শৈলেন ঘোষ

এ গল্প অনেক, অ-নে-ক দিন আগের হতে পারে,
অথবা কালকের,
হতে পারে আজকেরও।
এ গল্প চাঁদের। একটি ছোট্টছেলে। কিশোর।
সে থাকত তার মায়ের সঙ্গে। সেই সঙ্গে তার ছোট্টবোন চাঁদনি।
বাড়িটা তাদের পাহাড়ভাঙা পাথর দিয়ে তৈরি। ঝকঝকে তকতকে নিকনো। পেছনদিকে একটা পাঁচিল। বন-পাহারায় দাঁড়িয়ে আছে। ঘরের পুবে একটা জানলা। দক্ষিণে দুটো। বাড়িটা পাহাড়ের পায়ের কাছে। দাঁড়িয়ে। একা। চুপটি করে।
এধারে-ওধারে আরও বাড়ি একটি-দুটি।
এপারে-ওপারে আরও ক’টি।
হয়তো মনে হবে, বাড়ি নয়, ছবি।
চারদিকে যত সবুজ, ততই কঠিন পাথর। সেই পাথর ছলকে-ছড়িয়ে নেমে আসছে ঝরনা।
সে হয়তো একটু লাফায় পাথরে-পাথরে।
একটু নাচে নুড়িতে কাঁকরে।
অনেকটা ছোটে শিলায় উপলে।
তারপর ঝাঁপ দেয় খানিকটা ওপর থেকে,
অনেকটা নীচে, জলের স্রোতে, নদীতে।
এ নদী শব্দ বাজায় নূপুরের।
এ নদী মাদল বাজায় বর্ষায়। সেতার বাজায় শরতে।
বসন্তে ফুল ফোটে নদীর কূলে কূলে।
নয়তো, ওই পাহাড়ের ঢালুতে গড়ানে।
চাঁদ নামের সেই কিশোর ছেলে মেষ চরায়।
চাঁদনি, তার সেই ছোট্টবোন বই পড়ে ইস্কুলে।
মা তাদের ঘর গোছান। ঘরকন্নার কাজ করেন। এটা-ওটা রান্না করেন। তারপর, যেই দিন-বারোটার ঘণ্টা বাজবে, মেয়ে ফিরবে ইস্কুল থেকে। মেয়ে ভাত খাবে। ভাতের সঙ্গে ঝোল। ঝোলের সঙ্গে মাছ।
খাওয়া হলে চাঁদনি ছোটে দাদার কাছে। দাদা যেখানে মেষ চরায়, পাহাড়ের হুই-ই-ই ওপরে। সঙ্গে নেবে দাদার খাবার, পুঁটলি বাঁধা।
খাবার নিয়ে খানিকটা ছুটবে। খানিকটা হাঁটবে।
অনেকটা উঠবে। অনেকটা নামবে।
তার মাথার চুল বাতাস ছুঁয়ে উড়বে।
কানের দুল ফুল তুলতুল দুলবে।
পায়ের মল ঝনন-ঝনন বাজবে।
তারপর একটা ঝাঁকড়া দেবদারু গাছের ছায়ায় দাদাকে নিয়ে বসবে। খাবারের পুঁটলি খুলে ভাতের থালা সাজিয়ে দেবে। দাদা খাবে। গল্প করবে। খাওয়া হলে দাদা যখন একটু আয়েশ করবে, চাঁদনি তখন ছুটবে, ওই যেখানে মেষ চরছে সেখানে। সবচেয়ে ছোট্ট সেই যে মেষছানাটা, কী সুন্দর দেখতে তার সঙ্গে চাঁদনির যত ভাব। তার সঙ্গে খেলবে। কোলে নেবে। আর মনে মনে ভাববে, আহা রে, ছানাটা যেন কোনওদিন বড় না হয়!
দাদা যখন ইস্কুলে পড়ত, তখন বাবা-ই মেষ চরাতেন। দাদা তখন শিখে ফেলেছে আকাশের গল্প। শিখে ফেলেছে সূর্যের এত কেন তাপ, কেন একফালি চাঁদ একটি একটি দিন কাটলে একটু একটু বড় হয়। একটু একটু বড় হয় যত, কেন জ্যোৎস্নার আলো ততই অনেক অনেক আলো হয়ে ছড়িয়ে দেয় পাহাড়ে পাহাড়ে। বনে জঙ্গলে। নদীতে-সাগরে। মাঠে-প্রান্তরে।
কিংবা শিখে ফেলেছে চাঁদে মানুষ গেল কেমন করে।
বরফে ঢাকা কেন পৃথিবীর দুই প্রান্ত।
আমাজন জঙ্গলটা কোথায়, কোন দেশে।
কোথায় সাহারা মরুভূমি।
ডাইনাসোরের সন্ধান কেমন করে পেল মানুষ।
কোথায় আছে পিরামিড।
এমনই হাজারো গল্পের সত্যিকথা শিখছিল যখন, তখনই একদিন বাবা চলে গেলেন। তাদের ছেড়ে, পৃথিবী ছেড়ে। কোথায়? জানে না চাঁদনি। জানে তার দাদা চাঁদ। সবাই বলে সে জায়গাটার নাম স্বর্গ।
সেই থেকে বাবার কাজটা নিয়েছে চাঁদ। মেষ চরায়। পাহাড়ের ঢালে ঢালে।
ছোটবোন চাঁদনি ইস্কুলে যায়।
চাঁদের ইচ্ছে ছিল অনেক পড়বে সে নিজে। হয়নি।
এখন ইচ্ছে তার, অনেক পড়াবে বোনকে।
সে অনেকগুলো পাশ করবে। অনেক শিখে, দাদাকে অনেক গল্প বলবে। দাদা যেমন গল্প বলে বোনকে, এখনও একা একা, ঘুম ঘুম রাতে। কী ভালই না বাসে চাঁদ বোনকে।
দাদার কাছেই তো শুনেছে চাঁদনি, জ্বলন্ত আগুনের মতো একদিন তপ্ত ছিল এই পৃথিবী। ছেয়ে ছিল ঘন জমাট মেঘ। তারপর, একদিন পৃথিবীর জ্বলন্ত তাপ ধীরে ধীরে জুড়িয়ে এল তখন সেই জমাট মেঘ থেকে শুরু হল বৃষ্টি ঝরন। একদিন নয়, দু’দিন নয়, বষ্টি ঝরল ষাট হাজার বছর ধরে। এক নাগাড়ে।
সৃষ্টি হল সমুদ্রের।
শুধুই অন্ধকার সমুদ্রের গভীরে। সেই গভীরে আছে কত কী:
কোথাও পাহাড় সারি-সারি।
কোথাও বা খাদ ভয়ংকর, পাহাড়ের।
কোথাও সমতলভূমি।
কত প্রবাল। কত রং।
পৃথিবীর সবচেয়ে বিশাল যে প্রাণী, তার তো বাসা এই সমুদ্রেই। তার নাম তিমি। সে তিমির গায়ে ছড়ানো নীল, শুধুই নীল।
এসব গল্প যতই শোনে কোনও দাদার কাছে, ততই তার মন বলে আরও শুনি। আরও গল্প। অনেক গল্প।
কিন্তু হায়, হায়, একদিন থমকে গেল তার গল্প শোনা! ওই মস্ত আকাশটা যেন ভেঙে পড়ল চাঁদনির মাথার ওপর, আচমকা।
কেমন যেন অন্ধকার হয়ে গেল সারা পৃথিবী চাঁদনির চোখে।
সে চিৎকার করে উঠেছিল সেদিন তারস্বরে পাহাড়ের ওই ভয়ংকর খাদটার দিকে ঝুঁকে পড়ে।
তারপর সব নিস্তব্ধ!
কেন, কী হল তার? ছোট্ট মেয়ে চাঁদনির?
সেই কথাই শোনো তা হলে;
সেদিনও চাঁদনি ইস্কুল থেকে ফিরে, দাদার জন্যে খাবার নিয়ে ছুটেছিল পাহাড়ে।
সেদিনও তার মাথার চুল উড়েছিল এলোমেলো।
তার পায়ের মল বেজেছিল ঝনন-ঝনন।
সেদিনও দাদা বসেছিল ঝাঁকড়া দেবদারু গাছটার ছায়ায়।
চাঁদনি সাজিয়ে দিয়েছিল খাবারের থালা দাদার সামনে।
মেষগুলো চরছিল আপনমনে এধারে-ওধারে।
কোথাও ঘাস, বুনোগাছ চিবোচ্ছিল ছিঁড়ে ছিঁড়ে।

তক্ষুনি সেই পুঁচকে সাদা-ধবধবে মেষছানাটা দেখতে পেয়েছিল চাঁদনিকে।
ছুটে এসেছিল তুড়ুক-তুড়ুক পা ফেলে।
ঝাঁপ দিয়েছিল চাঁদনির কোলে।
জড়িয়ে ধরেছিল চাঁদনি পুঁচকেটাকে।
আদর করেছিল কোলে নিয়ে। চুমো দিয়েছিল কপালে।
তারপর পুঁচকেটা কোল থেকে লাফিয়ে পড়েছিল। ছুট দিয়েছিল।
যেন বলছিল, “আমায় ধরতে পারে না!”
পুঁচকেটা এ পাথরে লাফায়, ও পাথরে।
এ গাছে লুকোয়, ও গাছে।
এদিকে নামে ওদিকে।
চাঁদনিও ছাড়ে না। খোঁজে এখানে, নয়তো ওখানে।
এদিকে ওঠে, না-হয় ওদিকে।
উঠতে উঠতে উঠতে কত দূরে উঠে যায়।
ছুটতে ছুটতে ছুটতে কত দূরে ছুটে যায়।
পুঁচকেটাকে হাঁক পেড়ে ডাকে চাঁদনি।
পুঁচকেটা শুনবে না, খেলবে, আরও অনেকক্ষণ।
উঠবে পাহাড়ের আরও ওপরে অনেকটা।
আর, ঠিক তক্ষুনি আচমকা ঘটল সেই সর্বনাশ!
মেষছানাটা পড়ল পা পিছলে নীচে।
পড়তে
পড়তে
পড়তে
অনেক নীচে। গভীর খাদে।
চিৎকার করে উঠল চাঁদনি, “দাদা-আ-আ-আ!”
মিলিয়ে গেল সেই চিৎকার অন্ধকার খাদে পাক খেতে খেতে।
তারপর আর কোনও শব্দ নেই। না চাঁদনির মুখে, না গহ্বরের অন্ধকারের আনাচে-কানাচে।
দাদা ছুটে এসেছিল হন্তদন্ত হয়ে। জিজ্ঞেস করেছিল ব্যস্ত গলায়, “কী হল?”
বোন তার উত্তর দিতে পারল না। চেয়ে রইল ভয়মাখানো চোখে অন্ধকার সেই খাদের গর্তে। না হয় দাদার মুখের দিকে।
সে যেন বোবা।
তার দু’চোখ উপচে জল গড়ায়।
দাদা অবাক হয়ে আবার জিজ্ঞেস করে, “কাঁদছিস কেন তুই? কী হল?”
তবু মুখে নেই কথা চাঁদনির! মুখ তার ছমছম। চোখ তার ছলছল।
“কী হল? কী হল বোন? কী হয়েছে?” আকুল গলা চাঁদের। ব্যাকুল হয়ে বোনের চিবুক ছোঁয়।
বোন কান্নায় ভেঙে পড়ে। বলতে পারে না, তার আদরের মেষছানাটা পড়ে গেছে খাদে। শুধু সে আঙুল দেখায়, নীচে ওই খাদের অন্ধকারের দিকে।
বুঝতে পারল, বোধ হয়, চাঁদ তার আঙুলের ইশারায়। বুঝতে পারল, তার আদরের মেষছানা খাদে পড়ে গেছে। তাই সে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, “কেমন করে?”
কিন্তু হায়! চাঁদনি কাঁদতে পারছে, কিন্তু বলতে পারছে না। তার চোখে জল ঝরছে, কিন্তু মুখে শব্দ সরছে না। থমকে গেছে গলার স্বর।
তবে কি চাঁদনি সত্যি সত্যি বোবা হয়ে গেল? ভুলে গেল কথা বলতে তার ভালবাসার মেষছানার জন্যে!
এ কী ভীষণ কথা!
হ্যাঁ, এই ভীষণ কথাই সত্যিকথা। সত্যিই ভুলে গেছে চাঁদনি কথা বলতে। সে শুধু ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকে শূন্য চোখে। দাদার শত চেষ্টা বৃথা হয়ে যায়। মায়ের চোখের জল মিথ্যে হয়ে যায়। মা কতদিন কতবার বুকে জড়িয়ে আদর করেছেন মেয়েকে। মেয়ের ঠোঁট দুটি থিরথির করে কেঁপেছে খালি। চোখদুটি ভিজেছে কান্নায়। তবু শব্দ নেই। কান্নাও যেন বোবা হয়ে গেছে তার!
এ কী সর্বনাশ!
মা কান্নাভাঙা গলায় বলেন, “কী হবে চাঁদ?”
ছেলে পাগলের মতো ছুটে বেড়ায় এর কাছে, তার কাছে। মিনতি করে বলে, “দাও দাও, বলে দাও, কেমন করে ফিরে আসবে আবার আমার বোনের গলার শব্দ!”
কেউ পারে না, কেউ না, বলতে।
কোনও দিনও কেউ পারল না।
বোনের জন্যে ভুলে গেল চাঁদ নাওয়া-খাওয়া। পথে পথে ছুটে বেড়ায়। বেগোছ পোশাক। ক্লান্ত পা। যখন হোঁচট খায় বসে পড়ে। নদীর ধারে, না হয় গাছের নীচে।
এমনই করে একদিন সে বসে ছিল সারা গায়ে ঘাম মেখে। গাছের গায়ে গা ঠেকিয়ে।
হাওয়া বইছে গাছের পাতায় ঝমঝমিয়ে।
নদী বইছে পাহাড় উছল ঝরঝরিয়ে।
আনমনা চাঁদ কোন মনে যেন কী ভাবছে।
এমন সময় কে যেন ডাক দিল আচমকা, “কীরে ছেলে, অমন অন্যমনে বসে আছিস কেন এসময়ে এখানে? কী ভাবছিস?”
চমকে ওঠে চাঁদ। যেমন চমকে ওঠে স্থির জলের ঝিল ইটের আঘাতে তরঙ্গ তুলে।
চাঁদ চোখ তোলে। দেখে, একজন অচেনা মানুষ। সামনে দাঁড়িয়ে। তাঁর মুখে হাসি। বলেন, “আমি মুসাফির। দেশে-দেশে ঘুরে বেড়াই। মাটি আর মানুষ চিনে বেড়াই। পৃথিবীর বন্ধু আমি। তোরও।” বলতে বলতে লোকটি বসলেন চাঁদের পাশে। আবার জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে বাবা, তোর? কেন তুই বিষন্নমুখে বসে আছিস?”
উত্তর দিল চাঁদ, “হে মুসাফির, তুমি পথে পথে ঘুরে বেড়াও। একা। আমার দুঃখের কথা শোনালে, তুমি দুঃখ পাবে।”
মুসাফির বললেন, “এমনও তো হতে পারে, আমি দুঃখ পেলেও তোর দুঃখ দূর করার পথ বলে দিতে পারি।”
যেন চমক ভাঙে চাঁদের। অস্থির হয়ে জিজ্ঞেস করে, “তুমি? পারবে? কেউ-ই তো পারেনি।”
“চেষ্টা করতে পারি।” তাঁর উত্তর।
“যদি পারো মুসাফির, তোমার কাছে আমি চিরঋণী থাকব।” বলতে বলতে চাঁদের দুটি হাত যেন জোড় হয়ে যায়।
মুসাফির আবার হাসলেন, মৃদু। জিজ্ঞেস করলেন, “কী হয়েছে শুনি?”
“আমার ছোট্ট বোনের মুখের কথা হারিয়ে গেছে।” বলতে গিয়ে চোখ ভিজে যায় চাঁদের।
“কেমন করে?” মুসাফির চমকে ওঠেন।
“তার খেলার সাথী মেষছানা গভীর খাদে পড়ে যায়। প্রাণটাও যায়। সেই দুঃখে তার কথাও হারায়।”
চাঁদের কথা শুনে পৃথিবীর সেই বন্ধু মুসাফির থমকে গেলেন। তাঁরও মুখে কথা নেই। চোখেও পলক নেই। তাঁর দৃঢ় হাতের শান্ত ছোঁয়া চাঁদের মাথায় ছড়িয়ে পড়ল।
তিনি অস্ফুট স্বরে বললেন, “আমি তো জানি না, এই ভয়ংকর বিপদ থেকে কেমন করে মুক্তি পাবে তোর বোন। সত্যি বলতে কী, সময় ছাড়া জানেই বা কে সে কথা!”
“সময়!” মুসাফিরের কথা শুনে কেমন যেন থতমত খেয়ে যায় চাঁদ। তারপর জিজ্ঞেস করে, “সময় মানে?”
উত্তর দিলেন মুসাফির, “মানে বলা ভারী মুশকিল। কেননা :
সময় যে এক মস্ত ধন্ধ!
কখন যে ভাল, কখন মন্দ,
কখন সে আলো, কখন ছন্দ,
কখন শান্তি, কখন দ্বন্দ্ব,
তার জানা সব, আমরা অন্ধ!”
“হে মুসাফির, তুমি যখন এত জানো, তবে নিশ্চয়ই এও জানো কোথায় থাকে? বলো, কোথায় গেলে তার দেখা পাব?” ব্যাকুল হল চাঁদ।
“কঠিন প্রশ্ন। শক্ত বলা।” জবাব দিলেন মুসাফির,
“তার আভাস পাওয়া যায়, দেখা পাওয়া যায় না।
সে তোর সঙ্গে আছে, আমার সঙ্গেও।
সে পাহাড়ে আছে, নদীতে আছে।
সাগরে আছে, আকাশেও আছে।
সূর্যে আছে, চাঁদেও আছে।
আলোতে আছে, আঁধারে আছে।
এমনকী, মরুতে আছে, বনেও।
এমনই যে সময়, যার আভাস পাওয়া যায় অথচ দেখা পাওয়া যায় না, তুই কোথায় গেলে তার দেখা পাবি, আমি কেমন করে বলব!”
“তোমার যদি জানা না-থাকে মুসাফির, তবে তাকে আমি একাই খুঁজে বেড়াব। আমার বোনের জন্যে আমি সারা রাজ্য তোলপাড় করে ফেলব সময়ের খোঁজে। তার মুখে যদি কথা ফিরিয়ে আনতে না পারি, তবে আর ফিরব না কোনওদিন বাড়িতে। এই আমার প্রতিজ্ঞা। দরকার নেই আমার কোনও সঙ্গীর, আমি একাই পারব।” ওই পাহাড়ের পাথরের মতো কঠিন চাঁদের গলার স্বর মুসাফিরের কানে পৌঁছে গেল।
মুসাফির চমকে তাকালেন চাঁদের চোখের দিকে। সে-চোখ প্রতিজ্ঞায় ঝলকানো। সেই চোখের দিকে তাকিয়েই মুসাফির জিজ্ঞেস করলেন, “আমি যদি তোর সঙ্গী হতে চাই, আমাকে তুই সঙ্গে নিবি না?”
“মুসাফির-র-র!” হঠাৎ খুশিতে চিৎকার করে উঠল চাঁদ। তারপর মুসাফিরের হাত জড়িয়ে ধরল। চলল সেই মস্ত মানুষ মুসাফির, ছোট্ট মানুষ চাঁদের হাত ধরে সময়ের খোঁজে।

তারা নদী পেরোল।
কত পাহাড় টপকাল।
বনে-বনে পা ফেলল।
কত সময় কেটে গেল, কিন্তু সময় নামের হাত-পা-অলা কোনও জীবকেই তারা খুঁজে পেল না।
তারপর একদিন তারা অনেকটা হাঁটল। একটু জিরিয়ে না নিলে আরও অনেকটা হাঁটা যাবে না। তাই মুসাফির বললেন, “আয়, একটু গাছের ছায়ায় বসি।”
চাঁদ উত্তর দিল, “আমার কষ্ট হচ্ছে না, আমি কিন্তু পারছি।”
মুসাফির বললেন, “তুই তো পারবিই। কেন না, তুই যে এখনও ছোট্ট আছিস। সময় ছুটছে। সময়ের সঙ্গে আমারও বয়েস হচ্ছে। তুইও কিশোর হয়েছিস। সবই সেই সময়ের জাদুখেলা। বুঝলি?”
“জাদু!” অবাক হল চাঁদ। জিজ্ঞেস করল, “সময়ও জাদু জানে?”
“আলবত! ইচ্ছে করলে সময় এক্ষুনি তার জাদুর জোরে সব ওলট-পালট করে দিতে পারে। সময় হলেই ভূমিকম্প, সময় হলেই অগ্ন্যুৎপাত, সময় হলেই ঝড়-বৃষ্টি। সময় হলেই জন্ম, না-হয় বিনাশ।”
মুসাফিরের কথার মাঝেই চাঁদ চিৎকার করে উঠল, “ওই দ্যাখো মুসাফির, একটু দূরে, একটা ঘোড়া কেমন ছুটে ছুটে পাক খাচ্ছে।”
মুসাফিরও দেখতে পেয়েছেন। বলে উঠেছেন, “হ্যা তো রে! ঘোড়ার মালিক কই? দেখতে পাচ্ছি না তো!”
“চলো না, এগিয়ে যাই দেখি মালিক আছে কি না।”
“ঠিক বলেছিস চ। যদি মালিককে দেখতে পাই বলব ঘোড়াটা ধার দিতে। ঘোড়ার পিঠে বসে খুঁজে বেড়াব সময়কে। তখন আর কষ্ট করে হাঁটতে হবে না আমাদের।” বলে মুসাফিরও চলল চাঁদের সঙ্গে ছুটন্ত ঘোড়ার দিকে।
কিন্তু তার কাছে আর যেতে হল না। একটু যেতেই ঘোড়া দেখতে পেয়েছে তাদের। দিল ছুট সামনের দিকে। মুসাফির চেঁচিয়ে উঠলেন, “ঘোড়াটা পালাচ্ছে রে!”
চাঁদ উত্তর দিল, “মুসাফির, তুমি এখানে দাঁড়াও। আমি ধরে আনছি।”
মুসাফির দাঁড়িয়ে রইলেন।
চাঁদ ছুটল।
ঘোড়া ছোটে যত দ্রুত, চঁদ পারে না ছুটতে তত।
ঘোড়া যত এগিয়ে যায়, চাঁদও তত পিছিয়ে পড়ে।
ছুটতে ছুটতে চাঁদ হাঁক পাড়ে :
এই ঘোড়া, তুই দাঁড়া দাঁড়া!
ঘোড়ার তাতে নেইকো সাড়া।
এই ঘোড়া তুই লক্ষ্মী সোনা!
ছুটল ঘোড়া অন্যমনা।
এই ঘোড়া তুই একটু থাম!
থামবার তার নেইকো নাম।
শেষমেশ চাঁদ থমকে যায়,
অবাক চোখে সামনে তাকায়!
চাঁদ সামনে তাকিয়ে দেখে ঘোড়াটা অন্ধকারে একটা গুহার মধ্যে হারিয়ে গেল। পিছনে তাকিয়ে দেখে মুসাফিরও নেই চোখের কাছে।
তবে কি ঘোড়ার পিছু ছুটতে ছুটতে অনেক দূরে চলে এসেছে চাঁদ? সামনে কোনও লোক নেই, জন নেই। সুনসান নির্জন চারদিক। শুধু বাতাস বইছে শোঁ শোঁ একটানা।
এ পথ কোন পথ জানা নেই।
এ দেশ কোন দেশ চেনা নেই।
তাই সে দাঁড়িয়ে থাকে গুহার সামনে।
মন বলে, তাই তো এবার সে করবে কী!
এমন সময়ে হঠাৎ চাঁদের খেয়াল হল, সত্যি তো, এই আঁধার ঘেরা গুহার ভেতরে কোথায় গেল ঘোড়াটা অনায়াসে!
তবে কি গুহার সামনে আঁধার,
অন্দরে আলো ঝলমল!
তবে কি আলোর ভেতরে কেউ বাস করে?
সে কি ঘোড়ার মালিক? না, অন্য কেউ?
চাঁদ ভাবল, তার যখন চেনা নেই কিচ্ছু, সামনে কি পিচ্ছু, তখন, গুহার ভেতরেই সে যাবে। যাবে বলেই সে পা ফেলল।
অন্ধকার। ঘুরঘুট্টি। সেই ঘুরঘুট্টি হাতড়ে-সাঁতরে সে এগিয়ে চলল। যত যায় ততই আঁধার। যত যায় চোখ তার হারায় ধাঁধায়। কোথাও তার কপালে আঘাত লাগে আচকা, পাথরে। কোথাও পায়ে ঠোক্কর লাগে ইতিউতি কাঁকরে।
এমনই করে যেতে যেতে হঠাৎ তার কানে এল কে যেন নিশ্বেস ফেলছে ঘনঘন। সেই নিশ্বেস তার গায়ে লাগে। এমন সময় হঠাৎ যেন কে গর্জন করে ওঠে, “কে তুই, আমার ডেরায় ঢুকেছিস?”
জমাট অন্ধকারে তার সেই গর্জন প্রতিধ্বনি তোলে গমগম করে। কাঁপে।
শিউরে ওঠে চাঁদ। কথা সরে না মুখে। আনিমানি করে সে শুধু অন্ধকার হাতড়ায়।
আবার সে গর্জে উঠল, “তুই কি বোবা? না কালা? আমায় ভাবছিস বুঝি আমি কেউ তুচ্ছ? তাই গ্রাহ্য করছিস না?”
এবার চাঁদ কথা কইল। গলা কাঁপল, “কার সঙ্গে কথা বলব? তোমার মুখও দেখি না, চোখও দেখি না। হাতও দেখি না, পাও দেখি না। ধড়ও দেখি না, মাথাও দেখি না। শুধু তোমার গলার শব্দ শুনি।”
সে বলল, “তুই কি কোনওদিন বাতাসের হাত-পা দেখেছিস?”
“দেখিনি বটে, কিন্তু বাতাস আমাদের নিশ্বেস দেয়। আমরা বেঁচে থাকি।” উত্তর দিল চাঁদ।
“তুই কি কোনওদিন আলোর ধড়-মাথা দেখেছিস?”
“তাও দেখিনি, কিন্তু আলোর বাহার দেখেছি। তার আভায় আমাদের চোখ ভরে যায়।”
তখন সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে গলায় বিকট শব্দ করে কে যেন বলে উঠল, ‘হ্যাঁ, ঠিক কথা, আমার কোনও বাহার নেই। আমারও কোনও আভা কারও চোখে কোনওদিন আলো ছড়িয়ে দেয় না। আমারও কোনও হাত নেই, পা নেই। ধড় নেই, মাথা নেই। কেন না, আমার নাম অন্ধকার। সময় হলে, আলো যেমন সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়ে, তেমনই সময় হলে আলো নিভে যায়, আমিও জড়িয়ে ধরি পৃথিবীকে অন্ধকারে। এবার উত্তর দে, তুই কেন এসেছিস এখানে?”
চাঁদ উত্তর দিল, “ওই যে তুমি সময়ের কথা বললে, সেই সময়ের খোঁজে।”
অন্ধকার তেমনই গলায় গমক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “অদ্ভুত কথা শুনি তোর মুখে! সময়কে খুঁজে বেড়াচ্ছিস! কেন শুনি?”
“আমার বোন কথা বলতে ভুলে গেছে। অনেক চেষ্টা করেও তার মুখে কথা ফোটাতে পারিনি। একজন মুসাফির মানুষ বলেছেন, একমাত্র সময়ই জানে আমার বোন আর কথা বলতে পারবে কি না। তাই আমি সময়কে খুঁজে বেড়াচ্ছি। খুঁজতে খুঁজতে একটা অদ্ভুত কাণ্ড দেখতে পেলুম। দেখলুম, একটা ঘোড়া একা একা পাক খেয়ে ছুটছিল। আমি তার কাছে আসতেই, ঘোড়া এই গুহার মধ্যে ঢুকে পড়ল।”
চাঁদের কথা শুনে আচমকা চিৎকার করে উঠল অন্ধকার। তার চিৎকার শুনে মনে হল, যেন আকাশ থেকে বাজ পড়ল। সে বলল, “তোকে আমি আর ছাড়ব না। তুই চোর।”
চোর বলতেই প্রতিবাদ করে উঠল চাঁদ। ক্ষিপ্ত গলায় উত্তর দিল, “সাবধান, কে বলেছে আমি চোর! আর একবার বলো, আমি তোমায় দেখে নেব!”
অন্ধকারও কড়কে উঠল, “তোর তো ভারী তেজ দেখি! কী দেখবি আমার? তুই তো একটা পুঁচকে ছেলে! আমার অন্ধকারে ঘুরপাক খাইয়ে তোকে শেষ করে ফেলব। তুই চোর না হলে কেমন করে সন্ধান পাস ঘোড়ার। তোকে নিশ্চয়ই কেউ বলেছে, ওই ঘোড়াটা সময়ের রথ টানে।”
ধক করে কেঁপে উঠল চাঁদের বুক অন্ধকারের ওই কথা শুনে। তার মুখ দিয়ে অদ্ভুত একটা শব্দ বেরিয়ে এল, অনেকটা আনন্দে। অনেকটা উত্তেজনায়। সে গলা ফাটিয়ে বলে উঠল, “তবে তো ওই ঘোড়াটা আমার চাই-ই চাই!”
অন্ধকারটা যেন কেঁপে উঠল থরথর করে চাঁদের কথা শুনে। সে হুংকার ছাড়ল, “তোর স্পর্ধা তো কম নয়। সময়ের ওই ঘোড়া আমার আশ্রয়ে থাকে। আমি তাকে রক্ষা করি। আমি তার অন্ধকার-প্রহরী।”
অন্ধকারের কথা শুনে চাঁদের গলাও কঠোর হল। বলল, “তুমি প্রহরী হও, আর রক্ষকই হও, সময়ের ওই রথের ঘোড়াকে আমি ধরবই। যেমন করে তোক সময়ের দেখা আমায় পেতেই হবে।”
অন্ধকার ক্ষিপ্ত গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “আমার এই জমাট কালো আঁধারে তোর গলাটা জাপটে ধরব আমি। দম ফেটে তুই মরবি।”
“আমার বোনের জন্যে আমাকে যদি মরতে হয়, আমি হাসতে হাসতে মরতে রাজি।” উত্তর দিল চাঁদ। তারপর আবার বলল, “আমার যতক্ষণ প্রাণ আছে, ততক্ষণ কেউ আমায় রুখতে পারবে না। তোমার ওই জমাট অন্ধকার আমি খান খান করে ঘোড়ার তল্লাশি করব।”
“কর দেখি!” বলে আবার গর্জন করে উঠল অন্ধকার।
সঙ্গে সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল চাঁদ, “এই দ্যাখো!” বলে সে অন্ধকার গুহার মধ্যে এলোপাথাড়ি হাত-পা ছুড়তে লাগল।
অন্ধকার আরও জমাট বাধে।
চাঁদের বুকে দুরন্ত তেজ। চাঁদ অন্ধকার টপকায় একপা একপা করে।
অন্ধকার চাঁদকে আটকায় আরও জমাট হয়ে।
চলল লড়াই তুমুল। কতক্ষণ যে চলল সেই তুমুল লড়াই কে জানে! হয়তো একটা গোটা রাত। লড়তে লড়তে চাঁদ হয়তো পৌঁছে গেছল গুহার কিনারে। সেই কিনারে হঠাৎ দেখা গেল আলোর আভাস। দেখতে পেল, ভোরের আকাশ। ততক্ষণে অন্ধকার রণে ভঙ্গ দিয়ে ঢুকে পড়েছে গুহার গর্তে। আনন্দে দু’হাত তুলে লাফিয়ে উঠল চাঁদ। কিন্তু ঘোড়া? ঘোড়া কই? তাকে তো দেখা গেল না আর।
চাঁদ দেখতে পেল এক ভোরের বাগান। সবুজ গাছ। রঙিন ফুল। অনেক পাখি। অনেক গান। তার মুগ্ধ চোখ তাই দেখে। তারপর সে সবুজ গাছকে বলে, ‘ও গাছ, তুমি জানো, কোথায় আছে সময়ের ঘোড়া?’
গাছ বোবা।
তারপর সে রঙিন ফুলকে বলে, ‘ও ফুল, তুমি জানো, কোথায় লুকোয় সময়ের ঘোড়া?’
ফুলও বোবা।
তারপর সে পাখিকে বলে, ‘ও পাখি, তুমি কি জানো কোথায় পালাল সময়ের ঘোড়া?’
সেই পাখি শূন্যে উড়ে উড়ে তার মাথায় পাক খায়। সেই পাখি উড়ল বলে অসংখ্য পাখি হাজির হল শূন্যে। তার মাথার ওপর ডানা ছড়িয়ে তারাও উড়তে লাগল। আকাশভর্তি সে বুঝি খুশির রং খেলা? না রং মেলা?
না, সে খেলাও নয়, মেলাও নয়। পাখিরা সামনে দিকে উড়ে যায় যতটা, ফিরে আসে ততটা।
চাঁদ ভাবে, তাই তো এমন করে কেন পাখিগুলো! তবে কি তারা ডাকছে চাঁদকে! পাখিরা কি ঘোড়ার সন্ধান জানে। ‘দেখি তো,’ বলে চাঁদ আকাশে পাখির উড়ন দেখে, আর দেখতে দেখতে ছোটে।
ছুটতে ছুটতে ছুটতে অনেকটা দূরে এসে হঠাৎ চমকে ওঠে। থমকে দাঁড়ায়। কেন? সে বুঝি দেখতে পেয়েছে ঘোড়াটাকে?
না, ঘোড়া নয়। চাঁদের নজরে পড়ল আহত এক পাখি ময়না। তার ডানায় রক্ত। কে বুঝি মেরেছে তাকে তির দিয়ে! না হয় ইট দিয়ে। ছটফট করছে যন্ত্রণায়!
চাঁদ তাকে তুলে নিল দু’হাত বাড়িয়ে। সামনেই সায়র। পাখির মুখে দিল জল। মুছে দিল রক্ত। তার নরম তুলতুলে গায়ে হাত বুলিয়ে ভাবল, কেমন করে বাঁচাবে সে পাখিকে? যাবে সে কোথায়?
ভাবতে ভাবতে যখন সে কূলকিনারা খুঁজে পায় না, তখন সে চিৎকার করে ওঠে, “মুসাফির-র-র-র!”
আবার নিস্তব্ধ।
শব্দের পর শব্দ। নিস্তব্ধের পর নিস্তব্ধ।
তারপর আচমকা নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে এল কানে ঘোড়ার খুরের টগবগানি। চনমন করে ওঠে চাঁদ। বুকে জড়িয়ে ধরে পাখিকে। চকিতে তাকায় সামনে। এ কী! এ যে সেই সময়ের রথের ঘোড়া! ছুটে আসছে তারই দিকে। ঘোড়া এসে থামল চাঁদেরই সামনে। চিৎকার করে উঠল, চিঁ-হিঁ-হিঁ!
চাঁদ তার গায়ে হাত দিল। কাতর গলায় বলল, “ও ঘোড়া, সময় বয়ে যাওয়ার আগে তুই আমায় নিয়ে চ’ সময়ের কাছে। এ পাখির প্রাণ বাঁচাতে হবে আমায়। সময়ের কাছে আমি পাখির প্রাণ চাইব।”
ঘোড়া আবার চিৎকার করে উঠল, চিঁ-হিঁ-হিঁ! তারপর চাঁদকে পিঠে নিয়ে তিরবেগে ছুট দিল।
সময়ের ঘোড়া ছুটছে।
পাখির প্রাণ ধুকধুক করছে।
চাঁদ আকুল হয়ে বলে, “ঘোড়া, তুই কদম পায়ে ছোট। পাখির সময় যে ফুরিয়ে আসছে।”
ঘোড়া কদম পায়ে ছুটল।
কিন্তু এ কোথায় ছুটে যায় ঘোড়া! এ পথ যে চাঁদের চেনা পথ! এ পথ যে তার ঘরের পথ! ওই তো দেখা যাচ্ছে পাহাড়টা, যেখানে সে মেষ চরায়! ওই তো দেখা যাচ্ছে নদী! দেখা যাচ্ছে ঝরনা! ওই তো তাদের ছোট্ট বাড়িটা। দেখতে দেখতে বাড়ির কাছেই এল ঘোড়া। কোথায়? ঘোড়া তো তাকে সময়ের কাছে নিয়ে গেল না! তবে কি এখানেই কোথাও সময় আছে? আছে তাদের বাড়িতে?
দেখতে দেখতে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়ল চাঁদ। ছুটতে ছুটতে পৌঁছে গেল বার-দরজার কাছাকাছি। চেঁচিয়ে ডাকল, “মা-আ-আ!” ডাকল, “চাঁদনি-ই-ই!”
খুলে গেল দরজা।
সামনে দাঁড়িয়ে চাঁদনি।
ছুটে এলেন মা। জিজ্ঞেস করলেন, “কোথা ছিলি বাবা তুই এতদিন? আমি ভেবে মরি। চাঁদনি কেঁদে সারা। ওটা কী তোর হাতে?”
“একটা পাখি, আহত ময়না।”
অবাক চোখে তাকিয়ে ছিল চাঁদনি। নিশ্বেস ফেলছিল ঘন-ঘন। নিমেষে দাদার হাত থেকে নিজের হাতে তুলে নিল পাখিটা। এ পাখি সাদা নয়, লাল নয়, ঘন নীল। তার ডানায় রক্ত দেখে আকুল হল চাঁদনি। মুখে কথা ফুটল না। ছুটে গেল সে ব্যস্ত পায়ে ঘরের ভেতর।
সেদিন চাঁদনি সারাক্ষণ পাখির ডানার রক্ত মুছল।
পরদিন সে পাখির ডানার ক্ষতে বন-ওষুধের প্রলেপ দিল।
তারপর দিন একটু-একটু ডানা নাড়ল পাখি।
পরের পরের দিন পাখিকে আলতো ছুঁয়ে, হাতে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল চাঁদনি খোলা আকাশের নীচে।
আকাশের আলোয় একটু-একটু লাফ মারল পাখি। একটু একটু লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে কাঁধে উঠল চাঁদনির। না-হয় মুখের কাছে ঠোঁট ঠেকিয়ে আদর করল খানিক। তারপর পাখি ফুড়ুত করে উড়ে বসল পাইন গাছটার ডালে। তারপর আবার উড়ে এল চাঁদনির কাছে। চাঁদনির গালে ঠোঁট ঠেকাল। তারপর আকাশে, আলোতে লুটোপুটি খেতে খেতে হাওয়ায় ডানা ছড়িয়ে দিল পাখি।
আনন্দে হাততালি দিয়ে উঠল চাঁদনি।
আচমকা চেঁচিয়ে উঠল চাঁদনি, “মা-আ-আ! দাদা-আ-আ?”
এ কী, চাঁদনি যে ফিরে পেয়েছে কথা!
ছুটে এলেন মা। ছুটে এল দাদা।
চাঁদনিকে জড়িয়ে ধরলেন মা।
কেঁদে ফেলল চাঁদনি। কেঁদে ফেললেন মা।
কিন্তু দাদা? দাদা কাঁদল না। আজ চিৎকার করে হাসল। হাসতে হাসতে ভাবল, এরই নাম বুঝি সময়ের জাদুখেলা!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন