শৈলেন ঘোষ

বোঝো এবার! বোঝো বিপদ কাকে বলে! কিছুই নয়, ক’দিন ধরেই কাক্কাবোক্কার মনটা কেমন যেন আনমনা হয়ে ছটফট করছিল। দেখেই মনে হচ্ছিল, কোনও কাজেই গা নেই তাঁর। মুখে কথা বলছেন বটে, তবে, তা সে না-বলারই সামিল। মন্ত্রীর সঙ্গে যেন চিরদিনের মতো আড়ি করে বসে আছেন। আরে বাবা, অত কথা কী, অমন যে ঘর আলোকরা মহারানি, তাঁর সঙ্গে পর্যন্ত “হ্যাঁ, হুঁ,” ছাড়া অন্য বাক্যি ঠোঁটে নড়ে না। যে-মানুষটা সারাদিন “এটা খাব”, “সেটা খাব” করে রানিকে চোখের জলে, নাকের জলে করে ছাড়েন, সেই মানুষটা এখন খাবারের নামগন্ধ পর্যন্ত মুখে আনেন না! আশ্চর্য!
অবশ্য, তাঁর এই আশ্চর্য রকমের ব্যবহারটা প্রথম সেই রাজরানিরই চোখে পড়ে। পড়ারই কথা। কেন না, রানি খিলখিল করে হাসলে যাঁর মুখখানি চকচক করে ওঠে খুশিতে, কিংবা রানি কাশলে বুকখানা যাঁর চমকে ওঠে ভাবনায়, এখন সেই রাজারই মুখে-বুকে হাসি-ভাবনা কিছুই নেই! মানুষটার যেন জান নেই, প্রাণ নেই, ফাঁপা কলসি!
এ যে সর্বনেশে কথা! রাজা ফাঁপা হলে গোটা রাজ্যটাই যে ফাঁপিয়ে যাবে! এমনটা তো চলতে পারে না। এর একটা বিহিত না হলে অহিত কাণ্ড ঘটে যেতে কতক্ষণ! সুতরাং বুদ্ধিমতী রানি নিজেই ঠিক করলেন, মহারাজের সঙ্গে এটা-ওটা কথা বলে তাঁর মনের কথার খোঁজ করবেন। আসলে চেষ্টা করতে ক্ষতি কী!
তা বলতে নেই, রানি বোধহয় সেদিন, জীবনে সেই প্রথম নিজের হাতে মহারাজের পায়ে গরম তেল মালিশ করতে বসলেন। রাজা তখন পালঙ্কে হেলন্ত হয়ে বসে। আহা! অমন নরম হাতে গরম তেলে পা দললে কোন মানুষেরই না মন টলে! কিন্তু হায় কপাল, রাজা কাক্কাবোক্কার তাতেও হেলও নেই, দোলও নেই। আগেও যেমন, এখনও তেমন।
রানি কিন্তু ছাড়লেন না। তিনি রাজার পা দলেই চললেন, আর মৃদুমৃদু করে হাসতে লাগলেন।
মৃদুমৃদু হাসির শব্দটা ঠিক ঠিক কানে পৌঁছতেই রাজা একফাঁকে টুক করে রানির মুখখানা দেখে নিলেন। কিন্তু রানির চোখে চোখ পড়ার আগেই তিনি নিজের চোখ যেই সরাতে গেছেন রানি দেখে ফেলেছেন। অমনই রানি হি-হি করে হেসে উঠেছেন। হাসতে হাসতে বলে উঠেছেন, “আমি কিন্তু দেখে ফেলেছি।”
রাজা কাক্কাবোক্কা একটু লজ্জায় পড়লেন বটে, কিন্তু টসকালেন না। “হুঁ” করে মুখে একটা শব্দ তুলে নিজের ডান পা সরিয়ে বাঁ পাটা এগিয়ে দিলেন রানির হাতের কাছে। মানে, ডান পা ছেড়ে এবার বাঁ পায়ে তেল দাও! আরাম লাগলে সব মানুষই এমন করে।
এতক্ষণ হাসছিলেন রানি! রাজা বাঁ পা বাড়াতেই তিনি হাসি থামিয়ে হাত সরিয়ে নিলেন। ভণিতা করে মুখখানা গুরুগম্ভীর করলেন। তারপর তেলের বাটি হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
যেই রানি উঠে দাঁড়িয়েছেন, অমনই রাজার টনক নড়েছে। আরে বাবা কোনও রানি যদি নিজের হাতে রাজার পায়ে তেল মালিশ করেন, তবে তার যে কী সুখ, সে রাজা ছাড়া তো আর কারও জানার কথা নয়। তাই রানি উঠে দাঁড়াতেই রাজা আচম্বিতে কথা কইলেন, “উঠলে যে বড়?”
রানি বললেন, “উঠবই তো। আমি আপনার পায়ে তেল ঢালছি কখন থেকে, কিন্তু আপনার মুখে কোনও সাড়াশব্দ নেই। কেন যে আপনি কথা বলছেন না, তাও জানি না। অথচ চুপচাপ ডান পাটি টেনে আপনি কেমন বাঁ পাটি আমার হাতের গোড়ায় ঠেলে দিলেন। আমার বয়ে গেছে মালিশ করতে। আপনি আরাম করবেন আর আমি আপনার মুখের দিকে হাঁ করে বসে থাকব, এটা কেমন কথা!”
এতক্ষণে রাজার মুখে কথা সরল! তিনি যেন একটু বেঁকাসুরেই কয়ে উঠলেন, “আমি কথা বললেই বা শুনছে কে!”
রানি অবাক হলেন। উত্তর দিলেন, “এ কী কথা বলছেন আপনি? আপনার কোন কথাটা কে কবে শোনেনি বলুন তো? কার এমন বুকের পাটা আপনাকে অমান্য করে!”
রাজা কাক্কাবোক্কা এবার মুখখানা ভীষণ ভার করে বললেন, “সবাই আমাকে অমান্য করে। নইলে, আমি যে-কথাটা বলতে পারছি না, সেই কথাটাই কেউ শুনছে না। এটা অমান্য করা নয়?”
রানি এবার আর থাকতে পারলেন না। ফুস করে হেসে ফেললেন। বললেন, “এ কী অদ্ভুত কথা বলছেন? যে-কথাটা আপনি নিজেই বলতে পারছেন না, সেই কথাটা কেউ শুনছে না বলে আপনি অন্যকে কেন দোষ দিচ্ছেন? সেই কথাটা তো আপনি আমাকে পর্যন্ত বলেননি।”
রাজা গম্ভীরভাবে বললেন, “বলা যায় না।”
রানি বেশ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন বলা যায় না?”
রাজা উত্তর দিলেন, “সে একটা ভয়ানক কথা।”
রানি থতমত খেয়ে গেলেন। দাঁড়িয়েছিলেন, আবার বসে পড়লেন রাজার মুখের সামনে। পতপত করে বার দুয়েক চোখের পাতা ওপর-নীচ করলেন রাজার মুখের দিকে চেয়ে। তারপর ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আজ্ঞে, ভয়ানকটা কী?”
রাজা জবাব দিলেন, “ভয়ানকটা ভয়ানক। রাজবাড়ির অন্দরে যে এখন গানের সুর ফুরফুর করে উড়ে বেড়াচ্ছে, সে-খবরটা কি তোমার জানা আছে? আমার তো জানা ছিল না।” বলে রাজারা অপমানবোধ করলে যেমন করে মুখ ঘুরিয়ে বসে থাকেন, তেমন করে বসে থাকলেন।
রানি যেন ভয় পেলেন। বুক কেঁপে উঠল তাঁর দুরুদুরু। তিনি ভয়েময়ে বলে ফেললেন, “আমার কেমন যেন সব তালগোল পাকিয়ে যাচ্ছে। কিছুই আমার মাথায় ঢুকছে না। আজ্ঞে মহারাজ, আমি আপনার রানি। আপনি আমাকে সব কথা খোলসা করে না-বললে, আমি কী করে কী করি বলুন তো?”
রাজা গাঁক করে চেঁচিয়ে উঠলেন। বললেন, “আমি খুন করব।”
এই সর্বনাশ! এ আবার কী সাংঘাতিক কথা শুনি রাজার মুখে! রানির চোখ উঠল কপালে। তিনি আঁতকে উঠে জিজ্ঞেস করলেন, “কাকে খুন করবেন?”
“কাকে আবার, তাকে।” রাগে রাজার গলা কাঁপছে।
রানি ভ্যাবাচাকা-হাম্বার মতো জিজ্ঞেস করলেন, “তাকে মানে?”
রাজা হতচ্ছেদ্দা গলায় বললেন, “যাকে না-হলে আমার একদণ্ড চলে না।”
রানি আতঙ্কে শিউরে উঠলেন। তারপর ধরাধরা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “মহারাজ, আমাকে ছাড়া তো আপনার একদণ্ড চলে না। তার মানে আপনি আমাকে খুন করবেন?”
রাজা উত্তর দিলেন, “তোমাকে খুন করতে যাব কোন দুঃখে! তুমি কি গান গাও?”
“তবে কে সে-জন গান গায়?” রানি যেন ভয়ে কুঁকড়ে যান।
“যে-জন গায়, সে-জন শুধু গায় না, আমাকে লুকিয়ে লুকিয়ে গায়।” উফ! কী রাজা রে বাবা, এখনও ঝেড়ে কাশেন না! এখনও ঝুলিয়ে রেখেছেন রানিকে!
রানি বললেন, “মহারাজ, আপনি তার নাম বলুন, আমি তাকে আচ্ছা করে বকে দেব।”
রাজা তেমনই রাগত গলায় উত্তর দিলেন, “না, না, তোমাকে বকাবকি করতে হবে না। আমিই তাকে ঠান্ডা করে দিচ্ছি। তোমাকে শুধু একটি কাজ করতে হবে, আমাকে একটা গান শিখিয়ে দিতে হবে।”
রাজার মুখে এমন একটা উদ্ভট কথা শুনে রানির বুকটা ছ্যাঁত করে উঠেছে। ফস করে বলে উঠেছেন, “মহারাজ, এ আপনি কী বলছেন? আপনি রাজা। এই বয়সে আপনি গান শিখলে লোকে হাসবে। আর তা ছাড়া আমি আপনাকে কেমন করে গান শেখাব? আমি তো নিজেই গাইতে জানি না।”
রাজা এবার একটু গলা চড়িয়ে বললেন, “কে বলল জানো না! আমাদের যেদিন বিয়ে হয়, সেদিন তো তুমি গান গেয়েছিলে। ভাবছ, আমি ভুলে গেছি?”
এই রে, রাজার বোধহয় মাথাটা গেছে! রানি অধীর হয়ে উত্তর দিলেন, “হ্যাঁ, মহারাজ, আপনি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু বিয়ের রাতে গাইব বলে অনেক কষ্টে আমি ওই একটি গানই শিখেছিলুম। তার ওপর সে তো হয়ে গেল অনেকদিন।”
রাজা জিদ ধরলেন, “ঠিক আছে ওই বিয়ের গানটাই আমাকে তুমি শিখিয়ে দাও!”
“আমার একটা লাইনও মনে নেই।” রানি সভয়ে উত্তর দিলেন।
রাজা তাড়া দিয়ে বললেন, “মনে করো।”
এবার রানি একটু বিরক্ত হয়েই উত্তর দিলেন, “মনে না থাকলে, মনে করব কী করে?”
রাজাও নাছোড়বান্দা, “তোমাকে মনে করতেই হবে। আমি একবার দেখে নেব মন্ত্রীকে!”
রানি চমকে উঠলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “কেন! মন্ত্রীমশাইকে দেখে নেবেন কেন? তিনি আবার কী করেছেন?”
রাজা তিতিবিরক্ত হয়ে উত্তর দিলেন, “যা করবার তিনিই তো করেছেন। তিনিই আমার মেজাজ বিগড়ে দিয়েছেন। কী আশ্চর্য, যে-রাজ্যের রাজা নিজে গান জানে না, সেই রাজ্যের মন্ত্রী গোপনে গান গাইবে? মন্ত্রীর এই আস্পদ্দা মেনে নেওয়া যায়?”
রানি এবার আর থাকতে পারলেন না। হেসে ফেলেছেন। বললেন, “মন্ত্রীমশাই যে গান জানেন, এ তো আমিও জানি না।”
রাজা রাগে গর্জে উঠলেন, “তা হলেই বোঝো।”
রানি খুব উৎসুক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনি কোথায় শুনলেন তাঁর গান?”
রাজা ব্যাজার গলায় উত্তর দিলেন, “কেন, আমার এই রাজবাড়িতেই। সেদিন আমি তাঁর ঘরের পাশ দিয়েই যাচ্ছিলুম। হঠাৎ কানে এল তিনি ঘরের ভেতর খিল এঁটে দিব্যি সুর ভাঁজছেন।”
রানি রাজাকে আশ্বস্ত করার জন্য বললেন, “মহারাজ, মানুষের মনে ফুর্তি হলে মানুষ একটু-আধটু সুর ভেঁজেই থাকে। তাকে কি আর গান বলে!”
রাজা উত্তর দিলেন, “সে কী কথা! তুমি আমাকে বোকা ঠাওরাচ্ছ? আমি নিজের কানে শুনলুম গোটা গোটা কথায় তিনি তেড়ে তেড়ে গাইছেন:
ফুল ফুটেছে ফুলের গাছে
তালগাছেতে তাল,
মন বলছে তাল-ফুলুরি
পাই যদি খাই কাল।”
গানের কথা শুনে তখন রানির সে কী খিলখিল করে হাসি! হাসতে হাসতে কুটোপাটি খেয়ে গেলেন। বললেন, “মহারাজ, বুঝতে পারলেন না, মন্ত্রীমশাইয়ের তালের ফুলুরি খাবার সাধ হয়েছে তাই তিনি অমন করে সুর ভেঁজেছেন। এটাকে গান বলে নাকি?”
“বলে!” রাজা গলায় গমক দিলেন, “মন্ত্রীমশায়ের যদি অতই তালের ফুলুরি খাবার সাধ হয়ে থাকে, তবে সেটা সিধে-সাপটা মুখে বলতে কী হয়েছিল? না, তা তিনি বলবেন না। ইচ্ছে করেই বলবেন না। কেননা, তিনি সুর শুনিয়ে আমাকে জানান দেবেন যে তিনি মন্ত্রী, গান জানেন, আমি রাজা, জানি না। এটা আমাকে একপ্রকার অপমান করা। আমি অত সহজে ছাড়ব না মন্ত্রীকে। আমি প্রতিশোধ নেব। যতক্ষণ না মন্ত্রীকে আমি আমার গান শোনাতে পারছি, ততক্ষণ শান্তি পাব না। সুতরাং তুমি আমাকে সেই বিয়ের গানটাই শিখিয়ে দাও!”
রানি এবার ভীষণ প্যাঁচে পড়লেন। একবার যখন গোঁ ধরেছেন রাজা কাক্কাবোক্কা তখন আর রেহাই নেই। তবুও তিনি শেষবারের মতো আর একবার বললেন, “আপনাকে কেমন করে শেখাই বলুন তো, আমার কিচ্ছু মনে নেই।”
রাজারও সেই এককথা, “তোমাকে শেখাতেই হবে।”
অগত্যা রানি আর কী করেন, গানের কথাগুলো মনে করার জন্যে গুনগুন করতে লাগলেন। রক্ষে এই, সুরটা তবু ভাসা-ভাসা মনে ছিল। এই গুনগুন করতে করতেই তিনি আনচান করেন, একবার ঘরে যান, বাইরে আসেন। নয়তো বাগানে যান, ভাঁড়ার ঘাঁটেন। তা-ও সে অনেক ঘাঁটাঘাঁটির পর গানের একটি-দুটি শব্দ হঠাৎ হঠাৎ তাঁর মনে উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল। এমনই করে একটি-দুটি দিনও কেটে গেল। ভাগ্য ভাল, শেষমেশ কিছু না হলেও গানের ক’টি লাইন তিনি কণ্ঠস্থ করে ফেললেন। তারপর তিনি ঘরের ভেতরে কপাট এঁটে নিজের মনে চাপা স্বরে গাইতে লাগলেন:
আজকে আমার বিয়ের লগন
সাজন-গাজন শুরু,
পটকা ফাটে দুমদুমাদুম
বুক করে দুরদুরু।
হুল্লোহুড়ির ঠাট্টা হাসির
কতই ধানাই-পানাই,
আজকে যে চাঁদ উঠবে
সে তো সবার আছে জানা-ই।
এই আটটা লাইন-এর বেশি তিনি আর একটি লাইনও মনে করতে পারলেন না। ঠিক আছে, এই আটটা লাইনই সই। এই আটটা লাইনই তিনি রাজাকে শেখাতে শুরু করলেন।
বাবা রে বাবা, রাজাকে গান শেখানো কি সহজ কাজ! যে লোকটা গানের “গ” জানে না, বললেই কি আর তাকে টুসকি মেরে শেখানো যায়! তিনদিন ধরে কোস্তাকুস্তি হল। তিনদিন ধরে রাজা রানি দু’জনেই ঘেমে নেয়ে নাস্তানাবুদ হয়ে গেলেন। অবশেষে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলেন রানি। রাজার গলা যা গাইছে তাই যথেষ্ট। আরে বাবা এই বয়েসে গান গাইলে তো আর গলায় মধু ঝরবে না! ব্যাঙের মতো গলাটা যদি ঘ্যাংঘ্যাং করে ঘ্যাঙায়, তবে সেই নিয়েই খুশি থাকতে হবে।
কোনওক্রমে শিখে, রাজবাড়ির অন্দরমহলে ক’দিন একনাগাড়ে প্র্যাকটিস করলেন রাজা কাক্কাবোক্কা। কাক-পক্ষীও টের পেল না। টের পেলেন তিনি, যিনি শেখালেন, মানে রানি। তিনি মনে মনে ভাবলেন, না-জানি কী ভয়ংকর কাণ্ড ঘটে! ভয়ে-ভাবনায় রানির খিদে-তেষ্টা মাথায় উঠেছে। কিছুতেই ভেবে পাচ্ছেন না, এই গান গাওয়া থেকে তিনি কেমন করে মহারাজকে ক্ষান্ত করবেন। যে শুনবে সেই যে ছ্যা ছ্যা করে উঠবে, এ কি তিনি বুঝছেন না?
তার ওপর আর-এক বিপদ শুরু হয়ে গেছে। যখন খুশি তখনই মহারাজ গুনগুন করছেন। সুরের তোড়ে এমন মজে গেছেন যে, রানির সঙ্গে যখনই কথা বলছেন, তাও সুরে সুরে। সুরে সুরে একটা গানও বেঁধে ফেলেছেন:
রানি, খিদে পেয়েছে, খেতে দাও,
রানি, ফুলকো লুচি ভেজে দাও,
রানি, ঘুম পেয়েছে শুতে দাও,
রানি, রেশমি চাদর পেতে দাও,
রানি, চাঁদ উঠেছে পেড়ে দাও,
রানি, মাথা ধরেছে নেড়ে দাও!
আচ্ছা, কী জ্বালাতন বলো তো রানির? সারাদিন কথায় কথায় কেউ যদি সুর ছড়িয়ে ঘ্যানঘ্যান করে, তবে কার শুনতে ভাল লাগে বলো? তারপর সেদিন যখন রাজা বলে উঠলেন, “এবার আমি মন্ত্রীকে এমন একখানা দেব যে, তিনি জন্মে আর গানের নাম মুখে আনবেন না। মন্ত্রী ভাবছেন, তিনি একাই পারেন, ভাবছেন আমাকে টেক্কা দেবেন। অতই সোজা! আমি এবার নিজেই জলসা বসাব। রাজ্যের মানুষকে ডেকে এনে আমার গান শোনাব,” তখন থেকেই রানির হৃৎকম্প শুরু হয়ে গেল। তাঁর গলার গান যে রাজ্যের মানুষকে শোনানো যায় না, এখন একথা কে তাঁকে বোঝাবে! রানি পড়লেন মহাফাঁপরে। অন্যকিছু ভেবে না পেয়ে শেষমেশ তিনি মন্ত্রীমশাইকেই ডেকে পাঠালেন।
মন্ত্রী এলেন। প্রথম থেকে শেষ অবধি খুব ধৈর্যের সঙ্গে রানির কথা শুনলেন। তারপর বললেন, “রানিমা, ভয় পাবার কিচ্ছু নেই। আমাকে কিছুই করতে হবে না। মহারাজ নিজের ব্যবস্থা নিজেই করে নেবেন, দেখুন না।”
মন্ত্রীর কথা শুনে রানিমা কতটা আশ্বস্ত হলেন বলা যাবে না। তবে তিনি এরই ফাঁকে একটু মুচকি হেসে মন্ত্রীকে বলতে ভুললেন না, “আপনি যে গান গাইতে পারেন, কই আমি তো জানতে পারিনি কোনওদিন!”
রানিমার কথা শুনে মন্ত্রীমশাই হকচকিয়ে গেলেন। ভয়ানক অস্বস্তিতে মাথা হেঁট করে ফেললেন। তারপর আমতা আমতা করে উত্তর দিলেন, “আজ্ঞে না রানিমা, আমি গান কোনওদিনই গাইতে পারি না। কখন কোন ফাঁকে একটু গুনগুন করে ফেলেছি, সেই শুনেই বোধহয় রাজামশাই গোঁ ধরে আপনাকে এমন ব্যতিব্যস্ত করেছেন।”
উত্তরে রানি বললেন, “না মন্ত্রীমশাই, আপনি তো শুধু গুনগুন করেননি, গুনগুন করে তালের ফুলুরি খাবার ইচ্ছে প্রকাশ করেছিলেন। তা ফুলুরি খাবার ইচ্ছেটা আগে বললেই পারতেন, ব্যবস্থা করা যেত। তা হলে এত হ্যাপা পোয়াতে হত না।”
মন্ত্রীমশাই যে ধরা পড়ে গেছেন এটা বুঝতে পেরেছেন তিনি নিজেই। তাই মুখখানা কাঁচুমাচু করে বললেন, “সেইটাই ভুল হয়ে গেছে।”
রানি মন্ত্রীমশায়ের কথা শুনে কতটা সন্তুষ্ট হলেন বলা শক্ত। কিন্তু তিনি যে খুব চিন্তায় পড়ে গেছেন সে তাঁর মুখ দেখে স্পষ্ট বোঝা গেল। তাই তিনি মন্ত্রীমশাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “এখন মহারাজ আপনাকে যদি সত্যি-সত্যি জলসার ব্যবস্থা করতে বলেন, তা হলে কী হবে?”
মন্ত্রীমশাইও খুব চিন্তিত হলেন। তবে রানিমাকে বললেন, “আপনি ভাববেন না। দেখি না কী হয়।”
যাক বাঁচা গেল। একটা সুখবর আছে। মন্ত্রীমশাইকে জলসার ব্যবস্থা করতে বলেননি রাজামশাই। তিনি নিজেই ঢাকিকে ডেকে সারারাজ্যে ঢেঁড়া পেটানোর হুকুম জারি করে দিলেন। অমনই পথে পথে ঢেঁড়া পড়ল: “শোনো শোনো প্রজাগণ, আসছে কাল সন্ধেবেলায় রাজবাড়ির অঙ্গনে গানের জলসা বসবে। আমাদের মহানুভব মহারাজ কাক্কাবোক্কা তাঁর প্রিয় প্রজাদের নিজের কণ্ঠে গান শোনাবেন। আপনারা দলে দলে যোগ দিন”—ড্যাডাং-ড্যাড্যাং-ড্যাড্যাং।
রাজ্যের মহানুভব রাজা নিজে গান শোনাবেন! একথা শুনলে কোন প্রজার আনন্দে গায়ে কাঁটা না দেয়! শুধু আনন্দ নেই রানিমার। তিনিই শুধু জানেন গানের বদলে রাজার গলায় কী শোনা যাবে। তাই বলা যায়, লজ্জা আর ভয়ে তিনি জুজু হয়ে আছেন।
বলতে নেই, পরের দিন সত্যিই যেন রাজবাড়ির খোলা অঙ্গনটা হট্টমেলার দেশ হয়ে উঠল। লোকে লোকে লোকারণ্য। রাজা নিজে গান শোনাবেন, একথা কি কেউ কোনওদিন কল্পনা করতে পেরেছিল! এ সুযোগ কি ছাড়া যায়! তাই দলে দলে লোক এসেছে। কী অসম্ভব উৎসাহ মানুষের! রাজা বসবেন উঁচুতে, যাতে সব মানুষ দেখতে পায়। তাই খোলা অঙ্গনে তৈরি হয়েছে উঁচু মঞ্চ। আনা হয়েছে উঁচু নকশা-আঁকা কাঠের বেদি। এই বেদির ওপর বসে রাজা গান শোনাবেন।

যথাসময়ে শিঙা বেজে উঠল। যথাসময়ে সভাসদদের সঙ্গী করে রাজা কাক্কাবোক্কা বেদির ওপর এসে বসলেন। অগুনতি লোক উল্লাসে ফেটে পড়ল। সভাসদরা নিজের নিজের আসন নিলেন। শুধু মন্ত্রীমশাই-ই গুটি গুটি পায়ে রাজার কাছে এগিয়ে এলেন। রাজা তাঁকে চোখ টেরিয়ে মুহূর্ত দেখেই মুখটা ব্যাজার করে ঘুরিয়ে নিলেন। মন্ত্রী কিন্তু তবু রাজার কানের কাছে নিজের মুখখানা এগিয়ে আনলেন। তারপর ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলেন, “মহারাজ কি খালি গলায় গান গাইবেন?”
“হ্যাঁ!” মহারাজ গাঁক করে হুংকার ছাড়লেন।
মন্ত্রী চমকে উঠলেন। তবে ভয় পেলেন না। তাই আবার বললেন, “গানের সঙ্গে ডুগি তবলা না বাজলে হুজুর, গান বেতালা হয়ে যাবার আশঙ্কা থেকে যায়।”
“হোক বেতালা!” রাজা আবার মন্ত্রীকে ধাতানি দিলেন।
মন্ত্রী ভাবলেন, আর ঘাঁটাঘাঁটি না করাই ভাল। তাই এবার ওসব বাজনা-বাদ্যির কথা না তুলে জিজ্ঞেস করলেন, “মহারাজ, এখন কি তবে আমি আপনার গান শুরুর কথা ঘোষণা করে দেব?”
রাজা এবার মেজাজ আর একেবারেই ঠিক রাখতে পারলেন না। মন্ত্রীকে ধমক মারলেন, “আমি কি আপনাকে আমার হয়ে দালালি করতে বলেছি? আপনি যা করছিলেন ঘরের ভেতরে গিয়েই করুন। ভেবেছেন আপনি একাই গাইতে পারেন, আমি পারি না! ঘরের ভেতর ল্যাজ গুটিয়ে সবাই পারে গান গাইতে। এবার দেখুন, আমি কেমন উপচেপড়া জনগণের সামনে গান গাই।” বলে আচমকা গলা ফাটিয়ে নিজেই গেয়ে উঠলেন:
“আজকে আমার বিয়ের লগন
সাজন-গাজন শুরু,
পটকা ফাটে দুমদুমাদুম
বুক করে দুরদুরু।”
ওমা! কোথাও কিছু নেই, রাজা কাক্কাবোক্কা গানের চারটে লাইন গাইতেই খোলা-অঙ্গনের ডানদিক থেকে কে যেন খিলখিল করে হেসে উঠল। বোঝা গেল এ গলার স্বর একটা ছোট্ট ছেলের। সে হেসে উঠতেই রাজা কাক্কাবোক্কা থতমত খেয়ে থমকে গেলেন। তাঁর হেঁড়ে গলার গান থেমে গেল। অমনই সেই ছোট্ট ছেলেটি হাসতে হাসতে চেঁচাল, “সে কী মহারাজ, আমাদের তো রানিমা আছেন। আপনি আবার বিয়ে করবেন?”
সেই ছেলেটির কথা শুনে রাজবাড়ির খোলা-অঙ্গনে যত মানুষ জড়ো হয়েছিল, তারাও চিৎকার করে হেসে উঠল। উফ! অত লোকের অমন হাসির তোড়ে যেন থরথর করে কেঁপে উঠল সারা অঙ্গনটা। তারপর সে-হাসি আর থামতে চায় না। সে কী উদ্ভট কাণ্ড! মঞ্চে বসে থাকা সভাসদরা পর্যন্ত ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে হাঁ হয়ে গেছেন। হঠাৎ ওরই মধ্যে কে একজন মঞ্চের ওপর থেকে চেঁচিয়ে উঠলেন, “খামোশ! খামোশ!”
এখন আর “খামোশ খামোশ”করে চেঁচালে কী হবে! এই উপচে-পড়া ভিড়কে কি সামাল দেওয়া যায়! তবু তিনি হাতজোড় করে বার বার বলতে লাগলেন, “বন্ধুগণ, আপনারা থামুন! মহারাজকে আপনারা ভুল বুঝবেন না। তিনি বিয়ে করছেন না। তিনি কেবলমাত্র গান গাইছেন। আসলে এটা একটা গানের লাইন।”
তা বলতে নেই, তাঁর কথা শুনে ধীরে ধীরে সভা শান্ত হল। রাজা আবার গান শুরু করলেন:
“আজকে আমার বিয়ের লগন...”
“খামোশ! খামোশ!” ওমা! আবার কে বাধা দিল!
হ্যাঁ, বাধা দিলেন জনগণের ভেতর থেকে একজন বুড়ো মানুষ। কাঁপা কাঁপা গলায় তিনি চেঁচিয়ে বলে উঠলেন, “মহারাজ, আপনার গানের কথাগুলি ভালই। কিন্তু মহারাজ, আপনার গানের গলাটি ঘষেমেজে আর একটু ঝালিয়ে নিয়ে জলসা বসালে হত না? এখন আপনার গানের তোড়ে আমাদের কানে তালা লেগে যাচ্ছে!”
আড়াল থেকে কে একজন বলে উঠল, “যেন ব্যাঙ ডাকছে!”
ব্যাস! আবার তুমুল হাসি! আবার চিৎকার, “খামোশ, খামোশ!”
রাজা কাক্কাবোক্কা তো আর কালা নন। “ব্যাঙ ডাকছে” কথাটা তাঁর স্পষ্ট কানে গেছে। অপমানে রাজার রাগে গা জ্বলে গেল! তিনি নিজেকে সামলাতে না-পেরে হামলে পড়লেন মন্ত্রীর ওপর। মন্ত্রীকে কড়কে উঠলেন, “লোকে আমাকে ব্যাঙ বলল, আর আপনি মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে রইলেন!”
মন্ত্রী খুবই বিনয়ের সঙ্গে উত্তর দিলেন, “মহারাজ, আপনিই তো আমাকে দালালি করতে বারণ করলেন। এখন আমাকে বকাবকি করাটা কি আপনার উচিত হচ্ছে।”
ব্যাস, ভস্মে যেন ঘি পড়ল। রাজা কাক্কাবোক্কার মেজাজ গেল মুহূর্তে বিগড়ে। তিনি দপ করে জ্বলে উঠে তিড়িং করে লাফিয়ে উঠলেন মঞ্চের ওপর। গলা ফাটিয়ে মন্ত্রীকে কড়কে উঠলেন, “কী, আপনার আস্পদ্দা তো কম নয়! রাজাকে আপনি উচিত-অনুচিত শেখাচ্ছেন!” বলেই চকিতে হুড়মুড়িয়ে তেড়ে এলেন মন্ত্রীর দিকে।
মন্ত্রীমশাই রাজার ওই ভয়ানক মূর্তি দেখে চোখের পলকে মারলেন ঝাঁপ মঞ্চের ওপর থেকে একেবারে জনতার মাঝখানে। ঠেলে-মেলে দিলেন ছুট!
রাজাও মঞ্চের ওপর থেকে লাফ মেরে করলেন তাড়া মন্ত্রীকে। একে ঠেললেন, ওকে ফেললেন, শুরু হয়ে গেল রাজা আর মন্ত্রীতে চোর-পুলিশ খেলা!
রাজবাড়ির খোলা-অঙ্গনে গান শোনার জন্যে জমায়েত মানুষগুলো রাজা-মন্ত্রীর কাণ্ড দেখে প্রথমটা তো বেবাক অবাক। তারপর শুরু হয়ে গেল হুড়োহুড়ি, চেঁচামেচি, ছই-ছত্রখান বিশৃঙ্খলা।
রাজার মুক্তোমালা ছিঁড়ে-ছড়িয়ে গড়াগড়ি!
মন্ত্রীর মাথার পাগড়ি ফালাফালা ফর্দাফাঁই!
রাজার পায়ের নাগরা একপাটি হারাল, একপাটি পায়ে রইল!
মন্ত্রীর কচ্ছ-কাছা খুলেখালে একাক্কার!
সে এক লন্ডভন্ড লজ্জাকাণ্ড রাজবাড়িতে!
শেষমেশ রাজার তাড়া খেয়ে রাজবাড়ির খোলা-অঙ্গন থেকে মন্ত্রী ভোঁ-কাট!
রাজাও মন্ত্রীকে তাড়া করতে করতে চোঁ-কাট! কে যে কোথায় লুকিয়ে পড়ল আর দেখা গেল
না।
আর, এদিকে খোলা-অঙ্গনে জমায়েত গানের শ্রোতারা, গান শোনার বদলে একঝাঁক সরষে ফুল চোখে নিয়ে যে যার ঘরের দিকে পা বাড়াল। জানতেও পারল না, রাজা মন্ত্রীকে ধরতে গিয়ে নিজেই এখন বিছানায় চিতপাত হয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছেন। আর মন্ত্রীমশাই রাজার শয়নকক্ষের অলিন্দে উঁকি মেরে মেরে রাজাকে দেখছেন আর হাঁফাচ্ছেন।
বেচারা রানিমা তাই দেখে কী করবেন, হাসবেন, না কাঁদবেন বুঝতে না-পেরে একগলা ঘোমটা টেনে আইসক্রিম খেতে শুরু করে দিলেন। সে ভারী মজার দৃশ্য!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন