ছোট্ট পাখি টুনটুন

শৈলেন ঘোষ

ছোট্ট পাখি টুনটুন। ছোট্ট বলে ছোট্ট, এত্তোটুকু। ক’দিন হল চোখ ফুটেছে। ছোট্ট দুটি ডানায় পালক ধরেছে। ক’দিন হল মায়ের ঠোঁটে ঠোঁট ঠেকিয়ে খেতে শিখেছে। মস্ত একটা জামরুলগাছ। সেই গাছে টুনটুনের মা বাসা বেঁধেছে। গাছের পাতা সবুজ। সবুজ পাতার আড়ালে চুপটি করে বসে থাকত টুনটুন। পিটপিট করে দেখত, এদিকটা, ওদিকটা। নয়তো সামনেটা, পেছনটা। যখন খুব জোরে বাতাস বইত তখন দোল খেত টুনটুন পাতায় পাতায়। নাচত ডালে ডালে। খেলা করত একা একা। বাসা ছেড়ে বাইরে যাবার জো ছিল না। মা বারণ করেছে। মা বলেছে, “বাইরে যেয়ো না টুনটুন। তুমি এখন ছোট্ট। বড় হও, তারপর যাবে।”

মন মানে না টুনটুনের। একা একা ঘরে বসে থাকতে ভাল লাগে তার? আর কতদিন বসে বসে সে দেখবে ওই দূরের আকাশটা? দেখবে, আকাশে আলোর ঝিলমিল? ওই আকাশের আলোয় কত পাখি উড়ছে, ঘুরছে। কোনওটা তার মতো। আবার কোনওটা তার চেয়ে বড়। যতই দেখে ততই তার মনটা কেমন কেমন করে ওঠে। ভাবে, আহা রে, সে-ও যদি ওদের কাছে যেতে পারে। ওদের মতো উড়তে পারে, ঘুরতে পারে। খেলতে পারে, নাচতে পারে। দুর ছাই, কেন যে মা বারণ করে!

টুনটুন একদিন সত্যি-সত্যি মায়ের বারণ শুনল না। হয়েছে কী, সেদিন সকালবেলা মা যেই খাবার খুঁজতে বেরোল, আর অমনি টুনটুন ফুড়ুত করে বেরিয়ে পড়ল বাইরে। খানিকটা উড়ল, খানিকটা বসল, খানিকটা নাচল। তারপর দেখতে পেল একটা মস্তবড় ঝিল। জল ঝিলমিল। জলের ওপর ওরা কারা ভাসছে? একটা দুটো, পাঁচটা, ছ’টা? দেখে খুব ভাল লাগছে টুনটুনের। বা রে বা, ওইরকম সে-ও যদি জলের ওপর ভাসতে পারত। তা হলে বেশ মজা হত। ওদের সঙ্গে ভাব করতে ইচ্ছে হল টুনটুনের। তাই ডাকল, “ও ভাই, ও ভাই, তোমরা কারা?”

“আমরা হাঁস।” বলে পাঁচটা, না ছ’টা হাঁস একসঙ্গে ডেকে উঠল, “প্যাঁক-প্যাঁক।”

ওমা, কেমন মজার ডাক প্যাঁক-প্যাঁক! ফিক করে হেসে ফেলল টুনটুন। বলল, “তোমাদের নাম শুনে আমার হাসি পাচ্ছে। হাঁস আবার কী?”

সেই পাঁচটা, না ছ’টা হাঁসের মধ্যে একটা হাঁস রেগে গেল। প্যাঁক-প্যাঁক করে ডাক দিয়ে সে বলে উঠল, “তোমার হাসির ছিরি দেখে আমাদেরও বিচ্ছিরি লাগছে।”

টুনটুন তখন গম্ভীর হয়ে উত্তর দিল, “তোমরাও হাসো না! দেখি কেমন সুচ্ছিরি লাগে! আমি উড়তে পারি। তোমরা পারো?”

একটা ছোট্টমতো হাঁস ঘাড় হেলিয়ে, মাথা দুলিয়ে বললে, “আমরা জলে জলে ভাসতে পারি। জলের ওপর নাচতে পারি।”

টুনটুন বলল, “ও আর এমন কী শক্ত, আমিও পারি।”

“ঘেঁচু পারো। জলের তলায় তলিয়ে যাবে।” বলে সেই পাঁচটা, না ছ’টা হাঁস মুখ ফিরিয়ে চলে গেল। গ্রাহ্যই করল না টুনটুনকে। আর টুনটুন ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল সেইদিকে।

হঠাৎ চমকে ওঠে কেন টুনটুন! কী যেন একটা ধপাস করে লাফিয়ে পড়ল টুনটুনের সামনে। লাফিয়ে পড়েই ডাক ছাড়ল, ঘ্যাঙ-ঘ্যাঙ! এ মা, একটা ব্যাঙ!

ঠিক কথা, আচমকা অমন করে হঠাৎ যদি কেউ তোমার সামনে লাফিয়ে পড়ে, প্রথমটা কে না চমকে ওঠে! কিন্তু তার পরেই ব্যাঙের মুখখানা দেখে টুনটুনের এমন হাসি পেয়ে গেল। হেসে কুটিকুটি। হাসতে হাসতে জিজ্ঞেস করল, “তুমি আবার কে? এ বাবা, কী গাবদা-গাবুস দেখতে তোমাকে।”

ব্যাস! আর দেখতে হয়! ব্যাঙ তো রেগে কাঁই। কী, একটা পুঁচকে পাখি তাকে গাবদা-গাবুস বলে! যত বড় মুখ নয় তত বড় কথা! ব্যাঙটা ঘ্যাঙ-ঘ্যাঙ করে চেঁচিয়ে উঠল, “তুই কে রে বিচ্চু পাখি, আমাকে গাবদা-গাবুস বসিল? তোর আস্পদ্দা তো কম নয়!”

টুনটুন ব্যাঙের রাগ রাগ মূর্তি দেখে আরও জোরে হেসে বলে ফেলল, “উরি বাবা, রেগে গেলে তোমার গালদুটো কী ফুলে যায়! ঠিক গাল ফোলা গোবিন্দের মতো।”

আর দেখতে! পুঁচকে পাখির মুখে এইকথা যেই শোনা, ব্যাঙ দিল এক লাফ! একেবারে টিপ করে টুনটুনের ঘাড়ে। টুনটুন আর একটু হলেই চিঁড়েচেপ্টা হয়ে গেছল। চোখের পলকে ফুড়ুত! সুড়ুত করে গাছের ডালে উঠে পড়ল। উঠবি তো ওঠ একটা কাঠবিড়ালির ল্যাজের ওপর। আর দেখতে! ল্যাজে সুড়সুড়ি লেগে গেছে কাঠবিড়ালির। সঙ্গে সঙ্গে ল্যাজ তুলে সাঁই-ই-ই! এক ঝাপটা। টুনটুনি একেবারে ছিটকে-মিটকে টপাস করে গিয়ে পড়ল ওপর ডালে। ওপর ডালে শালিকের বাসা। পড়বি তো পড় বাসার ভেতর। না-জানা, না-চেনা পাখির ছানা দেখে যেই না পাখির মা টুনটুনকে ঠুকরে দিতে গেছে, টুনটুন উড়ুত, সোজা মগডালে। মগডালেতে কাগের বাসা। না-জানা, না-চেনা পাখির ছানা দেখে তার নোলা দিয়ে জল গড়াল। পেটপুজো করবে বলে টুনটুনকে মারল ছোঁ। টুনটুনও পড়িমড়ি করে উড়ল ডানা ছড়িয়ে আকাশে। কাগ ফসকে গেছে। ফসকে গেলে কী হবে! কাগও মারল তাড়া তার পিছনে।

পাখি উড়ল ডানদিকে।

কাগ উড়ল বাঁদিকে।

পাখির ছানা ভড়কি মারে।

কাগের ধাড়ি চরকি মারে।

কিন্তু টুনটুন তো ছোট্ট। ও আর কতক্ষণ পারবে। প্রাণ বুঝি তার বেরিয়ে যায়। এই সর্বনাশ, জামরুম গাছের বাসাটাও তো সে আর চিনতে পারছে না! কী হবে?

তাড়া খেয়ে উড়তে উড়তে কেঁদে ফেলল টুনটুন। এখন আর কাঁদলে কী হবে। যেমন মায়ের কথা না-শোনা।

না, খুব বেঁচে গেছে টুনটুন। ওই তো টুনটুনের মা, ওই তো উড়ে আসছে টুনটুনের দিকে। মা-ও যে টুনটুনকে খুঁজছিল কখন থেকে। ছেলে ঘরে নেই, মা কি নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারে! হঠাৎ ছেলেকে দেখতে পেয়েছে মা। দেখতে পেল, একটা কাগ তাড়া করেছে টুনটুনকে। এই ধরল! এই বুঝি গালে পুরল! তাই না দেখে টুনটুনের মা ছেলেকে মারল ছোঁ। আলতো করে নিজের ঠোঁটে টুনটুনকে চেপে ধরে একেবারে তিরবেগে হাওয়া।

কাগ তো হাঁ। ফ্যালফেলিয়ে দেখতে দেখতে নিজের বাসার ফিরে গেল।

আর, টুনটুনের মা-ও ঢুকে পড়ল নিজের বাসায়। ছেলে তখন ভয়ে কাঁপছে। মা-ও হাঁফাচ্ছে। মা তাড়াতাড়ি ছেলেকে পালকের কোলে জড়িয়ে ধরল। পালকের কোলে আঃ, কী আরাম!

এখন যেন একটু কাঁপুনি থেমেছে টুনটুনের। ভাবছে, ভাগ্যিস মা ছিল। বটেই তো, মায়ের কথা শুনলে এমন বিপদ কি হত? মায়ের পালক-ঢাকা বুকের নীচে বসে বসে এখন টুনটুনের মনে হচ্ছে, আঃ, মায়ের কোল কী মিষ্টি। না, আর-কোনওদিন মায়ের কথা না-শুনে কোথাও যাবে না টুনটুন। কক্ষনও না।

সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%