শৈলেন ঘোষ

একটা ছিল ছাগলছানা, আর তার ছিল এক বন্ধু বেড়ালছানা। দুটিতে খুব ভাব। বেড়ালছানার গলায় ছিল একটা ঘণ্টা। ছোট্টমতো। ছানাটা যখনই হাঁটত, ঘণ্টা বাজত, টুং টাং। যখনই ছুটত, ঘণ্টা বাজত, টুং-টুং-টুং।
একদিন খুব সকাল-সকাল বেড়ালছানার ঘুম ভেঙে গেল। ঘুম থেকে উঠে সে ছুটল ছাগলছানার বাড়ি। গিয়ে বলল, “ছাগলছানা, ছাগলছানা, চ বেড়াতে যাই।”
সেদিনের সকালটা যেন আর ক’দিনের চেয়েও সুন্দর। আলো-ভর্তি আকাশ। গাছ-ভর্তি ফুল। হাওয়া-ভর্তি গন্ধ। আঃ! ছাগলছানার মনটাও যেন বেড়াই বেড়াই করছে! আর কী দোনোমনো করে সে! বেড়ালছানার কথা শুনে একেবারে মাথা হেলিয়ে বললে, “হ্যাঁ চ, এক্ষুনি চ।”
দুটিতে বেড়াতে বেরোল।
দুটিতে বেড়াতে বেড়াতে যখন অনেকটা পথ পেরিয়ে এসেছে, তখন তাদের সামনে পড়ল একটা ঝিল। ঝিলের জল না তো, যেন কাচ। ঝিকঝিক করছে। ছাগলছানা আর বেড়ালছানা দাঁড়িয়ে পড়ল। দাঁড়িয়ে দেখে কী, জলের বুকে মাছ আর মাছ। সাঁতার কাটছে, ডুব দিচ্ছে, পাখনা দোলাচ্ছে, নাচছে। ছাগলছানাটার এত ভাল লেগে গেল তাই দেখে যে, সে বলেই ফেলল, “বেড়ালছানা, দ্যাখ, দ্যাখ কী সুন্দর!”
ওমা, বেড়ালছানাটা কোথায় সায় দেবে, তা না, ঠোঁট উলটিয়ে, মুখ ঘুরিয়ে নিলে। বললে, “সুন্দর, না হাতি।” অমনি তার গলার ঘন্টাটাও টুং টুং করে বেজে উঠল।
ছাগলছানা বললে, “কেন বাবা, আমার তো বেশ লাগছে।”
আবার দুটিতে হাঁটতে লাগল।
একটুখানি হাঁটতেই সামনে একটা ফুলবাগিচা। দেখতে পেয়েই, ছাগলছানা তড়বড়িয়ে ছুটল তার ভেতরে। বেড়ালছানা হনহনিয়ে হাঁটল তার পেছনে। ফুলবাগিচায় যত ফুল, তত মৌমাছি। যত মৌমাছি, তত প্রজাপতি। অবাক হয়ে দেখতে দেখতে ছাগলছানা বললে, “বেড়ালছানা, বেড়ালছানা, ফুলে ফুলে কত রং দেখছিস? মিষ্টি মিষ্টি গন্ধ পাচ্ছিস? কী ভাল!”
ওমা! বেড়ালছানাটা নাক সিটিয়ে বললে, “ছাই, ভাল না আর কিছু! এর চেয়ে স্বপ্ন দেখতে অনেক ভাল!”
“স্বপ্ন!” যেন চমকে উঠল ছাগলছানাটা! যেন কথাটা এই প্রথম শুনল ছাগলছানা। তাই জিজ্ঞেস করলে, “বেড়ালছানা, বেড়ালছানা, স্বপ্ন কী রে?”
ছাগলছানার কথা শুনে বেড়ালছানা হাসতে হাসতে যায় আর কী! খিলখিল করে তার সে কী হাসি! তার হাসি শুনে, গাছের ছোট পাখি, বড় পাখি ভয়ে ফুড়ু-ত ফুড়ু-ত উড়ে পালাল। আর ছাগলছানাও ভ্যাবলার মতো চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগল। তারপর বেড়ালছানার হাসি যখন থামল, তখন ছাগলছানা জিজ্ঞেস করলে, “বেড়ালছানা, অমন করে হাসলি কেন রে?”
বেড়াল বললে, “তোর কথা শুনে!”
ছাগল বললে, “কেন, কী এমন হাসির কথা বলেছি যে, তুই একেবারে হাসতে হাসতে আহ্লাদে গড়িয়ে পড়লি? জানি না, তাই জিজ্ঞেস করেছি।”
বেড়ালছানা আবার হেসে উঠল। বলল, “তুই কী বোকা রে! কাকে স্বপ্ন বলে জানিস না? তুই কোনওদিন স্বপ্ন দেখিসনি? এ ম্যা! আমি রোজ দেখি!”
“কোথায় দেখিস?”
“কেন, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে।”
অবাক হল ছাগলছানা। জিজ্ঞেস করল, “ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে আবার দেখা যায় নাকি! ঘুমুলেই তো চোখ বন্ধ!”
“হ্যাঁ রে বাবা, হ্যাঁ। চোখ বন্ধ মানেই মজার মজার স্বপ্ন।”
“কেমন-কেমন স্বপ্ন, কী দেখিস তুই বেড়ালছানা? ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল ছাগলছানা।
“সে কি আর এক কথায় বলা যায়?”
“বল না, যতটা পারিস বল!”
তখন বেড়ালছানাটা একটুখানি কী ভাবল। তারপর ছাগলছানার মুখের দিকে চেয়ে ফিক করে হেসে ফেললে। হাসতে হাসতে বললে, “তা হলে এইটুকুনি একটা স্বপ্নের কথা তোকে শোনাই। হয়েছে কী একদিন মা গান গাইছিল, আমি শুনছিলুম। শুনতে শুনতে হঠাৎ ঘুম পেয়ে গেল। চোখদুটো যেই ঘুমে ডুবে গেছে, ও মা! দেখি কী, আমি একটা হাতির পিঠে বসে আছি। হাতির পিঠে সোনার তৈরি একটা হাওদা, বসে আছি তার ওপর। আমার সামনে মাহুত। তার মাথায় একটা ঝলমলে পাগড়ি। আর দেখি রাস্তার ওপর এদিক-ওদিক কত সব পল্টন। হাতে হাতে তলোয়ার রোদের আলোয় ঝকঝক করছে। হাতি হাঁটছে। পাশে পাশে তারাও হাঁটছে। হাতির পিঠে দুলতে দুলতে আমিও চলেছি। ও মা! তারপর না কোত্থেকে প্যাঁ পোঁ করে বাজনা বেজে উঠল! দেখি, কতসব বাজনদার হাতির সঙ্গে হাঁটছে আর বাজনা বাজাচ্ছে! সে কী মজা! তারপর হাতিটা মস্ত একটা বাড়ির সামনে হাজির। উরি ব্যাস! কী পেল্লাই! ইয়া বড় বড় থাম। হুই উঁচু দরোয়াজা। শ্বেতপাথর আর শ্বেতপাথর। চারিদিকে শুধু শ্বেতপাথর। চোখ ঝলসে যায়। ও মা! হাতি সেই দরোয়াজার সামনে দাঁড়াতেই দেখি, ক’জন বেহারা একটা চৌদোলা কাঁধে নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতি আমাকে শুঁড় দিয়ে আলতো করে জড়িয়ে ধরে তার ওপর বসিয়ে দিল। অমনি চৌদোলা দুলতে দুলতে বাড়ির ভেতর চলতে লাগল। খানিকটা আসতেই দেখি কী, এক বুড়ো রাজা আমার সামনে দাঁড়িয়ে তার পাকা পাকা গোঁফ, অ্যায়সা পাকানো। সাদা সাদা দাড়ি এই অবধি ঝোলানো। রাজা আমাকে দেখেই ফিক করে হেসে উঠলেন। তারপর আমার গালে টুসকি মেরে আমায় কোলে তুলে নিলেন। আমার গলার ঘণ্টাটা ধরে নাড়া দিলেন। যেই নাড়া দিলেন, অমনি টুং টাং করে তো ঘণ্টা বেজে উঠেছে। বাজতে বাজতে এত জোরে বেজে উঠল যে, আমার কান ঝালাপালা হয়ে গেল। উফ! আমি চমকে উঠেছি। আমার কোথায় ঘুম আর কোথায় কী! আমি ঝটপট চোখ খুলে দেখি, মেঝের ওপর একলাটি আমি শুয়ে আছি, আর একটা কোলাব্যাঙ ঠ্যাং দিয়ে আমার গলার ঘণ্টাটি নাড়ছে। সেটা বাজছে, টুং টাং, টুং টাং। যাঃ! আমার স্বপ্ন দেখা শেষ হয়ে গেল!’

“সত্যি?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল ছাগলছানা।
বেড়াল বললে, “তোকে আমার মিথ্যে বলে লাভ!”
ছাগল বললে, “তা হলে আমি কেন স্বপ্ন দেখি না?”
“কারণ তো নিশ্চয়ই একটা আছে,” উত্তর দিল বেড়ালছানা। তারপর একটু কী ভাবল। ভেবে নিয়ে বলল, “আমার কী মনে হয় জানিস?”
“কী?”
“গলায় ঘন্টা না থাকলে বোধহয় স্বপ্ন দেখা যায় না!”
“তাই বুঝি?”
“হ্যাঁ রে, তা না হলে আমি দেখি, তুই দেখিস না কেন?”
“তা হলে তোর ঘন্টাটা আজ দে না আমায়! স্বপ্ন দেখে, কাল ফেরত দেব।”
বেড়ালছানা ঠোঁট বেঁকিয়ে বললে, “না ভাই, মা বকবে।”
তখন ছাগলছানা বললে, ‘তা হলে চ, ঘরে যাই।’
তারপর বেড়ালছানা আর ছাগলছানা ঘরে ফিরল। ছাগলছানা মা’র কাছে এসে বললে, “মাগো মা, বেড়ালছানা ঘণ্টা পরে ঘুমোয় আর স্বপ্ন দেখে। আমায় ঘণ্টা পরিয়ে দাও, আমি স্বপ্ন দেখব। আমি হাতির পিঠে চাপব।”
ছেলের কথা শুনে ছাগলছানার মা তো হেসে মরে আর কী! বললে, “হাতির পিঠে চাপবি কী রে?”
“বেড়ালছানা যে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চেপেছিল!” উত্তর দিল ছাগলছানা।
ছাগল-মা হাসতে হাসতেই বললে, “চাপেনি রে, চাপেনি। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখেছিল।”
“আমিও ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখব। তুমি আমায় ঘণ্টা এনে দাও! গলায় পরে ঘুমিয়ে পড়ি।”
“আমি কোত্থেকে এনে দেব!”
“আমি জানি না,” বলে ছাগলছানা ঘ্যানঘ্যানানি শুরু করে দিলে।
ছাগল-মা বললে, “জানি না বাপু, ঘণ্টা পরলে স্বপ্ন দেখে, এমন কথা জন্মে শুনিনি।”
“তুমি শোনোনি তো, বেড়াল-মা শুনল কী করে?”
মা বললে, “কী করে শুনল, বেড়াল-মাকে জিজ্ঞেস করগে যা!” বলে ছাগল-মা নিজের মনে ঘাস চিবুতে লাগল।
ছাগলছানা বেড়াল-মা’র কাছে ছুটল। “বেড়াল-মা, বেড়াল-মা তোমার ছেলের গলায় স্বপ্ন-দেখার ঘণ্টা। ঘণ্টা পরে তোমার ছেলে ঘুমোয়, আর স্বপ্ন দেখে। আমিও স্বপ্ন দেখব। হাতির পিঠে চাপব। স্বপ্ন-দেখার ঘণ্টা কোথায় পাওয়া যায় গো?”
বেড়াল-মা বললে, “ছাগলছানা, তুই আবার স্বপ্ন দেখার জন্যে কেন পাগল? ছাগল কী আর স্বপ্ন দেখে!”
ছাগলছানা বললে, “বারে বাঃ! বেড়াল যদি স্বপ্ন দেখতে পারে, ততো ছাগল কেন পারে না? তোমরাও চার পায়ে হাঁটো, আমরাও তো চার পায়ে হাঁটি। তোমাদের তো আর আধখানা পা বেশি দেয়নি ভগবান! জানো তো বাবা বলো না কোথায় পাওয়া যায় ঘণ্টা!”
বেড়াল-মা বললে, “জানি না বাছা! আমি তো আর আকাশে আকাশে উড়ে বেড়াই না যে, ঘণ্টা কোথায় পাওয়া যায় জানব!”
ছাগলছানা ভাবল, তা হলে বোধহয় আকাশে যারা ওড়ে তারাই ঘণ্টার খবর জানে। তাই সে খোলা আকাশের নীচে দিয়ে মুখ উঁচিয়ে ছুটল। ছুটতে ছুটতে একটা ঝাঁকড়ামতো গাছের সামনে এসে দাঁড়াল। ঝাঁকড়ামতো গাছের ছোট্ট একটা ডালে সবুজ সবুজ টিয়াপাখি বসে আছে। পাখি দেখে ছাগলছানা ডাক দিল, “টিয়ারানি, টিয়ারানি!”
টিয়া বলল, “ডাকছিস কেন রে ছাগলছানা?”
ছাগল বলল, “টিয়ারানি, টিয়ারানি, বেড়ালছানার গলায় ঘন্টা। সেই ঘণ্টা পরে বেড়ালছানা ঘুমোয় আর স্বপ্ন দেখে। আমিও স্বপ্ন দেখব। স্বপ্ন দেখার ঘণ্টা কোথায় পাওয়া যায় গো?”
পাখি বললে, “হায় কপাল! ছানা রে ছানা, আমি কি মাটিতে বাস করি যে, ঘণ্টার খবর রাখব!” বলে টিয়াপাখি ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ-ট্যাঁ করে উড়ে পালাল।
টিয়াপাখির কথা শুনে ছাগল ভাবল, তা হলে বোধহয় যারা মাটিতে বাস করে তারাই জানে ঘণ্টার খবর। কিন্তু মাটিতে তো অনেকে বাস করে। কে জানে তা হলে? ভাবতে ভাবতে ছাগলছানা হাঁটতে লাগল। হাঁটতে হাঁটতে ইদিক-উদিক দেখতে লাগল।
“কোঁকোঁর কোঁ, কোঁক কোঁক।”
চমকে উঠেছে ছাগলছানা। চেয়ে দেখে, একটা মোরগ গলা চড়িয়ে ডাকাডাকি করছে। থমকে দাঁড়াল ছাগলছানা। একটু দেখে এগিয়ে গেল তার দিকে। ডাকল, “মোরগমিয়া, মোরগমিয়া!”
মোরগ বললে, “কঁক-ক? কঁক-ক? কিঁক-কি? কিঁক-কি?”
ছাগল বলল, “মোরগমিয়া, মোরগমিয়া, বেড়ালছানার গলায় ঘন্টা। সেই ঘণ্টা পরে বেড়ালছানা ঘুমোয় আর স্বপ্ন দেখে। আমিও স্বপ্ন দেখব। স্বপ্ন দেখার ঘণ্টা কোথায় পাওয়া যায় গো?”
মোরগ বললে, “হায় চাচা! ছাগল রে ছাগল, আমি কি জলে জলে সাঁতার কাটি যে, ঘণ্টার খবর রাখব।” বলে মোরগমিয়া মুখ ফিরিয়ে নিলে। মাটিতে ঠোঁট ঠুকে, পোকা বেছে আপনমনে পেট ভরাতে লাগল।
মোরগমিয়ার কথা শুনে ছাগলছানা ভাবল, তা হলে বোধহয় যারা জলে সাঁতার কাটে তারা বলতে পারবে! তাই ছাগলছানা জল-ঝিল-মিল ঝিলের দিকে হাঁটা দিল। ঝিলের পাড়-বরাবর এসে দেখে, একটা হাঁস সাঁতার কাটছে আর প্যাঁকপ্যাঁক করে ডাকছে।
ছাগলছানা হাঁক পাড়লে, প্যাঁকপ্যাঁক, প্যাঁকপ্যাঁক।”
ছাগলছানার হাঁক শুনে হাঁসটা হাঁসফাঁস করে ডাঙার দিকে এগিয়ে এল। জিজ্ঞেস করলে, “কী রে ছাগলছানা?”
ছাগল বললে, “ও প্যাঁকপ্যাঁক, হাঁস-মা, বেড়ালছানার গলায় ঘন্টা। সেই ঘণ্টা পরে বেড়ালছানা ঘুমোয় আর স্বপ্ন দেখে। আমিও স্বপ্ন দেখব। স্বপ্ন দেখার ঘণ্টা কোথায় পাওয়া যায় গো?”
হাঁস বললে, “হায় বোকারাম! এই কথা! বুদ্ধু রে বুদ্ধু, ঘণ্টা কি জলে ভাসছে যে, আমার কাছে এসেছিস! ধরব আর গলায় পরিয়ে দেব! ঘণ্টা যেখানে আছে, ঘণ্টা সেখানেই পাবি। সেখানে যা! এখানে আমায় বিরক্ত করবি না! বোকারামের বুদ্ধি কবে হবে!” বলে হাঁসটা বিচ্ছিরি মুখ করে, ঝিলের জলে ঝিলিমিলি কাটতে কাটতে মাঝ-বরাবর চলে গেল।
ছাগল তো হাঁসের কথা শুনে হাঁদা। কী যে বলল হাঁসটা, “ঘণ্টা যেখানে আছে সেখানেই পাবি,” মানেই বুঝল না। কেমন যেন হেঁয়ালি হেঁয়ালি! সুতরাং আর কী হবে এখানে দাঁড়িয়ে থেকে, এই ঝিলের পাড়ে। পাড় ছেড়ে সে মাঠে পা দিল। এমন গোঁ তাকে পেয়ে বসল যে, সে মনে মনে ঠিক করে ফেলল, ঘণ্টা না পেলে সে ঘরেই ফিরবে না। স্বপ্ন সে দেখবেই। হাতির পিঠে সে চাপবেই। অগত্যা আকাশ-পাতাল কিছুই ভেবে না-পেয়ে সে হাঁটা দিল।
কোনখানে যাবে,
কোনখানে খাবে,
কার ঘরে শোবে,
জানে না। ভাবে না।
সে হাঁটছে।
হাঁটতে হাঁটতে ধানখেতে পড়ল।
ধানখেত পেরিয়ে যখন পাটখেতে পড়ল, তখনও সে থামল না।
কিন্তু পাটখেত পেরিয়ে আখখেতে পড়তেই, তার খিদে পেয়ে গেল।
আখের রস মিষ্টি-মিষ্টি। ঘাসের স্বাদ মিঠা-মিঠা। আখ খাবে না ঘাস খাবে? এই কথা যেই ভাবা, অমনি দেখে কী, সামনে একটা মাটির ঘর। বাঁশ-কঞ্চির বেড়া দিয়ে চারপাশটা ঘেরা। সেই ঘেরার মধ্যে কচি কচি কলমি শাক, বেগুন গাছ, ছোলার ঝাড়। ছোলা দেখেই ছাগলের নোলা দিয়ে জল গড়াল। ভাবল, ঘাস তো রোজ খাই, আজ ছোলা খাব। এই ভেবে সে বাঁশ-কঞ্চির বেড়ার ধারে চোখ গলিয়ে উঁকি মারলে। বাব্বা! বেড়ার এমন বাঁধুনি যে, একটু ফাঁক পর্যন্ত নেই কোথাও! তাই, এদিক ওদিকে ঘুরছে আর ফাঁকফোকর খুঁজছে! ওমা! দ্যাখো, ছোলাগাছের কচি কচি পাতাগুলো যেন ওর দিকে চেয়ে চোখ মটকে ঠাট্টা করছে! মনে মনে যা রাগান রাগছে না ছাগলছানা! ভাবছে, থামো, একবার ভেতরে ঢুকতে যদি পাই, তো, তোদের চিবিয়ে চিবিয়ে খাই!
আরে, আরে, ও কী, ও কী?
কী?
এতক্ষণ নজরেই পড়েনি! ওই তো বেড়ার গায়ে ফটক খোলা!
হ্যাঁ, তাই তো।
ছাগলছানা ছুটল ফটকের দিকে। সুট করে ফটকের ফাঁক দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। তারপর কুচকুচ করে ছোলা চিবুতে শুরু করে দিলে। পেটটা যখন ভরে ভরে এসেছে, তখন—
“ও বুড়ি, ও বুড়ি, বাগানে ছাগল! গেল রে, সব গেল!” কে যেন চেঁচিয়ে উঠল।
ছাগলছানার পিলে গেছে শুকিয়ে! চেয়ে দেখে, তার সামনে ঠেঙা হাতে এক বুড়ো দাঁড়িয়ে! এই দিল বুঝি কষিয়ে! আর দাঁড়ায়! মার ছুট। যেই না ছুট মেরেছে, সামনে এক বুড়ি দাঁড়িয়ে রয়েছে! ছাগলছানা সঙ্গে সঙ্গে উলটোদিকে টপকা মেরে দে হাওয়া।
“পালাল, পালাল!” চেঁচিয়ে উঠল বুড়ি।
“পালাল, পালাল!” চেঁচিয়ে ওঠে বুড়ো।
বুড়ি বাঁদিকে যায়।
ছাগলছানা ডাইনে পালায়।
বুড়ি ডাইনে হেলে।
ছাগলছানা সামনে ভাগে।
শেষে, সেই বেড়ার ভেতর বুড়ো আর বুড়ির সঙ্গে ছাগলছানার চোরপুলিশে খেলা শুরু হয়ে গেল।
বিপদ যখন ঘোরাল হয়ে উঠল, ছাগল যখন না-পারল পালাতে, না বেড়া ডিঙোতে, তখন ছাগলছানা প্রাণের ভয়ে ঢুকে পড়ল বুড়ো বুড়ির মাটির ঘরে। কিন্তু বুড়োও ছাড়ে না, বুড়িও হারে না। তারাও ঘরে ছুটল! তাদের দেখে ছাগলছানা তক্তাপোশে লাফ মারল। যাঃ! পা ফসকাল! কুঁজো ভাঙল! জল থই-থই ঘর ভাসল! জলের ওপর যেই না-ছোটা, পা পিছলে দুম ফটাস! হাঁড়ি ভাঙল। ফেন গড়াল। বাসন ছড়াল। একেবারে নৈরেকার কাণ্ড!
তখন বুড়ো হাঁপাচ্ছে। বুড়ি কোঁকাচ্ছে। এই বয়সে কখনও পারে, একটা ছানা-ছানা ছাগলের সঙ্গে? বুড়ো তখন বললে, “বুড়ি, বুড়ি, দে ঘরের দরজা ভেজিয়ে।”
বুড়ি তখন পড়ি-মরি করে ঘরের দরজা ঠেলতে গেছে। আর যাবে কোথায়? ভাতের ফেনে পা পড়েছে! চিতপটাং! ছাগল কী আর দাঁড়ায়? বুড়ির ঘাড়ের ওপর দিয়ে ভোঁ-কাট্টা! ঘর পেরিয়ে, বেড়া ডিঙিয়ে দে ছুট! তাই না দেখে, ফ্যালফেলিয়ে বুড়ো বুড়ির দিকে চায়, বুড়ি বুড়োর দিকে তাকায়!
এদিকে ছাগলছানা, সে তখনও ছুটছে। ভাবছে, বুড়ো বুঝি আসছে! ছাগল তো! যেমন বোকারাম, তেমনি ভিতুর একশেষ!
ছুটতে ছুটতে সকাল কখন চলে গেল, সে জানল না। দুপুর কখন গড়িয়ে গেল, সে দেখল না। বিকেল কখন ফুরিয়ে গেল, সে বুঝল না। তারপর দিনের আলো যখন হারিয়ে গেল, তারা ফুটল আকাশে, তখন মায়ের জন্যে তার মন কেমন করে উঠল! কিন্তু মন কেমন করলে কী হবে? এ কোথায় এসে পড়েছে ছাগলছানা? তাই তো! জায়গাটা চেনাও নয়, জানাও নয়! এ যে দেখি আঁধার-ঘেরা গভীর বন! কী হবে? এখান থেকে বাড়ি যে কোনদিকে তাও তো ঠাওর করতে পারে না ছাগলছানা! যাঃ! যাঃ! হারিয়ে গেছে ছাগলছানা! গভীর বন ছমছম, ভয়-ভয়! তাই না-পারে কাউকে ডাকতে, না-পারে কাঁদতে। বাঘ যদি হালুম করে হাঁক পেড়ে ঘাড়ে পড়ে! উফ! ভাবলেই হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যায়।
“হুক্কা-হুয়া!” এই রে! আচমকা একটা শেয়াল ডাকল। এবার নির্ঘাত শেয়ালের পেটে যেতে হবে ছাগলছানাকে।
“হুক্কা-হুয়া!” চমকে উঠেছে ছাগলছানা। মনে হল, ক’হাত দূরে যেন শেয়ালটা তাকে দেখে তাক করছে। আর দাঁড়ায়। ছাগল মারল একলাফ! ঝপাং করে এক ঝোপের মধ্যে। পড়েই, তার চক্ষু ছানাবড়া! দেখে কী, এটা তো ঝোপ নয়, একটা মন্দির। ওই তো, শিবঠাকুর বসে আছেন। ছাগলছানা ছুটে গেল ঠাকুরের পেছনে। লুকিয়ে পড়ল চোখের পলকে। লুকিয়ে লুকিয়ে ঠাকুরকে ডাকতে লাগল, “হে ঠাকুর, আমাকে বাঁচাও!”
“হুক্কা-হুয়া!” শেয়ালটা আবার ডাকল।
ছাগলছানা ভাবল, “এখন ডাকুক, যত পারে ডাকুক। এখন আর আমায় ধরতে হচ্ছে না। এখন তো আর আমি একা নই। শিবঠাকুর আছেন। ঠাকুরের কাছে আর শেয়ালকে আসতে হচ্ছে না!”
হ্যাঁ, সত্যি। শেয়ালটা তো আর হাঁকছে না। তা হলে বোধহয় ভেগে পড়েছে। তাই বলে এখনই কিন্তু বেরিয়ে পড়া ঠিক না। অন্ধকারটা যাক, সকাল আসুক, তারপর। সেই ভাল।
কিন্তু এখন, এই অন্ধকারে বসে বসে শেয়ালের কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ তার মায়ের কথা মনে পড়ে গেল। মা হয়তো তাকে এখন কত খোঁজাখুঁজি করছে। ছিঃ! কী করতে, কী হয়ে গেল! বেড়ালছানার জন্যেই তো তাকে এমন বিপদে পড়তে হল। কেন, একদিন ঘণ্টাটা তাকে দিলে, তোর ঘণ্টা কী ক্ষয়ে যেত। ভারী একলসেঁড়ে।
রাতটা এখন কেমন করে তাড়াতাড়ি যায়, সেইটাই ভাবনা। মনে মনে ঠাকুরকে গড় করে ছাগলছানা বলল, “ঠাকুর, ঠাকুর, আজকের রাতটা যেন কালকের মতো বড় না হয়। আমি সকালবেলা মায়ের কাছে যাব।”
কতক্ষণ আর এমনি একা একা বসে থাকা যায়। ঘুম পাচ্ছিল ছাগলছানার, ঢুলছিল। ঘুমের আর দোষ কী। সারাদিনই তো টো-টো করে ঘুরেছে আর ঘণ্টা খুঁজেছে। শরীর আর বয়। কিন্তু ঘুমিয়ে পড়াও ঠিক নয়। উটকো জায়গা। কী করতে কী হয়, কেউ বলতে পারে। উঠে পড়ল ছাগলছানা। এদিক ওদিক উঁকি মেরে দেখলে। তারপর শিবঠাকুরের চারপাশে ঘুরে ঘুরে ঘুম তাড়াতে লাগল। কিন্তু একটু পা বাড়ালেই যে একটা মস্ত সুড়ঙ্গ সে তো আর খেয়াল করেনি ছাগলছানা। তাই যেই না একটু অন্যমনস্ক হয়েছে, ধপাস। পড়া বলে পড়া। খট-খট, ধুপ-ধাপ, ফট! সুড়ঙ্গের মধ্যে পা ফসকে গড়াতে গড়াতে একেবারে যেন পাতাল প্রবেশ। উঃ। যা লাগান লেগেছে, সে আর কহতব্য নয়। আচমকা যে এমন একটা কাণ্ড হবে, ছাগলছানা ঘুণাক্ষরে বুঝতে পারেনি। বেচারা খোঁড়াচ্ছে। আহা রে। এই দ্যাখো, খোঁড়াতে খোঁড়াতে আবার কীসে হোঁচট খেল। আবার হুমড়ি খেয়ে ঠিকরে পড়ল। আরিব্বাস! এগুলো কী রে? এ তো দেখি, সোনা আর রুপোর গাদা। বেচারা ছাগল, পড়েছে তারই ওপর। পড়েই তো চক্ষু ছানাবড়া। এ কী কাণ্ড। মানুষ নেই, জন নেই, এই সুড়ঙ্গের মধ্যে এতসব সোনা রুপোর গয়না কোথা থেকে এল। মাথা ঘুরে গেছে ছাগলছানার। ভাল করে তো দেখতে হয়! ছাগলছানা পা বাড়াল। এতক্ষণ খোঁড়াচ্ছিল। এতসব সোনা দানা দেখে, পায়ের ব্যথা-ট্যথা সব হাওয়া। ও বাবা! এ যে পেল্লাই সুড়ঙ্গ। ভেতরে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। পথের যেন শেষ নেই। তার ওপর কী অন্ধকার দেখেছ! দরকার নেই বাবা বাহাদুরি দেখিয়ে। শেষে হিতে বিপরীত হয়ে যাক আর কী! এখানে আর একদণ্ডও দাঁড়ানো নয়। চলো ওপরে।
না, দাঁড়াল ছাগলছানা। তাই তো। হঠাৎ গয়নাগুলো অমন নাড়াচাড়া করছে কেন? একটা গলার হার যেন টেনে বার করল ওই গাদার ভেতর থেকে। ওটা কি ছাগলছানা মায়ের জন্যে নেবে? কে জানে। কিন্তু দ্যাখো দ্যাখো, হারটা গলায় ঝুলিয়ে ছাগলছানা কেমন ছুটতে ছুটতে সুড়ঙ্গের বাইরে আসছে।
অবিশ্যি বেশিক্ষণ ছুটতে হল না। একটু ছুটেই শিবঠাকুরকে দেখতে পেয়েছে। শিবঠাকুরের আড়ালে আবার চুপটি করে লুকিয়ে পড়ল। মনে মনে বললে, “ঠাকুর, ঠাকুর, তাড়াতাড়ি সকাল করে দাও। সকালের রোদে রাস্তা খুঁজে ঘরে যাব। ঘরে গিয়ে মাকে এই হারটা দেব। মা হার পরে তোমায় পুজো দিতে আসবে।”
এমন সময় হঠাৎ যেন ছাগলছানা মালুম পেল, একটু একটু আলো আসছে উদিক থেকে। এ কী ব্যাপার! এই রাতদুপুরে, অন্ধকারে, বনের ভেতর আলো কেন! কে আসে রে বাবা! ছাগলছানার পিলে ভয়ে একেবারে ঢিলে। উঁকি মারল ছাগলছানা। উঁকি মারতেই ছাগলের বুকের রক্ত জল। দেখে কী, দশটা, না বারোটা লোক, মশাল জ্বেলে এই মন্দিরের দিকেই আসছে। বলতে বলতেই তারা মন্দিরে ঢুকে পড়ল। ঢুকেই ‘হর-হর বোম বোম’ বলে শিবঠাকুরের সামনে লুটোপুটি খেতে লাগল। ছাগলের তো কম্ম শেষ। ঠাকুরের পেছনে গুটিসুটি মেরে মনে মনে ঠাকুরকে ডাকতে লাগল। তারপর হঠাৎ দশ-বারোটা লোক ‘বোম বোম’ করতে করতে উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে একে একে সুড়ঙ্গের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ছাগলছানা স্পষ্ট দেখতে পেল, তাদের কপালে সিঁদুরের ফোঁটা। চোখগুলো রক্তজবার মতো টকটকে। কোমরে ছোরা। হাতে মশাল। ওই ছোরা দিয়ে যদি একবার ছাগলছানার পেটে ছুড়ে মারে, তো, আর ট্যাঁ-ফু করতে হবে না বাছাধনকে। এক ঘায়েই কাত।
যাক, বেঁচে গেছে ছাগলছানা। খুব রক্ষে, লোকগুলো তাকে দেখতে পায়নি। রাতটা তার শিবঠাকুরের পেছনে বসে বসে ভালয়-ভালয় কেটে গেল। এতক্ষণ কান পেতে ছিল। একবার গাছের ফাঁকে ভোরের পাখি ডাকলেই হয়। আর যেই না ডেকেছে পাখি, অমনি ছাগল উঁকি মেরেছে। এখন আর বাঘও নেই, শেয়ালও ডাকছে না। এই তাল। শিবঠাকুরকে শেষবারের মতো গড় করে সে বেরিয়ে পড়ল! ঝোপের ভেতর লুকিয়ে-ছাপিয়ে হাঁটা দিলে। তারপর ঝোপ ডিঙিয়ে ছুট দিলে। সে কী ছুট। আগুপিছু আর কিছু সে দেখল না। আর কিছু সে ভাবল না। ছুটছে বলে গলার হারটাও তার দুলছে। বাবা! হারটা যেন আলোয় একেবারে ঝকঝক করছে। শুধু তো সোনা নয়, সোনার গায়ে নানান রঙের কত সুব মণি, মুক্তা। ছাগলছানা হারের দিকে দেখছে, আর ভাবছে, না জানি কাল সারাদিন মা কত ভেবেছে, কেঁদেছে। এখন তাড়াতাড়ি পৌঁছতে পারলে হয়।
বেশ খানিকটা ছুটে আসতেই, বন আর বন নেই। এখন সে শহরে পৌঁছে গেছে। বনের মতো শহরে তো আর বাঘ-শেয়াল নেই। কিংবা ঝোপ-জঙ্গল নেই! শহরে পাথর-ঢালা পথ আছে। গাড়ি আছে। বাড়ি আছে। রাজা আছে। রানি আছে। হাজাররকম মানুষ আছে। ছোটও আছে, বড়ও আছে। ছেলেও আছে, মেয়েও আছে।
যাঃ! ছোট্টমতো একটি মেয়ে ছাগলছানাকে দেখতে পেয়ে গেছে। চেঁচিয়ে ডাক দিল, “মা মা, দ্যাখো, দ্যাখো, একটা ছাগলছানা! গলায় সোনার হার।”
মা বললে, “কই? দেখি, দেখি!” দেখে বললে, “ওমা, তাই তো।”
মেয়ে ছুটল বাবার কাছে, “দ্যাখো, দ্যাখো, বাবা, একটা ছাগলছানা! গলায় সোনার হার!”
বাবা বললে, “কই? কই? দেখি, দেখি।” দেখে বললে, “বটে, বটে, তাই তো।”
তারপর ঘরের বাইরে ছুটে এল তিনজনে। মেয়ে এল, মা এল, বাবা এল। ছানা ধরতে পথে ছুটল।
পথে এক পুতুলওলা। ফেরি করছে। মেয়ে তাকে দেখে বললে, “ও পুতুলওলা, দ্যাখো, দ্যাখো, একটা ছাগলছানা! গলায় সোনার হার!”
“কই? কই? দেখি, দেখি। তাই তো!” সেও ছুটল ছানার পেছনে। আর তার পুতুল বেচা হল না।
সামনে পড়ল ময়রার দোকান। ময়রাকে দেখে পুতুলওলা বললে, “ও মিঠাইওলা, মিঠাইওলা, দ্যাখো, দ্যাখো, একটা ছাগলছানা। গলায় সোনার হার।”
“কই? কই? দেখি, দেখি। তাই তো।” সেও ছুটল ছানার পেছনে। দোকানে তার চাবি পড়ল।
সামনের রাস্তায় দাঁড়িয়ে কোতোয়াল পাহারা দিচ্ছিল। ময়রা বলল, “ও কোতোয়াল, কোতোয়াল, দ্যাখো, দ্যাখো একটা ছাগলছানা। গলায় সোনার হার।”
“কই? কই? দেখি, দেখি। তাই তো।” সেও ছুটল ছানার পেছনে। ছাগলছানা ধরা পড়ে গেল।
ছোট্ট মেয়ে বলল, “দাও, দাও, ছাগলছানা আমার।”
ছোট্ট মেয়ের বাবা বলল, “আমার।”
মা বলল, “আমার।”
পুতুল-বেচা তোক বলল, “আমার।”
মিঠাইওলা ময়রা বলল, “আমার।”
আমার, আমার, আমার। মাঝ-রাস্তায় হল্লা শুরু হয়ে গেল। হল্লা শুনে পথের মাঝে লোকে লোকে ছয়লাপ। টানাটানিতে ছাগলছানার প্রাণ যায় রে বাবা।
ঠিক এই সময়ে, রাজপথ দিয়ে চৌদোলা করে রাজা যাচ্ছিলেন এক রাজকাজে। হই-হল্লা দেখে হুকুম করলেন, “চৌদোলা রোখো।”
থেমে পড়ল চৌদোলা।
রাজা তাঁর দেহরক্ষীকে বললেন, “দ্যাখো তো, এত হট্টগোল কীসের?”
রক্ষী ছুটে গেল, ছুটে এল। বললে, “হুজুর, একটা ছাগলছানা। তার গলায় সোনার হার। ছানাটাকে নিয়ে জনতা কাড়াকাড়ি করছে।”
“তাই নাকি! কই? কই? দেখি, দেখি” বলে রাজাও চৌদোলা থেকে নেমে ছুটে গেলেন। গিয়ে দেখেন সর্বনাশ! ছাগল নিয়ে জনতার মধ্যে এ যে মারদাঙ্গা শুরু হয়ে গেছে। রাজা বলে কথা তার সামনে মারামারি। ক্ষোভে ফেটে পড়লেন তিনি। রক্ষীকে হুকুম করলেন, “জনতাকে ছত্রভঙ্গ করে ছাগলছানাকে আমার কাছে নিয়ে এসো।”
রাজার মুখের কথা আর মুখ থেকে বেরোতে হল না। অমনি সঙ্গে সঙ্গে সাঁই সাঁই লাঠি ঘুরতে লাগল। যে যেদিকে পারল ছাগল-টাগল ফেলে দে লম্বা। কাজ নেই বাবা ছাগল নিয়ে! অমন একটা ছাগলের গলার গয়নার চেয়ে, নিজের বুকের প্রাণটি অনেক তার দামটি।
একটু পরেই জনতা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেল শান্তি ফিরে এল। একজন রক্ষী এরই ফাঁকে ছাগলছানাটাকে ধরে এনে রাজার হাতে তুলে দিল। রাজা তো ছানাটাকে দেখে তাজ্জব বনে গেছেন। রাজা ছাগলের মুখের দিকে তাকালেন। গলার ওপর চোখ ফেরালেন। সোনার দিকে নজর দিলেন। চমকে উঠলেন। হুকুম করলেন, “ছানাটাকে রাজবাড়িতে নিয়ে চলো!”
এই দ্যাখো। আবার না-জানি কী বিপদ হয়! শেষ অবধি রাজা ছাগলছানাকে বলি দিয়ে মাংস করে খেয়ে ফেলবেন না তো!
এখন তো চলো রাজবাড়ি। ভাগ্যে যা লেখা আছে, সে তো আর কেউ খণ্ডাতে পারছে না। সুতরাং চৌদোলায় রাজা চলেছেন, রাজার সঙ্গে ছাগলছানাও চলেছে। চলতে চলতে ছাগলছানা মাঝে মাঝে রাজার ঠোঁটের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে। দেখছে, তাকে দেখে রাজার নোলা দিয়ে জল গড়াচ্ছে কি না! না, তেমন কিছু গড়াচ্ছে বলে তার মনে হচ্ছে না।
দেখতে দেখতে চৌদোলা রাজবাড়ির সামনে এসে থামল। চৌদোলা থামতেই সিংদরজা খুলে গেল। ছাগলছানা তো দেখে থ।
রাজবাড়ি, রাজবাড়ি
ঘর-দোর সারি সারি
ঘোড়া-জোতা জুড়িগাড়ি
হাঁটা-চলা তাড়াতাড়ি
এটা-ওটা নাড়ানাড়ি
কাজ নিয়ে কাড়াকাড়ি
সব যেন বাড়াবাড়ি
সেই রাজবাড়ির ভেতর রাজামশাই পা ফেলতেই অমনি ভ্যাঁ-পু, ভ্যাঁ-পু করে ভেঁপু বেজে উঠল। সিপাইরা অমনি ঠকাঠক সেলাম ঠুকতে লাগল। খটাখট পা ফেলে সান্ত্রিরা সব রাজার পেছনে হাঁটতে লাগল। রাজা কোনওকিছু গ্রাহ্যি না করে ছাগলছানাকে কোলে নিয়ে গটমট করে অন্দরমহলের দিকে এগিয়ে চললেন।
হাতি-হাতি শুঁড় তোলা রাজার কোলে ছাগলছানাকে দেখতে পেল। প্রথমে ভড়কে গেল। তারপর ফিহিক করে হেসে ফেলল।
ঘোড়া-ঘোড়া ল্যাজ-নাড়া রাজার ছাগলছানাকে দেখতে পেল। প্রথমে হিংসে হল। তারপর চিঁহিঁক করে হেসে উঠল।
উট উট ঢ্যাপসা ঘাড় রাজার কোলে ছাগলছানাকে দেখতে পেল। প্রথমে রেগে কাঁই। তারপর হিহিক করে হাসতে হাসতে প্রাণ যায়।
হাসতে হাসতে হাতি বললে, “এই ছানা, আমার শুঁড়ে বসে নাচবি?”
ছাগল ডাকলে “ব্যা-অ্যা-অ্যা।”
রাজা ছাগলকে আদর করলেন, “চুপ-চুপ।”
হাসতে হাসতে ঘোড়া বললে, “এই ছানা, আমার ঘাড়ে বসে ছুটবি?”
ছাগল ডাকলে, “ব্যা-অ্যা-অ্যা।”
রাজা ছাগলের গাল টিপলেন, “চুক, চুক।”
হাসতে হাসতে উট বললে, “এই ছানা, আমার পিঠে বসে হাঁটবি?”
ছাগল ডাকলে, “ব্যা-অ্যা-অ্যা।”
রাজা ছাগলের গায়ে হাত বোলালেন, বললেন, “তুত্ তুত্!”
মন্ত্রীর ডাক পড়ল।
মন্ত্রী হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন।
রাজা বললেন, “মন্ত্রীমশাই, মন্ত্রীমশাই!” রাজার গলায় গোঁসা।
মন্ত্রী বললেন, “আঁজ্ঞে হুজুর, কীসের কসুর?” মন্ত্রীর গলায় ডর।
রাজা বললেন, “রাজকোষের হার, ছাগলছানার গলায় ঝোলে কেমন করে?”
রাজামশাইয়ের কথা শুনে, মন্ত্রীমশাই যেন ভূত দেখলেন। “তাই তো, তাই তো! এ হার তো রাজপুরুষের হার, রাজকোষের গুপ্তঘরে জমা ছিল!”
রাজা গর্জে উঠলেন, “গুপ্তঘরের গোপন-সংবাদ কে ফাঁস করেছে? ছাগলের গলায় হার কে দিয়েছে?”
অমনি খোঁজ করতে মন্ত্রী ছুটলেন রাজকোষে। এ কী সর্ব্বনাশ। রাজরোষ যে ফাঁকা। হায়। হায়। এক টুকরো সোনা নেই, একরতি মণি নেই, মুক্তা নেই, হিরে নেই, জহর নেই। সব লুঠ। শুরু হয়ে গেল গুজব। কোথাও ফিসফাস। কোথাও জটলার জট। রাজামশাই তো তাণ্ডব শুরু করে দিলেন। কী জানি বাবা। হয়তো খেপে না যান।

ছাগল তো দেখেশুনে ভড়কে গেছে। কিন্তু থেকে থেকে একটা কেমন সন্দেহ তার মনের ভেতরটা খামচে খামচে ধরছে। মনে হচ্ছে, তবে কি শিবমন্দিরের সুড়ঙ্গের নীচে ওই যে অত সোনাদানা ওগুলো সব রাজবাড়ির। ওই যে শিবমন্দিরে লোকগুলোকে দেখল, ওরা বুঝি তবে ডাকাত। রাজবাড়ির রাজকোষ থেকে চুরি করে নিয়ে গিয়ে সুড়ঙ্গের ভেতর লুকিয়ে রেখেছে। ছাগলছানা মনে মনে ভাবলে, “কী করা যায় এখন।”
এদিকে রাজার ধাতানি খেয়ে মন্ত্রী চেঁচান, “কী করি। কী করি।”
রাজা হাঁকেন, “যত সব অকম্মের ধাড়ি।”
মন্ত্রীমশাই চমকে বলেন, “ছাগলছানাকে কয়েদে পাঠাই?”
রাজা বললেন, “বুদ্ধির ঢেঁকি।”
“তবে দ্বীপান্তরে দিই।”
রাজা বললেন, “আপনার মুন্ডু।”
“তা হলে শূলে চাপাই।”
“না।” রাজা ভীষণ চিৎকার করে উঠলেন। গলায় যেন বাজ পড়ল। সেই চিৎকার শুনে মন্ত্রীমশাই তো ভয়ে একেবারে থরহরি কম্পমান। আর ছাগলছানাটাও এমন আঁতকে উঠেছে যে, সে রাজামশাইয়ের হাত ছিটকে মার দৌড়।
মন্ত্রী থতমত খেয়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “হুজুর, হুজুর, পালাল।”
রাজা ধমকে বললেন, “যেতে দিন।” বলে হাঁক পাড়লেন, “সেপাই।”
সেপাই ছুটে, সেলাম ঠুকে কাঁপতে লাগল।
রাজা হুকুম দিলেন, “আমার ঘোড়া বার করো। একশোজন সেপাই আমার সঙ্গে এসো।”
ছাগলছানা ততক্ষণে সিংদরজা পেরিয়ে রাজপথে ছুট দিয়েছে। রাজপথে নেমে, যে-পথ দিয়ে এসেছিল সেই পথে সে ছুট মারল। ঘোড়ার পিঠে রাজা, তার পেছনে একশো সেপাই ছাগলছানার পিছু নিল।
তারপর, শহর গেল পেরিয়ে,
নগরও যায় ছাড়িয়ে,
গেরাম গেল হারিয়ে
বনের ভেতর ছাগলছানা পা দিল তার বাড়িয়ে।
ওমা। এ যে সেই বন। ঠিক তো। কেমন চিনে চিনে এসেছে দ্যাখো। বনের ভেতর শিবমন্দিরের চূড়াটা যেই দেখতে পেল, অমনি ছাগলছানা থমকে দাঁড়াল। রাজা অমনি চমকে ঘোড়ার পিঠ থেকে নেমে পড়লেন। একশোজন সেপাই এদিক-ওদিক ঝোপের আড়ালে গা-ঢাকা দিল। ছাগলছানা নিঃসাড়ে ঢুকে গেল শিবমন্দিরে। ছাগলছানার পেছনে রাজাও ঢুকে পড়লেন মন্দিরের ভেতরে।
মন্দিরের সেই সুড়ঙ্গের ভেতর ছাগলছানা ছুটে নামল।
রাজাও পিছু নিলেন।
তারপর রাজা থতমত খেয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়লেন। রাজার চোখ ঝলসে গেল। সেই সুড়ঙ্গের ভেতর চারদিকে সোনা আর মানিক, মণি আর মুক্তো। রাজার তো চক্ষু কপালে।
রাজা আর দাঁড়ালেন না সেখানে। সোনাদানা যেমন পড়েছিল তেমনি পড়ে রইল। ছাগলছানাকে কোলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এসে একশো সেনার সঙ্গে ঝোপের মধ্যে গা ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে রইলেন। লুকিয়ে লুকিয়ে মন্দিরের ভাঙা দরজার দিকে তীক্ষ্ণ চোখে নজর রাখলেন। অনেকক্ষণ।
তখন গভীর রাত। বনের ভেতর গভীর রাতের অন্ধকার যে কী ভয়ংকর, যে না দেখেছে, সে জানবে কেমন করে। হঠাৎ হল কী, সেই অন্ধঝারে, গাছের ফাঁকে আলোর স্ফুলিঙ্গ ঝলসে উঠল। এগিয়ে আসছে সেই আলোর ঢেউ। এঁকেবেঁকে। আর একটু দৃষ্টি স্থির রাখতেই বোঝা গেল, এ যেন মশালের আলো। এগিয়ে আসছে মন্দিরের দিকেই। একটু পরেই নজরে পড়ল, দশ-বারোটা লোক লুঠের বোঝা কাঁধে ফেলে, মশাল জ্বেলে মন্দিরের ভেতর ঢুকে পড়ল।
রাজা সন্তর্পণে উঠে দাঁড়ালেন।
একশো সেপাই তৈয়ার হল।
রাজা আদেশের নিশান দিলেন।
একশো সেপাই ঝোপ ডিঙিয়ে এগিয়ে এল।
রাজা হঠাৎ গর্জে উঠলেন, “ঝাঁপিয়ে পড়ো।”
অমনি তরোয়াল বেজে উঠল। ডাকাতের হাতের মশাল হাত থেকে ছিটকে পড়ল। একশোজন সেপাই দেখে রণে ভঙ্গ দিয়ে ডাকাতের দল দাঁড়িয়ে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে তাদের হাতে শিকল, পায়ে বেড়ি পরিয়ে দিল সেপাইরা। বন্দি করে রাজবাড়িতে নিয়ে চলল। আর নিয়ে চলল, সেই সুড়ঙ্গে লুকনো ছিল যত সোনা চাঁদি সব।
রাজার হুকুমে আজ সারা রাজ্যে ঢেঁড়া পড়ল। রাজবাড়ির লোক ঢেঁড়া পিটিয়ে বলে গেল, “রাজার হুকুমে আজ বিশেষ দরবার বসছে। সেই দরবারে সকলকে উপস্থিত থাকতে রাজামশাই আমন্ত্রণ জানিয়েছেন। সকলের জন্য দরবার আজ উন্মুক্ত।”
দেখতে দেখতে লোকে লোকে উপচে গেল দরবার-হল। ঠিক সময়ে সিংদরজায় মস্ত ঘণ্টা বেজে উঠতেই রাজামশাই পাত্রমিত্র, সভাসদ সঙ্গে নিয়ে দরবারে হাজির হলেন। আজ তিনি একা নন। তাঁর পাশে বসল, তাঁর ছোট্ট মেয়ে রাজকন্যা। সত্যি, দ্যাখো, দ্যাখো, কী সুন্দর দেখতে। রাজকন্যা তো নয়, যেন স্বর্গের অপ্সরা।
রাজা ইশারা করলেন। দরবারে যেটুকু গুনগুনানি শোনা যাচ্ছিল নিমেষে নিশ্চুপ হয়ে গেল। যেন নিশ্বাসের শব্দ পর্যন্ত শোনা যায় না। শোনা গেল রাজামশাইয়ের গম্ভীর গলার স্বর। তিনি বললেন, “প্রিয় দেশবাসী, আমি আজ এক বিশেষ কারণে আপনাদের সকলকে দরবারে আমন্ত্রণ করেছি। আপনারা এই মুহূর্তে একটি খবর শুনলে হয়তো শিউরে উঠবেন। শিউরে উঠবেন এই কথা শুনলে যে, আমাদের রাজকোষে যত সোনাদানা ছিল, আমাদের সকলের অজান্তে একদল ডাকাত সেগুলি চুরি করে নিয়ে যায়। কিন্তু আমাদের অশেষ সৌভাগ্য, আমরা সেগুলি সবই উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছি। আর এই উদ্ধারের কাজে আমাদের যে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে, তাকে আজ আপনাদের সকলের সামনে সম্মান জানাব বলেই, আপনাদের এখানে ডেকে নিয়ে এসেছি আমি। এক্ষুনি তাকে আপনাদের সামনে হাজির করা হচ্ছে।” বলে, রাজা নিজেই হাতে তালি বাজিয়ে ইশারা করলেন। অমনি সঙ্গে সঙ্গে একজন সেপাই ছাগলছানাকে কোলে নিয়ে দরবারে হাজির হল।
ছাগলছানা দেখে তো সবাই হাঁ।
রাজা আবার বললেন, “হ্যাঁ, হ্যাঁ, ছাগলছানা দেখে আপনাদের অবাক হবার কিছু নেই। আপনারা শুনে রাখুন, এই ছাগলছানাকেই আমরা সম্মান জানাব বলে এই দরবার ডেকেছি। মানুষ যা পারেনি, এই ছাগলছানা তাই পেরেছে। চোরাই মালের হদিশ তো সে দিয়েছেই, তার ওপরে ডাকাতগুলোকে ধরতেও সাহায্য করেছে। তাই আমি ঠিক করেছি, ছানার গলায় একটি সোনার ঘণ্টা পরিয়ে দিয়ে তাকে আমরা পুরস্কৃত করব। আপনারা কী বলেন?”
অমনি দরবারসুদ্ধু লোক উল্লাস করে উঠল, “নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই।”
“আর সেই সোনার ঘণ্টা ছানার গলায় পরিয়ে দেবে আমার মেয়ে, রাজকন্যা। আপনারা কী বলেন?”
“খুব ভাল, খুব ভাল।” দরবারে আনন্দের ঢেউ।
সঙ্গে সঙ্গে একজন দাসী এল। তার হাতে রুপোর থালা। রুপোর থালায় একটি সোনার ঘণ্টা। আলোয় তার জৌলুস ঠিকরে পড়ছে। রাজকন্যা রুপোর থালা থেকে সোনার ঘণ্টাটি হাতে নিল। এগিয়ে গেল ছানার দিকে। ছাগলছানার গলাটি জড়িয়ে ধরল। আদর করল। গলায় ঘন্টাটি পরিয়ে দিল। অমনি ঘণ্টা বেজে উঠল, টুং টাং। দরবারভর্তি লোক খুশিতে উছলে হাতে হাতে তালি বাজিয়ে নেচে উঠল। দেখেশুনে ছাগলছানা তো একদম হাঁদারাম।
গলায় ঘন্টাটি পরিয়ে দিয়েই রাজকন্যা ছুটে গেল বাবার কাছে। গলা জড়িয়ে কানে কানে কী বলল যেন। রাজা শুনলেন, ঘাড় নাড়লেন, মুচকি হাসলেন। তারপর সেপাইকে হুকুম করলেন, “ছাগল ছানাকে ছেড়ে দাও। ও মায়ের কাছে যাবে। মায়ের মতো সুখ আর কোথা সে পাবে?”
অমনি সঙ্গে সঙ্গে ছাগলছানাকে ছেড়ে দেওয়া হল। মাটিতে পড়েই ছাগলছানা ছুটতে গেল। ছুটতে গিয়ে থমকে দাঁড়াল। রাজকন্যার মুখের দিকে একবারটি তাকিয়ে দেখল ছাগলছানা। হাসিহাসি মুখে রাজকন্যা হাত বাড়াল। ছুটে এসে ওর গালে একটা চুমু খেল। নেচে উঠল ছাগলছানা। তারপর ছোটা দিল খুশিতে নাচতে নাচতে। সিংহাসন ছেড়ে ছুটে এলেন রাজা। রাজার হাত ধরে ছুটে এল রাজকন্যা। ছুটে এল অগুনতি মানুষ। দেখতে লাগল এক বাহাদুর ছাগলছানা মায়ের কাছে ছুটে চলেছে আর তার গলায় সোনার ঘণ্টা বাজছে টুং-টাং, টুং-টাং!
ছুটতে ছুটতে সবার চোখের আড়ালে চলে গেল ছাগলছানা। দরবারে অগুনতি মানুষ ছাগলছানার কথা ভাবতে ভাবতে চলে গেল যে-যার ঘরে।
অনেকক্ষণ ছুটেছিল ছাগলছানা। ছুটতে ছুটতে ঘণ্টার শব্দ যতই বেজে বেজে উঠছিল, আকাশটা ততই যেন ঝলমলিয়ে উঠছে। বাতাসটা ততই যেন ঝুরঝুরু হাসছে। আর ফুলবাগিচার মৌমাছিরা ততই যেন গুন গুন গুন গাচ্ছে।
আর সেই বেড়ালছানাটা সোনার ঘণ্টার শব্দ শুনে ছুটে এসেছিল ছাগলছানার কাছে। জিজ্ঞেস করেছিল, “ছাগলছানা, ছাগলছানা, এমন সোনার ঘণ্টা কে দিল রে তোকে? কী সুন্দর!”
ছাগলছানা বলল না কিছু। হাসল আর মুখ ফিরিয়ে মায়ের কাছে চলে গেল।
মা তো ছানাকে দেখে হাসবে, না কাঁদবে, ছুটবে, না নাচবে।
ছানাকে জড়িয়ে ধরে কী আদর, আর কী আনন্দ। বললে, “ছানা, ছানা, দুধ খাবি আয়। আহা রে, বাছার আমার মুখখানা শুকিয়ে গেছে। চোখের কোলে কালি পড়েছে। আমার অমন গাবুস-গাবুস ছানা, এখন, এক্কেবারে আধখানা।” বলে, মা ছানাকে দুধ খাওয়ালে। ছানা পেট ভরে দুধ খেলে।
তারপর সেদিন রাত এসেছিল। ছাগলছানার চোখ-জুড়িয়ে ঘুম এসেছিল। সোনার ঘণ্টা গলায় পরে মায়ের পাশে ঘুমিয়ে পড়েছিল। তারপর সে স্বপ্ন দেখেছিল। হ্যাঁ, সত্যি সত্যি স্বপ্ন। স্বপ্ন দেখেছিল, সেই মিষ্টি মিষ্টি রাজকন্যার। রাজকন্যা, শুধু রাজকন্যা! আঃ!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন