শৈলেন ঘোষ

কেউ জানে না, এ গল্প শুধুই কি গল্প, না সত্যি! কেউ জানে না, এ গল্প আজকের, না অনেকদিন আগের! শুধু জানে এই গল্পের এই যে শহর, এর নাম হাজমুল। এর মালিক এক সুলতান।
রোজ যেমন হয়, সেদিনও তেমন নিয়মমাফিক একজন জমাদার রাস্তায় ঝাড়ু দিচ্ছিল। খুব ভোরে। হ্যাঁ, সুলতানের কড়া হুকুম, শহর সাফসুতরো রাখা চাই এমন, যেন কোথাও এককুচি ময়লা পড়ে না থাকে।
তো, এখন যে-রাস্তাটায় জমাদার ঝাড়ু দিচ্ছিল, সেই রাস্তার গায়ে ছিল একটা পাথরের তৈরি দাওয়া। ক্লান্ত পথিকের বিশ্রামের জায়গা। সেই দাওয়ায়, সেই ভোরে, তখনও ঘুমোচ্ছিল একটি ছেলে মাথায় একটা পুঁটলি দিয়ে। জমাদার তাড়া মারল, “এই ছেলে, ওঠ!”
তাড়া খেয়ে ছেলেটার ঘুম ভেঙে গেল। সে ভয়ে ধড়ফড় করে উঠে পড়ল।
জমাদার মুখ ঝামটা দিয়ে ঝিকিয়ে উঠল, “এটা কি তোর ঘুমোবার জায়গা? হাট!”
ছেলেটা নিমেষে মাথার পুঁটলিটা হাতে নিয়ে জমাদারের মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল। তার মুখ দিয়ে কোনও কথা সরল না।
জমাদারের কেমন যেন সন্দেহ হল। ছেলেটা চোর-ছ্যাঁচড় নাকি! কথা বলে না! ফ্যালফ্যাল করে তাকায় শুধু! তাই আবার ধমক দিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তোর হাতে ওটা কী রে?”
ছেলেটা কোনও উত্তর না-দিয়ে, মুখ ফেরাল। পথে নামল। হাঁটার জন্যে পা বাড়াল।
কিন্তু ছেলেটা পারল না। জমাদার তার পথ আগলে চেঁচিয়ে উঠল, “দে, দেখি পুঁটলির ভেতর কী আছে!”
না, ছেলেটা দিল না। পুঁটলিটা সে পেছনে লুকিয়ে ফেলল। সঙ্গে সঙ্গে জমাদার তাকে জাপটে ধরেছে। চেঁচিয়ে উঠেছে, “চোর-চোর।”
ভয়ে ছেলেটার হাত ফসকে পুঁটলিটা পড়ে গেছে মাটিতে। জমাদার তাকে ছেড়ে যেই পুঁটলিটা হাতে নিয়েছে, আঁতকে উঠে ছেলেটা মারল ছুট। ছুটতে গিয়ে পুঁটলিটা ছিনিয়ে নেবার জন্যে জমাদারকে মারল এমন একখানি ঠেলা, জমাদার টাল সামলাতে পারল না। সে নিজে তো পড়লই, তার হাত থেকেও ছিটকে গেল পুঁটলিটা। সেটা পড়ল গিয়ে সাত হাত দূরে। ততক্ষণে ছেলেটা পগারপার।
তা, অত ভোরে “চোর-চোর” বলে চেঁচালে তো মানুষের ঘুম ভাঙবেই। তবে, একসঙ্গে অনেক মানুষের ঘুম না ভাঙলেও, প্রথম যে-মানুষটার ঘুম ভেঙেছিল, সে একজন জহুরি। সোনা-রুপোর গয়না গড়ে। সে ঘুমচোখে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে চোর ভেবে জাপটে ধরল জমাদারকেই। ধরেই চেঁচিয়ে উঠল, “ব্যাটা চোর, রাস্তা ঝাড়ু দেবার নাম করে চুরিবিদ্যে! আমার ঘরে সিঁদ কাটিস!”
জমাদার যেন আকাশ থেকে পড়ল। বলল, “আপনি কাকে কী বলছেন? যাঃ বাব্বা! আমি আপনার ঘরের সিঁদ কাটতে যাব কোন দুঃখে! আপনার ঘরে যে সিঁদ কেটেছে, সে তো পালাল! আমি বরং আপনার উপকার করেছি। ওই দেখুন, সেই চোরাই মাল।”
“কই?”
“ওই তো।”
জহুরি সেই সাত হাত দূরে ছিটকে পড়া পুঁটলিটা দেখে তৎক্ষণাৎ জমাদারকে ছেড়ে সেই পুঁটলিটার দিকে এগিয়ে গেল। সেটা যেই তুলে নেবার জন্যে হেঁট হয়েছে, অমনই সঙ্গে সঙ্গে আর একজন লোক সেখানে হাজির। হাজির হয়েই সে হল্লা শুরু করে দিল, “কোথায় চোর? কোথায় আমার জিনিস?”
জহুরি হাত বাড়িয়েও পুঁটলিতে হাত দিল না। লোকটার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তর্ক জুড়ে দিল। জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে হে মিথ্যে কথা বলো?”
লোকটা বলল, “আমি ওস্তাগর। আমি পোশাক বানাই। ওই পুঁটলি আমার।”
জহুরি বলল, “ফুঃ। পোশাক বানানো! সেটা আবার কাজ! আমি জহুরি। আমি সোনা-রুপোর গয়না গড়ি।”
ওস্তাগরও ছাড়বার পাত্তর নয়। সে বলল, “মানুষের আগে দরকার পোশাক। তারপর গয়না। আমার কাজটা তোমার কাজের চেয়েও জরুরি। পোশাক না-পরে, কেউ শুধু গয়না পরে রাস্তায় বেরোতে পারে? লোকে হাসবে।”
লোকদুটোকে অমন কথা কাটাকাটি করতে দেখে এবার জমাদার কথা বলল। এতক্ষণ সে চুপ করেই ছিল। সে বলল, “তোমরা ঝুটমুট তর্ক করছ। তোমাদের তর্ক শুনে আমিও কেমন যেন সব গুলিয়ে ফেলছি। মনে হচ্ছে, এ পুঁটলিটা তোমাদের দু’জনের কারও নয়। তোমাদের দু’জনের কারও চুরি যায়নি।”
নিজেদের মধ্যে নিমেষে তর্ক থামিয়ে জহুরি বলল, “তুই থাম তো! নিজের চরকায় তেল দে! দিস তো রাস্তায় ঝাড়ু। তোকে কে মাতব্বরি করতে বলেছে? পুঁটলিটা যে আমার, সেটা আমি ছাড়া অন্যে জানবে কেমন করে?”
সঙ্গে সঙ্গে ওস্তাগর গলা ফাটিয়ে জহুরির কথায় বাধা দিল। বলল, “পুঁটলিটা যে আমার নয়, জহুরিমশাই তুমিই বা জানলে কেমন করে? আমি দাবি করছি, পুঁটলি আমার।”
“আমার।” জহুরি চেঁচিয়ে দাবি করল।
“আমার।” ওস্তাগর আরও জোরে চেঁচিয়ে তার দাবি অগ্রাহ্য করল।
লোকদুটোর তর্কাতর্কিটা যখন প্রায় হাতাহাতি হতে চলেছে, তখন জমাদার আবার মুখ না খুলে পারল না। বলল, “বাবুমশাইরা, এই সামান্য পুঁটলির মালিকানা নিয়ে হাতাহাতি করার আগে এক কাজ করলে তো পারো, পুঁটলির ভেতর কার কী আছে বলো। তারপর পুঁটলি খোলো। দেখো যার কথা মিলে যাবে, সে পুঁটলি নিয়ে চলে যাও!”
জহুরি জমাদারের কথা শুনে বলে উঠল, “তুই একটা বুদ্ধির ঢেঁকি। পুঁটলির ভেতর আমার কী আছে আমি বলতে যাব কেন? আমার যা আছে, আমি বললে, ওস্তাগরও তো বলতে পারে, পুঁটলির মধ্যে ওইসব জিনিস তারও আছে। তখন মীমাংসা হবে কেমন করে?”
জমাদার বলল, “আমি তো সাক্ষী থাকব।”
ওস্তাগার তখন টিপ্পনি কেটে বলল, “রাস্তায় ঝাড়ু দিলে কী হবে, তুমিও ধান্দাবাজিতে কম যাও না! তুমিও যদি দাবি করে বসো, ওইসব জিনিস তোমার, তখন?”
জমাদার উত্তর দিল, “দ্যাখো বাপু, অন্যের জিনিসে আমার অমন লোভ করার অভ্যেস নেই। রাস্তায় ঝাড়ু দিতে দিতে প্রায় রোজই এটা ওটা কত কী কুড়িয়ে পাই। ইচ্ছে করলে কি নিতে পারি না? সব আমি কোতোয়ালিতে জমা করে দিই। তোমরাও যদি দু’জনে একই সঙ্গে দাবি করতে থাকো তখন অগত্যা কোতোয়ালিতেই আমাকে জমা করে দিতে হবে পুঁটলিটা।”
জহুরি এবার জমাদারকে খোঁটা দিয়ে বলে উঠল, “বাহ্, বেশ ভাল মতলব ভেঁজেছিস। ওই বলে পুঁটলিটা হাতিয়ে নিয়ে কেটে পড়তে চাও! ওটি হচ্ছে না।”
ওস্তাগর বলল, “ওটি আমিও হতে দেব না। আমার জিনিস আমি ঘরে নিয়ে যাব।”
ওস্তাগরের কথা শুনে জহুরি আর মেজাজ ঠিক রাখতে পারল না। আচমকা ওস্তাগরের বুকের জামাটা খামচে ধরে চিৎকার করে উঠল, “ফের ও-কথা মুখে আনলে তোমার মুখ আমি চিরদিনের মতো বন্ধ করে দেব।”
ওস্তাগরও ছাড়বার পাত্তর নয়। সেও জহুরির গলাটা খামচে ধরে কড়কে উঠল, “বেশি আমার আমার করলে, আমিও তোমাকে ছেড়ে কথা বলব না।”
বলতে না-বলতেই লেগে গেল ঝটাপটি। তারপর দু’জনেই রাস্তার ওপর পড়ে-ধরে সে এক কেলেঙ্কারি কাণ্ড। কোস্তাকুস্তি শুরু করে দিলে রাস্তার ওপর। হুংকার ছাড়তে লাগল ঘনঘন।
জমাদার তো দেখে শুনে থ। দুটো আধবুড়ো লোকের এ কী কাণ্ড! লোক জমে গেল দেখতে দেখতে। ছুটে এল কোতোয়াল। জহুরি আর ওস্তাগরকে ধমক-ধামক দিয়ে কোতোয়াল থামাল মারামারি। কোতোয়ালকে দেখে ভয় পেলেও জহুরি আর ওস্তাগর তখনও রাগে ফুঁসছে। এ ওকে দুষছে।
কোতোয়াল জমাদারের মুখে আদ্যন্ত সব শুনল। শুনে জহুরি আর ওস্তাগরকে গ্রেপ্তার করে পুঁটলিটা রাস্তা থেকে তুলে নিয়ে চলল সুলতানের কাছে। জমাদারকেও ছাড়ল না। সেও চলল।
সুলতানও জমাদারের মুখে একের পর এক সব ঘটনা শুনে, জহুরিকে প্রথম ডাকলেন। জিজ্ঞেস করলেন, “পুঁটলিটা তোমার?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ হুজুর।”
সুলতান বললেন, “আমি যদি বলি পুঁটলিটা তোমার নয়!”
“আপনি আমাদের শাহেনশা, আপনি বলতেই পারেন।”
সুলতান আবার বললেন, “তার মানে তুমি বলতে চাও, পুঁটলিটা তোমার হলেও আমি বলছি বলে এটা তোমার নয়?”
“আজ্ঞে হুজুর পুঁটলিটা আমার। কিন্তু আপনি যদি রায় দেন, এটা আমার নয় অন্য কারও, তবে আমাকে মেনে নিতেই হবে।” উত্তর দিল জহুরি।
এবার সুলতান ডাক দিলেন ওস্তাগরকে, “এ পুঁটলিটা তোমার?”
“কী করে বলি হুজুর,” উত্তর দিল ওস্তাগর, “কাল অবধি ছিল আমার। চুরি হয়ে যাওয়ার পর থেকে আমার হাতছাড়া।”
সুলতান বললেন, “আরে মশাই উত্তরটা অমন ধানাই-পানাই করে দেবার কী দরকার। সিধেসাপটা বলো, পুঁটলিটা তোমার চুরি গেছে কি না!”
ওস্তাগর উত্তর দিল, “হুজুর সবটাই তো আপনার ওপর নির্ভর করছে। আপনি যদি বলেন চুরি গেছে, তো গেছে। আপনি যদি বলেন যায়নি তো যায়নি। আপনার দয়াতেই তো বেঁচে আছি হুজুর।”
ওস্তাগরের কথা বলা শেষ হয়েছে কী হয়নি, ঠিক সেই সময়ে একজন সিপাই হন্তদন্ত হয়ে সুলতানের দরবারে হাজির হল। সুলতানকে কুর্নিশ করে তার হাতে একটুকরো কাগজ দিল। সুলতান কাগজটার ওপর চোখ বুলিয়ে সিপাইকে আদেশ করলেন, “ঠিক আছে। নিয়ে এসো।”
এবার সুলতান জহুরিকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমি চোরটাকে দেখেছ?”
জহুরি উত্তর দিল, “আজ্ঞে দেখলে তো ধরেই ফেলতুম।”
“তুমি দেখেছ?” তিনি এবার ওস্তাগরকে জিজ্ঞেস করলেন।
ওস্তাগর উত্তর দিল, “দেখেছি হুজুর। ওই তো চোরটা আপনার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে।” বলে জহুরির দিকে আঙুল তুলল।

আর দেখতে, জহুরি সুলতানের সামনেই আর একটু হলেই তুলকালাম শুরু করে দিয়েছিল। কিন্তু পারল না। কারণ ঠিক সেই মুহূর্তেই সেই সিপাই সেখানে হাজির হল। এবার সিপাই একা নয়, সঙ্গে আর একজন। সেই আর একজনকে দেখেই জমাদার আঁতকে চেঁচিয়ে উঠল, “হুজুর, ওই তো চোর! ওই ছেলেটার কাছেই পুঁটলিটা ছিল হুজুর।”
হ্যাঁ, সিপাই সেই ছেলেটাকেই ধরে এনেছে।
সুলতান সিপাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “তুমিই ছেলেটাকে ধরেছ?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, হুজুর।”
“কী করেছিল ছেলেটা?”
“সন্দেহজনকভাবে ঘুরঘুর করছিল। আর কী যেন সন্ধান করছিল। মনে হয় কিছু হাতানোর ধান্দা করছিল।” উত্তর দিল সিপাই।
সিপাইয়ের কথা শুনে সুলতান ছেলেটাকে ধমক দিলেন, “এই ছেলে, কোথায় থাকিস তুই?”
ছেলেটা নির্ভয়ে উত্তর দিল, “যেখানে আমাদের বাড়ি।”
“কোথায় তোদের বাড়ি?”
“যেখানে আমার মা আর আমার ছোট বোন থাকে। সেটা একটা গ্রাম। সে-গ্রামে আপনি কোনওদিন গেছেন কি না জানি না। গ্রামটার নাম ফুলুং।”
“তুই চোর? চুরি করে বেড়াস?” সুলতান গর্জে উঠলেন।
ছেলেটা শান্ত গলায় বলল, “না। আমি রাখাল। মেষ চরাই।”
সুলতান আবার দাবড়ি দিলেন। সেই পুঁটলিটা দেখিয়ে বললেন, “তুই মিথ্যে কথা বলছিস! এই পুঁটলিটা তোর কাছ থেকে পাওয়া গেছে।”
ছেলেটা তেমনই ঠান্ডা মেজাজে উত্তর দিল, “পুঁটলিটা আমার। আমার পুঁটলি আমার কাছ থেকেই তো পাওয়া যাবে।”
ঠিক এই সময়ে জহুরি চেঁচিয়ে উঠল, “না হুজুর, পুঁটলিটা আমার। ছেলেটা মিছে কথা বলছে।”
সঙ্গে সঙ্গে ওস্তাগরও গলা ফাটাল, “না হুজুর, মিছে কথা বলছে জহুরি। পুঁটলিটা আমার।”
এবার সুলতান ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়ে জহুরি আর ওস্তাগরকে ধমক দিয়ে বললেন, “আমি যখন কথা বলছি একজনের সঙ্গে, তোমরা তখন মাঝখান থেকে চেঁচামেচি করছ কেন? জানো এক্ষুনি আমি তোমাদের কয়েদ করতে পারি। তোমাদেরই যদি পুঁটলি হয় বলো, পুঁটলির ভেতর কী আছে!”
সুলতানের কথা শুনে আঁতকে উঠল জহুরি। তাই তো পুঁটলির ভেতর কী আছে, সেটা তো তার জানা নেই!
মুখ চুন হয়ে গেল ওস্তাগরের। সেও তো জানে না কী আছে পুঁটলির ভেতর!
অগত্যা অন্য কিছু ভেবে না পেয়ে জহুরি বলে উঠল, “ওর ভেতর কী আছে আমার বউ জানে হুজুর! আমি এক্ষুনি জিজ্ঞেস করে আসছি!”
জহুরির কথা শুনে একই কথা বলল ওস্তাগরও। সুলতান দু’জনেরই আর্জি নাকচ করে দিলেন। দু’জনকেই আটক করলেন। এবার ছেলেটিকে তিনি জিজ্ঞেস করলেন, “তুই যে বলছিস, পুঁটলি তোর, বল, কী আছে পুটলির ভেতর?”
“আমার মায়ের একখানা নতুন শাড়ি, আর আমার বোনের জন্যে একজোড়া চপ্পল। খুলে দেখতে পারেন।” উত্তর দিল ছেলেটা সাহসী গলায়।
সুলতান বললেন, “যদি তোর কথা মিথ্যে হয়, জানিস তোর কী শাস্তি হবে?”
ছেলেটা জবাব দিল, “জানি কারাবাস! কিন্তু আমি মিথ্যে বলতে যাব কোন দুঃখে। আপনি খুলে দেখুন না, আমার কথা সত্যি না মিথ্যে!”
সুলতান আর অপেক্ষা করলেন না। কোতোয়ালকে বললেন, “দেখি পুঁটলিটা!” বলে কোতোয়ালের হাত থেকে পুঁটলিটা নিয়ে নিজেই খুলে ফেললেন। ঠিক তাই। পুঁটলির ভেতর থেকে সত্যিই তো বেরিয়ে পড়ল, একজোড়া চপ্পল আর একখানা শাড়ি!
সুলতান থ। তিনি কিছু বলার আগেই ছেলেটাই বলতে শুরু করল, “ওই শাড়ি আর চপ্পল আমি দস্তুর মতো নিজের পয়সায় কিনেছি। কিনেছি আমার মায়ের জন্যে আর চপ্পলজোড়া আমার ছোট বোনের জন্যে। আমি রোজ মেষ চরাতে যাই সেই কোন সকালে। বেলা দুপুর হলে আমার বোনের হাতে মা খাবার পাঠায়। সেদিন আমার খাবার আনছিল যখন, তখন তার পায়ে কাঁটা ফুটে যায়। আমার বোনের জন্যে তাই আমি চপ্পল কিনেছি। আর মায়ের একটাও নতুন শাড়ি নেই বলে, ওই শাড়িটা কিনেছি মায়ের জন্যে। আপনি খোঁজ নিতে পারেন, আমি চোর নই, আমি খেটে খাই। আমি লেখাপড়া করি। আমার বোনকে লেখাপড়া শেখাই।”
এবার জমাদার সুলতানের কাছে নালিশ করল, “হুজুর, ছেলেটা মিছে কথা বলেছে। ছেলেটা রাত জেগে চুরি করে রাস্তার দাওয়াটার ওপর ঘুমোচ্ছিল।”
ছেলেটা এবার বেশ দৃঢ় গলায় উত্তর দিল, “হ্যাঁ, ঠিক বলেছে জমাদার, দাওয়ার ওপর আমি ঘুমোচ্ছিলুম। তবে চুরি করে নয়। ওই শাড়ি আর চপ্পল কিনতে আমি শহরে এসেছিলুম হেঁটে। এটা-ওটা দেখতে দেখতে অনেক রাত হয়ে গেছল বলেই আমি আর ঘরে ফিরতে পারিনি। ওই দাওয়ার ওপর বসে ঢুলতে ঢুলতে ঘুমিয়ে পড়েছিলুম। ভেবেছিলুম, ভোর হলেই বাড়ি ছুটব। জানি মা অস্থির হয়ে ভাবছেন। কিন্তু আমি এখনও বাড়ি যেতে পারিনি ওই জমাদারের জন্যে। এখন যদি আপনার মনে হয়, ওই পুঁটলিতে বাঁধা শাড়িটা, আর চপ্পলজোড়া আমার নয়, তা হলে আপনি রেখে দিন। আমায় যেতে দিন আমার মা আর বোনের কাছে। তারা এখন না-জানি আমার খোঁজে এর দোর, তার দোরে ছুটে ছুটে কত খোঁজাখুঁজি করছে।”
সুলতান একমনে এতক্ষণ ছেলেটার সবকথা শুনছিলেন। এবার তিনি কঠিন স্বরে বলে উঠলেন, “ওই জহুরি আর ওস্তাগরকে সশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হল একমাসের জন্যে। জমাদারের শাস্তি—সে ওঠ-বোস করুক এখন থেকে সন্ধে পর্যন্ত। আর ওই ছেলেটিকে ফিরিয়ে দাও এই পুঁটলি। আমার অশ্বশালায় যে ঘোড়াটি সবচেয়ে দ্রুত ছোটে, সেই ঘোড়ায় চড়িয়ে ছেলেটিকে তার গ্রামের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে এসো। আর সেই সঙ্গে দিয়ে এসো সহস্র স্বর্ণমুদ্রা। যাও!” বলে, তিনি সিপাইকে আদেশ করলেন।
আদেশ দিয়ে সুলতান অন্দরমহলের দিকে পা বাড়ালেন।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন