শৈলেন ঘোষ

আমাদের বাড়ি থেকে লাইট হাউসটা স্পষ্ট দেখা যায়। বিশেষ করে অন্ধকার রাতে লাল আলোর নিশানাটা তোমার চোখে পড়বেই। অবিশ্যি আমাদের বাড়ি থেকে সমুদ্রের কিনারাটাও যে খুব একটা দূরে তা নয়। তা হলেও, তোমাকে বেশ খানিকটা হাঁটতে হবে। হ্যাঁ হাঁটতেই হবে। কারণ, যেখানে আমাদের বাড়ি সেখান থেকে সমুদ্রে যেতে প্রথমে খানিক জলাভূমি, তারপর ওক গাছে ঘেরা ঘনবন। এত ঘন সেই বন যে, তার ভেতর দিয়ে গাড়ি চলাচলের কথা ভাবাটাই পাগলামি। অবিশ্যি ঘোড়ার পিঠে গেলে অন্য কথা। কিন্তু ঘোড়ায় চড়ে গেলেও যে বনের মধ্যে ঘোড়া কদম পায়ে ছুটতে পারবে, তেমন দুঃসাধ্যের কথা না ভাবাই ভাল। সুতরাং ইচ্ছে করলেই, যখন-তখন সমুদ্র কিনারে যাওয়ার কথা ভাবিই না। আমার বেশ মনে আছে, আমি যখন আরও ছোট ছিলুম, আজ থেকে ধরো আরও দু’বছর আগে, তখন একবার ওই লাইট হাউসের কাছাকাছি সমুদ্রের কাছে গিয়েছিলুম। সে শুধু আমি কেন, আরও কত লোক আমাদের এই বন, আর সমুদ্রেঘেরা ছোট্ট গ্রামের প্রায় প্রতিটি মানুষ। সে কী হইহই কাণ্ড! কারণটা আর কিছুই নয়, একটা তিমি মাছ ধরা পড়েছিল সমুদ্রে। তিমি মাছ তো আর বললেই ধরা যায় না। তেমনই ইচ্ছে করলেই যে দেখতে পাবে, তা-ও হবে না। ভাগ্য যদি দয়া করে, আর তোমার কপাল যদি মন্দ না হয়, তবে হঠাৎ দেখে ফেলা সম্ভব হলেও হতে পারে।
সত্যি বলছি, সে দৃশ্য চোখে না দেখলে বিশ্বাস করতে পারবে না।
থাক সে-কথা। বলতে গেলে, আর একটা সাতকাণ্ড রামায়ণ হয়ে যাবে। কিন্তু এখন যে-কথা বলতে গিয়ে এত কথা বলা, সত্যি বলছি সে-কথা এখন ভাবতেই আমার গা শিউরে ওঠে। কিছুদিন হল, আমার বাবা একটা ঘোড়া কিনেছে। বাবা যে ঘোড়াটা শখ করে কিনেছে তা মনে কোরো না। আমাদের বেশ খানিকটা জমিতে গম চাষ হয়। বাবা-ই করে। বলতে পারো এটাই আমার বাবার পেশা। গমের জমিতে আরও নানান ফসলের চাষ হয়। সেই ফলনের সবটাই তো আর আমাদের লাগে না। বেশিটা চলে যায় হাটে বিকিকিনিতে। এতদিন বাবা নিজেই ফসলের বস্তা কাঁধে ফেলে হাটে গেছে। বেচে এসেছে। এখন আর সে-কাজটা বাবাকে করতে হয় না। ঘোড়ার ঘাড়ে বস্তা চাপিয়ে, আর তার পিঠে চেপে এখন দিব্যি হাটে যেতে পারে বাবা। সময়ও বাঁচে, কষ্টও কমে। বয়স বেশি নয়তো, তাই ঘোড়াটা ভীষণ টগবগিয়াল। সবসময় ঘাড় নাড়ছে, নয়তো পা ঠুকছে। বড্ড ছটফটে। আর ও যখন ছোটে, তোমার ঠিক মনে হবে, পড়ন্ত সূর্যের মতো যেন এক ঝলক আলো ছুটে যাচ্ছে। গায়ের রংটা সত্যি তার অদ্ভুত রকমের বাদামি। এমন রং এর আগে আমি কখনওই দেখিনি। রংটা যে আমার খুব অপছন্দ, তা বলছি না। তবে কালো ঘোড়া আমার বেশ লাগে। নিদেন সাদা হলেও চলে। সে যাই হোক, ঘোড়ার রং নিয়ে তো ঘোড়ার গুণ বিচার করা যায় না। যখন ছোটে তখন দেখলে অবাক হয়ে যাবে! সাংঘাতিক তেজ। ছুটতে ছুটতে যখন লাফ মেরে খানা-খন্দ ডিঙোয়, তখন তার পিঠে বসে একটু অন্যমনস্ক হয়েছ কী ব্যাস, নির্ঘাত ডিগবাজি।
