শৈলেন ঘোষ

ক’দিন ধরে একটানা বৃষ্টি পড়ছে। এখন একটু ক্ষান্ত হয়েছে। নদী টইটুম্বুর। আকাশের মুখ ভার। ছেলেটি জানত আবার বৃষ্টি পড়লে নদী উপচে বান আসবে। কে ছেলেটি?
ছেলেটির নাম জানত না কেউ। তার রকমসকম দেখে কার যেন মনে হয়েছিল ছেলেটি কুয়াশার মতো। ঝাপসা। তাই অন্য নাম খুঁজে না পেয়ে কে যেন তার নাম দিয়েছিল কুয়াশা। কোথা থেকে এসেছে সে, কেউ জানে না। সবাই বলে ভারী ফুটফুটে সে। মাথায় চুলের ঝাঁক যেন উড়ন্ত ফিঙের কালো্ পালক। ঠোঁটদুটি ফোটা দোপাটির পাপড়ির মতো।
অনেকে বলে, তার মাথার চুল বড় এলোমেলো। ছড়িয়ে আছে কপালে।
কেউ কেউ বলে, ঠোঁটে তার হাসি নেই। যেন খেই হারানো চোখের দৃষ্টি। একদিন কে যেন তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “কোথায় থাকিস রে তুই?”
ছেলেটি উত্তর দেয়নি, ছুট দিয়েছিল। ছুটতে ছুটতে এমন জোরে নিশ্বাস ফেলছিল যে, কুয়াশায় ঢেকে যাচ্ছিল চারদিক। সেই কুয়াশার আড়ালে লুকিয়ে সে অদৃশ্য হয়ে গেছল। আর দেখা যায়নি তাকে। সে বোধহয় এমনই করে নিজেকে লুকিয়ে রাখে। ধরা দেয় না। এ তো ভারী আশ্চর্য!
আসলে, কেউ কেউ বলে, তাকে দেখা যায় খুব ভোরে। যখন পাখিদের ঘুম ভাঙে তখন।
কেউ কেউ বলে, তাকে দেখেছে তারা ঠিক দুপুরে রোদের আলোয়। যখন গাছের পাতা রোদের তাপে নুয়ে পড়ে।
কে একজন যেন তাকে দেখেছে চাঁদনি রাতে। একা একা ঘুরছে, এবড়ো-খেবড়ো পথ ধরে, হোঁচট খেতে খেতে।
সে কি ঘুমোয় না?
হয়তো ঘুমোয়।
কোথায়?
দেখা যায় না।
তার কি খিদে পায় না?
হয়তো পায়।
কী খায়?
জানা যায় না।
কিন্তু কারও হাঁড়ির খবর জানার জন্যে উঠেপড়ে লাগার জিদ, সে তো আর শেষ হয় না মানুষের। শেষমেশ তাই তারা দল বাধল। শলা করল। ঠিক হল ছেলেটাকে পাকড়াও করবে।
কেন? সে কি চোর, না ডাকাত? না কি ডাকাতদলের গুপ্তচর? কী হবে তাকে ধরে?
যে-দেশের মানুষের কথা হচ্ছে এটা সে-দেশের কোনও ঘিঞ্জি শহর নয়। তেমনই বন নয়, বাদাড়ও নয়। এখানে মাঠে মাঠে ফসল ফলে। নদীতে হাঁস, পাতিহাঁস সাঁতার কাটে। এখানে ঝাউ-দেওদার ছায়া দেয়। শিউলি-পলাশ গন্ধ বিলোয়। এখানে শা-বুলবুল, ময়না, দোয়েল গাছে গাছে গান গায়। নাচে।
কিন্তু, এখানে হরিণ নেই, কাঠবিড়ালি আছে।
এখানে উট নেই, বানর আছে।
এখানে ভালুক নেই, ভেড়া আছে।
আর আছে একদল মানুষ যারা ভয় পায় একটা ছেলেকে। যার নাম দিয়েছে তারা কুয়াশা। বেরিয়ে পড়ল তারা একদিন রাতের অন্ধকারে, দল বেঁধে, চুপিসারে তাকে পাকড়াও করতে। উফ! অন্ধকার বলে অন্ধকার! অন্ধকারকে আরও ভয়ংকর যেমন মনে হয় ঝিঁঝির শব্দে, তেমনই অন্ধকারে মানুষকেও ভয়ংকর মনে হয় তাদের বুকের চাপা নিশ্বেসের ফোঁসফোঁসানিতে। নিশুতি রাতের সেই চলন্ত মানুষগুলো যেন ছন্নছাড়া ভূতের ছায়া। ছেলেটাকে খুঁজতে খুঁজতে কেউ দেখছে পিটপিট করে এদিক ওদিক। ডিঙি মারছে আলতো পায়ে এপাশ-ওপাশ। নয়তো, আঙুল-ডগা ঠোঁটে ঠেকিয়ে ফিসফিসুচ্ছে আঁতকে ভয়ে।
ছেলেটাকে খুঁজতে খুঁজতে কে যেন দলের ভেতর থেকে হঠাৎ বিটকেল গলায় চেঁচিয়ে উঠল, “ওই তো ছেলেটা!”
বিটকেল তার গলার শব্দে নিস্তব্ধ রাত যেন কেঁপে উঠল। সেই কাঁপুনিতে আরও কাঁপিয়ে আর-একজন গলা ফাটাল, “কই সে ছেলেটা?”
‘কই সে ছেলেটা’ বলতেই কী যেন একটা রাতের আবছায়াতে লাফ দিয়ে ঝোপের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। দলবাঁধা এই লোকগুলো তাই না দেখে ভয়ে টাল খায়। কেউ কেউ হাঁসফাঁস করে হাঁপায়। ওরই মধ্যে একজন হাঁপাতে হাঁপাতে বলে উঠল, “ওটা ভূত!”
ভূতের নাম কানে ঢুকতেই একটা ধেড়ে লোক কেঁদে ককিয়ে উঠল, “ওরে বাবা রে, কী করি রে, ভূত-ত-ত!”
দলবাঁধা সেই মানুষগুলোর তখন সে কী পড়িমরি দশা। যে যেদিকে পারল ছুট দিল। ছুটতে ছুটতে চেঁচাল, “ভূত-ত-ত! ভূত-ত-ত!”
সে এক অদ্ভুত কাণ্ড!
সেই দলটার অনেক মানুষ ভূতের ভয়ে সেই যে ঘরে ঢুকল, আর বেরোবার নামগন্ধ নেই তাদের। তার চেয়ে বাবা ঘরই ভাল। ঘরে বসে খড়কে গুঁজে নাকে হাঁচো, আপনি বাঁচো!
কিন্তু কপালে যদি দুর্ভোগ থাকে, তবে তুমি যতই হাঁচো কিংবা নাচো, কপাল তোমার ফাটবেই। আর হলও তাই। একদিন হল কী, ভোরের বেলা কে একজন দেখল, একটা ছেলে নদীর ঘাটে বসে হাঁসেদের গুগলি খাওয়াচ্ছে। তাকে দেখে ভাবল, এই ছেলেটা নিশ্চয়ই কুয়াশা নামের সেই ছেলেটা। আর দেখতে! সে হাঁকও দিল না, ডাকও পাড়ল না। সেখান থেকে টেনে দৌড় মারল। ঢুকে পড়ল এর ঘরে, না-হয় তার ঘরে। শুরু হয়ে গেল এর কানে ফিসফিস, না-হয় ওর কানে ফুসফাস! কী, না, সেই ছেলেটা নদীর ঘাটে হাঁসকে গুগলি খাওয়াচ্ছে!
আর বলব কী, ঝড় উঠলে যেমন ধুলো ওড়ে, কথাটা তেমনই করে উড়তে উড়তে গেল তার ভোল পালটে। হয়ে গেল গুজব:
‘গুগলি খাওয়াচ্ছে’ পালটে হয়ে গেল, গুলতি মারছে।
‘গুলতি মারছে’ হয়ে গেল, গুবরে হাঁটছে।
‘গুবরে হাঁটছে!’ হয়ে গেল, গুরুমশাই গান গাচ্ছে।
‘গুরুমশাই গান গাচ্ছে’ হয়ে গেল গোরু হাঁস খাচ্ছে।
আর দেখতে হয়, গুজবটা যখন সবে জমব জমব করছে, ঠিক তখনই কে যেন সত্যি-সত্যি গান গেয়ে উঠেছে। অবশ্য গানটা যে গুরুমশাই গাইছেন না, এটা একবাক্যে সবাই স্বীকার করবে। এটি একটি ছোট ছেলের গলার স্বর। এ বোধহয় সেই ছেলেটা! নদীর ঘাটে গান গাইছে!
অমনি ছোট ছোট। দলবেঁধে সব নদীর ঘাটে ছুটে চলল। গিয়ে দেখল, সত্যিই তো, হাঁস দুলছে নদীর স্রোতে, পা ডুবছে ছেলেটার নদীর জলে। ঢেউ উঠছে। ছেলেটা গান গাইছে আপনমনে দিব্যি। আর, যেই না তাকে দেখা, কারও আর তর সইল না ভাবার, অন্যকিছু। তারা ঝোপঝাড় টপকে, জলকাদা চটকে ছেলেটার ঘাড়ে হুড়মুড়িয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ল। ছেলেটা কিছু বোঝার আগেই তাকে খাবলে ধরল। ধরে আকাশে ছুড়ে লোফালুফি করতে লাগল। ছেলেটা হাত-পা ছুড়ে চিল চেঁচাল, “মরে গেলুম! মরে গেলুম!”
সে-কথা আর কে শুনছে! উলটে, তাকে চ্যাংঝোলা করে নিয়ে চলল জমাদারের ঘরে। জমাদারের জিম্মায় জমা রেখে বলে গেল, “ছেলেটাকে ঘরে বন্দি করে রাখবে।”
ছেলেটা অনেক কান্নাকাটি করল। অনেক সাধাসাধি করল। জমাদারের হাত ধরে অনেক ঝুলোঝুলি করল। বলল, “বিশ্বাস করো, আমার নাম কুয়াশা নয়, আমি বাদল। আমার একটা সাদা রঙের কুকুর আছে। একটা লাল রঙের জামা আছে। একটা কালো রঙের ফুটো ব্যাগ আছে। তাতে একটা সাপলুডো আছে। একটা ছেঁড়া ছবির বই আছে।”
তা, সে আর কে শুনছে! জমাদার ছেলেটাকে বাগিয়ে ধরে, তার পাশের ঘরের দরজায় শেকল তুলে আটকে রাখল। তবে, মিথ্যে বলব না, জমাদার তাকে পেট ভরে খেতে দিল। ঘুমোবার বিছানা দিল। রাতের ঘরে বাতি জ্বেলে আলো দিল।
সে খেল, কি খেল না, কে জানে! তার ঘুমে চোখ বুজল কি না তা-ই বা কে দেখবে! কিন্তু বাতির আলো দেখে সে যে রেগেমেগে ফুঁ দিয়ে নিভিয়ে দিল, সেটা স্পষ্ট চোখে পড়ল।
ব্যাস! যেই ফুঁ দিল অমনি অন্ধকার। রাত-নিঃঝুম অন্ধকারে ছেলেটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।
কাঁদতে কাঁদতে রাত হল গভীর। গভীর রাত মানে, চারদিক সুনসান। যেন কালো কয়লার কালি ছড়ানো চরাচর। এই কালো অন্ধকারই তো শয়তানের বন্ধু। এই অন্ধকারেই তো শয়তান অস্ত্র শানায়। প্রাণ নেয় মানুষের। এই অন্ধকারই তো মানুষের বুকে বাসা বেঁধে শয়তানের জন্ম দেয়। ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়!
খুট! শব্দ উঠল ঘরের দরজায়। এই ঘরেই ছেলেটা বন্দি। চমকে উঠল।
ক্যাঁচ! আবার শব্দ উঠল। খুলে গেল দরজাটা। হাট।
কে খুলল?
দেখা গেল না অন্ধকারে। শোনা গেল তার নরম মিষ্টি গলার স্বর, “আয়! বেরিয়ে আয়!”
দেখেশুনে ছেলেটির কান্না থমকে গেছে। হতবাক হয়ে সে খোঁজে তাকে, যে ডাকে।
সে আবার ডাক দিয়ে বলল, “দেরি করিস না। আয় তাড়াতাড়ি। জমাদার ঘুমোচ্ছে। ঘুম ভেঙে গেলেই বিপদ।”
ছেলেটি আর দেরি করল না। চটপট বেরিয়ে এল। দেখতে পেল অন্ধকারের ছায়ায় তারই মতো দেখতে একটি ছেলেকে।
সে ব্যস্ত গলায় বলল, “আমার ছায়ার আড়ালে তুই লুকিয়ে পড়। লুকিয়ে লুকিয়ে আমাদের পালিয়ে যেতে হবে।”
“কোথায়?”
“যেখানে কুয়াশায় মানুষের চোখ ঝাপসা হয়ে যায়নি!” সে উত্তর দিল।
“তুমি কে?”
“এ দেশের মানুষ আমার নাম দিয়েছে ওই কুয়াশা।”
“আমার নাম বাদল।”
“আমি জানি। তোদের যে বাড়ি আগুনে পুড়ে ছারখার হয়ে গেছে, সেটাও আমার জানা। তোর যে কেউ নেই, তাও জানি।”
“কেমন করে জানলে?”
কুয়াশা উত্তর দেওয়ার আগেই আচমকা বিদ্যুৎ চমকে উঠল। মেঘ ডাকল। ওরা দু’জনেই সঙ্গে সঙ্গে তাকাল আকাশের দিকে। কুয়াশা ব্যস্ত হয়ে বলল, “এখন আর অন্যকথা নয়। তুরন্ত পা চালা। মেঘে ঢাকা আকাশ। ঝড় উঠতে পারে। বৃষ্টি নামতে পারে। মাথা গোঁজার মতো একটা জায়গা না-পেলে মুশকিল। চল! চল!”
না, আর দেরি নয়। পা চালাল চোঁ-চা। যেন ছুটছে!
বলতে না-বলতেই শব্দ উঠল ঝড়ের শনশন। শনশন শব্দটা যখন বনবন করে চরকি খেতে লাগল, তখন কুয়াশা যেন ভয় পেল। বলল, “মনে হয় ঘূর্ণিঝড় উঠেছে।”
কুয়াশার মুখ থেকে কথাটা পড়তে যতক্ষণ। একেবারে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে শব্দ উঠল, দুম দড়াম ধপাস ধুপ ধাঁই ধড়াম! এটা-ওটা ভেঙে তছনছ করে দিল সব ঘূর্ণিঝড়।
বাদল আঁতকে উঠে চেঁচাল, “এবার কী হবে?”
কুয়াশা, দ্বিগুণ জোরে উত্তর দিল, “ছুটতে হবে। যত জোরে পারিস ছোট!”
বাদল জোরেই ছুটতে শুরু করে দিল। কিন্তু সে যতটা এগোচ্ছে ছুটতে ছুটতে, ঠিক ততটাই যেন পিছোচ্ছে ঝড়ের ধাক্কা খেতে খেতে। ঝড়ের ধাক্কায় কুয়াশা যে কোথায় ছিটকে গেল, কে জানে!
কিন্তু ঝড়ের ঝাপটানিতে বাদল হুমড়ি খেল খোলা মাঠে। সে আর্তনাদ করে উঠল, “কুয়াশা-আ-আ!”
ঝড়ের এই ভীষণ হুংকার টপকে সেই ডাক কার কানে পৌঁছবে!
এবার রাত কাটছে। রাতের যতটুকু বাকি ছিল ঝড়েই কাটল। মেঘে-ঢাকা ভোর-আকাশে আবছা আলোর রেশ দেখা গেলেও ঝড় থামল না। মুহূর্তের মধ্যে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নামল।
সে কী কথা! এক ঝড়ের তাণ্ডবেই পৃথিবী থরহরি, তার ওপর আবার বৃষ্টির তড়বড়িয়ে ঝরঝরানি! দুর্যোগ আর কাকে বলে! দুর্যোগের সঙ্গে তো আর কেউ গা-জোয়ারি করতে পারে না। কাজেই বৃষ্টির জলে কাকভেজা হয়ে বাদল মাঠে পড়ে পড়ে হি-হি করতে লাগল।
কিন্তু কুয়াশা?
সে যে কোথায় ছিল কে জানে। আচমকা হাজির হয়ে হাঁক পাড়ল, “বাদল, দুর্যোগ থেকে বাঁচার একটা জায়গা খুঁজে পেয়েছি। শিগগির ছুটে আয় আমার সঙ্গে!”
বাদল ভিজে হি-হি করতে করতেই বলল, “বৃষ্টির তোড়ে আমার চোখ ঝাপসে যাচ্ছে। তোমাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি না।”
কুয়াশা চেঁয়াল, “ছোট, ছুটলেই দেখতে পাবি।”
কথাটা সে মিথ্যে বলেনি। দু’পা ছুটতেই বাদল কুয়াশাকে দেখতে পেল। ছুটল কুয়াশাকে লক্ষ করে। খানিকটা ছুটতেই সত্যি-সত্যি দেখা গেল একটা হেলেপড়া ভাঙা ঘর। দরজা খোলা। বাদল হুড়মুড়িয়ে ঢুকে পড়ল ঘরের ভেতর। কিন্তু তখন ঘরে ঢোকা আর না-ঢোকা সমান। ভিজে ঢোল বাদলের তখন আর কিছুই বাঁচাবার নেই।
কুয়াশা আবার চেঁচাল। বলল, “বাদল, তুই এখানেই থাক। আমি না-আসা পর্যন্ত কোথাও যাস না!”
কোথাও যাবে কী, যা অবস্থা! এখানে যে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই মিলেছে, এই যথেষ্ট। এখান থেকে এখন আর অন্য কোথাও যাবার নাম করে কেউ!
কিন্তু হঠাৎ কেন অমন করে থতমত খেয়ে গেল বাদল! কে যেন আচমকা কেঁদে উঠল এই ভাঙা-ঘরে! কে কাঁদে? এ যে একটি ছোট্ট মেয়ে!
এতক্ষণ একদম খেয়াল করেনি বাদল। করার কথাও নয়। ঝড়-বৃষ্টির দাপট থেকে বাঁচার জন্যে সে আগুপিছু কিছু না-দেখেই ঢুকে পড়েছে এখানে। সুতরাং মেয়েটিকে কাঁদতে দেখে সে আঁতকে উঠতেই পারে। তাই সে অন্যকিছু ভেবে না-পেয়ে তারস্বরে হাঁক দিল, “কুয়াশা-আ-আ!”
এখন এখানে কোথায় কুয়াশা। উলটে বাদলের চিৎকারে থমকে গেছে মেয়েটির কান্না। সে যেন বোবা হয়ে গেল নিমেষে। বাদলও যেন শক্ত পাথর। কথা নেই তার মুখেও। দু’জনেই দু’জনকে দেখছে অবাক দৃষ্টিতে।
হঠাৎ ঝাপসা গলায় বাদল জিজ্ঞেস করল, “তুই কে?”
মেয়েটি জল-টলটল চোখে তাকিয়েই রইল। তার মুখে কথা সরল না।
বাদল আবার জিজ্ঞেস করল, “তোর নাম কী?”
ঠিক তক্ষুনি মেঘ গর্জে উঠল ভীষণ শব্দে। সেই ভাঙা ঘরটা থরথর করে উঠল কেঁপে। এই বুঝি থুবড়ে পড়ে। মেয়েটি চমকে বলে উঠল তার নাম, “রেহানা।”
ওদিকে বৃষ্টির নাগাড় বর্ষণে উত্তাল হচ্ছে নদী। বান ডাকবে না কি!
বানের আর দোষ কী! তোমার মুখের কথা পড়তে না-পড়তেই, কে যেন চেঁচাল, “বান আসছে! বান আসছে!” এ যেন কুয়াশার গলার স্বর!
মেয়েটি ভয়েময়ে ছুটে আসে বাদলের কাছে। আর্তনাদ করে ওঠে, “বাঁচাও!”
নদীর জল উপচে পড়েছে মাঠের ওপর। ভেসে যায় শাক-সবজির খেত! ছোট্ট সেই ভাঙা ঘরটাও বুঝি তলিয়ে যায় নদীর জলে! কী দুরন্ত তার স্রোত!
বাদল মেয়েটির হাত ধরে টান দেয়। ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। বাইরে এসে দু’জনেই আঁকড়ে ধরে একটা গাছের গুঁড়ি। বাইরে তখন তুমুল কাণ্ড। জলের তোড়ে মেয়েটির হাত ফসকে যায়! বাদল তাকে বাঁচাবার জন্যে ঝাঁপিয়ে পড়ল স্রোতের ওপর। চিৎকার করে উঠল, “সাঁতার জানিস?”

মেয়েটি জলে নাকানি-চোবানি খেতে খেতে উত্তর দেয়, “জানি।”
বাদল বলে, “স্রোতের টানে ভাসতে থাক। আমিও ভাসছি।”
মেয়েটিও স্রোতের টানে ভাসতে থাকল। ভেসে চলল কোথায়, কে জানে!
ওই দ্যাখো, বানের স্রোতে ভেসে যাচ্ছে কুয়াশাও। ভেসে যাচ্ছে গোরু, ভেড়া, ছাগল। সঙ্গে কত মানুষও।
ভাসতে ভাসতে হঠাৎ মেয়েটির দম যায় ফুরিয়ে। বুঝি ডুবে যাচ্ছে মেয়েটি। বাদলেরও যেন একই বিপদ। দম ফুরোয় তারও।
কুয়াশারও কি দম ফুরিয়ে গেছে?
না, না, ওই তো দেখা যাচ্ছে কুয়াশাকে। ওই তো সে একাই জাপটে ধরেছে বাদল আর রেহানা নামের মেয়েটিকে। সে কাউকে তলিয়ে যেতে দেবে না। বানের স্রোতে উথালপাথাল করে রেহানা আর বাদলের জন্যে সে একাই লড়াই চালাবে।
কে জানে কখন বানের দুরন্ত দাপট নিস্তেজ হয়ে গেছল। কে জানে কখন বাদল আর রেহানা জলের তোড়ে পৌঁছে গেছল একটা গভীর জঙ্গলের তীরে। আটকে ছিল জঙ্গলের ঝোপের ভেতর। অবশ্য না-বললেও কে না জানে, এমন করে মৃত্যুর হাত থেকে কে বাঁচাল তাদের। এ সেই ওস্তাদেরই কাজ, যার নাম কুয়াশা।
বৃষ্টি থেমেছে। কিন্তু আকাশ এখনও ঢেকে আছে মেঘে। কে বলতে পারে, আবার বৃষ্টি নামবে না। সুতরাং জঙ্গলেই খুঁজতে হয় একটা মাথা গোঁজার আস্তানা। কিন্তু কোথায় খুঁজবে আস্তানা এই ধস্ত তিনটে ছেলেমেয়ে এই গভীর জঙ্গলে? জঙ্গলটা যে শুধুই গভীর তা-ই নয়। বুক কাঁপানো থমথমে। ভয়ংকর নির্জন।
তবু তো জিজ্ঞেস করতে হয়। তাই কুয়াশা জিজ্ঞেস করল বাদলকে, “কীরে বাদল, পারবি জঙ্গল ডিঙিয়ে আস্তানা খুঁজতে?”
ক্লান্ত গলায় বাদল উত্তর দিল, “পারব।”
কুয়াশা ফিরে তাকাল সেই মেয়েটির দিকে। বলল, “তোর নামটা আমার জানা হয়নি। কী নাম তোর?”
“রেহানা।” মেয়েটি উত্তর দিল।
“আমাদের সঙ্গে আস্তানা খুঁজতে তোর কষ্ট হবে না তো?” জিজ্ঞেস করল কুয়াশা।
রেহানা উত্তর দিল, “তোমরা পারলে আমিও পারব।”
তখন কুয়াশা বলল, “তবে আর দেরি নয়। চ খুঁজি।”
তবে, খুঁজব বললেই তো আর ঘন জঙ্গলে আস্তানা খুঁজে বার করা যায় না। মানুষের বসবাস থাকলে তবু কথা ছিল। যেখানে মানুষই নেই, আছে শুধু ঝাঁকড়া ঝাঁকড়া গাছ, না-হয় ঝোপঝাড়, সেখানে তুমি আস্তানা খুঁজবে কোথায়? শেষ পর্যন্ত দ্যাখো গাছের তলায় আস্তানা গাড়তে হয় কি না।
ঝোপঝাড় সরাতে সরাতে এগোচ্ছিল তিনজনে। চতুর্দিকে কাদা প্যাচ-প্যাচ করছে। মাঝে মাঝে বুনো গাছের কাঁটা। ফুটছিল পায়ে। কে জানে, কোথাও সাপখোপের গর্ত আছে কি না! বিশ্বাস নেই।
হাঁটতে হাঁটতে চকিতে দাঁড়িয়ে পড়ল কেন কুয়াশা!
তাকে দাঁড়াতে দেখে রেহানা আর বাদলও থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
কুয়াশা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, “শুনতে পাচ্ছিস?”
রেহানা আর বাদল কান পাতে। ইদিক-উদিক জুলজুল চোখে তালাশ করে। হ্যাঁ, সত্যি তো! কার যেন কাতর স্বর তাদের কানে আসছে!
কুয়াশা বলে, “আয় তো, দেখি!” বলে সে জঙ্গলের ঝোপ হাঁটকাতে হাঁটকাতে এগিয়ে চলল। চলল রেহানা আর বাদলও তার পিছু পিছু।
বেশিদূর যেতে হল না তাদের। খানিকটা যেতেই তারা সন্ধান পেয়ে গেল আর-একটি ছেলের। গাছের লতাপাতায় ভীষণভাবে জড়িয়ে সে হাঁকপাক করছে। তাদের দেখে ছেলেটি মিনমিনে গলায় ডুকরে উঠল, “আমাকে বাঁচাও!”
“ভয় নেই তোর। আমরা আছি।” বলতে বলতে কুয়াশা চটপট এগিয়ে গেল তার দিকে। এগিয়ে গেল রেহানা, বাদলও। তক্ষুনি তক্ষুনি লতাপাতা ছেঁড়ার কাজ শুরু করে দিল। বেঁচে গেল ছেলেটা। কারও বুঝতে বাকি রইল না, বানের তোড়ে ভাসতে ভাসতে তার হয়েছে এই দশা। তার নাম জিজ্ঞেস করতে সে বলল, “জোসেফ।”
এত কষ্টের মধ্যেও ছেলেটার নাম শুনে কুয়াশার মুখে এক টুকরো হাসি ঝলসে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে মিলিয়েও গেল। তারপর যেন সে আপনমনে বলে উঠল, “নাম আমাদের সবার আলাদা আলাদা। কিন্তু বিপদ যখন আসে তখন সে নাম দেখে আসে না। সে ঝাঁপিয়ে পড়ে রেহানার ওপর যেমন, তেমনই আমার ওপর, জোসেফের ওপর, বাদলের ওপর। এখানে আর বাছবিচার নেই। বিপদকে তখন এককাট্টা হয়ে রুখতে হয়। তখন আমাদের নামগুলো আর আলাদা থাকে না। আমরা তখন সবাই মানুষ।”
কুয়াশার এসব কথা শুনে রেহানা বাদল জোসেফ অবাক হয়ে তার মুখের দিকে তাকাল। বাদল ধীর গলায় বলল, “আশ্চর্য লাগছে তোমার কথা শুনে।”
রেহানা বলল, “আমরা যেসব কথা ভাবতে পারি না, সেসব কথা তুমি কেমন করে ভাবলে?”
বাদল বলল, “এই সত্যি কথাগুলো তুমি নিশ্চয়ই বড়দের মুখে শুনেছ!”
কুয়াশা আবার মুচকি হাসল। হাসিমুখেই সে উত্তর দিল, “এসব কথা আমায় বাবা বলেছেন। তা ছাড়া আমিও তো এখন বড় হয়ে গেছি। অন্তত তোদের চেয়েও তো বড়!”
এতক্ষণে জোসেফও অনেকটা ধাতস্থ হয়ে উঠেছে। সে একজন পাকাপোক্ত বয়স্ক মানুষের মতো বলে উঠল, “একটা বিপদ কাটলে আর একটা বিপদ আসে। ভয়ংকর বানের হাত থেকে রক্ষা পেয়েছি আমরা। কিন্তু আমরা জানি না আমাদের খাবার কোত্থেকে জুটবে! কেমন করে জুটবে আমাদের আশ্রয়! জুতসই আশ্রয় না-পেলেও এখানে ওখানে পড়ে থাকা যায়। তাতে কষ্ট হবে ঠিকই, তবে প্রাণ যাবে না। কিন্তু খাবার না জুটলে শুকিয়ে মরতে হবে।”
কুয়াশা জোসেফের বুদ্ধির তারিফ করে বলল, “তুই ঠিকই বলেছিস। আশ্রয় খোঁজার আগে আমাদের খাবারই খোঁজা উচিত। কিন্তু বনে-জঙ্গলে ফলমূল ছাড়া আর অন্যকিছু তো পাওয়া যাবে না। সুতরাং সবাই এককাট্টা হয়ে এখন আমাদের ফলমূলই খুঁজতে হবে। পেলে ভাল। নইলে জোসেফের কথা মতো শুকিয়ে মরতে হবে।”
না, শুকিয়ে মরল না তারা। কুয়াশার কথা শুনে জলকাদা ডিঙিয়ে ডিঙিয়ে তারা ফলের গাছের খোঁজতল্লাশ করতে লাগল। ঘন জঙ্গলে ঢুকেও গেল অনেকটা। আবার যে ফিরতে হবে একথা যেন খেয়ালও করল না কেউ। ঠিক এই মুহূর্তে আলটপকা চেঁচিয়ে উঠল রেহানা, “ওই দ্যাখো, গাছভর্তি কলা!”
আর সবুর সয়! যে পারল সেই ছিঁড়ল কলার ছড়া। অন্তত খানিকটা সামাল তো দেওয়া গেল খিদেকে।
ঠিক এই মুহূর্তে হঠাৎ এক আশ্চর্য কাণ্ড ঘটে গেল। রেহানার চোখ পড়ে গেল, ঘন জঙ্গলের আড়ালে নিথর হয়ে পড়ে থাকা একটা ধস্ত অট্টালিকার দিকে। সে চেঁচিয়ে উঠল, “ওই দ্যাখো!”
যে-আশ্রয়ের খোঁজে এতক্ষণ এত যে হাপিত্যেশ করা, তার হদিস এমন যে অতর্কিতে মিলে যাবে, এটা কে আশা করেছিল! না, তারা আর দেরি করল না। পড়িমরি করে ধেয়ে গেল সেইদিকে।
বাবা! অট্টালিকা বলে অট্টালিকা! কী প্রকাণ্ড! এ যেন ঠিক রাজপ্রাসাদ। ভেঙেচুরে পড়ে আছে জঙ্গলের মাঝখানে।
কিন্তু এ কী! অট্টালিকার ভেতরে যাবার পথ আগলে পড়ে আছে যে রাশি রাশি আবর্জনা, পাহাড় হয়ে। ভেতরে যাবে কেমন করে। যাঃ! আশ্রয়ের দেখা পেয়েও বুঝি ফক্কা হয়ে যায় ভাগ্য! হিমশিম খেয়ে গেল তারা পথ খুঁজতে খুঁজতে। শেষমেশ নিরাশ হয়ে হা-হুতাশ করতে লাগল।
হাল ছাড়েনি কুয়াশা। সে জানে, বাবা তাকে বলেছেন:
যে পারে শক্ত হাতে ধরতে হাল
নিশানায় তারই ওড়ে তরীর পাল।
তাই, সে যখন দেখতে পেল একটা সুড়ঙ্গ, তার মুখে হাসি ফুটল। সবাইকে ডাক দিল। আনন্দে শুকনো মুখগুলো যেন ঝলমল করে উঠল। তারা কুয়াশার পিছু পিছু সুড়ঙ্গে ঢুকে গেল।
খুব একটা সহজ হল না সুড়ঙ্গের ভেতরে এগিয়ে চলা। তবু ভাল, পোড়োবাড়ির জঞ্জাল তেমন একটা বাধা হল না। তারা নিরাপদেই পৌঁছে গেল অনেকটা ভেতরে। যেখানে এসে তারা দাঁড়াল, উফ! কী ঘুরঘুট্টি অন্ধকার সেখানটা! তারা নিজেরাই নিজেদের দেখতে পায় না। শুধু শুনতে পায় নিজেদের নিশ্বেসের শব্দ। সেই নিশ্বেস অন্ধকারে হাঁসফাস করে ছড়িয়ে পড়ছে।
ভয়ে রেহানার গলা কেঁপে উঠল, “কী অন্ধকার!”
বাদলের ভয়ে বুক দুরু দুরু। সে বিড়বিড় করে বলে উঠল, “এটা বোধহয় পাতালঘর!”
“এই অন্ধকারে আমাদের দম আটকে আসছে। কেমন করে থাকব এখানে আলো ছাড়া?” জোসেফের গলা যেন চিঁচি করে ওঠে আতঙ্কে।
কুয়াশা উত্তর দিল, “ঠিক বলেছিস আলো ছাড়া এখানে থাকা মুশকিল। আলোর কথা কাল ভাবব। আজ অন্ধকারেই শুয়ে বসে কাটাতে হবে। সারাটা দিন ভয়ংকর ধকল গেছে। এখন শুয়ে পড়লেই ঘুমিয়ে পড়বি। ঘুমিয়ে পড়লে অন্ধকারের কথা মনে থাকবে না। সুতরাং আয়, যে যেখানে দাঁড়িয়ে আছি সেখানেই শুয়ে পড়ি।”
সবাই শুয়েই পড়ল।
সকাল হল। সারারাত সত্যিই তারা ঘুমিয়েছে অকাতরে ধুলোবালির ওপর। একে একে তাদের যখন ঘুম ভাঙল, একে একে সবাই দেখল, সারাঘর আলোয় আলো! কুয়াশা জেগে বসে আছে। ঘরের এককোণে আগুন জ্বলছে শুকনো গাছের ডালপালায়। তারই শিখায় ঘর আলোয় উছলে পড়েছে। রেহানা বাদল জোসেফ অবাক চোখে তাকাল কুয়াশার দিকে। কুয়াশার মুখে হাসি। সে বলল, “আগুনের ঝলক দেখে অবাক হচ্ছিস? শুকনো ডালপালা জোগাড় করে, পাথরে পাথর ঠুকে আমি ধরিয়েছি আগুন। ওই দ্যাখ, তোদের জন্যে কত ফল পেড়ে এনেছি গাছ থেকে।”
সবে ঘুম ভাঙা চোখ তখনও ঢুলুঢুলু করছে তাদের। ঢুলুঢুলু চোখে তারা চারদিক দেখতে লাগল। সত্যিই, এটা একটা পাতালঘর।
কুয়াশা বলল, “আয় আমার সঙ্গে!”
“কোথায়?”
“বাইরে। আজ আর আকাশে মেঘ নেই। রোদ উঠে গেছে। কাছেই একটা সায়র আছে। পরিষ্কার জল। ওখানেই মুখ-চোখ ধুয়ে নিতে পারবি।” কুয়াশার সঙ্গে বেরিয়ে এল তারা বাইরে। মুখ-চোখ ধুয়ে সাফসুতরো হয়ে আবার ফিরে গেল সেই পাতালের আস্তানায়।
“এরপর কী করব আমরা?” হঠাৎ জিজ্ঞেস করল বাদল।

কুয়াশা বলল, “কেন, ফিরে যাব।”
“আমার তো ফিরে যাবার জায়গা নেই।” উত্তর দিল বাদল।
“আমারও নেই।” জোসেফও বলল একই কথা।
রেহানা বলল, “কেন, আমরা এখানেই থাকতে পারি না?”
“তোরও বুঝি কেউ নেই?” জিজ্ঞেস করল কুয়াশা।
চোখ ছলছল করে উঠল রেহানার। সে কথা বলতে পারল না।
স্থির হল, তারা সেখানেই থাকবে। লেগে পড়ল তারা ইটের ভাঙা স্তূপ আর জঞ্জাল সরানোর কাজে। ছুটে খেলে, শুয়ে বসে থাকার মতো অনেকখানি জায়গা তারা বার করে ফেলল। তারপর শুরু হয়ে গেল তাদের আনন্দ আর উল্লাস।
কুয়াশা জিজ্ঞেস করল, “কেউ গান জানিস?”
“আমি।” বাদল হাত তুলল।
“রেহানা, তুই?”
“আমি নাচতে পারি।”
জোসেফ বলল, “আমি বাঁশি বাজাব।”
“বাঁশি? কই?” কুয়াশা জিজ্ঞেস করল।
জোসেফ বলল, “আমি নাকে শব্দ তুলে বাঁশি বাজাতে পারি।”
সারাদিন হই-হুল্লোড় করে তাদের কেটে গেল। সারাদিন সেই পাতালঘরে শুকনো গাছের ডালপালায় আগুন জ্বলল দাউ দাউ করে ঘর আলোয় ভরিয়ে দিয়ে। সেই আলোয় তাদের মুখগুলি ঝলমল করতে লাগল। এখন বোধহয় অনেক রাত। কত রাত সে তো আর এখানে বসে বোঝা যায় না। বোঝা যায় তাদের চোখ দেখলে। ঘুমে জড়িয়ে আসছে তাদের চোখ। হাই উঠছে ঘনঘন। এবার শুয়ে পড়লেই হয়। বুনো গাছের পাতা বিছিয়ে তারা কেমন নরম বিছানা পেতেছে। ভাঙা এবড়ো-খেবড়ো মেঝেটা ঢেকে গেছে সেই নরম বিছানায়। মনে হয় না, আর কষ্ট হবে।
না, কষ্ট হল না। সবাই ঘুমিয়ে পড়ল নিশ্চিন্তে। শুধু জেগে রইল কুয়াশা। হয়তো সেও শুয়ে পড়বে একটু পরে। হয়তো যতক্ষণ আগুনের আঁচ আলো দেবে ততক্ষণই সে জেগে থাকবে। লক্ষ রাখবে আগুন না ছড়িয়ে পড়ে ওই পাতার বিছানায়।
অবশ্য, তেমন কিছু হল না। আগুনে ধিকিধিকি জ্বলতে জ্বলতে ছাই হয়ে গেল গাছের শুকনো ডালপালা। আবার নেমে এল নিকষ কালো অন্ধকার সেই পাতালঘরে। আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল চারদিক। এবার তো শুতে পারে কুয়াশা। আর কেন বসে থাকা?
কিন্তু না, তার শোওয়া হল না। কেন না, অদ্ভুত একটা কাণ্ড ঘটে গেল। হঠাৎ থর থর করে কেঁপে উঠল পাতালের সেই ঘরখানা। প্রথমটা মনে হল, সে কাঁপন যেন ভূমিকম্পের। থতমত খেয়ে গেল কুয়াশা। এই বুঝি সে চিৎকার করে ঘুম ভাঙিয়ে দেয় সকলের। না, পারল না। মনে হল, জমাটবাঁধা অন্ধকারে ঘরের চারটে দেওয়াল যেন তাকে চেপে ধরার চেষ্টা করছে। কে যেন শ্বাস ফেলছে ভয়ংকর শব্দ করে। শ্বাসের সেই শব্দটা মুহূর্তের মধ্যে ঝড়ের শব্দের মতো ফুঁসে উঠল। তারপর কুয়াশার মুখে-চোখে ঝাপটা মেরে ছড়িয়ে দিল সেই নিভন্ত আগুনের মুঠোমুঠো ছাই। নাস্তানাবুদ কুয়াশা আর্তনাদ করে উঠল, “থামো-ও-ও।”
থামল। থেমে, কে যেন একটা উদ্ভট গলায় খরখর করে কয়ে উঠল, “বুঝতে পারছি, আমি কে সেটা জানার জন্যে তুই উৎসুক হয়ে আছিস। জেনে রাখ, এই যে পাতালঘরে ঢুকেছিস তোরা, এটা একটা গুমঘর। এই গুমঘরের চারটে দেওয়াল হল, আমার ধড়, বুক, পিঠ, পেট। আমার বন্ধু হল অন্ধকার। সেও থাকে এখানে। এখানে আমাদের একসঙ্গে কত বছর যে কেটে গেছে, তার হিসেব জানা নেই। যেদিন সম্রাট চোখ বুজল, সেদিন থেকে প্রাসাদেরও দিন ফুরোল। এককালে এই গুমঘরে বন্দি করে রাখা হত তস্কর, জালিয়াত, ডাকু, লুঠেরাদের। তখন জ্বলত এই ঘরে টিমটিম করে লম্ফ। তারপর যেদিন ধসে পড়ল এই প্রাসাদ, সেদিন থেকে নিভে গেল লম্ফও। সেদিন থেকে আমার বন্ধু অন্ধকারের গলা জড়িয়ে আমি শান্তিতে আছি। সেই থেকে আমার বন্ধু অন্ধকারকে আলো জ্বেলে কেউ উত্যক্ত করেনি। আমার পেটে পা ফেলে কেউ নাচেনি। গান গেয়ে কেউ আমার দেওয়ালে প্রতিধ্বনি তোলেনি। কারও হাসির শব্দে আমার শান্তির ব্যাঘাত ঘটেনি। কিন্তু তোরা এখানে ঢুকে আমাকে যেমন অতিষ্ঠ করে তুলেছিস, তেমনই অন্ধকারের মুখে-চোখে আগুনের তাপ ছড়িয়ে তাকেও দগ্ধ করেছিস। তোরা এক্ষুনি এখান থাকে দূর হয়ে যা!”
কুয়াশার ভয়পাওয়া মুখখানা হঠাৎ যেন কেমন পালটে গেল। তার মুখে ছড়ানো ছাইয়ের রাশি সে ঝটপট ঝেড়ে ফেলল। বুক চিতিয়ে জবাব দিল, “আমরা যাব বলে এখানে আসিনি। আমরা এই প্রাসাদ দখল করেছি।”
“বলিস কী রে! তোদের সাহস তো কম নয়। প্রাসাদ দখল করেছি বললেই কি দখল করা যায়? এ প্রাসাদ আমার আর আমার বন্ধু অন্ধকারের। অন্ধকার যদি একবার ক্ষিপ্ত হয়, তখন তো তোরা অতলে তলিয়ে যাবি।”
কুয়াশা তার কথা শুনে থোড়াই ভয় পেল। বরং অন্ধকারকে হতচ্ছেদ্দা করে বলে উঠল, “অন্ধকার তো ফাঁকা-ফুঁকো ফোপরা। তার হাতও নেই, পা-ও নেই। ঠুঁটো। সে আমাদের কী করবে! সে তো নিজেই ভিতুর মতো লুকিয়ে থাকে ঘরের কোণে। জেনে রাখো আমরা এইখানেই থাকব। আমরা নতুন করে গড়ে তুলব এই ভাঙা রাজপ্রাসাদ। অন্ধকারের সাধ্যি নেই আমাদের আটকায়।”
“তুই কে রে ছেলে, এত হম্বিতম্বি করিস?”
“আমি কুয়াশা। অন্ধকার যেমন তোমার বন্ধু, তেমনই ওই যারা ঘুমোচ্ছে বন্ধু ওরাও আমার। ওদের নাম রেহানা, বাদল, জোসেফ। আমরা সবাই এক। আমরা ভালবাসি সবাই সবাইকে প্রাণ দিয়ে। কে আমাদের ক্ষতি করবে! অন্ধকার? ফুঃ!”
গুমঘরের সেই অদৃশ্য মূর্তি তখন আজব স্বরে খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “তুই একটা আস্ত হামবড়াই! অন্ধকারকে তাচ্ছিল্য করিস। ঠিক আছে, সকাল হোক, তখন তোর মালুম হবে, কাকে বলে অন্ধকারের তেজ। দেখবি, কেমন করে তছনছ করে দেয় তোর বন্ধুদের ভালবাসা!”
কুয়াশা উত্তর দিল, “দেখা যাবে!”
হঠাৎ আবার সব নিশ্চুপ। কারও মুখে আর কথা নেই। থমথম করছে চারদিক। কী মনে হল কুয়াশার, সেই রাতদুপুরেই সে শুকনো ঝোপঝাড় টেনে আনল বাইরের জঙ্গল থেকে পাতালের সেই গুমঘরে। পাথরে পাথর ঠুকে আগুন লাগিয়ে দিল তাতে। আলো ছড়িয়ে পড়ল। কারও কোনও আপত্তিকর হুংকার শোনা গেল না আর।
বাকি রাত কেটে গেল নির্বিঘ্নে। ঘুম ভাঙল তিন বন্ধুর। গভীর রাতে যে অত কাণ্ড ঘটে গেছে, ঘুণাক্ষরেও তারা টের পায়নি। তাদের ঘুম ভাঙতে কুয়াশা তাই হাসিমুখেই জিজ্ঞেস করল, “কীরে, কেমন ঘুম হল?”
আশ্চর্য, কাল যারা সারাদিন একসঙ্গে অত আনন্দ করেছে, আজ সকালেই যেন তারা একেবারেই অন্য মানুষ। তারা কেউই কুয়াশার কথার কোনও উত্তরই দিল না। উলটে বাদল আচমকা জোসেফের গলাটা খমচে ধরে খিঁকিয়ে উঠল, “কাল সারারাত তোর জন্যে আমার ঘুম হয়নি। বারবার আমি তোর লাথি খেয়েছি। এবার লাথি খাবার পালা তোর।”
জোসেফ ঝটকা মেরে বাদলের হাতটা সরিয়ে দিয়ে রুখে উঠল, “বেয়াদপ, আমার গায়ে তুই হাত তুলিস! কে মেরেছে লাথি, আমি না তুই?” বলেই দিল একখানা মোক্ষম ঘুষি। নিমেষের মধ্যে লেগে গেল হাতাহাতি।
এক লহমায় এমন একটা ঘটনা যে চোখের সামনে ঘটে যাবে, এ কেমন করে ভেবে পাবে কুয়াশা। সে হতভম্ব। দেখেশুনে হাত-পা যেন তার পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে যায়! সে যে এগিয়ে গিয়ে তাদের থামাবে, তাও পারল না। কেন না, এরই ফাঁকে রেহানা ভীষণ রেগে চেঁচিয়ে উঠল, “হতচ্ছাড়ার দল, আর জায়গা পেলি না। বাড়িটা আমার। আমার বাড়িতে এমন অশান্তি আমি সহ্য করব না। মারামারি করতে হয়, আমার বাড়ি থেকে বেরিয়ে গিয়ে কর।”
রেহানার কথা শুনে জোসেফ আর বাদলের মারামারি মাথায় উঠল। তেড়ে এল রেহানার দিকে। জোসেফ বলে, “এ বাড়ি কারও নয়, আমার।”
বাদল বলে, “আমার।”
লেগে গেল তিনজনের মধ্যে তুমুল কথা কাটাকাটি। এই বুঝি শুরু হয়ে যায় রক্তারক্তি কাণ্ড!
কুয়াশার কেমন যেন মনে হল, তবে এ কি সেই সর্বনেশে অন্ধকারের কাণ্ড!
হ্যাঁ, ঠিক তাই। কুয়াশা সারারাত জেগে বসেছিল, কিন্তু জানতে পারেনি কখন তার অলক্ষ্যে অন্ধকার ঢুকে পড়েছে ওদের বুকের ভেতর। কুয়াশা ছুটে গেল লড়াক্কু ওই তিনটে ছেলেমেয়ের দিকে। বুকের মধ্যে সে টেনে নিল বাদলকে। বাদল মানল না কুয়াশাকে। তাকে ছিটকে ফেলে চেঁচিয়ে উঠল, “তুমিই যত নষ্টের গোড়া। তুমিই ফন্দি করে আমাকে বন্দি করেছ এখানে।” বলেই, বাদল এবার ঝাঁপিয়ে পড়ল কুয়াশার ওপর।
কুয়াশা আকুল হয়ে বলে উঠল, “ভুল করিস না বাদল। আমাকে আঘাত করে কোনও লাভ নেই। আমাদের আঘাত করতে হবে অন্ধকারকে। নিজেদের নয়।”
বাদল শুনল না তার কথা। গলা চড়াল চিলের মতো। বলল, “তোমার মিথ্যে কথা অনেক শুনেছি। তুমি আমাকে ভুলিয়ে ভালিয়ে এখানে নিয়ে এসে বন্দি করেছ। আমাকে তুমি মেরে ফেলতে চাও!”
বাদলের কথা শুনে জোসেফও চেঁচিয়ে উঠল, “তুমি আমাকেও ধোঁকা দিয়ে এই গুমঘরে আটক করেছ। তুমি আমারও প্রাণ নিতে চাও!”
রেহানারও চোখ রেগে লাল হয়ে উঠল কুয়াশার দিকে চেয়ে। সে-ও কিছু কটুকথা বলতে যাচ্ছিল কুয়াশাকে, কিন্তু তার আগেই একটা মারাত্মক কাণ্ড করে বসল জোসেফ। ঝট করে একটা ইট তুলে নিল মাটি থেকে। চিৎকার করে উঠল, “আমার প্রাণ নেওয়ার আগে, তোমারই প্রাণ নেব আমি।” বলে, আচমকা ছুড়ে দিল ইটটা কুয়াশার দিকে। আঘাত করল কুয়াশার কপাল। লুটিয়ে পড়ল কুয়াশা মাটিতে। রক্ত গড়াল কপাল ফেটে। জ্ঞান হারাল সে।
তারপর?
নিস্তব্ধ হয়ে গেল গুমঘর। এ কী করল জোসেফ! এক মুহূর্তও দেরি হল না তার বুঝতে, কী অপরাধ করে ফেলেছে সে। যে-হাত দিয়ে সে ইট ছুড়েছে সে-হাতটা লুকিয়ে ফেলার জন্যে সে ছটফট করতে লাগল। থমকে গেল বাদলেরও হাঁকডাক। রেহানার রাগে লাল চোখদুটোও স্থির হয়ে গেল কুয়াশার কপালে রক্ত দেখে। তিনজনে ভয়ে কাঠ।
মাত্র কয়েক মুহূর্ত। তারপরেই ছুটে গেল রেহানা কুয়াশার কাছে। নিজের কামিজের অনেকটা কাপড় ছিঁড়ে ফেলল। বেঁধে দিল তার কপালে। কেঁদে ফেলল। আর ভাবতে লাগল এ কী অদ্ভুত কাণ্ড! আমাদের এমন ভালবাসা, হঠাৎ কে ছিনিয়ে নিল।
দাঁড়াল না বাদল আর জোসেফও। ছুটল তারা জল আনতে। মুছে দেবে কুয়াশার কপালের রক্ত জল দিয়ে।
ঠিক বটে, তারা রক্ত মুছেও দিয়েছিল কুয়াশার। তবু তার জ্ঞান ফেরেনি অনেকক্ষণ। একটা আহত হরিণের মতো সে পড়েছিল মেঝের ওপর। আর ওই তিনটে ছেলেমেয়ে মুখ বুজে শুশ্রূষা করছিল তার। সেইসঙ্গে বোধহয় মনে মনে ভাবছিল, জোসেফের ছোড়া ইটটা শুধু কুয়াশাকেই আঘাত করেনি, আঘাত করেছে তাদেরও।
ঠিক এই সময়েই আচমকা একটা দীর্ঘশ্বাস পড়ল কুয়াশার। তার হাতদুটি যেন আলতো কেঁপে উঠল। দৃষ্টি পড়ল তার প্রথম তারই জ্বালানো আগুনের শিখার দিকে। তারপর সে ফিরে তাকাল জোসেফের দিকে। হাসল। ভারী নরম সেই হাসি। উঠে বসল। তখন সেই তিন বন্ধুর বুকের মধ্যে গুমরোচ্ছে অপরাধের যন্ত্রণা। সরে গেল তারা। মাথা নিচু করে দাঁড়াল একটু দূরে।
কুয়াশাও উঠে দাঁড়াল। টলোমলো পায়ে এগিয়ে গেল। তিন বন্ধুর কাঁধে হাত রাখল। তারপর বলল, “আমি কিচ্ছু মনে করিনি। আমি জানি তোদের কোনও দোষ নেই। নিষ্ঠুর অন্ধকার চোরের মতো ঢুকে পড়েছিল তোদের বুকের ভেতর। আমার ক্ষতি করার জন্যে তোদের মন বিষিয়ে দিয়েছিল হিংসায়। চুরমার করে দিতে চেয়েছিল আমাদের বন্ধুত্ব। নিজেদের সঙ্গে নয়, এখন আমাদের লড়াই করতে হবে অন্ধকারের সঙ্গে। এই গুমঘরের অন্ধকারকে আলোয় ভাসিয়ে দিয়ে এখানে আমরা গড়ে তুলব নতুন সৌধ। পারবি না?”
আকাশ-ফাটানো গলায় চিৎকার করে উঠল, রেহানা, বাদল, জোসেফ “পারব! পারব! পারব!”

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন