শৈলেন ঘোষ

কে জানে কার মুখ দেখে আজ সকালে ঘুম ভাঙল! এ কী দেখি! এ কী দৃশ্য! ওই দ্যাখো, রাজা কাক্কাবোক্কা কেমন ঠোঁট টিপে টিপে হাসছেন। শুধু হাসছেন বলি কেন, দ্যাখো দ্যাখো, কী দুর্দান্ত খোশমেজাজে তিনি মন্ত্রীমশায়ের সঙ্গে গুজুরগুজুর-ফুসুরফুসুর করছেন! আয়ি ব্যাস! এ যে ভাবাই যায় না। উঠতে বসতে যাঁর সঙ্গে ঠোকাঠুকি লেগেই আছে, আজ কী এমন ঘটল যে তাঁর সঙ্গে এমন গলাগলি শুরু হয়ে গেল! রাজাবাদশাদের কথাই আলাদা। কখন যে তাঁরা হাসবেন, আর কখন যে তাঁরা রাগবেন, তার হদিস কার সাধ্যি আগেভাগে টের পায়!
অবিশ্যি মন্ত্রীমশাইও যথেষ্ট সাবধানী। তিনি তো রাজামশায়কে হাড়েহাড়ে চেনেন। হাসতে হাসতে এক্ষুনি যে রাজা গর্জে উঠতে পারেন, এ তাঁর অজানা নয়। গর্জে উঠে এমন সব আজগুবি বায়না ধরবেন যে, সবাই থরহরিকম্পমান। আজও কি তিনি হাসতে হাসতে বায়না ধরার গাওনা শুরু করবেন?
এই তো সেদিন গভীর রাতে কী কাণ্ডটাই না করলেন তিনি। সারাদিন হাড়ভাঙা খাটুনির পর মানুষ যে একটু নিশ্চিন্তে ঘুমোবে, তারও উপায় নেই। আরে বাবা, তোমার ঘুম ভেঙে গেছে বলে মাঝরাতে তুমি হাঁকডাক শুরু করে দেবে! সে কী হুলুস্থুলু কাণ্ড! এ ধড়ফড় করে উঠে বসে! ও তড়বড় করে ছুটে আসে! এ হাঁফায়! ও দাপায়! ঘুমন্ত রাজবাড়ি নিমেষে জাগন্ত!
কিন্তু জাগলে কী হবে! কার অত বুকের পাটা যে সে সময় রাজার সামনে গিয়ে দাঁড়ায়। হ্যাঁ, দাঁড়াতে পারেন একজনই, তিনি আর কেউ নন, রানি। তিনি “কী হল, কী হল” করে ছুটে এসে রাজার ঘরে ঢুকে পড়লেন। অমনই রাজার মুখখানা গুম মেরে গেল। তিনি আর হাঁকেন না, ডাকেন না, ফ্যালফ্যাল করে তাকান শুধু।
রানি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করেন, “কী হল মহারাজ?”
মহারাজের মুখে “হ্যাঁ”ও নেই, “না”ও নেই। তিনি বোবা।
রানি আবার জিজ্ঞেস করলেন, “কথা বলছেন না কেন মহারাজ?”
মহারাজের মুখে “ফুস”ও নেই “ফাস”ও নেই। তিনি হাবা।
রানি ব্যাকুল হয়ে রাজার মুখের সামনে হুমড়ি খেয়ে বসে বলে উঠলেন, “মহারাজ, আপনাকে কি ভূতে ভয় দেখিয়েছে?”
ভূতের নাম শুনেই মহারাজ কটমট করে তাকালেন। চোটপাট করে চেঁচিয়ে উঠলেন, “আমি খাব!”
রানি ভড়কি খেয়ে চমকে উঠলেন, “আজ্ঞে!”
“আমি খাব!” তেড়েমেড়ে উত্তর দিলেন রাজা।
রানি কাঁপাকাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলেন, “কী খাবেন হুজুর? আপনি রাতের খাবার খেয়েদেয়েই তো শুয়েছেন। আপনার কি পেট ভরেনি?”
“পেট ভরেছে, কিন্তু মন ভরেনি।” বেশ তিরিক্ষি মেজাজেই রাজা উত্তর দিলেন।
রানি এবার ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কেন হুজুর, রান্না কি ভাল হয়নি?” “হয়েছে।”
“তবে?”
“‘তবে’র উত্তরটা আমি কেন দেব? শুনেছি, অন্য দেশের রাজারা এটা খাব, সেটা খাব বলে বায়না করে। আমি কি কোনওদিন করেছি? না, করি? আমি সে মিঁয়া নই যে চেয়ে খাব! এই যে এখন আমার পোস্তর বড়া খেতে ইচ্ছে করছে, এটা কি আমি বলেছি? এই যে আমার পোস্তর বড়ার জন্যে চোখে ঘুম আসছে না, আমি যে শুকনো খাটে তখন থেকে গড়াগড়ি খাচ্ছি, একথাটা কি আমার বলা সাজে? ছিঃ! আমি না রাজা! যাক, যা হবার হয়ে গেছে, এখন ব্যবস্থা করো!” বলে, রাজা কাক্কাবোক্কা মুখে একটা ফুস করে শ্বাস ছাড়লেন।
রানি আঁতকে উঠলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “আজ্ঞে মহারাজ, পোস্তর বড়া আপনি ক’খানা খাবেন?”
রাজা বললেন, “য’খানা পেটে ধরে।”
রানি ঢোঁক গিললেন। গিলতে গিলতে উত্তর দিলেন, “মহারাজ, য’খানা আপনার পেটে ধরে, ত’খানা করতে যে রাতখানা কাবার হয়ে আকাশখানা ভোর হয়ে যাবে। তাই বলছিলুম কী, আজ রাতটা ঘুমিয়ে পড়ে কালটা অবধি অপেক্ষা করা যাবে না?”
রানির কথা শুনে ব্যাজার মুখ রাজার!
রাজার সেই ব্যাজার মুখ দেখে রানি আর কথা বাড়ালেন না। রাতভর পোস্তর বড়া ভেজে, রাজাকে খাইয়ে তুষ্ট করে তবে নিশ্চিন্তি। আর সত্যি বলতে কী, এই গোঁয়ার্তুমির জন্যেই মন্ত্রীর সঙ্গে যখন তখন খটামটি লেগে যায় তাঁর।
কিন্তু আজ সেই রাজাই যখন মন্ত্রীর সঙ্গে খোশমেজাজে গুজুরগুজুর-ফুসুরফুসুর করেন, তখন আশ্চর্য না-হয়ে পারা যায়? কী ফন্দি আঁটছেন তিনি? কী দুর্বুদ্ধি এল মাথায়?
দুর্বুদ্ধিই তো! বায়না-টায়না করলে, তবু সে একরকম। যা হোক করে ঠেকানো যায়। কিন্তু রাজাবাদশার মাথায় দুর্বুদ্ধি এলে তাকে সামাল দেবে কেমন করে?
কেন, কী হল? ব্যাপারটা কী?
ব্যাপারটা ভয়ানক রকম গোলমেলে। খোশমেজাজে গুজুরগুজুর করতে করতে তিনি ফস করে বলে বসলেন, “মন্ত্রীমশাই, আমার বদলে আপনি রাজা হবেন?”
ব্যাস! কথাটা রাজা কাক্কাবোক্কার মুখ টসকে বেরোবার সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রীমশায়ের চোখ চমকে রাজামশায়ের মুখের ওপর ঠিকরে পড়ল।
মন্ত্রীমশায়ের চমকানি দেখে রাজা কাক্কাবোক্কা হেসে কুটিপাটি। হাসতে হাসতে মন্ত্রীর পিঠে চড়াং করে একখানা চাপড় মেরে বলে উঠলেন, “এ কী মশাই, রাজা হওয়ার নাম শুনেই কেঁচোর মতো গুটিয়ে গেলেন!”
মন্ত্রীমশাই জানেন, এখনই একটা যাহোক-তাহোক উত্তর না-দিলে রাজার মুখের হাসি খিঁচড়ে তো যাবেই, তার সঙ্গে উলটো-পালটা কিছু ঘটে যাওয়াও আশ্চর্যের নয়। সুতরাং কিছু একটা বলার জন্যেই তিনি গড়গড় করে বলে গেলেন, “পৃথিবীতে নিত্য কত অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে বলুন। এই দেখছেন, আকাশভর্তি ঝাঁঝাঁ রোদ্দুর, পরক্ষণেই দেখছেন, আকাশে ঝামরানো কালো মেঘ। এই দেখছেন, গাছভর্তি ফুল ঝলমল করছে, পরক্ষণেই দেখছেন, মৌমাছি ফুলে ফুলে গুনগুন করছে।”
মন্ত্রীর মুখে এমন গোলমেলে কথা শুনে রাজা কাক্কাবোক্কা প্রথমটা কেমন যেন ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন। থমকে গেলেন মুহূর্তের জন্যে। তারপরেই গলা ফাটিয়ে হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতে বলে উঠলেন, “আপনি মশাই একটি ঢ্যাঁড়শ!”
হাসতে হাসতে রাজামশাই যে তাঁকে আচমকা এমন একটা অপমানজনক কথা বলবেন, এটা মন্ত্রীমশাই একেবারেই ভাবতে পারেননি। ভেতরে ভেতরে তিনি যারপরনাই ক্ষিপ্ত হয়ে কটমট করে রাজার মুখের দিকে তাকালেন। তাকাতেই রাজামশাই হাসতে হাসতেই বললেন, “ঢ্যাঁড়শই তো। জিজ্ঞেস করলুম রাজা হবেন কি না, অমনি শুরু করে দিলেন ভুল বকতে!”
মন্ত্রীমশাই আর অপমান সহ্য করতে পারলেন না। তিনিও শুনিয়ে দিলেন, “আমাকে ঢ্যাঁড়শ বললে আপনাকেও একটি কথা বলা যায়!”
“কী বলা যায় শুনি!”
মন্ত্রী উত্তর দিলেন, “সে-কথা আপনার শোনার কথা নয়।”
রাজা ব্যঙ্গ করে বললেন, “সে আবার কী রকমের কথা, বলা যায় অথচ আমার শোনা যায় না?”
মন্ত্রী জবাব দিলেন, “সে একরকমের কথা।”
রাজা কাক্কাবোক্কা এবার গলাটা একটু গম্ভীর করে বললেন, “সেই একরকমের কথাটাই আমি শুনতে চাই। বলুন।”
মন্ত্রীও কম যান না। তিনিও গলাটা কুসুমকুসুম গরম করে বললেন, “আমিও সেই একরকমের কথাটা শোনাতে চাই না। থামুন।”
রাজা রাগলেন। বললেন, “আপনি তো আচ্ছা বে-আক্কেলে মন্ত্রী! আমার কথা অমান্য করেন!”
“আপনিই বা কেমন সমজদার ব্যক্তি যে, আপনার বদলে মন্ত্রীকে রাজা হতে বলেন!”
এই যাঃ। বুঝি লেগে গেল জোর কথা কাটাকাটি!
না, লাগল না। আশ্চর্য, রাজা কাক্কাবোক্কাই সামলে গেলেন। নিজের ঠোঁটে আঙুল ঠেকিয়ে শব্দ করলেন, “ইসসস!”
মন্ত্রী থমকে গেলেন।
রাজা চাপা গলায় কড়কে উঠলেন মন্ত্রীকে, “চেঁচাচ্ছেন কেন? বলছি একটা গোপন কথা। আর আপনি পাড়া মাথায় করছেন!”
মন্ত্রীও সঙ্গে সঙ্গে গলা সামলে বলে উঠলেন, “গোপন কথাটা কী, আপনি না-বললে আমিই বা জানব কেমন করে!”
রাজামশাই নিজের কণ্ঠস্বর এবার আরও নামিয়ে ফিসফিস করে বললেন, “গোপন কথাটা হল, রানিকে নিয়ে একটু রগড় করব! আর সে-কাজে আপনি হবেন আমার সঙ্গী।”
মন্ত্রী আঁতকে উঠলেন, “আজ্ঞে আমি? আমাকে ছাড়ান দিন মহারাজ!”
“উফ!” রাজা বিরক্ত হলেন, “আপনাকে নিয়ে পারা যায় না মশাই। ভয়ে এমন কোঁতাচ্ছেন, যেন আপনার গর্দান নেওয়ার হুকুম দিয়েছি। আরে মশাই, রগড় কথাটার মানে বোঝেন না?”
“বুঝি।”
“তবে ভয় পাবার কী আছে?”
মন্ত্রীমশাই এবার ঢোঁক গিললেন। বললেন, “আজ্ঞে মহারাজ, রানিমার সঙ্গে আপনি রগড় করবেন, এর চেয়ে ভাল খবর আর কী হতে পারে! করুন, যত ইচ্ছে করুন, সব রাজাবাদশাই রানির সঙ্গে তাল পেলেই রগড় করেন। কিন্তু মহারাজ, আমার মতো অসহায় মানুষকে তার সঙ্গে জড়ানোটা কি শোভা পায়?”
“শোভা পায়, কি পায় না সেটা আমি বুঝব। আমি রাজা। আমার আদেশ আপনাকে মানতে হবে।”
“এই খেয়েছে!” মন্ত্রীমশাই ভয়ে ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন।
এবার রাজা কাক্কাবোক্কা সত্যি-সত্যি ধমক দিলেন মন্ত্রীকে। বললেন, “আপনি মশাই কোনও কম্মের নন। সব কথা না-শুনেই ভাতের ফ্যানের মতো ফতফত করে উথলে ওঠেন।”
মন্ত্রীমশাই উত্তর দিলেন, “আজ্ঞে সব কথার সবটাই তো আমার শোনা হয়ে গেছে।”

“কী শুনেছেন?”
“আমাকে রাজা হতে হবে।”
রাজা বললেন, “আরে মশাই আপনাকে কি আর চিরদিনের জন্যে রাজা হতে বলা হচ্ছে!”
“তবে?”
“আপনি রাজা হবেন একদিনের জন্যে।”
“একদিনের জন্যে কেন?” মন্ত্রীর গলায় কাশি এসে গেল। তিনি খকখক করে উঠলেন।
রাজা বললেন, “সেইটাই তো রগড়।”
“এ আবার কেমন রগড়?” মন্ত্রীর কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম দেখা গেল।
রাজা বললেন, “তবে শুনুন রগড়টা কেমন, আপনি একদিনের জন্যে রাজা হবেন। একদিনের জন্যে সিংহাসনে বসবেন। সিংহাসনে বসে, একদিনের জন্যে আপনি রানিকে কয়েদ করার হুকুম দেবেন।”
মন্ত্রীমশাই লাফিয়ে উঠলেন, “উরি বাবা!” মন্ত্রীমশায়ের কপাল দিয়ে ঝরঝর করে ঘাম ঝরতে লাগল। চোখে অন্ধকার দেখলেন। তিনি চিৎকার করে বলে উঠলেন, “এ কাজ আমার দ্বারা হবে না মহারাজ। এ-রগড় আপনি নিজেই করুন।”
রাজা এবার ভীষণ বিরক্ত হলেন। বললেন, “আপনার মতো ভোঁতাবুদ্ধির মন্ত্রীর আমার দরকার নেই। আপনি মন্ত্রিত্ব ছেড়ে বিদায় নিতে পারেন। কোন দেশের কোন রাজা নিজের মুখে নিজের রানিকে কয়েদে পাঠায় মশাই? এ কাজটা আপনাকেই করতে হবে। নইলে কাটুন!”
রাজার মুখে “কাটুন” শুনেই মন্ত্রীর বুকটা ধক করে উঠেছে। তিনি প্রায় কাঁদো-কাঁদো গলায় বলে উঠলেন, “মহারাজ, রানিমার মতো এমন একজন লক্ষ্মীমন্ত মানুষকে বিনা কারণে কয়েদে পুরলে সে কি ধর্মে সইবে? কেন তাঁকে কয়েদ করা হবে সেটা তো প্রজারা জানতে চাইবে।”
রাজা উত্তেজিত হয়ে বললেন, “আপনি আমাকে বুদ্ধু ভাবছেন? কারণ ছাড়া আমি আপনাকে রাজা হয়ে রানিকে কয়েদ করতে বলছি?”
“কী কারণ হুজুর?”
“চুরি।”
মন্ত্রী থতমত খেয়ে বলে উঠলেন, “রানিমাকে চোর বানিয়ে আপনি রগড় করবেন? ছিঃ! কী চুরির দায়ে তাঁকে চোর বলা হবে?”
“আমসত্ত্ব।”
মন্ত্রী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলেন, “আমসত্ত্ব! আপনি কি বলতে চান রানিমা আমসত্ত্ব চুরি করেন?”
রাজা উত্তর দিলেন, “শুধু চুরি করেন না, চুরি করে খান।”
মন্ত্রী এবার রাজার কথা শুনে হাঁদা! তিনি বললেন, “সে কী মহারাজ, রানিমা নিজের ভাঁড়ার থেকে নিজের ইচ্ছেয় আমসত্ত্ব খাবেন, এতে চুরির কথা ওঠে কেমন করে? এটা কি একটা অপরাধ হল?”
রাজা কাক্কাবোক্কা এবার খুব চটিতং। বললেন, “আপনি একটি বুদ্ধির ঢেঁকি। আরে মশাই বলছি রগড়, আপনি খুঁজছেন অপরাধ। আমসত্ত্ব চুরিটা কি রগড়ের মধ্যে পড়ে না?”
মন্ত্রী উত্তর দিলেন, “কিন্তু মহারাজ, রাজপ্রাসাদের রানিকে আমসত্ত্ব চুরির মিথ্যে দোষারোপ করে কয়েদ করার রগড়টা যে ভয়ংকর রগড়।”
রাজা কাক্কাবোক্কা এবার হল্লা শুরু করে দিলেন, “আমি রাজা, আমার আদেশ আপনি অক্ষরে-অক্ষরে পালন করতে বাধ্য। আর যদি পালন না-করেন, আপনাকেই কয়েদ করব।”
মন্ত্রী আঁতকে আর্তনাদ করে উঠলেন, “ওরে বাবারে, দয়া করে আমায় কয়েদে পুরবেন না হুজুর। আমাকে একটা দিন ভাববার সুযোগ দিন!”
রাজা সম্মতি দিলেন। বললেন, “ঠিক আছে, ভাবুন। কিন্তু কথাটা ফাঁস না হয়ে যায়।”
“না হুজুর, ফাঁস কেন হবে। সে সম্পর্কে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।” বলে, মন্ত্রী সেখান থেকে কেটে পড়লেন। তারপর মনে মনে অন্য একটা ফন্দি আঁটলেন। ফন্দি এঁটে চুপিচুপি রানির সঙ্গে দেখা করতে গেলেন। রানির ঘরের দোরে টোকা দিয়ে চুপিসারে ডাকলেন, “রানিমা গো, রানিমা!”
রানিমা সাড়া দিলেন, “কে ডাকেন?”
“আমি, মন্ত্রী ডাকি। আপনাকে দুটো দরকারি কথা বলার আছে।”
রানিমা ব্যস্ত হয়ে ঘরের ভেতর থেকেই বললেন, “আসুন! আসুন!”
শুকনো মুখে মন্ত্রী দরজা ঠেলে রানির ঘরে ঢুকলেন।
রানিমা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার? অসময়ে?”
মন্ত্রীমশাই চারদিক দেখেশুনে অতি সাবধানে বললেন, “ব্যাপারটা ভয়ংকর। তাই অসময়েই ছুটে আসতে হল আপনার কাছে।”
“ভয়ংকর?” রানিমা অবাক হলেন।
“আজ্ঞে হ্যাঁ রানিমা, আমি ভয়ংকর বিপদে পড়েছি। আপনি ছাড়া আমাকে রক্ষা করার আর কেউ নেই।”
“কী হয়েছে?” রানিমা অবাক হয়েই জিজ্ঞেস করলেন।
মন্ত্রীমশাই ভয়ে কুঁকড়ে উত্তর দিলেন, “রানিমা, কথাটা খুবই গোপন। রাজামশাই জানতে পারলে আমার গর্দান যাবে।”
“কী ব্যাপার বলুন তো? কী এমন কথা যে, বলতে আপনি এত ভয় পাচ্ছেন?”
মন্ত্রী বললেন, “কথাটা খুবই অসম্মানজনক। রাজামশাই আপনাকে কয়েদ খাটিয়ে আপনার সঙ্গে রগড় করতে চান।”
“কেন?” রানি খুব কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন।
“আপনি নাকি আমসত্ত্ব চুরি করে খান, তাই।”
এবার রানিমা আর থাকতে পারলেন না। মন্ত্রীমশায়ের মুখের থেকে এক ঝলকে চোখ সরিয়ে প্রাণ খুলে হেসে উঠলেন। হাসতে হাসতে বললেন, “এই কথা! কিন্তু এতে আপনার তো ভয় পাবার কিছু নেই।”
“আছে রানিমা, আছে।” কথা বলতে গিয়ে মন্ত্রীমশায়ের গলার স্বর যেন গলা থেকে বেরোতে চায় না। তিনি সেই শুকনো গলায় অনেক কষ্টে ফিসফিসিয়ে বললেন, “রাজামশাই বলেছেন, নিজের মুখে নিজের রানিকে শাস্তি দেওয়া ভাল দেখায় না বলে, তিনি আমাকে একদিনের জন্যে রাজা করে দেবেন। রাজা হয়ে আপনাকে শাস্তি দেওয়ার হুকুম আমাকেই দিতে হবে। এতে নাকি আপনাকে নিয়ে খুব একটা রগড় হবে। আচ্ছা, আপনিই বলুন, কোন আক্কেলে এমন অধর্মের কাজ আমি করি? না, রানিমা না, এ-কাজ আমার দ্বারা হবে না। আপনি আমাকে বাঁচান।” বলে, মন্ত্রীমশাই দু’হাত জোড় করে রানির সামনে ভেঙে পড়লেন।
রানিমা মন্ত্রীর কথা শুনে কী যেন ভাবলেন মুহূর্তের জন্যে। তারপর বললেন, “না মন্ত্রীমশাই, রাজামশায়ের এই হুকুম আপনার অমান্য করা চলবে না। তিনি যখন আপনাকে রাজা হতে বলছেন, তখন আপনি নিশ্চয়ই রাজা হবেন। একদম আপত্তি করবেন না। আমাকে কয়েদ করার হুকুমও দেবেন। কিন্তু রাজামশাইকে জব্দ করার জন্যে আমিও সেই হুকুম মানব না। আর আমি যতক্ষণ না আপনার হুকুম মানছি, ততক্ষণ আপনিও সিংহাসন ছাড়বেন না। একবার সিংহাসন দখল করতে পারলে আপনার কত ক্ষমতা। আপনার কথা তখন কে ফেলবে! তখন রাজামশায়েরও কিছু করার থাকবে না। আমাকে নিয়ে রগড় করা তখন তাঁর বেরিয়ে যাবে। না, না, আপনি রাজি হয়ে যান! দেখুন না তারপর কী হয়।”
শেষমেশ তাই হল। যে-হেতু রানিমা সাহস দিয়েছেন, সেই কারণে মন্ত্রীমশাইও রাজি হয়ে গেলেন। বোক্কারাজা কাক্কাবোক্কাও মন্ত্রীর রাজা হওয়ার হুকুম জারি করে দিলেন। মন্ত্রীমশাইও রাজমুকুট মাথায় দিয়ে সিংহাসনে বসে পড়লেন। রাজবাড়ির সৈন্যসামন্ত, পাত্র-মিত্র, রক্ষী-সান্ত্রি তাই না দেখে হাঁ! তার ওপর মন্ত্রী যখন সিংহাসনে বসে আমসত্ত্ব চুরির দায়ে রানিমাকে কয়েদে পাঠাবার হুকুম দিলেন, তখন সবার আক্কেল গুড়ুম।
রাজার বেশে রাজসিংহাসন থেকে মন্ত্রীর হুকুম শুনে পেয়াদা ছুটল রানিমার ঘরে তাঁকে গ্রেপ্তার করতে। একজন নয়, দু’জন নয়, দশ-দশজন পেয়াদার লাঠিসোঁটা নিয়ে সে এক ধুমধাড়াক্কা কাণ্ড! তা, হলে কী হবে, রানিমাকে ধরাই গেল না। তিনি যে কোথায় বেপাত্তা হয়ে গেলেন, কেউ জানতেই পারল না। বসার ঘরে তিনি নেই। শয়নঘরে তিনি নেই। ভাঁড়ার ঘরে, পাকশালে তিনি নেই। মানে তিনি কোত্থাও নেই। সারা রাজবাড়ি তন্নতন্ন করে খুঁজেও তাঁকে পাওয়া গেল না। তখনই রাজামশায়ের মাথায় হাত! এতক্ষণে তাঁর মালুম হল, কাজটা তিনি বোকারামের মতো করে ফেলেছেন! তিনি তড়িঘড়ি মন্ত্রীকে ডাক দিলেন।
ডাক দিলে কী হবে, মন্ত্রী গ্রাহ্যই করলেন না। উলটে বললেন, “দরকার থাকলে তিনিই আমার কাছে আসবেন। এখন আমি রাজা। এই আমার হুকুম।”
মন্ত্রীর এই আস্ফালনের খবর পেয়ে রাজা কাক্কাবোক্কা রেগে টং। তিনি মন্ত্রীর সামনে সত্যিই নিজে হন্তদন্ত হয়ে উপস্থিত হলেন। মন্ত্রী তখন সিংহাসনে বসে। রাজা বললেন, “আমার দয়ায় আপনি রাজা হয়েছেন। আবার আমাকেই আপনি অমান্য করছেন। আপনি এক্ষুনি সিংহাসন থেকে নামুন!”
রাজার কথা শুনে তাচ্ছিল্যে মুখ ঘুরিয়ে নিলেন মন্ত্রী। বললেন, “খেপেছেন, আমার হুকুম মতো যতক্ষণ না রানিমার শাস্তি হচ্ছে, ততক্ষণ সিংহাসন ছাড়ছি না আমি।”
রেগে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে রাজা গর্জে উঠলেন, “রানিকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। তাঁকে শাস্তি দিতে হবে না। আপনার হুকুম আপনি ফিরিয়ে নিন!”
মন্ত্রীও কম যান না। তিনিও রাজার মুখের ওপর বলে দিলেন, “আমার হুকুম ফিরিয়ে নেওয়ার হুকুম দেওয়ার আপনি কে?”
রাজাও কড়কে উঠলেন, “আমি রাজা কাক্কাবোক্কা।”
মন্ত্রীও চোটপাট করে উঠলেন, “কে বলেছে আপনি রাজা? এখন আপনি ফক্কা! রাজা আমি! এখন আমার হুকুম মতো সব কাজ হবে।”
রাজা চোখ পাকালেন। বললেন, “আমার হুকুমে আপনি সিংহাসনে বসে আমায় ফক্কা বলছেন। আপনার আস্পদ্দা তো কম নয়! এখন আমার হুকুমেই আপনাকে সিংহাসন ছাড়তে হবে।”
মন্ত্রী ঠোঁট ওলটালেন, বললেন, “এ কি মামার বাড়ির আবদার পেয়েছেন? জানেন, এখন যদি আমি আদেশ দিই আপনাকেই রাজবাড়ি ছাড়তে হবে! এখন সিংহাসন আমার। আমার বিরুদ্ধে যে যাবে তাকেই দেব কোতল করে! আমাকে আর বিরক্ত করবেন না। আপনি এখন আসতে পারেন।” বলে রাজাকে বিদেয় হতে বললেন।
রাজা কাক্কাবোক্কা এবার একদম কাবু। এই রে, সিংহাসনটা বুঝি সত্যি-সত্যি হাতছাড়া হয়ে গেল! তাই, তিনি আর মন্ত্রীকে না-ঘাঁটিয়ে তাঁকে তোয়াজ করতে লাগলেন। বললেন, “বড্ড ভুল হয়ে গেছে মন্ত্রীমশাই। এমন ভুল আর কক্ষনও হবে না। আমি হুকুম ফিরিয়ে নিচ্ছি।”
মন্ত্রী বেশ মেজাজ দেখিয়েই উত্তর দিলেন, “মুখে ওকথা বললে হবে না। আগে রানিমাকে খুঁজে আনুন। তিনি যা বলবেন, তা-ই হবে।”
মন্ত্রীকে তোয়াজ করলে আর যে তেমন ফল পাওয়া যাবে না, একথা বুঝতে দেরি হল না রাজা কাক্কাবোক্কার। তবু ভাল যে মন্ত্রী বলেছেন, রানিমা যা বলবেন তা-ই হবে। সুতরাং রানিকে খুঁজে বার করাটাই এখন প্রধান কাজ। যতক্ষণ না তা হচ্ছে ততক্ষণ বসে বসে আঙুল চোষো! হায়! হায়! বে-আক্কেলের মতো এমন কাজ করে!
সুতরাং রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীর কাছ থেকে বিরসবদনে বিদায় নিয়ে রাজবাড়ি তোলপাড় করে রানিকে খুঁজতে লাগলেন। রাজবাড়ি মানে তো আর একটুখানি নয় যে, বললুম আর এমুড়ো-ওমুড়ো ঘুরতে ঘুরতে রানিকে খুঁজে বার করলুম! খুঁজতে খুঁজতে জান বেরিয়ে যাবে। আর, রাজার হলও সেই দুর্দশা। হায় রে! কোথায় রানি!
শত চেষ্টা করেও যখন রানিকে খুঁজে পাওয়া গেল না, তখন তিনি প্রায় কেঁদেই ফেলেন। পাছে সবার সামনে তাঁর চোখের জল গড়িয়ে পড়ে, তাই তিনি লজ্জা সামাল দিতে ছুটলেন ছাদের ওপর চিলেকোঠায়। আহা, এমন নিরিবিলি জায়গা ভূভারতে আর বুঝি কোত্থাও নেই। মস্ত রাজবাড়ির সাতশো সিঁড়ি ভেঙে তিনি যখন সাততলায় উঠলেন, তখন তাঁর চোখ ঝাপটে ঝরঝর করে জল গড়াচ্ছে। চিলেকোঠার ভেতরে ঢুকেই তিনি দিলেন দরজায় আগল লাগিয়ে। অমনই ঘরের ভেতর নেমে এল ঘুরঘুট্টি অন্ধকার!
ঘুরঘুট্টি অন্ধকার চিলেকোঠায় তখন সে আর এক কাণ্ড!
কী কাণ্ড? কী কাণ্ড?
তখন রাজা কাক্কাবোক্কার কোথায় কান্না, কোথায় কী! তাঁর চোখের জল চোখেই গেল আটকে! তাঁর বুকের ধুকধুকি বুঝি থমকে থেমে যায়! আঁতকে উঠে তিনি কাঁপতে থাকেন! কেন, কী হল?
ঘরের ভেতর কে যেন তুততুড়ি কাটল! তুড়-ড়-ড়! ভূত নাকি রে বাপ! রাজা কাক্কাবোক্কা ভয়ে চিৎকার করে উঠলেন, “কে-এ-এ!”
অমনই সে নাকি সুরে হেসে উঠল, “হিঁ-হিঁ-হিঁ!
রাজা আর্তনাদ করে উঠলেন, “বাঁচাও-ও-ও!”
অমনই খ্যানখ্যানে গলায় কে যেন গেয়ে উঠল:
চিঁলেকোঁঠায় চিঁল,
পিঁঠে মাঁরছে ঢিঁল!
ঘুঁলঘুঁলিতে প্যাঁচা,
চাঁরদিকেতেঁ ছ্যাঁ-ছ্যাঁ!
মিঁথ্যে মঁজার সাঁজা,
নিজেঁই পেঁলেন রাঁজা।
ধুঁলোয় মেঁশে মাঁন,
কুঁলোয় হাঁওয়া খাঁন।
ওমা, বলতে-না-বলতেই কে উঠল হেসে খিলখিল করে! ওমা, কার হাসি এমন মিষ্টি! কে সামনে দাঁড়িয়ে রাজার!
রাজা পড়িমরি করে দিলেন ঘরের আগল খুলে। আকাশ-আলো ঝাঁপিয়ে পড়ল ঘরের ভেতর। সঙ্গে সঙ্গে আলো পড়ল কার মুখের ওপর! উনি কে? এ যে রানি!
তাঁকে দেখেই রাজা আনন্দে হা-হা করে হেসে উঠলেন। চেঁচিয়ে উঠলেন “খুঁজে পেয়েছি, খুঁজে পেয়েছি, আমি রানিকে খুঁজে পেয়েছি।” বলতে বলতে রাজা সাততলা থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে একতলায় নেমে পৌঁছে গেলেন একেবারে মন্ত্রীর সামনে। রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীকে কিছু বলার আগেই মন্ত্রীই সিংহাসন ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে গলা চড়ালেন:
রাজার নাকে মাছি,
আমি এবার নাচি!
তারপর শুরু হয়ে গেল সত্যি-সত্যি নাচ-গান হল্লা!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন