শৈলেন ঘোষ

ছেলেটির নাম বোবো। আশ্চর্য তার নামের বহর! বোবো বয়সে কিশোর। আর তার আদরের বোনের নাম সুহানা। বোবো যদি এখনই পনেরোয় পা দিয়ে থাকে, তবে সুহানা এখনও দশে। কথা ছিল না, এখনই দুই ভাইবোন হাতে তুলে নেবে হাতুড়ি। সকাল হলেই বস্তা কাঁধে, হাতুড়ি হাতে তাদের উঠতে হবে পাহাড়ে। ভাঙতে হবে পাথর। কাঁধের ওই বস্তাটা পাথরের ডুমোয় ভর্তি হলে তবেই ছুটি।
হ্যাঁ, এমনই করে পাথর ভেঙে পয়সা উপায় করতে হয় দুই ভাইবোনকে।
না, কথা ছিল না এমন। কথা ছিল, বোবা তখন যেমন ইস্কুলে পড়ছিল, তেমনই পড়বে। আর তো বছরখানেক বাকি। সে মাধ্যমিক দেবে। অবশ্য সুহানাও পড়ছিল ইস্কুলে। তবে সে সবে ক্লাস ফোরে উঠেছিল। মাধ্যমিকে দেরি তার তখনও ছ’বছর। সুহানা স্বপ্ন দেখত, সে অনেক লেখাপড়া শিখবে। সে টিচার হবে।
আর বোবো? সে কী হবে?
খুব সকালে উঠে অনেকখানি যেতে হত তাদের। ওই যে পাহাড়টা এখান থেকে দেখা যায়, ওই পাহাড়ে। সারাদিনের খাবার বেঁধে নিত পুঁটলিতে। মা ভোরবেলা উঠে রান্না করে দিতেন। ভাইবোন হাঁটা দিত। ফিরে আসত সাঁঝের বেলা। মালিকের কাছে ভাঙা ডুমোপাথরের বস্তাটা পৌঁছে দিয়ে, খাটুনির পাওনা টাকা বুঝে নিয়ে নিশ্চিন্তে ফিরে আসত। সে টাকা আর ক’টাই বা। চারটে প্রাণীর দিন চলে না।
অবিশ্যি ওদের বাবা যখন সুস্থ-সমর্থ ছিলেন, তখন তিনি সারাদিনে পাথর ভাঙতেন তিন বস্তা। যা পেতেন, তাতে খেয়ে-পরে যা থাকত, দুটো ছেলেমেয়ের ইস্কুলের খরচ পুষিয়ে যেত।
কিন্তু এখন সব ওলটপালট হয়ে গেছে। তবে, ওলটপালট হয়ে যাবার কথা ছিল না। বোবো-সুহানার বাবা সেদিন খুব ভোরে উঠেছিলেন। রাতে খুব বৃষ্টি হয়েছে। গভীর রাতে বৃষ্টি হলে, তিনি খুব ভোরেই উঠে পড়েন। বৃষ্টিভেজা ভোরের ঝরঝরে পরিষ্কার আকাশ দেখতে ভারী ভালবাসেন তিনি। যদি দু’এক টুকরো মেঘ তখনও ঘোরাফেরা করে আকাশে, আর সেই মেঘের আড়াল থেকে যদি লাল টকটকে সূর্য প্রথম উঁকি দেয়, তখন কী চমৎকার না দেখতে লাগে সেই দৃশ্য! তিনি চোখ ফেরাতে পারেন না। মনে মনে ভাবেন, আহা রে, এমন দৃশ্য আরও যদি থাকে কিছুক্ষণ! তা হলে ছেলেমেয়ে দুটোকে ঘুম ভাঙিয়ে দেখাই! না, এখন তিনি ঘুম ভাঙাবেন না তাদের। আর একটু ঘুমোক তারা। কত রাত অবধি লেখাপড়া করে। উঠলেই তো আবার শুরু। পড়ো, ইস্কুলে চলো। ফিরে এসে একটু জিরোও। আবার...। বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়ে বাচ্চাদুটো।
কিন্তু, তিনি অবিশ্যি তিন বস্তা পাথর ভাঙতে ক্লান্ত হন না একটুও। দারুণ পুরুষ্টু দশাসই চেহারা মানুষটার। ওই তিনটে পাথরভর্তি বস্তা একটা একটা করে নামিয়ে আনেন, পাহাড়ের চুড়োয় তিনবার ওঠানামা করে। বটেই তো! এমনই করে না খাটলে সংসারটা চলবে কেমন করে? সে তো আর নিজে নিজে গড়িয়ে চলে না! তার ওপর মানুষ করতে হবে ছেলেমেয়েকে। ওই ছেলেমেয়েই তো তাঁর স্বপ্নের ঝলমলে আলো।
হ্যাঁ, অন্যদিনের মতো সেদিনও তিনি বৃষ্টিভেজা আকাশ দেখতে খুব ভোরেই উঠেছিলেন। কিন্তু তিনি আকাশ দেখলেন বটে, সূর্য-ওঠা দেখা হয়নি। কেন না, আকাশ তখনও ঢাকা মেঘে। সেই মেঘ মাথায় নিয়েই তাঁকে পাহাড়ে উঠতে হয়েছিল। হাতের হাতুড়ির ঘা পাথরে না পড়লে তো এমনি এমনি মালিক পয়সা দেবে না। কে না জানে, একজন মস্ত ব্যাপারি ওই মালিক। অনেক পয়সা তার। এই পাহাড়ের অনেকটা জায়গা ইজারা নিয়ে, মালিক ব্যবসা করে টুকরো পাথরের। বোবো-সুহানার বাবা সেই মালিকেরই হেঁজিপেঁজি এক কাজের লোক। সে-কাজ শুধু পাথর ভাঙো সারাদিন ধরে। দিনের শেষে পয়সা নাও, ঘরে ফেরো!
কিন্তু সেদিন?
সেদিনই তো ঘটেছিল সেই ভয়ংকর বুক-থরথর ঘটনাটা। সেই রাতভর বৃষ্টি যে এমন একটা নৃশংস কাণ্ড করবে, এমন করে পাহাড় ধসিয়ে সে যে মানুষটাকে চিরকালের জন্যে পঙ্গু করে দেবে, সে আর কে জানত।
কিছুই না, সেই স্যাতসেঁতে মেঘলা দিনে মানুষটা নিজের মনে পাথরই ভাঙছিলেন পাহাড়ের চুড়োয়। এমন সময়ে কোথাও কিছু নেই, আচমকা খানিকটা চুড়ো ধসে গেল পাহাড়ের গা থেকে। সেই ধসের সঙ্গে ধামসাধামসি করতে করতে গড়িয়ে পড়লেন মানুষটা অনেকটা নীচে। পাথরের আঘাতে জ্ঞান হারালেন। কী ভয়ানক কথা!
না, তাঁর প্রাণ গেল না। কিন্তু চিরদিনের মতো তিনি অকেজো হয়ে গেলেন। ঘরের বাইরের যে-আলো, সে-আলো আর দেখার উপায় নেই। বৃষ্টিভেজা ভোরের আকাশ তার হারিয়ে গেছে। ছেলেমেয়েকে নিয়ে তাঁর স্বপ্ন দেখার ঝলমলে আলো সে-ও সেদিনেই নিভে গেছে। এখন তাঁর আশ্রয় বিছানা। সহায় তার ছেলেমেয়ের মা। আর ওই দুটো ছোট্ট ছেলেমেয়ে। বাবার মতো তারা এখন রোজ যায় পাথর ভাঙতে পাহাড়ের ওপরে। মা চোখের জলে ভাসতে ভাসতে ভাবেন, কেন হয় এমন! কেন? কেন?
উত্তর নেই।
এমনই সময় একদিন পাথর ভাঙতে ভাঙতে বড্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল ওই ছোট্ট মেয়েটা, সুহানা। থাকতে পারেনি। শুয়ে পড়েছিল পাহাড়ের গায়ে। দাদা কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সে বলে উঠেছিল, “জানিস দাদা, যখনই আমার চোখ চলে যায় ওই আকাশের দিকে, তখন কেমন যেন গায়ে কাঁটা দেয়। আমার ইস্কুলের দিদি একদিন বলেছিলেন, আমরা আমাদের অজান্তে ভাসছি আকাশে। কেন না, আমাদের এই পৃথিবীটাই যে আকাশে ভেসে বেড়াচ্ছে। ওই যেমন ভাসছে চাদ, কিংবা অসংখ্য তারা। আমার ইচ্ছে ছিল, বড় হলে আমি আকাশের বন্ধু হয়ে তার হাটহদ্দ সব জানব। সবাইকে জানাব। আমি ইস্কুলের দিদির মতো টিচার হব। সে আর হল না।”
বোবা কান পেতে বোনের কথাগুলো শুনল। চুপ করে রইল। আপন মনে পাথরই ভাঙতে লাগল। পাথরের ওপর হাতুড়ির শব্দটা নির্জন পাহাড়ের এই চুড়োয় যেন সুহানার কথাগুলো ভাসিয়ে নিয়ে হারিয়ে যায় হাওয়ায়।
আবার হঠাৎই সুহানা কথা কয়ে ওঠে, “দাদা, তোর আকাশ দেখতে ভাল লাগে?”
এবার বোবো হাতুড়ির শব্দ থামাল। পলক তাকাল বোনের মুখের দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তোর খুব কষ্ট হয়, না রে? আমি দেখেছি, আকাশের দিকে মুখ তুললেই তুই যেন কেমন হয়ে যাস। ক্লান্ত হয়ে শুয়ে পড়িস! সত্যিই তো, এখন কি আমাদের পাথর ভাঙার কথা! কিন্তু কী করব বল, ওই আকাশের মেঘ-বৃষ্টিই যে আমাদের সব স্বপ্ন কেড়ে নিয়েছে! তাই বলে কি আমরা আকাশকে দোষ দেব? নাকি দোষ দেব মেঘ-বৃষ্টিকেও। তোর মতো আমিও আকাশকে ভালবাসি। ভালবাসি মেঘ-বৃষ্টিকেও। বল, বাবাও কত ভালবাসেন মেঘ-বৃষ্টি-আকাশকে।”
সুহানা এবার উঠে বসল। দাদার সঙ্গে আবার হাতুড়ির শব্দ তুলল পাথরে। বস্তাভর্তি হতে এখনও অনেক দেরি। বস্তা ভরার মতো অর্ধেক পাথর ভাঙা হয়েছে কি না তাই দ্যাখো! অথচ বেলা থাকতে থাকতেই নামতে হবে। সুতরাং যত জোরে পারো হাত চালাও!
এমন সময় সুহানা যেন ওই পাথরের ওপর হাতুড়ির ঘা মারে একটু দ্রুত। গায়ের জোরে। শব্দ ওঠে এলোমেলো। কিন্তু গলার শব্দ তার ভারী গোছাল। হাতুড়ির শব্দকে ছাপিয়ে সে বলে উঠল, “জানিস দাদা, একদিন ইস্কুলের দিদি বলছিলেন, মানুষ স্বপ্ন না-দেখলে পৃথিবীটা এমন করে গড়ে উঠত না।’ আমি সেদিন এইটুকু শুনেছিলুম তাঁর মুখে। আর কিছু নয়। সেদিন থেকে আমি ভাবি, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আমরা রোজই তো স্বপ্ন দেখি। তবে দিদির বলা স্বপ্ন কি অন্য!”
বোবো হাতুড়ি থামিয়ে হেসে ফেলল বোনের কথা শুনে। তারপর হাসতে হাসতেই বলল, “দুর বোকা, দিদি ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখার কথা বলবেন কেন? তিনি যে-স্বপ্নের কথা বলেছিলেন, সেই স্বপ্নের জোরেই মানুষ চাঁদে যায়। তাজমহল গড়ে উঠে। সেই স্বপ্নের জোরেই আদিম মানুষ পাহাড়ের গুহা ছেড়ে অট্টালিকায় বাস করে। অজন্তা, ইলোরার পাহাড়ের গহ্বরে আঁকা যে-ছবির গল্প শুনি আমরা, সে তো মানুষের স্বপ্ন দেখার জন্যই রঙে রেখায় ফুটে উঠেছিল।”
সুহানা একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, “জানিস দাদা, আমার খুব ছবি আঁকতে ইচ্ছে করে।”
সুহানার কথা শুনে থমকে গেল বোবো। নিমেষে চোখ ফেরাল বোনের দিকে। কিছু বলতে পারল না। মনে মনে ভাবল, আহা রে, সুহানার ওই নরম হাতে তুলির বদলে কেন উঠল হাতুড়ি! ভাবতে গিয়ে মন আনমনা হয়ে যায়! আর ঠিক তখনই সুহানা জিজ্ঞেস করে বসল, “তোর কী ইচ্ছে করে দাদা?”
বোবো উত্তর দিল, “তোর ইস্কুলের দিদি যেমন বলেন, তেমন আমারও ইচ্ছে করে স্বপ্ন দেখতে। জানতে ইচ্ছে করে মানুষ যখন ছিল একেবারেই অসভ্য আদিম, তখন কেমন করে এল তাদের মাথায় ছবি আঁকার ভাবনাটা। কেমন করে তারা কথা বলতে শিখল! কোন শব্দটি প্রথম তাদের মুখে কথা হয়ে বেরিয়ে এসেছিল? পৃথিবীজোড়া মানুষের মুখের ভাষা একটা না-হয়ে কেন হল এত অসংখ্য ভাষা? কে তাদের ডেকে আনল গুহা থেকে? শেখাল ঘর তৈরি করতে? বলল, গুহা নয়, এসো ঘরে বাস করি!”
দাদার কথা শুনতে শুনতে বিমনা সুহানার হাতের হাতুড়ি কখন যেন আপনা-আপনি অনড় হয়ে থেমে যায়! অবাক চোখ অপলকে দাদার মুখের দিকে চেয়ে থাকে। দৃষ্টি তার দাদার জন্যে যেন মমতায় ছলছল করতে থাকে। অসহায় দুটি খুদে মানুষকে সেই মুহূর্তে কেউ যদি আড়াল থেকে দেখে ফেলত, তখন সে নিশ্চয়ই ভাবত, হাতুড়ি নামের ওই লোহার অস্ত্রকে কখনই বলা যাবে না, ওটার দরকার নেই। বলা যাবে শুধু, যারা এমন স্বপ্ন দেখে তাদের নরম হাতে ওটা তুলে দেবার দরকার পড়ে কেন?
ঠিক এই মুহূর্তে আচম্বিতে সুহানার মুখ দিয়ে বেরিয়ে এল, “দাদা, তোকে দেখে আমার কষ্ট হচ্ছে।”
“আমারও যে কষ্ট হচ্ছে তোর কষ্ট দেখে সুহানা!”
সুহানা এবার ভারী সহজ সুরে বলে উঠল, “ওসব কথা ভেবে এখন আর কোনও লাভ নেই, না রে?”
“ভাবলে শুধু সময় নষ্ট হবে। কাজ শেষ করতে পারব না। সন্ধে হয়ে যাবে। মা বাবা ভাববেন। তার চে বরং বস্তাটা তাড়াতাড়ি ভরে ফেলি। ভাঙ পাথর।”
সুহানা আবার দাদার সঙ্গে হাতুড়ি ঠুকতে শুরু করে দিল। ঠুকতে ঠুকতে বলে উঠল, “আজ যেন পাথর ভাঙতে মন সায় দিচ্ছে না। বারে বারে এমন অন্যমনা হয়ে পড়ছি। মনে হচ্ছে দিন থাকতে থাকতে কাজ শেষ করতে পারব না।”

বোবোর গলায় উদ্বেগ। বলল, “সে কী বলছিস! বস্তাভর্তি না-হলে মালিক যে টাকা দেবে না!” বলতে বলতে আকাশের দিকে তাকাল। দেখল, সূর্য এখন আকাশের কোনখানে পৌঁছেছে। দেখে আশ্বাস দিল, “না রে, মনে হচ্ছে হাত চালালে হয়ে যাবে।”
তারপর অনেকক্ষণ দু’জনের মুখে কোনও শব্দ শোনা গেল না! শব্দ শুধু পাথরের ওপর হাতুড়ির।
হঠাৎই আবার বোবোই মুখ খুলল, “এখন তো এটা একুশ শতক। খ্রিস্টের জন্মের পর থেকে দু’হাজার বছর পেরিয়ে গেছে। পৃথিবীর বয়সও কোটি কোটি বছর। এই তো মাত্র কয়েক হাজার বছর আগের সভ্যতার চিহ্নগুলো মাটি খুঁড়তে গিয়ে হঠাৎ হঠাৎ বেরিয়ে পড়ছে মাটির ভেতর থেকে। ইতিহাসের পাতায় আমরা সেইসব সভ্যতার গল্প পড়ি। আর বলি, হাজার হাজার বছর আগের রেশ ধরে মানুষ এখন আরও অনেক সভ্য হয়েছে। বিজ্ঞান আমাদের সভ্যতার সবচেয়ে বড় বন্ধু! কিন্তু—” বলতে বলতে থামল বোবো।
সুহানারও হাতুড়ি থামল। জিজ্ঞেস করল, “থামলি কেন?”
“ভাবছি।”
“কী ভাবছিস?”
“ভাবছি, সভ্যই যদি হয়ে থাকি, তবে এত দেমাক কেন আমাদের মনে বাসা বাঁধে? তবে কি সভ্যতা আমাদের অন্যকে হিংসা করতে শিখিয়েছে! শিখিয়েছে লোভ আর অন্যের সম্পদ ছিনিয়ে নিতে। ভালবাসতে শেখায়নি?”
সুহানা অবাক হয়ে দাদার মুখের দিকে তাকাল, তারপর উত্তর দিল, “তোর কথার মাথামুন্ডু আমি কিছুই বুঝতে পারছি না।”
বোবো বলল, “না, এসব কথা এখন তোর বোঝার কথা নয়। তুই এখন সবে ক্লাস ফোরে পড়ছিস। আমাদের ক্লাসের ইতিহাসের স্যার একদিন পৃথিবীর সভ্যতার গল্প বলতে বলতে এসব কথা বলছিলেন। সেদিন আমিও প্রথমটা বুঝতে পারিনি। তারপর তিনি যখন ইরাকের গল্প বললেন, তখন বুঝতে আমার কষ্ট হল না। সেদিন আমি বুঝেছি কার নাম দেমাক! কার নাম হিংস্রতা! অন্যের শক্তির দাপট কাকে বলে! চোখের সামনে বিজ্ঞানের সাহায্যে তৈরি অস্ত্র দিয়ে কেমন করে ধ্বংস করে দিল একটা দেশের দেমাকি নেতারা অন্য আর-এক দেশকে! মারা পড়ল কত অসহায় মানুষ। শেষ করে দিল সভ্যতার কত নিদর্শন। জানিস তো, যখন ইরাকের নাম ইরাক হয়নি, তখন নাম ছিল তার মেসোপোটেমিয়া। স্যার বলেন, তখন সুমের নামে এক সভ্য জাতি সেখানে রাজত্ব করত। আমরা এই যে লিখতে পারছি, সে তো তাদেরই জন্যে। তারাই নাকি প্রথম মানুষকে হদিস দেয়, কেমন করে লিখতে হয়। তারাই নাকি সভ্যতার সন্ধান দেয় প্রথম।”
সুহানা দাদার কথা শুনতে শুনতে বলে উঠল, “আমাদের কী বরাত বল! পৃথিবীর বুকে যে আরও কত কী ঘটে গেছে, আমাদের কিছুই জানা হল না।”
বোবো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তারপর বলল, “আরও কত কী ঘটছে তা-ও জানা হল না।”
“আমি যদি অনেক লেখাপড়া শিখতুম, ইস্কুলের দিদির মতো আমিও তো হতে পারতুম!” বলতে বলতে নিমেষ থামল সুহানা। তারপর দাদাকে আচমকা জিজ্ঞেস করল, “তোর কী হতে ইচ্ছে করে রে দাদা, বললি না তো?”
বোবো হাসল। পলকে হাসিটা মিলিয়ে গেল মুখে। তারপর সে শুকনো মুখে বলল, “এখন আর অন্য কিছু ইচ্ছে করে না। এখন শুধু ইচ্ছে করে এই হাতুড়ি নিয়ে পাথরের মাথা ভাঙতে। ইচ্ছে করে, অনেক পয়সা উপায় করে তোকে অনেক লেখাপড়া শেখাতে। তুই টিচার হবি। তোর স্বপ্ন যেন সত্যি হয়।”
“না!” হঠাৎ যেন চিৎকার করে উঠল সুহানা।
চমকে উঠল বোবো। চকিতে তাকাল তার বোনের মুখের দিকে। সে-মুখ যেন রাগে ঝলসে লাল হয়ে গেছে! বোনের মুখের ওপর থেকে চোখ সরাতে পারল না। কিছু বলতেও পারল না। অবাক হয়ে শুধু তাকিয়ে রইল। কিন্তু কথা বলল সুহানাই, “পাথর ভাঙব আমি। দাদা, তোকে শিখতে হবে অনেক লেখাপড়া। তুই অনেক বড় হবি। আমাদের দেশে কত বড় বড় মানুষ জন্মেছেন। আমাদের মতো গরিব মানুষের জন্যে তারা কত কাজ করে গেছেন। তোকে তাঁদের একজন হতে হবে। পারবি না?”
না, এ কথার কোনও উত্তর দিল না বোবো। শুধু বলল, “আয়, ভাঙা পাথরে বস্তাটা ভরে ফেলি এবার! দেরি হয়ে গেছে।”
হ্যাঁ, দুটিতে মিলে এবার বস্তা ভরতে লাগল পাথরে। এবার দু’জন মিলে ধরাধরি করে পাথরের বস্তা নিয়ে নামবে উপর থেকে নীচে। পৌঁছে দেবে মালিকের ডেরায়। তারপরে মজুরি মিলবে। কী জানি আজ কত মেলে! কেন না, আজ পাথর ভাঙা হয়েছে কম, গল্প হয়েছে বেশি। বেশ খানিকটা খালি আছে বস্তা। বকুনি খেতে না-হয়! তবু বস্তা ধরে ঘষটে ঘষটে তারা নামতে থাকল নীচে। রোজই এমনই করে নামতে হয়। বেশ খানিকটা নেমেও গেছে। কম ভারী নয় তো! ঠিক এই সময়ে আচম্বিতে এক কাণ্ড ঘটে গেল! বস্তাটা কেমন যেন বেটক্কা গেল ওদের হাত ফসকে। পড়ে যায়। ধরতে ধরতেও ধরা গেল না। তার ওপর বস্তার মুখ খোলা। পাথরের কুচিগুলো ছত্রখান হয়ে ছড়িয়ে পড়ল চারদিকে। একেবারে সেই জঙ্গল হয়ে আছে যেখানে, সেখানেও। যাঃ! কী হবে!
দু’জনের মুখ চুন। সত্যিই তো, কী হবে এবার? ভয়ে বুক দুরুদুরু! সুহানা শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করল, “কী করবি এবার?”
বোবো ভয়টাকে সামলে বলল, “আয়, দেখি যতটা পারি আবার পাথরের ডুমোগুলো তোলবার চেষ্টা করি।”
“বস্তাটা কই?” জিজ্ঞেস করল সুহানা।
বোবো এদিক ওদিক দেখে বলল, “দেখতে পাছি না তো! মনে হচ্ছে, ওই জঙ্গলটার মধ্যে গিয়ে পড়েছে। তুই এখানে দাঁড়া। আমি নীচে নেমে দেখি।”
সুহানা বাধা দিয়ে বলল, “না দাদা, তুই একা যাস না। আমিও যাব।”
বোবো উত্তর দিল, “তুই পারবি না। পা হড়কে পড়ে যাবি।”
সুহানা শুনল না। অগত্যা দু’জনেই বেপথে পাথর টপকে নীচে ওই জঙ্গল লক্ষ করে নামতে লাগল এ ওকে ধরে। বলতে নেই, মাঝে মাঝে দু’জনের পা হড়কে যাচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু তেমন কিছু বিপদ হল না। কিন্তু মুশকিল হল অন্য, তন্ন তন্ন করে খুঁজেও সেই বস্তাটার হদিস তারা পেল না। এ তো দেখি আচ্ছা ফ্যাসাদ!
বস্তাটার হদিস না পেলেও, সুহানা হঠাৎ অমন চমকে উঠল কেন? কী যেন সে দেখতে পেল! সে চেঁচিয়ে উঠল, “ওটা কী রে দাদা?”
“কই?”
“ওই যে।” আঙুল তুলে দেখাল সুহানা।
বোবো দেখতে পেয়েছে। জঙ্গলঘেরা মস্ত একটা পাথরের খাঁজে একটা ঘোড়া। পুতুল। বোবো বলল, “সুহানা, তুই এখানে দাঁড়া। আমি দেখি।” বলে, বোবো এবড়ো-খেবড়ো জঙ্গল আর উঁচু নিচু পাথর টপকে পৌঁছে গেল সেই পুতুল-ঘোড়াটার সামনে। হাত দিয়ে তুলতেই দেখে সেটা মাটি নয়, কাঠ নয়, ভারী কিছু ধাতুর তৈরি। কিন্তু তার চেয়েও আশ্চর্য, উলটে পড়ে থাকা ঘোড়াটার ঠিক নীচেই পাথরের খাঁজে আটকে আছে একটা বাকসো। মনে হল, অনেককাল পড়ে পড়ে বাকসের আসল রংটাই চটে গেছে। বোবো হাত দিয়ে টানল বাকসোটা। না, সহজে বার করা গেল না। আরও দু’চার বার টানামানি করল। তবু কিছু হল না। দূর থেকে স্থির চোখে দেখছিল সুহানা। দাদা পারছে না দেখে চেঁচিয়ে উঠল, “আমি যাব?”
অদ্ভুত ব্যাপার। সুহানার গলার স্বর শুনেই যেন অনড় বাকসোটা বোবোর হাতের টানে নড়ে উঠল। তারপর আর-এক টানেই ঝপ করে উপড়ে বেরিয়ে এল। সঙ্গে সঙ্গে টানের ধাক্কায় খুলেও গেল বাকসের পলকা ঢাকনাটা। ভেতরটা দেখে থতমত খেয়ে গেল বোবো। তার চোখ সরে না। কেন না, বাকসে ভর্তি মুদ্রা। সোনালি, নাকি খাঁটি সোনার, চিনতে পারে না বোবো। বাকসের ঢাকনাটা চটপট বন্ধ করে, বাকসের সঙ্গে সেই ঘোড়াটা হাতে নিয়ে সে যেমন কষ্ট করে জঙ্গলে নেমেছিল, তেমনিই কষ্ট করে উঠে এল।
সুহানা এতক্ষণ যেন দমবন্ধ করে সব দেখছিল। দাদা উঠে আসতেই আস্তব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কী রে দাদা?”
বোবো উত্তর দিল, “কী জানি। মনে হয়, অনেক পুরনো দিনের কোনও মুদ্রা আর এই ঘোড়াটাও কোনও দামি ধাতুর তৈরি। বলা যায় না, এই পাহাড়ের গায়ে হয়তো এককালে কোনও রাজার ধনভাণ্ডার ছিল। চল, এখানে আর আমাদের দাঁড়ানো ঠিক হবে না।”
সুহানা বলল, “পাথরের টুকরোগুলো যে পড়ে রইল?”
“থাক! তুই আয় আমার সঙ্গে।”
“কোথায় যাবি? মালিকের কাছে?” জিজ্ঞেস করল সুহানা।
দাদা বলল, “না, থানায়।”
হ্যাঁ, বোবো আর সুহানা সেদিন আর যায়নি মালিকের কাছে। গেছিল তারা থানায়। জমা দিয়েছিল সেই বাকসোভরতি মুদ্রা আর ঘোড়াটা। দেখা গেল সেই মুদ্রাগুলি সোনালি নয়, খাঁটি সোনার, আর ঘোড়াটা তামার।
তারপর?
তারপর সে এক আশ্চর্য ঘটনা। একদিন শুরু হয়ে গেল সেই পাহাড় খোঁড়ার কাজ। সেই পাহাড়ের গহ্বর থেকে একদিন সত্যিই বেরিয়ে পড়েছিল এক প্রাচীন সভ্যতার নিদর্শন। কত অমূল্য ধনরত্ন আর কত সম্পদ!
কিন্তু বোবো আর সুহানার কী হল?
তারা এখন আবার ইস্কুলে পড়ছে। আর তাদের পাথর ভাঙতে পাহাড়ে উঠতে হয় না। এখন তাদের পাশে দেশের সরকার। এ পুরস্কার দুটি সৎ-ভাইবোনের জন্যে তাদের ভালবাসার উপহার।
সৎই তো! বলো, কে পারত লোভ সামলাতে এমন সোনার মুদ্রা হাতে পেলে? বলো, এমন ছেলেমেয়ের জন্যে কম গর্ব বাবা-মা’র? কম গর্ব দেশের?

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন