শৈলেন ঘোষ

ছেলেটার নাম টুকুন। তার ছিল একটা বেড়াল। বেড়ালটার নাম ম্যাও। ম্যাওটা একা-একা থাকত। একা-একা ঘুরঘুর করত। আর একা-একা ম্যা-ম্যা করে কাঁদত। তাই, টুকুন একদিন ইস্কুল থেকে ফেরবার সময় ম্যাওটার জন্যে একটা কাঠের তৈরি বাঘ কিনে আনল। আহা, ম্যাওটা একা-একা থাকে, এবার তার খেলার সঙ্গী হল।
তা, সেদিন টুকুন ইস্কুলে চলে যাবার পর, ম্যাওটা সত্যি-সত্যি বাঘের সঙ্গে খেলা শুরু করে দিল। রোদ খটখটে দুপুরবেলা কাঠ খটখট বাঘের সঙ্গে বেড়াল-ম্যাও খেলা করছিল। এমন সময় ঘটল এক তাজ্জব কাণ্ড। কী হল?
হল কী, খেলা করতে করতে, সেই কাঠের তৈরি বাঘের নাকে, হঠাৎ সেই জ্যান্ত বেড়ালের গন্ধ ঢুকে গেল। গন্ধ ঢুকে যেতেই, বাঘটার দুম করে ম্যাও-খটকা রোগ ধরে গেল। রোগ ধরতেই বাঘটা জ্যান্ত হয়ে গেছে। বলা নেই, কওয়া নেই বাঘটা রোদে পিঠ দিয়ে গান শুরু করে দিলে খটাস খটাস করে। বাঘের সে কী গান!
বাঘের গানের সুর প্রথম প্রথম নাকের সিধে ছুটছিল। তারপর হাওয়া টপকে যেই ম্যাওটার কানে সেঁদিয়ে পড়েছে, বলব কী, সঙ্গে সঙ্গে ম্যাওটার হাসি পেয়ে গেছে। প্রথমে ফসকে ফসকে তারপর টসকে টসকে এমন হেসে উঠল ম্যাওটা যে, সে-হাসি আর থামে না। যতবার হাসি চাপতে যায়, ততবারই ম্যা-হ্যা-হ্যা করে হাসতে হাসতে নাকানি-চোবানি খেয়ে যায়।
ওদিকে বাঘের সেই খটখটে গান, আর এদিকে ম্যাও এর সেই ম্যা-হ্যা-হ্যা হাসি সারা ঘরে উড়ছে, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে।
এমন সময় বাঘের সেই খটাস খটাস গান, ফটাস করে থমকে গেল। কটাস কটাস চোখদুটো বেড়ালের মুখের ওপর চমকে পড়ল। একটা বিটকেল চটাস-চটাস গলায় হাঁকার দিলে, “কে হাসে র্যা?”
কিন্তু ম্যাওটার হাসি থামা দুরে থাক আরও জোরে জোরে সে হেসে উঠেছে। হাসতে হাসতেই বলল, “কাঠ-খটখট বেঘো রে, আমি তোর মেসো। আমার নাম ম্যাও, হাউ-হাউ-হাউ।” বলে, বেড়াল হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ল।

কাঠের তৈরি বাঘটা অমনি তড়াং করে লাফিয়ে উঠেছে। চটাং করে চেঁচিয়ে উঠেছে, “তুমি আমার মেসো! রসো, দেখছি তোমায়।” বলে নিজের ল্যাজ উঁচিয়ে বেড়ালের পিঠে দিল এক ঝাপটা।
ওমা! যেই না ঝাপটা মারা, অত বড় একটা জলজ্যান্ত বেড়াল ফুস মন্তরে ফস করে উবে গেল! চোখের পলকে হুট করে একটা নেংটি ইঁদুর হয়ে ঘর থেকে বাইরে ছুটে পালাল! ছুটতে ছুটতে ইঁদুরটা একটা মস্ত উঁচু ঢিবির ওপর উঠে দেখতে পেল, সামনে একটা বাগান। বাগানের গাছে ঝোলানো একটা দোলনা। সে ঢিপির ওপর থেকে লাফ মারল। লাফ মেরে দোলনার ওপর উঠে পড়ল। হাওয়ায় দুলছে দোলনা উলুক-ঝুলুক। দোলনায় দুলছে ইঁদুর দুলুক-দুলুক।
তারপরে বলব কী, সে এক আজব কাণ্ড! কোথায় ছিল একটা কেলে কিষ্টি কাক, সিধে দোলনার মাথায় উড়ে এসে বসল। আশ্চর্য, কাকের গলায় একটা মালা। যেন একটি বিয়ের কনে। ইঁদুরকে দেখে ক্যারকেরে সুরে কয়ে উঠল, “এই যে বাঘের মেসো ইঁদুর, তোমাকেই আমি এ্যাদ্দিন গলায় মালা পরে খুঁজে বেড়াচ্ছি। তোমার জন্যেই আমার অ্যাদ্দিন বিয়ে হয়নি। আজ চলো ছাতনা তলায়! তোমার গলায় আমি মালা দেব।”
ইঁদুরটা কাককে দেখেই ভয়ে জবুথবু। চোখ-ছলছল। এদিক দেখে, ওদিক দেখে। “কোথায় পালাই, কী করি” ভাবতে-না-ভাবতেই কাকটা হুস! চোখের পাতা পড়বার আগেই মারল ছোঁ! ইঁদুরটাকে ঠোঁটে চেপটে, ভোঁ-কাট্টা। ইঁদুরটা চ্যাঁও করতে পারল না, ভ্যাঁও করতে পারল না।
অবশ্য একটা কথা জানা গেল না। কথাটা হল, কাকের সঙ্গে ইঁদুরের বিয়ে হল, নাকি ইঁদুরটা কাকের পেটে গেল!
তোমরা বলতে পারো নাকি কেউ?

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন