শৈলেন ঘোষ

অবাক-অবাক দেখতে একটা লোক।
লোকটা না-জোয়ান। না-বুড়ো।
না-বেঁটে। না-ঢ্যাঙা।
না-মোটা। না-রোগা।
শুধু অবাক-অবাক।
তার ছিল একটা বেড়াল। ঢুলু-ঢুলু।
একটা বাঁদর। ভুলু-ভুলু।
একটা গাধা। হাঁদা-হাঁদা।
ঢুলু-ঢুলু বেড়ালটা দিনের বেলা ঢুলত।
ভুলু-ভুলু বাঁদরটা দিনরাত্তির এটা ওটা ভুলত।
হাঁদা-হাঁদা গাধাটা হেঁড়ে-হেঁড়ে গলায় রাতদুপুরে গান গাইত।
লোকটাও তেমনই! রোদ উঠলে হাই উঠত, হা-উ-উ-উ।
মেঘ দেখলে হাসি পেত, হ্যা-হ্যা-হ্যা।
চাঁদ দেখলে গান গাইত, গা-মা-পা-ধা।
লোকটার চাল ছিল না।
চুলো ছিল না।
বউ ছিল না।
ছেলে ছিল না।
তার শুধু বেড়াল ছিল একটা।
বাঁদর ছিল একটা।
গাধা ছিল একটা।
একটা ছেঁড়া-ছেঁড়া ন্যাকড়ার পুঁটলি। বিচ্ছিরি ময়লা। তার মধ্যে যত রাজ্যির সম্পত্তি তার। পুঁটলিটা পিঠে বাঁধত। বেঁধে, গাধার পিঠে সুড়ুত করে উঠে পড়ত। অমনই তিড়িং করে লাফিয়ে বসত বেড়ালটা লোকটার কোলে। সাঁই-ই করে লাফিয়ে উঠত বাঁদরটা লোকটার মাথায়। তারপর গাধাটা হাঁটতে শুরু করত।
গাধাটা হাঁটত। পথে পা পড়ত। আর দুলত।
দুলত লোকটা গাধাটার পিঠে।
দুলত বলে কোলে বসে বসে বেড়ালটা ঢুলত।
বাঁদরটা মাথা নেড়ে নেড়ে উকুন বাছত।
আর লোকটা? থেকে থেকে হাই তুলত।
গাধাটা হাঁটতে হাঁটতে যখন আর থামত না, লোকটা, চেঁচাত, “থাম যা।”
অমনই গাধাটা দাঁড়িয়ে পড়ত।
বেড়ালটা ঘুমোতে ঘুমোতে যখন উঠত না, লোকটা ডাকত, “উঠ যা।”
অমনই বেড়ালটা উঠে পড়ত।
বাঁদরটা মাথার উকুন বাছতে বাছতে যখন নামত না, লোকটা হাঁকত, “নাম যা।”
অমনই বাঁদরটা লাফিয়ে পড়ত।
বাঁদরটা লাফালে লোকটা গাধার পিঠ থেকে সুড়ুত করে নেমে পড়ত।
বেড়ালটা লোকটার কোল থেকে ঝপাং করে ঝাঁপিয়ে পড়ত।
গাধাটা হেঁড়ে গলায় ডেকে উঠত।
তারপর?
বেড়ালটা যে-বাড়িটা সামনে দেখত, সে-বাড়িটায় ঢুকে পড়ত।
বাঁদরটা যে-গাছটা নিচু দেখত, সে-গাছটায় উঠে পড়ত।
লোকটা হেঁজি-পেঁজি ছেঁড়া ন্যাকড়ার পুঁটলিটা পিঠ থেকে খুলত। মাটিতে রাখত। একটা ভাঙা ঘটি বার করে, ঘটি ভর্তি জল এনে চোখে দিত, মুখে দিত। গাধাটা ততক্ষণে সামনের মাঠে চড়তে চড়তে কচি কচি ঘাস চিবোত।
গাধাটা ঘাস চিবোচ্ছে মাঠে মাঠে।
বেড়ালটা দুধ চাটছে বাটি বাটি।
বাঁদরটা কলা খাচ্ছে গাছে গাছে।
আর লোকটা তখন গণেশঠাকুরের পুজো করছে।
পুজো সেরে চিঁড়ে-মুড়কির ফলার খাবে। ফলার খেয়ে আকাশের দিকে চেয়ে থাকবে। চাঁদ উঠবে কখন? চাঁদ উঠলে গান গাইবে।
লোকটা আকাশের দিকে দেখত বলে, বাঁদরটাও চাইত।
বাঁদরটা চাইত বলে, বেড়ালটাও লক্ষ করত।
বেড়ালটা লক্ষ করত বলে, গাধাটাও চোখ মেলত।
তারপর চাঁদ উঠত।
লোকটা গান গাইত।
তাই শুনে হেঁড়ে-গলায় সুর ভাঁজত গাধাটা। আর বাঁদরের গলা জড়িয়ে বেড়ালটা, বেড়ালের গলা জড়িয়ে বাঁদরটা নাচ লাগাত: তাক-ধিনা-ধিন, তাক-ধিনা-ধিন।
গাইতে গাইতে, নাচতে নাচতে, চাঁদের আলো ফুরিয়ে ফুরিয়ে যাবে। তারার আলো নিভে নিভে আসবে তখন ঘুমিয়ে পড়বে লোকটা। ঘুম ভাঙলে আবার হাঁটবে।
হাঁটতে হাঁটতে একদিন হয়তো নাম-না-জানা গ্রামে গেল। অচেনা এক গঞ্জে গেল। অজানা এক নগরে গেল। কোথায় যাবে তার তো ঠিক নেই। যেদিকে চোখ যায়।
এমনই করে একদিন একটা শহরে পৌঁছল। শহরের লোক তো আর এমন আজগুবি কাণ্ড দেখেনি কোনওদিন! কীরে বাবা! একটা লোক বসেছে গাধার পিঠে! কোলের ওপর মেনি-বেড়াল! মাথায় বসে পোষা বাঁদর! যে দ্যাখে, সে-ই হাসতে হাসতে গড়িয়ে পড়ে।
দেখতে দেখতে লোক জমল।
প্রথম জমল একটি একটি মানুষ। একটু একটু হাসি, হি-হি-হি।
তারপর দুটি দুটি মানুষ। হ্যা-হ্যা-হ্যা হাসি।
তারপর দশটি দশটি।
একশোটি একশোটি।
হাজারটি হাজারটি।
হাসির হুল্লোড় পড়ে গেল হ্যা-হ্যা, হো-হো, হি-হি, হু-হু। চারদিকে হাসি আর হাসি। হই-হই ব্যাপার। এ-মোড়, ও-মোড় যে-দিকে চাও, লোকে লোকারণ্য! তারা হাসছে, হাসছে, হাসছে।
লোক তো লোক বয়েই গেছে। হাঁদা-হাঁদা গাধাটা হাঁটছে তো, থামছে না।
বোকা বোকা লোকটা দুলছে তো, দেখছে না।
ঢুলু-ঢুলু বেড়ালটা ঢুলছে তো, জাগছে না।
বাঁদরটা আনমনে লোকটার কাঁধে বসে উকুন বাচছে আর গালে পুরছে। মাঝে মাঝে ল্যাজ ঝুলিয়ে বেড়ালের নাকে সুড়সুড়ি দিচ্ছে।
লোকে লোকে পথ আটকে গেল।
পথ আটকে গেল বলে, গাড়ি রুখতে হল।
গাড়ি নেই, তাই বাজার বসল না।
বাজার ফাঁকা, তাই রান্না চড়ল না।
রান্না নেই, তাই খাওয়া জুটল না।
খাওয়া বন্ধ।
খাস-কাছারি বন্ধ।
দোকান-পাট বন্ধ।
টাকা লেন-দেন বন্ধ।
পাঠশালা বন্ধ।
পড়াশোনা বন্ধ।
গাড়ি যখন চলল না,
বাজার যখন বসল না,
দোকান-পাট খুলল না,
রান্না যখন চড়ল না,
পড়ার ঘণ্টা পড়ল না,
তখন?
এক কাণ্ড হল। হল কী, কোথায় ছিল একটা ছোট্ট ছেলে। ছুটতে ছুটতে ঠেলেমেলে গাধাটার কাছে হাজির। গাধার ল্যাজটা ধরে চেঁচিয়ে উঠল, “হুড়-ড়-ড়।” আচমকা মারল ল্যাজে হ্যাঁচকা টান। ব্যাস! গাধা ছুটতে আরম্ভ করলে। বাসরে বাস! সে কী ছুট! ছুটছে আর চেঁচাচ্ছে। ঠ্যাং তুলে তুলে লাফ মারছে। লোকে ভয় পেয়ে গেল।
গাধা ছুটছে,
লোক পালাচ্ছে।
গাধা হাঁকছে,
লোক কাঁপছে।
গাধা ডাইনে ছুটল। ডানদিকের লোক হুড়মুড়িয়ে ছুটে পালাল।
গাধা বাঁয়ে লাফায়। বাঁদিকের লোক দুড়দাঁড়িয়ে দে ছুট! দে ছুট!
সামনে খাঁ-খাঁ
পেছন ফাঁকা।
একটু একটু দরজা ফাঁক, উঁকি ঝুঁকি।
একটু একটু জানলা ফাঁক, চুপি চুপি
মা দেখছে
বাবা দেখছে
পিসি দেখছে
ছেলে দেখছে
মেয়ে দেখছে।
দেখছে, গাধা ছুটছে আর চেঁচাচ্ছে।
ছুটছে তো! কিন্তু লোকটার তো কিছুই হয়নি। সে তো তেমনই বসে আছে গাধার পিঠে। তেমনই মাথায় বাঁদরটা। তেমনই কোলে বেড়ালটা। বেড়ে মজা তো!
ছুটতে ছুটতে গাধাটা যখন শহরের মাঝামাঝি এসেছে তখন সামনে একটা মস্তবাড়ি। মস্তবাড়ি, রাজবাড়ি। মস্তবাড়ির মস্ত দরজা, সিংদরজা। গাধাটা দেখলেই না। দরজার মধ্যে ঢুকে পড়ল।
সামনে দ্বারী। রুখতে এল। গাধা মারলে ঢুঁ। দ্বারী ছিটকে গেল।
পেছনে দ্বারী। বাঁধতে এল। গাধা মারলে ঠ্যাং। দ্বারী চিতপটাং।
ছুটল গাধা। পাঁই পাঁই।
ডাকল গাধা, “ঘ্যাঙকু-উ-উ, ঘ্যাঙকু-উ-উ।”
কান ঝালাপালা।
কান ঝালাপালা তাই মস্তবাড়ির হাজার ঘোড়া চিঁ-হিঁ-হিঁ করে ডেকে উঠল।
মস্তবাড়ির মস্ত মস্ত থামগুলো কেঁপে উঠল। দরদালান গমগম করে উঠল।
বাসন-কোসন ঝন-ঝন-ঝন পড়ল।
ঝি-দাসীরা ধড়-ফড়-ফড় ছুটল।
ঘরের দরজা দুম-দুম-দুম ভাঙল।
তখন মস্তবাড়ির মস্ত রাজা চমকে উঠলেন। বললেন, “কী ব্যাপার! এত চেঁচামেচি কীসের!”
মস্তবাড়ির মস্ত রাজা ওপর থেকে নীচের দিকে তাকালেন। রাজা তো থ! রাজবাড়ির ভেতর এ কী কাণ্ড! রাজবাড়িতে গাধা ছুটছে!
গাধার পিঠে লোক দুলছে!
লোকের কোলে মেনি ঢুলছে!
মাথায় বসে বাঁদর ঝুলছে!
সিপাই ছুটছে পিছু পিছু, ধরতে। পারছে না।
ঘোড়া ডাকছে, চিঁহিঁ চিঁহিঁ, নাচছে। থামছে না।
গাধা হাঁকছে, ঘ্যাঙকু, ঘ্যাঙকু, ছুটছে। রুখছে না।
বাড়ি বলে বাড়ি, রাজবাড়ি। সেখানে এ কী কাণ্ড! এ কী ধাপার মাঠ, না চিড়িয়াখানা! রাজা বুঝি রাগলেন! এই বুঝি হাঁকলেন!
না, রাজা চটলেন না। হাঁকলেন না। ঘাবড়ে গিয়ে লুকিয়ে ঘরে ছুটলেন না। রাজা একটি ফুল ছিঁড়ে নিলেন ফুলদানি থেকে চট করে। ছুড়ে দিলেন ওপর থেকে গাধার দিকে। একেবারে নাকের ডগায়।
ওমা! এ কী! হঠাৎ গাধা থামল যে!
ফুল-ফুল-ফুল, ভুরু ভুরু গন্ধ। গাধার নাকে সেঁদুল। আহা!
ফুল-ফুল-ফুল, গোলাপ-গোলাপ রাঙা। গাধার চোখে রং ছড়াল। ওহো!
ফুলের গন্ধে, ফুলের রঙে অমন যে গাধা এক্কেবারে কাদা। সে ছুটছেও না, হাঁটছেও না। নাচছেও না, ডাকছেও না। থ হয়ে গেল গাধা। এমন সময় আচমকা চেঁচিয়ে উঠলেন রাজা, “ধর।” বাবা! যেন বাজ পড়ল!
সিপাইরা চমকে উঠে থমকে গেল। একসঙ্গে ঝাঁপিয়ে পড়ল গাধাটার ওপর।
গাধাটা নড়তেও পারে না, চড়তেও পারে না।
যখন—
গাধাটা নড়তে পারল না, রাজা তখন হুকুম দিলেন, “বাঁদরটার ল্যাজ ধর।”
একটা না দুটো সেপাই বাঁদরটার ল্যাজ ধরে টান দিল। বাঁদরটা পালাতে পারল না।
যখন গাধাটা নড়তে পারল না,
বাঁদরটা পালাতে পারল না,
রাজা তখন হুকুম দিলেন, “বেড়ালটার ঠ্যাং ধর।”
সঙ্গে সঙ্গে তিনটে না চারটে সেপাই বেড়ালটার ঠ্যাং ধরলে। বেড়ালটা “ম্যাঁও” করতে পারল না।
যখন—
গাধাটা নড়তে পারল না,
বাঁদরটা পালাতে পারল না,
বেড়ালটা ম্যাও করল না,
রাজা তখন হাঁক পাড়লেন, “লোকটার কান পাকড়াও।”
পাঁচটা না ছ’টা সেপাই লোকটার কান ধরল। হিড়হিড় করে টান দিল। লোকটা কিচ্ছু বলল না।
যখন—
গাধাটা নড়তে পারল না,
বাঁদরটা পালাতে পারল না,
বেড়ালটা ম্যাঁও করল না,
লোকটা রা কাড়ল না,
তখন রাজা বললেন, “গাধার কান ছিঁড়ে দাও। বাঁদরের ল্যাজ কেটে দাও। বেড়ালের ঠ্যাং ভেঙে দাও। লোকটার মাথা মুড়িয়ে ঘোল ঢালো। গাধার পিঠে চাপিয়ে শহর থেকে বার করে দাও।”
তারপর গাধার কান ছেঁড়া গেল।
বাঁদরের ল্যাজ কাটা পড়ল।
বেড়ালের ঠ্যাং ভাঙা গেল।
লোকটার মাথা ন্যাড়া হল।
রাজবাড়ির সেনারা লোকটাকে গাধার পিঠে চাপাল। ন্যাড়া মাথায় ঘোল ঢালল। কান ধরে টানতে টানতে শহর থেকে বার করে দিল। শহরের হাজার হাজার লোক তাই দেখে হেসে গড়িয়ে কুটোকুটি। ইস! কী লজ্জা!
গাধার কান ছিঁড়ল বলে, গাধা একবারও উঃ, উঃ, করল না।
বাঁদরের ল্যাজ কাটল বলে, বাঁদর একটুও আঃ, আঃ, ডাকল না।
বেড়ালের ঠ্যাং ভাঙল বলে, বেড়াল মাঃ, মাঃ, কাঁদল না।
বাঁদর বলল, “বেড়াল রে বেড়াল, কী অপমান!”
বেড়াল বলল, “গাধা রে গাধা, মান ইজ্জত গেল।”

গাধা বলল, “বেড়াল রে বেড়াল, অপমানের শোধ নিতে হবে।”
“কেমন করে?” জিজ্ঞেস করল বেড়ালটা।
“কেমন করে?” অবাক হল বাঁদরটা।
“কেমন করে? ভাবতে হবে।” উত্তর দিলে গাধাটা।
ন্যাড়া মাথা লোকটা কিন্তু চুপচাপ। মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে তাকিয়ে রইল আকাশের দিকে। কখন চাঁদ উঠবে? গান গাইবে।
আর?
বাঁদরটা,
গাধাটা,
বেড়ালটা,
ভাবতে লাগল।
ভাবতে ভাবতে যেদিন চাঁদ উঠল না, তারা ফুটল না, আকাশে মেঘ-মেঘ করল, মেঘ দেখে ন্যাড়া মাথা লোকটা খিলখিল করে হেসে উঠল, সেদিন বাঁদরের কাটা-কাটা ল্যাজের ব্যথা মরল।
যেদিন আকাশে মেঘ করল, কালো মেঘ গুড়গুড় করে ডাকল, খুব বিষ্টি পড়ল, সেদিন বেড়ালের ভাঙা-ভাঙা ঠ্যাং জোড়া লাগল।
যেদিন খুব বিষ্টি পড়ল, জল থইথই মাঠ ভেসে গেল, মাঠে মাঠে সবুজ ধানে ভরে গেল, সেদিন ন্যাড়া-ন্যাড়া লোকটার মাথায় চুল গজাল।
যেদিন সবুজ ধান রোদের ছোঁয়ায় সোনা হল, সোনার ধান মাঠে মাঠে কাটা হল, কাটা ধান ঘরে উঠল, সেদিন গাধার ছেঁড়া-ছেঁড়া কানের ঘা শুকোল।
তখন আবার লোকটা গাধার পিঠে বসল,
বেড়ালটা লোকের কোলে ঢুলল,
বাঁদরটা ঘাড়ের উপর ঝুলল,
গাধাটা হাঁটতে শুরু করল।
হাঁটছে গাধাটা।
ভাবছে বাঁদরটা।
ভাবছে বেড়ালটা।
ভাবছে গাধাটা।
ভাবছে শোধ নেওয়া যায় কেমন করে? অপমানের?
ওমা! হঠাৎ এ কোথায় এল তারা হাঁটতে হাঁটতে? এ তো বনও নয়, বাদাড়ও নয়! শহরও নয়, নগরও নয়! গ্রামও নয়, গঞ্জও নয়! পাহাড়ও নয়, মরুও নয়!
আলো নেই
আঁধি নেই
হাওয়া নেই
পাখি নেই
গান নেই
হাসি নেই
বলা নেই
কওয়া নেই।
গাছেরা বাড়ে না।
পাতারা ঝরে না।
টিকটিকি হাঁচে না।
মানুষে কাশে না।
না ঝমঝম।
না গমগম।
“ঝুন-ঝুন-ঝুন,” হঠাৎ যেন কী বেজে উঠল! পায়ে ঠেকল গাধাটার! ছিটকে গেল! কী ওটা?
লোকটা বলল, “কী ওটা?”
গাধাটা হাঁকল, “কী ওটা?”
বাঁদরটা ডাকল, “কী ওটা?”
বেড়ালটা ম্যাও করল, “কী ওটা?”
ঝকঝকে!
তকতকে!
ঝুনঝুন!
টুনটুন!
বাঁদরটা লাফ দিল।
বেড়ালটা তাক দিল।
লোকটা হাত দিল।
দ্যাখো! দ্যাখো! একটা সোনার ঘণ্টা! রাস্তায় পড়ে! তুলে নিল লোকটা। বাজাল, টুনটুন।
বাঁদরটা চেয়ে রইল। যেন বলল, আমার গলায় পরিয়ে দাও।
বেড়ালটা তাকিয়ে রইল। যেন চাইল, আমার গলায় বাজিয়ে দাও।
গাধাটা ঠ্যাং ছুড়ল। মন বলল, আমার গলায় সাজিয়ে দাও।
বেশ, বেশ। সব্বাই পরবে। বাঁদর আজ পরবে। কাল পরবে বেড়াল। পরশু সাজবে গাধা। একসঙ্গে কি সবাই পরতে পারে? ঘণ্টা তো একটা!
সেই বেশ।
তাই আজ কে পরবে? কে পরবে?
বাঁদর পরবে।
লোকটা বাঁদরের গলায় সোনার ঘণ্টা পরিয়ে দিল। ঘণ্টা বাজিয়ে দিল, টুং টাং।
ওমা! সঙ্গে সঙ্গে অন্ধকার! চারদিক অন্ধকার হয়ে গেল! ঘুরঘুট্টি অন্ধকার! যতক্ষণ ঘণ্টা বাজে ততক্ষণ অন্ধকার!
তারপর?
বাজতে বাজতে ঘণ্টার বাজনা যখন থেমে এল, আস্তে আস্তে আলো তখন নেমে এল।
একটু আলো,
আর একটু,
আরও একটু!
থেমে গেছে ঘণ্টার বাজনা। ব্যাস! আঁধারও কেটে গেছে। আলোয় আলোয় ভরে গেছে আবার। লোকটার চোখে আবার আলো ছড়িয়ে পড়ল।
ওমা! এ কী! লোকটা চমকে উঠে অবাক!
ওমা! ও কী! গাধাটা চেঁচিয়ে উঠে হাঁদা!
ওমা! উ কী! বেড়ালটা লাফিয়ে উঠে বে-বাক!
সব্বনাশ! বাঁদর ছিল একটা। হয়ে গেছে দুটো!
কেমন করে?
ঘণ্টা পরে?
সঙ্গে সঙ্গে বাঁদরটা নিজের গলার ঘণ্টা খুলে ছুট্টে এল। বেড়ালটার গলায় পরিয়ে দিল। টুং টাং!
দ্যাখো! দ্যাখো! দ্যাখো! একটা বেড়াল দুটো হয়ে গেছে!
সঙ্গে সঙ্গে বেড়ালটা ছুট্টে এল। নিজের গলার ঘণ্টা খুলল, গাধার গলায় পরিয়ে দিল। টুং টাং!
হ্যাঁ ঠিক তাই! একটা গাধা দুটো হয়ে গেছে!
কী কাণ্ড!
কাঁপতে লাগল লোকটা দেখে-শুনে। থুপ করে বসে পড়ল মাটিতে কাঁপতে কাপতে। তাড়াতাড়ি হেঁজিপেঁজি পুঁটলিটা খুলে ফেলল। গণেশঠাকুর বার করল। ঠাকুরের সামনে বসে, আকাশের দিকে চোখ তুলে, হরিনামের মালা জপতে শুরু করে দিল।
বাঁদরটার মাথায় সঙ্গে সঙ্গে একটা বুদ্ধি এসে গেল। ছুট্টে গেল গাধার কাছে ঘণ্টা নিয়ে। পরিয়ে দিল গাধার গলায় ঘন্টা। একবার, দু’বার, তিনবার, বারবার!
একটা-একটা গাধা দুটো-দুটো হয়ে গেল।
দুটো-দুটো গাধা চারটে-চারটে,
আটটা-আটটা,
দশটা-দশটা,
একশো-দুশো,
পাঁচশো-ছ’শো,
পাঁচ হাজার-ছ’ হাজার,
হাজার-হাজার,
অগুনতি গাধা।
মাঠে গাধা। ঘাটে গাধা। উঠোনে গাধা। ছাতে গাধা। উপচে গেল। যেদিকে চাও গাধা।
অগুনতি গাধা ছুট দিল।
বাঁদরটা এবার বেড়ালের গলায় ঘন্টা পরায়।
একটা বেড়াল দুটো হয় আর গাধার পিছু ছুটতে থাকে।
ছুটছে। ছুটছে। অগুনতি গাধার পেছনে অগুনতি বেড়াল।
তারপর বাঁদরটা নিজের গলায় ঘন্টা পরে।
একটা বাঁদর দুটো হয়, আর বেড়ালের পিছু লাফ মারে।
অগুনতি গাধার পেছনে অগুনতি বেড়াল। ছুটছে।
অগুনতি বেড়ালের সঙ্গে অগুনতি বাঁদর। লাফাচ্ছে।
কোথা চলেছে ছুটতে ছুটতে? লাফাতে লাফাতে?
শহরে চলেছে।
কোন শহরে!
সেই শহরে। মস্ত রাজার মস্তবাড়িতে।
লোকটা কিন্তু কোনওদিকেই চাইছে না। হরিনামের মালাই জপছে।
যেদিকে চাও, খালি গাধা-গাধা-গাধা, বেড়াল-বেড়াল-বেড়াল, বাঁদর-বাঁদর-বাঁদর।
ছুটছে!
গাধা-গাধা-গাধা,
বেড়াল-বেড়াল-বেড়াল,
বাঁদর-বাঁদর-বাঁদর,
পাহাড়ে উঠল। পাহাড় ধসে গেল।
নদীতে লাফাল। নদী বুজে গেল।
খেত-খামারে ছুটল। ফসল ফুরিয়ে গেল।
শেষকালে সেই শহর এল।
অমনই গাধা চেঁচিয়ে ডাকে, “ঘ্যাঙকু, ঘ্যাঙকু।” লক্ষ লক্ষ গাধার হেঁড়ে হেঁড়ে ডাক। কেঁপে কেঁপে ওঠে বাড়িগুলো, ঘর-দোর। ভেঙে ভেঙে পড়ল। বড় বড় দোকান-পাট ধুলো-ধুলো হয়ে গেল। বড় বড় রাস্তা-ঘাট খানা-ডোবায় ভরে গেল।
গাধা-গাধা-গাধা,
বেড়াল-বেড়াল-বেড়াল,
বাঁদর-বাঁদর-বাঁদর,
ছুটতে ছুটতে রাজবাড়ির সামনে।
রাজা তো ভয়ে জুজুবুড়ি! রাজবাড়ির সিংদরজা ঘড়-ঘড়-ঘড় বন্ধ হল।
হলে কী হবে?
অমনই লাখ লাখ বাঁদর লাফ দিল। রাজবাড়ির এখানে-ওখানে, বাগানে-উঠোনে চেঁচামেচি, নাচানাচি লাগিয়ে দিল।
বাঁদরের ল্যাজ ধরে বেড়ালগুলোও উঠে পড়ল তরতর করে। এ-ঘরে, ও-ঘরে, সে-ঘরে সেঁদিয়ে পড়ল।
লাখ লাখ গাধা সিংদরজায় ঘা মারল। সিংদরজা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল।
রাজবাড়ির যত ঘোড়া চিঁহি, চিঁহি ডেকে উঠল। যত হাতি থুপথাপ, থুপথাপ দৌড় মারল। যত উট চোঁ-চা, চোঁ-চা ছুট মারল।
পালা, পালা, পালা।
রাজবাড়ির সিপাই-সেনা ছুটে এল। এক লাখ বাঁদর একসঙ্গে চটাপট, চটাপট চড় মারল তাদের গালে। এক লাখ গাধা খটাখট, খটাখট মাড়িয়ে দিল তাদের।
এক লাখ বেড়াল তাদের গোঁফে কামড় দিল। দাড়ি খামচে উপড়ে ফেলল।
রাজা তখন অন্ধকার ঘরে বসে চুপটি করে কাঁপছেন! ভয়ে!
গাধা-গাধা-গাধা,
বেড়াল-বেড়াল-বেড়াল,
বাঁদর-বাঁদর-বাঁদর,
রাজবাড়ি তছনছ করে রাজাকে খুঁজতে লাগল।
খুঁজতে খুঁজতে অন্ধকার ঘর। অন্ধকারে বেড়ালের চোখ জ্বলজ্বল। জ্বলজ্বলে চোখ দেখেই রাজা চমকে গেলেন। চেঁচিয়ে উঠলেন, “বাপ রে! মা রে!”
পড়ি-মরি ছুট দিলেন রাজা ঘর থেকে বাইরে। ব্যাস! অমনই কোথায় ছিল বাঁদর, দৌড়ে এসে ঘাড়ে চাপল। রাজার নাক কামড়ে দিল। কান কেটে ফেলল। মাথার মুকুট কেড়ে নিল। নাক-কান-কাটা রাজা বাঁদরকে ঘাড়ে নিয়েই মারলেন লাফ। ওপর থেকে নীচে। মারলেন দৌড়। ঘর থেকে বাইরে।
অমনই পেছন-পেছন ছুটল
গাধা-গাধা-গাধা,
বাঁদর-বাঁদর-বাঁদর,
বেড়াল-বেড়াল-বেড়াল।
রাজাও ছুটছেন।
রাজার সামনে ঘোড়া,
পেছন-পেছন হাতি,
তার পেছনে উট,
উটের পিছু সেপাই।
তাই দেখে শহরের মানুষও ছুটছে, ভয়ে। ছুটতে ছুটতে যাচ্ছে কোথায়? কেউ জানে না।
ছুটতে ছুটতে শহর ফাঁকা।
শহরে মানুষ নেই,
রাজা নেই,
রানি নেই,
সেনা নেই,
সেপাই নেই,
হাতি নেই,
ঘোড়া নেই,
উট নেই,
ভেড়া নেই,
হুকুম নেই,
তামিল নেই।
কোথায় যে তাড়া খেয়ে তারা পালাল কেউ জানতেও পারল না।
সে দেশে রাজা যখন রইল না,
চেঁচামেচি রইল না। সব যখন ঠান্ডা হয়ে গেল, সব মানুষ যখন শহর ছেড়ে পালিয়ে গেল, তখন সে দেশে রইল শুধু:
গাধা-গাধা-গাধা,
বেড়াল-বেড়াল-বেড়াল,
বাঁদর-বাঁদর-বাঁদর।
আর রইল সেই লোকটা।
গাধা-গাধা-গাধা, তাকে রাজা করল।
বাঁদর-বাঁদর-বাঁদর, তার মাথায় মুকুট পরিয়ে দিল।
বেড়াল-বেড়াল-বেড়াল, তাকে সিংহাসনে বসাল।
লোকটা রাজপোশাক পরে, মাথায় মুকুট দিয়ে সিংহাসনে বসল।
অমনই আসল বেড়ালটা তার কোলের ওপর লাফিয়ে বসল।
আসল বাঁদরটা তার ঘাড়ে লাফিয়ে উঠল। ল্যাজ ঝুলিয়ে বেড়ালের নাকে সুড়সুড়ি দিল।
আসল গাধাটা গান ধরল, “গা-মা-পা-ধা।”
সঙ্গে সঙ্গে লক্ষ লক্ষ গাধা গেয়ে উঠল।
লক্ষ লক্ষ বাঁদর নেচে উঠল।
লক্ষ লক্ষ বেড়াল হেসে উঠল।
আর সেই ঘণ্টাটা, সোনা-সোনা ঘণ্টা, টুংটুং করে দুলে দুলে বাজতে লাগল।
সেইদিন থেকে, সেই লোকটা, সেই দেশের রাজা। সে-দেশে কিন্তু একটিও মানুষ নেই।
সে-দেশে আছে
গাধা-গাধা-গাধা,
বেড়াল-বেড়াল-বেড়াল,
বাঁদর-বাঁদর-বাঁদর।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন