।

দাদু জিজ্ঞেস করলেন, “কী রকম খেলা রে, যে শিখতে একমিনিটও লাগে না?”

অরু জবাব দিল, “কী রকম খেলা, সেটা আমি তোমায় শিখিয়ে দেব। কিন্তু তুমি কাউকে বলতে পারবে না।”

“না, না। তাই আবার কেউ বলে।”

অরু বলল, “দ্যাখো না। আমি সবাইকে এমন ঠকান ঠকাব। মা, বাবা, ঠানদি, আমার বন্ধুরা, কেউ বাদ যাবে না।”

দাদু হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করলেন, “তোর ঠানদিকেও ঠকাবি?”

“বলছি তো সব্বাই ঠকবে। শুধু তুমি বাদ। কেন না, তুমি হবে আমার ম্যাজিক-খেলার সঙ্গী। তুমিই কালো কাপড় চাপাচুপি দিয়ে শুয়ে থাকবে সবার সামনে। আমি মন্তর পড়ব। সবাইকে বলব, দাদু পায়রা হয়ে আকাশে উড়ে যাবে। তোমরা সবাই আকাশের দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকো।”

“হ্যাঁ রে, আমি কি সত্যিই পায়রা হয়ে যাব?” দাদু যেন ভয় পেলেন।

অরু হেসে ফেলল। বলল, “আমি তোমাকে সব বলব। কিন্তু কাউকে বললেই খেলা পণ্ড। এমনকী ঠানদিকে পর্যন্ত বলা চলবে না।”

“পাগল।” বলেই দাদু মুখ ঘোরালেন। তারপর গলা চড়িয়ে বললেন, “বাজিকরের গোপন কথা যে কাউকে বলতে নেই, এ কী আমি জানি না।”

অরু সাবধান করল দাদুকে, “মাকেও বোলো না কিন্তু। মাকে বললে, মা আবার বাবাকে বলে দেবে। বলো, সবাই আগের থেকে জেনে ফেললে সে খেলায় মজা থাকে। কাউকে অবাক করা যায়?”

“সে তো একশোবার।” উত্তর দিল দাদু।

“তবে, তুমি যখন আমার সঙ্গী তখন তোমার কাছে তো কিছু গোপন করতে পারি না। তোমাকে আগেভাগে সব শিখিয়ে না রাখলে খেলা হবে কেমন করে?”

দাদু বললেন, “বটেই তো?”

অরু হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “বাজিকররা খুব চালাক হয়, না দাদু?”

দাদু উত্তর দিলেন, “চালাক না হলে মানুষকে ধোঁকা দেবে কেমন করে।”

অরু বলল, “আমি কিন্তু বাজিকরের চালাকি ধরে ফেলেছি।”

দাদু চমকে তাকালেন অরুর দিকে। জিজ্ঞেস করলেন, “কী রকম?”

অরু উত্তর দিল, “বাজিকর এমন চালাক জানো, যে কালো কাপড়টা তার ছোট্ট সঙ্গীটির গায়ে ঢাকা দিয়ে দিল, পায়রাটা সে ওই কাপড়ের ফাঁকে কায়দা করে লুকিয়ে রেখেছিল। বাজিকর যখন সবাইকে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতে বলল, আমি তখন চুপচাপ তাকিয়ে রইলুম ওই কালো কাপড়ঢাকা বাজিকরের সঙ্গীটির দিকে। সবাই আকাশ দেখছে, আর আমি দেখছি মাটিতে বাজিকরের কেরামতি। এবার শুরু হল বাজিকরের মন্তর পড়া। কাপড়ঢাকা সঙ্গীটিকে ঘিরে ঘুরে ঘুরে মন্তর পড়ছে বাজিকর। আর আড়চোখে দেখছে, আকাশ না-দেখে তাকে কেউ দেখছে কিনা। আমি কিন্তু লুকিয়ে লুকিয়ে দেখছি। তার সাধ্যি কী আমাকে ধরে! ঠিক সেই সময়ে তার ছোট্ট সঙ্গীটি চুপচাপ কালো কাপড়ের ভেতর থেকে বেরিয়ে এল। বেরিয়েই ভিড়ের মধ্যে মিশে গেল। পায়রাটা কিন্তু কাপড়ের নীচেই চাপা পড়ে থাকল। মন্তর পড়তে পড়তে বাজিকর আচমকা কাপড়ে মারল একঝটকা। সঙ্গে সঙ্গে পায়রাটা কাপড়ের নীচ থেকে বেরিয়ে উড়ে গেল আকাশে। পোষা পায়রা। খানিক আকাশে চক্কর মেরে সে সবার চোখের আড়ালে চলে গেল। এদিকে বাজিকরের ছোট্ট সঙ্গীটি লুকিয়ে ছিল একটু দূরে। সে আকাশের দিকে চেয়ে তালি মারল। সঙ্গে সঙ্গে পায়রা নেমে এল আকাশ থেকে তার হাতে। তারপর বাজিকরের ছোট্ট সঙ্গীটি পায়রা হাতে নিয়ে আবার খেলার মাঠে হাজির। সবাই অবাক!”

দাদুও অবাক হয়ে গেলেন অরুর কথা শুনে। তারপর বললেন, “একেই বলে ম্যাজিক। এমনই করে বাজিকর আমাদের চোখ ধাঁধিয়ে দেয়।”

অরু আবার বলল, “তুমি কিন্তু এসব কথা কাউকে বলবে না।”

দাদু উত্তর দিলেন, “একদম না।”

“দ্যাখো এবার কী মজা হয়,” বলে অরু পায়রাটা হাতে নিয়েই ছুটল।

দাদু ব্যস্ত হলেন, “কোথা যাচ্ছিস?”

“তুমি দাঁড়াও, আমি এক্ষুনি আসছি।” বলে অরু একেবারে মায়ের কাছে হাজির, “মা!”

মা রান্নাঘরে কুটনো কুটছিলেন। অরুর ডাক শুনে মুখ তুলতেই অবাক। “কীরে, পায়রা কোত্থেকে পেলি?”

অরু হাসতে হাসতে উত্তর দিল, “আমি ফার্স্ট হয়েছি বলে দাদু দিয়েছে। আমি এই পায়রা নিয়ে বাজিকরের মতো খেলা দেখাব।”

মা বললেন, “দ্যাখো ছেলের কাণ্ড।”

“আমি সবাইকে অবাক করে দেব,” বলে অরু আর মায়ের কাছে দাঁড়াল না। ছুটল ঠানদির কাছে।

“ঠানদি, ঠানদি!”

ঠানদি তুলসীগাছে জল দিচ্ছিলেন। অরুর হাতে পায়রা দেখে বললেন, “আমি জানি কে দিয়েছে।”

অরু বলল, “সে আমিও জানি। নিশ্চয়ই দাদু বলেছে। দ্যাখো না, এবার এই পায়রার খেলা দেখিয়ে আমি তোমাদের অবাক করে দেব।”

ঠানদি মুচকি হেসে জিজ্ঞেস করলেন, “কী খেলা দেখাবি রে?”

“এখন বলব না,” বলে অরু ছুটল বাবার কাছে।

বাবা খবরের কাগজ পড়ছিলেন। এখনই চান-খাওয়া সেরে অফিসে যাবেন। অরু ছুটতে ছুটতে বাবার কাছে হাজির, “বাবা, বাবা!”

বাবা কাগজের পাতা থেকে মুখ তুলে চাইতেই তাঁর চোখ পড়ে গেল অরুর হাতের দিকে।

অরু খুশিতে উছলে উঠে বলল, “আমি ফার্স্ট হয়েছি বলে দাদু এই সাদা পায়রাটা আমায় দিয়েছে।”

বাবার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল।

অরু হাসতে হাসতেই বলল, “এই পায়রাটা নিয়ে আমি একটা দারুণ ম্যাজিক দেখাব তোমাদের। দাদু হবে আমার সঙ্গী। আমার খেলা দেখলে তোমরা অবাক হয়ে যাবে।”

হঠাৎ বাবা গম্ভীর গলায় বলে উঠলেন, “পায়রাটা যেখান থেকে কিনেছেন, দাদুকে সেখানে ফেরত দিয়ে আসতে বলো।”

“কেন?”

“এখন তুমি উঁচু ক্লাসে উঠেছ। তোমার আর খেলাধুলো করে সময় নষ্ট করা চলবে না।” বাবার গলা তেমনই গম্ভীর।

অরুর হাসি-খুশি মুখখানা নিমেষে মুষড়ে গেল। বলল, “উঁচু ক্লাসে উঠেছি তো কী হয়েছে!”

“অনেক বই পড়তে হবে। খেলাধুলোর সময় পাবে না।”

অরু উত্তর দিল, “আমি তো সারাদিন খেলা করছি না। শুধু বিকেলবেলা খেলি। আর এই ম্যাজিকের খেলাটা তো আমি বিকেলেই দেখাব।”

“বিকেলেও তোমায় খেলাধুলো বন্ধ করতে হবে।” বাবার গলায় যেন হুকুমের গর্জন।

“কেন?”

“বিকেলে তোমায় কোচিং ক্লাসে যেতে হবে। সেইরকম ব্যবস্থা হয়েছে।”

“না-আ-আ-আ।” আচমকা একটা ভীষণ চিৎকার করে উঠল অরু। সঙ্গে সঙ্গে তার হাত ফসকে জানলা গলে উড়ে গেল পায়রাটা আকাশে। অরুর চোখদুটি ছলছল করে উঠল। সে বাবার ঘর থেকে বেরিয়ে এল দ্রুত পায়ে। বাইরে, খোলা আকাশটার নীচে গিয়ে সে দাঁড়াল। তার মনে হল, বাবা যেন ওই আকাশটা কেড়ে নিল তার কাছ থেকে। তার এখন আকাশ দেখার সময় হবে না। ওই নীল আকাশ। ওই নীল আকাশের নীচে ছুটে-হেসে সে আর খেলা করতে পারবে না। ভয়ে তার সারা শরীর ঠকঠক করে কেঁপে উঠল। সে ফুঁপিয়ে উঠল। তার চোখ উপচে জল গড়াল গাল বেয়ে। তখনই সে দেখতে পেল সেই সাদা পায়রাটাকে। সাদা ঝলমলে ডানা ছড়িয়ে সে উড়ছে আকাশে। হয়তো সে ডাকছে অরুকে। হয়তো বলছে, এসো, এখানে আমার কাছে। এই নীলের স্বপ্নে কত আনন্দ, কত আলো। এসো! এসো! এসো!

কিন্তু অরু যাবে কেমন করে? তার তো পাখির মতো ডানা নেই! দুটি রং ঝলমল ডানা!

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%