আমার অবশ্য এখন আর ভয় করে না। প্রথম যখন ওর পিঠে চাপতুম, বুক ঢিপঢিপ করত। তারপর ধীরে ধীরে যখন ঘোড়াটার সঙ্গে আমার ভাব হয়ে গেল, আর আমিও তার পিঠে ছুটে ছুটে যখন ছোটাটা রপ্ত করে ফেললুম, তখন আর আমায় কে দেখে! ফুরসত পেলেই দে ছুট—টগবগ টগবগ। ওর নাম রেখেছি ‘সাহেব’। বলতে পারো আমারই রাখা নাম। আমি ওর সামনে দাঁড়িয়ে ‘সাহেব’ বলে ডাকলেই হল, অমনি ঘোড়া চিঁ-হিঁ-হিঁ করে চিৎকার করে উঠবে। রেগে নয় তা বলে, খুশি খুশি! আমার ডাক শুনলেই খুশি হয়ে ঘোড়াও চিৎকার করে সাড়া দেবে। সত্যি বলতে কী, ওর যেন আমারই সঙ্গে বন্ধুত্বটা বেশি জমে উঠল। আমাকে না-দেখলে ওর চোখে ঘুম আসে না। আমি হাতে করে ওর মুখে ঘাস তুলে না দিলে, মুখে রোচে না। বাবার ঘোড়া যেন আমারই হয়ে গেল। বলতে কী, ঘোড়া দেখে আমিও যেন খোঁড়া হয়ে বসে রইলুম। আমার আর মাটিতে পা পড়ে না। দেখলেই মনে হয়, পিঠে বসে ছুট দিই। আমার অবিশ্যি একটা দিকে রক্ষে, ঘোড়া নিয়ে বাড়াবাড়ি করলেও, বাবা তেমন বকাঝকা করে না। তবে তুমি যদি এখন কাজকম্ম, পড়াশোনা ফেলে রেখে সবসময় ঘোড়ার লাগাম ধরে ট্যাঙাস ট্যাঙাস করে ঘুরে বেড়াও তবে কি মানুষ দু’-একটা কথা বলবে না! সত্যিই তো সব জিনিসেরই একটা সীমা আছে। সে-কথাটা ক’টা লোক বোঝে।
আমার কথা শুনে হয়তো তুমি মুচকি মুচকি হাসছ। হয়তো মনে মনে বলছ, তোমার তো দেখি বড্ড টনটনে জ্ঞান!
না, আমিও একবার দুঃসাহসের সীমা ছাড়িয়ে গেছলুম। কী ভীষণ এক বিপদের মধ্যে যে আমি পড়েছিলুম, সে-কথাটা যখনই মনে পড়ে, তখনই যেন আমার বুকের ধুকধুকিটা থমকে থেমে যায়।
একদিন দুপুরবেলা হাতের কাছে করার মতো কিছু ছিল না বলে কেমন যেন আলসেমি লাগছিল। দুপুরের রোদটাও কেমন মরা-মরা। সেই যে ঝকঝকে রোদ উঠলে আকাশটা যেমন পরিষ্কার নীল নীল লাগে, তেমন লাগছিল না। কেমন একটা পাংশুটে যেন সেই রংটা। সেইসময় আচমকা কেন যে, আমার চোখের ওপর ভেসে উঠেছিল সেই লাইট হাউসের লাল আলোর নিশানাটা, আমি খেয়াল করতে পারছি না। আমি যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছিলুম সমুদ্রের উত্তাল তরঙ্গ। কানে আসছিল তার একটানা গর্জন।
কী হল কে জানে, আচমকাই আমার মনটা সমুদ্রের সেই ঢেউ অথবা লাইট হাউসের লাল নিশানাটা দেখার জন্য ছটফটিয়ে উঠল। আমি সত্যিই থাকতে পারলুম না। আমার ঘোড়ার পিঠে চড়ে আমি ছুট দিলুম। সামনের জলাভূমিটা পেরিয়ে একেবারে ওক বনের ভেতর ঢুকে পড়লুম। বেরোবার সময় কাউকে বলেও এলুম না। দুর্মতি না হলে মানুষ এমন কাজ করে? আমি সেই কবে বছর দুই আগে যখন সমুদ্রের কিনারে গিয়েছিলুম, সেটা মনে রাখা সম্ভব তো নয়। কেন না, তখন আমার বয়স বড় জোর আট। এখন বুঝতেই পারছ, এই বয়সে বনের পথ চিনে রাখা আমার কাছে কী কষ্টসাধ্য কাজ! তবু আমি বনের ভেতর একটা পায়ে চলা পথের হদিস করতে পারছিলুম। তোমাদের তো আগেই বলেছি, এ বনে ঘোড়াও ছুটতে পারে না। সেই কারণে মানুষের এই পায়ে চলা পথের ওপর দিয়েই ঘোড়ার পা সাবধানে হেঁটে চলেছে। আমি জানিও না, যে হারে হাঁটছি, এ-ভাবে হাঁটলে কতক্ষণে পৌঁছব সেই সমুদ্র কিনারে। তবু এই বনের মধ্যে দিয়ে ঘোড়ার পিঠে একা হাঁটতে আমার একটুও ভয় করছিল না। বরঞ্চ বলতে পারি, মনের ভেতর একটা বেশ শিহরন লাগছিল। এইভাবে একা একা অজানা পথে হারিয়ে যাবার কথাটা ভাবলে বেশ মজাই লাগে। কিন্তু সত্যি-সত্যি কেউ যদি পথ হারিয়ে, দিশেহারা হয়ে যায়, তখন কী হয়? সেটা আমার জানা ছিল না বলেই, সেই ভাবনাটাও আমার মাথায় আসেনি তখনও পর্যন্ত। আমি জানতুম না, আমি সত্যিই হারিয়ে যাচ্ছি। যেটা জানতুম, তা হল, এই পথ ধরে আমি লাইট হাউসের নিশানার দিকে এগিয়ে চলেছি।
এমন সময় গাছের মাথায় মাথায় হঠাৎ এক ঝলক হাওয়ার ধাক্কা লাগল। শুকনো পাতার ঝাঁক উড়ে উড়ে ছড়িয়ে পড়ল। আবার হাওয়া, তারপর ঝড় উঠল। বনের মধ্যে ঝড় উঠলে কত কী যে ঘটতে পারে, কত অঘটন, তা আমার জানা ছিল না বলেই, আমার মনের মজাটা আমায় আরও পেয়ে বসল। আমি চিৎকার করে আমার খুশিটাকে বনের আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে দিলুম। শুনলে অবাক হবে, আমার ঘোড়াও আমার সঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল। তারপর লাফাতে লাগল। আমি প্রথমটা ভেবেছিলুম, সত্যিই বুঝি ঘোড়াও আমার মতো খুশি। কিন্তু তার চিৎকারের গলা-ফাটা শব্দটা শুনে যখন আমার মনে হল, না, এ তো খুশির আওয়াজ নয়, এ আর্তনাদ, তখন আমি একটু ঘাবড়ে গেলুম। তুমি কোনওদিন বনের মধ্যে ঝড়ের খপ্পরে পড়েছ কিনা আমার জানা নেই। সে কী তুলকালাম কাণ্ড! ঝড়ের শব্দ, গাছের শব্দ, পাতার উড়ন্ত ঘূর্ণি, সে দেখলে তোমার হাত-পা এমনিতেই পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যাবে। তার ওপর আমার মতো যদি ঘোড়ার পাল্লায় পড়, তা হলে আর রক্ষে নেই! আসলে ঘোড়ারই বা কী দোষ। ঝড়ের তেজ যতই বাড়ছে, ততই যেন সে দিশেহারা হয়ে এধার ওধার লাফিয়ে ছুটে পথ খুঁজছে। আমি কিছুতেই বাগ মানাতে পারছি না। সত্যি বলতে কী, সে যেন শেষমেশ একটা পাগলা ঘোড়ার মতো চার পা তুলে লাফাতে লাগল। লাফিয়ে লাফিয়ে ঝোপঝাড় ডিঙোতে লাগল। সঙ্গে সঙ্গে ঝড়েরও দাপট বাড়ছে! আমি শুনতে পাচ্ছি, আশেপাশে, কাছে-দূরে মড়মড়ানি শব্দ। গাছের ডাল ভাঙছে, কিংবা একটা গোটা গাছই উপড়ে পড়ছে বোধহয়। আমি ভয় পেয়ে গেলুম। এই মুহূর্তে কী করা উচিত এই কথা ভেবে ওঠার মতোও তখন আমার বুদ্ধি লোপ পেয়েছে। আমার মনে হচ্ছিল, আমি চিৎকার করে কেঁদে উঠি। কিন্তু কাঁদবার আগেই আমার প্রায় ঘাড়ের ওপরই একটা ডাল মড়মড় করে ভেঙে পড়ল। আমি ঠিক মরতুম। কিন্তু ঘোড়াটা ভীষণ আতঙ্কে আমাকে তার পিঠের ওপর থেকে ছিটকে ফেলে দিয়ে দুড়দাঁড়িয়ে ছুট মারল। কী প্রচণ্ড যে লাগল, সে তোমরা ধারণা করতে পারবে না। কিন্তু বেঁচে গেলুম। সেই ভাঙা ডালটা এক চুলের জন্যে আমার মাথায় না-পড়ে পড়ল মাটিতে। আমি চকিতে উঠে পড়েছি। উঠেই, সামনে চেয়ে দেখি, আমার ঘোড়া নেই। চোখের নিমেষে ঘোড়াটা যে কোথায় পালাল, আমি আর দেখতে পেলুম না। আমি সেই ভয়ংকর বিপদের মধ্যেও থমকে দাঁড়িয়ে না থেকে এধার ওধার ছুটতে ছুটতে চিৎকার করতে লাগলুম, ‘সাহেব’, ‘সাহেব’। কিন্তু ঝড়ের শব্দের সঙ্গে পাল্লা দেবে আমার গলার স্বর কেমন করে! কী তীব্র তার শনশন আওয়াজ। কী সাংঘাতিক গাছের গায়ে গায়ে তার আঘাতের প্রতিধ্বনি!

আমি প্রায় উন্মাদের মতো সেই ঝড়ের সঙ্গে চরকি খেতে খেতে বে-দম হয়ে পড়লুম। আমার আর দাঁড়াবার মতো ক্ষমতা ছিল না। মনে হচ্ছিল, এখনই বসে পড়ি মাটির ওপর অথবা গাছের গুঁড়ির কাছে। বসা আমার উচিত ছিল, কিন্তু কী দুর্মতি হল, আমি বসলুম না। একে দুর্মতি বলতে চাও, বলো। কিন্তু যার ঘোড়া এই বনের মধ্যে প্রাণভয়ে ছুটে পালাল, সে কেমন করে নিজের প্রাণ বাঁচাতে চুপচাপ বসে থাকে। সুতরাং আমি টাল খেয়ে হোঁচট খেলুম। মুখ থুবড়ে পড়ে হাঁফাতে লাগলুম।
“কে হে খোকা, এখানে অমন করে পড়ে আছ?” আমার খুব কাছ থেকে কে যেন ডাকল। এত কাছ থেকে ডাকল, যেন মনে হল, ঝড়ের শব্দের চেয়েও তার গলার আওয়াজ আরও তীব্র। আমার বুকটা ধক করে উঠেছে। আমি কথা বলতে পারছিলাম না বলে তার দিকে ভয়ে ভয়ে তাকালুম। তার মুখের দিকে তাকিয়ে আমার সঙ্গে সঙ্গে মনে হল, না ভয় পাবার মতো চেহারা নয় লোকটার। বয়সও খুব না।
লোকটা আমার অবস্থা নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছিল। তাড়াতাড়ি আমায় ধরে ধরে সে বসিয়ে দিল। তারপর বলল, “এই দুর্যোগে এখানে কেন এসেছ?”
আমি তখনই যদি কথা বলতে পারতুম, তবে বলতুম, ঘাট হয়েছে আমার। আর যদি কখনও এমন বেআক্কেলে কাজ করি।
লোকটা যে আমায় বোবা ঠাওরায়নি সে বেশ বোঝা যায়। আমি ঝড়ের ঝাপটায় ঘায়েল হয়ে ধুঁকছি, সেটা সে বুঝতে পারল। তাই, আর কোনও কথা না-বাড়িয়ে সে বলল, “এখানে পড়ে থাকাটা ঠিক নয়! একটু উঠে দাঁড়াতে পারবে?” জিজ্ঞেস করে লোকটা আমায় একটু ধরে দাঁড়াতে সাহায্য করল।
আমি কষ্টেসৃষ্টে দাঁড়ালুম।
লোকটা বলল, “চলো।”
আমি এবার লোকটার মুখের দিকে হাঁদার মতো তাকালুম।
“ওই যে আমার ঘর।”
আমি সামনে চেয়ে দেখি সত্যিই তো ঘর!
“এখানে এভাবে এই ঝড়ে পড়ে থাকাটা একেবারেই ঠিক নয়।” বলে লোকটা আমায় এবার হাঁটতেও সাহায্য করল।
আমি হাঁটতে হাঁটতে যন্ত্রের মতো তার সঙ্গে তার ঘরে এলুম।
তোমাদের না বললেও তোমরা নিশ্চয়ই আন্দাজ করতে পারছ, বনের ভেতরে যখন ঘর, তখন সেটা একটা ঝকঝকে অট্টালিকা নয়। নেহাতই ভাঙাচোরা, ইট বার করা একটা পোড়ো-বাড়ি। হয়তো বা লোকটা বনে বাস করে বলে এই বাড়িতেই থাকে। আমি সেই ভাঙা আর পোড়ো মতন ঘরটার মধ্যে ঢুকে একটা নড়বড়ে চৌকির ওপর বসে পড়লুম। বসে, জুলজুল করে এদিক ওদিক তাকাতে লাগলুম। সে বলল, “এখানে খানিকক্ষণ বসে থাকো। চাই-কী শুয়েও পড়তে পারো, কোনও অসুবিধে নেই। বিশ্রাম করতে করতে দেখবে ঝড়ও থেমে গেছে। কোথাও লেগেছে নাকি?”
আমি ঘাড় নাড়লুম। সে বুঝল, লাগেনি।
“কিছু খাবে? খিদে পেয়েছে?” সে জিজ্ঞেস করল।
আমি এবারও ঘাড় নেড়ে জানালুম খিদে পায়নি।
ঝড় থামছে।
আমার এখন যেন একটু একটু শরীরটাও ঝরঝরে লাগছে। শরীরটা ভাল লাগলেও মনটাকে স্থির রাখতে পারছিলুম না। কারণ যে আমার ঘোড়া, সে আর কে না-জানে! ঘোড়াটা কোথায় পালাল, কেন পালাল, আমি কিছুই বুঝতে পারছি না। এই জঙ্গলে তাকে খুঁজে পাওয়াও যে চারটিখানি ব্যাপার নয়, সে-কথা না বললেও কে এমন মুখ্যু আছে যে বুঝবে না!
লোকটাই বলল, “ঘোড়াটা তোমার?”
আমি এবার মুখে শব্দ করলুম “হ্যাঁ।”
“ঝড়ের ভয়ে ফেলে পালিয়েছে।”
আমার বুকটা দুরু দুরু করে উঠল।
সে আবার বললে, “ভয় পেয়ো না। এই বনে যদি কোথাও থাকে আমি খুঁজে দেব’খন।”
আমি তার মুখের দিকে তাকালুম। হঠাৎ তাকে দেখে আমার মনে হল ভীষণ ভাল লোক।
লোকটা আমার চাউনি দেখে হেসে বলল, “আমার ঘরটা কেমন লাগছে?”
“ভাল।” খুব অস্পষ্টস্বরে আমি বললুম।
“মনরাখা কথা বলছ? ভালটা দেখলে কোথায়? ভাঙা-ফাটা, দাঁত বার করা একটা পোড়ো ঘর।”
লোকটার সঙ্গে এবার যেন কথা বলার জন্যে আমার মনটা ভীষণ উশখুশ করতে লাগল। আমি বলতেই যাচ্ছিলুম, ঘরটা আপনার খুব ভাল। ঘোড়াটা যদি আমায় ধরে এনে দেন, তা হলে, চাই কী এই ঘরে আমি একদিন থেকেও যেতে পারি। কথাটা আমার ঠোঁটে এসেও পড়েছিল, কিন্তু ঠোঁট থেকে লোকটার কানে পৌঁছবার আগেই, সে বলে বসল, “তা বলে ভেবো না যেন আমি এই একখানা ঘরেই থাকি।”
আমি অবাক হয়ে ঘরের চারপাশটা দেখতে দেখতে ভাবতে লাগলুম একখানাই তো ঘর!
সে বলল, “এসো আমার বাড়িটা দেখাই।”
আমার এখন উঠে দাঁড়াতে আর কষ্ট হচ্ছে না। আমি উঠে দাঁড়াতে লোকটা আবার বলল, “এই তো ভাল হয়ে গেছ, এসো।”
আমি পা বাড়ালুম। তারপরেই আমার চক্ষু ছানাবড়া। দেখি কী, লোকটা ঘরের মেঝেয় পাতা একটা কাঠের পাটাতন টেনে তুলছে। পাটাতনটা সরে যেতেই, ঘরের ওপর থেকে নীচে নেমে যাবার একটা সিঁড়ি আমার নজরে পড়ল। নীচটা কী ঘুটঘুটে অন্ধকার! আমি থমকে গেছি। সে আমার মুখের দিকে চেয়ে প্রথমে মুচকি মুচকি তারপর হো-হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “মুখখানা দেখে মনে হচ্ছে খুব ভয় পেয়েছ? ভয় নেই, একদম ভয় নেই, এসো!”
আমি সত্যিই ভয়ে জুজুর মতো তাকে জিজ্ঞেস করলুম, “অন্ধকারে নামব কী করে?”
সে বলল, “আমার হাত ধরো।”
আমি বললুম, “নীচে কী আছে?”
হঠাৎ সে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। আমার এই কথায় দীর্ঘশ্বাসটা কেন হঠাৎ তার নিশ্বাসের সঙ্গে বেরিয়ে এল, আমি তখন বুঝতেই পারিনি। লোকটাকে দেখে আমার সন্দেহ করার মতো তখনও পর্যন্ত কোনও কারণ যদিও ঘটেনি, তবু কেমন যেন শিরশির করে উঠল আমার গা-টা। মনে হল, ওপরে ভাল মানুষি সেজে, লোকটা নীচে নিয়ে গিয়ে আমাকে মেরে ফেলবে না তো! আমি তার হাত না ধরে দাঁড়িয়েই রইলুম।
লোকটা আমার দিকে আবার চাইল। তেমনি স্নেহমাখা তার মুখখানা। বলল, “আমাকে বুঝি বিশ্বাস হচ্ছে না? কোনও ভয় নেই।” বলে এবার সে আমার হাতটা ধরে নীচের সিঁড়িতে পা ফেলল। আমি কেমন মন্ত্রমুগ্ধের মতো তার সঙ্গে সিঁড়ি বেয়ে নীচে নেমে গেলুম।
দু’ পা কি চার-পা নেমেছি, দেখি, এক অদ্ভুত কাণ্ড! কোথায় অন্ধকার! আলোয় আলো চারদিকে। আর সেই আলোয় ঝলমল করছে সারা ঘর। আমি সেই নীচে, ঘরের মেঝেয় দাঁড়িয়ে থ হয়ে গেছি। ওপর থেকে যে ঘরটাকে মনে হচ্ছিল পোড়ো-বাড়ি, নীচে, এখানে, চোখ মেলে দেখছি যেন একটা রূপকথার স্বপ্নরাজ্য। খুব ঝলমলে ঝাড় লণ্ঠনের আলো ছড়িয়ে পড়ে আশ্চর্য এক আঁকি-ঝুঁকির ছায়া দুলছে চারদিকে। বোধহয় আমায় হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেই লোকটা বলল, “অবাক লাগছে? না, ভাল লাগছে?”
আমি কথা বলব কী! বিস্ফারিত চোখে দেখতেই লাগলুম।
সে-ই আবার বলল, “তোমার ভাল লাগলে, আমারও ভাল লাগবেই।”
আমি জিজ্ঞেস করে ফেললুম, “এখানে থাক তুমি?”
“হ্যাঁ, একা।”
আমি বললুম, “কেন তোমার আর কেউ নেই?”
“ছিল এখন নেই!” বলেই লোকটা একটু কী ভেবে চট করে আমার হাতটা ধরল। টান দিল, “দেখবে এসো।”
আমি তার হাত ধরে এগিয়ে গেলুম। সে একটা মস্ত আলমারির সামনে এসে দাঁড়াল। আলমারির গায়ে একটা খুব উঁচু মতো আয়না বসানো। আমি লোকটার সঙ্গে আমারও ছায়া দেখতে পেলুম। আলমারিটা সে খুলে ফেলল। আমার চোখদুটো খুশিতে চমকে উঠেছে। দেখি কী, আলমারিভর্তি খেলনা আর খেলনা। আমি থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করলুম, “এত খেলনা কেন?”
সে বলল, “নেবে?”
আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম।
সে আমার চোখের দিকে তাকিয়ে হাসতে হাসতে বলল, “এ খেলনাগুলো তোমার। হ্যাঁ তোমার। আমার যখন ছেলে ছিল, এগুলো ছিল তার। এখন তোমার?”
আমি জিজ্ঞেস করলুম, “তোমার ছেলে গেল কোথায়?”
যে-মানুষটার মুখখানা এতক্ষণ হাসিতে উপচে পড়ছিল, সে হঠাৎ এমন গম্ভীর হয়ে গেল যে, দেখে আমি নিজেই আশ্চর্য হয়ে গেছি। এ কী, লোকটা যেন কাঁদছে। অমন একজন বয়স্ক মানুষকে কাঁদতে দেখে আমার মতো এক ছোট ছেলের সে সময় কী অবস্থা হওয়া উচিত, সে তোমরা নিশ্চয়ই বুঝতে পারছ। আমি না-পারি তার কান্না দেখতে না-পারি তার কান্না থামাতে, সে কাঁদতে কাঁদতে বলে উঠল, “ছেলেটা মারা গেছে!”
আমি থমকে গেলুম।
সে আবার বলল, “এই ঘরটা তার। আমি সাজিয়ে রেখেছি তার জন্যে! আমি রোজ রাত্রে জেগে বসে থাকি, যদি সে আসে। কিন্তু আসে না সে।”
আমি চুপ করে রইলুম। মনে মনে ভাবলুম, মারা গেলে কি আর ফিরে আসে কেউ!
সে হঠাৎ নিস্তব্ধতা ভেঙে বলে উঠল, “আমি বড্ড একা।”
আমি বললুম, “তুমি এখানে কাউকে রাখ না কেন?”
সে আমার কাছে এগিয়ে এল। আমার চিবুকটা ছুঁয়ে আদরমাখা স্বরে বলল, “একটা কথা বলব?”
আমি জিজ্ঞেস করলুম, “কী?”
সে একটু ইতিউতি চেয়ে ইতস্তত করল। তারপর বলল, “তুমিই থাকো না! আমার কাছে?”
আমি চমকে উঠলুম।
“হ্যাঁ, আমি একশো বছর ধরে, এই নির্জন বনের নিরালা বাড়িতে একা একা হাঁপিয়ে উঠেছি। আমি গত একশো বছরে একটু ভালবাসা পাইনি, একটু হাসি শুনিনি, তোমার মতো একটি ছোট্ট মিষ্টি ছেলের দেখা পাইনি। আজ তুমি এসেছ। তুমি আমায় একটু আদর করতে পারো না? একটু ভালবাসতে?” বলে সে এমন ব্যাকুল হয়ে আমার মুখের দিকে তাকাল, যে, আমার ভীষণ মায়া লাগল। কিন্তু অবাক লাগল আমার এই ভেবে, একশো বছর লোকটা বেঁচে আছে? অথচ দেখে তো মনে হচ্ছে না! কেন? তাই আমি জিজ্ঞেস করলুম, “তোমাকে দেখে তো মনে হচ্ছে না, তোমার অত বয়স!”
সে হাসল।
“তা ছাড়া অতদিন কি মানুষ বাঁচে?”
সে জোরে হেসে উঠল। তারপর কীরকম উন্মাদের মতো চিৎকার করে বলে উঠল, “আমিও বেঁচে নেই, আমিও বেঁচে নেই। আমি একটা মৃত মানুষের আত্মা। আমি একটু ভালবাসা চাই, একটু ভালবাসা। তোমার কাছ থেকে। যেমন ভালবাসত আমার ছেলে আমাকে।” বলে কেঁদে উঠল লোকটা।
সঙ্গে সঙ্গে আমার মাথাটা কীরকম ঝিমঝিম করে উঠল। আমার পাদুটো অস্থির হয়ে ছটফট করতে লাগল। আমি বসে পড়লুম সেই পালঙ্কের ওপর। আমি ভয় পেয়েছি কি না বুঝতে পারলুম না। কিন্তু সে ছুটে এল আমার কাছে। আমাকে জড়িয়ে ধরে বলল, “ভয় নেই। আমি কোনও ক্ষতি করব না তোমার। আমি তোমাকে কত যত্ন করব, কত ভালবাসব, যা চাইবে তাই দেব,” বলে আলমারির ভেতর থেকে একটা রিভলভার বার করল। আমি এবার প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলুম। মৃত-মানুষটা কি আমায় মেরে ফেলবে! আমি চিৎকার করে পালাতে গেলুম। না, পারলুম না। নিমেষের মধ্যে ঘরের আলো নিভে গেল, একটা ঘন অন্ধকারের মধ্যে আমি নিজেকে হারিয়ে ফেলে কেঁদে উঠলুম। কিন্তু আমি নিশ্চিত জানি, এ-কান্না আমার মিথ্যে। কেউ শুনতে পাবে না। কেঁদে কেঁদে আমার মুখের রক্ত উঠে গেলেও আমায় এখানে কেউ উদ্ধার করতে আসবে না। সুতরাং অন্ধকার হাতড়ে হাতড়ে আমি ঘরের সিঁড়িটা খুঁজে বার করার জন্যে আঁকপাক করতে লাগলুম। এমন সময় সেই জমাট অন্ধকারে তার কণ্ঠস্বর আমি শুনতে পেলুম, “এই রিভলভারটা দিয়েই আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়েছিল। তুমি বিশ্বাস করো, সে কোনও দোষ করেনি। সে শুধু দেখে ফেলেছিল, একদল জলদস্যু ওই সমুদ্র পেরিয়ে এই বনে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের গোপন আস্তানার কথাটা জানতে পেরেছিল আমার ছেলে। একদিন গভীর রাত্রে সেই দস্যুদল চড়াও হয় আমার বাড়ি। আমার ছেলেকে তারা আমার কাছ থেকে ছিনিয়ে নেবার জন্যে আমার মাথায় আঘাত করল। আমি ছিটকে পড়লুম। কিন্তু মরলুম না। যন্ত্রণায় ছটফট করে কাতরাতে কাতরাতে বলে উঠলুম, তোমরা ওকে মেরো না, ওকে মেরো না। আমার প্রাণ ওই আমার একমাত্র ছেলে। তারা শুনল না আমার কথা। কিন্তু আমি পড়ে পড়ে শুনতে পেলুম, এই রিভলভারটা গর্জে উঠেছে, দুম, দুম! একবার নয় দু’-দু’বার। তারপর চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে গেল। আমি স্তব্ধ হয়ে গেলুম।”
কিছুক্ষণ পরে আমি উঠেছিলুম। তখন আমি মৃত। মাথার আঘাতে অজস্র রক্তপাত হয়ে গেছে আমার শরীর থেকে। আমি সে-আঘাত সহ্য করতে পারিনি, তাই আমার মৃত্যু। তারপর হাহাকার করতে করতে আমি খুঁজে বেড়িয়েছি আমার ছেলেকে। পাইনি খুঁজে। কিন্তু খুঁজে পেয়েছিলুম এই রিভলভারটা। ওই বনের ভেতর থেকে। সেই থেকে এটা আমার কাছে আছে। এটা তুমি কি নেবে! খুঁজে যদি পাও সেই ঘাতকদের, যারা আমার ছেলেকে মেরেছে, তাদের—”
আচমকা আমি সিঁড়িটায় হোঁচট খেলুম, দড়াম করে আওয়াজ হল। সে বোধহয় চমকে উঠল। আমার হাতটা টেনে ধরল। চেঁচিয়ে উঠল, “না তুমি যেতে পারবে না।”
আমিও চিৎকার করতে গেলুম, পারলুম না। মনে হল, কে যেন আমার মুখটা চেপে ধরলে। সেই রিভালভারটা অন্ধকারে আলোর ঝিলিক দিয়ে আবার শব্দ তুলল, দুম! মনে হল, একটা বিচ্ছিরি গন্ধ নাকের ভেতর ঢুকে আমার নিশ্বাসটা চেপে ধরছে। আমি চোখ চাইবার চেষ্টা করছি, পারছি না। কিন্তু আমি শুনতে পাচ্ছি সে আমার কানের কাছে মুখটা এনে ফিসফিস করে বলছে, “আমি বড় একা। তোমাকে আমি ছাড়ব না। কিছুতেই না।” তারপর যেন মনে হল, তার হাতদুটো, আমার হাতদুটোকে চেপে ধরেছে। আমি আঁতকে উঠলুম। তারপর আর কিছু জানি না।
আমার যখন জ্ঞান এল, আমি দেখলুম, আমি আমার ঘোড়ার পিঠে মুখ গুঁজে লুটিয়ে আছি। ঘোড়া হাঁটছে বনের ভেতর দিয়ে। আমি অবাক হয়ে গেলুম। জানি না, কোথা থেকে ঘোড়া এল, আর কেমন করেই-বা আমি তার পিঠে এলুম। আমি তার পিঠের ওপর সিধে হয়ে বসার চেষ্টা করতে করতে ভাবছি, তবে কি সেই মৃত মানুষটা দয়া করেছে আমায়! সে কি দয়া করে আমার নিস্তেজ দেহটা বয়ে নিয়ে ঘোড়ার পিঠে বসিয়ে দিয়েছে। হবেও বা। কিন্তু ঘোড়াটা এল কোত্থেকে? কোথায় ছিল সে? এ যেন আশ্চর্য এক রহস্য।
তারপর আমি ঘরে ফিরে এলুম, পাক্কা একদিন পরে।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন