রুমঝুম নূপুরের রূপকথা

শৈলেন ঘোষ

সে কতদিন আগের কথা।

এক যে ছিল ছোট্ট নদী, রূপসী। রূপসীর এপারে-ওপারে কত গাছগাছালি। যত আলো, তত ছায়া। যত ফুল, তত মৌমাছি। হালকা হাওয়ার ছোঁয়া। গাছের পাতায় নাচন, পাতার ফাঁকে পাখি। পাখিরা ফুড়ুত ফুড়ুত উড়ে বেড়ায় আর গান গায়।

রূপসী তখন কী করে?

খুশিতে উছলে উঠে ঢেউ তোলে। ধীরি-ধীরি নাচে। ঝিরি-ঝিরি বয়ে যায়।

এই রূপসী নদীর তীরে ঘর বেঁধেছিল এক বীণ-বাজিয়ে আর তার বউ। তাদের ছিল একটি ছোট্ট মেয়ে। যেমন মিষ্টি মুখখানি তার, তেমনই দৃষ্টি চোখের তারায়। কী তার রূপ! হয়তো এমনই রূপ দেখে ওই বীণ বাজিয়ে আর তার বউ মেয়ের নাম রেখেছিল ওই নদীর নামে, রূপসী।

রূপসী এখন ছোট্ট। নীল আকাশে সপ্তঋষি যেমন সাতটি তারার আলো জ্বেলে ঝিকমিক করছে, তেমনই মেয়েও তাদের সাতটি বছরে পা দিয়ে খুশির আলোয় ঝলমল করছে।

বীণ-বাজিয়ে আর তার বউয়েরও যে এখন অনেক বয়স হয়েছে, তেমন না। বীণার তারে বীণ-বাজিয়ের আঙুলগুলি এখনও ঝড়ের মতো দুরন্ত বেগে ঝমঝমিয়ে বেজে ওঠে। সেই বাজনার তালে তালে ছোট্ট দুটি পা মিলিয়ে মেয়েও তার নেচে ওঠে। দেখে দেখে বউও হেসে ওঠে। ভারী সুখী তারা। অথচ তাদের যে অঢেল পয়সা আছে, তেমন না। বীণ-বাজিয়ে বীণা বাজায়। খুশি হয়ে যে যা দেয়, তাতেই তাদের চলে যায়। কী সুন্দর পরিপাটি করে ঘরখানি সাজিয়ে রেখেছে তার বউ। সে-ঘরে যেমন যত্ন, তেমনই আনন্দ। ওই বীণার সুরের মতো সেই ঘর খুশিতে ঝলমল।

এমনি করে তাদের দিন কাটে।

এমনি করে বীণ-বাজিয়ে বীণার তারে সুর তোলে।

এমনি করে মেয়ে নাচে। মা হাসে। বাতাস তাদের ছোট্ট ঘরে লুটোপুটি খায়।

এমনি সময় একদিন বীণ-বাজিয়ের বউ তাকে বলল, “দ্যাখো, মেয়ে আমাদের একটি বই দুটি নয়। তোমার বীণা শুনে সে যখন নাচে, তখন ভাবি, আহা রে, মেয়ের পায়ে সোনা না-হোক, একজোড়া যদি রুপোর নূপুরও বাজত! আমার ভারী সাধ যায় মেয়েকে সাজাই।”

বীণ-বাজিয়ে চমকে ওঠে। বউয়ের মুখের দিকে চোখ ফেরায়।

বউ আর কিছু বলার আগে নিজেই বলে, “বউ, সাধ কি তোমার একার! আমারও কি ইচ্ছে যায় না! কিন্তু পারি কই!”

বউ চুপ করে যায়। কিন্তু চুপ করলে কী হবে! মনের কথা যখন মুখ ফুটে একবার বেরিয়েছে, তখন, তাকে তো আর ফেরানো যায় না। বউ ভাবে কথাটা বলে সে কী ভুল করল! বুঝি না-বললেই ভাল হত। কেন না, বউয়ের মুখে ওই কথা শুনে বীণ-বাজিয়ে মানুষটা কেমন যেন হঠাৎ অন্য মানুষ হয়ে গেছে! অমন আনমনে কীভাবে মানুষটা যখন তখন! কী দ্যাখে নিরাশ চোখে নিজের মেয়ের মুখের দিকে! বাবার ওই মুখ দেখে মেয়ে আর অতশত কী বুঝবে! যখন তার হাসার কথা, তখন সে হাসে। যখন তার মন চায় তখন সে নাচে। আর বাবা হয়তো সেই হাসি দেখে ভাবে, রুপো নয়, মেয়ে, যদি সাজাতেই হয়, তোকে আমি সোনা দিয়ে সাজাব। কিন্তু সোনা সে পাবে কোথায়? তার বীণা শুনে সোনা দেবে কোন মানুষ? কোন দেশে? জানে না সে।

অগত্যা রোজ যেমন বীণাটি নিয়ে সে পথে বেরোয়, সেদিনও সে বেরোল। বেরোবার আগে রোজ যেমন মেয়ের কপায়ে চুমো দেয়, সেদিনও চুমো দিল। মেয়ের মুখের হাসিটির সঙ্গে নিজের হাসি মিলিয়ে সে বউকে বলল, “বউ, প্রার্থনা করো, আজ যেন তোমার সাধ পূর্ণ করতে পারি।” বলে সে বেরিয়ে গেল। আর বউ মেয়েকে বুকে নিয়ে সময় গুনতে বসল।

আজ কোথায় যাবে বীণ-বাজিয়ে?

জানে না।

পশ্চিমে, কি পুবে? অথবা উত্তরে না দক্ষিণে?

সে ঠিক করতে পারে না।

অগত্যা সে রূপসী নদীর তীরে এসে দাঁড়ায়। তারপর তীর ধরে সে হাঁটতে থাকে।

হাঁটল সে অনেকক্ষণ। হাঁটতে হাঁটতে নদীর এপারে, ওপারে সে রং-সবুজের কত ছবি দেখল, দেখল, কত মানুষ। কত সাজ। কত পাখি। আকাশ-রোদের ছায়ায় সে শুনতে পেল কত পাখির কত কাকলি। আর শুনতে পেল, জলের তরঙ্গ নদীর ঢেউ-এ ঢেউ-এ।

হাঁটতে হাঁটতে সে থমকে দাঁড়াল। বড্ড ক্লান্ত লাগছে।

নদীর বাতাসে সে বুকটা একটু ভরে নেবে। তাই এখানে, এই নদীর তীরে সে একটু বসল। বসে বসে ভাবল, এখন সে কী করবে। কোথায় কাকে শোনাবে তার বীণার সুর! কে দেবে তাকে দুটি নূপুর, সোনায় গড়া তার মেয়ের জন্যে!

বসে বসে হঠাৎ তার মনে হল, ওই নদীর তরঙ্গে সত্যিই যেন নূপুরেরই ঝুনঝুনি শোনা যাচ্ছে। আনন্দে তার গায়ে কাঁটা দেয়। সে থাকতে পারে না। নিজের বীণাটি কোলে নিয়ে সুর বাঁধে। ওই নদীর তরঙ্গের তালে তালে সে তার বীণার তারে ঝংকার দেয়। তারপর আর কিছু মনে থাকে না তার। বিভোর হয়ে বীণা বাজায় এই নদীর তীরে একা একা।

কতক্ষণ এমনি করে যে সে বীণায় সুর বাজাল সে খেয়াল নেই তার। কখন যে একটি ময়ূরপঙ্খি নাও নদীর স্রোতে ভেসে ভেসে পাড়ে এসেছে, তার নজরে পড়েনি। কখন যে সেই নাও নোঙর ফেলেছে, বীণ-বাজিয়ে তাও টের পায়নি। এতক্ষণ কে ওই মানুষটি ময়ূরপঙ্খি নায়ে বসে তার বীণা শুনেছে তন্ময় হয়ে!

“ওহে বীণ-বাজিয়ে!” কে ডাকল?

চমক ভাঙল বীণ-বাজিয়ের। চকিতে ফিরে তাকাল। তাই তো, এরা কারা তার সামনে দাঁড়িয়ে! এরা কি রাজার প্রহরী! হবে হয়তো।

তাদের যে সর্দার সে বলল, “ওই দ্যাখো, সামনে ময়ূরপঙ্খি নাও। ওই নায়ে মহারাজ ভ্রমণে বেরিয়েছেন। তোমার বীণা শুনে রাজামশাই মুগ্ধ। তিনি তোমার সঙ্গে দেখা করতে চান। তোমার যদি কোনও আপত্তি না থাকে তুমি কি যেতে পারো আমাদের সঙ্গে?”

এ কী শুনছে বীণ-বাজিয়ে। সঙ্গে সঙ্গে চোখ ফিরিয়ে সে দেখতে পেয়েছে ময়ূরপঙ্খি নাওটি। সে দেখতে পেয়েছে, ওই ময়ূরপঙ্খি নায়ে বসে আছেন এক সুপুরুষ মানুষ তার দিকে চেয়ে। তাঁর মাথায় মুকুট। গলায় রত্নহার। পোশাকে মণিমুক্তার ঝলমলানি। বীণ-বাজিয়ের চোখ ঝলসে দিচ্ছে। বীণ-বাজিয়ে ধড়ফড় করে উঠে পড়ল। সে বীণাটি বুকে তুলে নিল। রাজাকে দেখে সে মাথা নত করল দূর থেকে। তারপর অত্যন্ত ভয়ে ভয়ে সর্দারকে জিজ্ঞেস করল, “আমাকে ডাকছেন তিনি?”

“হ্যাঁ।” উত্তর দিল প্রহরী-সর্দার।

বীণ-বাজিয়ে যেন বিশ্বাস করতে পারে না। তার বুকের ভেতরটা একটা অদ্ভুত আনন্দে কেঁপে ওঠে। সে ধীর পায়ে এগিয়ে গেল ওই ময়ূরপঙ্খির দিকে। নায়ে যখন পা রাখল, তখন রাজামশাই নিজে এগিয়ে এসে তার হাত ধরলেন। হাসতে হাসতে বললেন, “হে বীণ-বাজিয়ে, এমন সুর তুমি কোথায় পেলে? কে তোমার হাতে এমন সুর দিয়েছে? আমি যে আরও শুনতে চাই। আমাকে শোনাবে তুমি?”

ভারী লজ্জা পেল বীণ-বাজিয়ে রাজার তারিফ শুনে। যে-রাজা ছিলেন তার কাছে গল্পের মতো, ছিল তার কল্পনা, সেই রাজাই আজ তার হাত ধরেছেন! সেই রাজা আজ তার বীণা শুনতে চান! শিহরন লাগে তার সারা শরীরে। সে শিহরন তার গলার স্বরে। সে কাঁপা কাঁপা স্বরে বলল, “মহারাজ, আমার বীণার সুর আপনার ভাল লেগেছে শুনে আমি ধন্য। এর চেয়ে বড় পুরস্কার আর কী আছে! আপনার যখন ইচ্ছে, তখন আমি নিশ্চয়ই শোনাব।” এই বলে বীণ-বাজিয়ে ময়ূরপঙ্খির দোলায় দুলতে দুলতে বীণার তারে সুর জুড়ল। ময়ূরপঙ্খি ভেসে চলল।

কতক্ষণ ধরে যে ময়ূরপঙ্খি নদীর স্রোতে ভেসেছে সে হিসেব করার ফুরসত রাজা পাননি। ভেসে ভেসে ময়ূরপঙ্খি কোথায় চলেছে, সে-ও রাজা খেয়াল করেননি। বেলা যে বয়ে গেল, তার খবর কে রাখছে! বীণ-বাজিয়ের বীণার সুর শুনতে শুনতে সবাই তন্ময়, অবাক।

শেষমেশ, বীণার শেষ সুরের শেষ চমকটি যখন ঝংকার দিয়ে থেমে পড়ল, তখন যেন ঘোর কাটল। তখনও সে ঝংকারের প্রতিধ্বনি রিনিঝিনি করে লুটোপুটি খাচ্ছে চারদিকে। রাজা খুশিতে উছলে উঠলেন, “চমৎকার, চমৎকার।” তারপর তিনি তাঁর রত্নহারটি নিজের গলার থেকে খুলে নিলেন। দ্রুত পায়ে এগিয়ে এলেন বীণ-বাজিয়ের কাছে। তার গলায় পরিয়ে দিলেন হাসিমুখে রত্নহারটি। পরিয়ে বললেন, “ওহে গুণী, তোমার বীণার সুরের তুলনায় আমার এ-হার নেহাতই তুচ্ছ। তবু তুমি এটি গ্রহণ করলে আমি খুশি হব।”

বীণ-বাজিয়ে মাথা নত করল। বলল, “মহারাজ, এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ পুরস্কার আমার আর কী আছে! রাজার গলার রত্নহার আমার গলায় শোভা পাবে, এ যে আমি ভাবতেও পারিনি কোনওদিন। মহারাজ আপনি মহান।”

রাজা বীণ-বাজিয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, “বীণ-বাজিয়ে, তুমি আমার চেয়েও মহান। আমি রাজা, আমি প্রজাদের শাসন করি। তুমি শিল্পী, তুমি তাদের আনন্দ দাও। রাজাকে তারা ভয় পায়। শিল্পীকে ভালবাসে।”

রাজার কথা শুনে বীণ-বাজিয়ের চোখ দুটি অশ্রুফোঁটায় টলমল করে উঠল। তারপর সে বলল, “মহারাজ, এবার আমায় ছুটি দিন।”

রাজা বললেন, “হ্যাঁ, ছুটি তোমায় নিশ্চয়ই দেব। কিন্তু তার আগে আমার আর-একটি অনুরোধ যে তোমায় রাখতে হবে।”

বীণ-বাজিয়ে উদ্‌গ্রীব হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী অনুরোধ মহারাজ?”

রাজা হাত তুলে বললেন, “ওই দ্যাখো, আমার রাজপ্রাসাদ!”

বীণ-বাজিয়ে পলকে ফিরে তাকাল। হ্যাঁ, ওই তো রাজপ্রাসাদ! এ যে দেখি, ময়ূরপঙ্খি একেবারে রাজপ্রাসাদের সম্মুখেই নোঙর ফেলেছে!

রাজা বললেন, “শুধু একটিবারের জন্য তোমাকে যেতে হবে আমার ওই প্রাসাদে।”

বীণ-বাজিয়ে উত্তর দিল, “মহারাজ এর চেয়ে আর কী সৌভাগ্য হতে পারে আমার।”

রাজা বীণ-বাজিয়ের হাত ধরে বললেন, “তবে চলো।”

বীণ-বাজিয়ে রাজার হাত ধরে নেমে এল নাও থেকে। সামনে চতুর্দোলা তৈরিই আছে। সেই চতুর্দোলায় রাজার পাশে বসে বীণ-বাজিয়ে রাজপ্রাসাদে চলল। রাজপথের একটি একটি তোরণ পেরিয়ে যায়, আর ওই দূরে রাজপ্রাসাদের সিংদরজা কাছে এগিয়ে আসে। ভেরি বেজে উঠল। প্রাসাদের রাজরক্ষীরা রাজাকে অভিবাদন জানাবার জন্য প্রস্তুত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। রাজার চতুর্দোলা সিংদরজা পেরিয়ে প্রাসাদ-চত্বরে ঢুকে পড়ল। রাজা নামলেন। তাঁর সঙ্গে নামল বীণ-বাজিয়ে। অবাক চোখে থমকে চায় বীণ-বাজিয়ে। এ যেন এক স্বপ্নপুরী। শুধুই রঙিন খুশির রং তার চোখে উপচে পড়ছে। কেমন যেন নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে বীণ-বাজিয়ে। পরনে সবার কেমন ঝকমকে পোশাক। কিন্তু ছিঃ ছিঃ, এ তার কী সাজ! ভারী লজ্জা হয় বীণ-বাজিয়ের। রাজা তার চোখের দিকে তাকান। হাসেন। তারপর বলেন, “দাঁড়ালে কেন? এসো!” বলে রাজা তার হাত ধরলেন।

বীণ-বাজিয়ে হকচকিয়ে গেল। রাজার হাত ধরে ইতস্তত করতে করতে এগিয়ে চলল প্রাসাদের অন্দরমহলে। আর সকলে অবাক হয়ে দেখতে লাগল সেই দৃশ্য! ভাবতে লাগল, এ কোন ভাগ্যবান! কার হাত ধরেছেন রাজা!

রাজা হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করলেন, “ভয় পাচ্ছ, বীণ-বাজিয়ে?”

না, বীণ-বাজিয়ে ভয় পাচ্ছে না, তার লজ্জা হচ্ছে। কী বলি, কী বলি ভাবতে ভাবতে বলেই ফেলল, “মহারাজ, আপনার পাশে আমি এক নিতান্তই নগণ্য মানুষ। মানায় না। বরঞ্চ আমায় ফিরে যেতে দিন মহারাজ, আমার ঘরে।”

রাজা বীণ-বাজিয়ের হাত আরও শক্ত করে চেপে ধরলেন। বললেন, “ফিরে তো যাবেই তুমি। তার আগে এসো, আমার স্বর্ণভাণ্ডারে তোমাকে নিয়ে যাই। স্বর্ণভাণ্ডারে আমার অফুরন্ত সোনার অলংকার। সেই অলংকারের সব যদি তুমি নিতে চাও, তুমি নিয়ো। আমি বাধা দেব না।”

শিউরে উঠল বীণ-বাজিয়ে রাজার কথা শুনে। সে বুঝি হাঁটতে হাঁটতে হোঁচট খায়! মানুষটা আড়ষ্ট হয়ে হেঁটে চলল রাজার এই দরদভরা বুকখানা আড়চোখে দেখতে দেখতে।

রাজা হাসছেন। বীণ-বাজিয়ের মুখের দিকে তিনি যতবারই চাইছেন ততবারই হেসে উঠছেন। এমনই করে হাসতে হাসতেই তিনি স্বর্ণভাণ্ডারে পৌঁছে গেলেন।

সোনা, সোনা! স্বর্ণভাণ্ডারে শুধুই সোনা! যেদিকে চাও সোনার আলো ঠিকরে পড়ছে। চোখ ঝলসে যায় বীণ-বাজিয়ের। চোখের পাতা থিরথির করে কাঁপে! পা যেন তার স্থির থাকে না। এখন, সে যদি একটু বসতে পায়! ঠিক এমনই সময়ে রাজা বীণ-বাজিয়েকে বললেন, “ওহে শিল্পী, এই স্বর্ণভাণ্ডার থেকে তুমি কী নেবে, নাও! কেউ তোমায় বাধা দেবে না।”

এতসব সোনার রাশি দেখেশুনে তার মাথা টলছে। এখনই এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারলে সে যেন নিস্তার পায়। কিন্তু সে বুঝতে পেরেছে, একটা কিছু না নিলে, তার রেহাই নেই। তাই সে চোখের সামনে যা দেখল, সেইদিকেই হাত বাড়িয়ে বলল, “মহারাজ, ওইটি পেলেই আমি খুশি হব!”

রাজা তার হাতের নিশানার দিকে নজর রেখে জিজ্ঞেস করলেন, “কোনটি?”

“মহারাজ, ওইটি।” সেইটির দিকেই হাত স্থির রেখে উত্তর দিল বীণ-বাজিয়ে।

রাজা চমকে উঠলেন, “নূপুর।”

বীণ-বাজিয়ে থমকে গেল। এতক্ষণ, এতসব সোনা দেখে তার চোখ ঝাপসা হয়েছিল যেন! ওইটি নূপুর, না অন্য কী, ভাল করে দেখেনি সে। কিন্তু নূপুরের নাম শুনেই, সে আঁতকে উঠেছে। চোখের দৃষ্টি ভাল করে মেলে ধরতেই সে দেখতে পেয়েছে। তাই তো, সত্যিই যে একজোড়া সোনার নূপুর ও-দুটি। হায় রে, এতক্ষণ যে নূপুরের কথা সে বেমালুম ভুলে গেছিল। ভুলে গেছিল, বউয়ের কথা। তার মেয়ের কথা। আশ্চর্য, যে-নূপুর তার বউ মেয়ের পায়ে পরাতে চেয়েছিল, সেই নূপুরই তার হাতের কাছে। এ কি তবে জাদু!

কিন্তু রাজার মুখখানা অমন শুকিয়ে গেল কেন! অমন খুশি-ঝলমল তাঁর চোখের দৃষ্টি হঠাৎ এমন ফ্যাকাশে হয়ে গেল কেন? তিনি ঝট করে বীণ-বাজিয়ের হাত থেকে নিজের হাত সরিয়ে নিলেন। কেমন একটা অজানা ভয়ে তাঁর চোখদুটি অস্থির হয়ে উঠল। তিনি ছটফট করতে লাগলেন।

“কী হল মহারাজ?” রাজাকে হঠাৎ অস্থির দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল বীণ-বাজিয়ে।

“অ্যাঁ!” রাজা থতমত খেয়ে গেলেন। তাঁর হারিয়ে যাওয়া মুখের হাসি হঠাৎ যেন একটুখানি ঝলসে উঠে আবার মিলিয়ে গেল। তিনি উত্তর দিলেন, “না, কিছু না।”

“তবে আপনি ওই নূপুরটি দেখে অমন চমকে উঠলেন কেন?” জিজ্ঞেস করল বীণ-বাজিয়ে।

রাজা অপ্রস্তুত হলেন। কী উত্তর দেবেন ঠিক করতে না পেরে কয়েক মুহূর্ত তিনি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন। হয়তো কিছু ভাবলেন। তারপর তিনিই জিজ্ঞেস করলেন, “ওই নূপুর নিয়ে তুমি কী করবে বীণ-বাজিয়ে?”

“আজ্ঞে মহারাজ, আমার মেয়ের পায়ে পরাব।” উত্তর দিল বীণ-বাজিয়ে।

রাজা আচমকা আর্তনাদ করে উঠলেন, “না-আ-আ!” কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে নিজেকে সামলে নিয়ে তিনি একদৃষ্টে নূপুরের দিকে তাকিয়ে রইলেন। সে-দৃষ্টিতে ভয়জড়ানো।

রাজার হঠাৎ এমন মূর্তি দেখে কেমন যেন ঘাবড়ে গেল বীণ-বাজিয়ে। তাই সে খুবই ভয়ে ভয়ে উত্তর দিল, “না, না, আপনার যখন ইচ্ছে নয়, তখন আমারও দরকার নেই ওই নূপুর।”

রাজা এবার ওই নূপুরের থেকে নিজের চোখ ফেরালেন। তিনি বীণ-বাজিয়ের মুখের দিকে তাকালেন। তারপর শান্ত গলায় বললেন, “তাই কখনও হয়! আমি রাজা। আমি তোমায় কথা দিয়েছিলুম, আমার এই সোনার ভাণ্ডার থেকে তোমার যা-খুশি তুমি নিতে পারো। তুমি যখন চেয়েছ, তখন আমি এই নূপুর জোড়াই তোমাকে দিতে বাধ্য।” বলতে বলতে তিনি হাত বাড়ালেন। দু’পায়ের দুটি নূপুর সোনার ভাণ্ডার থেকে তুলে নিয়ে, বীণ-বাজিয়ের হাতে তুলে দিলেন।

বীণ-বাজিয়ে হতবাক।

রাজা জিজ্ঞেস করলেন, “বীণ-বাজিয়ে, তোমার আর কে আছে?” আশ্চর্য, রাজার গলায় কোথায় গেল সেই খুশির আমেজ।

বীণ-বাজিয়ে উত্তর দিল, “আমার একটি মেয়ে আছে হুজুর, আর আছে তার মা।”

“আর কেউ নেই?”

“না, মহারাজ।”

রাজার গলায় উদ্বেগ। অস্পষ্ট শোনা গেল, “ভগবান তোমাদের রক্ষা করুন।”

বীণ-বাজিয়ে রাজার উদ্বেগের কিছুই খেয়াল করল না। মাথা নত করল। বলল, “ধন্যবাদ।”

রাজা বীণ-বাজিয়ের কাঁধে হাত রাখলেন। বললেন, “তুমি কি তাদের একদিন আমার এই রাজপ্রাসাদে নিয়ে আসতে পারো না? তুমি যদি সম্মতি দাও, আমি চৌদোলা পাঠিয়ে দেব তাদের জন্যে।”

বীণ-বাজিয়ে অত্যন্ত ব্যস্ত হয়ে বলল, “মহারাজ, আপনি তাদের দেখতে চান, এ তো তাদের সৌভাগ্য। আমি নিজে একদিন তাদের আপনার প্রাসাদে নিয়ে আসব। আজ তবে আসি মহারাজ।”

“বেশ,” বলে রাজা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।

রাজার কাছে বিদায় নিয়ে, চৌদোলায় চড়ে, বীণ-বাজিয়ে ঘরে চলল। আর রাজা ভয়ংকর এক ভাবনা নিয়ে নিজের কক্ষের পথে পা বাড়ালেন।

চৌদোলা ছুটে চলেছে। ছুটে ছুটে দুলে উঠেছে। আর সেই দোলায় দুলতে দুলতে বীণ-বাজিয়ে ভেবে পড়েছে, “নূপুরজোড়া তুলে দিতে কাঁপল কেন রাজার হাত!”

রাজা তাঁর কক্ষে ফিরে এলেন। তাঁর মুখখানা যেন অসহ্য এক ভাবনার ভারে শুকিয়ে গেছে। আনমনা তিনি। বারবার একই কথা তিনি ফিরে ফিরে ভাবছেন। ভাবতে ভাবতে তাঁর চোখের ওপর ভেসে ওঠে কতদিন আগের সেই কথা। তখনও তিনি রাজা হননি। তখনও তিনি রাজপুত্র। তখন রাজা তাঁর বাবা। সেই সময়ে একদিন রাজপুত্রের শখ হল, শিকারে যাবেন। একা। সঙ্গে নিলেন না কাউকে। এমনকী, কোথায় চললেন, সে-কথাও কাউকে জানালেন না। শুধু সঙ্গে নিলেন তাঁর কালো ঘোড়াটিকে। নাম তুর্কি। তার পিঠে চেপে ছুটলেন বনের ধারে।

বন সে অনেক দূর। অনেক জনপদ পেরোলেন তিনি। অনেক নদী। নদীর এপারে-ওপারে সেতু। পাহাড়। তারপর বন। সেই বন খানিকটা উপত্যকা ঘিরে, অনেকটা পাহাড়ের গায়ে গায়ে। সেই বনেই পৌঁছলেন তিনি। ঘন বনের ছায়ায় তিনি থামলেন। ঘোড়ার জিন ছেড়ে তিনি নামলেন। ঘোড়ার গায়ে হাত বোলালেন। আদর করলেন। এতখানি পথ এক নিশ্বাসে ছুটে এসেছে। এখন তুর্কির একটু বিশ্রাম চাই। বেচারা এখানেই একটু দাঁড়াক। তিনি এদিক ওদিক দেখতে লাগলেন। গাছের ফাঁকে, কোথাও কখনও টুকরো টুকরো আলো নজরে পড়ে। তা ছাড়া আঁধার চারদিক। এখন দুপুর। এই রোদের দুপুরেও পাখি আসে না এখানে। সুনসান নির্জন। শুধু মাঝে মাঝে, আকাশ-ছোঁয়া গাছের মাথায় বাতাসের শব্দ। নিস্তব্ধতা ভেঙে দিচ্ছে।

রাজপুত্র আরও খানিক দাঁড়ালেন, এখানে, এই বনের গহনে। তারপর যখন তাঁর মনে হল, তাঁর ঘোড়া বুক ভরে দম নিতে পারছে, তিনি ঘোড়ার লাগাম ধরে হাঁটলেন। এখন তাঁকে শিকার খুঁজতে হবে। হয়তো তাঁকে আরও গভীরে যেতে হবে। সুতরাং খুব সতর্ক তাঁর চোখের দৃষ্টি।

আশ্চর্য, তিনি এতক্ষণ ধরে হাঁটলেন, এতখানি এলেন, কোনও শিকারই তাঁর নজরে পড়ল না। হাঁটতে হাঁটতে কতখানি বেলা যে গড়িয়ে গেছে, এখন সে আন্দাজ করাও তাঁর সাধ্য নয়। কারণ, তিনি যত গভীরে হেঁটেছেন, বনের ধাতও ততই বদলে গেছে। এখন, এই বনের গহনে রাত আর দিনের চেহারা চেনাই দায়! অন্ধকার আরও অন্ধকারে ঢেকে গেছে! বনের নিস্তব্ধতা ভেঙে ঝিঁঝি ডাকছে। ভারী একঘেয়ে, একটানা সেই ডাকের শব্দ। তবে কি সাঁঝ নেমেছে। ঝিঁঝির ডাক শুনে রাজপুত্র অবাক হন। তিনি ঘন গাছের একটু ফাঁক খুঁজলেন। একটুকরো আকাশ যদি দেখতে পান। দেখা গেল না। যেমন আকাশ দেখা গেল না, তেমন শিকারও চোখে পড়ল না। কাজেই বনের আরও গভীরে যাওয়ার কোনও মানে হয় না। তিনি থামলেন। ঘোড়ার পিঠে চাপলেন। ফেলে আসা পথের দিকে ঘোড়ার মুখ ফেরালেন। কিন্তু বনের অন্ধকারে ছুটতে পারে না ঘোড়া। কোথা পথ, কোনখানে ঝোপ কিছুই ঠাওর করতে পারে না। ঘোড়া পাথরে হোঁচট খায়, ছিটকে থামে। ঘোড়ার সাধ্যি নেই এগিয়ে চলার। রাজপুত্র ভয়ংকর বিপাকে পড়লেন। কিন্তু এখন তো আর হাল ছাড়লে চলবে না। তাঁকে যেমন করে হোক বন ডিঙিয়ে বাইরে যেতেই হবে। তাই তিনি ঘোড়ার সঙ্গে, ঘোড়ার পিঠে বসে টালমাটাল করতে করতে বনের ভেতরে ঘুরপাক খেতে লাগলেন। কিন্তু বনের যেন শেষ নেই। তবে কি তিনি বনে পথ হারালেন! এই কথাটা মনে হতেই রাজপুত্রের বুকটা ছ্যাঁত করে উঠল। তাঁর গা ছমছম করতে লাগল। তিনি বুঝতে পারলেন, ভয়ংকর এক বিপদের মধ্যে পড়েছেন তিনি। তা হলে এখন কী হবে?

তিনি চিৎকার করে উঠলেন। চিৎকার করে ঘোড়ার পিঠে চাবুক হাঁকালেন, সপাং, সপাং। কিন্তু ঘোড়া ছুটবে কোথায়! তার পায়ের আঘাতে শব্দ ওঠে। ঘোড়া নাকাল হয়ে, চার পা তুলে লম্ফঝম্ফ শুরু করে দিলে। ঘোড়ার পিঠ থেকে রাজপুত্র এই বুঝি ছিটকে পড়েন। এই বুঝি হাত-পা ভাঙেন। ঘোড়া আচমকা চিৎকার করে উঠল, চিঁ-হিঁ-হিঁ! কিন্তু হায়, ঘোড়ার চিৎকার শোনার মতো তখন কে আর আছে সেখানে! এই ঘন বনের অন্ধকারে কে আর ছুটে আসবে রক্ষা করতে!

ঠিক এই সময়ে, হঠাৎ ওই দূরে বনের আড়াল থেকে কার পায়ে যেন নূপুর বেজে উঠল! থতমত খেয়ে গেলেন রাজপুত্র। ঘোড়াও স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। রাজপুত্র হাঁপাচ্ছেন। ঘোড়াও ঘন ঘন দম ফেলছে। কোনদিক থেকে আসছে এই নূপুরের শব্দ। আশ্চর্য, এই অন্ধকার বনে, এই সময়ে কার পায়ে নূপুর বাজে।

রাজপুত্র ঝটপট ঘোড়ার পিঠ থেকে নামলেন। তাঁর কী মনে হল, ঘোড়ার লাগাম গাছে বাঁধলেন। তিনি কান পাতলেন। তিনি বুঝতে পারলেন, শব্দ তাঁরই দিকে এগিয়ে আসছে। কাছে, আরও কাছে! তিনি লুকিয়ে পড়ার জন্য আঁকপাক করতে লাগলেন। আর ঠিক তখনই তার চোখে ধাঁধা লেগে গেল। অন্ধকারে ও কার ছায়া! ও কে গাছের আড়ালে। থেমে গেল নূপুরের শব্দ। আলতো পায়ে সেদিকেই এগিয়ে চললেন রাজপুত্র। উত্তেজনায় তাঁর পা যেন চলতে চায় না। তিনি বোধহয় কাঁপছেন। তবু তিনি চলছেন। হঠাৎ একটা মস্ত পাথরে ঠোক্কর খেলেন তিনি। হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গে সেই ছায়া ছুটল। সেই ছায়ার সঙ্গে তার পায়ের নূপুরও ঝনঝন করে ঝংকার তুলে বেজে উঠল। রাজপুত্র উঠে পড়লেন। কিন্তু ততক্ষণে সেই ছায়া পালিয়েছে। সেই সঙ্গে তার নূপুরেরও শব্দ মিলিয়ে গেল।

কিন্তু থামলেন না রাজপুত্র। অন্ধকার সেই বনের গাছ-গাছালির বাধা তুচ্ছ করে তিনি এগিয়ে চললেন। সত্যিই তো এই নির্জন বনে, ওই নূপুরের শব্দ কার পায়ে বেজে উঠল! এ ছায়া কার? কোনও মানুষের, না, আর কারও! তিনি এগোচ্ছেন। কিন্তু তিনি জানেন না, কোথায় তিনি যাচ্ছেন। তিনি শুধু এটুকু খেয়াল করতে পারছেন, শব্দটা তাঁর সামনের দিকেই ছুটে ছুটে হারিয়ে গেছে। তাই তিনি সামনের দিকেই হাঁটছেন। সন্তর্পণে।

কিন্তু এ কী, রাজপুত্র আচমকা থামলেন কেন! যেন একটা আবছা আলোর আভাস তাঁর চোখের ওপর ঝিলমিল করে উঠল। অন্ধকার এই গহীন বনে ওই আলো কোত্থেকে আসে! কে জ্বেলেছে! ধীরে ধীরে তিনি ওই আলোর দিকেই আবার এগিয়ে চললেন। যতই এগোচ্ছেন, আলো ততই স্পষ্ট হচ্ছে। উত্তেজনায় তাঁর বুকের ভেতরে তোলপাড় শুরু হয়ে গেছে। কিন্তু অন্ধকার বনে এ কি সত্যিই আলো, না, অন্যকিছু। তিনি স্বপ্ন দেখছেন না তো!

আবার তিনি থমকে দাঁড়ান। কী হল আবার। সামনে ওটা কী দেখছেন তিনি। যেন একটা ভগ্নস্তূপ। আরও একটু ভাল করে দেখার জন্য আরও দু’পা ফেলতেই তিনি হতবাক হয়ে গেলেন। দেখলেন, এটা ভগ্নস্তূপ নয়, একটা ভাঙা প্রাসাদ। সেই ভাঙা প্রাসাদের একটা ঝরোখা দিয়ে সেই আলো লুটিয়ে পড়ছে। তিনি লুকিয়ে পড়লেন সেই প্রাসাদেরই একটা ভাঙা পাথরের আড়ালে। ব্যাস, অমনি সঙ্গে সঙ্গে কে যেন হেসে উঠল। তিনি ভয় পেলেন। আশ্চর্য হলেন তার চেয়েও বেশি। কেন না, এ হাসি শোনা গেল যে একটি মেয়ের গলায়! এ-সময়ে এ-গভীর বনে মেয়ে এল কোত্থেকে!

না, রাজপুত্র আর লুকিয়ে বসে থাকলেন না। তিনি পাথরের আড়াল থেকে বেরিয়ে এলেন। আবার সেই হাসি খিলখিল করে উঠল। পড়িমরি রাজপুত্র পালাতে গেলেন। হাসি আরও জোরে খিলখিল করে উঠল। তিনি সামনের খন্দটা দেখতে পেলেন না। পা পড়ল সেই খন্দে। হুমড়ি খেলেন তার ভেতর। পড়েই তিনি উঠে পড়লেন। আশ্চর্য, সঙ্গে সঙ্গে হাসিও থেমে গেল! আবার নিঝুম হয়ে গেল চারদিক। একটা ভয়ংকর থমথমানি নেমে এল বনের মধ্যে। তিনি কেমন যেন হতভম্বের মতো নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। ভাবতে লাগলেন, এখন তিনি কী করবেন! কিছুই ভেবে পাচ্ছেন না। তিনি এখন যেন একটা বোবা-পাথর। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, রাতের অন্ধকার গাঢ় হয়েছে। এখন আর কিছুই দেখা যাবে না। শুধু দেখা যাবে, ভাঙা প্রাসাদের এই আলোটুকু। অবাক কথা, এই নির্জন বনে, ওই ভাঙা প্রাসাদে আলো জ্বেলে কে বাস করে! এই কথা ভাবতে ভাবতে কেমন যেন একটা শিহরন লাগে রাজপুত্রের। দেখতে হয় তো! দেখতে হয় কে সে! সে কী মানুষ, না মায়াবী!

রাজপুত্র আলোর নিশান লক্ষ করে ঢুকে পড়লেন সেই ভাঙা প্রাসাদের অন্দরে। চারদিকে এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে দেওয়াল থেকে খসে-পড়া পাথরের টুকরো। মনে হয়, অনেককাল আগে, এই পাহাড়ের গায়ে, এই পাথর দিয়েই ওই প্রাসাদের দুর্গ তৈরি হয়েছিল। কিন্ত কে করেছিল তৈরি বনের গভীরে এই দুর্গপ্রাসাদ। এখন সেদিন আর নেই। প্রাসাদের চারদিকে আগাছায় ভর্তি হয়ে গেছে। এই আগাছার জঙ্গল ডিঙোচ্ছেন তিনি। পাথরে পা ফেলে এগিয়ে চলেছেন।

এখন দ্যাখো, আলোর রোশনাইটা কেমন ঝলমলিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে এদিক ওদিকে। এবার বেশ বোঝা যাচ্ছে, দেওয়ালের গায়ে গায়ে সব নকশা খোদাই করা। সেই নকশার গায়ে হাওয়ার সঙ্গে আলোর আভা ঝলমল করে নেচে বেড়াচ্ছে।

এ কী হল!

কী হল?

হঠাৎ এমন অন্ধকার হয়ে গেল কেন চারদিক! আলোটা ঝপ করে নিভে গেল কেন? এ যেন অন্ধকূপের মতো ভয়ংকর অন্ধকারে ঢাকা পড়ে গেল প্রাসাদটা!

ভীষণ ভয় পেয়ে গেলেন রাজপুত্র। তাঁর চোখের ওপর হঠাৎ কে যেন একটা নিকষ কালো পর্দা টেনে দিল। তিনি অন্ধকারে অন্ধের মতো থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। এখন তিনি কী করবেন, কোনদিকে যাবেন কিছুই ঠিক করতে পারলেন না। সুতরাং পা চালিয়ে তিনি পেছন দিকে পালাতে গেলেন। খেলেন এক ধাক্কা। পড়লেন। আবার ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ালেন। কিন্তু তাঁর কেমন যেন সব গুলিয়ে গেল। কোন পথে গেলে যে তিনি আবার তাঁর ঘোড়ার কাছে পৌঁছতে পারবেন, সেই পথ তিনি ঠিক করতে পারলেন না। তিনি অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে আঁকপাক করতে লাগলেন। যেদিকেই পা বাড়ান, ঠোক্কর খান। নয়তো, বাধা পান। আলো নেই। দিশা নেই। পথ নেই। এদিক ওদিক, এধার-ওধার তিনি মিথ্যে হাতড়াচ্ছেন আর ঘুরপাক খাচ্ছেন। তিনি বুঝতে পারলেন, এখান থেকে বেরিয়ে যাবার রাস্তা তিনি হারিয়ে ফেলেছেন। অন্ধকারে তিনি এখন বন্দি।

তা হলে এবার?

এবার তিনি কী করবেন, জানেন না। আবার আলো জ্বলবে কি না তাও তাঁর জানা নেই। এখন তাঁর মনে হচ্ছে, এই অন্ধকারটা যেন একটা ভয়ংকর দৈত্যের মতো তাঁর ঘাড়ে চেপে বসেছে। তাঁর যেন দম আটকে আসছে। তিনি হাঁসফাঁস করে হাঁপাতে লাগলেন। যখন তিনি আর পারলেন না, আর্তনাদ করে উঠলেন গলা ফাটিয়ে। প্রতিধ্বনি উঠল ভাঙা প্রাসাদের আনাচে-কানাচে। কিন্তু কারও সাড়া মিলল না। তিনি অস্থির হয়ে আবার চিৎকার করে উঠলেন, “কে আছ? এখানে যে আছ, আমাকে একটু আলো দেখাও! আমি রাজপুত্র।”

আশ্চর্য, রাজপুত্রের চিৎকারের প্রতিধ্বনি মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে আবার সেই নূপুর বেজে উঠল। গাঢ় অন্ধকারে শোনা গেল রিনঝিন, রিনঝিন। ঝুন-ঝুন। সেই ঝংকার এই দিকেই এগিয়ে আসছে। রাজপুত্র কান ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, তটস্থ হয়ে। কিন্তু তিনি কিছুই দেখতে পেলেন না। শব্দ কাছে এল। থামল। রাজপুত্র কিছু ভেবে ওঠার আগেই, সে ঝট করে রাজপুত্রের হাতটা চেপে ধরল। রাজপুত্র ভয়ে আঁতকে উঠলেন, “কে-এ-এ-এ!”

“ই-স-স-স!” তার মুখ দিয়ে একটা চাপা শব্দ বেরিয়ে এল। মনে হল, ব্যস্ত হয়ে সে চিৎকার করতে মানা করছে। তারপর সে রাজপুত্রের হাত ধরে টান দিল।

“কোথায় যাব আমি?” ভয় পেলেন রাজপুত্র। তাঁর গলা আড়ষ্ট।

সে অত্যন্ত চাপাস্বরে ফিসফিস করে বলল, “যেখানে আমি নিয়ে যাব।”

সেই অন্ধকারে তাকে দেখা না গেলেও রাজপুত্রের বুঝতে কষ্ট হল না, এ-স্বর একটি মেয়ের। এত মিষ্টি সে-স্বর, মনে হল যেন সোনার মতো ঝলমলিয়ে ঝরে পড়ল তার গলা দিয়ে। সে যে খুব ছোট্ট নয়, বোঝা যায় তার গলার স্বরে। হয়তো সে একটি কিশোরী।

তার গলার স্বর শুনে রাজপুত্রের যত ভয় সব যেন জুড়িয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। তিনি অত্যন্ত আগ্রহের সঙ্গে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কি আমায় বাইরে যাওয়ার পথটা দেখিয়ে দেবে?”

সে উত্তর দিল, “না, তুমি এখন বন্দি। এখানে একবার যে আসে সে আর ফিরতে পারে না। এ হল এক সর্বনাশাপুরী। তোমাকে এখন আমার সঙ্গে তার কাছে যেতে হবে।”

“কার কাছে?” রাজপুত্রের গলায় আবার ভয় জড়িয়ে ধরল।

“যার কাছে নিয়ে যাচ্ছি।” শান্ত গলায় উত্তর দিল সে।

“সে কে?” জিজ্ঞেস করলেন রাজপুত্র। উৎকণ্ঠায় তাঁর গলা কাঁপছে।

“তার কাছে গেলেই জানতে পারবে।”

“জানো, আমি রাজপুত্র।” গলায় সাহস আনার চেষ্টা করলেন তিনি।

“তাতে কী?”

“রাজপুত্র তার কাছে কেন যাবে! তাকে নিয়ে এসো আমার কাছে!”

সে রাজপুত্রের এই কথা শুনে থামল একটু। হয়তো ভাবল কিছু। তারপর বলল, “তুমি রাজপুত্র, কিন্তু তিনি রাজা।”

চমকে গেলেন রাজপুত্র। রাজা! এ-রাজ্যে রাজা তো একজনই। তিনি তাঁর বাবা। অন্য কোনও রাজার কথা তো জানা নেই তাঁর।

রাজপুত্রের মুখে কোনও কথা না শুনে সেই মেয়েটিই বলল, “তুমি আমার সঙ্গে না গেলেও, তোমার নিস্তার নেই। তার অনুচরের দল এসে তোমায় ধরে নিয়ে যাবে। তখন তোমার মরণ ছাড়া আর গত্যন্তর নেই।”

তার এই কথা শুনে রাজপুত্র কী যেন মুহূর্তের জন্যে ভাবলেন। তারপর বললেন, “ঠিক আছে, আমায় নিয়ে চলো।”

“এসো।”

রাজপুত্র তার হাত ধরে অন্ধকারে হেঁটে চললেন। ক’পা হেঁটেই রাজপুত্র অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “অন্ধকারে আমি কিছু দেখছি না, তুমি দেখছ কেমন করে?”

“আমি অন্ধকারেও দেখতে পাই। আমার যে সব জানা।” সে হাঁটতে হাঁটতে উত্তর দিল। তারপর আরও ক’পা দু’জনে নিঃশব্দে হাঁটল।

হঠাৎ রাজপুত্র জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি কে?”

রাজপুত্রের কথার কোনও উত্তর দেওয়ার সুযোগ এল না তার। সে বলল, “আমরা এসে গেছি। রাজা আছেন ওই সামনের কক্ষে।”

রাজার সে-কক্ষও অন্ধকার। মেয়েটির হাত ধরে সে-কক্ষে ঢুকতে গিয়ে থমকে দাঁড়ালেন রাজপুত্র। মেয়েটি কোনও কথা না বলে তাঁর হাত ধরে টানল। রাজপুত্র কক্ষে ঢুকলেন। অন্ধকারে রাজাকে আঁতিপাতি চোখে খুঁজতে লাগলেন। কিন্তু কাউকেই দেখতে পেলেন না। শুধু শুনতে পেলেন, যেন কোনও অজানা জন্তুর নিশ্বাসের বিকট শব্দ। রাজপুত্র দাঁড়াতেই সেই নিশ্বাসের শব্দ আরও তীব্র হল। মনে হল যেন, এইমাত্র ঝড় উঠল ঘরের মধ্যে। তোলপাড় শুরু করে দিল। এমনকী, নিশ্বাসের ধাক্কাটা রাজপুত্রের গায়ে এসেও লাগল। তারপর কে যেন হঠাৎ বলে উঠল, “তোমাকে আমি চিনি।”

যে কথা বলল তাকে দেখা গেল না। তার গলায় ভয়ংকর এক খসখসানি শব্দ। রাজপুত্র ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন। আর ঠিক তখনই তিনি দেখতে পেলেন, ভয়ংকর দুটো চোখ তাঁর সামনে জ্বলজ্বল করছে। সে-চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরে বেরোচ্ছে। সে আবার খসখসে গলায় বলল, “আমার প্রাসাদে তুমি ঢুকেছ কার হুকুমে? আমার প্রাসাদে ঢুকে তুমি চিৎকার করেছ। আমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়েছ!” সে কথা বলল, আর মনে হল যেন তার দু’পাশে মস্ত দুটো ডানা আগুন ধরাবার হাপরের মতো ঝাপটা মারছে। সেই সঙ্গে রাজপুত্রের নাকে ছুটে আসছে একটা বিচ্ছিরি সোঁদা গন্ধ। রাজপুত্র নাকে হাত চাপলেন। কোনও কথা বলতে পারলেন না।

“তুমি কথা না বললে, দেখতে পাচ্ছ, এই নখ দিয়ে তোমায় আমি খিমচে মেরে ফেলব!” বলে সে নখ দেখাল।

রাজপুত্র অন্ধকারে ঝাপসা ঝাপসা দেখতে পেলেন সেই নখ। মনে হল, লম্বা। তীক্ষ্ণ। ধারালো। তিনি আর চুপ থাকতে পারলেন না। ভাবলেন, চুপ থাকাটা আর ঠিক নয়। তিনি কথা বললেন, “হে রাজন, আপনি যখন আমায় চেনেন, তখন নিশ্চয়ই জানেন, আমি এক রাজপুত্র। এখানে যে এমন একটি প্রাসাদ আছে এ আমার আদৌ জানা ছিল না। আমি হঠাৎই না জেনে আপনার প্রাসাদে ঢুকে পড়েছি। আমি এখান থেকে বেরিয়ে যাওয়ার অনেক চেষ্টা করেও বেরোবার পথ খুঁজে পাইনি। আমার অন্য কোনও উদ্দেশ্য নেই। আমি এই গভীর অরণ্যে শিকার করতে এসে পথ হারিয়ে ফেলেছি। আমার ঘোড়াটাকে আমি গাছে বেঁধে এসেছি। আমায় যদি আপনি মুক্ত করে দেন, আমি এখনই এখান থেকে চলে যাব।”

রাজপুত্রের এই কথা শুনে সে রাগে ফেটে পড়ল। সে চেঁচিয়ে উঠল। তার খসখসে গলা থেকে খ্যানখ্যান করে বেরিয়ে এল ভয়ংকর শব্দ। তাই শুনে ভয়ে বুক শুকিয়ে গেল রাজপুত্রের। সে বলল, “না, তোমার মুক্তি নেই। শুনে রাখো রাজপুত্র, আমার প্রাসাদে যে ঢোকে, সে আর মুক্তি পায় না। তাকে মরতে হয়। তোমাকেও মরতে হবে। তুমি মৃত্যুর জন্যে তৈরি থাকো।” বলে সেই রাজা হঠাৎ ধেয়ে এল রাজপুত্রের দিকে। ধুলো উড়ল সেই ঘরে। হয়তো ঘরটা বড়ই হবে। সে ধেয়ে এসে পাখি যেমন করে ছোঁ মারে, তেমনই করে ছোঁ মেরে রাজপুত্রকে শূন্যে তুলে নিল। তারপর সেই ঘর থেকে বেরিয়ে এসে সে উড়তে লাগল। উড়তে উড়তে রাজপুত্রকে হাওয়ায় ভাসিয়ে দোল খাওয়াতে লাগল। রাজপুত্র বুঝতে পারলেন, তিনি শূন্যে পাক খেতে খেতে উড়ে চলেছেন। একটা উড়ুক্কু দানব তাঁকে পা দিয়ে খামচে ধরে, আকাশে ডানার ঝাপটা মেরে উড়ছে। এখন আর তাঁর সন্দেহ নেই, মৃত্যুর হাত থেকে তাঁকে আর কেউ বাঁচাতে পারছে না। এখনই হয়তো তিনি মরবেন রাজা নামে এই দানবটার হাতে।

খুব যে একটা দূর পথ রাজপুত্র ঝুলে ঝুলে উড়ে এলেন, তেমন না। খানিকটা এসেই সেই উড়ুক্কু দানব ঝপ করে নেমে এল আকাশ থেকে। নেমে, রাজপুত্রের কোমরে বাঁধা তরোয়ালটা ছিনিয়ে নিল। পিঠে বাঁধা তির আর ধনুক কেড়ে নিল। তারপর তাঁকে টানতে টানতে একটা ঘরের সামনে হাজির করল। ঘরের সামনে লোহার ফটক। সেই লোহার ফটকের চাবি খুলে রাজপুত্রকে ঠেলে ঢুকিয়ে দিল। আবার ফটক বন্ধ করে দিল। রাজপুত্র বুঝতে পারলেন, এটা কারাগার। যতক্ষণ না তাঁকে মেরে ফেলা হচ্ছে, ততক্ষণ এই কারাগারেই তাঁকে বন্দি থাকতে হবে। তাঁর এই ধারণা সত্যি হল যখন সেই উড়ুক্কু দানব আবার অন্ধকারে চোখ জ্বালিয়ে রাজপুত্রকে বলল, “এখন এই কারাগারে তুমি বন্দি থাকো। কাল ভোরবেলা আমি তোমাকে নিয়ে উড়ে যাব আকাশের অনেক উঁচুতে। তারপর শূন্য আকাশ থেকে তোমাকে পাহাড়ের ওপর ছুড়ে ফেলে দেব। পাথরে মুখ থুবড়ে তুমি মরবে। যে আসে এখানে, তারজন্য এই আমার শাস্তি।” বলে উড়ুক্কু দানবটা আবার উড়তে উড়তে যেখান থেকে এসেছিল সেখানেই চলে গেল।

দানব চলে গেলে, রাজপুত্র অসহায়ের মতো ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইলেন। তিনি আর কিছু ভাবতে পারছেন না। তিনি কারাগারের ভেতরটা ভাল করে দেখবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু এখানেও সেই অন্ধকার। কিছুই দেখা গেল না। কারাগারের এই ঘরটা যে কত বড়, সেটা পর্যন্ত তিনি আন্দাজ করতে পারছেন না। তা, কারাগারের এ-ঘর যত বড়ই হোক, সে নিয়ে মাথা ঘামিয়ে কাজ কী!

কাজ আছে বই কী! এই ভাঙা প্রাসাদের কারাগারের দেওয়ালে যদি একটা ভাঙা ফাঁক খুঁজে পান তিনি, তা হলে সে ফাঁক গলে তো বেমালুম পালাতে পারেন। ঠিক কথা! ওই দ্যাখো, তিনি অন্ধকারে হাত বাড়িয়ে দেওয়াল খুঁজতে শুরু করে দিয়েছেন। দেওয়াল ছোঁয়ার জন্য তিনি গুটিগুটি পা ফেললেন। কোথায় দেওয়াল! অন্ধকারে যেদিকেই যান, সেই দিকটাই ফাঁকা। সত্যি, কত বড় এই কারাগারটা। পায়ে ব্যথা ধরে যায়, তবু শেষ হয় না হাঁটা!

রাজপুত্র আর হাঁটতে পারলেন না। হতাশ হয়ে তিনি থামলেন। কারাগারের অন্ধকারে পাগলের মতো চরকি খাওয়ার কোনও মানে আছে। পালাবার পথ খুঁজে না পেয়ে তিনি বুঝতে পারলেন, মরণের হাত থেকে তাঁর বাঁচার আর কোনও পথ নেই। মরণের এই ভয়টা মাথায় ঢুকতেই তাঁর ধড়ফড়ানি শুরু হয়ে গেল। হঠাৎ তিনি মরিয়া হয়ে কারাগারের লোহার ফটকটা দু’হাত দিয়ে ধাক্কা মারতে লাগলেন। কিন্তু এ মিথ্যে চেষ্টা। একচুলও নড়ল না ফটক। শেষে তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “বাঁচাও-ও-ও!”

ঠিক এই মুহূর্তে আবার নূপুরের শব্দ শোনা গেল। সেই নূপুর! তিনি শিউরে উঠলেন। নূপুরের নিক্কণ ভেসে আসছে কাছে। সেইসঙ্গে দেখা যাচ্ছে সেই আলোর রশ্মি। কারাগারের লোহার ফটকের গরাদের ভেতর দিয়ে সেই আলো ছড়িয়ে পড়ছে রাজপুত্রের চোখের ওপর। তিনি আলোর দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। ধীরে ধীরে আলোর সঙ্গে সেই নূপুরের শব্দ কারাগারের সামনে এসে থামল। হ্যাঁ, সামনে দাঁড়িয়ে সেই মেয়েটি। কারাগারের ফটকের গরাদ ধরে রাজপুত্র দেখছেন তাঁকে। তখন অন্ধকারে এমন করে দেখতে পাননি তিনি। তখন দেখেছিলেন অন্ধকারে তার ছায়া। এখন তার হাতে একটি শেজবাতি। বাতির রোশনি মেয়েটির মুখখানি ছেয়ে ফেলেছে। সে-মুখ দেখে রাজপুত্র কথা হারালেন। মুগ্ধ হয়ে দেখতে লাগলেন তার মুখখানি। মেয়েটি তাঁকে ডাকল, “রাজপুত্র।”

চমকে উঠলেন রাজপুত্র। মনে হল মেয়েটির গলায় যেন সমস্ত গানের সুর একসঙ্গে বেজে উঠল। রাজপুত্র এবার নিজেকে হারিয়ে ফেললেন। তিনি এ কাকে দেখছেন! এই নিশুতি রাতে এই ভাঙা-প্রাসাদে কে এই মেয়েটি!

“রাজপুত্র!” আবার সে ডাকল।

রাজপুত্রের আবেশ কাটল। এতক্ষণে তিনি চোখ নামালেন।

মেয়েটি বলল, “তোমার জন্য খাবার এনেছি।”

সত্যিই মেয়েটির একহাতে শেজবাতি, আর একহাতে খাবারের রেকাব।

রাজপুত্র দেখলেন। কথা কইলেন না। দাঁড়িয়ে রইলেন নিশ্চল হয়ে।

“আমি জানি, অনেকক্ষণ তোমার খাওয়া হয়নি। তাই তোমার জন্যে খাবার এনেছি।”

সে-ই আবার কথা বলল।

হঠাৎ রাজপুত্রের ঘোর কাটল। তার মনে পড়ে গেল কাল তাঁকে মরতে হবে। রাজপুত্রের মুগ্ধ চোখদুটি রোষে লাল হয়ে উঠল। তিনি আক্রোশে কাঁপতে লাগলেন। তিনি রুক্ষস্বরে ধিক্কার দিয়ে বলে উঠলেন, “ধিক! ধিক তোমাদের ব্যবহার! একজন নির্দোষ মানুষকে কারাগারে বন্দি করে, এখন তাকে খাবার দিতে এসেছ! যে-মানুষটাকে কাল তোমরা হত্যা করবে, আজ তার মুখে খাবার তুলে দেওয়ার ইচ্ছে তোমাদের হয় কেমন করে? তোমাদের রাজাকে আমি ভাল করে দেখিনি। সে ছিল অন্ধকারে। তবু আন্দাজ করতে পারি, সে একটা দানব। আর তুমি সুন্দরী সেজে আমার সামনে দাঁড়িয়ে আছ এক ডাইনি। তুমি, হ্যাঁ, তুমিই সেই মেয়ে, আমাকে মায়াবলে ভুলিয়ে এই ভগ্ন প্রাসাদে নিয়ে এসেছ। আমার মৃত্যুর জন্য তুমিই দায়ী। তুমি ডাইনি! ডাইনি! ডাইনি! আমি একজন ডাইনির হাত থেকে খাবার নেব, এ-কথা ভাবতে তোমার লজ্জা করল না?”

ঝনঝন ঝনাত! আচমকা মেয়েটির হাত থেকে খাবারের রেকাবটি পড়ে গেল মাটির ওপর। দপ করে নিভে গেল, তার হাতের শেজবাতিটি। চারদিকে আবার নেমে এল অন্ধকার। মেয়েটি দাঁড়াল না আর। সেই অন্ধকারে সে ছুট দিল। তার পায়ের নূপুর কারাগারের ফাঁকা ঘরে প্রতিধ্বনি তুলে হারিয়ে গেল। রাজপুত্র হঠাৎ যেন ব্যস্ত হয়ে ফটকের গরাদে মুখ ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়লেন। কিন্তু তিনি আর দেখতে পেলেন না মেয়েটিকে। সে অন্ধকারে হারিয়ে গেল। তাঁর কানেও আর শোনা গেল না নূপুরের শব্দ। সব নিঝ্‌ঝুম হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে। রাজপুত্র তাঁর দু’হাত দিয়ে লোহার ফটকের গরাদ ধরে ঝাঁকুনি দিলেন, ঝম-ঝম-ঝম! তিনি যেন ভেঙে ফেলতে চান সেই ফটক। কিন্তু হায়। সে শক্তি তাঁর নেই। তিনি হতাশ হয়ে বসে পড়লেন ফটকের পায়ের কাছে। তাঁর বুদ্ধি যেন এলোমেলো হয়ে গেল। তিনি নির্বাক। এ কী করলেন তিনি! মেয়েটির মনে অমন করে আঘাত দিয়ে তিনি বোধহয় ঠিক করলেন না। কে বলবে তার মুখটি দেখলে, সে ডাইনি! ছিঃ ছিঃ। এ খেদ তিনি রাখবেন কোথায়? দুঃখের জ্বালায় তিনি ছটফট করতে লাগলেন। এখন তিনি কী করবেন! কী করলে আবার তিনি মেয়েটিকে দেখতে পাবেন! দেখতে পেলে তাকে বলবেন, “কিছু মনে কোরো না তুমি। আমি ভুল করেছি।” কিন্তু সে কি আর আসবে তাঁর কাছে! সে যদি না-ও আসে, রাজপুত্র কি যেতে পারেন না তার কাছে! না, রাজপুত্র তো বন্দি। কাল তাঁর মৃত্যু।

কারাগারের গরাদ ধরে রাজপুত্র অনেকক্ষণ বসেছিলেন। বসে বসে মেয়েটির জন্য অনেকক্ষণ হা-হুতাশ করেছেন। চোখদুটি সজাগ রেখে অন্ধকারের দিকে তাকিয়েছিলেন। কিন্তু বৃথাই তাকিয়ে থাকা। চোখদুটি ক্লান্ত হয়ে ঝিমিয়ে পড়ল। রাত এখন গভীর। একটা ঘুমের আবেশ বারবার তাঁর চোখদুটিকে জড়িয়ে ধরছিল। কিন্তু যতবারই তিনি তন্দ্রায় ঢুলে পড়ছিলেন, ততবারই তিনি চমকে চমকে জেগে উঠছিলেন। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি দানব এল। এই বুঝি তাঁকে ছোঁ মেরে তুলে নেয় শূন্যে!

একবার তিনি আর পারলেন না। একবার সত্যিই তিনি চমকে ওঠার শক্তি হারালেন। এখন তাঁর চোখদুটি শান্ত হয়ে ডুবে গেছে ঘুমে!

দ্যাখো তো, এই অন্ধকারে যেন আবার একটি ছায়া ধীরে-ধীরে এগিয়ে আসছে কারাগারের দিকে। ভারী সতর্ক সে। যেন শব্দ না ওঠে তার আলতো পায়ে। যেন ঘুম না ভেঙে যায় রাজপুত্রের! তবে কি সে দেখতে পেয়েছে ঘুমে অচেতন রাজপুত্রকে এই অন্ধকারেও। হয়তো। হয়তো আমরাও বুঝতে পারব কার সেই ছায়া আর একটু কাছে এলে। এ কি তবে সেই মেয়েটি। রাজপুত্র বুঝি একেই ডাইনি বলে গঞ্জনা দিলেন!

ঠিক বলেছ।

তবে ওর পায়ে নূপুর বাজে না কেন! কোথা গেল নূপুর!

পায়ের নূপুর সে খুলে ফেলেছে। সে-দুটি তার কোমরে বাঁধা রেশমি কাপড়ের থলিতে।

সে ধীর পায়েই এগিয়ে এল রাজপুত্রের কাছাকাছি। এগিয়ে এল কারাগারের সামনে। দেখল, ঘুমোচ্ছেন রাজপুত্র। কেমন অসহায়ের মতো পড়ে আছেন মানুষটা কারাগারের কঠিন পাথরের ওপর। সে হাঁটু গেড়ে বসল। অন্ধকারে কে বুঝবে, তার চোখের কোণে কান্নার ফোঁটাগুলি তখন টলমল করছে কি না। কে বলবে, তার মন তখন কেঁদে উঠে বলতে চাইছে কি না, “রাজপুত্র, আমি ডাইনি নই। আমি তোমার মৃত্যুর জন্য দায়ী নই রাজপুত্র। আমি তোমার বন্ধু। আমি তোমাকে বাঁচাতে চাই।”

কিন্তু একটি কথাও মুখ ফুটে বেরোল না তার। অন্ধকারে, পলকহীন চোখে সে শুধু রাজপুত্রের মুখখানি দেখবার চেষ্টা করল। তারপর তার যে কী মনে হল, ফটকের গরাদে হাত গলিয়ে সে রাজপুত্রের মাথাটি ছুঁতে গেল। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘুমের ঘোরে রাজপুত্র একটি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সে ছুঁতে পারল না। সে উঠে দাঁড়াল। তার কোমরে বাঁধা রেশমি কাপড়ের থলিটি সে রাজপুত্রের মাথার কাছে রেখে দিল। তারপর সে আঁচলে লুকনো কারাগারের চাবিটি বার করল। অত্যন্ত সতর্ক হাতে সেটি কারাগারের কুলুপে গলিয়ে খুলে ফেলল। কিন্তু এমনই মন্দ কপাল তার, ফসকে পড়ে গেল চাবির তোড়াটি তার হাত থেকে। শব্দ হল আচমকা। রাজপুত্র আঁতকে উঠলেন। ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলেন। তাঁর ঘুম উঠল মাথায়। তিনি চিৎকার করে উঠলেন, “কে-এ-এ-এ।”

তার আগেই মেয়েটি ছায়ার মতো অন্ধকারে হারিয়ে গেল। আর রাজপুত্রের হাতে রেশমি কাপড়ের থলিটির ছোঁয়া লেগে গেল। তিনি ভয়ে হাত সরাতে গেলেন। হাত লাগল বেটক্কা কারাগারের ফটকে। ফটক খুলে গেল! তিনি হকচকিয়ে থমকে গেলেন। এ কী, কারাগারের ফটক খোলা! তিনি নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারেন না! তাঁর বুক ঢিপ-ঢিপ করতে লাগল। গায়ে কাঁটা দিল। তবে এ কি সত্যি! হ্যাঁ সত্যিই তো! ওই তো ফটক দু’ ফাঁক হয়ে খুলে গেছে। তিনি ধড়ফড় করে উঠে পড়লেন। আর ভাববার সময় নেই। সেই রেশমি কাপড়ের থলিটা তুলে নিলেন তিনি। দিলেন ছুট। কী তাঁর উত্তেজনা। এখন আর পেছনে তাকানো নয়। এখন শুধু ছুটতে হবে সামনে। এই অন্ধকারে। কোথায় তাঁর ঘোড়া আছে! কোনদিকে।

এই অন্ধকারে ঘোড়া খুঁজে বার করা রাজপুত্রের সাধ্যি নয়। এখন ঘোড়ার কথা মূর্খের মতো ভাবাটা কি ঠিক হচ্ছে! আগে নিজের কথা না-ভেবে ঘোড়ার কথা ভাবে কোন মানুষ। নিজের প্রাণটা তো আগে বাঁচুক, তারপর অন্য কথা। তাই, অন্য কথা আর না ভেবে তিনি নিজের কথা ভেবেই ছুটতে ছুটতে পালাবার পথ খুঁজতে লাগলেন।

রাজপুত্র ছুটতে ছুটতে বুঝতে পেরেছেন, এখন তিনি বেপথে যাচ্ছেন না। মনে হচ্ছে, সেই ভাঙা প্রাসাদ পেছনে ফেলে তিনি সামনে চলেছেন। এখন আর প্রাসাদের ভাঙা পাথরের চাঁইগুলো তাঁর পায়ে লাগছে না। তাই তিনি ছুটতে ছুটতে থামলেন। একটানা অনেকটা ছুটে তিনি দমসম হয়ে গেছেন। এখানে একটু জিরিয়ে নেওয়া যায়! তাঁর ঘোড়াটা কাছে-পিঠে এখানেই কোথাও আছে কি না এই অন্ধকারে ঠাওর করা মুশকিল। অবশ্য চিৎকার করে ডাকা যায় ঘোড়ার নাম ধরে। তবে সেটা খুব বুদ্ধিমানের কাজ হবে না। তাঁর ডাক যদি শত্রুর কানে পৌঁছে যায়, তবে নিশ্চিত মরণের হাত থেকে কেউ তাঁকে আর রক্ষা করতে পারবে না।

হঠাৎ রাজপুত্র থমকে গেলেন। যেন গাছের ডালে পাখির ডাক শুনতে পেলেন তিনি! তবে কি ভোর হচ্ছে! হ্যাঁ! কেন না, একটি-দুটি করে অনেক পাখিই ডাকাডাকি শুরু করে দিল। তখন তাঁর চোখ পড়ল আকাশের দিকে। ঠিক বটে, এদিকে বনটা তেমন ঘন নয়। চোখ মেললেই গাছের আড়াল থেকে আকাশে নজর পড়ে যায়। ভোরের আকাশে রক্ত রঙের ছোঁয়া লাগছে। একটু পরেই আকাশ উপচে যাবে আলোয়।

ভোরের আলো দেখেই রাজপুত্র ভয় পেয়ে গেলেন। হয়তো এতক্ষণে ভাঙা প্রাসাদে তুলকালাম শুরু হয়ে গেছে, তাঁকে দেখতে না পেয়ে। কারাগারের অমন জবরদস্ত কুলুপটা যে কেমন করে খুলে গেল, সেটা তিনি কিছুতেই ভেবে পাচ্ছেন না। ভেবে পাচ্ছেন না, তাঁর হাতের এই থলিটাই বা এল কোত্থেকে। এবার ভোরের আলোয় ভাল করে থলিটা তিনি পরখ করলেন। অবশ্য খুললেন না। কানের কাছে থলিটা নাড়লেন। শব্দ উঠল, ঝুনঝুন। এ কি মোহরের ঝনঝনা। না তো! তবে! খুলে না দেখলে বুঝবে কে! না, এখন থাক। পরে খুললেই হবে। এখন সবচেয়ে আগে দরকার ঘোড়াটাকে খুঁজে বার করা। সুতরাং এখন তিনি রেশমি কাপড়ের থলিটা কোমরে গুঁজে, বনের ভেতর ঘোড়ার তল্লাশি শুরু করলেন।

কাজটা মোটেই সহজ নয়। খুঁজতে খুঁজতে তিনি যে বনের আরও গভীরে ঢুকে যাচ্ছেন, এটা বুঝতে তার কষ্ট হল না।

কিন্তু তিনি অমন করে থমকে গেলেন কেন! অমন পাথরের মতো স্থির হয়ে কান পেতে কী শুনছেন! তাঁর চোখের পাতাদুটি যেন উদ্বেগে তিরতির করে কাঁপছে। তবে কি তিনি সেই উড়ুক্কু দানবের ডানার শব্দ শুনতে পেয়েছেন!

আর দাঁড়ানো নয়। সামনেই বিপদ। তিনি খানিকটা ঝোপ ডিঙিয়ে ছুট দিলেন। লুকিয়ে পড়ার মতো একটা জায়গা এখনই খুঁজে বার না করলে, তাঁর আর রক্ষা নেই।

ওটা কী! মনে হচ্ছে একটা গর্ত। হ্যাঁ, ঠিক তাই। লুকোবার মতো এমন নিরাপদ জায়গা আর পাওয়া যাবে না। তিনি হুড়মড় করে গর্তের মধ্যে লাফিয়ে পড়লেন। আশপাশের ঝোপঝাড়গুলো এমনভাবে গর্তটাকে ছেঁকে আছে, কার সাধ্যি খুঁজে পায় রাজপুত্রকে। অবশ্য গর্তের মধ্যে যদি সাপখোপ থাকে তা হলে অন্য কথা। একটা নৃশংস দানবের হাত থেকে প্রাণ বাঁচাতে গিয়ে যদি সাপের মতো আর একটা হিংস্র প্রাণীর খপ্পরে তিনি পড়েন, তা হলে সেটা দুর্ভাগ্য ছাড়া আর কী বলবে তুমি?

না, তেমন কিছু ঘটল না। গর্তের ভেতর রাজপুত্র বেমালুম ঘাপটি মেরে বসে রইলেন। বসে কান খাড়া করে শুনতে লাগলেন, শব্দটা কোনদিক থেকে কোথায় যায়। শব্দটা যতই বাড়ছে, তাঁর মনের মধ্যে উত্তেজনাটাও ততই দানা বাঁধছে। তিনি আঁচ করতে পারলেন, শব্দটা এদিকেই আসছে। আর কোনও কথা নয়। চুপ!

এমন সময় হুপ! এ কে? কে এই গর্তের ওপর লাফ মেরে ছুটল। ছুটল তাঁর মাথা টপকে। এ তো সেই উড়ুক্কু দানব নয়। তিনি চটপট উঠে পড়লেন। সামাল। সামাল। তিনি দেখতে পেয়েছেন। এ যে তাঁর ঘোড়া, তুর্কি! নিশ্চয়ই গাছে বাঁধা লাগামটা সে টেনে টেনে ছিঁড়েছে। পালাচ্ছে। তিনি আর সময় নষ্ট করলেন না। চিৎকার করে হাঁক পাড়লেন, “তুর্কি-ই-ই-ই।”

এক ডাকেই ঘোড়া থমকে দাঁড়ায়। দাঁড়িয়েই ঘোড়া পিছু ফিরল। সঙ্গে সঙ্গে রাজপুত্র ছুট দিলেন ঘোড়ার কাছে। ঘোড়া দেখতে পেয়েছে তার প্রভুকে। আনন্দে চার পা তুলে সে লাফালাফি লাগিয়ে দিল। তারপর রাজপুত্র ছুটে গিয়ে যখন তাকে জড়িয়ে ধরলেন, তখন সে চেঁচিয়ে উঠল, চিঁ-হিঁ-হিঁ!

চোখের পলকে ঘোড়ার পিঠে চড়ে বসলেন রাজপুত্র। ঘোড়া ছুটল তিরবেগে। সামনে কিছু বাধা পড়লেই সে লাফ মেরে টপকে যায়। আর সিধে রাস্তা ফাঁকা দেখলেই কদম পায়ে ছুটে পালায়। মাঝে মাঝে ডাক ছাড়ে। বনের বুক থরথরিয়ে কেঁপে ওঠে।

আর রাজপুত্র কী করছেন?

ঘোড়ার পিঠে বসে বসে রাজপুত্র ভাবছেন, ঘোড়া যায় কোন দিকে! ঠিক পথে, না বেঠিক পথে! উড়ুক্কু দানব যদি এইদিকে উড়ে আসে তবে তিনি তাকে মারবেন কী দিয়ে! তাঁর নেই তরোয়াল কোমরে। সঙ্গে তিরও নেই, ধনুকও নেই। সব কেড়ে নিয়েছে দানবটা। এখন তাঁর শূন্য হাত। ছিন্ন পোশাক। ধুলো-ময়লা গায়ে যেমন, পোশাকে তেমন। এখন তাঁকে দেখলে কে বলবে রাজপুত্র। অবশ্য কোমরে তাঁর রেশমি কাপড়ের থলিটি এখনও ঝুলে আছে। ঘোড়া যখনই লাফ মারছে, তখনই থলির ভেতরে কী যেন বেজে উঠছে ঝুনঝুন, ঝুনঝুন! চমকে উঠছেন রাজপুত্র। মনটা তাঁর ছমছমিয়ে বলে উঠছে, এ কি মোহরের শব্দ, না আর কিছু!

এ যে দেখি তাজ্জব ব্যাপার!

কেন, কী হল?

দেখতে পাচ্ছ না? ওই তো, ঘোড়া ঠিক পথেই ছুটে চলেছে! ঠিক, ঠিক। বনের এইদিকটা পেরোলেই তো রাজধানীর পথ। ঘন বন এখন কত হালকা হয়ে গেছে দ্যাখো! সত্যি! বাহাদুর বলতে হয় ঘোড়াকে। ফেরার পথ ঠিক চিনেছে!

আরও খানিকটা ছুটে ঘোড়া রাজপথে পড়ল। ঘোড়ার খুরে শব্দ উঠল, টগবগ টগবগ! পথের মানুষ রাজপুত্রকে দেখতে পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। কেউ হাত তোলে, কেউ মাথা নামায়। রাজপুত্র মুচকি মুচকি হাসেন। ঘোড়া ছুটেই চলে। ছুটতে ছুটতে তিনি রাজপ্রাসাদের সিংদরজা পেরিয়ে প্রাসাদে প্রবেশ করেন। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়ে গেল, হইহই রইরই কাণ্ড। মুখে মুখে খবর রটে যায়, “এসেছেন, এসেছেন।” ছেলেকে দেখতে রাজা ছুটে এলেন। রানি ছুটে এলেন। মন্ত্রী, সান্ত্রি যিনি যেখানে ছিলেন সবাই ছুটলেন। মুহূর্তের মধ্যে রাজবাড়িতে মচ্ছব লেগে গেল।

তারপর?

রাজপুত্রের মুখে সবাই সেই ভয়ংকর গল্প শুনে থ হয়ে গেল। সেই গল্প শুনে কেউ ভয়ে, কেউ ভাবনায় যে-যার কাজে ফিরল। আর রাজপুত্র নিজের ঘরে ফিরলেন ক্লান্ত পায়ে।

ঘরে ঢুকেই রাজপুত্র দরজা বন্ধ করে দিলেন। নিজের কোমর থেকে সেই রেশমি কাপড়ের থলিটা বার করলেন। এতক্ষণ তিনি উদ্‌গ্রীব হয়ে এই থলিটার কথাই ভেবেছেন! কী আছে এই থলির ভেতর? তিনি খুলে ফেললেন থলির মুখ! কিন্তু এ কী! এর ভেতরে যে দুটি সোনার নূপুর। সোনার নূপুরের গায়ে জড়ানো এ যে দেখি একটি কাগজ! কী যেন লেখা কাগজে! আর তর সইল না রাজপুত্রের। তিনি পড়তে শুরু করলেন। তাতে লেখা:

হে রাজপুত্র, তোমাকে আমার সবকথা বলার মতো একটুও সময় নেই। কেন না, তোমাকে হত্যা করার সব ব্যবস্থা তৈরি। কিন্তু আমি তোমাকে বাঁচাবার জন্য ছুটে এসেছি। দানবের কবল থেকে কারাগারের চাবি চুরি করে এনেছি আমি। তোমাকে এখনই পালাতে হবে। আমার ওপর তোমার রাগ দেখে আমি একটুও দুঃখ পাইনি। সত্যিই তো, আমি নিজে হাত ধরে তোমাকে ওই দানবটার কাছে নিয়ে গেছি। কাজেই তোমার মৃত্যুর জন্যে আমি ছাড়া আর কাকে দুষবে তুমি! তুমি বিশ্বাস করো, তোমাকে আমি যখনই এই ভগ্ন প্রাসাদে দেখেছি, তখন থেকেই আমি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে আছি। হে রাজপুত্র, তোমাকে আমি কেমন করে বোঝাই আমি ডাইনি নই। আমি মায়াবল জানি না। আমি একজন সাধারণ মেয়ে। আমার মা আছে, বাবা আছে, ভাই আছে। হে রাজপুত্র, শোনো, তোমার মতো আমিও ধরা পড়েছি এই দানবের হাতে। তবে, তুমি যেমন অন্ধকার বনে পথ হারিয়ে ধরা পড়েছ, আমি তেমন না।

আমার মা-বাবা আমাকে শখ করে নাচ শিখিয়েছিল। আমার নাচের সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছিল নানা দিকে। নানা দেশের কত মানুষ আমার নাচ দেখতে আসত। আমায় তারা কত উপহার দিত। একদিন এক সওদাগর এল আমার নাচ দেখতে। কী সুন্দর তার চেহারা। কী চমৎকার তার পোশাক-আশাক। কী মিষ্টি তার কথাবার্তা। আমার নাচ দেখে তার তারিফের যেন শেষ নেই। এত খুশি হল, কী বলব! খুশি হয়ে সে আমায় এই সোনার নূপুরজোড়া উপহার দিয়েছিল। যাওয়ার সময় সওদাগর বাবাকে বলে গেল একদিন সে জুড়িগাড়ি পাঠিয়ে দেবে। তার বাড়িতে নাচ দেখাতে যেতে হবে। সঙ্গে আমার বাবা, মা, ভাই সক্কলকে নেমন্তন্ন করে গেল। সেইমতো একদিন জুড়িগাড়ি এল। সেইমতো একদিন সবাই মিলে সওদাগরের বাড়ি রওনা দিলুম। বললে বিশ্বাস করবে না, জুড়িগাড়ির ঘোড়া কদম পায়ে এমন দৌড় মারল, মনে হল, কয়েক যোজন পথ চোখের পলকে পেরিয়ে এল। পৌঁছে গেল সওদাগরের সেই আস্তানায়। তুমি শুনলে হয়তো আরও অবাক হবে, সেই সওদাগর আর কেউ নয়, এই দানবটা নিজে। মায়াবলে এই দানব নিজেই ছদ্মবেশ ধারণ করে সওদাগর সেজেছিল। জুড়িগাড়ির সহিসও সেজেছিল সে। আমরা বুঝতে পারিনি ঘুণাক্ষরে। কিন্তু সে যখন নিজমূর্তি ধরল, তখন আমরা অসহায়। তার কালো কুচ্ছিত মুখখানা আর হিংসুটে চোখদুটো দেখলে দুর্দান্ত সাহসী মানুষেরও বুক কাঁপে। কাজেই তার ভয়ংকর মূর্তি দেখে আমার মা থাকতে পারল না। মা জ্ঞান হারিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। বাবা আঁতকে উঠল। আর আমার ছোট ভাই আর্তনাদ করে বাবাকে জড়িয়ে ধরল। আমি চিৎকার করে মায়ের কাছে ছুটে গেছি। কিন্তু এই দানবটা চোখের পলকে ধেয়ে এসে আমার চুলের মুঠি ধরল। হিড়হিড় করে টেনে মায়ের কাছ থেকে আমায় ছিনিয়ে নিল। বাবা ছুটে এল আমাকে বাঁচাতে। কিন্তু পারল না। দানবটা তার ডানার ঝাপটায় বাবাকে কাবু করে বাবার গলাটা খামচে ধরে বলল, “শোন রে মেয়ের বাপ, যদি বাঁচতে চাস তো এখান থেকে এক্ষুনি দূর হয়ে যা। তোদের এই মেয়েকে তোরা আর কোনওদিন ফিরে পাবি না। সে আমাকে ছাড়া আর কাউকে নাচ দেখাবে না। সে সারাদিন নূপুর পরে ঘুরে বেড়াবে। নূপুর বাজবে, আমি শুনব। আর আমার কথা যদি না শুনিস তবে আমার এই নখের আঁচড়ে তোর বুক ফুটো করে আমি রক্ত খাব।”

আমার মায়ের জ্ঞান ফিরে এসেছিল একটু পরেই। সেখানে আর দাঁড়াল না তারা। চলে গেল চিরদিনের জন্য। কোথায় গেল, আমি জানি না। সেই থেকে আমি এখানেই আছি। সেই থেকে এই সোনার নূপুর পরে আমি দানবকে নাচ দেখাই। হে রাজপুত্র, সেই সোনার নূপুরটি আজ আমি তোমার হাতে তুলে দিলুম। এইসঙ্গে তোমার কাছে আমার আকুল মিনতি, আমার মা, বাবা আর ভাইকে যদি তুমি খুঁজে পাও, তবে এই নূপুর দুটি তাদের দেখিয়ে বোলো, আমি এখনও বেঁচে আছি। হে রাজপুত্র, আমার পায়ে সোনার নূপুর না দেখলে জানি না, দানবটা আমায় মেরে ফেলবে কি না। সে হয়তো আমাকে মেরে ফেলে উন্মাদের মতো হন্যে হয়ে এই নূপুরজোড়া খুঁজে বেড়াবে। যদি সে খুঁজে পায়, তবে বুঝতেই পারছ কী সাংঘাতিক কাণ্ড সে করবে। কাজেই হে রাজপুত্র, সে যেন ঘুণাক্ষরেও না টের পায়। বলে রাখি, আমার মা-বাবাকে তুমি যদি খুঁজে না-ও পাও, তবে, এই নূপুর তুমি নিজের কাছে রেখে দিয়ে। এমন জায়গায় রাখবে, যেন কেউ না দেখতে পায় কোনওদিন। কেউ না কোনও দিন এই নূপুর দুটি চেয়ে বসে তোমার কাছে। এ বড় সর্বনেশে নূপুর। শোনো রাজপুত্র, একদিন দানব আমায় বলেছিল, এনূপুর যতদিন আমার পায়ে বাজবে, ততদিন আনন্দে উথলে উঠবে দানবের জীবন। কোনও রোগ তাকে ছুঁতে পারবে না। কিন্তু আমার পায়ে বাজতে বাজতে এ নূপুর যদি কোনওদিন থেমে যায়, তবে সেদিন থেকেই তার দুঃসময় ঘনিয়ে আসবে। যতদিন নূপুর আর বাজবে না, ততদিন ধীরে ধীরে তার শক্তিও শেষ হয়ে আসবে। তার মৃত্যু-ঘণ্টা বেজে উঠবে। কিন্তু আবার যদি কোনও মন্দকপাল মেয়ের পায়ে এ নূপুর বেজে ওঠে, তবে এই দানব আবার বেঁচে উঠতে পারে। বেঁচে উঠবে সেই দুর্ভাগা মেয়েকে হত্যা করে। আরও শুনে রাখো রাজপুত্র, এ নূপুর যদি কেউ কোনওদিন চেয়ে বসে, তবে তাকে দিতেই হবে। নইলে তোমারও সর্বনাশ হবে। সুতরাং দানব যতদিন না মরছে, ততদিন কেউ যেন না দ্যাখে ওই নূপুর। কেউ যেন না চেয়ে বসে। হে রাজপুত্র, অনেক কথা বলে ফেললুম। হয়তো তোমার সঙ্গে আর আমার কোনওদিন দেখা হবে না। তুমি প্রথম যেদিন রাজার মুকুট মাথায় পরে সিংহাসনে বসবে, সেদিন রাজ্য জুড়ে কত আনন্দ উৎসব হবে। সেদিন হঠাৎ যদি আমার কথা মনে পড়ে যায়, তখন আশাকরি এই কথাটাও তোমার মনে পড়বে, আমি ডাইনি নই। আমি এক দুঃখী মেয়ে। আমার নাম আয়েলা।

পড়া শেষ হলে রাজপুত্র অনেকক্ষণ বোবার মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। তিনি যেন শুনতে পেলেন ঘরের কোণে কোণে কে যেন চিৎকার করে বলছে, “আমি ডাইনি নই রাজপুত্র, আমি ডাইনি নই। আমি আয়েলা, আমার নাম আয়েলা।”

রাজপুত্র অস্থির হয়ে উঠলেন। তাঁর মনে হল, এক্ষুনি তিনি আবার ছুটে যান সেখানে। সেই দানবের ভাঙা প্রাসাদের আস্তানায়। না, অত অধৈর্য হলে চলবে না। এখন ঠান্ডা মাথায় কাজ করতে হবে। প্রথমেই খুঁজে বার করতে হবে আয়েলার মা-বাবাকে। কিন্তু তাঁদের ঠিকানা? আয়েলা তো সেটা লেখেনি। তবে কি সে লিখতে ভুলে গেল। এই অতবড় রাজ্যে তিনি কোথায় খুঁজবেন তাঁদের। তিনি সোনার নূপুরজোড়া খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখলেন। তারপর লুকিয়ে রাখলেন। এখন কাল রাতের ওই সাংঘাতিক ধকলটা সামলাবার জন্য তাঁর একটু বিশ্রাম চাই। তারই তোড়জোড় শুরু হয়ে গেল রাজবাড়িতে।

তিনি পুরো একটা দিন অপেক্ষা করলেন। পুরো একটা দিন তিনি বিশ্রাম দিলেন তাঁর ঘোড়া তুর্কিকে। একদিন পরে তুর্কির পিঠে চেপে তিনি আয়েলার মা-বাবাকে খুঁজতে বেরোলেন।

এ তো এক অসম্ভব কাজ। জানা নেই, চেনা নেই তিনি তাঁদের কেমন করে খুঁজে পাবেন। একদিন, দু’দিন, তিনদিন তিনি তন্নতন্ন করে চেষ্টা করলেন। কেউ তাঁদের খোঁজ দিতে পারল না। অগত্যা তিনি ঢোল-শহরত করতে আদেশ দিলেন। ঢোল নিয়ে দূত ছুটল রাজ্যের দিকে দিকে। তারা চিৎকার করে খবর জারি করল:

আয়েলা নামে একটি মেয়ের খোঁজ পেয়েছেন রাজপুত্র। তাঁর বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতে চান তিনি। তাঁরা নিজেরা অথবা তাঁদের জানাশোনা কেউ রাজপুত্রের সঙ্গে দেখা করলে, তিনি সব জানাবেন। সুতরাং যত তাড়াতাড়ি সম্ভব যেন রাজবাড়িতে যোগাযোগ করা হয়।

ঢোল-শহরত হয়ে গেছে কতদিন, কোনও সাড়া পেলেন না রাজপুত্র। এখন মিথ্যে অপেক্ষা করা। অগত্যা সেই সোনার নূপুরজোড়া তিনি আর নিজের কাছে রাখার সাহস পেলেন না। তিনি ঠিক করলেন এই সোনার নূপুরজোড়া তিনি তাঁর স্বর্ণ-ভাণ্ডারে রেখে দেবেন। স্বর্ণ-ভাণ্ডারের চাবি তাঁর নিজের কাছেই থাকে। তিনি ছাড়া সেই ভাণ্ডারে আর কারও ঢোকার হুকুম নেই। সুতরাং এই নূপুরজোড়া অন্য কারও দেখতে পাওয়ার ভয় নেই।

হ্যাঁ, তিনি নূপুরজোড়া তাঁর স্বর্ণ-ভাণ্ডারেই রেখে দিলেন।

তারপর আরও কতদিন কেটে গেল। রূপসী নদীর পাড়ে পাড়ে আরও কত ঢেউ উথালি-পাথালি নেচে গেল। কত শীতের সকালে কুয়াশায় ভরে গেল সবুজ মাঠ। কত ভ্রমর বসন্তের ফুলে ফুলে গেয়ে গেল কত গান। এমনই করে সময় বয়ে গেল। রাজপুত্র আরও বড় হলেন। এখন রাজপুত্র রাজা হয়েছেন। তাঁর মাথায় মুকুট সেজেছে সোনার। গায়ে তাঁর মণি-খচিত পোশাক। পায়ে তাঁর নাগরা জুতো। রাজকাজে ব্যস্ত হয়ে তিনি কবেই ভুলে গেছেন আয়েলা নামে মেয়েটিকে। ভুলে গেছেন সোনার নূপুরের কথা। রাজার কি আর হাজার কাজে তুচ্ছ এসব মনে থাকে!

কিন্তু আজ তাঁর আবার সব মনে পড়ে গেল। মনে পড়ে গেল আজই, এইমাত্র সর্বনাশা নূপুরজোড়া বীণ-বাজিয়ের হাতে তুলে দিয়ে। ছিঃ ছিঃ, এ তিনি কী করলেন! বীণ-বাজিয়েকে কেন তিনি স্বর্ণ-ভাণ্ডারে নিয়ে এলেন। আয়েলা যে কাউকে নূপুরজোড়া দেখাতে বারণ করেছিল। ওই সোনার নূপুর যে পরবে তার সর্বনাশ হবে। কেন তিনি অমন সাদাসিধে মানুষটাকে স্বর্ণ-ভাণ্ডারে নিয়ে গেলেন! কেন! কেন!

রাজার চতুর্দোলায় বসে সেদিন কী খুশি হয়েই না বীণ-বাজিয়ে বাড়ি ফিরল। “বউ, বউ, দ্যাখো, তোমার মেয়ের জন্যে কী এনেছি!” বলতে বলতে সে ঘরে ঢুকল একমুখ হাসি নিয়ে। সে কী আনন্দ তার!

বউ ছুটে এল হন্তদন্ত হয়ে। বীণ-বাজিয়েকে দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল সে। অবাক হয়ে দেখল, বীণ-বাজিয়ের গলার দিকে। সে-গলায় রত্নহার ঝলমল করছে। হাতে তার সোনার নূপুর ঝিকমিক করছে।

বউকে অমন করে চেয়ে থাকতে দেখে বীণ-বাজিয়ে হো-হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “বউ, অমন করে দেখছ কী? এই নূপুর আমায় রাজা দিয়েছেন আমার মেয়ের জন্যে। আর আমার বীণা শুনে রাজা আমার গলায় এই হার পরিয়ে দিয়েছেন। এ-হার আমার নয় বউ, এ তোমার। তুমি গলায় পরো।” বলে বউয়ের গলায় সেই হার পরিয়ে বীণ-বাজিয়ে খুশিতে উছলে উঠে ডাক দিল, “রূপসী!”

বাবার ডাক শুনে ছোট্ট মেয়ে রূপসী দুলতে দুলতে ছুটে এল। বাবা তাকে খুশিতে আদরে কাছে টেনে জড়িয়ে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “ওরে মেয়ে, এই দ্যাখ তোর জন্য নূপুর এনেছি। সোনার। দেখি, দেখি, পায়ে পর। দেখি কেমন মানায়।” বলে মেয়ের দু’পায়ে দুটি নূপুর পরিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “ওরে, রূপসী, এ নূপুরজোড়া আমি এনেছি রাজার স্বর্ণ-ভাণ্ডার থেকে। তিনি দিয়েছেন। এই নুপুর পরে আজ তুই নাচ। আমি বীণা বাজাই।”

খুশিতে উদ্বেল রয়ে রূপসী নূপুর পায়ে নেচে উঠল। বাবা তার বীণার তারে ঝংকার তুলল। আর, মা আনন্দে হতবাক হয়ে সেই নাচ দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে মায়ের চোখে জল ভরে যায়। সে যেন আনন্দের টুপ-টাপ বৃষ্টি ফোঁটা। ঝরে পড়ছে তার গাল বেয়ে।

এমনই করে এখন থেকে রোজ নাচে রূপসী। এখানে-ওখানে যায়। মেয়ে নাচে, বাবা বীণা বাজায়, সবাই বলে, আহা, কী সুন্দর, কী সুন্দর!

এমনই সময় একদিন রাজার চতুর্দোলা এল। রাজার সঙ্গে বীণ-বাজিয়ের কথামতো রূপসী নাচ দেখাতে রাজবাড়ি চলল। সঙ্গে চলল মা আর বাবা।

রাজবাড়ির সিংদরজা পেরিয়ে চতুর্দোলা যখন অন্তঃপুরে ঢুকল, তখন সে আর এক দৃশ্য। ছোট্ট মেয়ে রূপসীর দু’চোখে যেন স্বর্গের যত আলো একসঙ্গে উপচে পড়ল। সে অবাক হয়ে দ্যাখে এদিক-ওদিক চারদিক, আর বিহ্বল হয়ে মাকে জড়িয়ে ধরে। মায়ের চোখেও বিস্ময়। সে-চোখ যেদিকে চায়, স্থির হয়ে থমকে দাঁড়ায়।

চতুর্দোলার সামনে এসে রাজা হাসতে হাসতে হাত বাড়ালেন। ডাক দিলেন, “এসো, এসো বীণ-বাজিয়ে। এই বুঝি তোমার মেয়ে আর মেয়ের মা?”

বীণ-বাজিয়ে রাজার সামনে নত হয়ে উত্তর দিল, “হ্যাঁ হুজুর।”

রাজা সঙ্গে সঙ্গে রূপসীর হাত ধরলেন। তার পায়ে সোনার নূপুর বেজে উঠল। রাজা নূপুরের শব্দ শুনেই কেমন যেন থতমত খেয়ে গেলেন। তাঁর মুখের হাসি এক মুহূর্তের জন্যে মিলিয়ে গেল। সেই মুখ কারও চোখ পড়ার আগেই তিনি আবার নিজেকে সামলে নিলেন। রূপসীকে আচমকা জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার নাম কী?”

রূপসী নরম গলায় উত্তর দিল “রূপসী।”

“রূপসী!” নাম শুনে খুশিতে হেসে উঠলেন রাজা। হাসতে হাসতে বললেন, “বাঃ! নামটি তো ভারী চমৎকার।” এমনভাবে বললেন, যেন এইমাত্র নূপুরের শব্দ শুনে তিনি যে শিউরে উঠেছিলেন সেটা কেউ না বুঝতে পারে।

রাজার তারিফ শুনে বীণ-বাজিয়ে উত্তর দিল, “ওর মা রেখেছে।”

চকিতে মায়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে রাজা বললেন, “এ যে আমাদের নদীর নামে মেয়ের নাম।”

মা মাটির দিকে চোখ নামায়। মুচকি হেসে লজ্জা পায়।

রাজা রূপসীর মাকে বললেন, “আপনি এসেছেন, খুব খুশি হয়েছি।” তারপর বীণ-বাজিয়ের কাঁধে হাত রেখে বললেন, “চলো হে ওস্তাদ, আমার খাস-মহলে চলো। সেইখানেই আজ তোমার মেয়ের নাচ দেখব, তোমার বীণা শুনব।”

রাজা রূপসীর হাত ধরে খাস-মহলের একটি একটি ঘরে ঢোকেন। তিনি একটি একটি ঘর তাদের দেখান। দেখান, কোনটা তাঁর পোশাক-ঘর, কোনটা তাঁর খাবার-ঘর। ডাইনে দেখান আরাম-ঘর। পেছন দিকে শোবার-ঘর। আর, সব শেষে খুশির-ঘর। হ্যাঁ, এই ঘরে ভর্তি যত বাজনা-বাদ্যি। এই ঘরে রাজা গান শোনেন। নাচ দেখেন। ক্বচিৎ ইচ্ছে হলে, নিজেই তিনি সুরবাহারের সুর বাজান। নয়তো, তানপুরাতে গলা সাধেন। বীণ-বাজিয়ে আর তার বউ এসব দেখছে যত, চোখের পাতা কাঁপছে তত। মুখে তাদের কথাও নেই, বার্তাও নেই। যেন বোবা।

হঠাৎ কথা বলল রূপসী। বলল, “রাজামশাই, রাজামশাই রাজবাড়িতে রানিমাকে দেখছি না যে! রাজপুত্তুর, রাজকন্যা, কোথায় তারা?”

রূপসীর কথা শুনে রাজা প্রথমটা হকচকিয়ে গেছলেন। তারপর হেসে ফেললেন। হাসতে হাসতে রূপসীকে আদর করে বললেন, “তুমিই তো আমার রাজকন্যা।” বলে, কথা ঘোরালেন, “চলো আগে খেয়ে আসি। খেয়েদেয়ে গল্প করব। গল্প করে। তোমার নাচ দেখব।”

বীণ-বাজিয়ে আর তার বউ কিন্তু ঠিক বুঝল রাজার এখনও বিয়ে হয়নি। অবশ্য বিয়ের বয়েসও যায়নি।

বলতে কী, খেতে-পরতে, গল্প করতে অনেক বেলা বয়ে গেল। বেলা বয়ে গেলে, সূর্য পাটে বসলেন। রাজবাড়িতে সেঁজুতি জ্বলে উঠল। তারপর ঝলকে উঠল কতরকমের আলোর রোশনাই। নানা আলোর বাহার দেখতে দেখতে রূপসীরও চোখ ধাঁধিয়ে যায়। মন বলে, আরও দেখি।

আর সত্যি, আরও দেখল সে। আরও দেখতে দেখতে রূপসী তার মা আর বাবার সঙ্গে রাজার পিছু পিছু খুশির ঘরে পৌঁছে গেল। বীণ-বাজিয়ে বীণার তারে সুর তুলল। মেয়ে তার নাচ ধরল। মেয়ে নাচছে, হেলেদুলে, খুশি হয়ে। মুখে তার হাসি ঝরছে। পায়ে তার নূপুর বাজছে। বীণার তারে ঝনাতকার। আর রাজা বলেন, “চমৎকার।”

ঠিক তক্ষুনি হঠাৎ যেন একঝলক দমকা হাওয়া ঘরে ঢুকেই হুস-হাস করে জানলা দিয়ে উধাও হয়ে গেল। ঘরের আলো হাওয়ার দাপটে নিভতে নিভতেও নিভল না। তা, সেদিকে কারও মনই গেল না। সবাই মেয়ের নাচ দেখতেই মশগুল।

কিন্তু হঠাৎ আবার হাওয়া ছুটল। এবার হাওয়ার আরও তেজ। রাজা হন্তদন্ত হয়ে উঠে পড়লেন। অলিন্দে মুখ বাড়ালেন। কই, আকাশে তো মেঘ দেখা যায় না! এখন আকাশভর্তি তারা। তবে?

এবার কিন্তু হাওয়া ক্ষান্তি দিল না। মনে হল, এখন যেন হাওয়ায় ঝড়ের ঝাপটা উঠছে। যেন, একদঙ্গল হাতি রাজবাড়িতে ঢুকে পড়ে ক্ষিপ্ত হয়ে নাচন শুরু করে দিয়েছে। দেখতে দেখতে সেখানে যত আলো ছিল, সব ঝুপ-ঝাপ করে নিভে গেল। দোর-জানলা সব ধুম-ধাড়াক্কা উলটে-পালটে দাপাদাপি শুরু করে দিল। এখানে ওখানে যত দামি দামি পর্দা ছিল, সব ছিঁড়ে ফরদাফাঁই হয়ে গেল। দরবারে, কি বারমহলে যত ঝাড়লণ্ঠন ঝোলানো ছিল, সব ভেঙে পড়ল। গড়িয়ে ছড়িয়ে সব নৈরেকার। সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার।

অন্ধকারে তখন শুরু হয়ে গেল আর এক কাণ্ড! এ ছুটতে ছুটতে ওদিকে পালায়। ও ছুটতে ছুটতে গলা ফাটায়। এ যদি ধাক্কা খায়, তো ও চিতপটাং হয়ে ডিগবাজি মারে। রাজবাড়িতে যেন দক্ষযজ্ঞ লেগে গেছে। এমনকী, ধাক্কাধাক্কিতে রাজামশাই পর্যন্ত নাকানিচোবানি খেয়ে হাঁপাচ্ছেন।

আরে, এ আবার কী?

কেন, কী হল?

হাওয়াটা যেন হঠাৎ রাজবাড়ির দেওয়াল টপকে পালিয়ে গেল। জ্বালো, জ্বালো, আলো জ্বালো। আবার সব আলো জ্বলে উঠল। উফ বাবা, হাঁফ ছেড়ে বাঁচল সবাই।

কিন্তু এ কী! রূপসী কোথায়! তাই তো! মেয়েটাকে তো দেখা যাচ্ছে না! গেল কোথায়?

অমনই হাঁকডাক শুরু হয়ে গেল, “রূপসী-ই-ই-ই।” রাজা থেকে শুরু করে রাজপেয়াদা পর্যন্ত হাঁকতে হাঁকতে গলা ফাটাল। কিন্তু রূপসীর সাড়াই মিলল না। সাড়া যখন মিলল না, তখন খোঁজ খোঁজ। কিন্তু খোঁজাও বৃথা। সে রাজবাড়িতে থাকলে তবে তো! মেয়েকে দেখতে না পেয়ে বীণ-বাজিয়ে আর তার বউ, ভয়ে জুজু হয়ে কাঁপতে লাগল। আর রাজামশাই ভয়ে ভয়ে ভাবতে লাগলেন, তবে কি এ সেই সর্বনাশা নূপুরেরই সর্বনেশে কাণ্ড!

সঙ্গে সঙ্গে রাজার হুকুমে ভেঁপু বেজে উঠল। দিকে দিকে সৈন্য ছুটল। আর রাজা নিজে ছুটলেন একা, সেই কালো ঘোড়া তুর্কির পিঠে চেপে। ছুটলেন সেই বনের পথে। ভগ্ন প্রাসাদের খোঁজ করতে।

রূপসী শূন্য আকাশে ঝুলে ঝুলে উড়ে চলেছে। সে দেখতে পাচ্ছে, একটা মস্তবড় পাখি তাকে ঝুলিয়ে ঝুলিয়ে আকাশের ওপর দিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। তার লাগছে, কিন্তু চিৎকার করতে পারছে না। সে হাত পা ছুড়ছে। কিন্তু তার পায়েব নূপুরজোড়াই শুধু বাজছে। পাখি তাকে ছাড়ছে না। খুব যখন সে ছটফট করছে, তখন অন্য আর-একটা পাখি তার মাথায় এমন ঠোক্কর মারছে যে, রূপসী যন্ত্রণায় আঁতকে উঠছে। এরাই যে রাজবাড়িতে ঢুকে তাকে ছোঁ মেরে শূন্যে তুলে নিয়েছিল, সেটা রূপসী স্পষ্ট দেখেছে। কিন্তু কেন তারা রূপসীকে এমন করে ধরে নিয়ে চলেছে। সে তা জানে না। কোথায় যাচ্ছে, তা-ও তার জানা নেই। এরা কি তবে রূপসীকে মেরে ফেলবে! এই কথাটা যতবারই মনে হচ্ছে তার, ততবারই সে মা আর বাবার জন্য কেঁদে ফেলছে। চেঁচাতে পারছে না, শুধু চোখ দিয়ে জল গড়াচ্ছে।

রূপসী অনেকক্ষণ ধরে ঝুলে ঝুলে উড়ে এল। হঠাৎ যেন সে বুঝতে পারল, পাখিগুলো আকাশ থেকে নীচে নামছে। রূপসী হেঁট হয়ে নীচেটা দেখবার চেষ্টা করল, পারল না। কিন্তু যখন তারা নামল, তখন রূপসী দেখল, বনের মধ্যে একটা ভাঙা বাড়ির চত্বরে সে দাঁড়িয়ে আছে। বেশিক্ষণ তাকে দাঁড়াতে হল না। হঠাৎ সেই পাখিদুটো তাকে ঠোঁট দিয়ে টানতে টানতে ভাঙা বাড়িটার ভেতরে নিয়ে চলল। এই ভাঙা বাড়িটা যে সেই উড়ুক্কু দানবের ভগ্ন প্রাসাদ সে-আর রূপসী জানবে কেমন করে! তবে, যে দুটো পাখি তাকে ধরে নিয়ে এল, তাদের সেই বিতিকিচ্ছিরি চেহারা দেখে রূপসী বুঝতে পেরেছে, এ দুটো নির্ঘাত পিশাচ।

হ্যাঁ, এ দুটো পিশাচই। রূপসীকে তারা ধরে নিয়ে গেল তাদের প্রভুর কাছে। আর তাদের এই প্রভুই সেই উড়ুক্কু দানব।

উড়ুক্কু দানবের ঘর আজ অন্ধকার নয়। ঘরের মাঝখানে একটি কুপি বসানো। তাতে টিমটিম করে আলো জ্বলছে। সেই টিমটিমে আলোয় আরও ভয়ংকর লাগছে সেই দানবকে। আজ আর সে বসে নেই। বসে থাকার মতো তার শক্তিও নেই। রোগের প্রকোপে সে মরতে বসেছে। হ্যাঁ, সত্যিই তো, রাজাকে সেই মেয়ে আয়েলা লিখেছিল, যতদিন সোনার নূপুর বাজছে না, ততদিনই দানব ধীরে ধীরে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাবে। আবার যদি কারও পায়ে নূপুর বেজে ওঠে, তবে, তাকে মেরে ফেললেই এই দানব আবার বেঁচে উঠবে। তাই বুঝি দানব রূপসীকে ধরে এনেছে, তাকে হত্যা করবে বলে!

দানব শুয়ে আছে একটা মস্ত খাটের ওপর। তার চোখ ঘোলাটে। তার নখগুলো ভোঁতা হয়ে গেছে। তার বুকের হাড়গুলো জিরজির করছে। রূপসীকে দেখে তার চোখদুটো একবার শুধু দপ করে জ্বলে উঠল। তারপর আবার যেমনকে তেমন। সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে রইল রূপসীর দিকে। তারপর পিশাচদুটোকে ইশারা করল। তারা বেরিয়ে গেল। দানবের সামনে রূপসী এখন একা। সে হয়তো ভয় পেয়েছে। পাওয়ার কথাই। কেন না, সে ছোট্ট। এই আলো-আঁধারে অমন একটা ভয়াবহ দানবের সামনে যদি অসীম সাহসী বীরকেও একা দাঁড়িয়ে থাকতে হয়, তবে তারও যে বুক কাঁপবে সে-কথা হলপ করে বলা যায়। রূপসীরও বুক কাঁপল হয়তো, কিন্তু সে কাঁদল না। মা আর বাবার কথা হয়তো তার মনে পড়ে গেল, কিন্তু সে চিৎকার করে ককিয়ে উঠল না। সে দাঁড়িয়ে রইল। চোখের পাতা পড়ে না তার। ভয়ের চিহ্ন নেই তার মুখে। ঘরে এখন দানব আর রূপসী ছাড়া আর কেউ নেই। কী ভয়ংকর নিস্তব্ধ চারদিক। হঠাৎ সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে কথা বলল দানব, “আমায় চিনিস?” ঘড়ঘড় করে উঠল তার গলার শব্দ।

সেই শব্দ শুনে চমকে ওঠার কথা রূপসীর। হয়তো চমকাল, কিন্তু ঘাবড়াল না। সে স্পষ্ট স্বরে উত্তর দিল, “না।”

দানব গলার স্বরটাকে আরও কঠিন করে উত্তর দিল, “আমি দানব।”

কী জানি কেন, কী মনে হল রূপসীর, সে নির্ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোমার কী হয়েছে?”

দানব রূপসীর চোখে ভয় না-দেখে অবাক হল। সে রূপসীর পা থেকে মাথা অবধি ভাল করে দৃষ্টি হেনে পরখ করল। তারপর বলল, “জানিস, তোকে মেরে ফেলা হবে?”

“তাই বুঝি তোমরা আমাকে ধরে এনেছ?” ভারী শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করল রূপসী, “আমায় কেন মারবে? আমি তো কোনও দোষ করিনি।”

রূপসীর কথা শুনে ক্ষিপ্ত দানব নড়ে-চড়ে ওঠবার চেষ্টা করল। উঠতে কষ্ট হল। হাঁপিয়ে পড়ল। বুকের মধ্যে দমটাকে সামাল দেওয়ার জন্য ককাতে লাগল। রূপসী অস্থির হয়ে দু’পা এগিয়ে গেল তার দিকে। পায়ের নূপুর বেজে উঠল ঝুনঝুন করে। অধীর হয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোমার কষ্ট হচ্ছে?”

“না।” এবার সে গর্জন করার চেষ্টা করল। পারল না। তার চোখ পড়ে গেল রূপসীর পায়ের দিকে। কটমট করে তাকিয়ে সে জিজ্ঞেস করল, “ওই নূপুর তুই কোথায় পেলি?”

“আমায় রাজামশাই দিয়েছেন। এ নূপুর রাজামশাইয়ের।” তেমনই সহজ গলায় উত্তর দিল রূপসী।

“না।” আবার চিৎকার করে উঠল দানব। “এই নূপুর আমার। ওই রাজা চুরি করেছে। জানিস, ওই নূপুরের শব্দে আমার জীবন লুকনো আছে! জানিস, যেদিন থেকে ওই নূপুর চুরি গেছে, যেদিন থেকে ওই নূপুর আর বাজল না, সেদিন থেকে শুরু হয়েছে আমার মরণ-রোগ। তোকে না মারলে আমি আর বাঁচব না! তোকে হত্যা করা হবে!” বলতে বলতে খক খক করে ভীষণ জোরে কেশে উঠল দানব।

রূপসী চোখের পলকে ছুটে গেল তার কাছে। অতর্কিতে দানবের বুকে হাত রাখল সে। দানবের সেই মস্ত বুকখানা কাশতে কাশতে তোলপাড় করছে। সে গর্জে ওঠার চেষ্টা করল, “আমার ছুঁলি কেন? সরে যা আমার সামনে থেকে।”

রূপসী ভয় পেল না একটুও। সে সরল না। বুকে হাত রেখেই সে বলল, “আমাকে তুমি যদি মারো, আমার মাকে, আমার বাবাকে যে আমি আর দেখতে পাব না।”

“তাতে আমার কী!” তীক্ষ্ণ কর্কশ স্বরে সে তেড়ে উঠে মুখ ঘুরিয়ে নিল।

সঙ্গে সঙ্গে রূপসী সেই কুচ্ছিত দানবের বুকের ওপর মাথা রেখে ডুকরে ডুকরে কেঁদে ফেলল। সে আর কথা বলতে পারল না। শুধু তার চোখের জলে দানবের বুকখানা ভেসে যায়। কিন্তু দানবের মনে কোনও দয়া হল কিনা বোঝা গেল না। সে রূপসীর মাথাটাতে হাত দিয়ে ঠেলে চিৎকার করে উঠল, “এই, কে আছিস!”

ডাক শুনে একটা পিশাচ-পাখি ঘরে ঢুকল।

দানব হুকুম করল, “মেয়েটাকে এখান থেকে নিয়ে যা! কারাগারে বন্দি করে রাখ! কাল সূর্য ওঠার আগে হত্যা করা হবে। আমি নিজে হত্যা করব।”

সেই পিশাচ পাখিটা রূপসীকে ধরল। টানতে টানতে নিয়ে চলল। কারাগারে ঢুকিয়ে তাকে বন্দি করে রাখল।

সেই অন্ধকার কারাগারে কতক্ষণই বা কাটল রূপসীর। হঠাৎ যেন ঠক করে একটি শব্দ উঠল কারাগারের মধ্যে। চমকে উঠল রূপসী। এদিকে ওদিকে দেখতে-না-দেখতেই সামনে এসে দাঁড়াল আর এক কয়েদি। এ যে আয়েলা! হ্যাঁ, আয়েলা। যেদিন থেকে তার পায়ের নূপুর গেছে, সেদিন থেকেই সে বন্দি। সেইদিন থেকেই সেও কারাগারে তিলে তিলে মরছে দানবের হুকুমে।

“কে-এ-এ?” তার মুখের দিকে চেয়ে ভয়ে শিউরে উঠে জিজ্ঞেস করল রূপসী।

আয়েলা আরও একটু এগিয়ে এল। আর একটু এগিয়ে এসে তার চোখের উপর চোখ রাখল। আতঙ্কে চাপাস্বরে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে?”

রূপসী ভয়ে পিছিয়ে গেল তার গলা শুনে। রূপসীর পায়ের নূপুর ঝনঝনিয়ে বেজে উঠল। আয়েলা আঁতকে ওঠে। এ যে তার অনেকদিনের চেনা শব্দ। সে অন্ধকারে রূপসীর পায়ের দিকে তাকিয়ে ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করে, “এ নূপুর তুমি কোথায় পেলে?”

তবু কথা বলল না রূপসী। সে আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে।

অস্থির হয়ে আয়েলা বলল, “আমাকে তোমার ভয় নেই। তুমি যেমন বন্দি, আমিও তাই। আমি যে কতদিন বন্দি হয়ে আছি, তার হিসেব ভুলে গেছি। বলো তুমি, এ নূপুর তোমায় কে দিয়েছে!”

বলতে বলতে সে রূপসীর চিবুকখানি ছুঁয়ে ধরল।

আয়েলার সেই হাতের ছোঁয়ায় রূপসীর মনে যেন স্পর্শ লাগল জাদুর। সে আর ভয় পেল না। তার কান্না পাচ্ছিল। অনেক কষ্টে নিজেকে সামলে নিয়ে সে বলল, “আমায় রাজা দিয়েছেন।”

“রাজা!” বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠল আয়েলার গলার স্বর।

“হ্যাঁ, রাজা।”

“বুঝতে পেরেছি।” ভীষণ উত্তেজনায় গুমরে উঠল আয়েলা, “এই রাজাই বোধহয় সেই রাজপুত্র। ওরে মেয়ে, আমি যে একদিন তাকে দানবের হাত থেকে রক্ষা করেছিলুম। এই নূপুর যে আমিই তাকে দিয়েছিলুম। বলেছিলুম, এ যে সর্বনাশা-নূপুর। এ সর্বনাশা-নূপুর তোর পায়ে এল কেমন করে! তোকে এখন কেমন করে বাঁচাই আমি!”

এবার রূপসী সত্যিই কেঁদে ফেলল।

সে-কান্না দেখতে পারল না আয়েলা। ওই ছোট্ট মেয়েটার চোখ দিয়ে জল যত পড়ছে, আয়েলার মনের ভেতরটা ততই যেন তোলপাড় করে উঠছে। সে চেঁচিয়ে উঠল, বলল, “তবে শোন রে মেয়ে, আমি যতক্ষণ বেঁচে আছি, তোর গায়ে হাত দেয় কে দেখি! আমি তোকে বাঁচাব, বাঁচাব!” চিৎকার করতে করতে সে রাগে কাঁপতে লাগল। কাঁপতে কাঁপতে সে কারাগারের মেঝের ওপর থেকে একটা মস্ত পাথরের চাঁই তুলে নিল। তারপর সেই পাথর দিয়ে কারাগারের লোহার ফটকে আঘাত করতে লাগল। সে ভেঙে ফেলবে কারাগারের ওই লোহার কপাট। ঘং ঘং ঘং! সে আঘাত করে। শব্দ ওঠে। কিন্তু লোহা ভাঙে না। অন্ধকারে এখনই যদি কেউ আয়েলাকে দ্যাখে, দেখবে তার সারা শরীর ক্লান্তিতে ভিজে গেছে। তবু সে আঘাত করছে, করছে, এখনও করছে।

না, আয়েশা হেরে গেল। এবার সে পাথরের সেই চাঁইটা হাতে নিয়ে ক্ষিপ্ত স্বরে চিৎকার করে উঠল, “একটি শিশুকে লোহার আড়ালে বন্দি করে যে-শয়তান অস্ত্র শানাচ্ছে, সেই অস্ত্র তারই বুকে বসবে একদিন। সে মরবে, মরবে, মরবে!” বলতে বলতে সে শেষবারের মতো সেই পাথর দ্বিগুণ জোরে ছুড়ে মারল ফটকের ওপর। আবার শব্দ, ঘং।

কিন্তু ও কে? ফটকের সামনে কার পায়ের কাছে ওই পাথর ছিটকে পড়ল! কে দাঁড়িয়ে!

কেউ তার কাঁপা হাত নিয়ে কারাগারের চাবি খুলছে। আঁতকে উঠল আয়েলা। রূপসীকে সে নিজের কোলের কাছে টেনে লুকিয়ে ফেলল। মনে মনে ভাবল, তবে কি আকাশে ভোরের আলো ফুটেছে! তবে কি রূপসীকে হত্যা করার সময় ঘনিয়ে এসেছে! বুঝি, তাই কোনও পিশাচ তাকে নিতে এল!

কারাগারের চাবি খুলে গেল। যুদ্ধে আহত সৈনিকের মতো টলতে টলতে কে যেন ঢুকল কারাগারের মধ্যে। মনে হয়, আয়েলার অনেকটা কাছে এসে সে দাঁড়াল। কিন্তু পারছে না যেন। অন্ধকারে সে অস্থির হয়ে নিশ্বাস ফেলতে লাগল। নিস্তব্ধ এ বন্দিশালায় সে-নিশ্বাসের শব্দ কী ভয়ংকর। আয়েলা এই অন্ধকারে তার মুখখানা দেখার জন্য তটস্থ হয়ে তাকিয়ে রইল।

“আয়েলা!” হঠাৎ বন্দিশালার নিস্তব্ধতা ভেঙে কে অমন বিধ্বস্ত গলায় ডাক দিল! বোঝা যায়, ডাকতে তার কষ্ট হচ্ছে। সে হাঁপাচ্ছে।

আয়েলা চমকে উঠেছে। সে বুঝতে পেরেছে, কার গলা। এ সেই দানব। এবার বোধহয় সে এই মেয়েটাকে হত্যা করবে। আতঙ্কে অস্থির হয়ে আয়েলা গর্জে উঠল, “না-আ-আ-আ! আমি যতক্ষণ বেঁচে আছি, এ মেয়েকে তুমি মারতে পারবে না।”

“আয়েলা!” দানবের গলা কাঁপে কেন! ব্যথায় উথলে ওঠে কেন তার গলার শব্দ! সে আবার কথা বলে থমকে থমকে, “আয়েলা, আমি কাউকে মারতে আসিনি। তোমাকেও না, তোমার দু’হাতের আড়ালে লুকনো ওই মেয়েটিকেও নয়। ওই মেয়েটির চোখের জলে এখনও আমার বুক ভিজে আছে। আয়েল ছোট্ট দুটি নরম হাত আমার বুকে রেখে আমায় জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি আমায় এক্ষুনি মেরে ফেলবে?’ তখনই আমি হেরে গেছি ওর কাছে। আমি জানি, ও মরলে আমি বাঁচব। কিন্তু আয়েলা, ওই ছোট্ট মেয়ের চোখের জল আমার বুকে নিয়ে আমি কেমন করে বাঁচব! আয়েলা, আমার কানে যে বারবার বেজে উঠছে ওর সেই ছোট্টদুটি কথা, ‘আমায় তুমি মারবে কেন? আমি তো কোনও দোষ করিনি। আমায় যদি মারো, আমার মাকে, আমার বাবাকে আমি যে আর কোনও দিন দেখতে পাব না।”

বলতে বলতে দানব হাঁপিয়ে উঠল। একটু জিরিয়ে হঠাৎ সেই দানব চিৎকার করে উঠল, “না-আ-আ, ওই সুন্দর শিশুর রক্তে আমার প্রাণ আমি বাঁচাতে চাই না। একটা নিষ্ঠুর দানব মরলে একটি সুন্দর শিশু যদি বাঁচে, তবে চাই না আমি বাঁচতে।”

বলতে বলতে সেই রুগ্‌ণ দানব আর দাঁড়াতে পারল না। উত্তেজনায় কাঁপতে কাঁপতে সে কারাগারের মেঝের ওপর বসে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে আয়েলার দু’হাতের বাঁধন ছাড়িয়ে ব্যস্ত হয়ে ছুটে এল রূপসী। সে জড়িয়ে ধরল দানবকে। জিজ্ঞেস করল, “কষ্ট হচ্ছে তোমার?”

দানব কথা বলতে পারল না। সে অপলকে তাকিয়ে রইল রূপসীর দিকে কিছুক্ষণ। তারপর ভারী ক্ষীণস্বরে সে রূপসীকে বলল, “আমায় আর একবার আদর কর। আর-একবার আমার বুকে তোর মাথা রেখে বল, আমায় তুই ভয় পাস না। আমায় ভালবাসিস।”

রূপসী অবাক হয়ে তাকাল দানবের মুখের দিকে খানিক। দানব ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছে। রূপসী তার বুকে হাত রাখল। তার ছোট্ট দুটি হাত আলতো আলতো দোল খেতে লাগল দানবের বুকের ওপর। তারপর রূপসী তার বুকের ওপর মাথা রাখল। আদর করে বলল, “তোমায় আমি ভয় পাই না, ভালবাসি।”

“আঃ!” ভারী নিশ্চিন্তে দানব দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর সে শুয়ে পড়ল কারাগারের মেঝের ওপর। তার চোখদুটি ধীরে ধীরে বুজে এল। তার সেই উথালি-পাথালি বুকের নিশ্বাস কেমন যেন শান্ত হয়ে এল একটু একটু করে। সে আর চোখ চাইল না। নিশ্বাসও নিল না। চকিতে দানবের বুকের ওপর থেকে মাথা তুলল রূপসী। দানবের মুখখানা সে দেখতে লাগল একদৃষ্টে। দানবের মুখের ওপর থেকে নিজের চোখ তুলে সে চাইল আয়েলার দিকে। দেখল, আয়েলা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখে জল। গড়িয়ে পড়ছে মাটিতে।

ঠিক তক্ষুনি একটি পাখি ডেকে উঠল। কারাগারের ভাঙা-পাঁচিলের আড়াল থেকে আকাশটা দেখলে বোঝাই যায় একটু পরেই সূর্য উঠবে। একটু পরেই...

ঘোড়ার পায়ের শব্দ। চমকে ওঠে আয়েলা। উঠে দাঁড়ায় রূপসী। ঘোড়া ছুটে আসে এদিকেই, কাকে পিঠে নিয়ে?

এ যে রাজামশাই।

রাজা ঝটিতে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়লেন। তিনি ক্ষিপ্রহস্তে কোমরের খাপ থেকে তরোয়াল বার করলেন। ছুট দিলেন সামনে, ওই কারাগারের দিকে। কারাগারের ফটকের সামনে এসে তিনি থমকে দাঁড়ালেন। চমকে উঠলেন। কেন না, তাঁর চোখ পড়ে গেল, দানবের প্রাণহীন দেহটার ওপর। খোলা ফটক ডিঙিয়ে, বোধহয় আজই প্রথম, ভোরের সূর্য আলো ছড়িয়ে দিয়েছে কারাগারের অন্ধকারে। ছড়িয়ে দিয়েছে দানবের ওই মৃতদেহটার ওপরও।

মৃত দানবের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে রাজা মাথা নোয়ালেন। তারপর তাঁর হাতের তরোয়াল রেখে দিলেন দানবের পায়ের কাছে। হাত বাড়িয়ে দিলেন আয়েলার দিকে। টেনে নিলেন রূপসীকে নিজের কাছে।

ক’দিন পরেই রাজপ্রাসাদে নহবতখানায় সানাই বেজে উঠল। সোনার টোপর মাথায় পরে বউ আনলেন রাজামশাই। সাতনরী হার গলায় পরে কে বসল রাজার পাশে রানি হয়ে? তার নাম বুঝি আয়েলা? হ্যাঁ, আয়েলা। আর ওই দ্যাখো, বীণ-বাজিয়ের বীণার সুরে পা মিলিয়ে রূপসী দুলে দুলে নাচছে, সোনার নূপুর পায়ে দিয়ে! সে যেন আজ সবচেয়ে খুশি, এই রাজপ্রাসাদে।

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%