শৈলেন ঘোষ

কী কুক্ষণেই আমার জন্ম। আমার জন্ম হয়েছিল এক ভয়ংকর গভীর রাত্রে। বাইরে তখন প্রচণ্ড ঘূর্ণিঝড়ের তাণ্ডব চলছে। আকাশে ঝলসে উঠছে চোখ-ধাঁধানো বিদ্যুতের চকমকি আর বুক-কাঁপানো মেঘের তর্জন-গর্জন।
ঘূর্ণিঝড়ে আমাদের গ্রামের কত ঘরবাড়ি যে নিশ্চিহ্ন হয়ে গিয়েছিল সেদিন, আর কত লোক যে ভাঙা ঘরের মাটির নীচে প্রাণ হারিয়েছিল, তার হিসেব কেউ বলতে পারে না। তার ওপর আমি যখনই জন্মেছি, মানে, মাটিতে পড়ে প্রথম কেঁদেছি, তখনই প্রচণ্ড শব্দে একটি বাজ পড়েছিল। একেবারে আমাদের বাড়িতে। খুব রক্ষে, পড়েছিল আমাদের বাড়ির বেলগাছে। কে জানে, সেটি যদি আমাদের কোঠা-বাড়ির ছাতে এসে হুমড়ি খেত, তা হলে কী সর্বনাশ হত!
ওই বেলগাছটির চারা আমার ঠাকুমা নিজের হাতে পুঁতেছিল। নিজের হাতে রোজ সকালে গাছের গোড়ায় জল ছিটিয়ে, অনেক যত্নে ওকে পুরুষ্ট করে তুলেছিল। ঠাকুমা আর নেই। ঠাকুমা দেখে যেতে পারেনি, তার সবেধন নীলমণি নাতিটি জন্মাবার সঙ্গে সঙ্গে তার আদরের বেলগাছটির মাথায় বাজ পড়েছে। গাছ মরেছে।
কাজেই লোকে বলল, আমি একটি অলক্ষুনে ছেলে!
সত্যি বলতে কী, আমার মা-বাবা অনেক সাধ্য-সাধনা করে আমায় পেয়েছে। অনেক দেবতার ঘরে ধর্ণা দিয়ে, অনেক মানত করে। কিন্তু আমি যে এমন ভাগ্য নিয়ে তাদের সংসারে আসব, কে তা ভাবতে পারে!
আমার বাবা ছিল মস্ত বড়লোক। একটা মস্ত সোনা-রুপো র ব্যবসা ছিল আমার বাবার। বাবা খুব ভাল জহুরির কাজ জানত। সোনায়-গাঁথা হিরে-পান্না চুনি-মুক্তোর নানান কারিগরি বাবার হাতে তৈরি হয়ে নানান দেশে বিকিকিনির জন্যে কাড়াকাড়ি পড়ে যেত। সেই সুবাদে বাবার যেমন নাম-ডাক ছিল, তেমনই হয়েছিল অঢেল পয়সা, অনেক সম্পত্তি আর অসংখ্য বন্ধুবান্ধব। কিন্তু মনে সুখ ছিল না। কারণ সব থেকেও বাবার মনে হত, তার কিছুই নেই। মানে, তার একটি ছেলে নেই।
তাই আমি যখন জন্মালুম, তখন নাচ-গান, হাসি-আনন্দ সব দিয়ে আমাদের ঘর উপচে ওঠার কথা। কিন্তু তা হল না। কেননা, সবাই বলল এমন অলক্ষুনে ছেলেকে নিয়ে বেশি আদিখ্যেতা করা ভাল নয়! এ সর্বনেশে ছেলে! কিন্তু বাপ-মা তো আর তা মনে করতে পারে না। বাপ-মা’র কাছে, আহা! ছেলে সে ছেলেই। আদরের ধন। তার ওপর আমি বড়লোকের ছেলে। অভাব নেই। তাই আমার যত্ন-আত্তিরও শেষ নেই। শত্তুরের মুখে ছাই দিয়ে আমি সুখে স্বাচ্ছন্দ্যে মানুষ হতে লাগলুম।
কিন্তু সুখ বেশিদিন সহ্য হল না। সত্যিই, আমার আসার পর থেকে বাবারও সময় খারাপ হতে থাকল। আমার অমন ধনবান বাবার কপাল ভাঙল। বাবার ব্যবসা গেল, সম্পত্তি গেল, টাকাপয়সা সব গেল। এখন দু’বেলা দু’মুঠো জোটে না। জমজমাট বাড়ি ঘরদোর এখন অন্ধকার। চামচিকি উড়ে বেড়াচ্ছে। দেয়াল থেকে রং চটে ইট-সুরকি দাঁত ছরকুট্টে দাঁড়িয়ে আছে। হয় তো আর ক’দিন পরে গোটা বাড়িটাই মুখ থুবড়ে মাটির ওপর গড়াগড়ি খাবে। সুতরাং এই ছেলের জন্যেই যে এমন দুর্দশা, এ-কথাটা তখন আর না মেনে উপায় কী! তবু আমার বাপ-মা তো আর সে-কথা মানতে পারে না। তারা দিনরাত্তির ঠাকুরকে ডাকতে লাগল, ঠাকুর, তাদের ছেলের যেন কোনও অকল্যাণ না হয়।
অকল্যাণ আমার হয়নি। আমি বেশ বহাল তবিয়তে মানুষ হয়ে উঠছিলুম। খেতে না পেলে কাঁদছিলুম। শুতে না পেলে বায়না ধরছিলুম। আর কখনও বাবার কাঁধে, কখনও মায়ের কোলে নিশ্চিন্তে নাচানাচি কিংবা চেঁচামেচি করে দিন কাটাচ্ছিলুম।
এমনি করে বড় হয়ে উঠলুম। মানে, বুঝতে পারলুম, আমাদের খুব কষ্টে দিন চলে। বাবা রাস্তায় রাস্তায় চিনেবাদাম ফিরি করে বেড়ায়। বাদাম বেচে যা দু’ পয়সা হয়, তাতে আমার পেট ভরাতেই ভাঁড়ার খালি। এটা-ওটা ভাল-মন্দ খেয়ে খেয়ে আমারও এমন নোলা হয়েছে যে, একটু আধটুতে আমার সানে না। বেশ চারডি না গিললে আমার পেট ভরে না। মা বলত, “আহা, খাক খাক, ছেলে তো আমাদের পাঁচটা-সাতটা নয়, একটা। তা দু’বেলা দুটো পেট ভরে খাবে না!” মায়ের আর কী! মাকে তো আর বাবার মতো মাথায় বাদাম নিয়ে বাজারে বেচতে যেতে হয় না। তা হলে বুঝত কত ধানে কত চাল!
সত্যি বাবার কী দশা হয়েছে। দেহের হাড় ক’খানি জিরজির করছে। মাথার চুলগুলো শুকনো ঘাসের মতো খাড়া খাড়া হয়ে গেছে। গালভাঙা হাড়ের ওপর চোখ দুটো ড্যাব ড্যাব করছে। দেখলে বড় কষ্ট হয়। আমারও কষ্ট হত। কারণ আমি এখন আরও বড় হয়েছি। এখন আমার লেখাপড়া শেখার বয়েস। সে আর আমার হয়েছে। নুন আনতে পান্তা ফুরোয় যাদের তাদের আবার লেখাপড়া! সুতরাং লেখাপড়া শিকেয় তুলে আমি মুখ্য হয়েই বাবার কষ্ট দেখতে লাগলুম।
আমার লজ্জা করত। ছিঃ ছিঃ! আমি এত বড় একটা ছেলে, খাচ্ছিদাচ্ছি আর ধিঙ্গিপনা করে বেড়াচ্ছি। আর আমার বুড়ো বাবা মাথার ঘাম পায়ে ফেলে খেটে মরছে! আমার তখন খুব ইচ্ছে হত, বাবার মতো আমিও ফিরিওয়ালা হয়ে যাই। কিছু মাল-পত্তর মাথায় নিয়ে আমিও বেচতে বেরোই। একদিন বাবাকে বলেও ফেললুম, “বাবা আমি তোমার সঙ্গে বাদাম বেচতে বেরোব!”
বাবা হেসে ফেললে। বলল, “না, না, তুই পারবি না। তোর কষ্ট হবে।”
আমি বললুম, “তুমি বুড়ো মানুষ, তুমি কষ্ট করতে পারো, আমি পারব না? আমায় তো শিখতে হবে।”
হ্যাঁ। বাবা হয় তো ভাবল, ছেলেটা ঠিকই বলেছে। অবিশ্যি কার বাপের আর মন বলে, ছেলে ফিরিওলা হয়। বাপ চাইবে ছেলে তার জজ-ব্যারিস্টার হোক। গাড়ি-ঘোড়া চড়ুক। তাকে পেয়াদা-পাইক সেলাম ঠুকুক। তা ও-সুখ আর এ-জন্মে আমার হবার নয়। এ জন্মটা ফেরিওলার ব্যাটা ফেরিওলা থাকাই ভাল। সুতরাং বাবার সঙ্গে আমি বাদাম বেচতে পথে বেরোলুম।
বইয়ের বিদ্যে না শিখলেও, বেচাকেনার বিদ্যেটা শিখতে আমার বেশি সময় লাগল না। এদিক থেকে আমার মাথাটা দিব্যি খুলে গেল। আমি তো আসলে ব্যবসায়ীর ছেলে! বেশ কিছুদিন বাবার সঙ্গে ঘুরে ঘুরে শিখলুম। শিখলুম, খুব কম পয়সায় জিনিস কিনে, কেমন করে খুব বেশি পয়সায় বেচতে হয়। আর শিখলুম, এর নাম ব্যবসা।
বাবা আরও বুড়ো হল। আমি আরও বড় হলুম। একদিন বাবাকে বললুম, “দ্যাখো বাবা, তুমি বুড়ো হয়েছ, তোমার ছেলেও মানুষ হয়েছে। এক ছটাক বাদাম বেচে খদ্দেরের হাতে ক’টি কাঁচা-লঙ্কা ও কতটা নুন দিতে হয় সে শিখেছে। তুমি এবার ছেলের ওপর সংসার ছেড়ে ঘরে বসে আরাম করো।”
বাবা কি আর রাজি হবার পাত্তর! আগেকার লোক তো! টাটকা ঘি-দুধ পেয়েছে। ভাল-মন্দ খেয়েছে। তাই বুড়ো হলেও মনের জোরটা তো একটুও কমেনি। তাই বাবার সঙ্গে আমার অনেক ধানাই-পানাই হল। অনেক তক্ক-বিতক্ক চলল। শেষমেশ জোয়ান ছেলের জয় হল। বাবা আমার মাথায় বাদামের বোঝা তুলে দিল। আমি পথে বেরিয়ে হাঁক পাড়লুম, “বাদাম চাই বাদাম। টাটকা-ভাজা বাদাম।”
বাবা আমার ভাবতে লাগল, “আমার দিন শেষ হল, নতুন দিন এল।”
কিন্তু, আমার মাথায় বাদাম দেখে চোখ কপালে উঠল পাড়াপড়শির। যেন ভয়ানক সর্বনাশ হয়ে গেল তাদেরই। লজ্জার মাথা খেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “দ্যাখো গো, দ্যাখো, বাপ বাদাম বেচে যাও-বা দু’বেলা দু’মুঠো খেতে পাচ্ছিল, ছেলে এবার লাটে তুলবে!”
আমি ওসব ফালতু কথায় কান দেবার বান্দা নই। আরে পাগলে কী না বলে, ছাগলে কী না খায়! দুর তোর পাড়াপড়শি। “বাদাম চাই, বাদাম।” আমি হাঁক পাড়তে লাগলুম আর পথ হাঁটলুম।
বলব কী, অন্তত ঘণ্টা দুয়েক পথ হেঁটেছি। চিল্লাতে-চিল্লাতে গলা ভেঙেছি। তবুও একটি খদ্দের জোটেনি। অন্যদিন বাবা থাকলে এতক্ষণে না হলেও মাথার বোঝা অর্ধেক বিকিয়ে যেত। আজ এখনও পর্যন্ত একটি পয়সাও আমার হাতে এল না। কী বলব একে? বাজার মন্দ, না আমার ভাগ্য? মনে হল, লোকের কথাই বোধহয় সত্যি। আমি বোধহয় সত্যিই অপয়া। নইলে প্রথম দিনেই এমন হবে কেন! নিজের ওপর আমি নিজেই বিচ্ছিরি রকমের বিরক্ত হয়ে উঠলুম। ঘরে আমার মা-বাবা আমার জন্যে পথ চেয়ে বসে থাকবে। আমি পয়সা নিয়ে গেলে তবে হাঁড়ি চড়বে। আর এ কী কাণ্ড!
নিজের ওপর আমার যতই ঘেন্না ধরুক, ভাবলুম, হাল ছাড়লে চলবে না। যা হোক করে আজকের খরচটা তুলতেই হবে। আমি যদি বাপ-মাকে না খাওয়াতে পারি, তো আমি কীসের ছেলে!
আমি ভাবলেই কি ভবি ভোলবার! যা হবার নয়, মাথা কুটে মরলেও তা হবার নয়। একটি কুটোও আমার বিকোল না। এদিকে রোদ পড়ি-পড়ি করছে। ঘরে ফেরার সময় হয়ে আসছে। আমি ভীষণ মুষড়ে পড়লুম। ভাবলুম কোন মুখে ঘরে ঢুকব! ব্যবসাটা শেষ অবধি সত্যি-সত্যি আমার হাতে পড়ে চুলোয় গেল! আমি নিজেই ভাবতে ভাবতে অবাক হয়ে গেলুম।
কী করি, না-করি আমি ভেবে পাচ্ছিলুম না। কখনও মনে হচ্ছিল, দুর ছাই, বাদামগুলো আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলে দিই। আবার ভাবছিলুম, ফেলে দিয়ে কী হবে। যাকে সামনে পাই তাকে বিলিয়ে দিই। বিনে পয়সার খদ্দেরের তো অভাব হবে না। আবার মনে হচ্ছিল, না ওসব করে কী লাভ! বাদাম আমায় বেচতে হবেই। বেচি তো ভাল। নইলে আজ ঘরমুখো হব না।
মনের ভেতরটা আমার এমন খেপে উঠেছিল যে, পাদুটো আমার কোন পথে হাঁটছে খেয়ালই করিনি।
“এই বাদামওলা।” একদম আচমকা কে যেন আমায় পেছনদিক থেকে ডাকল। আমি থতমত খেয়ে গেছি। পেছন ফিরে চেয়ে দেখি, একটা বুড়োলোক।
“তোর বাদাম টাটকা?” লোকটা জিজ্ঞেস করল।
আমার চোখে-মুখে, মাথায়-বুকে এমন একটা টাটকা হাওয়ার ঢেউ খেলে গেল কী বলব! মনে হল, আমি তক্ষুনি বুড়ো লোকটার পায়ের ওপর ধপাস করে বসে পড়ে বলি, “আহা, তুমি বাঁচালে!”
না, আমি অবশ্য তা করলুম না। তা হলে খদ্দের পেয়ে বসবে। তাই আমি খুশিটাকে মনের মধ্যে খামচে ধরে বললুম, “কী বলেন বাবু, টাটকা—এক নম্বরের বাদাম। কতটুকু চাই আপনার?”
“সবটুকু। কতটা আছে তোর ঝুড়িতে?”
বুকের ধুকধুকিটা আমার ধকধক করে নেচে উঠল। মুখ দিয়ে কথা সরল না। আমি ফ্যাল ফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম তার দিকে।
“তোর ওই ঝুড়িসুদ্ধ বাদামের কত দাম?”
আমার ফট করে মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “আজ্ঞে, দশ টাকা।” কিন্তু আমি জানি মাল আছে পাঁচ টাকার।
“মাত্তর। আমি তোকে পনেরো টাকা দেব।”
সঙ্গে সঙ্গে মনে হল লোকটা আমায় নিয়ে ঠাট্টা করছে। নইলে মশাই, কে এমন লোক আছে, দশ টাকার মাল পনেরো টাকায় নিতে চায়। মনে হল বলি, আপনি মশাই ঠাট্টা করছেন নাকি? বলতে হল না। লোকটাই বলল, “পনেরো টাকা দেব, কিন্তু তোকে আমার একটা কাজ করে দিতে হবে!”
আমি জিজ্ঞেস করলুম, “কী কাজ?”
লোকটা বলল, “আয় আমার সঙ্গে।”
আমি চললুম।
লোকটা বাড়ি এল। একখানা বেশ বড়সড় ঘর। লোকজন কাউকে দেখতে পেলুম না। ঘরে মাল-পত্তরও তেমন কিছু দেখলুম না। দেখলুম, ঘরে একটা চেটাই বিছানো। তার ওপর একটা তেল-চিটচিটে বালিশ। বালিশের কোলে এক বান্ডিল বিড়ি। আর দেখলুম, দশ-বারোটা সাদা রঙের ইঁদুর। সব ক’টার পায়ে সুতো বাঁধা। ছুটোছুটি করছে। আমি ভাবলুম, তা হলে বোধহয় ইঁদুরের জন্যেই বাদাম কিনবে। যার জন্যেই কিনুক, আমার নগদ পয়সা পেলেই হচ্ছে। জন্ম জন্ম বেঁচে থাক আমার এমন খদ্দের।
আমায় ঘরে ঢুকতে দেখে ইঁদুরগুলো লাফালাফি শুরু করে দিল। বাদামের গন্ধ পেয়েছে তো! লোকটা একটা ময়লা কাপড় বিছিয়ে বলল, “বাদামগুলো এতে ঢেলে দে।”
আমি বাদামের ঝুড়ি খালি করে দিলুম।
লোকটা বলল “একটু দাঁড়া, পয়সা এনে দিচ্ছি।” বলে ঘর থেকে বেরিয়ে বোধহয় আর এক ঘরে গেল। আমি ঘুরে দাঁড়ালুম। দাঁড়িয়ে ভাবতে লাগলুম, দেখি লোকটা আবার কী কাজ দেয়!
“এই খোকা, একটা বাদাম দিবি?”
চমকে উঠেছি আমি। যাঃ চ্চলে! এমন মিনমিনে সরু গলায় ঘরের মধ্যে কে কথা কইল! বুড়োর বউ নাকি! কিন্তু বউ-টউ তো কাউকে দেখছি না। আমি ঘুরে দাঁড়ালুম। সঙ্গে সঙ্গে ঘরের দশ-বারোটা ইঁদুর একেবারে মানুষের মতো খিলখিল করে হেসে উঠল। আমি তো তাজ্জব। ইঁদুর মানুষের মতো হাসছে! হ্যাঁ, হাসছে, আমি নিজে দেখছি!
“দে নারে একটা বাদাম, কী ছেলে বাবা কথা শোনে না!”
উরি ব্যাস! আমি পালাই! ইঁদুর কথা বলছে। ভুতুড়ে ইঁদুর! দে ছুট!
লোকটা সেই সময়েই ঘরে ঢুকছে। আর একটু হলেই ধাক্কা লেগে গেছল! সামলে নিলুম।
লোকটা জিজ্ঞেস করল, “কোথা যাচ্ছিস?”
আমার গলা শুকিয়ে গেছে। হাত বাড়ালুম।
লোকটা বলল, “ওঃ ইঁদুর?”
আমি ঠকঠক করে কাঁপছি!
লোকটা বলল, “দুর বোকা! ইঁদুর দেখে ভয় পাস! ওদের আমি কথা বলতে শিখিয়েছি।”
তবু আমার হাঁফ ছাড়ল না। লোকটার হাত থেকে পনেরোটা টাকা ছিনিয়ে নিয়ে ট্যাঁকে গুজলুম। তারপর এক মুঠো বাদাম নিয়ে ইঁদুরগুলোর দিকে ছুড়ে দিলুম। ইঁদুরগুলো তেমনি মিহি গলায় চেঁচিয়ে উঠল “থ্যাঙ্ক ইউ!”
আমি বুঝতে পারলুম না কী বলল। কিন্তু বুড়ো লোকটা হো-হো করে হেসে উঠে বলল, “তোকে ধন্যবাদ দিল।”
আমি বললুম, “অ”।
“আচ্ছা তা হলে শোন”, বুড়ো লোকটা আবার বলল, “এই কাগজটা ধর। এই কাগজে ঠিকানা লেখা আছে। এই ঠিকানায় ক’টা কাশীর পেয়ারা তোকে পৌঁছে দিতে হবে। পারবি তো?”
আমি ঠিকানা লেখা কাগজটা হাতে নিয়ে, আমার বাদামের ঝুড়ির মধ্যে পেয়ারার ঝোলাটা বসিয়ে, মাথায় তুলতে তুলতে বললুম, “পারব।”
লোকটা বলল, “দেখিস বাপু, বিশ্বাস করে তোকে দিলুম। ঠিক জায়গায় পৌঁছে দিস। আর শোন, রোজ এক ঝুড়ি করে বাদাম দিয়ে যাস। আমি পনেরোটা করে টাকা দেব।”
আমি কি অতই বোকা যে, এমন একটা পাকা ব্যবস্থায় সায় না দিয়ে, পেয়ারাগুলো রাস্তায় ফেলে বাড়ি চম্পট দেব! যাক, বাদাম বেচতে কাল থেকে আর আমায় টো টো করে রাস্তায় ঘুরপাক খেতে হবে না। নিশ্চিত হয়ে, আমি ঠিকানা লেখা কাগজটায় চোখ বোলাতে বোলাতে বেরিয়ে পড়লুম। লোকটাকে বুঝতে দিলুম না, আমার পেটে ঢুঁ মারলেও ‘ক’ অক্ষর বেরোবে না। সুতরাং সেই কাগজে কার ঠিকানা লেখা আছে আমি জানি না। কোনদিকে যেতে হবে, তাও জানার কথা আমার নয়। কাজেই খানিকটা পথ সেই কথা-বলা ইঁদুরগুলোর কথা ভাবতে ভাবতে, আর ট্যাঁকের টাকাগুলো ঘাঁটতে ঘাঁটতে আমি একটা চৌমাথার মোড়ে এলুম। এখন ঠিকানার কথাটা কাউকে জিজ্ঞেস না করে উপায় নেই। চৌরাস্তার কোন রাস্তার কোনদিক ধরে হাঁটলে ঠিকানার হদিস পাব, তা তো আমি জানি না। সামনেই একটা লোক আসছিল। দেখে মনে হল, ছিমছাম ভদ্দরলোক। তাকে আমার ঠিকানা লেখা কাগজটা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “মশাই, বলতে পারেন এই ঠিকানাটা কোনদিকে?”
ভদ্দরলোক ভদ্দরলোকের মতো আমার হাত থেকে ঠিকানাটা নিয়ে বলল, “এই তো কাছেই। ওই রাস্তাটা ধরে হাঁটতে হবে। খানিকটা গিয়ে বাঁদিকে আর একটা রাস্তা। চারখানা বাড়ির পরে একটা লাল রঙের বাড়ি। তার পাশ দিয়ে একটা সরু গলি গেছে। গলিটার মাঝ বরাবর একটা পুকুর। পুকুরের পাড়ে একটা শিবমন্দির। শিবমন্দিরটা পেরোলেই একটা অশ্বত্থাগাছ। ওই অশ্বত্থাগাছটার ডানদিকে হাঁটলেই পেয়ে যাবে।”
আমি বললুম, “অ! তা হলে তো কাছেই।” কিন্তু সত্যি বলতে কী একসঙ্গে হড়বড় করে কী যে বলল লোকটা, আমার মাথায় কিছুই ঢুকল না। তবে সে-কথা আর ভদ্দরলোককে বলে বিরক্ত করতে চাই না। ভাবতে পারে, আমি গর্দভ! তাই আর ঘাঁটাঘাঁটি না করে, ওই রাস্তাটা ধরেই হাঁটা দিলুম। ও হরি! এক পা-ও হেঁটেছি কি না ঠিক নেই, সেই ভদ্দরলোক চেঁচিয়ে ডাক দিল, “ওহে খোকা, দাঁড়াও, দাঁড়াও।”
আমি দাঁড়িয়ে পড়লুম। লোকটা কাছে এসে বলল, “চলো, তোমায় পৌঁছে দিয়ে আসি।”
মনে মনে ভাবলুম, তা হলে তো ভালই হয়। কিন্তু লোকদেখানি বললুম, “আপনি আবার কষ্ট করবেন কেন?”
“না, কষ্ট আর কী! এই তো এখানেই! তুমি খুঁজে না পেলে শুধু শুধু ঘোরাঘুরি করবে। রাস্তাটা একটু গোলমেলে।”
আমি বললুম, “তা ঠিক। একটু প্যাঁচালো!”।
আমি ভদ্দরলোকের ভদ্রতায় জল হয়ে তাঁর সঙ্গে চললুম।
অনেক আগেই আমার বাড়ি ফেরার সময় হয়ে গেছে। আমি ঠিক জানি, আমার বুড়ো বাপ-মা তাদের সবেধন নীলমণিটির জন্যে কতই না ভাবনা করছে। কিন্তু যখন বাড়ি গিয়ে বাবার হাতে ওই পনেরোটা টাকা তুলে দেব তখন? তখন ভাবনা কোথায় থাকবে? থেকে থেকে আমার মনের ভেতর একটা চাপা আনন্দ উথলে উঠছিল, আর মাঝে মাঝে সাদা ইঁদুরগুলোর খিলখিলিনি হাসির সুরটা কানের ভেতর সুড়সুড়ি দিচ্ছিল। পাখিকে শেখালে তারা “হরে-কেষ্ট, কেষ্ট কেষ্ট, রাম রাম” বলে ডাকতে পারে শুনেছি। কিন্তু ইঁদুরকে শেখালে ইঁদুরও যে খিলখিল করে হাসতে পারে, এমন কথা জন্মে শুনিনি। ইঁদুরগুলো বেঁচে-বর্তে থাক, যত পারে খিলখিলিয়ে হাসুক, কথা। বলুক, তাতে আমার তো আর বাড়া ভাতে ছাই পড়বে না। উলটে বাদামের ব্যবসাটাই আমার ফেঁপে উঠবে।
অশ্বত্থগাছটা পেরিয়ে একটা বাড়ির মধ্যে ঢুকতে ঢুকতে লোকটা বলল, “আমার সঙ্গে এসো।”
বাড়ির যা চেহারা! ঘুপচি। ভাঙাচোরা। আমি দরজা ডিঙিয়ে একটা সুড়ঙ্গমতো রাস্তা ধরে লোকটার সঙ্গে বাড়ির ভেতর হাঁটা দিলুম। সুড়ঙ্গটা নেহাতই অন্ধকার! কেমন যেন থমথমে। এর ভেতর যে মানুষ বাস করে, প্রথমে তা ভাবাই যায় না। যতই ভেতরে ঢুকছি অন্ধকারটা ততই দানা বাঁধছে। সামনেটা ভাল করে ঠাওরই করতে পারছি না। দু’-একটা ঠোক্করও খেলুম। তারপর অন্ধকার কাটিয়ে একটা ঘরে এলুম। আমার কেমন ভয় ভয় করতে লাগল। লোকটা আমায় একটা ভাঙা চৌকি দেখিয়ে বলল, “ওইখানে বসো। আমি ডেকে দিচ্ছি।” বলে লোকটা ভেতরে ঢুকে গেল।

ভাঙা বলে ভাঙা। চৌকির ওপর বসতেই ল্যাকপ্যাকে পায়া চারটে ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে ভেংচিয়ে উঠল। আমি ভাবলুম পড়ব নাকি! অবশ্য পড়িনি। ভাঙা চৌকির ওপর একা বসে ঘরটার চেহারা জুলজুল করে দেখতে লাগলাম। কোন জন্মের বাড়ি কে জানে? দেখে মনে হচ্ছে, এক্ষুনি বুঝি কড়িকাঠগুলো হুড়মুড়িয়ে ঘাড়ের ওপর পড়ে! ঝাড়পোঁচও করে না। এমন একটা স্যাতসেঁতে গন্ধ! মনে হচ্ছে নাকে কাপড় দিই। না, সেটা ঠিক না। নাক আমার খোলাই থাক। গন্ধটা নিশ্চিন্তে নাকে সেঁদুক। ভদ্দরলোকের বাড়িতে নাকে কাপড় জড়িয়ে বসে থাকাটা অসভ্যতা!
নাকে কাপড় গুঁজলুম না বটে, কিন্তু হঠাৎ আমার চোখদুটো ভয়ে ঠাউরিয়ে উঠল। আমার প্রায় সামনে মুখোমুখি দু’-দুটো খাঁড়া ঝুলছে। ঘরে যদিও তেমন আলো আসছিল না, কিন্তু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে খাঁড়াদুটো ঝকঝক করছে। আমি ভাবলুম, গেছি! এ আবার কার খপ্পরে পড়লুম!
“ঝনঝন ঝনাৎ!” নিস্তব্ধ ঘরটা কেঁপে উঠল। আমি থতমত খেয়ে গেছি! ভাল করে কিছু বোঝার আগেই চেয়ে দেখি সেই খাঁড়াদুটো ঘরের মেঝেয় গড়াগড়ি খাচ্ছে! আমি আগুপিছু কিছু না ভেবে মারলুম ছুট!
ছুটতে পারলুম না। আমার হাতটা যেন কে ধরে ফেলল! চেয়ে দেখি আমার সামনে সেই ভদ্দরলোক!
আমি কিছু বলার আগেই ভদ্দরলোক আমার হাতটা ছেড়ে দিয়ে, মানুষ অর্ধেক রেগে গেলে চোখের ভেতর যেমন আধা-আধি রাগ দেখা যায়, তেমনইভাবে আমার দিকে স্থিরদৃষ্টিতে চেয়ে রইল। আমি কী করব ভেবে দেখতে দেখতেই লোকটা বলল, “ডাকাতি করতে পারবি?”
আমি আকাশ থেকে পড়লুম!
আমার উত্তর না পেয়ে লোকটা ধমক দিয়েই বলল, “কী রে পারবি?”
আমি বললুম, “আজ্ঞে পেয়ারা।” ভয়ে গলা আমার কাঠ হয়ে গেছে!
“আমি যা জিজ্ঞেস করছি, তার উত্তর দে।” লোকটা তেমনি গম্ভীর গলায় বলল।
আমি বললুম, “বেলা পড়ছে। আমি বাড়ি যাব। পেয়ারার মালিককে ডেকে দিন।”
“তুই আর বাড়ি যেতে পারবি না। এখানেই তোকে থাকতে হবে। হয় তোকে ডাকাত হতে হবে, না হয় মরতে হবে। এখানে তোকে কেটে ফেললেও কেউ জানতে পারবে না।” বলে লোকটা একটা খাঁড়া নিয়ে আমার দিকে এগিয়ে এল।
আমি বুঝতে পারলুম, আমার কম্ম শেষ! আর বুঝলুম, ইনি মোটেই ভদ্দরলোক নন। ইনি ডাকাতের পাণ্ডা! আমি চোখে সরষের ফুল দেখতে শুরু করলুম। আমার শরীরটা কীরকম অবশ হয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিল। মনে হচ্ছিল, পাদুটো আমার সিধে হয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না! এক্ষুনি মাটির ওপর মুখ থুবড়ে পড়ে যাব, কিংবা দম আটকে মরে যাব।
লোকটা এবার খাঁড়াটা আমার মাথার ওপর তুলে ধরল। আমার মুখের রা মুখেই আটকে গেছে! ভদ্দরলোকের গলাটা বাঘ রেগে গেলে যেমন গর-র-র গর-র-র-র করে, তেমনই করতে লাগল। আমি ভাবলুম, এবার আমার মুন্ডুপাত হবে। আমি মরব। মরা ভাল, না ডাকাত হওয়া ভাল, এই কথাটা ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ কে যেন আমার মুখ দিয়ে চিৎকার করে বলে উঠল, “না, আমি ডাকাত হব না।”
লোকটার খাঁড়া আমার ঘাড়ের ওর খ্যাচাং করে নেমে এল। আমি মাথা সামলাতে গিয়ে টাল সামলাতে পারিনি। হুড়মুড় করে পেয়ারার ঝুড়ির ওপর ঘষটে পড়লুম। কাশীর পেয়ারাগুলো মাটির ওপর গড়াগড়ি খেতে লাগল।
আমি ধাক্কা সামলাতে সামলাতে বুঝে নিয়েছি, খাঁড়া আমার ঘাড়ে পড়েনি। ফসকে গেছে। কিন্তু একবার ফসকে গেছে বলে তো আর বারবার ফসকে যাবে না। এবার আর নিস্তার নেই। আমি তখন কীরকম মরিয়া হয়ে উঠলুম। মনে হল, মরতে যখন হবে তখন কাপুরুষের মতো মরি কেন! ওই পেয়ারাগুলো ছাড়া তখন আমার হাতের কাছে আর কিছু ছিল না। আমি দুটো, তিনটে, চারটে যতগুলো পেরেছি পেয়ারা তুলে নিয়ে, একটা টেনে মেরেছি লোকটার মুখে। মেরে যেই আর একটা ছুড়তে গেছি, আমার হাতের পেয়ারা হাতেই রয়ে গেল। আমি দেখলুম, লোকটার হাতের খাঁড়া সাত হাত দূরে ছিটকে পড়েছে! অত বড় লোকটা নিমেষের মধ্যে উবে গিয়ে একটা সাদা রঙের ইঁদুর হয়ে গেছে! আমি কিছু ভেবে ওঠার আগেই দেখি, সাদা রঙের ইঁদুরটা ভীষণ তেড়ে আমায় কামড়ে দিতে আসছে। আমি ঘরের মধ্যে ছুটোছুটি লাগিয়ে দিলুম। আমার হাতে তখনও দুটো পেয়ারা। কী করব কিছুই ভাববার মতো অবস্থা ছিল না। আমি ঘুরপাক খাচ্ছি আর ইঁদুরের ভয়ে পালাবার রাস্তা খুঁজছি।
আমি পালালুম। মানে ছুটলুম। ইঁদুরটাও ছুটল। আমার পিছু নিল। আমার তখন দিক-বিদিক জ্ঞান ছিল না। যেদিকে পেরেছি ছুটেছি। এ-ঘর পেরিয়ে, ও-ঘর ডিঙিয়ে মার ছুট! আমি জানব কী করে, যতই ছুটছি ততই আমি ওই ভাঙা বাড়িটার একেবারে অন্দরে গিয়ে পড়ছি। কে জানে সেখানে কী বিপদ আছে!
আমি বুঝতে পারছি আমার দম ফুরিয়ে এসেছে। আমি আর ছুটতে পারছি না। এখন ধরে নিয়েছি ইঁদুরটা আমায় কামড়াবেই। প্রাণের ভয়ে সামনের ঘরটায় ঢুকে পড়লুম। পড়ি-মরি ঘরের দরজাটা দু’ হাত দিয়ে যেই বন্ধ করতে গেছি, আমার হাত থেকে একটা পেয়ারা ফসকে পড়ে গেল। ঘরের দরজা বন্ধ করতে গিয়ে টাল রাখতে পারলুম না। “ফ্যাঁচ-চ-চ!” একটা বিচ্ছিরি আওয়াজ আমার পেছনে। ফিরেই দেখি একটা কালো রঙের বেড়াল লাফিয়ে পড়েছে। লাফিয়েছে একেবারে সাদা রঙের ইঁদুরটার সামনে। চোখের পলক পড়তে পড়তেই দেখি, বেড়ালটা ইঁদুরটাকে টপাস করে গিলে ফেলল! উঃ! বেঁচে গেছি!
না, বাঁচিনি! বেড়ালটা এবার আমার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। আমি আগে অনেক বেড়াল দেখেছি, কিন্তু এমন বিদঘুটে কালো রঙের বেড়াল কখনও দেখিনি। চোখদুটো যেমন কটা, পায়ের নখগুলো তেমনই খোঁচা খোঁচা। পা-পা এগিয়ে আসছিল আমার দিকে। আমি ভয় পেলুম, এবার বোধহয় আমাকে কামড়াবে, কিংবা পায়ের নখ দিয়ে খামচে দেবে। আমি লাফিয়ে উঠে সরে গেলুম।
বেড়ালটা ক’পা এসেই ওঁত পেতে আমার সামনে বসে পড়ল। ল্যাজ নাড়তে লাগল। বেড়ালের সেই ল্যাজ নাড়া দেখে, আমার আর নড়ানড়ি করতে সাহস হল না! কী জানি, পেটে পেটে কী মতলব ভাঁজছে বাছাধন।
তা হলে এখন আমি কী করি। আচ্ছা, বেড়ালটার সঙ্গে ভাব করা যায় না? যতই হোক বেড়াল তো আর বাঘ-ভালুক নয় যে, ভাব করতে গেলে কামড়ে দেবে! তা ছাড়া যখন ষণ্ডামার্কা ডাকাতের সর্দারের হাত থেকে বেঁচে উঠেছি, তখন একটা তুচ্ছ বেড়াল আমার কী করবে! আমি ভাব করবার জন্যে বেড়ালের দিকে হাত বাড়িয়ে মুখে আওয়াজ দিলুম, “তু-তু-তু-তু।”
এই সেরেছে! বেড়ালটা যে হঠাৎ একেবারে একটা মেয়েমানুষের মতো কেঁদে উঠল! কাঁদতে কাঁদতে বলল, “তু-তু করছিস কেন রে ছেলেটা? আমি কি কুকুর?”
এর আগে সাদা ইঁদুরগুলোকে কথা বলতে শুনে যতটা অবাক হয়েছিলুম, এবার বেড়ালকে কাঁদতে দেখে চোখ আমার ঠিক ততটা কপালে উঠল না বটে, কিন্তু কপাল ভীষণ টনটন করে উঠল। আমি মুখে কথা বলতে পারছিলুম না। মনে মনে বলছিলুম, “আদরের মেনি আমার, আমি তোমায় কুকুর বলিনি, আদর করে ডাকছিলুম। এখন একটু পথ ছেড়ে দাও তো বাছা। আমি ঘরের ছেলে ঘরে যাই!”
বেড়ালটা এবার নাকিসুরে নেকিয়ে নেকিয়ে বলল, “আমি যে কাঁদছি, আমার চোখ দিয়ে যে জল পড়ছে, দেখতে পাচ্ছিস না? আমায় একটু ভোলাতে পারিস না? তোর হৃদয়ে কি একটু দয়ামায়া নেই!”
আমি আমার বুকে হাত বোলালুম। বুলিয়ে দেখলুম, আমার হৃদয় ঠিকই আছে। শুধু আমার হৃদয়ের ধড়ফড়ানিটা বেড়ালের কান্না দেখে অনেকটা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। যা থাকে কুল কপালে! আমি তড়াং করে লাফিয়ে বেড়ালের সামনে বসে পড়লুম। কালো বেড়ালটাকে কোলের ওপর তুলে নিয়ে আদর করতে করতে বললুম, “না, না, কেঁদো না। কী হয়েছে সোনামণি? আমি তোমায় ল্যাবঞ্চুস দেব, গলায় ঝুমঝুমি পরিয়ে দেব! না, না, থাক থাক!”
বেড়ালটা আমার আদরে গদগদ হয়ে আমার গলাটা জড়িয়ে ধরে বলল, “শুধু আদর করলে চলবে না, আমাকে তোর সঙ্গে নিয়ে যেতে হবে।”
এই খেয়েছে, আমি জানি কুকুরকে লাই দিলে মাথায় ওঠে! বেড়ালও যে ওঠে আমার জানা ছিল না। দ্যাখো দিকিনি কী শুকনো আবদার! আমার বুড়ো বাপ-মাই দু’বেলা দু’মুঠো খেতে পায় না, তার ওপর বেড়াল!
বেড়ালটা আবার আদুরি-আদুরি গলায় আমার কোলে দুলতে দুলতে বলল, “বল না, আমায় তোর সঙ্গে নিয়ে যাবি না?”
আমি কথাটা চাপা দেবার জন্যে বেড়ালের মুখের কাছে মুখ এনে, একটু “ইলি ইলি” করে জিব নেড়ে জিজ্ঞেস করলুম, “মেনি, মেনি, মেনি, সরভাজা খাবে?”
“উঁ! কথা ঘোরাচ্ছে।”
এই দ্যাখো, বেড়ালটা আমার মতলব ধরে ফেলেছে! কী চালাক!
বেড়াল বলল, “আমায় না নিয়ে গেলে আমিও তোকে এখান থেকে যেতে দেব না। আর যদি নিয়ে যাস, তবে তোকে একটা”—বলতে বলতে থামল বেড়ালটা।
আমি বললুম, “থামলে কেন আদরের মেনি? বলো না, বলো, তোমার মনের কথাটা খুলে বলো!”
বেড়াল বলল, “তুই আগে বল, তারপর আমি বলব।”
আমিও বললুম, “তুমি আগে বলো তারপর আমি বলব।”
“তুই আগে।”
“তুমি আগে।”
তারপর অনেকক্ষণ “তুই আগে, তুমি আগে” করতে করতে বেড়ালটা হি-হি-হি করে হেসে উঠে বলল, “দুষ্টু আয় আমার সঙ্গে।”
বেড়াল আমার কোলের থেকে নেমে, অন্ধকারে পথ দেখিয়ে কে জানে কোথায় নিয়ে চলল।
ভীষণ অন্ধকার। অন্ধকার হাতড়াতে হাতড়াতে বেড়াল আমায় একটা ঘরের সামনে নিয়ে এসে দরজা ঠেলে বলল, “আয়!”
ঘরে ঢুকে চক্ষু আমার স্থির! আলো, শুধু আলো। চারদিকে আলো আর তাল তাল সোনা। বস্তা বস্তা হিরে-চুনি-পান্না। গড়াগড়ি খাচ্ছে, ছড়াছড়ি যাচ্ছে!
বেড়াল জিজ্ঞেস করল, “কী দেখছিস?”
আমি বললুম, “তোমাকে।”
বেড়াল বলল, “দুর বোকা, সোনা দেখছিস, না রুপো দেখছিস?”
আমি বললুম, “সোনা দেখছি, রুপো দেখছি, তোমায় দেখছি।”
বেড়াল বলল, “এ আমার গুপ্তধন। আমায় যদি তোর সঙ্গে নিয়ে যাস, তা হলে তোকে আমি দেব।”
আমি একেবারে চিলের মতো চেঁচিয়ে উঠলুম, “নিশ্চয়ই নিয়ে যাব।”
আমার চেঁচানি শুনে, বেড়ালটা তেমনি তেড়ে ধমকে উঠল, “আদেখলেদের মতো চেঁচাচ্ছিস কেন?”
আমি ধমক খেয়ে, সিঁটিয়ে গেলুম। আমতা আমতা করে বললুম, “আমার ভীষণ আনন্দ হচ্ছে তো, তা-ই!”
বেড়াল বলল, “কী নিবি?”
আমি আঁক-পাঁক করতে লাগলুম। বললুম, “সব তো নিতে পারব না, সোনা নেব।”
বেড়াল জিজ্ঞেস করল, “ক’ বস্তা?”
আমি বললুম, “যত বস্তা পারি।”
বেড়াল বলল, “ঠিক আছে, আজ দু’বস্তা নিয়ে চল। কাল আবার নিয়ে যাবি।”
আমি বললুম, “রোজ নিয়ে যাব?”
বেড়াল বলল, “হ্যাঁরে, যদ্দিন না ফুরোয়।”
আমি ঘরের চারপাশটা দেখতে দেখতে ভাবলুম, “এ আর কোনওদিনই ফুরোবে না।”
আমার কোমরের কাপড়টা বেশ করে কষে বেঁধে নিলুম। ট্যাঁকে ভাল করে গুঁজে নিলুম আমার বাদাম বেচার বউনির টাকাটা। বেশ কসরত করেই দু’বস্তা সোনা পিঠে তুলে নিলুম। বেড়ালকে বললুম, “মেনি আমার কোলে এসো!”
মেনি কোলে লাফিয়ে উঠল। সোনার বস্তা পিঠে নিয়ে আর মেনিকে কোলে নিয়ে অন্ধকারে হাঁটা শুরু করলুম।
হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় এসে দেখি রাত হয়েছে। বেড়ালকে জিজ্ঞেস করলুম, “এবার কোনদিকে যাব মেনি?”
মেনি বলল, “ওই দিকে।”
ঘরে পৌঁছতে পৌঁছতে আরও রাত হয়ে গেল। যা ভেবেছিলুম হয়েছেও তাই। আমার বুড়ো-বাপ আর বুড়ি-মা ছেলের আশা ছেড়ে দিয়ে কান্নাকাটি শুরু করে দিয়েছে। আমায় দেখতে পেয়ে, কান্নার জল মুছতে মুছতে মা জিজ্ঞেস করল, “তোর কোলে এটি কে?”
আমি বললুম, “মেনি।”
বাবা জিজ্ঞেস করল, “তোর পিঠে ওটা কী?”
আমি বললুম, “সোনা।”
আমি বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলুম। আর কিছু বলতে পারলুম না। ট্যাঁকের পনেরোটা টাকা বাবার হাতে গুঁজে দিয়ে বললুম, “বাদাম বেচার টাকা।” বাবা বাদাম বেচার টাকাটা মায়ের আঁচলে বেঁধে দিয়ে, বস্তা খুলে সোনা ওজন করতে বসল।
আমার যা খিদে পেয়েছিল, কী বলব! খুব করে খেলুম, মেনিকে খাওয়ালুম। তারপর দুটিতে শুতে গেলুম।
কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলুম জানি না।
মাঝ রাতে হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেল। দেখলুম, আমার পাশে মেনি ঘুমোচ্ছে। কানে এল, বাবা তখনও সোনা ওজন করছে। আর আমার মা বাবার মাথায় হাওয়া করছে।
আমি বেড়ালকে জড়িয়ে আবার ঘুমিয়ে পড়লুম।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন