শৈলেন ঘোষ

ভারী আশ্চর্য সেই মানুষটি। পথে পথে ঘুরে বেড়ায়। তাকে দেখা যাবে লোক-গিজগিজ হাট-বাজারে, সকালবেলা। ব্যাঞ্জো বাজাচ্ছে। কখনও বা দেখতে পাবে, রোদ-দুপুরে, গাছের নীচে ব্যাঞ্জো নিয়ে সুর তুলছে। নয়তো বা সেই যেখানে বিকেলের নরম রোদে, সবুজ ঘাসে, অনেক কচিমুখের হাসি খলখলিয়ে ওঠে, সেখানে সে ব্যাঞ্জো বাজিয়ে তাদের সঙ্গে খেলা করছে।
তার নাম ছিল হো। তার বয়েস যে কত, বলা শক্ত। মাথার ওপর যেন একরাশ তুষার ছড়িয়ে আছে মানুষটার। ভরাট গালের ওপর সাদা ধবধব করছে একঝাঁক দাড়ি। বুকটা এত্তখানি চওড়া। কিন্তু তার রোদে-পোড়া গায়ের চামড়া যেন একটু আলগা। কেউ কেউ তাকে ডাকত, হো-বুড়ো। কেউ বলত, ওস্তাদ-হো। তাকে দেখতে পেলেই হল, ছেলে-বুড়ো ছুটত তার পেছনে। চেঁচাত, “একটা বাজনা শোনাও, একটা বাজনা শোনাও!”
“আচ্ছা, আচ্ছা। হচ্ছে, হচ্ছে,” বলে, হো তার ঝকঝকে ব্যাঞ্জোর তারে হাত বুলিয়ে গান বাজাত। সে-গান সবার জানা। তারে সুর বাজলেই যারা শুনত, তারা আপনমনে গেয়ে উঠত:
ফুল-টুকটুক ফুলবাগানে
মৌটুসকি পাখি;
পালক-ডানায় রঙের ছবি
করছে আঁকাআঁকি।
আঃ! কী মিষ্টি সেই সুর! হো’র আঙুলগুলো ব্যাঞ্জোর তারের ওপর যতই নাচত, ততই তার বরফ-সাদা চুলগুলো, এলোমেলো গড়িয়ে, মুখের ওপর ছড়িয়ে পড়ত।
হো’র কেউ ছিল না। একা। একটি মানুষ। শহরের শেষে, যেখান দিয়ে ছোট্ট নদী একলাটি বয়ে গেছে, যেখানে নদীর এধারে ওধারে কিছু গাছ, কিছু ঝোপ, কিছু ফুল, কিছু ঘাস হাওয়ায় দোলে, তারই পাশে হো’র একখানি ঘর। হো’র মতো সেই ঘরখানারও বোধহয় অনেক বয়েস। কোনদিন না ভেঙে পড়ে! হো ঘরখানা যে সারাবে, সে-পয়সা তো তার নেই। এই ব্যাঞ্জো শুনে, খুশ হয়ে, কেউ দুটো পয়সা দিলে, তবে তার দিন চলে।
অবিশ্যি পয়সা তাকে সবাই দেয়। সেই পয়সা তার ছেঁড়া কোটের পকেটে ফেলে সে হাঁটে। হাঁটতে হাঁটতে এখান থেকে চলে যায় অনেক দূরে, আর-এক জায়গায়।
সত্যি, হো’র গায়ের কোটটার ভারী বেহাল অবস্থা। তেমনই ছিরি প্যান্টের। হিল-ফাটা জুতোয় ঘষটে ঘষটে প্যান্টের নীচের দিকটা ছিঁড়ে ফরফর করছে। কোটের পকেটে যত রাজ্যের হাবিজাবি এটা-ওটা। লাট্টু থেকে শুরু করে টুকরো সুতোর কাঠিম পর্যন্ত খুঁজলে পেয়ে যাবে। পথ চলতে চলতে হো হঠাৎ একদিন একটা ছোট্ট পুতুল কুড়িয়ে পেয়েছিল। এমনকী, পুতুলও তার ঘর বেঁধেছিল ওই পকেটেই! হো’র যখন কাজ থাকত না, কিংবা কাজ করতে মন চাইত না, তখন পকেট থেকে পুতুলটা বার করে নিজের মনে কী যে সব কথা বলত পুতুলটার মুখের দিকে চেয়ে, কে জানে! কথা বলতে বলতে তাকে আদর করত। পুতুলের মাথাটা নেড়ে দিয়ে চুক করে একটা চুমু খেয়ে, পাশে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়ত। যেন তার নিজের মেয়ে!
একদিন হল কী, এই রে, হো’র পকেট থেকে পুতুলটা ফাক্ক হয়ে গেল! পুতুলটা হারিয়ে গেল, না পকেট থেকে কেউ তুলে নিয়ে পালিয়ে গেল, হো তা জানতেই পারল না। পকেট থেকে তুলে নেওয়াটা এমন কিছু অসম্ভব নয়। হো যখনই বাজনা বাজায়, তখন চারপাশে কী ভিড় জমে যায়। ভিড়ের মধ্যে পকেট হাতড়ে কেউ যদি পুতুল নিয়ে ভেঙ্গে পড়ে, তখন তো বাজনা বাজাবে, না চোর পাকড়াবে!
যাক গে, যাক। যা হয়ে গেছে, সে-নিয়ে তো আর মন খারাপ করার কোনও মানে হয় না। যেটা গেছে সেটা একটা নেহাতই পুতুল। পুতুলের কথা অত আর কে মনে রাখে! অবিশ্যি দু’-চারদিন হো’র মনটা একটু খারাপ খারাপ লাগল। তারপর যে-কে সেই! পকেটের পুতুল তার চলে গেল বটে, কিন্তু হাতের ব্যাঞ্জো তার থামল না।
অগুনতি লোক তাকে চিনত। অসংখ্য লোক তার বাজনা শুনত। কিন্তু সেই অগুনতি লোকের মধ্যে তার ছিল এক খুদে সমঝদার। অত লোকের মধ্যে কে আর তাকে চিনে রাখছে! ল্যাকপেকে সিং সেই খুদে শ্রোতার চেহারাটা তো আর রাজপুত্তুরের মতো ঝলমলে নয় যে, দেখলেই চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে যাবে! যেমন তার আহামরি চেহারা, তেমনি বিচ্ছিরি তার গায়ের পোশাক! মাথায় পাখির বাসা। শুকনো শুকনো মুখ। ফাটা ফাটা ঠোঁট। গালে খড়ি ফুটছে। অথচ নীল নীল চোখদুটো তার কেমন দ্যাখো, তিড়িং-বিড়িং এদিক ওদিক ঘুরছে। হো বুড়োও তাকে চিনত না। অত লোকের ভিড়ের মাঝখানে কোথায় কে একটা ছেলে তার বাজনা শুনছে, সে আর অত কে খোঁজ রাখে। হো যখনই বাজনা বাজাত ছেলেটা ওই ভিড়ের মধ্যে সেঁধিয়ে, এর হাতের ফাঁক দিয়ে, ওর ঘাড়ের ফোকর দিয়ে তাকে দেখত আর বাজনা শুনত। শুনতে শুনতে কেমন হয়ে যেত যেন ছেলেটা। কেমন চোখদুটো তার ছলছলিয়ে উঠত! এক্ষুনি বুঝি চোখের ফেঁটাগুলি গালের ওপর গড়িয়ে পড়ে।
বাজনা শেষ হলে, সব লোক চলে গেলেও, সেই ছেলেটা কিন্তু যেত না। সে আড়ালে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখত হো-বুড়োকে। তারপর হো যখন পকেটে পয়সাগুলো ফেলে হাঁটত, ছেলেটাও লুকিয়ে ছাপিয়ে তার পিছু নিত। অবিশ্যি প্রথম প্রথম হো অতটা খেয়ালই করত না। সে তো তখন পথে যেতে যেতে আপনমনে ব্যাঞ্জো বাজায়। কে তার পিছু নিয়েছে, সে আর অত দ্যাখে কে!
কিন্তু এমনই করে রোজ রোজ কেউ যদি মানুষটার পিছু নেয়, তবে একদিন-না-একদিন সন্দেহ তো হবেই। হয়েছিলও তাই। সেদিন ছেলেটাকে হঠাৎ দেখে ফেলেছিল হো। থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে, হো যেই পিছু ফিরেছে, ছেলেটা একেবারে সঙ্গে সঙ্গে তিরবেগে ছুট মারল। হো তাকে হঠাৎ ছুটতে দেখে এমন ঘাবড়ে গেল যে, মুখ দিয়ে তার কথাই ফুটল না। হাঁদার মতো চোখ উঁচিয়ে দেখতে না-দেখতেই ছেলেটা ফুস। অবাক কাণ্ড তো!
সেইখানে ঠায় দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হো আকাশ-পাতাল কত কী ভাবল। কিছুই ঠাহর করে উঠতে পারল না। তখন আর কী, আবার হাঁটা। আর থেকে থেকে পিছন ফিরে দেখা। আসছে নাকি? না। সুতরাং হাঁটতে হাঁটতে সিধে চলল ঘরের দিকে।
সেদিন তখন হো’র ঘরে রাত নেমেছে। অনেক রাত অবধি তো তার জেগে থাকার ক্ষমতা নেই। একে বয়েস হয়েছে, তার ওপর সারাদিন রাস্তায় টো-টো করে ঘুরে, বাজনা বাজাও! কী হাড়ভাঙা খাটুনি বলো! তাই পেটে কিছু দিয়ে বিছানায় পড়তেই হো’র নাকে গুড়গুড়ি বাজতে শুরু করে দিল!
আচ্ছা, এত রাত্রে ও কে? ওই যে হো’র ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি মারছে? চোর নাকি?
খট্। এই যাঃ। মনে হচ্ছে চোরটার হাত থেকে কী যেন পড়ে গেল। শব্দ হল।
“এই, কে রে?” এই সব্বনাশ! হো’র ঘুম ভেঙে গেছে! ধড়ফড় করে উঠে পড়েছে। ছুটে এসে জানলায় দাঁড়াল।
চোর এদিকে চোখের পলকে হাওয়া! আচ্ছা, চোরটাকে তো খুব লম্বা-চওড়া, গাঁট্টাগোট্টা বলে মনে হল না। মনে হল, যেন, একটা বাচ্চা ছেলে। হবে হয়তো ছিঁচকে চোর। হো’র ঘুমের দফারফা! অবিশ্যি হো’র যদিও না-আছে সোনা, না-আছে দানা, তবু তার ভয়, ব্যাটা চোর যদি তার ব্যাঞ্জোটা নিয়ে পালায়! উঃ! এই কথাটা ভাবতেই ছ্যাঁত করে চমকে উঠল হো। ব্যাঞ্জো গেলে তো তার সবই গেল! ব্যাঞ্জো তার প্রাণ। ওটা আছে বলেই না দুটো পয়সা জোটে। তাই ব্যাঞ্জোর কত যত্ন। সবসময়ে ধুলো-ময়লা ঝাড়ছে। না-হয় তারগুলোকে কাপড় দিয়ে মুছছে। নিজের কাপড়-চোপড়ের অমন ছিরি হলে কী হবে! ব্যাঞ্জোর শ্রী দেখলে তোমার চোখ ঝলসে যাবে! হো ঝটপট জানলাটা বন্ধ করে দিল। ছুট্টে গিয়ে ব্যাঞ্জোটা বুকের কাছে নিয়ে, সেই দুপুর-রাতে জেগে বসে রইল। অন্ধকার সেই নিস্তব্ধ রাত্রে একটু যদি খুট করে এদিক ওদিক আওয়াজ ওঠে, হো চট করে ঘাড় ফিরিয়ে আড়ষ্ট হয়ে দ্যাখে। মনে হয়, যেন কাছেপিঠেই দুশমন চুপ মেরে দাঁড়িয়ে আছে! না বাবা, আর ঘুমিয়ে কাজ নেই!
বললে কী হবে! ঘুম তো আর কারও কেনা গোলাম নয় যে, বললেই কথা শুনবে! তাই শেষরাতে হো’র অ্যায়সা ঢুলুনি এসে গেল যে, বেচারা না পারে দাঁড়াতে, না পারে বসতে। শেষকালে আর কী করা, একেবারে বিছানায় সটান গড়াগড়ি। কোথায় ব্যাঞ্জো আর কোথায় কী! ঘুমের সে কী বহর! আহা! ঘুমোক, ঘুমোক। মানুষটার বয়েস হয়েছে তো!
অনেকক্ষণ পর আচমকা ঘুম ভেঙে গেল হো’র। তড়বড় করে উঠে পড়েছে। চটপট জানলাটা খুলে দেখে, ইস, রোদ উঠে গেছে। আকাশ একেবারে আলোয়-আলোয় উপচে পড়েছে। না-জানি কত বেলা হয়ে গেল! এতক্ষণে হাটে-বাজারে ব্যাঞ্জো বাজিয়ে কত পয়সা উঠে আসত। কে জানে, বাজার হয়তো শেষই হয়ে গেছে! না, আর একদণ্ড দেরি করা নয়। এক্ষুনি বেরোতে হয়। মুখপোড়া চোরের জ্বালায় আজকের দিনটাই মাটি। আচ্ছা বাপু, আগে তো এ-তল্লাটে চোর-ছ্যাঁচড়ের নামগন্ধ ছিল না। হঠাৎ মহাপ্রভুদের আমদানি হল কোত্থেকে? তাও না-হয় হল! মরতে আর জায়গা ছিল না, শেষকালে এই বুড়োমানুষটার ঘরে হানা! ভাল ঠাওরেছে জায়গা বটে! যাই হোক, এক্ষুনি বেরিয়ে পাঁচজনকে বলে এর একটা বিহিত করতে হবে। নইলে সন্ধান যখন পেয়েছে, আবার আসতে কতক্ষণ! যতই হোক চোর তো!
হো ঝটপট ঘরের দরজাটা খুলে ফেলল। একেবারে হাট হয়ে খুলে গেল দরজা। হন্তদন্ত হয়ে বাইরে বেরিয়ে এল।
“এই-ই-ই-ই!” বেরিয়েই চমকে উঠেছে হো।
কী হল?
চেয়ে দ্যাখো, একটা ছেলে দরজার গোড়ায় পড়ে আছে! এক্ষুনি দিয়েছিল ক্যাঁত করে পায়ের ঠোক্কর!
থমকে গেল হো। ভাল করে দেখল। ছেলেটা একদম চৌকাঠ ঘেঁষে শুয়ে আছে। হ্যাঁ, ঘুমোচ্ছে। হাতে ওটা কী, মুঠির মধ্যে ধরে আছে? মনে হচ্ছে, একটা পুতুল। আরও একটু ভাল করে দেখল হো। আরে, আরে, মনে হচ্ছে, তারই সেই পুতুলটা। তবে কি এই ছেলেটাই সেই চোরটা! হো’র পুতুল চুরি করে এখন ব্যাঞ্জোর ও চোখ পড়েছে!
হো আর নিমেষও দেরি করল না। সেই ঘুমন্ত ছেলেটাকে দু’হাত দিয়ে জাপটে ধরল। ঘরের মধ্যে চ্যাংদোলা করে টেনে নিয়ে এল। ছেলেটা তো ভ্যাবাচাকা-হাম্বা। হো’র হাতের চাপে, ঘুম কি আর চোখে থাকে! চোখ থেকে দে লম্বা!
কিন্তু আশ্চর্য তো! ছেলেটা কোথায় ভয়ে জুজুর মতো কাঁচুমাচু হয়ে থাকবে, তা নয়, হি হি হি হি করে হেসে উঠল।
হো তো তার মুখখানা দেখেই থ হয়ে গেছে! আর এ যে দেখি সেই ছেলেটা, তার পেছনে পেছনে ঘোরে! হো’র রাগে কান লাল হচ্ছে! এই বুঝি দিল এক ঘা! না, ঘা দিল না। উলটে থমকে উঠল, “পাজি, বজ্জাত, গলা টিপলে দুধ বেরিয়ে আসবে, এখন থেকেই চুরি! ভয়ডর নেই!”
ছেলেটা আরও জোরে হেসে উঠে বলল, “ভয় করতে যাব কেন? তুমি কি রাজার বরকন্দাজ যে, তোমাকে হুজুর, আজ্ঞে করতে হবে!”
ব্যাস, ওই একটি কথাতেই হুশ-শ, মানে ভস্মে ঘি পড়ল। হো রেগে কাঁই। খপ করে তার ঘাড়টা ধরে, চেঁচাল, “কোন সাহসে তুই আমার পুতুল চুরি করেছিস?”
“চুরি করিনি তো। তোমার পকেটে ছিল, তুলে নিয়েছি। তুমি অত বড় লোক, পুতুল নিয়ে কী করবে? খেলা করবে?” ছেলেটা সাফ এই কথাগুলো বলে, ফিক ফিক করে হাসতে লাগল।
এই হাসি দেখে হো’র যেন গা-পিত্তি জ্বলে যায়। আরও জোরে কড়কে উঠে বলল, “পকেটমার, তোকে পুলিশে দেব।”
ছেলেটা তেমনই খিলখিল করে হেসে বলে উঠল, “পুলিশ? লোকগুলো ভাল, ক’দিন বেশ আরামে ওদের কাছে থাকা যাবে।”
আর যায় কোথায়! হো যেন পাড়া মাথায় করল। বলল, “আগে ঠ্যাঙানির ব্যবস্থা হোক, তারপর আরাম বুঝবি। হাত-পাগুলো যখন টুকরো-টুকরো করে কাটবে, তখন মালুম হবে আরাম কেমন!” বলে হো, ছেলেটার হাত থেকে পুতুলটা কেড়ে নিল। এবার ঘাড় ছেড়ে হাতটাকে বেশ করে মুচড়ে ধরে জিজ্ঞেস করল, “আর কী চুরি করেছিস?”
ছেলেটা উত্তর দিল, “না, আর কিছু নয়।”
হো জিজ্ঞেস করল, “আর কী নেবার মতলব?”
“আবার কী নেব?”
“তবে এখনও আমার ঘরে চোখ কেন?”
“তোমার ব্যাঞ্জো শুনতে আমার খুব ভাল লাগে। তুমি কী সুন্দর বাজাও।”
“চোপ,” হঠাৎ হো তেড়ে উঠল, “শুনতে ভাল লাগে! রাত্তিরে আমার ঘরে উঁকি মারছিলি কেন?”
“দেখছিলুম।”
“কী দেখছিলি?”
“ব্যাঞ্জোটা।”
এই না শুনে হো ঝট করে ছেলেটার হাতে এমন একটা হ্যাঁচকা টান মারল যে, ছেলেটা সামলাতে না পেরে ধপাস করে ঘরের মেঝেয় ছিটকে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে হো ঘরের বাইরে বেরিয়ে এসে ধাঁ করে বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে তালা লাগিয়ে দিল। তারপর তারস্বরে চেঁচাতে লাগল, “থাক বন্দি হয়ে। পুলিশকে আগে ডেকে আনি, তারপর তোর ব্যবস্থা হবে।” বলে হো গজগজ করতে করতে থানার দিকে হাঁটা দিল।
তক্ষুনি ছেলেটা জানলায় মুখ বাড়িয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “বিশ্বাস করো হো-বুড়ো, আমি চোর নই, আমি চোর নই। আমি তোমার বাজনা শুনতে এসেছিলুম। হো...”
হো হাঁটতে হাঁটতে তেমনি গলা চড়িয়ে উত্তর দিল, “ওসব প্রাণ-জুড়নো কথা অন্য জায়গায় বলবি। আগে উত্তম-মধ্যমের ব্যবস্থা করি, তারপর বাজনার কথা!” বলতে বলতে হো চলল। আর সত্যি সত্যিই পুলিশ ডাকতে চলল।
অগত্যা ছেলেটার চেঁচানি ঝিমিয়ে গেল। সে হাঁদার মতো জানলায় মাথা ঠেকিয়ে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে রইল। চেয়ে রইল রাস্তার দিকে, অনেকক্ষণ।
হো সত্যিই ভীষণ চটেছে! হনহন করে সে থানার দিকেই হাঁটছে। রেগে লাল টকটকে চোখ তার যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছে! বাব্বা! দ্যাখো আবার, একটা না কেলেঙ্কারি কাণ্ড করে বসে! হ্যাঁ, সে পুলিশকে কী কী নালিশ করবে, তার একটা ফিরিস্তি মনে মনে ভাঁজতে লাগল। ফিরিস্তিটা মস্ত না করলে তো নালিশ জবরদস্ত হবে না!
কিন্তু সে পুলিশকে বলবেটা কী? সেটা সে কিছুতেই গুছিয়ে ভাবতে পারছিল না। আচ্ছা ধরো, সে যদি বলে ছেলেটা একটা আস্ত ডাকু, সে তার পুতুল চুরি করেছিল! তখন কি সেটা একটা খুব গুরুতর অভিযোগ বলে পুলিশ মনে করবে। তা ছাড়া এটা কি খুব একটা বলার মতো কথা! পুতুল চুরি! শুনলে পুলিশ যদি মুচকি মুচকি হাসে! এমনকী হো’কে যদি পাগল ঠাওরায়! নাহ্, এ কথাটা বলা যাবে না। তার চেয়ে বলা ভাল ছেলেটা তার পকেট মেরেছে! কই না তো, পকেট তো সে মারেনি! এ তো ডাহা মিথ্যে! অমন একটা ছোট ছেলের নামে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যে বলা! ছিঃ, ছিঃ। হো বেঁচে থাকতে তা করতে পারবে না। তবে, ছেলেটা যে রাতের অন্ধকারে জানলা দিয়ে তার ঘরের ভেতর উঁকি মারছিল এটা তো বলা যাবে! এটা তো আর মিথ্যে নয়! কিন্তু কেন উঁকি মারছিল? নিশ্চয়ই চুরি করার মতলবে? নিশ্চয়ই তার ওই ব্যাঞ্জোটা সে চুরি করার ফন্দি এঁটেছিল! হ্যাঁ, এইটাই বেশ জবরদস্ত নালিশ! কিন্তু তবে যে ছেলেটা বলল, সে চুরি করতে আসেনি, সে তার ব্যাঞ্জো শুনতে এসেছিল! ছেলেটা কি তবে মিথ্যে বলল! না, না, তাই বা কেমন করে হবে! ওইটুকু একটা বাচ্চা ছেলে, সে কখনও মিথ্যে বলতে পারে না! তা ছাড়া ছেলেটার বয়েসই বা কত হবে! খুব জোর ন’ বছর। না, না। ন’ বছরের একটা বাচ্চা কখনও এ-কথাটা বানিয়ে বলতে পারে না। ছেলেটার মুখখানা, আহা...

এই দ্যাখো, বলতে বলতেই হো একেবারে আনমনে পুলিশ-থানার সামনেই চলে এসেছে। হো থানা দেখেই থমকে যায়। দাঁড়ায়। একটু ভাবে। তারপর থানার ফটকের দিকে পা চালায়! ঢুকতে যাবে, হঠাৎ মনটা কেমন যেন দোনোমনো করে উঠল। হঠাৎ যেন ছেলেটার মুখখানা মনে পড়ে যায়। তার সেই খিলখিল করে হাসির শব্দটা যেন কানে বেজে ওঠে। হো যেন শুনতে পায়, ছেলেটা চেঁচাচ্ছে, ‘আমি চোর নই, আমি চোর নই। আমি তোমার বাজনা শুনতে এসেছিলুম।’
মুখ ফেরায় হো। ছুট দেয় থানার সামনে থেকে। একটু দূরে এসে দাঁড়ায়। হাঁফায়। অমন ভয়ংকর রাগটা যেন নিমেষে ফুস করে উবে গেল। একটা অজানা ভয়ে মানুষটা যেন কুঁকড়ে যায়। অবাক কাণ্ড! হঠাৎ এত ভয় কীসের? ওই যে পুলিশের হাতে লাঠি, ওই দেখে ভয় পেয়েছে। লাঠিটা কত বড়। নিশ্চয়ই খুব শক্ত। ছেলেটার নামে নালিশ করলে পুলিশ তো তাকে ছেড়ে দেবে না। ওই লাঠি দিয়েই হয়তো মারবে। না, না। ওই লাঠি কখনও সহ্য করতে পারে একটা ওইটুকু বাচ্চা ছেলে! মাথা ফাটলে? রক্ত ঝরলে? আহা রে, সত্যি, কী সুন্দর হাসে ছেলেটা। দাঁতগুলো ঝকঝকে সাদা না হলেও, কেমন থরে থরে সাজানো। চোখদুটো কী অদ্ভুত নীল! হাসলে ঠোঁটদুটিতে কেমন ঢেউ খেলে!
নালিশ করা তার হল না। ছেলেটার মুখখানা যতই তার চোখের ওপর ভেসে উঠছে, নালিশ করার কথা ততই তার মন থেকে মুছে যাচ্ছে। তাই তো, ছেলেটা কে?
হো আর একদণ্ড দাঁড়াল না সেখানে। ফিরে চলল। কিন্তু কোথায় ফিরে যাবে? পুলিশের লোক সঙ্গে না নিয়ে হো একা ঘরে ফিরলে, ছেলেটা যদি মজা করে হাততালি দিয়ে বলে, পুলিশ এল না, এল না, তখন? ছিঃ, ছিঃ! কী লজ্জা!
তার চেয়ে আরও লজ্জার কথা আছে।
কী?
ছেলেটাকে ঘরে বন্দি করে রাখাটাও কি লজ্জার কথা নয়!
ইস! তাই তো! কী করা যায় এখন! হেরোর মতন এখনই ঘরে ফেরাটা কি ঠিক হবে? না, বেলা পড়লে যাবে?
বেলা পড়লে যাবে কী! তা হলে অতক্ষণ ছেলেটা না খেয়ে থাকবে! কে জানে, কাল থেকেই ছেলেটা হয়তো উপোস করে আছে! এই কথাটা মনে হতেই হো’র বুকটা কেমন যেন ধক করে উঠল। এখনই তো তা হলে ওর জন্যে কিছু খাবার নিয়ে ঘরে ফিরতে হয়!
হো বাজারের দিকে হাঁটল। আজ তার সঙ্গে ব্যাঞ্জো নেই। সুতরাং তাকে যারাই দ্যাখে অবাক হয়ে চিৎকার করে, “হো-বুড়ো, হো-বুড়ো, তোমার এ কী অবস্থা! গায়ে কোট নেই, হাতে ব্যাঞ্জো নেই, কী হয়েছে?”
এতক্ষণে হো’র খেয়াল হল, তাই তো, কোটটা তো সে গায়ে না দিয়েই বেরিয়ে পড়েছে! খাবার কিনবে কোত্থেকে! পয়সা তো কোটের পকেটে! হো’র সব মতলব গুবলেট হয়ে গেল। যারা চিৎকার করছিল তাদের দিকে শুকনো মুখে হো তাকাল। তারপর কাঁচুমাচু হয়ে বলল, “দ্যাখো বাবারা, বাড়িতে আমার অতিথি এসেছে। খাবার কিনব বলে বেরিয়ে এখন দেখছি কোটটাই পরা হয়নি।”
“কী ভুলো মন তোমার!” সবাই চেঁচিয়ে উঠল।
“ভুলোই বটে। কোট রইল ঘরে, পয়সা রইল কোটের পকেটে, এদিকে আমি এসেছি খাবার কিনতে। যাই, আবার ফিরে হাঁটি। পাপের শাস্তি আর কাকে বলে!” বলে, হে পিছু ফিরল।
হো-বুড়োকে ফিরতে দেখে সঙ্গে সঙ্গে একজন ডাক দিল তাকে। বলল, “হো-বুড়ো, আবার কষ্ট করে ঘরে ফিরবে কেন? আমি তোমায় খাবার কেনবার পয়সা দিচ্ছি। কাল ভাল করে ব্যাঞ্জো শুনিয়ে শোধ করে দিও!”
হো খুশিতে উছলে চেঁচিয়ে উঠল, “নিশ্চয়ই!” তারপর পয়সা নিয়ে, তাকে অনেক ধন্যবাদ দিতে দিতে দোকানের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
খাবার নিয়ে বুড়ো যখন ফিরল, তখন অনেক বেলা হয়ে গেছে। সারা পথটাই সে হাঁটতে হাঁটতে ভেবেছে, ছেলেটার সামনে এই মুখ নিয়ে সে কেমন করে দাঁড়াবে। কোন মুখে সে তার সঙ্গে কথা বলবে! যাই হোক আর তাই হোক, একটা বাচ্চা ছেলেকে ঘরের ভেতর অমন করে আটকে রাখাটা কি উচিত কাজ হল! মনটা তার দগ্ধে দগ্ধে জ্বলে যাচ্ছে!
নিজের ঘরের সামনে এসে হো একটু দাঁড়াল। কী করবে এখন? ভেতরে যাবে কি যাবে না, এই কথাটা ভাবতে ভাবতে হো ঘরের জানলা দিয়ে উঁকি মেরে চমকে উঠল। আরে! এ কী! ছেলেটা মাটিতে পড়ে আছে কেন? ঘুমিয়ে পড়েছে নাকি! তাড়াতাড়ি দরজার তালাটা খুলে ফেলে, হন্তদন্ত হয়ে ঘরে ঢুকে পড়ল। এক পলক ছেলেটার দিকে চেয়েই অবাক হয়ে গেল ঘরের চেহারাটা দেখে। তকতক করছে চারদিক। এতদিন ঝুল আর ধুলোয় থিকথিক করত ঘরটা। সব সাফ! দ্যাখো, দ্যাখো, হো’র ময়লা, ছেঁড়া বিছানাটা পর্যন্ত কেমন সুন্দর করে গুছিয়ে রেখেছে! ধুলধুলি, নোংরা-চিরকুট কোটটা ঝেড়েঝুড়ে কেমন টাঙিয়ে রেখেছে! কাজটা যে কার, সে তো আর বুঝতে বাকি নেই হো’র। হঠাৎ কেন জানি, হো’র চোখদুটিও ছলছলিয়ে ওঠে। বুঝি-বা আনন্দে! সত্যি, মানুষ মানুষকে কেন এত ব্যথা দেয়! কেন এত দুঃখ দেয়! এত ভুল বোঝে! হো’র মনে হল ছেলেটাকে সে এক্ষুনি জড়িয়ে ধরে আদর করে। বলে, তুই কিছু মনে করিস না বাবা। আমি বুড়ো হয়েছি। তাই মাথাটা ঠিক রাখতে পারিনি। শুধুমুধু তোকে কষ্ট দিয়েছি।
না, তা সে বলল না। ও এখন ঘুমোচ্ছে। ঘুমোক। কাল সারারাত বাইরে, ঘরের দোর-গোড়ায় পড়ে ছিল। হয়তো ভাল ঘুম হয়নি। আহা থাক, থাক, এখন একটু ঘুমোতে দাও ওকে!
হো সত্যিই ডাকল না। তার জন্যে দোকান থেকে সে ক’টা রসগোল্লা কিনে এনেছিল। ভাঁড়টা তার পাশে রেখে, কী মনে হল, ব্যাঞ্জোটা হাতে তুলে নিল। তারপর তারের ওপর খুব আলতো হাত বুলিয়ে, কী একটা সুর বাজাতে শুরু করল। খুব অস্পষ্ট স্বপ্নের মতো দুলে ওঠা সেই সুর। হয়তো হো ভেবেছিল, সেই সুর হাওয়ায় হাওয়ায় ছড়িয়ে পড়লে ছেলেটার চোখে এই সুখের ঘুম আরও অনেকক্ষণ জড়িয়ে থাকবে। কিন্তু বাজাতে বাজাতে হো এমনই বিভোর হয়ে গেছল, কখন যে ছেলেটা উঠে পড়েছে, সে তার খেয়ালই হল না।
ছেলেটার ঘুম ভেঙে গেছল আচমকা ওই ব্যাঞ্জোর সুরে। আচ্ছা আনমনা মানুষ তো হো-বুড়ো! ছেলেটা যে বসে বসে শুনছে তার বাজনা, সেটুকু দেখারও ফুরসত নেই তার! বুঝি বা হো’র বুকের ভেতরটা এই মুহূর্তে, সুরের ছোঁয়ায় মাতোয়ারা!
হঠাৎ চমক ভাঙল হো’র। হঠাৎ বাজনা থামল। মুহূর্তে তার নজর পড়ল ছেলেটার দিকে। এ কী, ছেলেটার ঘুম ভেঙে গেছে! দেখতে দেখতে চোখে চোখ পড়ে গেল! হো ঝট করে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ছেলেটা তাই দেখে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “থামলে যে? আমার খুব ভাল লাগছিল।”
হো গম্ভীর।
ছেলেটা বলল, “বাব্বা! কী গম্ভীর! এই দেখলুম চোখ বুজে ব্যাঞ্জো বাজাচ্ছে, হাসি হাসি মুখ! এখন কী হল আবার যে, মুখখানা গোমড়া হয়ে গেল! পুলিশ কই?”
ছেলেটার এই কথা শুনে হো বিদ্যুতের মতো একবার শুধু তার মুখের দিকে দৃষ্টি হানল। পরক্ষণেই চোখ ফিরিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “সামনে রসগোল্লা!”
“কার?”
“কার আবার, যার খিদে পেয়েছে।”
“কার খিদে পেয়েছে?”
“এতক্ষণ যে ঘুমোচ্ছিল, তার পেয়েছে।”
এই কথা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা আবার খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, “আমি আগেই জানতুম, তুমি খুব ভাল লোক।”
হো এবার একটু হালকা গলায় বলল, “ঠিক আছে। এখন খেয়ে নিয়ে আমাকে কেতাত্থ করো।”
ছেলেটা উত্তর দিল, “কই, আমার তো খিদে পায়নি!”
“জানতে পারি, রাত্তিরে কী খাওয়া হয়েছে?”
“আমিও কি জানতে পারি, তুমিই বা রাত্তিরে কী খেয়েছ?” ছেলেটা উলটে জিজ্ঞেস করে বসল।
“সে জমাখরচের দরকার নেই তোমার। যা বলা হচ্ছে, তাই করা হোক। পাশে নদী আছে। মুখ ধুয়ে এসে ভাঁড়টা খালি করে আমাকে রেহাই দাও!”
ছেলেটা এবার কোনও কথা না বলে ভাঁড়টার দিকে তাকাল। তারপর হাতে নিল। উঠে দাঁড়াল। হো’র কাছে এগিয়ে গেল। বলল, “খেতে পারি, যদি আমার কথা রাখো!”
“জানতে পারি, কথাটা কী?”
“তোমাকেও খেতে হবে। আর আমাকে বাজনা শোনাতে হবে।”
হো ছেলেটার কথা শুনে, কোনও উত্তর না দিয়ে, চুপ করে বসে রইল।
হো’কে চুপ দেখে ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, “তার মানে তুমি রাজি নও! বেশ, তা হলে এই রইল রসগোল্লার ভাঁড়। আমি চললুম।”
সঙ্গে সঙ্গে বুড়ো চেঁচিয়ে উঠল, “না, যাবি না।”
তখন ছেলেটা বলল, “তা হলে খাও!”
অগত্যা হো বলল, “বেশ খাচ্ছি। কিন্তু একটার বেশি নয়!”
“বেশ তো, একটাই খাও!” বলে ছেলেটা নিজে ভাঁড় থেকে একটা রসগোল্লা বার করে হো’র মুখের কাছে ধরল। হো ফোকলা দাঁতের ফাঁক দিয়ে রসগোল্লাটা সড়াত করে মুখে টেনে নিল। ক’ফোঁটা রস ছেলেটার হাতে ছিটকে লাগল। ছেলেটা হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “আমি হলে চট করে মুখ-চোখটা ধুয়ে আসি।” বলে ছেলেটা নদীর ঘাটে ছুটল।
ছেলেটা চলে গেল। হো সেই তক্কে রসগোল্লাটা চিবুতে চিবুতে ভাবল, ‘ছেলেটা যেমন মিষ্টি, তেমনি মিষ্টি রসগোল্লাটা। দোকানদার বেড়ে বানিয়েছে কিন্তু!’
ছেলেটা ঘরে ঢুকল। বলল, “নাও, এবার ব্যাঞ্জো বাজাও!”
হো অমনই সঙ্গে সঙ্গে এবার নিজে রসগোল্লার ভাঁড়টা হাতে নিয়ে বলল, “আগে তুই খেয়ে নে!” বলে, একটা রসগোল্লা ভাঁড় থেকে তুলে নিয়ে ছেলেটার মুখে তুলে দিল। ছেলেটা তার এতটুকু হাঁ-মুখে অত বড় রসগোল্লাটা পুরে ফেলে, না পারে গিলতে, না পারে ওগরাতে। শেষে কোনওরকমে সামাল দিয়ে হাঁফ ছাড়ল। আর একটু হলেই বিষম লেগে যেত! তারপর দাঁতের ফাঁকে বেশ ক’টা মোক্ষম চিবুনি দিয়ে বলল, “দারুণ খেতে কিন্তু!” তারপর নিজেই ভাঁড় থেকে আর একটা রসগোল্লা তুলে টপ করে মুখে ফেলে দিল। আঃ! রস টুসটুস করছে!
তারপর আরও একটা।
শেষকালে যত ছিল, সব। ভাঁড় ফাঁকা! হাতে যেটুকু রস লেগেছিল, চেটেপুটে তাও সাফা করে ফেলল।
হো ছেলেটার খাওয়ার রকমসকম দেখে আর থাকতে পারল না। ফোকলা দাঁতে ফ্যা-অ্যা-অ্যা, ফ্যা-অ্যা-অ্যা করে হেসে উঠল। ছেলেটাও হেসে ফেলল। হাসতে হাসতে বলল, “আমি একটা রাক্ষস, না?”

হো হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করল, “আর খাবি?”
ছেলেটা বলল, “না। আর না। পেট ভরে গেছে।”
হো জিজ্ঞেস করল, “কী এমন খেলি যে, পেট ভরে গেল?”
ছেলেটা উত্তর দিল, “এতদিন তো রসগোল্লা মিষ্টির দোকানের গামলাতেই ভাসতে দেখেছি। আজ পেটে পড়ল। সঙ্গে সঙ্গে পেট ভরে গেল।”
ছেলেটার কথা শুনে হো’র হাসিমুখ কেমন যেন চুপসে গেল।
ছেলেটা বলল, “এবার তা হলে হোক!”
“কী?”
“ব্যাঞ্জো। বাজাও!”
“যদি না বাজাই!”
“তা হলে মনে করব, তুমি আমার সঙ্গে হুড়কুষ্টি করলে!” বলে, ছেলেটা হো’র মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
হো যেন একটু ব্যস্ত হয়েই বলল, “এই দেখেছিস, তোর নামটাই শোনা হয়নি!”
“নামটা আমার একদম শোনার মতো নয়।”
“তবু শুনি?”
“না, শুনতে হবে না।”
“তবে ডাকব কী বলে?”
“জানি না।”
“সে কী!”
“এখন আমি তোমায় নাম বললে, তুমি সঙ্গে সঙ্গে ঠিক জিজ্ঞেস করবে, কোথায় থাকি, বাবা কী করে, ক’ভাই, ক’ বোন, নিজের বাড়ি, না ভাড়া বাড়ি, এমনই আরও সাত-সতেরো।”
“কেন, বললে দোষ কী?”
এবার ছেলেটা একটু থামল। গলাটা তার ভার হয়ে গেল। তারপর যেন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। বলল, “বলার কথা আমার কিছু নেই। কারণ আমার কেউ নেই!”
শিউরে উঠল হো, “কেউ নেই!” তারপর অপলকে ছেলেটার মুখের দিকে চেয়ে রইল।
কতক্ষণই বা চেয়েছিল, হঠাৎ ছেলেটাই আবার হেসে উঠে সেই নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল। তারপর বলল, “শোনো, শোনো, হো, আমার নাম মন। আমার বাড়ি নেই, মা নেই, বাবা নেই, কেউ নেই। আমি একা।”
“একা!” হো চমকে তাকায়।
মন নামে সেই ছেলেটা বলল, “তুমিও তো একা!”
“কে বলল?” হো’র চোখের পাতা কেঁপে উঠল।
“বলেনি কেউ, নিজে দেখছি।”
একটু চুপ করে রইল হো।
মন জিজ্ঞেস করল, “চুপ করলে কেন?”
হো উত্তর দিল, “এমনি।”
“ব্যাঞ্জো বাজাবে না?” মনের আবার জিজ্ঞাসা।
“বাজাব,” উত্তর দিল হো, “আমার বাজনা তোর ভাল লাগে?”
“খুব ভাল লাগে। কতদিন তোমার পেছনে ঘুরে ঘুরে কত শুনেছি।”
“এত শুনেছিস, তবে আরও কেন শুনতে চাস?”
“এতদিন দূর থেকে শুনেছি। আজ তোমার কাছে বসে শুনব।”
“শিখবি?”
ছেলেটার মুখের ওপর চকিতে যেন একটা ভয়ের ছায়া উঁকি দিল। ছেলেটা যেন আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠল, “না, না, আমি ব্যাঞ্জো শিখব না, কিছুতেই না।”
হো মনের মুখের দিকে অবাক দৃষ্টিতে চেয়ে জিজ্ঞেস করল, “কেন রে?”
মন তেমনই ভয়ে ভয়েই বলল, “সে-কথা জিজ্ঞেস কোরো না। তুমি যদি বাজাতে পারো তো বাজাও, নইলে আমায় যেতে দাও।”
হো কী ভাবল কে জানে! আর কথা না বাড়িয়ে ব্যাঞ্জোটা হাতে তুলে নিল। তারপর বাজাতে শুরু করল।
অনেক, অ-নে-কক্ষণ বাজাল। তারপর যখন থামল, মনে হল, যেন অনেক ফুলের পাপড়িতে, অগুনতি মৌমাছি গুনগুন করে নাচতে নাচতে এই মাত্তর আকাশে হারিয়ে গেল। দু’জনেই নিশ্চপ। চারদিক নিথর।
অনেকক্ষণ পর মনই প্রথম কথা বলল, “তুমি এত ভাল বাজাও কেমন করে হো? তুমি জাদু জানো।”
হো একটু মুচকি হাসল। তারপর হঠাৎ জিজ্ঞেস করল, “মন, তুই আমার কাছে থাকবি? এই ঘরে, আমার সঙ্গে?”
হো-বুড়োর এই কথা শুনে মন নামে ওই ছোট্ট ছেলেটার চোখের সামনে যেন এক ঝলক খুশি পলকে উছলে পড়ল। আর একটু হলেই সে হয়তো চেঁচিয়ে উঠত, হ্যাঁ থাকব। কিন্তু নিমেষে সে নিজেকে সামলে নিল। নিজের খুশিটাকে বুকের মধ্যে আগলে নিয়ে সে স্পষ্ট গলায় বলল, “না।”
“না কেন?” হো সহজ সুরে জিজ্ঞেস করল।
মন জবাব দিল, “আমি থাকলে তোমার কষ্ট হবে।”
বুড়ো হো মনের কথা শুনে হা-হা করে হেসে উঠে বলল, “দুর বোকা, কষ্ট হবে কেন? তুই আমার কাছে থাকলে, আমার ভাল লাগবে। তুইও একা, আমিও একা।”
“তারপর ক’দিন পরে আমার জ্বালায় যদি বিরক্ত হও?” জবাব দিল মন।
হো বলল, “কী আর বিরক্ত করবি তুই! যা দুটো জুটবে, দু’জনে ভাগ করে খাব। আর এই ঘরে দু’জনে ভাগাভাগি করে শোব।”
মন খানিক চুপ করে রইল। কিছু ভাবল। তারপর বলল, “যদিও থাকি, আমি এমনি এমনি থাকব না। একটা কাজ দাও তো থাকতে পারি।”
“বেশ তো, আমি ব্যাঞ্জো বাজাব, তুই আমার সঙ্গে ঘুরবি। যারা আমার বাজনা শুনবে, তাদের কাছে আমার হয়ে পয়সা আদায় করবি।”
মন বলল, “রাজি।”
“তারপর আস্তে আস্তে আমি তোকে ব্যাঞ্জোটা বাজাতে শিখিয়ে দেব। তুই বাজাবি।”
মন হো’র কথা শুনে, একইভাবে ভূত দেখার মত চিৎকার করে উঠল, “না। ও কথা বললে, আমি চলে যাব কিন্তু।” উত্তেজনায় কাঁপছে যেন ছেলেটা।
হো নরম গলায় আদর করে বলল, “শিখে রাখলে তোরই কাজে লাগবে।”
ছেলেটা এবার তিতিবিরক্ত হয়েই উত্তর দিল, “বলছি তো, আমি শিখব না। কেন বারবার ওই কথা বলছ?”
হো এবার অস্ফুট স্বরে বলল, “যা ভাল বুঝিস।”
সেইদিন থেকে মন নামে সেই ছেলেটা হো’র কাছে থেকে গেল। এতদিন দু’জনে ছিল একা-একা। এখন দু’জনেই দুটি সঙ্গী পেল। এখন দু’জনেই দুটো কথা বলে। দু’জনেই গল্প করতে করতে প্রাণ খুলে হাসে। হো পথে পথে বাজনা বাজায়। আর মন পয়সা আদায় করে থলিতে ভরে নেয়। তারপর রাতে ঘরে ফিরে, দুটো খেয়ে। দু’জনে ঘুমিয়ে পড়ে।
এমনই করে থাকতে থাকতে দু’জনে দু’জনের বড় আপন হয়ে গেল। এখন দু’জনেই জানে কেউ তারা একা নয়। হো যেন ভাবতেই পারে না, ছেলেটা তার নিজের ছেলে নয়। আর মনও জানে হো তার আপনজন, কাছের মানুষ। ছেলেটা যে কোত্থেকে এল, না-এল, এ-কথা যেমন হো কোনওদিন ভাবেনি, মনও তেমনি হো’রা কে ছিল, না-ছিল এ-নিয়ে মাথা ঘামায়নি। হো’র শুধু একটাই দুঃখু, ছেলেটাকে সে ব্যাঞ্জোটা শেখাতে পারল না। ছেলেটা শুনবে, তবু শিখবে না। শেখার নাম শুনলেই মাথায় বাজ পড়ে। কেন? উত্তর পায় না হো।
বেশ চলছিল। হঠাৎ হল কী, হে একদিন খুব বৃষ্টিতে ভিজল। বয়স হলে যা হয়, সর্দি-কাশি, জ্বর-জ্বালা। সে যে তা বলে ইচ্ছে করে ভিজেছে, তা মনে কোরো না। মনে কোরো না যেন, বাচ্চারা যেমন বৃষ্টির জলে ভিজে ভিজে নাচানাচি করে, হো-ও তেমন ভিজে ভিজে নেচেছে। সেদিন পথের মাঝে হঠাৎ ঝড় উঠল, ঝমঝম করে বৃষ্টি নামল। আর এমন বরাত, কাছেপিঠে মাথাটা বাঁচাবার মতো একটাও জায়গা জুটল না তার! অগত্যা ভিজল। ভিজে ঢোল হয়ে যখন ঘরে ফিরল, তখন ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ শুরু হয়ে গেছে। বুকে সর্দি বসল। আর রাত না পোয়াতেই ‘হি-হি’ করে জ্বর এল, গা একেবারে আগুন! বেচারা না পারে উঠতে, না কিছু করতে।
একদিন গেল, জ্বর ছাড়ল না।
দু’দিন গেল, জ্বর ছাড়বে কোথায়! বাড়ল।
তিনদিনের দিন হো একেবারে কাহিল।
মন তো ভীষণ বিপদে পড়ল। সে তো ছোট্ট। কী করবে সে, কিছুই ভেবে পায় না। তার ওপর যে ক’টা পয়সা ছিল, এ ক’দিনে সব খরচ হয়ে গেছে। বসে বসে খরচ করলে যা হয়! এক পয়সা আয় নেই, দু’পয়সা খরচ। এখন কী হবে? এক্ষুনি যে একজন ডাক্তার ডেকে এনে হো’কে দেখানোর দরকার, সে-কথাটা মন হাড়ে হাড়ে বুঝলেও সামর্থ্য নেই। কী ফ্যাসাদ বলো। মানুষটা কি শেষে ওষুধ-পথ্যির অভাবে চোখ বুজবে! ছেলেটার ভয়ে মুখ শুকিয়ে এইটুকুনি। সে একবার এদিকে যায়, একবার বাইরে ছোটে। কিন্তু তাতে কী হবে।
শেষে হো তার এই অবস্থা দেখে তাকে কাছে ডাকল। খুব কষ্ট করে জিজ্ঞেস করল, “কী রে? পয়সা ফুরিয়ে গেছে?”
মন কোনও উত্তরই দিতে পারল না।
হো আবার তেমনই কষ্ট করে জিজ্ঞেস করল, “কী হবে তা হলে?”
এবার মন কাঁদো কাঁদো স্বরে উত্তর দিল, “জানি না।”
হো বলল, “দ্যাখ দিকিনি, ব্যাঞ্জোটা শিখে রাখলে তো আর এমন বিপদে পড়তে হত না তোকে।”
এবার কিন্তু মন চুপ করে থাকল। রাগল না। বিরক্ত হল না।
হো ছেলেটাকে অমন চুপ থাকতে দেখে, আবার জিজ্ঞেস করল, “তা হলে এখন কী হবে?”
তবু কোনও উত্তর দিল না মন। ওর চোখ ছলছল করছে।
হো জিজ্ঞেস করল, “কী করবি এখন? ভিক্ষে?”
মন এবার চমকে চাইল। চোখের জলটা মুছে বলল, “ভিক্ষে করতে যাব কোন দুঃখে।”
“তবে?”
“দেখি।”
“কবে দেখবি? আমি মরে গেলে?”
শিউরে উঠল মন। আহা রে, সত্যিই, মানুষটার কী চেহারা হয়েছে এই ক’দিনে! চোখদুটো কোটরে ঢুকেছে। ঠোঁটদুটো শুকিয়ে গেছে। কপালে বলিরেখা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সত্যিই কি হো মরে যাবে! বেশিক্ষণ হো’র মুখের দিকে চাইতে পারল না মন। যেটুকু চোখের জল একটু আগে মুছেছিল, সে-জল আবার ছলছলিয়ে উঠল। তারপর যখন চোখ বেয়ে উপচে পড়ল, তখন মন হো’র বুকের মধ্যে নিজের মুখটা লুকিয়ে ডুকরে কেঁদে ফেলল।
মনকে অমন করে কাঁদতে দেখে হো তার শীর্ণ হাতটা অনেক কষ্টে তার মাথায় রাখল। আদর করল। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তোর খুব খিদে পেয়েছে, না রে?”
মন সে-কথার কোনও উত্তর না দিয়ে হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠে বলল, “তোমায় আমি মরতে দেব না হো। তুমি আমার সব। তুমি চলে গেলে কে আমায় ভালবাসবে!”
“একদিন তো মরতে হবে।” হো’র মুখে অস্পষ্ট কষ্টের হাসি।
“আমি তোমায় বাঁচিয়ে রাখব।” মনের গলায় সে কী দৃঢ়তা।
“কেমন করে?” জিজ্ঞেস করল হো।
“যেমন করে পারি।” উত্তর দিল মন।
হো তেমনই ধীরে ধীরে মনের মাথায় হাত বুলাতে বুলোতে বলল, “আমি বেঁচে থাকতুম, যদি তুই ব্যাঞ্জোটা আমার কাছে শিখে নিতিস।”
এবার যেন আকুল হয়ে মিনতি করল মন, “তুমি আমায় ও-কথা বোলো না হো, ও কথা বোলো না। আমার কষ্ট হয়।”
হো এবার করুণ স্বরে বলল, “বেশ, আর বলব না, কোনও দিনও বলব না। শুধু একটা কথা বলি, তুই চোখের জল ফেলিস না। আমি দেখতে পারি না।”
হো’র বুক থেকে নিজের মাথাটা তুলে নিল মন। চোখ মুছল। তারপর বলল, “হো, তুমি শুয়ে থাকো, আমি তোমার জন্যে ওষুধ নিয়ে আসি।”
হো ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “কোত্থেকে আনবি?”
মন বলল, “এতদিন তুমি কত লোককে বাজনা শুনিয়েছ। কত লোক তোমায় চেনে। তোমায় সক্কলে ভালবাসে। যাকে বলব, দেখবে সে-ই ওষুধ কিনে দেবে!”
হো হাসল।
মন বলল, “আমি তা হলে যাই!”
“তাড়াতাড়ি আসবি।”
“হ্যাঁ, যাব আর আসব।” বলে, মন ছুট দিল।
ছুটতে ছুটতে মন একেবারে সটান বাজারে চলে এল। আর ওদিকে হো একলা ঘরে শুয়ে শুয়ে যন্ত্রণায় কাতরাতে লাগল।
বাজারে অনেক লোক। অনেক লোকের কত লোককে মন চেনে। মন ভাবল, ওদের বললে, নিশ্চয়ই কাজ হবে। তাই মন প্রথমজনের কাছে ছুটে গেল। বলল, “শুনুন, হো-বুড়োর অসুখ করেছ। ওষুধ কেনার পয়সা নেই। আপনি...”
মনের কথা শেষ হল না, লোকটা নাক উঁচিয়ে চলে গেল।
মন আর একজনের কাছে গেল। তাকেও ওই একই কথা বলল। লোকটা মুখ ফিরিয়ে চলে গেল।
আর একজন মুখ টিপে হাসল।
কেউ কেউ ঠাট্টা করল। টিটকিরি দিল।
একজন বলল, “বুড়ো হলে মানুষ মরবে না! মরতে দাও, মরতে দাও! মানুষটা শান্তিতে মরুক।”
মন আকুল হয়ে বলল, “এতদিন সে তোমাদের বাজনা শুনিয়ে আনন্দ দিয়েছে। আজ সে উপোস করে মরতে বসেছে। তোমরা কি তার জন্যে কিছু করতে পারো না?”
মনের কথা শুনতে বয়ে গেছে তাদের। চলে গেল।
মন থ হয়ে যায়। মানুষ কী স্বার্থপর, নিষ্ঠুর। ভয়ংকর স্বার্থপর এক দানবের গল্প শুনেছিল মন অনেক দিন আগে। তার মনেও দয়া ছিল। কিন্তু মানুষ এত নির্দয়!
কেমন যেন নিরাশ হয়ে যায় মন। আর যেন পা চলছে না তার। বড্ড ক্লান্ত সে। তবু মনটাকে অনেক শক্ত করে এতক্ষণ হেঁটেছে। এখন যেন আর পারছে না। এদিকে বেলাও পড়ে যাচ্ছে। অথচ শূন্য হাতে সে কেমন করে হো’র সামনে গিয়ে দাঁড়াবে। তবে কি সে-ই ভুল করল! তবে কি হো’র কথামতো সে ব্যাঞ্জোটা বাজাতে শিখলে এত কষ্ট হত না হো’র। কী যে করবে, সব যেন গোলমাল হয়ে যাচ্ছে ভাবতে ভাবতে।
আর দাঁড়াতে পারছিল না মন। বিকেলের পড়ন্ত রোদের ছায়ায় একটা অর্জুন গাছের নীচে সে বসে পড়ল। এখন মাথায় তার কিচ্ছু বুদ্ধি আসছিল না। দেহের মতো মাথাটাও তার ঝিমঝিম করছে। ছিঃ, ছিঃ, যে-মানুষটা তাকে এত ভালবাসে তার কেন অবাধ্য হল মন! কেন সে শিখল না ব্যাঞ্জোটা! না-জানি কত দুঃখ পেয়েছে মানুষটা!
দুঃখ কি মনেরও কম! সে কেমন করে তার হো’কে বোঝাবে যে, সত্যিই ওই বাজনাটা বাজাবার কথা বললে তার ভয় লাগে! কেন না, এই বাজনার জন্যেই মনের সব কিছু হারিয়ে গেছে। হারিয়ে গেছে মা, তার বাবা, তাদের সেই ছোট্ট বাড়িটা, সব কিছু। মনের বাবাও ছিল হো’র মতো এক মস্ত বাজনদার। ওর বাবাও বাজাত ব্যাঞ্জো। ওদের বাড়িটা ছিল নদীর ধারে। ওরা ছিল নদীর মানুষ। প্রত্যেক বছর বর্ষার শেষে যখন ফসলের চারাগুলি রোদের ছোঁয়ায় সোনা রঙে দুলে উঠত, তখন নদীর ধারে, দূর এক গ্রামে মেলা বসত। ওই মেলায় কত রকমের পসরা নিয়ে মানুষ যেত বিকিকিনি করতে। যেত মন, তার মা, বাবাও। নদীতে নৌকো ভাসত। ঢেউ উঠত। সেই ঢেউয়ে দুলে দুলে মনের বাবা ব্যাঞ্জো বাজাত, মা গান গাইত। সে গান ছিল নদীর গান। সেই সুর বাতাসের সঙ্গে লুকোচুরি খেলতে খেলতে দূর থেকে দূরে, আরও দূরে ভেসে যায়! আঃ! সে কী খুশির সুর!
কিন্তু এক বছর হল কী, এমনই করে যেতে যেতে মাঝদরিয়ায় হঠাৎ মেঘে মেঘে ছেয়ে গেল আকাশ। তুফান উঠল, বাজ পড়ল, তারপর ভয়ংকর ঝঞ্ঝায় তাদের নৌকো জলের নীচে তলিয়ে গেল। কে যে কোথায় গেল, কেউ জানে না। কে মরল, কে বাঁচল তার খবর কে রাখছে তখন!
কিন্তু মন বেঁচে গেল। কেমন করে বাঁচল, সে নিজে আজও তা জানে না। তাকে পাওয়া গিয়েছিল নদীর চরে। হয়তো ঝড়ের সঙ্গে, নদীর সঙ্গে লড়াই করতে করতে সে জিতে গিয়েছিল। কিন্তু এ-জয়, তার মুখে হাসি ফোটায়নি। কেন না, সেদিন থেকে সে মাকে হারিয়েছে, বাবাও নেই। পৃথিবীতে মন একা। কেবলই একা। তারপর থেকেই তো ওই ব্যাঞ্জোকে তার ভীষণ ভয়! ওর মন শুধু শুনতে চায় এই বাজনার সুর। শুধু শুনবে। শুনতে শুনতে ও যেন দেখতে পায় বাবাকে, অস্পষ্ট বাবার মুখখানি! কিংবা মায়ের চোখদুটি! কিন্তু ভাবে, ওই ব্যাঞ্জো বাজাতে বাজাতেই তো ঝড় উঠেছিল, ওই ভয়ংকর ঘূর্ণি হাওয়া! হো’কে তার এই দুঃখের কথাটা কত দিন বলতে গিয়েও বলতে পারেনি মন। যদি মানুষটা ব্যথা পায়! ওই বুড়ো মানুষটাও যে একা!
গাছের নীচে বসে বসে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল মন। বেলা যে কখন সাঁঝের বেলায় গড়িয়ে গেছে, সে তার খেয়াল ছিল না। হঠাৎ যখন ওর ঘুম ভাঙল, তখন পাখিরা গাছে ফিরে গেছে। আকাশে একটি দুটি তারা ফুটেছে। হয়তো আর একটু পরেই আঁধার ছেয়ে যাবে। বুকটা ধক করে উঠল মনের। ছিঃ, ছিঃ! এ কী! সে ঘুমোচ্ছে! প্রায় লাফিয়ে সে উঠে দাঁড়াল। ব্যাস! সঙ্গে সঙ্গে ঠুং-ঠাং, ঝনাত! শিউরে উঠল মন। কীসের শব্দ! কী পড়ল! সেই আলো-আঁধারিতে চোখ মেলে সে চমকে গেল, আরে, এ যে টাকা! তারপর সে চিৎকার করে উঠল, “টাকা!” কে দিল? কোত্থেকে এল? নিশ্চয়ই কোনও দয়ালু মানুষ তাকে এমন করে গাছের নীচে পড়ে থাকতে দেখে দিয়ে গেছে! টাকাগুলো সে গুনতে শুরু করল, একটা দুটো তিনটে, চারটে, ছ’টা, দশটা, অনেক টাকা। মনের বুকের ভেতরটা খুশিতে তোলপাড় শুরু করে দিয়েছে। ক্লান্ত পাদুটো তার হঠাৎ যেন হরিণের মতো ছুটতে চায়। সে ছুটল। কিছুটা ছুটেই একটা ডাক্তারখানা দেখতে পেল। সে চেঁচিয়ে উঠল, “ডাক্তারবাবু, ডাক্তারবাবু, আমার হো-বুডোর সর্দি-জ্বর। একটু ওষুধ দিন না, আমি পয়সা দেব!”
ডাক্তারবাবু সর্দি-জ্বরের ওষুধ দিলেন। পয়সা নিলেন। ওষুধ হাতে নিয়ে মন তিরের মতো ছুটতে লাগল।
ছুটতে ছুটতে একেবারে হো’র ঘরের সামনে। দরজা ঠেলে চেঁচিয়ে উঠল, “হো-বুড়ো, হো-বুড়ো, তোমার ওষুধ এনেছি।”
হো সাড়া দিল না।
মন আবার চেঁচাল, “হো, তুমি ঘুমোচ্ছ? তোমার ওষুধ!”
তবু সাড়া দিল না।
হো’র মুখের কাছে মন হুমড়ি খেয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “হো ওঠো। ওষুধ খাও!”
তবু নিশ্চুপ।
মন তখন হো’র বুকে হাত রেখে ঠেলা দিল। তারপর থতমত খেয়ে গেল। মনের হাতটা কেঁপে উঠল। ওষুধটা হাত ফসকে মাটিতে ছিটকে পড়ল। এ কী! হো’র নিস্তেজ বুকটা এমন বরফ-ঠান্ডা কেন? চোখদুটো তার বুজে আছে। মুখখানি শান্ত!
মন হতবাক। সেই অন্ধকার ঘরে সে পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর হো’র বুকে মাথা রাখল। অস্ফুট স্বরে বলল, “তোমার কথা শুনিনি, তাই বুঝি আমার ওপর রাগ করে চলে গেলে! আমি তোমার কথা রাখব হো। তুমি ফিরে এসো। বিশ্বাস করো আমি ব্যাঞ্জো শিখব। তুমি যা বলবে, তাই করব।” বলতে বলতে মন হো’র সেই বরফ-ঠান্ডা নিস্তেজ দেহটা দু’হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরল। কিন্তু হো আর সাড়া দিল না।
কথা রেখেছিল মন। হো’র সেই ব্যাঞ্জোটা বুকে নিয়ে হারিয়ে গেল, অন্য আর-এক অজানা দেশে। যেন কেউ না খুঁজে পায় তাকে। নির্জন এক বনের গভীরে ঘুরে বেড়ায়। যেন কিছু একটা খুঁজে বেড়ায়। যেখানে অনেক পাখি গান গায়, কিংবা হাওয়ার দোলায় গাছের পাতারা যেখানে ঝিলমিলিয়ে নাচে, বা একটু দূরে পাথরের ওপর নাচতে নাচতে ঝরনার জল গড়িয়ে যায়, সেখানে সে দাঁড়ায়। সুন্দর ওই পাখি, এই ফুল, এই গাছ আর ঝরনা দেখতে দেখতে চোখ যেন জুড়িয়ে যায়। একটি পাথরের ওপর সে বসে। তারপর ব্যাঞ্জোর তারে আলতো হাতের স্পর্শ দেয়। ওই পাখির গান সে বাজাবার চেষ্টা করে।
পারে না।
ওই হাওয়ার ঝিলিমিলি?
তাও বাজে না সেই তারে।
ঝরনার টুং টাং?
বাজনায় সুর পায় না।
একদিন পারে না।
দু’দিন পারে না।
তিনদিনও না।
তবে কি মন কোনওদিনই পারবে না? ভাবতে ভাবতে ছটফট করে মন। তবে কি হো’কে মন যেকথা দিল, সে-কথা তার মিথ্যে হয়ে গেল? তা হলে এখন কী করবে সে? সে কি চলে যাবে এই বন ছেড়ে? নাকি, এই বনে বনেই সে ঘুরবে। ঘুরতে ঘুরতে চলে যাবে সেখানে, যেখানে তার হো-বুড়ো চলে গেছে? মন ভাবে আর কাঁদে। কাঁদে আর ব্যাঞ্জোর তারে হাত বুলোয়।
কিন্তু একদিন হঠাৎই এক আশ্চর্য জাদু কে যেন ওর হাতে ছুঁইয়ে দিল। কে যেন তার হাতটি ধরে তারে তারে সুর তুলে দেয়! মনের শরীরে যেন শিহরন লাগে। আপনমনে বাজিয়ে চলে মন্ত্রমুগ্ধের মতো!
বাজায়! বাজায়! বাজায়!
তারপর?
সে চিৎকার করে ওঠে আনন্দে, “আমি পেরেছি। হো, শোনো, আমি পেরেছি।” আকাশের দিকে তাকিয়ে সে কেঁদে ফেলে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ তার উপচে যায় অসংখ্য অশ্রুফোঁটায়। তবু সে বাজনা থামায় না। ঝরনার টুং টাং, পাতার ঝিলমিল আর পাখির কলতান সব যেন একসঙ্গে বেজে ওঠে তার ব্যাঞ্জোর তারে।
হঠাৎ সে থামে। চোখের জল সে মুছে ফেলে। তারপর সেই অজানা দেশের গভীর অরণ্য থেকে সে ছুট দেয়। ছুটতে ছুটতে সে বন পেরিয়ে এগিয়ে চলে বসতির দিকে। সে খুঁজে বেড়াবে হো’র সেই ছোট্ট ঘরখানা। তারপর সেই ঘরে সে বাসা বাঁধবে। অন্ধকার রাতে সবাই যখন ঘুমিয়ে পড়বে, নিঝুম হয়ে যাবে চারদিক, তখন সেই ঘরে একলাটি বসে বসে বাজনা বাজাবে মন। তখন হয়তো হো স্বর্গ থেকে নেমে এসে তার বাজনা শুনবে। হয়তো খুশিতে হেসে উঠবে, “হা-হা-হা।” সেই প্রাণখোলা হাসি।
কিন্তু এ কী! হো’র সেই ছোট্ট ঘরখানা কোথায় গেল? এই তো এইখানে ছিল। এখন নেই তো! ওই দূরে দেখা যাচ্ছে নদী। ওই তো কিছু গাছ, কিছু ঝোপনদীর ধারে, তেমনই আছে। কী হল বলো তো? কেউ কি ভেঙে দিল! সে উত্তর মন পেল না। দুঃখ হল বটে, তবে মুষড়ে পড়ল না। সে থামাল না তার বাজনা। সে যে হো’র কথা রেখেছে। আর থামবে না, কোনও দিনই না।
ব্যাঞ্জো বাজিয়ে হো’র মতনই পথে পথে ঘুরে বেড়ায় মন। তার হো’কে বাঁচাবার জন্যে যাদের কাছে আকুল হয়ে ঘুরেছে মন, সেই মানুষের দলই আজ তার বাজনা শোনে। আনন্দে উল্লাস করে। আর মন হাসে। ভারী তাচ্ছিল্য-ভরা সে হাসি। কেন না, সে জানে, আজ যারা তাকে নিয়ে মাতামাতি করছে, যেদিন হো’র মতো সে-ও অথর্ব হয়ে যাবে, সেদিন আর এরা তাকে চিনতে পারবে না। একটা ভাঙা পুতুলের মতো জঞ্জালে ফেলে দেবে।
আশ্চর্য, যতই দিন যায়, মনের বাজনার সুর যেন ততই মানুষকে চমকে দেয়! চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে মন নামে এই আজব ছেলের বাজনার গল্প। মানুষের মুখে মুখে রটে যায়, ছেলেটা সুরের জাদুকর। যাদের নাম ছিল ওস্তাদ-বাজিয়ে বলে, যাদের অনেক আদর ছিল, তাদের টনক নড়ল। হিংসায় চোখ তাদের বেঁকে যায়। বাঁকা চোখে তারা আস্ফালন শুরু করে, “কী, একটা কালকের ছেলে, তাকে নিয়ে এত নাচানাচি।” সুতরাং যত রাজ্যের কুমতলব তাদের মাথায় চাগাড় দিল। তারা মনকে শাসাল, “ওহে ছেলে, এখনই তুমি বাজনা ছাড়ো, নইলে তুমি শেষ হয়ে যাবে।”
মন উত্তরে বলল, “মাননীয় ওস্তাদজি, যতক্ষণ আমার প্রাণ থাকবে, ততক্ষণ আমার বাজনা বাজবে। এ দুনিয়ায় এমন কেউ নেই, যে আমার বাজনা বন্ধ করতে পারে। হ্যাঁ, আমি বাজনা ছাড়তে পারি, কেউ যদি আমার চেয়ে ভাল বাজনা বাজিয়ে আমাকে হারাতে পারে। শুনে রাখুন আপনারা, আমার হাতের এই ব্যাঞ্জো আমার হো-বুড়োর। সুতরাং সহজে আমি হারতে জানি না।”
ওস্তাদজিরা হেসে উঠল মনের কথা শুনে। ঠাট্টা করে বলল, “ওরে খুদে ওস্তাদ, আমাদের নখের যোগ্য হয়ে ওঠ আগে, তারপর কথা বলবি! এখনও হাতের আড় ভাঙেনি, তবু দেমাক দ্যাখো।”
মন বলল, “সাহস থাকে তো আসুন আমার হাতের আড় ভেঙেছে কি না একবার দেখে যান।”
“তবে আয়!” বলে সত্যিই সেই ওস্তাদের দল নিজেদের তারে সুর বাঁধল।
হাজার হাজার লোক জমায়েত হল, সেই আজব ছেলের জাদুকরি বাজনার লড়াই দেখার জন্যে। তাবড় তাবড় ওস্তাদের কেরামতি দেখে, একটুও ঘাবড়াল না মন। সে আপন মনে বাজায়। আর এক এক ওস্তাদ রণে ভঙ্গ দিয়ে ভেগে যায়।
একজন ভাগে তো, হাজার হাজার মানুষ চিৎকার করে।
দু’জন হারে তো, ‘শাবাশ, শাবাশ’ করে তারা আনন্দে চেঁচিয়ে ওঠ।
শেষকালে যখন হেরে মাথা নিচু করে পালাল, তখন সেই অসংখ্য লোক মনকে মাথায় নিয়ে, কোলে তুলে, বুকে জড়িয়ে উল্লাসে নাচানাচি শুরু করে দিল।
তখন এল শেষজন। শেষজন বুঝি ওস্তাদের ওস্তাদ। সব সেরা। শেষজনের শেষ বাজনায় মনের বুক উত্তেজনায় কাঁপে। লোকটাকে কেমন যে দেখতে, একবার ফিরে দেখার ফুরসতও পেল না মন। সে বাজায় আপনমনে। এক-একটি সুরে মনের ব্যাঞ্জোর তার ঝংকার দিয়ে ওঠে, সঙ্গে সঙ্গে অগুনতি লোক ‘আহা আহা’ করে চেঁচিয়ে ওঠে।
ওস্তাদের ওস্তাদ সেও তো কম যায় না! মন যে সুর বাজায়, ওস্তাদ বাজায় তারও ওপরের সুর। একবার মন বাজায়, একবার ওস্তাদ বাজায়। সে কী জমজমাট সুরের ঝংকার। কে যে হারবে কেউ জানে না। এ বলে আমায় দ্যাখ, ও বলে আমায়।
ঝনাত।
কীসের শব্দ?
তার ছিঁড়ে গেল।
অসংখ্য মানুষ ‘হায় হায়’ করে উঠল। ইস, ছেলেটা কি শেষ অবধি হেরে গেল!
না, না। তোমরা দেখতে পাচ্ছ না, ব্যাঞ্জোর তার ছিঁড়েছে বড়-ওস্তাদের?
“কই?”
“তাই তো।”
ওঃ! তখন সে কী আনন্দের চিৎকার। মনকে নিয়ে জনতা প্রায় লোফালুফি শুরু করে দিল। ছেলেটার প্রাণ বুঝি যায়!
বড়-ওস্তাদ উঠে দাঁড়াল। এগিয়ে এল মনের কাছে। হাত বাড়াল। তাকে বুকে জড়িয়ে ধরতে গেল। তারপর থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দু’জনেই দুজনের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। দু’জনেই হতবাক। দুজনেই নিশ্চল।
হঠাৎ বিদ্যুতের মতো ঝলসে উঠে মন সেই বড়-ওস্তাদের বুকের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল। তার মুখ দিয়ে অস্ফুট স্বরে শুধু একটি শব্দই বেরিয়ে এল, “বাবা!”
উল্লাসে মত্ত অত লোক নিমিষে নিশ্চুপ। অবাক তারা।
বড়-ওস্তাদের বুকের ভেতরে একটা আনন্দের ঢেউ বারবার আছড়ে পড়ে আকুলি-বিকুলি করে উঠছে, “আমার ছেলে, আমার ছেলে।”
এখন বাবা আর ছেলে দু’জনের চোখেই জল। দু’জনেই এখন বুঝতে পারল, সেই নৌকাডুবিতে দু’জনেই বেঁচে গেছে। কিন্তু মা?
অগুনতি লোক সেই দৃশ্য যখন অবাক হয়ে দেখছিল, তখন বড় ওস্তাদ চেঁচিয়ে উঠে তাদের বলল, “শুনুন বন্ধুগণ, আপনাদের এই খুদে ওস্তাদ আমার ছেলে। অনেকদিন আগে এক নৌকাডুবিতে আমরা জলে ভেসে যাই। আমি আর আমার বউ সেই ভয়ংকর দুর্ঘটনা থেকে কোনওরকমে প্রাণে বেঁচেছিলুম। কিন্তু এতদিন আমরা জানতুম, আমাদের ছেলে বেঁচে নেই। আজ হঠাৎ তার দেখা পেয়েছি, আপনাদেরই জন্যে। সুতরাং ছেলের কাছে আমার এই পরাজয় লজ্জার নয়, আনন্দের।”
তখন সেই মানুষের দল, চিৎকার করে, হাততালি দিয়ে আনন্দে নেচে উঠল। তারা বলল, “আপনার ছেলের মুখখানি আমরা একবার দেখতে চাই!”
সত্যিই মনের মুখখানি তখন দেখাই যাচ্ছিল না। কারণ তখনও তার মুখখানি ওর বাবার বুকের মধ্যে লুকনো ছিল।
তারপর বুকের ভেতর থেকে মন মুখখানি বার করে আনল। তার চোখভর্তি জল। সে জনতার দিকে হাত তুলল। তার চোখের জল গাল বেয়ে নেমে আসছে। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে জনতারও যেন চোখ ছলছল করে ওঠে। তারাও খুদে-ওস্তাদের দিকে হাত তুলে চিৎকার করে উঠল, “শাবাশ।”
মন আকাশের দিকে চাইল। ওই তার হো’র স্বর্গ। ওই বুঝি তার হো আকাশ থেকে উঁকি মারছে। হাসছে। আঃ! কী নরম সেই হাসি!
আকাশ থেকে চোখ নামাল মন। তারপর বাবার মুখের দিকে তাকাল। হাত ধরল। হাঁটল। বাবার হাত ধরে ফিরে চলল ঘরে, তার মায়ের কাছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন