শৈলেন ঘোষ

এখানে তাকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। সে একটি ছোট্ট ছেলে। সামনে সমুদ্র, পেছনে মস্ত পাহাড়। জলের ভেতর থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে পাহাড়। সমুদ্রের ঢেউ উথালপাথাল করে ঝাঁপিয়ে পড়ছে তার গায়ে। উঁচু পাহাড়ের ওই এবড়ো-খেবড়ো মাথার ওপরেই আধুনিক কালের ঘর-বাড়ি দেখা যাচ্ছে। দেখা যাচ্ছে বটে, তবে, নেহাতই খেলনার মতো। খুদে খুদে। ওখানে কি কোনও শহর আছে? কোনও পাহাড়ি শহর? হয়তো আছে। তা হলে তো ওখানে পালিয়ে যেতে পারে বন্দি? না, উপায় নেই। সমুদ্রের বুকের ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা এই পাহাড়ের চাঁইগুলো বিরাট বড়। থাকে থাকে এমনভাবে সাজানো, কার সাধ্যি টপকে পালায়!
বন্দি ছেলেটার চোখ বেঁধে এখানে আনা হয়েছিল। চোখ বেঁধেই এখানে ফেলে দেওয়া হয়েছিল। এমনকী হাতদুটোও বাঁধা। দুরন্ত সমুদ্রের ভয়ংকর চেহারাটা সে দেখতে পায়নি। কিন্তু তার গর্জন বন্দির কানে আসছিল। চকিতে আকাশছোঁয়া একটা ঢেউ তাকে উলটে পালটে ছুড়ে দিয়েছিল শক্ত পাথরের ওপর। তখনই তার চোখের বাঁধন খুলে যায়। হাতদুটোও। কাউকে সে দেখতে পায় না। শূন্য চারদিক। শুধু সে একা। তখনই সে চিৎকার করে ওঠে, “বাঁচাও-ও-ও!”
কিন্তু কে বাঁচাতে আসবে? সমুদ্রের এই গর্জন ছাপিয়ে কার কানে পৌঁছবে এই ছোট্ট ছেলেটির গলার স্বর?
আচমকা আর একটা ভয়ংকর ঢেউ ধেয়ে আসছে। তারই দিকে। মুহূর্তে সে নিজেকে সামলে নেয়। পড়িমরি করে সে একটা উঁচু পাথরে উঠে পড়ে। ছিটকে পড়ল ঢেউটা পাক খেয়ে সেই পাথরেরই গায়ে। এ যাত্রায় সে বেঁচে গেল, এ-ঢেউ আগের মতো তাকে আঘাত করতে পারল না। আগের সেই ঢেউয়ের আঘাতটা ভীষণ লেগেছে তার। হাঁপাচ্ছে সে। তার পরনের প্যান্ট-জামা ভিজে ঢোল হয়ে গেছে। সমুদ্রের নোনা জলও তার পেটে গেছে অনেকটা। চোখে-মুখে এখনও বালি কিচকিচ করছে। ভিজে জামার খুঁট দিয়ে সে মুছে ফেলল নিজের মুখ। তখনই তার চোখে পড়ে গেল অসংখ্য শঙ্খচিল আকাশে উড়ছে। আকাশটাই যা ভোলা। আর কোনওদিকে পালিয়ে যাওয়ার কোনও পথ নেই। দেখে কেঁপে উঠল তার বুক। কে এমন নিষ্ঠুর। তাকে বন্দি করে রেখেছে এখানে? এমন করে?
ছেলেটা কোনও দোষ করেনি। পথে পথে একাই ঘুরছিল সে। সে একাই ঘোরে। ঘুরে ঘুরে সে খুঁজে বেড়ায় তার মাকে, বাবাকে আর তার দিদিকে। সে বছর সৃষ্টিনাশা ঝড় উঠেছিল। সঙ্গে নেমেছিল মুষলধারে বৃষ্টি। সর্বনাশা বান এসেছিল নদীতে, ভাসিয়ে নিয়ে গেছিল তাদের সর্বস্ব। এমনকী ভেসে গেছিল তার মা, বাবা, দিদি। সে নিজেও। কে কোথায় যে হারিয়ে গেল, তার খবর কেউ জানে না। শুধু ছেলেটা জানে সে বেঁচে আছে। তার বিশ্বাস, সে যেমন বেঁচে আছে, তেমনই বেঁচে আছে তারাও। তাই সে তোলপাড় করে খুঁজে বেড়ায় সারা তল্লাট। কিন্তু হায় রে, খুঁজে পেল না কাউকেই!
তবু সে হাল ছাড়ে না। একা একা ঘুরে বেড়ায় পথে-ঘাটে। তাদের খোঁজে।
এমনই করে খুঁজতে খুঁজতে সে দেখতে পেয়েছিল একদিন একদল ডাকাতকে। তারা লুঠ করে পালাচ্ছিল। ছেলেটা তাড়া করেছিল তাদের। সে চিৎকার করে উঠেছিল “ডাকাত ডাকাত” বলে। কেউ শোনেনি তার চিৎকার। কেন না ডাকাতের হাতে অস্ত্র। কে এগোবে! উলটে সে-ই ধরা পড়ে গেল ডাকাতের হাতে। ডাকাতরা তাকে প্রাণে মারল না। ফেলে দিয়ে গেল এই দুর্গম সমুদ্রতীরে। কার সাধ্যি পালায় এখান থেকে। পথ নেই কোনওদিকে। সামনে সমুদ্র, পেছনে পাহাড়। সুতরাং এইখানে মরো তিলে তিলে। সমুদ্রের জলে তলিয়ে মরো! না হয় খিদের জ্বালায় শুকিয়ে মরো! কী ভয়ংকর কথা।
ছেলেটা এখন ভয়ে হাঁপাচ্ছে। ফ্যালফ্যাল করে তাকাচ্ছে চারপাশে। খুঁজতে থাকে পাথরের ফঁকফোকর। সন্ধান করে পথের। সে যদি যেতে পারে ওই ওপরে! ওই যেখানে অনেক ঘর-বাড়ি আছে! তবে সে বেঁচে যায়। সুতরাং হাঁকপাক করে পাথরের ওপরে পা ফেলে সে। পারে না। কোথায় পা দেবে সে? পাথরের গায়ে গায়ে শ্যাওলা। নীচে গভীর খাদ। পা হড়কালেই মরণ!
কিন্তু হঠাৎ যেন থতমত খেয়ে গেল সে। হঠাৎই নজর পড়ে গেল একটা মুখ বাঁধা বস্তার দিকে। পড়ে আছে বস্তাটা একটা পাথরের খাঁজে। মনে হচ্ছে বস্তার ভেতর যেন কী একটা নড়ছে! থেকে থেকে! কোনও জন্তু? নাকি অন্য কিছু!
ছেলেটা এগিয়ে গেল বস্তাটার দিকে। উবু হয়ে বসল। কাছ থেকে দেখতে লাগল। কী তার মনে হল, বস্তাটার গায়ে হাত ঠেকাল। ঠেকিয়েই তুলে নিল। তার হাতের স্পর্শ লাগতে বস্তাটা জোরে জোরে নড়ে উঠল। বোঝা গেল, বস্তা বন্দি প্রাণীটার প্রাণ এখনও টাটকা আছে।
বলতে না-বলতেই বস্তার ভেতর থেকে একটা গোঙানির শব্দ শোনা গেল! ছেলেটা কী ভাবল কে জানে, ঝটপট খুলে ফেলল বস্তার মুখটা। খুলতেই ধক করে কেঁপে ওঠে বুকের ভেতরটা। এ কী! আরে, এ যে একটা মানুষ বস্তার মধ্যে বন্দি! তার মুখটা বাঁধা কাপড় দিয়ে! হাত-পা বাঁধা দড়ি দিয়ে! বস্তার ভেতর তালগোল পাকিয়ে হাঁসফাঁস করছে।
ছেলেটার যে বুক ভয়ে কেঁপে উঠেছিল, এখন সেই বুক উত্তেজনায় ওঠা-নামা করতে লাগল। মনে হল তার, অন্তত সে এখন একা নয়। কেন না; সে একজন মানুষের দেখা পেয়েছে। যে মানুষটা বেঁচে আছে। মনে হয় এও তারই মতো বিপদে পড়েছে। চটপট সে তার মুখের বাঁধন খুলে দিল। খুলে দিতেই, কী আশ্চর্য মানুষটা হেসে ফেলল। বলে উঠল, “আমি জানি তুই এখানে আছিস।”
ছেলেটা তার কথা শুনে আঁতকে ওঠে। তার মুখের দিকে তাকায়। মনে মনে ভাবে, সে যে এখানে আছে এই মানুষটা জানল কেমন করে! তবে কি এই মানুষটা ডাকাতদলের কেউ। লুটের মালের বখরা নিয়ে ঝগড়া করে এই বিপদে পড়েছে। সুতরাং তার বাঁধা হাত খুলতে গিয়ে ছেলেটা থমকে গেল।
লোকটা ব্যস্ত হয়েই বলে উঠল, “খুলে দে, খুলে দে, থামলি কেন? দেরি হয়ে গেলেই মুশকিল। তখন আর পালাতে পারব না। বস্তার ভেতরই মরতে হবে।”
ছেলেটা এতক্ষণে কথা বলল। বেশ রেগেমেগেই জিজ্ঞেস করল, “তুমি বুঝি ডাকাত?”
এবার সে হো-হো করে হেসে উঠল। বলল, “দুর বোকা, ডাকাত হতে যাব কেন। আমি পাগল! আমি পাগলামি করি বলে ওরা আমায় এইখানে ফেলে দিয়ে গেছে।”
“তবে তুমি আমায় চিনলে কেমন করে?” ছেলেটা রাগ দেখিয়ে জিজ্ঞেস করল।
সে উত্তর দিল খুব সহজ গলায়, “চিনব কেমন করে? তোকে তো কোনওদিন দেখিইনি!”
“তবে যে বললে, তুমি জানতে আমি এখানে আছি?”
এত কষ্টেও মানুষটার সারা মুখে কেমন একটা মনকাড়া নরম হাসি ছড়িয়ে গেল। সে বলল, “ও, এইজন্যে বলছিস? তবে শোন, কেন ওকথা বলেছি। দ্যাখ, আমি পাগল নই। আমি কোনও দোষও করিনি। আমার দোষ বলতে আমি সবসময় হাসি। আর আমার হাসি দেখেই সবাই আমায় পাগল ঠাউরাল। পাগলকে কে আর দয়া করে! তাই, আমাকে প্রাণে না মেরে হাত-পা বেঁধে ফেলে দিয়ে গেল এখানে। ওরা ভেবেছিল, আমি একদিন নিশ্চয়ই মরে যাব সমুদ্রের জলের তলায় তলিয়ে। কিন্তু আমি জানতুম, দোষ যে করে না, সে এমন বেঘোরে মরেও না। কেউ-না-কেউ তাকে বাঁচাবেই। আর তাই, তোকে দেখে আমার সেই কথাই মনে হয়েছে।” বলে সে থামল। ছেলেটার মুখের দিকে নিমেষ তাকাল। তারপর হাসতে হাসতেই জিজ্ঞেস করল, “আমাকে বাঁচাবি না?”
ছেলেটা উত্তর দিল, “আমি তোমাকে কেমন করে বাঁচাব? আমি নিজেই তো মরতে বসেছি।”
মানুষটা জবাবে বলল, “তা বটে, তুইও মরতে বসেছিস। কিন্তু এখনও তো মরিসনি। আমিও মরিনি। এখন তুই আমাকে সাহায্য করলে, আমিও তোকে সাহায্য করতে পারি। আমার হাত-পা বাঁধা। আমি কাল থেকে এই অবস্থায় এখানে পড়ে আছি। দেরি করিস না আর। মনে রাখিস, তোর ওই দুটো হাতই আমার এই বন্দি দুটো হাতের বাঁধন খুলে দিতে পারে। তারপর আমরা দু’জনে খুঁজতে পারি আমাদের বাঁচার রাস্তা। দেরি করলে কে বলতে পারে আবার কী বিপদ আসে!”
না, ছেলেটা সত্যি আর দেরি করল না। তার হাতদুটো খুলে দিল। মানুষটা নিজেই তার পায়ের বাঁধা দড়িটা খুলে উঠে দাড়াল। এখন সে দেখতে পেল, সামনে উত্তাল সমুদ্র। তার আছড়ে পড়া ঢেউ। দেখতে পেল তার কূল ভেঙে উঠে এসেছে পাথরের স্তূপ। সেই স্থূপ দেখতে দেখতে সে বলল, “সূর্য এখন ঠিক মাথার ওপরে। সূর্য সমুদ্রে ডুব দেবার আগে এই পাথর টপকে আমাদের নিরাপদ জায়গায় পৌঁছতে হবে। তবেই আমরা বাঁচব। পারবি না?”
ছেলেটা উত্তর দিল, “তুমি পারলে আমিও পারব।”
“তবে আয়!” মানুষটার হাসি মুখ আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠল। দু’জনেই তখন কঠিন পাথরের ফাকে ফাকে পথের সন্ধান করতে লাগল।
একটা ছোট্ট ছেলে, কতই বা বয়েস তার। হয়তো দশ-এগারো। আর একজন পুরুষ্ট মানুষ। দু’জনেই পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে সন্ধান করছে পথের। ওই-ই-ই ওপরে যাবে ওরা। ওই যেখানে পাহাড়ের মাথায় অনেক বাড়ি। সুতরাং তারা চেষ্টা করে। পাথর টপকায়। পাথর টপকে এক-পা এগোলে, তারা দু’পা পেছোয়। খাড়াই পাথর। থাক থাক সাজানো। মানুষটা তেমনই হাসতে হাসতে বলল, “আসল বন্দিশালা একেই বলে। তুমি যে পাঁচিল টপকে পালাবে, সেটি হচ্ছে না।”
ছেলেটা নিরাশ গলায় জিজ্ঞেস করল, “তা হলে কী হবে?”
মানুষটা চকিতে ছেলেটার মুখের দিকে তাকাল। হা-হা করে হেসে উঠল। বলল, “ছট্কু দেখছি বড়ই হতাশ হয়ে পড়েছে।”
সঙ্গে সঙ্গে ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, “ছট্কু আবার কে?”
“কেন, তুই।”
“আমি ছট্কু হতে যাব কোন দুঃখে? আমি তো রন্তু। আমার নাম রন্তুকুমার।”
“সেইজন্যে আমায় লোকে পাগল বলে।” বলতে বলতে লোকটা আবার হাসল। মন যেন কেড়ে নেয় সেই হাসি। হাসির রেশটা সমুদ্রের বাতাসে দোল খেতে খেতে হারিয়ে যায় দূরে, অ-নে-ক দূরে।
ছেলেটা এবার অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, এমন বিপদেও তোমার হাসি পাচ্ছে?”
“এই, এইটাই হচ্ছে কথা। আরে বাবা, পাগল ছাড়া বিপদকে থোড়াই কেয়ার করতে পারে কে? কে পারে বিপদে হাসতে?” বলতে বলতে হেসে গড়িয়ে পড়ল লোকটা।

ছেলেটা হাঁ করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।
এবার হাসি থামিয়ে লোকটা বলল, “ঠিক আছে বাবা, আর তোকে ছট্কু বলে ডাকব না। রন্তু বলেই ডাকব। কিন্তু আমাকে তুই কী বলে ডাকবি?”
“তোমাকে আমি ‘হা-হা’ বলে ডাকব।”
“এ আবার কী ধরনের ডাক?”
“তোমার হাসির ডাক। তুমি সবসময় হা-হা করে হাসছ। তোমার ভয়ও নেই, ডরও নেই। তাই ওই নামে ডাকতেই আমার ইচ্ছে হল।” ছেলেটা উত্তর দিল।
“বুঝতে পেরেছি, তুমিও কম যাও না! আমাকে ঠাট্টা করা হল।”
ছেলেটা একদৃষ্টে তার মুখের দিকে তাকিয়ে ভাবল একমুহূর্ত। তারপর জিজ্ঞেস করল, “তুমি রাগ করলে? ঠিক আছে, তোমার যখন আপত্তি তখন আর একটা অন্য নাম ভাবি।”
“না, না, আমার আপত্তি কেন হবে? তোর যখন ‘হা-হা’ নামটাই পছন্দ, তখন তুই ‘হা-হা’ নামেই ডাকবি আমায়।” বলতে বলতে থামল লোকটা। তারপর পাথরের বাধার দিকে তাকিয়ে থমকে রইল খানিক। তাকিয়ে মুখের হাসি যেন তার হারিয়ে গেল।
“কী দেখছ?” তার মুখে হাসি না দেখে ছেলেটার মন যেন কেমন করে ওঠে।
“দেখছি পথ।”
“সত্যিই পথ খুঁজে না পেলে কী হবে বলো তো?”
“আমার হাসি হারিয়ে যাবে চিরদিনের মতো। তখন আর তুই আমায় ‘হা-হা’ বলে ডাকতে পারবি না। আমিও তোকে ডাকতে পারব না ‘রন্তু’ বলে। তখন কেউ আর আমায় পাগল বলতে পারবে না। বলবে, পাগলটা পটল তুলেছে।”
হঠাৎ ছেলেটা একটা গর্ত দেখতে পেল সরু একটা পাথরের ফাঁকে। তাই জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, ওই গর্তটার মধ্যে আমরা নামতে পারি না? কে বলতে পারে, ওই গর্তে নামলেই হয়তো পথ পেয়ে যাব।” বলে আঙুলে দিয়ে দেখাল সেই গর্তটা।
লোকটা চকিতে তাকাল সেই গর্তটার দিকে। তারপর বলল, “চল দেখি তা হলে।” বলতে বলতে একটু এগিয়ে গেল। পাথরের এখানে ওখানে পা ফেলে দেখল গর্তের ভেতর জল। জলে পা ঠেকল।
লোকটা বলল, “হুট করে জলে নামিস না।”
ছেলেটা উত্তর দিল, “দেখি না যদি তলে পা ঠেকে।”
“না, না, তোকে দেখতে হবে না, আমি দেখছি। আমার পা তোর চেয়ে লম্বা। বলে লোকটা নিজে জলে পা ডোবাল। অনেকখানি ডুবে গেল পা। তারপর চেঁচিয়ে উঠল। “তল পেয়েছি। আয়, আমার হাত ধর। সাবধান, পা পিছলে না যায়। ভয়ানক শ্যাওলা।”
না, পা পিছলাল না। দু’জনে খুব সাবধানে নেমে এল। এক-পা এক-পা করে তারা জল ডিঙিয়ে আর একটা পাথরে উঠে এল। তারা এমনই করে আরও তিনবার জল আর পাথর টপকাল। তখন দু’জনেই হাঁপাচ্ছে। লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতেই বলল, “খুব কষ্ট পেলি মনে হচ্ছে?”
ছেলেটি উত্তর দিল, “তোমার মুখে হাসি না দেখে বোঝাই যাচ্ছে কে কষ্ট বেশি পেয়েছে।”
একথা শুনে লোকটা হাঁপাতে হাঁপাতে হেসে উঠল। বলল, “ও বাবা, তুমিও কম যাও না। কেমন খোঁটা দিয়ে কথা বলছে।”
ছেলেটা বলল, “তা কেন বলছ। আসলে তোমার হাসি মুখ দেখলে আমার ভয় ভেঙে যায়। ভাল লাগে।”
লোকটা এবার একটু অন্য সুরে উত্তর দিল, “তা ধর, তোর যদি এখন খুব খিদে পায়, আর, আমি যদি দাঁত বার করে হাসি, তোর ভাল লাগবে?”
“ও, এবার বুঝতে পেরেছি।”
“কী বুঝতে পেরেছিস?”
“তোমারই খিদে পাচ্ছে।”
“আর তোর বুঝি পাচ্ছে না?”
ছেলেটা উত্তর দিল, “যারই খিদে পাক, একটা কথা জানি, খিদে পেলে একটু জিরিয়ে নেওয়া ভাল। এসো এখানে একটু বসি। বলতে হয়, অনেকটা বাধাই পার হয়ে এসেছি আমরা। একটু দম নিয়ে আরও খানিকটা ওঠার চেষ্টা করা যাবে।” বলে ছেলেটা একটা এবড়ো-খেবড়ো পাথরের ওপর নিজেই আগে বসে পড়ল।
লোকটা বসতে বসতে জিজ্ঞেস করল, “তোর খুব কষ্ট হচ্ছে, না রে?”
“না, তেমন না।” ছেলেটা উত্তর দিল, “আসলে এখন এই খাড়াই পথটা টপকাবার আগে একটু দম নেওয়া ভাল। দ্যাখো আমাদের মাথার ওপর ওই পাথরটা কী ভয়ংকর দেখতে লাগছে! আমরা এমন একটা বিপজ্জনক খাড়াই পাথরের নীচে আসতে পারব এ কী ভাবতে পেরেছিলে?”
“তোকে তো আগেই বলেছি, যার মনে পাপ নেই, যে কোনওদিন দোষ করে না, কেউ তার ক্ষতি করতে পারে না। বিনা কারণে যতই কষ্ট দাও তাকে, সে সব কষ্ট তুচ্ছ করে জিতবেই জিতবে।” লোকটা উত্তর দিল। তারপর বলল, “কিন্তু তোকে আসল কথাটাই জিজ্ঞেস করতে ভুলে গেছি, তুই এখানে এলি কেমন করে?”
“আমাকে ধরে-বেঁধে এখানে ফেলে দিয়ে গেল।”
“কে?”
“ডাকাতেরা।”
“কেন?” আশ্চর্য হল লোকটা।
“তারা ডাকাতি করে পালাচ্ছিল, আমি তাদের তাড়া করেছিলুম।”
“তা হলে বল, তোর মা-বাবা এখন তোকে হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াচ্ছেন?”
“না।” ভার হয়ে গেল ছেলেটার গলার স্বর। “তারা কেউ নেই।”
ছেলেটার দিকে তাকিয়ে লোকটার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। ছেলেটা তাই দেখে বলে উঠল, “তোমার মুখটা এমন গোমড়া হয়ে গেল কেন? এমন করে আমার দিকে। তাকিয়ে কী দেখছ?”
“দেখছি তোর মুখখানা।”
“আমাকে দেখে কী হবে এখন। তার চেয়ে বরং দ্যাখো এই সোজা খাড়াই পাথরটাকে। ভাবো, এটাকে এখন কেমন করে টপকানো যায়।”
লোকটা তাকে দেখতে দেখতে বলে উঠল, “ছেলে বটে একখানা! এত তোর মনের জোর।”
ছেলেটা উত্তর দিল, “তোমারই বা কম কী?”
“দ্যাখ,” লোকটা জবাব দিল, “এই খাড়াই পাথর কেন, আমাদের মনের জোরের কাছে আর কোনও বাধাই বাধা নয়। দরকার নেই আর সময় নষ্ট করে। সূর্য ডুব দেবার আগেই আমাদের ওই মানুষের রাজ্যে পৌঁছতে হবে।”
ছেলেটা উঠে দাঁড়াল। লোকটাও। দু’জনে দু’জনের হাত ধরল। সমুদ্র গর্জনকে তুচ্ছ করে দুর্গম এই পাথরের খাঁজ খামচে ধরে হামা দিল। লোকটা এই প্রথম তার নাম ধরে ডাক দিয়ে বলল, “রন্তু, আমি আগে আগে উঠি। তুই আমাকে দেখে দেখে ওঠ। সাবধানে পা রাখবি। না হড়কে যাস!”
“ঠিক আছে।”
অদ্ভুতভাবে থাকে থাকে সাজানো পাথর। দূর থেকে মনে হবে যেন ধোপ-দেওয়া কাপড়ের থাক সারি সারি কে সাজিয়ে রেখেছে। পা ফেলতে হচ্ছে দু’জনকে থাক দেওয়া এই পাথরের ওপরেই। না এখন আর দু’জনের কারও মুখে কথা নেই। চুপচাপ তারা ওপরে উঠছে দম ফেলে ফেলে। হাতের মুঠো শক্ত করে একটার পর একটা পাথর খামচে ধরে ওপরে উঠছে। কী ভয়ংকর দুঃসাহসী দুটো মানুষ। দূর থেকে দেখলে বুক কাঁপে।
হঠাৎ লোকটা একটা অদ্ভুত শব্দ করে হেসে উঠল। এ যেন কষ্টে ভেঙে পড়া মানুষের হাসি। তখনও ছেলেটা ঝুলে ঝুলে পাথর টপকাচ্ছে। কষ্টের চিহ্ন স্পষ্ট ফুটে উঠেছে তার সারা শরীরে। পাথরের ঘসটানি লেগে ছিঁড়েছে তার বুকের ছাল-চামড়া। হাসি শুনে চমকে মুখ তুলল সে। দেখতে পেল লোকটাকে। একটা এবড়ো-খেবড়ো পাথরের ওপর লুটিয়ে পড়ে হাসছে। ছেলেটাও ওখানে উঠতে পারলে পাথরটার ওপর শুয়ে পড়তে পারবে। কিন্তু উফ। আর যেন পারে না সে। এই বুঝি হাত ফসকে যায়! একবার ফসকালেই শেষ!
লোকটা ধড়ফড় করে ছেলেটার দিকে হাত বাড়াল। ধরে ফেলল ছেলেটার হাত। নিজের বুকের ওপর ভর দিয়ে ছেলেটাও উঠে পড়ল সেই পাথরটার ওপর। উত্তেজনায় দম বন্ধ হয়ে আসে যেন। শুয়ে পড়ল সে-ও। অনেকক্ষণ ধরে তারা দম নিল। তারপর ধীরে ধীরে লোকটা উঠে বসল। দেখতে লাগল চোখ ঘুরিয়ে চতুর্দিক। তারপর ডাকল, “রন্তু!” কষ্টে গলা কেঁপে উঠল।
ছেলেটা শুয়ে শুয়েই জিজ্ঞেস করল, “আরও কত পাথর ভাঙতে হবে?”
“না আমরা প্রায় এসেই গেছি। আর খানিকটা। নীচের দিকে চেয়ে দ্যাখ আমরা কোথায় উঠেছি। কত নীচে সমুদ্র। ওপরে দেখা যাচ্ছে ঘর-বাড়ি। আর খানিকটা পাথর টপকালেই ওই বাড়ি-ঘরের কাছে আমরা পৌঁছে যাব। সূর্য ঢলে পড়ছে। এখনও অস্ত যেতে দেরি আছে। আমরা আরও কিছুক্ষণ এখানে হাওয়া খেয়ে নিতে পারি।”
ছেলেটা মৃদু হাসল। হাসতে হাসতে উঠে বসল। তারপর আকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “হ্যাঁ, এখন হাওয়া খেয়েই পেট ভরাতে হবে। মানুষ যদি শুধুই হাওয়া খেয়ে বেঁচে থাকতে পারত তবে কী মজা হত বলো।”
লোকটার মুখখানা এত কষ্টেও ঝলমলিয়ে উঠল। বলল, “এতক্ষণে আমি এই প্রথম তোকে হাসতে দেখলুম। আয়, এই ঢেউ-ঝলমল সমুদ্রের দিকে চেয়ে আমরা দু’জনে প্রাণ খুলে হাসি। হাসতে হাসতে বলি, হে সমুদ্র, তুমি আমাদের দয়া করলে বলেই আমরা বেঁচে আছি। তুমি চাইলেই আমাদের দু’জনকে চোখের নিমেষে তোমার ঢেউয়ের ঝাপটায় তলিয়ে দিতে পারতে জলের তলায়। কেউ জানতেও পারত না।”
ছেলেটা জল থইথই সমুদ্রের দিকে তাকাল ক্ষণেক। তারপর মুখ তুলল আকাশের দিকে। বলে উঠল, “সমদ্রের বুকে কেমন আকাশের ছায়া পড়েছে দ্যাখো। সমদ্র যেন আকাশের আয়না। আকাশ এই আয়নায় মুখ দেখছে সারাদিন সারারাত ধরে। ঠিক বলিনি, বলো?”
লোকটা বলল, “তোর তো ভারী বুদ্ধি।”
ছেলেটা উঠে দাঁড়াল। বলল, “এবার চলো! অনেক হাওয়া খেয়েছি, পেট ভরে গেছে।”
আবার দু’জনে মনকে শক্ত করল। আবার পাথর টপকাতে লাগল। আগের মতো এমন খাড়াই না হলেও চড়াই-উতরাই কম করতে হচ্ছে না। এখন থেকে-থেকেই থামতে হচ্ছে। দম নিয়ে আবার উঠতে হচ্ছে। ভাগ্য বলতে হয়, তেমন কোনও সাংঘাতিক বাধা নেই। যতই এগোচ্ছে তারা, সূর্যও ততই নামছে। খানিক পরেই মনে হবে নীল সমুদ্রের জল সূর্যের লাল রঙে টলমল করছে।
হঠাৎ যেন হোঁচট খেল ছেলেটা। পড়ে গেল। তবে নীচে নয়। অন্য একটা চেটাল পাথরের ওপর। দমসম হয়ে সে ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলছে। লোকটাও হাঁপাচ্ছিল। ছেলেটাকে পড়তে দেখে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করল, “পড়ে গেলি?”
ছেলেটা উত্তর দিল, “হোঁচট খেয়েছি।”
“কোথায় লাগল?” বলতে বলতে লোকটা ব্যস্ত পায়ে এগিয়ে এল। ছেলেটা বলল, “না, তেমন লাগেনি।” বলতে বলতে উঠে দাঁড়াল।
“ভাগ্যিস!”
“এখনও কতটা?” ছেলেটা জিজ্ঞেস করল।
“কতটা কী বলছিস! ওই তো লোকজন দেখা যাচ্ছে। আমরা প্রায় মানুষের আস্তানায় ঢুকেই পড়েছি।”
সমুদ্রের ঢেউ এখান থেকে কত ছোট দেখাচ্ছে! সমুদ্রের বুক থেকে উঠে আসা পাহাড়ের উপত্যকায় গড়ে উঠেছে একটা শহর। ছবির মতো। সূর্য অস্ত গেছে। জ্বলে উঠছে আলো। এখান থেকে শোনা যাচ্ছে সমুদ্রের ক্ষীণ গর্জন। মানুষের কোলাহল কানে আসছে। দেখা যাচ্ছে, তাদের গায়ে গায়ে রং-বাহারি পোশাক। দেখলে কে বলবে তারা গরিব।
তাদের দেখে থমকে যায় এই দুটো মানুষ। ছিঃ! তাদের পোশাকের কী বিচ্ছিরি হাল! লজ্জা পায় রং-বাহারি পোশাক পরা মানুষের সামনে যেতে। সত্যিই, যা চেহারা হয়েছে মানুষদুটোর। যেমন পোশাক-আশাক, তেমনই শুকনো-শুটকো মুখ। ধুঁকছে। তবু ভাল, সন্ধে নেমেছে। তেমন করে তাদের দিকে চোখ পড়ে না কারও। ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, “এবার কী করবে?”
লোকটা হাসল, সেই চেনা হাসি। সে-ই উলটে জিজ্ঞেস করল, “কী করা যায় বল দিকিনি? কিছু পেটে না দিলে দু’জনেই মরব। তোর খিদে পাচ্ছে না?”
“পেলেই বা কী করা, দিচ্ছে কে?”
“চ। চেষ্টা করে দেখি।” লোকটা প্রায় কোঁকাতে-কোঁকাতে বলল।
“আর হাঁটতে পারছি না।” উত্তর দিল ছেলেটা, “একটু বসি।”
“রাস্তার এইখানে কি বসা ঠিক হবে?”
“তবে চলো একটু হেঁটে ওই দিকটা দেখি।”
“তাই চ।”
তারা হাঁটতে হাঁটতে ওই দিকেই চলল। একে কি হাঁটা বলে! খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে তারা। যেন দুটো ডানা-ভাঙা পাখি। একটা বড়, একটা ছোট।
লোকটার দয়া হল ছেলেটার অবস্থা দেখে। জিজ্ঞেস করল, “কীরে, কষ্ট হচ্ছে? বসবি?”
“এতটা যখন এসেছি চলো, ওই দিকটায় একটু যাই। ওদিকে অনেক মানুষ ঘোরাফেরা করছে। ছেলেরা খেলা করছে। খাবারের গাড়ি দেখা যাচ্ছে। ওইখানেই বসা যেতে পারে। ওটা মনে হচ্ছে বেড়াবার জায়গা।”
হ্যাঁ, সত্যি বেড়াবার জায়গা। একটা পার্ক। ওখান থেকে সমুদ্র দেখা যাচ্ছে, ওই নীচে। সমুদ্রের হাওয়া খাচ্ছে বেড়িয়ে বেড়িয়ে অনেক মানুষ। বাহ্! বিশ্রাম নেওয়ার বেশ জুতসই জায়গা তো। এখানেই বসা যেতে পারে। কিন্তু বসবে কোথায়? কার পাশে? এই আলো ঝলমলে পার্কে বেমানান ছেলেটা আর লোকটা। এখন তাদের দিকে নজর পড়ে গেল একটি একটি করে অনেক মানুষের। একটি দুটি করে অনেক ছেলেমেয়ে খেলা ছেড়ে ভয়ে পালাল মা-বাবার কাছে। তাদের দেখে। কেউ একজন আঁতকে চেঁচিয়ে উঠল, “চোর!”
একজন চেঁচাতে আর একজন চেঁচাল, “চোর।”
আর একজন চেঁচাতে সবাই চেঁচালো, “চোর! চোর! চোর!”
তারপর ইট! পাথর! ঘুষি! চড়!
চিৎকার! হুল্লোড়! পিটুনি! বিধ্বস্ত মানুষদুটো অজ্ঞান হয়ে গেল।
আগে জ্ঞান ফিরেছিল লোকটার।
তারপর ছেলেটার।
লোকটা আগে দেখেছিল সে বন্দি লোহার গারদে।
তারপরে দেখেছিল ছেলেটা।
লোকটা প্রথম দেখেছিল, ছেলেটার চোখের পাশে কালসিটে পড়েছে। ফুলে আছে।
ছেলেটা দেখেছিল, লোকটার মাথা ফেটে রক্ত শুকিয়ে আছে।
ছেলেটার মুখের দিকে চেয়ে লোকটার ঠোঁটে ঝলকে উঠেছিল মৃদু হাসি।
ছেলেটা সেই হাসি দেখে কেঁদে ফেলেছিল। খুব আবছা গলায় বলে উঠেছিল, “আমরা তো কোনও দোষ করিনি।”
কথাটা শুনতে পেয়েছিলেন পুলিশের বড়কর্তা। তিনি থমকে গেছলেন।
তারপর তাদের জন্যে খাবার এসেছিল। তাঁর হুকুমে।
তারপর তাদের দেখতে ডাক্তার এসেছিলেন। সেও তাঁর হুকুমেই।
দু’দিন ধরে অনেক যত্ন করা হয়েছিল সেই ছোট্ট ছেলেটাকে। আর বড় মানুষটাকে। নতুন পোশাক এসেছিল তাদের জন্যে।
এরপর পুলিশের বড়বাবু হুকুম করলেন, “গারদ খুলে দাও! এরা চোর নয়। নির্দোষ। শিশুরা কখনও মিথ্যে বলে না।”
তারপর রন্তু নামে সেই ছেলেটা আর রন্তর ডাকা তার হা-হা নামের সেই লোকটা পাহাড়ের গায়ে গড়ে ওঠা সেই শহর ছেড়ে কোথায় যে হারিয়ে গেল, কেউ জানে না!
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন