শৈলেন ঘোষ

একটা ছিল হুম-চক্কা। বাব্বা, কী চেহারা তার! বিদিগিচ্ছিরি! খাড়া-খাড়া শিং। ড্যাবড্যাবে চোখ। কোদাল-কোদাল দাঁত। আর ল্যাকপ্যাঙা-প্যাঙ ঠ্যাং। রাত যখন ঘুরঘুট্টি হয়, তখনই তার খিদে পায়। খিদি পেলেই সে করে কী, সেই দুপুর-রাতে গা-ছমছম বনে চলে যায়। বনে গিয়ে মনের সুখে নাচে আর গান গায়। সে গানও তেমনই ঘ্যানঘেনে:
গামবুড়ি হুমগুড়ি হুক্কা,
আলুভাতে ওলপোড়া খুব খা।
চিরিমিরি শিলিগুড়ি সটকা,
ভেড়া মেরে হাড়িকাঠে লটকা।
বলব কী, তার এই গান শোনার সঙ্গে সঙ্গে সারা বনে শুরু হয়ে যায় লেফট-রাইট। লেফট-রাইট করতে করতে সেখানে দলে দলে হাজির হয় ছাগল, ভেড়া, বাছুর, গাধা। হাজির হয় মানে, আড়ালে-আবডালে নয়! সটান তার মুখের সামনে। আর অমনই সেই হুম-চক্কাটা গান থামিয়ে খিলখিল করে হেসে ওঠে। হাসতে হাসতে খপখপ করে তাদের ধরে, আর গপগপ করে গিলে ফেলে।
তো, একদিন হয়েছে কী, একটা বিলিতি-বিলিতি গন্ধওলা ঘোড়া তার গান শুনতে পেয়েছে। শুনে, আনমনে সটান তার সামনে হাজির। অত বড় ডাগর-ডাগর একটা ঘোড়া দেখে হুম চাক্কার নোলার জল উপচে গেল। উপচে, টসটস করে মাটিতে ছড়িয়ে পড়ল। ওমা! ছড়াতে ছড়াতে এ কী হল! নোলার জল উপচে যে একটা পেল্লাই পুকুর হয়ে গেল! বাব্বা! কী কাণ্ড! ঘোড়াটা তো সেই পুকুর দেখে থ। কী আশ্চর্য! অমনই সঙ্গে সঙ্গে এমন তার তেষ্টা পেয়ে গেল! সে আর থাকতে পারল না। ‘জল খাই খাই’ করে ঘোড়াটা যেই জলে মুখ বাড়িয়েছে, ব্যাস! হুম-চক্কা গিলবে বলে মেরেছে কোঁত। অমনি ঘোড়াটাও মেরেছে গোত! মেরেই মাছের কাঁটার মতো তার গলায় আটকে গেছে! আটকে গিয়েই ঘোড়া ঠ্যাং ছুড়তে শুরু করে দিল। ঘোড়া যতই ঠ্যাং ছোড়ে, হুম-চাক্কাও ততই ওয়াক-ওয়াক করে গলা ঝাড়ে।
খানিক পরেই ঝটাং! ঘোড়াটা হুম-চক্কার গলা ফসকে মাটিতে চিতপটাং! পড়েই দে লম্বা! আরে বাবা, লম্বা বললেই কী আর লম্বা দেওয়া যায়! হুম-চক্কা চোখের পলক পড়তে দিল না। ঝট করে তার একটা ঠ্যাং ধরে ফেলল। ধরে, সাত সতেরো জিনিস ঠাসা থলের ভেতর থেকে একটা জাহাজ-বাঁধা দড়ি বার করল। ঘোড়াটাকে আষ্টে-পিষ্টে বাঁধল। তারপর গাছের গোড়ায় বলির পাঁঠার মতো বসিয়ে রাখল। ঘোড়া না পারে উঠতে, না পারে ছুটতে। সেই তক্কে হুম-চক্কা ভাগাড়ে ছুটল। ভাগাড় থেকে একটা শুকনি-পাখির ফাঁপা হাড় জোগাড় করে আনল। এনে, ঘোড়ার মুখের সামনে দাঁড়িয়ে যেই ফাঁপা-হাড়ে ফুঁ দিয়েছে, অমনি হাড়ের বোল ফুটল। হাড় বলল:

যাঃ-যাঃ ঘোড়া তুই গেঁড়া হয়ে যা,
যাঃ-যাঃ গেঁড়া তুই ভেড়া হয়ে যা।
দেখতে দেখতে হল কী, অতবড় ধিঙ্গি একটা ঘোড়া, প্রথমে একেবারে গেঁড়ার মতো এইটুকু হয়ে গেল। তারপরেই ভেড়ার মতো ব্যা-অ্যা-অ্যা করে ডেকে উঠল। ডাকতেই হুম-চক্কা ভেড়ার পিঠে বসে পড়ল। বসে, সেই ফাঁপা-হাড়ে বাঁশি বাজাতে বাজাতে সারা বন চষে বেড়াতে লাগল। ওঃ, সেই অন্ধকারে গা-ছমছম বনে, সে এক তাজ্জব-মার্কা লাগ বঙা-বঙ কাণ্ড! কে জানে, শেষ পর্যন্ত হুম-চক্কা ভেড়াটাকে গিলে খেল কি না। না কি তার পিঠে বসে লাগ বঙা-বঙ করতে লাগল!
তোমরা কেউ জানো নাকি?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন