শৈলেন ঘোষ

আমি বন্ধু তোমাদের। নাম আমার সামন। আমি বন্দি এখন এক বনের রহস্যে। আমায় এক ঘাতক বন্দি করেছে। সে হত্যা করছিল একটি মানুষকে তার গোপন ডেরায়। আমি দেখে ফেলেছি।
সে পাকড়াও করল আমাকে। মারল না প্রাণে। আমাকে তিলে তিলে মারার জন্যে ফেলে দিয়ে গেল এই বনে।
ছায়ায় ঢাকা এ এক ঘন বন। পথের চিহ্ন নেই।
কতদিন কত তুষার পড়েছে কে জানে এই বনে। আকাশঢাকা মেঘ ভেঙে কত বার বৃষ্টি পড়েছে, তার হিসাব কেউ জানে না, আকাশ ছাড়া। হয়তো কখনও কেঁপেছে বন ভূমিকম্পে। লুটিয়ে পড়েছে হয়তো বনের গাছ সেই কাঁপনে। মরেও গেছে। আবার জন্মেছে নতুন গাছ। নতুন পাতা। সবুজ। দেবদারু নয় তো ওক। কদম নয় তো পাইন। হয়তো আরও নাম না-জানা নানান গাছ। বনের বছরগুলো কেটে গেছে এমনি করে। কেউ জানে না বনের কত বয়স, ক’হাজার।
বনের গহনে কী আছে জানা নেই। বাঘ আছে, না ভালুক আছে। হয়তো আছে, হয়তো নেই। কিন্তু আছে একটা হাহাকার। শব্দ।
থেকে থেকে কানে আসে। সেই হাহাকার যেন ভেসে বেড়ায়।
গাছের ফাঁকে ফাঁকে। পাতায় পাতায়।
এ কি তবে বাতাসের ঝাপটা! না কি শব্দ কান্নার কারও! বুঝে পাই না। খুঁজে বেড়াই আনমনে। আলতো পায়ে। এদিক ওদিক। ঝরাপাতায় পা পড়ে যায়। চমকে থামি। পায়ে পায়ে শব্দ ওঠে ঝরঝরানি। গাছের পাখি উড়ে পালায় আঁতকে ভয়ে। নির্জন বন ঠিক তখনই জেগে ওঠে হঠাৎ।
সে-জাগা তো একপলক। যেন চোখের পাতা এই খুলল, এই বুজল। নিঝুম বন আবার ঘুমোল। আবার চুপ করল। কে বলেছে চুপ করল! ওই তো সেই শোনা যাচ্ছে হাহাকার। এদিক ওদিক চারদিকেই হা-হা! হা-হা! হা-হা! খুঁজি তন্নতন্ন। দেখি না কিছুই। হার মানি। পাক খাই। ধাঁধার ঘূর্ণিপথে হারিয়ে যাই। এখানে ওখানে কত ঝোপজঙ্গল। টপকাই। ভয়ে ভয়ে হাঁটকে বেড়াই। এই বুঝি সাপ ছোবল মারে! এই বুঝি বাঘ ঝাঁপিয়ে পড়ে! কিংবা হরিণ লাফিয়ে পালায়! দেখি না কিছুই, কাউকে। শুধুই শুনি হাহাকার। সে যেন এক হেঁয়ালি!
বটেই তো হেঁয়ালি। কেননা, হঠাৎ চোখে ঝলসে ওঠে একটা বেদি। ঝোপের আড়ে। যেমন বেদি মস্ত পাথরের, তেমনই তারও পরে ছোট্ট চোরকুঠুরি। সে-ও পাথরের।
কুঠুরির ভেতর যাওয়ার পথটা যেন হাঁ-মুখ। একটা বাঘের। হাঁ-মুখের দাঁতগুলো খোঁচা খোঁচা। টুটাফাটা। একটা দুটো গোটা গোটা। হাঁ-মুখে মাথা গলিয়ে উঁকি মারি। অন্ধকার ঘুটঘুটে ভেতরটা। ধক করে ওঠে বুকের ধুকধুকি। গন্ধ সোঁদা নাকে ঢুকে যায়। ঢোকা যায় না ভেতরে। বাইরে থেকে চোরাকুঠুরির দেওয়াল ছুঁয়ে থাকি।
দেখতে দেখতে দিন চলে যায় কখন। ঠাওর পাই না। সাঁজ নামে।
তারপর ধীরে ধীরে অন্ধকারে বন ঢেকে যায়। এতক্ষণ যাও-বা ছিল কাকলি একটি দুটি পাখির, এখন তা-ও নেই।
এতক্ষণ যাও বা টুকটাক আকাশে আলো ছিল, এখন তা-ও নিভু।
শুধু জেগে আছে সেই হাহাকার! আর জেগে আছি আমি। ভয়ে, আতঙ্কে, একা। আমি জানি বন্দি আমি। আমায় মরতে হবে। পারি না, আর পারি না ঠায় দাঁড়াতে। অন্ধকারে বসে পড়ি সেই বেদির ওপর। শুয়ে পড়ি। আঃ!
না, শোয়া হল না আমার। কেননা, সেই হাহাকার থেমে গেল আচমকা। তারপরেই হাহাকারের শব্দটা ভেসে উঠল বাতাসে—কেমন যেন ছন্দ-সুরে। থতমত খেয়ে যাই। সেই সুর কি ঝোপজঙ্গলের আড়াল থেকে কানে আসছে! আমি ধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়াই। দাঁড়ানোই সার। অন্ধকারে যাব কোথায়! কাকে পাব খুঁজে!
আশ্চর্য, কোথাও যেতে হল না আমায়! সেই সুর আমার পেছনেই গেয়ে উঠেছে। একটি ছোট্ট মেয়ের গলা। আমি পিছু ফিরি চকিতে। সেই সুর থেমে গেল ঝটিতে। আমি শিউরে উঠি। পরক্ষণেই আবার শোনা যায় সেই সুরের তান। আমারই চারপাশে ভেসে বেড়ায়। আমি কি ভয় পাই? না। আমি ঘুরপাক খাই সেই বেদির ওপর। চারদিক শূন্য। কিছুই নজরে পড়ে না। অথচ সুরের দোল তো ঠিক শোনা যায়! আমি অস্থির হই। চিৎকার করে উঠি, “কে-এ-এ-এ!” মুহূর্তে সুর যায় থেমে। শোনা যায় হাসি হঠাৎ—হি-হি-হি!
আমি আবার হাঁক পাড়ি, “কে তুমি হাসছ?”
সে হাসতে হাসতেই উত্তর দিল, “হাসবই তো, এতদিন হাহাকার করেছি একা একা। এবার বন্ধু খুঁজে পেয়েছি। তুমি আমার বন্ধু! বন্ধু! বন্ধু!”
সে যেন হাঁপিয়ে উঠল আনন্দে। সে আবার বলল, “আর আমায় একা-একা কাঁদতে হবে না। এবার আমরা দু’জনে একসঙ্গে হেসে বেড়াব।”
আমি উত্তর দিলুম “এ তো ভারী আশ্চর্য কথা! যে বন্ধু বলে ডাকে, আমি দেখি না কেন তাকে?”

সে বলল, “না, দেখতে পাবে না আমায়, কোনও দিনই পাবে না। পাবে, যেদিন তোমারও দশা হবে আমার মতো।”
“মানে!” আমি অবাক হই।
সে উত্তর দিল, “মানে? আমি কাঁদলে শোনা যায়, কিন্তু দেখা যায় না চোখের জল। শোনা যায় আমি হাসলে, কিন্তু দেখা যায় না আমার হাসিমখ। আমি আদর করি পাখির গায়ে হাত ছুঁয়ে, পাখি টের পায় না। ভাবে হাওয়ার স্পর্শ। আমি ছুটে বেড়াই হরিণের পিঠে চেপে, হরিণ জানতে পারে না। ভাবে হাওয়ার দোলন। আমি সুড়সুড়ি দিই বাঘের ল্যাজে, বাঘ ল্যাজ নাড়ে না। আমি শূন্য। একদিন শূন্য হয়ে যাবে তুমিও। যেমন আমি। একদিন তুমিও কাঁদবে হা-হা করে, যেমন কাঁদি আমি। একদিন তুমিও হাসবে। হি-হি-হি করে, যেমন তোমায় দেখে আমি হেসেছি।”
আমি জিজ্ঞেস করি, “তবে কি এ বনে যে আসে, সে-ই হয়ে যায় শূন্য?”
সে বলে, “হ্যাঁ, বেরিয়ে যাবার পথ যে গোলকধাঁধা। খোঁজা যায় কিন্তু পাওয়া যায় না।”
আমি জিজ্ঞেস করি, “তবে কি তুমি পথ হারিয়ে শূন্য হয়ে গেছ?”
“না।” তার মুখের উত্তর।
“তবে?”
“আমায় বন্দি করল এক রাজা। বেঁধে রেখে গেল রাজার লোক পিছমোড়া করে, গাছের সঙ্গে, এই বনে। গাছের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে আমি শূন্য হয়ে গেলুম।”
আমি বলি, “এখন কই রাজা? এখন তো নেই-রাজার দেশ এটা?”
“তখন ছিল!”
“কখন?”
“তিন হাজার বছর আগে।” সে উত্তর দেয়।
আমি চমকে উঠি, “তিন হাজার! আমার তো সবে দশ। তোমার তো গলা শুনে আমার মনে হয়, তুমি আমারই মতো ছোট।”
সে উত্তর দিল, “ঠিকই বলেছ তুমি। একথা মনে হতেই পারে। কিন্তু শুনে রাখো বন্ধু, তিন হাজার বছর আগে যেদিন আমি শূন্য হয়ে যাই, সেদিন থেকে বছর কেটেছে ঠিকই, কিন্তু শূন্যের বয়স বাড়েনি। আমি থেকে গেছি ছোট্ট, এখনও।”
আমি জিজ্ঞেস করি, “তিন হাজার বছর আগের সেই রাজা কেমন রাজা? নিষ্ঠুর! কেন তোমায় শাস্তি দিল?”
“তবে শোনো বন্ধু সেই গল্প :
তিন হাজার বছর আগের সেই রাজার নাম ছিল বুক্কাবিম্বা। রাজ্যের নাম ছিল জলতলটুং। আমরা ছিলুম সেই রাজ্যের মানুষ। আমার বাবা ছিলেন এক মূর্তিগড়ার কারিগর। তখন পাওয়া যেত অজস্র আগুনে পাথর। বাবা গড়তেন সেই পাথরে মানুষ, না-হয় দেবতা। বাঘ, না-হয় বানর। গড়তেন মন্দিরের নকশা। আমি বাবার পাশে বসে থাকতুম। দেখতুম। বাবার হাতে এগিয়ে দিতুম যন্তর। এটা-ওটা। দেখতুম পাথর কুঁদে বাবা মানুষ গড়ছেন কেমন করে। কোনও দিনও দেখিনি আমি রাজা বুক্কাবিম্বাকে। বাবা দেখেছেন। আমি তার বীরত্বের গল্প শুনেছি অনেক। বাবার মুখে। আমি স্বপ্ন দেখতুম রাজার গল্প শুনে। আর ভাবতুম, রাজারাই শুধু রাজা হয় কেন! বাবা কেন রাজা হতে পারেন না! এই ভাবনাটাই কেমন যেন পেয়ে বসল আমাকে। বাবার মূর্তি গড়ার কারিকুরি দেখতে দেখতে শিখি নিজেও। একদিন একটা ছোট্ট পুতুল গড়ি নিজে নিজে। বাবা দেখেন। বলেন, ‘বাহ্।’
একদিন একটা মানুষের মুখ গড়ি আপন মনে। বাবা বললেন, “বাহ্! বাহ্! আর আমার ভাবনা নেই। আমার মেয়েই আমার বলভরসা।”
আমি মনে মনে ভাবি, আমিও তা হলে পারি।
বাবার খুশি খুশি মুখখানা দেখি।
আমিও মাতোয়ারা হই আনন্দে।
ভাবি, ওই মুখখানা যদি গড়ে রাখতে পারি পাথরে। ক’দিন খুব ছটফট করলুম। ক’দিন একমনে দেখতে লাগলুম বাবাকে। আহা রে, তেমন যদি একটা পাথর পাই, বাবার মুখখানা খোদাই করি সেই পাথরে!
কিন্তু খোদাই শেষ না করে জানান দেব না কাউকে। এমনকী নয় বাবাকেও।
তাই বেরোলুম পাথর খুঁজতে বন-পাহাড়ে।
এখানে পাথর, সেখানে পাথর, যেখানে তাকাও ছড়িয়ে পাথর। খুঁজতে খুঁজতে দেখতে পেলুম একটা খাঁজ পাহাড়ের। খুঁজে পেলুম একটা পাথর মনের মতো সেই খাঁজে। খাঁজের সামনেটা ঢাকা আছে ঝোপঝাড়ে। পেছনটা খোলা আছে আলো-হাওয়ায়। এখানে লুকিয়ে মূর্তি গড়লে কেউ টের পাবে না। আমার হাতে শুরু হল বাবার মুখের আদল গড়া। এ পাথর তো আর নুড়ি নয়, মস্ত বড়। এ পাথর তো পিঠে নিয়ে যাওয়া যায় না। পাহাড়ে এঁটে আছে।
বাবার মুখ গড়তে লাগবে অনেকদিন। অনেকদিন পর মুখ গড়া শেষ হলে সে-মুখ লুকিয়ে থাকবে এই আড়ালেই। কেউ দেখতে পাবে না।
দেখব খালি আমি আর বাবা।
কেউ জানতে পারবে না। জানবে খালি বাবা আর আমি।
পাথর কুঁদতে কুঁদতে কেটে গেল কতদিন।
ক’টা বর্ষা, ক’টা শীত, ক’টা বসন্ত চলে গেল। ছোট্ট আমি একটু বড় হলুম। এখন যেমন। তখন শেষ হল বাবার মূর্তি।
মূর্তি গড়েছি আমি বাবার হাসি মুখের। কিন্তু রাজার গল্প শুনে যে-স্বপ্ন দেখতুম, যে-ভাবনা মনকে অস্থির করত, মনে হয়, রাজারাই কেন রাজা হয়, বাবা কেন রাজা হয় না, বাবার এ মূর্তি তো তেমন রাজার হয়নি।
তাই আমি মূর্তির মাথায় খোদাই করলুম একটি মুকুটের। রাজার এ মুকুট বাবার মুখে শোনা গল্পের মতো। এ মুকুট যেমন আমার স্বপ্নের, আমার বাবাও যেন তেমনই রাজা আমার স্বপ্নের। সত্যি নয়, পাথরে গড়া।
কিন্তু ভয়ংকর কাণ্ড ঘটে গেল একদিন।
একদিন সত্যি রাজা বুক্কাবিম্বা দলবল নিয়ে এই বনে হাজির। শিকার করতে।
রাজা শিকার করতে বনে আসবে এ আর কী নতুন কথা। তার জন্যে ঢেঁড়াও পড়ে না, কাঁসরও বাজে না। ঘণ্টাও না। তাই কেউ পারে না জানতেও।
রাজা দলবল নিয়ে শিকার খুঁজছে বনে। চুপিসারে। আমিও বাবার মূর্তির বাকি কাজ টুকটাক সারছি আপন মনে। রাজা এ ঝোপে খুঁজছে শিকার, নয়তো ও বনে। ধনুকে তির জুড়ে আড়ালে লুকিয়ে থাকে। দেখলেই বাঘ, দেবে তির ছুড়ে। আমি তার এককণাও টের পাই না। কিন্তু কপাল এমন রাজা টের পেয়ে গেল আমার। আমার হাতের যন্তর বাবার মূর্তির গায়ে আলতো-আলতো আঘাত করছে। তারই শব্দ কানে গেল রাজার। দলবলের। রাজা ভাবল, বুঝি কোনও জন্তু, পাহাড়ের খাঁজে উশখুশ করছে! রাজা এগিয়ে এল দলবল নিয়ে। সতর্ক পা। হিংস্র চাউনি। ঝুঁকে পড়ল আচমকা সেই খাঁজে। চিৎকার করে উঠল। আমি চমকে উঠলুম। আমাকে দেখে রাজা থমকে গেল। অবাক চোখে দেখতে লাগল।
ইনিই যে রাজা সে আর জানব কেমন করে আমি। সেদিন তার মাথায় ছিল না মুকুট। ছিল না ঝলমলে পোশাক পরনে। পায়ে ছিল না শুঁড়তোলা জুতো। রাজার বেশ সেদিন শিকারির। অবাক মাত্র ক্ষণেকের জন্যে। চোখে-চোখ চাওয়া পলক মাত্র। তখনই হঠাৎ একজন জিজ্ঞাসা করল, “এখানে কী করছিস?”
সেই একজনই যে রাজা, আমার জানার কথা নয়।
আমি উত্তর দিলুম, “মূর্তি গড়ছি।”
সে জিজ্ঞেস করল, “কার মূর্তি?”
আমি বললুম, “বাবার।”
“তোর বাবা?” অবাক হল সে। জিজ্ঞেস করল, “মাথায় মুকুট কেন?”
আমি উত্তর দিলুম “আমার বাবাকে আমি রাজার মুকুটে সাজাতে চাই।”
“কেন?”
আমি কঠিন স্বরে বললুম, “রাজারাই শুধু রাজা হবে কেন? আমার বাবা কেন রাজা হতে পারে না? আমার বাবা কেন রাজার মুকুট পরবে না? কেন সিংহাসনে বসবে না?”
আমার কথা শুনে লোকটা যেন হুংকার ছাড়ল।
হুকুম করল সাঙ্গোপাঙ্গদের, “মূর্তিটা ভেঙে ফেল! মেয়েটাকে বন্দি কর! বুঝতে পেরেছি এরা ষড়যন্ত্র করছে আমার বিরুদ্ধে।”
তারপরে সে আমায় বলে, “জানিস তুই, কে তোর সামনে দাঁড়িয়ে আছে? তুই কার সঙ্গে কথা বলছিস? আমিই সেই রাজা।”
রাজার কথা শুনে আমি ভয়ে কাঠ।
নিমেষে ভয় ঝেড়ে আমি ঘুরে দাঁড়ালুম। দু’হাত ছড়িয়ে আড়াল করে দাঁড়ালুম বাবার মূর্তিটা। প্রতিজ্ঞা—আমি ভাঙতে দেব না।
পারলুম না।
আমার ওপর তারা পড়ল ঝাঁপিয়ে। আমাকে ফেলে দিল ছুড়ে। খানখান করে দিল মূর্তিটা ভেঙে। তারপর আমায় বেঁধে রেখে গেল এই বনের গভীরে।
আমার প্রাণ গেল। আমি শূন্য হয়ে গেলুম।
আমি জানতেও পারিনি আমার মা-বাবার কী হল সেদিন! সেই তিন হাজার বছর আগে।
সেই শূন্য-মেয়েটির কথা শেষ হলে আমি বলি, “বনের শূন্য বন্ধু একদিন তোমার যেমন মা-বাবা ছিলেন, তেমনই আজ আমারও আছেন। দুঃখ এই, তোমার মতো আমিও বন্দি। তিন হাজার বছর আগে বন্দি করেছিল এক রাজা তোমাকে। আর আজ আমাকে বন্দি করেছে এক ঘাতক। শুনে রাখো আমার শূন্য বন্ধু, আমি তোমার মতো শূন্য হতে চাই না। আমি ফিরে যেতে চাই আমার মায়ের কাছে। আমার বাবার কাছে। যেমন করে পারি।”
“কেমন করে পারবে তুমি?” সে জিজ্ঞেস করে, “তুমি তো এখান থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে না আর। কোনওদিনও না। তুমি তো হারিয়ে ফেলেছ পথ। খুঁজে পাবে না সে-পথ আর কোনওদিন। তোমাকে হতেই হবে আমার মতো শূন্য।”
“কে বলেছে আমি খুঁজে পাব না পথ?” আমি উত্তর দিই, “পথ খুঁজে বার করার উপায় আমার জানা আছে। আমি আগুনে পুড়িয়ে ছারখার করে দেব এই বন। পুড়তে পুড়তে এ বন ধ্বংস হয়ে যাবে। তখন যেদিকে চাইব সেদিকেই দেখতে পাব পথ।”
আমার কথা শুনে সেই শূন্য বন্ধুর গলা যেন ভার হল। বলল, “এ কী বলছ তুমি? এ যে ভয়ংকর কথা। এমন সবুজ সুন্দর বনের তুমি প্রাণ নেবে? বন তো তোমার কোনও ক্ষতি করেনি বন্ধু! তুমি বনের প্রাণ নিলে, আমি শূন্য হয়ে থাকব কোথায়?”
আমি বললুম, “তুমি আমার সঙ্গে থাকবে, আমাদের বাড়িতে।”
সে উত্তর দিল, “তা কেমন করে হয়? যে বাড়িতে শূন্য ঢোকে সে বাড়ি যে খাঁ খাঁ করে। সে-বাড়িতে হাসি-কান্না, আনন্দ-বেদনা, উল্লাস-আহ্লাদ সবই হয়ে যায় শূন্য।”
তার কথা শুনে থ হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম খানিক। আমি অসহায়, একা। তার কথা শুনে মনে কষ্ট পাই। আনচান করি বাবার জন্যে, মায়ের জন্যে। কেমন করে ফিরে যাব তাদের কাছে! ভাবছি যখন ঠিক তখনই, সে বুঝি জানতে পারল আমার মনের কথা।
গলা তার আরও ভার হল। বলল, “ভয় নেই বন্ধু, তুমি যেমন আমার বন্ধু, তেমনই বনের বন্ধু আমি। বনের গায়ে আগুন দিলে সে-আগুন আমারও লাগে। বন যেমন আছে তেমন থাক। থাক আরও হাজার-হাজার বছর। আমিও থাকব সেই সঙ্গে হাজার বছর শূন্য হয়ে। ভয় নেই বন্ধু, তোমায় আমি শূন্য হতে দেব না। আমি তোমায় পথ দেখিয়ে দেব। ফিরে যাবে তুমি মায়ের কাছে, বাবার কাছে।”
“পথ কেমন করে দেখাবে তুমি? তোমাকে তো আমি দেখতেই পাচ্ছি না।”
সে উত্তর দিল, “ভাবনা নেই, তোমার গা ছুঁয়ে-ছুঁয়ে বাতাস হয়ে ভাসব আমি। যেদিকে ভেসে যাব সেইদিকে হাঁটবে তুমি। তাহলেই পথের খোঁজ পাবে তুমি।”
বলে সেই শূন্য বন্ধু আমায় ছুঁয়ে ছুঁয়ে ভেসে চলল। আমিও তার সঙ্গে তেমন করেই হেঁটে চললুম। খানিক পরেই দেখতে পেলুম পথ। আমি মুক্তি পেলুম বনের বন্ধন থেকে, কিন্তু শূন্য বন্ধুর আর সাড়া পেলুম না।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন