তিত্তি

শৈলেন ঘোষ

আমিই ছেলেটার নাম রেখেছিলুম উট্টি। একই গ্রামের একই পাড়ায় থাকি আমরা। আমাদের গ্রামটা বেশ বড়। এখান থেকে ওই দূরে পাহাড় দেখা যায়। মাঠের গা ঘেঁষে জঙ্গল।

উট্টিরা আমার আত্মীয় না হলেও, ওর বাবা আর মা’র সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ছিল খুব ভাল। উট্টির মা’র চেয়ে আমি বয়সে বড়ই ছিলুম। এমনকী, ওর বাবাও আমার চেয়ে বয়সে ছোট ছিল। তাই ওর মা আর বাবা দু’জনেই আমাকে ‘দিদি’ বলে ডাকত। আর উট্টি করত কী, ওর মা’র মতো দিদি বলতে গিয়ে আমাকে ‘তিত্তি, তিত্তি’ বলে আদর করত। ছোট্ট তো। তখন ও একটু একটু দাঁড়াতে পারে। চাই কী, টলতে টলতে দু’-এক পা হাঁটতেও পারে। হাঁটতে হাঁটতে একটু বেটাল হলেই ধুপ করে বসে পড়ে। বলা যায়, উট্টি প্রায় জন্ম থেকেই আমার কোলেপিঠে বড় হয়েছে। ছেলেকে আমার জিম্মায় রেখে ওর মা-ও যেমন ভরসা পেত, তেমনই আমারও তিনকুলে কেউ ছিল না বলে ছেলেটাকে নিয়ে বেশ সময় কেটে যেত। তা ছাড়া উট্টিকে আমার কাছে না রেখে ওর মা’রও উপায় ছিল না। সেই ভোর থেকে কী হাড়ভাঙা খাটুনি খাটতে হত বেচারিকে। উট্টির মা’কেও যেমন খাটতে হত, তেমনই তার বাবাকেও। আসলে আমাদের কাজ ছিল পাড়া-ঘরে ময়লা-জঞ্জাল সাফ করার। এককথায় ঝাড়ুদার বলতে তোমরা যা বোঝো, তাই আর কী। সেই কারণে আমাদের পাড়াটা ছিল গ্রামের একেবারে শেষ প্রান্তে। আমাদের ঘরদোর আলাদা, জলকল আলাদা। এমনকী, চলার পথ পর্যন্ত আলাদা। অন্য পাড়ায় ইচ্ছেমতো আমরা যেতে পারতুম না। কী বলব, দেব-দেউলে ঢুকতেও আমাদের মানা।

যাক, তবু ভাল, এই নিয়েই সুখে-দুঃখে আমাদের দিন কাটছিল। একবার হল কী, দেবতার ভীষণ কোপ পড়ল আমাদের ওপর। সেবার বর্ষায় একফোঁটা বৃষ্টি হল না। ফসল ফলল না। মাঠ-ঘাট ফেটেফুটে চৌচির। যাকে বলে ভয়ংকর খরা। খাবার নেই, ইঁদারায় জল নেই, শুকনো খটখটে চারদিক। খেতে না পেয়ে গোরু-ভেড়া মরছে। মানুষও প্রায় মরতে বসেছে। দুর্ভিক্ষের দশা আর কী। শেষে খিদে-তেষ্টার জ্বালা সহ্য করতে না পেরে আমরা একদিন দল বেঁধে অন্য পাড়ার বাবুদের কাছে ধরনা দিতে চললুম। বাবুদের তো আর তেমন ভাবনা নেই। পয়সা আছে। তাই চাল-ডালও ভাঁড়ারে মজুত আছে। সুতরাং আমরা ভেবেছিলুম, যে-বাবুদের আমরা এতকাল ধরে সেবা-যত্ন করে আসছি, তারা নিশ্চয়ই আমাদের এই বিপদে একটু দয়া দেখাবে। হায় কপাল, দয়া! উলটে বাবুরা তাদের পাড়ায় আমাদের ঢুকতেই দিল না। কিন্তু খিদে-তেষ্টা কী আর বাধা মানে। আমরা ঝগড়া শুরু করে দিলুম। হচ্ছিল মুখে মুখে। কিন্তু বাবুরা তেড়ে এল লাঠিসোঁটা নিয়ে। মার খেলে কে আর চুপটি করে দাঁড়িয়ে থাকে। লেগে গেল দাঙ্গা। আমরা চালডাল লুঠ করলুম। ইঁদারার জলে প্রাণ ভরে তেষ্টা মিটিয়ে নিলুম। তারপর হইহই করে যে-যার ঘরে ফিরে এলুম। আর সেই হল কাল। বাবুরা আমাদের ওপর প্রতিশোধ নেবার মতলব আঁটল।

তখন রাতের অন্ধকার। বুঝতেই পারছ, গাঁ-ঘরের অন্ধকার রাত্তির, সুনসান, নির্জন। সবাই প্রায় ঘুমিয়ে পড়েছি। সেই তক্কে সেই অন্য পাড়ার বাবুরা আমাদের পাড়ায় হানা দিল। তাদের হাতে আগুনের মশাল। আমাদের অজান্তে আমাদের ঘরে আগুন জ্বলে উঠল। এ-বাড়ি, ও-বাড়ি, এ-ঘর, ও-ঘর জ্বলতে জ্বলতে নিমেষে দাউদাউ করে জ্বলে উঠল গোটা পাড়াটা। শুরু হয়ে গেল আর্তনাদ। লেগে গেল হুড়োহুড়ি, চিৎকার, চেঁচামেচি। কেউ আগুনে পুড়ে আহত হয়ে মুখ থুবড়ে ছিটকে পড়ে, কেউ পুড়তে পুড়তে দিগ্‌বিদিক জ্ঞান হারিয়ে ছোটাছুটি লাগিয়ে দেয়। আমি মরতে মরতে কোনওরকমে আমার ঘর থেকে বেরিয়ে এলুম। আমার সারা গায়ে আগুনের ফুলকি ছড়িয়ে ছিটিয়ে জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে। সে-জ্বালা অগ্রাহ্য করে বাঁচার জন্যে আমি ছুটছি, আর পালাবার পথ খুঁজছি। হঠাৎ আমার নজরে পড়ল এ শুধু অন্যপাড়ার বাবুরাই নয়, তাদের সঙ্গে একদল দুর্জন। কী ভয়ংকর হিংস্র তাদের চেহারা। হাসছে তারা বিকট সুরে, আর অস্ত্রের ঝনঝনানি বেজে উঠছে তাদের হাতে। যেন এক-একটা রক্তপিশাচ দানব। আমি ছুটতে ছুটতে থামলুম। রাগে আমার মাথায় রক্ত উঠল। আমি তাদের একজনকে খামচে ধরলুম। মারলুম একটান। সে পড়ল গিয়ে জ্বলন্ত আগুনের ওপর। সে মরণ কান্নায় চিৎকার করে উঠল।

আমি আর মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ালুম না। আমি আবার ছোটা দিলুম। কিন্তু থমকে গেছি। আমি চমকে উঠেছি একটি ছোট্ট ছেলের চিৎকার শুনে। এ যে উট্টির গলার স্বর। ফিরে তাকাতেই দেখি, উট্টিদের বাড়িটা দাউদাউ করে জ্বলছে। উট্টির বাবা দরজার গোড়ায় চিৎপাত হয়ে পড়ে আছে। আর খানিকদূরে পড়ে পড়ে উট্টি তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। ওর মা যে কোথায়, তখন সে-দেখার আর সময় নেই। উট্টিকে ঝটপট কোলে তুলে নিলুম। আমার আঁচলের আড়ালে লুকিয়ে নিয়ে ছোটা দিলুম। কিন্ত তাতে কী হবে! ওর কান্না তো আর লুকনো যাচ্ছে না। আমি যতই ওর মুখটা চেপে ধরার চেষ্টা করছি, ও যেন ততই চিৎকার করে উঠছে। তবু রক্ষে, উট্টির গায়ে আগুন লাগেনি। কিন্তু ওর কান্না আমার বিপদ ডেকে আনল। উট্টির কান্না শুনে সেই পাষাণের দল আমাকে তাড়া লাগাল। তখন আমি বুঝতে পারলুম, এবার আমার নিশ্চিত মরণ। উট্টিকেও বোধহয় আর বাঁচাতে পারলুম না। হতে পারি আমি মেয়ে, কিন্তু দুর্বলের মতো মরার কথা আমি ভাবতে পারি না। অন্য সময় হলে মরার আগে আমি আমার শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে ওদের সঙ্গে যুঝতুম। কিন্তু এখন সে-উপায় নেই। কারণ আমার কোলে উট্টি। আমি মরি ভাল, তবু উট্টিকে আমায় বাঁচাতেই হবে। উট্টি আমার কেউ নয়, কিন্তু ছেলেটার জন্যে যে আমার সব আদর উজাড় করে দিয়েছি। সুতরাং ওকে বাঁচাবার জন্যে আমায় পালাতেই হবে।

রাতের অন্ধকার। আগুনের ঝলকানিতে চারদিক উছলে উঠেছে। সুতরাং আমাকে তারা স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। আমার পেছনে সেই দুর্বৃত্তের দল তাড়া লাগাল। সামনে ফাঁকা খেত। খেতের ওপারেই জঙ্গল। আমার লক্ষ্য ওই জঙ্গল। যদি কোনওরকমে একবার জঙ্গলে ঢুকে পড়তে পারি, তবে, অন্তত কিছুক্ষণের জন্যেও ওদের চোখে ধুলো দিয়ে থাকতে পারব। এই কথাটা মনে হতেই প্রচণ্ড বেগে ছুটতে আরম্ভ করলুম। আমার নিজের শক্তিকে আমি নিজেই যেন বিশ্বাস করতে পারছি না। ছুটতে ছুটতে পেছনে ঘাড় ফেরাচ্ছি, আর দেখছি কত দূরে আছে তারা। দেখতে দেখতে তাদের নাগালের অনেকখানি দূরে চলে এসেছি আমি। তখন আর কিছু না পেয়ে তারা মাঠ থেকে ইট তোলে আর আমাকে লক্ষ্য করে ছুড়ে মারে। কিন্তু তখন আমি তাদের নিশানার অনেক বাইরে চলে এসেছি। আমি তখন নাগাল পেয়ে গেছি জঙ্গলের। ঢুকে পড়লুম। পাগলের মতো হুটোপাটি করতে লাগলুম জঙ্গলের অন্ধকারে। খুঁজতে লাগলুম লুকিয়ে থাকার মতো একটু জায়গা। আমি জানি লুকোলেও আমার নিষ্কৃতি নেই। কারণ উট্টির কান্না তখনও থামেনি। থামবার কোনও লক্ষণও নেই। উট্টি যদি এখনও না থামে তবে উট্টির কান্না শুনে ওরা আমাকে ঠিক ধরে ফেলবে। তাই একটা ঘুপচিমতো জায়গায় দাঁড়িয়ে আমি উট্টিকে ভোলাবার চেষ্টা করে চাপাস্বরে আদর করতে লাগলুম।

কান্না থামল না। কিন্তু আশ্চর্য, ওদেরও তো আর সাড়া পাচ্ছি না। তবে কি ওরা হাল ছেড়ে দিল। কী জানি, হলেও হতে পারে। কিন্তু তাই বলে হুট করে এখান থেকে বেরিয়ে পড়াটাও উচিত কাজ হবে না। কে বলতে পারে, ওরা আমাকে ধরবার জন্যে ওত পেতে বসে নেই। শয়তানের ছলের অভাব হয় না। কাজেই আমাকে সেই জমাট অন্ধকারে আড়ষ্ট হয়ে গা-ঢাকা দিয়ে অপেক্ষা করতে হল।

হঠাৎ দেখি, কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ল উট্টি। আহা, দুধের শিশু! আর কত কাঁদবে। বোধহয় কাহিল হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। আমি স্বস্তির নিশ্বাস ফেললুম। যাক বাঁচা গেল। উট্টির কান্নার শব্দটা থামতেই, জঙ্গলটা তখন মনে হল, ভয়ংকর আর নির্জন। কোথাও যদি টুক করে শব্দ হয় তো, আমার বুকটা ধক করে চমকে ওঠে। আমি উট্টিকে বুকের মধ্যে আগলে নিয়ে সেই নির্জন জঙ্গলে চুপচাপ লুকিয়ে রইলুম। তারপর, আস্তে আস্তে বসে পড়লুম।

এমনই করে বসে থাকতে থাকতে চোখ ছলছল করতে লাগল ভাবছি, এ কী হল! বাড়ি-ঘর পুড়ে ছারখার হল। জিনিসপত্তর যা ছিল, তাও গেল। এখন আমি কোথা যাব, কী করব, কার কাছে ঠাঁই পাব, আর এই ছেলেটারই বা কী হবে, এইসব নানান দুর্ভাবনা আমায় পেয়ে বসল। জানি না, ওর মা আর বাবা বাঁচল, না মরল। জঙ্গলে একটা বাচ্চা ছেলেকে কোলে নিয়ে এমনই সব সাত-পাঁচ ভাবতে ভাবতে যখন একদম আনমনা হয়ে গেছি, তখন হঠাৎ বুকটা ধড়াস করে উঠেছে। চেয়ে দেখি, জঙ্গলের মধ্যে আলোর রোশনাই। শুনতে পেলুম অনেক পায়ের খসখসানি। আমি উট্টিকে কোলে নিয়ে ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়ালুম। আমি বুঝতে পেরেছি, দুর্বৃত্তের দল আমাকে ধরার জন্যে আলো নিয়ে জঙ্গলে ঢুকেছে। কী করি এখন! এবার তো আর নিস্তার নেই। বাঁচবার আর কোনও উপায় না দেখে আলোর উলটো দিকে ধীর পায়ে ডিঙি মারলুম। নিঃশব্দে আলতো আলতো পা ফেলে পালাচ্ছি, আর মনে মনে ভগবানকে ডাকছি, ‘হে ভগবান, উট্টি যেন কেঁদে না ওঠে। ওকে আরও একটু ঘুম পাড়িয়ে রাখো।’ ভয়ে আর উত্তেজনায় আমার নিশ্বাস ভীষণ অস্থির হয়ে উঠছে। নিশ্বাসের শব্দটুকু যাতে ওদের কানে না যায় তার জন্যে প্রাণপণ লড়াই করতে লাগলুম নিজের সঙ্গে। আমি বুঝতে পারলুম, আমি যতই এক পা করে এগিয়ে যাচ্ছি, মানুষের পায়ের শব্দ ততই যেন আমার দিকেই এগিয়ে আসছে। জঙ্গলের সেই আলো আর অন্ধকারে তাদের সঙ্গে যেন আমার লুকোচুরি খেলা শুরু হয়ে গেল। তখন যে কী ভীষণ উৎকণ্ঠা, বোঝাবার ক্ষমতা নেই আমার। বলতে হয়, বরাত আমার খুবই ভাল, এত টানা-হ্যাঁচড়া সত্ত্বেও উট্টির ঘুম ভাঙল না। আর আমিও ধীরে ধীরে ওদের থেকে অনেক দূরে পালিয়ে এসেছি। আমি এখন নিশ্চিত যে, ওরা আর আমায় ধরতে পারছে না। আমি ওদের চোখে ধুলো দিতে পেরেছি। আমি যখন ভাবছিলুম, এবার ছুটতে হবে, তখনই আমি বুঝতে পারলুম জঙ্গলের শেষ সীমায় আমি পা বাড়িয়েছি। উফ! নিশ্চিন্তে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম। এবার যেন শরীর আমার টলতে শুরু করেছে! গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। মাথা ঝিমঝিম করছে। তবু জানি থামলে চলবে না। দুশমনের থাবা যে কখন কোন ফাঁকে গলাটা খামচে ধরবে, কেউ জানে না।

অনেকক্ষণ ধরে হাঁটলুম। রাতও যাই যাই করছে। একটু একটু করে রাতের অন্ধকার কেটে ভোরের আকাশ উঁকি মারছে। এ কী! এ আমি কোথায় চলে এসেছি। এদিকে তো আমি কোনওদিন আসিনি। এ তো দেখছি সামনে রেললাইন। হ্যাঁ, ওই তো রেল ইস্টিশান। ইস্টিশানটাও ঠিক ছবির মতো দেখতে লাগছে। ইস্টিশানের দুরে দূরে উঁচু-নিচু পাহাড়ের সারি। চারদিকে বড় বড় গাছ। ভাবলুম, ভালই হল। ইস্টিশানের গাছের নীচে একটু বসে যাই। উট্টিকে কোলে নিয়ে ছোটাছুটি আর হাঁটাহাঁটি করে আমার শরীর বইছে না। হাত-পা যেন অবশ হয়ে গেছে। এখান থেকে একটুখানি হেঁটে রেললাইনটা পেরোলেই ইস্টিশানে পৌঁছে যাব। কিন্তু কী বলব, এইটুকু যেতেই যেন আমার প্রাণ বেরিয়ে যাচ্ছিল।

যাই হোক, পৌঁছে গেলুম ইস্টিশানে। দেখলুম এই ভোরবেলাতেও লোকজন গিজগিজ করছে। একটা বেঞ্চি খালি দেখে বসে পড়লুম। খুব ভয়ে ভয়ে চোখের দৃষ্টি এপাশ-ওপাশ করতে করতে হঠাৎ উট্টির মুখের ওপর নজর পড়ল। তখনও অকাতরে ঘুমোচ্ছে ছেলেটা। আমি ভাবলুম, থাক, ঘুমিয়েই থাক। জেগে উঠে কান্নাকাটি শুরু করে দিলে তখন আবার বিপদ। সত্যি, কী ভয়াবহ অবস্থার মধ্যে যে পড়ে গেলুম! যতই ভাবছি, ভয়ে-ভাবনায় ততই শিউরে উঠছি। হঠাৎ আমার নিজেরই হাতের দিকে চেয়ে আমি থতমত খেয়ে গেছি। আমার দু’হাতে দুটো সোনার চুড়ি। এই রে, কেউ দেখে ফেলেনি তো! চটপট খুলে ফেললুম। কাপড়ের খুঁটে বেঁধে লুকিয়ে রাখলুম। এই ফাঁকে চুপিচুপি বলে রাখি, আমি কোমরেও একটা বিছেহার পরে আছি। সেটাও সোনার। সেটার খবর অবিশ্যি কেউ জানতেই পারছে না।

দুই

ইস্টিশানটা একদম খোলামেলা। আঃ! ফুরফুর করে হাওয়া বইছে। সেই হাওয়ায় উট্টিকে কোলে নিয়ে বেঞ্চিতে বসে বসে এমন চোখ জড়িয়ে আসছিল। থাকতে পারিনি। আমার অজান্তেই আমি কখন বেঞ্চিতে মাথা ঠেকিয়ে ঢুলে পড়েছি। তারপর আর কিছুই খেয়াল ছিল না।

এইভাবে কতক্ষণ ঘুমিয়ে ছিলুম, জানি না। হঠাৎ কানের কাছে প্রচণ্ড একটা শব্দ বেজে উঠতেই ঘুম ভেঙে গেল। ধড়ফড় করে উঠে পড়েছি। শুনি ঘণ্টা বাজছে। এক্ষুনি গাড়ি আসবে। ঘণ্টা শুনে চারদিকে হুটোপাটি শুরু হয়ে গেল। যে যার তল্পিতল্পা বাগিয়ে এদিক ওদিক দাঁড়িয়ে পড়ল। তাদের দেখাদেখি আমিও এগিয়ে গেলুম।

দেখতে দেখতে বিকট আওয়াজ করে রেলগাড়ি ইস্টিশানে ঢুকে পড়ল। তখন সে কী হুলুস্থুলু কাণ্ড! কে আগে উঠবে, সেই নিয়ে লেগে গেল হুড়োহুড়ি। আমার যে কী মতি হল, আমিও গাড়িতে উঠে পড়লুম। আশ্চর্য, উট্টি কিন্তু এখনও অকাতরে ঘুমোচ্ছে!

আমি টিকিট কাটিনি। কাটব কী করে পয়সাই নেই। গাড়িতেও তেমনই ভিড়। উঠতে যে পেরেছি, এই-ই ভাগ্য। এককোণে, একটুখানি দাঁড়াবার জায়গা পেয়ে, চোরের মতো সিটিয়ে রইলুম। গাড়ি ছেড়ে দিল। কী জানি, এখন আমি কোন অজানা পথে চলেছি। রেলগাড়ি ছুটছে আর আমার মনটা যত রাজ্যের দুশ্চিন্তায় ছটফট করছে। সবচেয়ে দুর্ভাবনা উট্টিকে নিয়ে। এখন যে ছেলেটাকে নিয়ে আমি কী করব ভেবে পাচ্ছি না। বরাতে কী আছে কে জানে!

উট্টির মুখের দিকেই তখন আমি আনমনে তাকিয়ে ছিলুম। হঠাৎ যেন কেমন এক অজানা আশঙ্কায় বুকটা আঁতকে উঠেছে। মনে হল, এ তো ঘুম না। ঠেলা দিয়েছি। উট্টি নড়ল না। গালটা ধরে আদর করে নেড়ে দিয়েছি। তবু জাগল না। আমার আর বুঝতে একদণ্ড দেরি হল না, উট্টি এতক্ষণ অচৈতন্য হয়ে আমার কোলে কোলে ঘুরেছে। ভয়ে আমার ধাত ছেড়ে যাবার জোগাড়। এখন আমি কী করব, কাকে বলব, কিছুই ভেবে না পেয়ে অস্থির হয়ে আনচান করতে লাগলুম। গাড়ি ছুটছে। কোথায় গিয়ে কখন থামবে, তাও আমার জানা নেই। নেমে পড়ে উট্টির চোখে-মুখে যে একটু জল দেব, তারও উপায় নেই। এখনই যদি অঘটন কিছু ঘটে যায়, তখন আমি কাকে কী কৈফিয়ত দেব! মনে হল গলা ছেড়ে কান্না জুড়ে দিই। না, সেটা কোনও কাজের কথা নয়। সুতরাং আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এর-তার ঝোলাঝুলির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছি, যদি কারও কাছে জল পাই। কিন্তু কই জল! অথচ গাড়ি থামবারও কোনও লক্ষণ দেখছি না। গাড়ি ছুটছে তো ছুটছেই। ঠিক এইসময়ে হঠাৎ মনটা আমার ভীষণরকম বেপরোয়া হয়ে উঠল। মনে হল, উট্টিকে নিয়ে চলন্ত গাড়ি থেকে দিই একলাফ। কিন্তু পরক্ষণেই মনে হল, এতে লাভ তো কিছুই হবে না। আমিও মরব, উট্টিও বাঁচবে না।

এমন সময় উট্টির বুকের ভেতর থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। আমি থতমত খেয়ে তাড়াতাড়ি উট্টিকে জড়িয়ে ধরেছি। আশ্চর্য, ঠিক প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই গাড়ির গতি যেন কমল। তবে কি গাড়ি থামবে! হ্যাঁ, মনে হচ্ছে পরের ইস্টিশান এসে গেছে।

সত্যিই পরের ইস্টিশান এসে গেছে। আমি সবার আগে একে ওকে ঠেলে ঠুলে হুড়মুড় করে গাড়ি থেকে নেমে পড়লুম। নিজের ব্যাপার নিয়ে সবাই এত ব্যস্ত আমার দিকে কে আর নজর দেয়! ইস্টিশানে নেমেই জলের খোঁজ করতে লাগলুম। বেশি খোঁজাখুঁজির দরকার হল না। সামনেই একটা জলের কল। কল খুলে জল নিয়ে উট্টির মুখে-চোখে ঝাপটা দিলুম। কিন্তু কিছুতেই কিছু হল না। উট্টির জ্ঞান ফেরার এতটুকু লক্ষণ দেখতে পেলুম না। তখন যে কী ভীষণ ভয় পেয়ে গেছি, কী বলব! হাত-পা কাঁপছে। দাঁড়াতে পারছি না। হতভম্ব হয়ে একটা গাছের তলায় বসে পড়লুম। বসে বসে ভাবতে লাগলুম, যদি উট্টি মরে যায়, তখন কী হবে!

হঠাৎ দেখি কী, একটা ছেলে আসছে। এদিকেই। তাকে দেখে তো আমার ভিরমি খাবার গোত্তর। ভালয়-ভালয় আমাকে পাশ কাটিয়ে সে চলে গেলেই বাঁচি। হায় কপাল! সে যে আমায় দেখে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল! কী অদ্ভুত দেখতে ছেলেটাকে। পা অবধি একটা লম্বা প্যান্ট পরে আছে। তেমনি ময়লা একটা জামা। পায়ে ফাটা চটি, লটপট করছে। একমাথা চুল। যেন পাগল। ছেলেটার বয়সও যে খুব বেশি, তাও না। তা উনিশ-কুড়ি হবে। আমার কাছে এগিয়ে এসে একমুখ হাসি ছড়িয়ে সে বলল, “ছেলে ঘুমোচ্ছে বুঝি?”

আমি তার মুখের দিকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইলুম।

সে আবার তেমনি সহজ সুরেই বলে গেল, “ঘুমোক, এই বয়সে যত ঘুমোবে শরীর-স্বাস্থ্য ততই ভাল হবে। আজ নিয়ে তিনদিন আমি ঘুমোইনি। জেগে থাকতে বেশ মজা লাগে আমার।”

আমার চোখের দৃষ্টি অবাক হল।

“আমার ছিরি দেখে কী বুঝছ? নিশ্চয়ই কিছু বুঝতে পারছ না! আমি কুলিগিরি করি। হ্যাঁ, গাড়ি আসে-যায়, আর আমি বাবুদের মালপত্তর বওয়াবয়ি করি। তবে এই গাড়িটায় একজনও প্যাসেঞ্জার মিলল না।” বলে সে উবু হয়ে আমার মুখের সামনে বসে পড়ল। হাসল।

আমি তার মুখের ওপর থেকে চোখ নামিয়ে উট্টির দিকে ভয়ে ভয়ে তাকালুম। সেও আমার চোখের সঙ্গে চোখ নামিয়ে উট্টিকে দেখল। তারপর বলল, “খুব ঘুমোচ্ছে।”

তার কথা শুনে আমার বুকটা হু হু করে জ্বলে উঠল। ভাবলুম বলি, “ওরে বাছা, এ ঘুম নয়, ছেলেটা বেহুঁশ হয়ে মরতে বসেছে। তুই ওকে বাঁচাতে পারিস?” কিন্তু বলতে পারলুম না। তার আগেই সে বলল, “তা বলে মনে কোরো না আমার পয়সা নেই। আজ সকালের ট্রেনে অবিশ্যি একদল প্যাসেঞ্জার পেয়েছি। কত মাল। এক্কাতে তুলে দিলুম। দুটো টাকা দিল। দু’-টাকায় চলে যাবে আমার। এই দ্যাখো!” বলে একটা দু’ টাকার নোট বার করে দেখাল আমায়। দেখিয়ে আবার উট্টির দিকে চেয়ে হাসতে হাসতেই বলল, “তোমার ছেলেটা এত রোগা কেন?”

আমি তাকে কিছুই বলতে পারলুম না। বলতে পারলুম না, এ-ছেলে আমার নয়। তাই সে জানল, উট্টির আমিই মা।

তাই সে আবার জিজ্ঞেস করল, “অসুখ-টসুখ করেছে নাকি?” বলেই সে উট্টির কপালে হাত রাখল।

সে কপালে হাত রাখার সঙ্গে সঙ্গেই আমার চাপা উদ্বেগ ফেটে পড়ল। বললুম, “বাবা, ছেলেটা আমার ঘুমোয়নি, অজ্ঞান হয়ে আছে।”

হঠাৎ ঝড় উঠলে যেমন একসঙ্গে অসংখ্য গাছ তোলপাড় শুরু করে দেয়, তেমনই ছেলেটাও যেন ছটফটিয়ে উঠল। মুখে সে কোনও কথা বলল না। চোখের পলকে উট্টিকে আমার কোল থেকে তুলে নিয়ে ছুট দিল। আঁতকে চেঁচিয়ে উঠলুম, “কোথায় নিয়ে যাচ্ছ বাবা?”

কিন্তু আমি কি দাঁড়িয়ে থাকতে পারি! আমিও ছুটলুম। কিন্তু ওই জোয়ান ছেলের সঙ্গে আমি পারব কেন! সে ছুটতে ছুটতে ইস্টিশান পেরিয়ে রাস্তায় পড়ল। তবু যতক্ষণ পারলুম ওর পেছনে ছুটতে ছুটতে ওকে লক্ষ রাখলুম। এখানকার রাস্তাঘাট আমার কিছুই চেনা নয়। ভাল করে এদিক ওদিক দেখার ফুরসতও পেলুম না। আমি স্পষ্ট দেখলুম, ছেলেটা অনেকখানি ছুটে গিয়ে একটা বাড়ির মধ্যে ঢুকে পড়ল। আমিও পড়ি-মরি সেখানে ছুটে এসেছি। বুঝতেই পারছ, আমার তখন কী অবস্থা। সেখানে দাঁড়িয়ে হাঁপাচ্ছি আর ছেলেটাকে দেখতে না পেয়ে এপাশ-ওপাশ খুঁজছি। এমন সময় হঠাৎ দেখি সে হন্তদন্ত হয়ে সেই বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। অথচ উট্টি নেই। আমি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই সে ব্যস্ত হয়ে বলল, “ডাক্তারবাবু তোমাকে ডাকছে।”

আমি থমকে তার মুখের দিকে তাকালুম।

“হ্যাঁ, চলো ওই ঘরে।” বলে সে আমার হাত ধরে টান দিল। আমি ডাক্তারবাবুর ঘরে ঢুকে পড়লুম।

আমার দিকে কটমট করে তাকিয়ে দেখলেন ডাক্তারবাবু। তারপর জিজ্ঞেস করলেন, “তোমার ছেলে?”

“আজ্ঞে হ্যাঁ।” আমি উত্তর দিলুম। এখন মিথ্যে বলতে আমার মুখে আটকাল না। এই বিপদে মিথ্যে ছাড়া আর কী বলতে পারি আমি! যদি বলি আমি জঞ্জাল সাফা করি, এ-ছেলে আমার নয়, তা হলে ঝঞ্ঝাট বেধে যাবে। সুতরাং আমায় বাঁচতে হলে সবকিছু গোপন করতে হবে।

ডাক্তারবাবু আবার জিজ্ঞেস করলেন, “কতক্ষণ ধরে অজ্ঞান হয়ে আছে?”

“তা অনেকক্ষণ।”

“এতক্ষণ কী করছিলে?”

“আমি বুঝতে পারিনি। ভাবছিলুম ঘুমোচ্ছে।”

ডাক্তারবাবু ধমক দিলেন, “তুমি কেমন মা, ছেলে ঘুমোচ্ছে না অজ্ঞান হয়ে আছে খেয়াল করতে পারো না!”

আমি চুপ করে রইলুম।

ডাক্তারবাবু আবার বললেন, “ছেলেটাকে তো মেরে এনেছ। খেতে দাও না?”

আমি বললুম, “ডাক্তারবাবু, আমাদের দেশে খরা। জমিতে ফসল নেই, ঘরে খাবার নেই।”

“কোথায় থাকো?”

“অনেক দূরে, রতনপুরে।”

“সঙ্গে টাকা-পয়সা আছে?”

“আজ্ঞে!” আমি চমকে ডাক্তারবাবুর মুখের দিকে তাকালুম।

ডাক্তারবাবু বললেন, “সব মিলিয়ে কুড়ি টাকা লাগবে।”

আমি কথা বলতে পারলুম না। শুধু অসহায়ের মতো ফ্যালফ্যাল করে ডাক্তারবাবুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম। কারণ তখন আমার কাছে একটা কানাকড়িও ছিল না। কথা বলব কোন মুখে?

ডাক্তারবাবু আমার মুখখানা থমথমে দেখে বললেন, “ভেবে দ্যাখো। অবস্থা খুবই ভয়ের।”

ছেলেটা আমার মুখ দেখে কী বুঝেছিল জানি না, সে ভীষণ ব্যস্ত হয়ে বললে, “ডাক্তারবাবু, এখন যদি দুটো টাকা দিই, পরে বাকিটা দিলে হবে না?”

ডাক্তারবাবু হো-হো করে হেসে উঠলেন। বললেন, “হাসপাতালে নিয়ে যা, পয়সা লাগবে না।”

আমার হঠাৎ চুড়িদুটোর কথা মনে পড়ে গেল। চটপট কাপড়ের খুঁটে বাঁধা একটা চুড়ি বার করে ডাক্তারবাবুর সামনে রেখে বললুম, “আমার কাছে এই আছে ডাক্তারবাবু।”

ওমা! সেই ছেলেটা অমনই সঙ্গে সঙ্গে প্রায় ছোঁ মেরে চুড়িটা ডাক্তারবাবুর সামনে থেকে তুলে নিয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “না!” তারপর আমার চুড়ি আমার হাতে গুঁজে দিয়ে উট্টিকে কোলে তুলে নিল। বলল, “এসো তুমি, হাসপাতালেই যাব।” বলে ডাক্তারখানা থেকে বেরিয়ে এল।

একটুখানি গেছি, কি যাইনি, হঠাৎ এক অদ্ভুত কাণ্ড ঘটে গেল! উট্টি আচমকা কেঁদে উঠল! উট্টির জ্ঞান এসেছে। ছেলেটা সঙ্গে সঙ্গে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে চেঁচিয়ে উঠেছে, “মাসি!” বলে উট্টিকে তাড়াতাড়ি আমার কোলে এগিয়ে দিল। আমি উট্টিকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই সে আনন্দে চিৎকার করে উঠল, “তোমার ছেলে ভাল হয়ে গেছে মাসি, আর দরকার নেই হাসপাতালের। চলো, আমার ঘরে চলো।” বলে আমাকে প্রায় টানতে টানতে তার ঘরে নিয়ে চলল।

একটুখানি যেতেই তার ঘর। ঠিক ঘর নয়, বলতে পারো ঝুপড়ি। সেখানে একাই থাকে সে। চটের আড়াল ঠেলে ঘরে ঢুকতেই সে একটা ছেঁড়া-ফুটো মাদুর ঝটপট বিছিয়ে বলল, “ছেলেকে নিয়ে তুমি একটু বোসো, আমি এক্ষুনি আসছি।” বলে ঘর থেকে বেরিয়ে দুড়দাঁড়িয়ে ছুট দিল। আমি কোনও কথাই জিজ্ঞেস করার ফুরসত পেলুম না।

উট্টি কাঁদছে। আমি মাদুরের ওপর বসে বসে তাকে ভোলাচ্ছি। আর ফ্যালফ্যাল করে তার মুখের দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছি। আমি বুঝতে পারলুম, খুব কষ্ট হচ্ছে উট্টির। কাঁদতে কাঁদতে বেচারির গলা চিনচিন করছে। মনে হচ্ছে, বড্ড খিদে পেয়েছে। ঠিক এইসময়ে ছেলেটা যে আমায় ফেলে কোথায় গেল, কে জানে। আবার কাউকে ডাকতে গেল নাকি! কেন জানি, এক অজানা ভয়ে আমার মনের ভেতরটা ভারী ছটফট করছিল। তার ওপর উট্টির কান্নাও আমাকে অস্থির করে তুলল। আমি আর বসে থাকতে পারলুম না। উট্টির জন্যে একটু খাবার জোগাড় করতে না পারলে ছেলেটাকে বাঁচানো দায় হবে। সুতরাং ধৈর্য হারালুম আমি। আর কতক্ষণই বা মনের ভেতর এই অস্থিরতা নিয়ে চুপচাপ বসে থাকা যায়। আমি উঠে দাঁড়ালুম। ঘরের চটের পর্দা ঠেলে যেই বাইরে পা বাড়িয়েছি, অমনি সঙ্গে সঙ্গে হুড়মুড়িয়ে ছেলেটা ছুটে এল। একভাঁড় দুধ আমার দিকে এগিয়ে দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “এখনও গরম আছে, ছেলেকে খাইয়ে দাও!”

আমি থতমত খেয়ে গেছি।

“নাও, নাও, দাঁড়িয়ে রইলে কেন? ধরো, এক্ষুনি ঠান্ডা হয়ে যাবে।” সে ব্যস্ত হয়ে উঠল।

আমি হতভম্বের মতো তার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম। তার হাত থেকে দুধের ভাঁড়টা নিয়ে আবার ঘরে ঢুকে মাদুরের ওপর বসে পড়লুম। উট্টির গালে ফোঁটা ফোঁটা দুধ ঢেলে দিই, আর ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। কী হাসি তার মুখে। বলল, “দ্যাখো না, একটু পরেই চাঙ্গা হয়ে উঠবে।”

দুধের ফোঁটাগুলি উট্টির গালে পড়তেই রাক্ষসের মতো গিলে খাচ্ছে। বুঝতে পারলুম, ভীষণ খিদে পেয়েছে। দেখতে দেখতে সব দুধটাই শেষ করে ফেলল উট্টি। আমার দিকে তাকাল একবার। তখন তার কান্না থেমে গেছে। তারপর মুখ ঘুরিয়ে আবার চোখ বুজল। তাড়াতাড়ি ওর গায়ে আবার ঠেলা দিলুম। না, উট্টি আবার জেগে উঠল। যাক বাবা, তেমন কিছু নয়। উট্টির শরীরে যে কিচ্ছু নেই, বুঝতেই পারলুম। তাই আমি নিজেই এবার ওকে আমার কোলে শুইয়ে দোলা দিতে দিতে ঘুম পাড়াতে লাগলুম। দেখতে পেলুম, থেকে থেকে উট্টির চোখ জুড়িয়ে আসছে। সেই ছেলেটি এবার বেশ খুশি হয়েই বলল, “ঘুমোক, ঘুমোক, পেট ভরে গেছে তো, এখন ঘুমোবে।”

আমি জিজ্ঞেস করলুম, “তুমি কোত্থেকে দুধ আনলে বাবা?”

সে বলল, “কেন, আমার কাছে তো দুটো টাকা ছিল। দোকান থেকে কিনে আনলুম।”

আমি অবাক হয়ে গেলুম তার কথা শুনে। জিজ্ঞেস করলুম, “তোমার চলবে কী করে? তুমি কী করে খাবে?”

সে হাসতে হাসতে বলল, “ও তুমি কিছু ভেবো না। একটা দিন কিছু না খেলে মরে যাব না। কতদিন তো পয়সা জোটে না, তাতে কি আমি মরে গেছি। আমার তো মনে হয়, তুমিও তো কিছু খাওনি।”

আমি বললুম, “আমার কথা ছেড়ে দাও। উট্টি বাঁচলেই আমি বাঁচি।”

তখন আমার উত্তর শুনে সেও হাসতে হাসতে বলল, “তবে আমার কথাও ছেড়ে দাও। আমার বেঁচে থাকাও যা, না-থাকাও তা।”

“ছিঃ! ও-কথা বলতে নেই বাবা। এখন তোমার উঠতি বয়স; এখনই তো পেট ভরে খাবার সময়। শরীরটাকে তো দেখতে হবে।” এইকথা বলে আমি ওর মুখের দিকে তাকালুম, সে অমনই সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “কেন আমার শরীরে শক্তি কি কম আছে? জানো, একসঙ্গে তিনটে বড় বড় বাকসো আমি মাথায় নিতে পারি। সেইসঙ্গে একটা ঝোলা কাঁধে ঝুলিয়ে আর-একটা পুঁটলি হাতে নিয়ে বেমালুম চলে যেতে পারি। একটুও কষ্ট হয় না।” বলে সে যেমন করে এতক্ষণ হাসছিল, তেমন করেই হেসে ফেলল। তারপর আবার বলল, “আমার কথা তুমি ভেবো না। এখন তোমার কথাই আমাকে ভাবতে হবে।”

আমি বললুম, “আমি তো এক্ষুনি চলে যাব।”

সে যেন চমকে উঠল, বলল, “কোথায় যাবে?”

“দেখি।” আমি উত্তর দিলুম।

সে ব্যস্ত হয়ে বলল, “সে কী! তুমি যে ডাক্তারবাবুকে বললে, তোমাদের দেশে-ঘরে খরা হয়েছে! ঘরে খাবার নেই!”

আমি উত্তর দিলুম, “হ্যাঁ, আমি ঠিকই বলেছি বাবা। এখন আমায় নিজে একটা কিছু ব্যবস্থা করার কথা ভাবতে হবে।”

সে এবার একটু উদ্বেগের স্বরেই বলল, “ওই রুগ্‌ণ ছেলেটাকে কোলে নিয়ে রাস্তায় রাস্তায় কোথায় তুমি ঘুরবে? না, না, ওসব চলবে না। তোমাকে এখানেই থাকতে হবে।”

আমি তার কথা শুনে অবাক হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলুম। আমার মুখ দেখে আবার তার মুখে হাসির ঝিলিক দেখা দিল। সে বলল, “তুমি কিচ্ছু ভেবো না। ছেলেকে নিয়ে তুমি ঘরে শোবে, আর আমি যেখানে হোক একটু জায়গা করে নেব।”

ছেলেটি যে খুবই দয়ালু, সে-কথা আমি অনেক আগেই বুঝেছি। তবু ওর এই কষ্টের জীবনে আমি কেন ভার হই। তাই বললুম, “তুমি এই যে করলে বাবা, এ আমি চিরদিন মনে রাখব। আমার জন্যে তুমি কষ্ট পাবে, এ আমি কেমন করে সহ্য করব?”

আমার কথা শুনে সে চোখের পলকে আকাশে হাত ছুড়ে বলল, “কী যে বলো, আমার আবার কষ্ট! কষ্ট আমার কাছে ঘেঁষতেই পারে না। ওসব কথা আমি শুনতে চাই না। মাসি, তোমার কাছে তোমার ছেলেও যা, আমিও তাই। আমাকে একা ফেলে তুমি কোথাও যেতে পারবে না।”

আমি ভারী অস্বস্তিতে পড়ে গেলুম। মনে হল, যেদিন জানতে পারবে আমার সব কথা, সেদিন কি ও সহ্য করতে পারবে। এই সরল ছেলেটাকে সব গোপন রেখে আমি ঠকাতে চাই না। তার চেয়ে বরং সব বলেই দিই, বলে দিই উট্টি আমার কেউ নয়। আমরা জঞ্জাল সাফ করি। আমরা ভারী দুঃখী। কিন্তু কী যে হল, ছেলেটার মুখের দিকে চেয়ে আমার মুখ দিয়ে কোনও কথাই বেরোল না। আমি আমার সব কথা গোপন রেখে ওখানেই থেকে গেলুম।

কিন্তু থাকা না হয় হল, তিনটে প্রাণীর খাবার জুটবে কী করে। তাই আমি ছেলেটিকে বললুম, “দ্যাখো বাবা, আমি না-হয় তোমার এখানে থাকলুম, কিন্তু তিনজনের চলবে কী করে?”

সে বলল, “আমি তো আছি মাসি, সব ঠিক চলবে। এক্ষুনি আমি ইস্টিশানে যাচ্ছি। গাড়ি আসার সময় হয়ে গেল। আমাদের কারবারের মজা কি জানো, প্যাসেঞ্জার ধরলেই পয়সা। এখানে এই পাহাড়-ঘেরা শহরে কত লোক হরদম বেড়াতে আসছে। একে একে সব দেখতে পাবে। তুমি বোসো, আমি এক্ষুনি এসে পড়ব।”

ছেলেটা ইস্টিশানে চলে গেল। আমি বোবা হয়ে পথের দিকে চেয়ে রইলুম।

সত্যি বলতে কী, তখন আমার মাথায় কোনও বুদ্ধিই আর খেলছিল না। বুদ্ধি আসবে কোত্থেকে? সেই কালকের রাত থেকে আর আজ এই এখন পর্যন্ত ধকল সইতে সইতেই তো শেষ হয়ে গেলুম। এ-বিপদ যে কেমন করে কাটবে, আমি তার কোনও হদিশই খুঁজে পাচ্ছি না। ভেবে পাচ্ছি না, উট্টিকে নিয়েই বা আমি কী করব। কোথায় যাব! ওর বাবা-মা যদি বেঁচে থাকে, তাদেরই বা কেমন করে খোঁজ করব, আমি কিছুই ভেবে উঠতে পারছিলুম না। জানি, এখনই যদি আমার গ্রামে আমি ফিরে যাই, তবে বাবুরা নির্ঘাত আমাকে আর উট্টিকে মেরে ফেলবে।

তিন

অনেকক্ষণ পর ছেলেটা ফিরে এল। তেমনি একমুখ হাসি। মুখ দেখে মনে হল, অনেক পয়সা রোজগার করে এনেছে। তার মুখে সেই কথাটা শোনার জন্যে আমি উদ্‌গ্রীব হয়ে তার চোখের দিকে তাকালুম। সঙ্গে সঙ্গে সে হাসিমুখে গলগল করে বলে গেল, “ইস্টিশানে গাড়ি এল, তোমাকে বলব কী, গাড়ি ভিড়ে একেবারে উপচে পড়ছে। কিন্তু জানো, আমাদের ইস্টিশানে লোক তেমন নামল না। যারা নামল, তারা নিজের নিজের মাল নিজেরাই বয়ে নিয়ে চলে গেল। যাকগে, তাতে কী হয়েছে। গাড়ি তো আর থেমে নেই। কাল তো আবার গাড়ি আসবে, তখন দেখা যাবে। একটা রাত দেখতে দেখতে কেটে যাবে।”

আমি ভয়ে আড়ষ্ট হয়ে ওর মুখের দিকে চেয়ে রইলুম। কী বলব কিছুই ভেবে পেলুম না। ছেলেটাও তো সারাদিন মুখে কিছু না-দিয়ে আমাদের জন্যে ছোটাছুটি করছে। তার মুখের দিকে চেয়ে বসে থাকতে আমার কী যে লজ্জা করছে, সে-কথা আমি কাকে বলি! অথচ পয়সা না হলে চলবেও না তো। একটু পরে উট্টিও জেগে উঠবে। তখন ওর পেটে একটু দুধ না-পড়লে, আবার যদি কিছু হয়। সুতরাং মনস্থির করে ফেললুম। স্থির করলুম আমার একটা চুড়ি আমি বেচে দেব। তাই ছেলেটিকে বললুম, “আচ্ছা বাবা, এখানে কোথাও সোনা রুপোর দোকান নেই?”

সে সঙ্গে সঙ্গে বলে উঠল, “কেন, আবার বুঝি গয়না বেচার কথা ভাবছ? আচ্ছা, তুমি আমায় কেন বিশ্বাস করতে পারছ না বলো তো? কাল সকাল অবধি একটু অপেক্ষা করেই দ্যাখো না। আমি তো বলছি...”

তার কথা শেষ হবার আগেই আমি উট্টিকে দেখিয়ে বললুম, “ওরে বাছা, সে-কথা নয়। এই ছেলেটার পেটে যদি একটু দুধ না পড়ে, ওকে বাঁচাব কেমন করে?”

আমার এ-কথা শুনেই ছেলেটার মুখখানা কেমন যেন শুকিয়ে গেল। অস্ফুটস্বরে সে বলল, “তা ঠিক” বলে সে এক মুহূর্ত কী যেন ভাবল। তারপর বলল, “দাও তোমার চুড়ি। আমি দেখি।”

“তুমি?” আমি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলুম।

সে বলল, “হ্যাঁ, দাও না!”

সত্যি বলছি, তার হাতে সোনার চুড়িটা দিতে আমার মন একেবারেই সায় দিচ্ছিল না। তাই বললুম, “সোনার জিনিস, তোমার কাছ থেকে কেউ যদি কেড়ে নেয় বাবা! তার চেয়ে বরঞ্চ চলো, আমিও যাই।”

“না মাসি, তোমায় যেতে হবে না। আমার কাছ থেকে যে কেড়ে নেবে, সে এখনও ওই ওপরে আছে।” বলে হাত তুলে আকাশটা দেখাল। তারপর বলল, “তুমি বরং ছেলেকে দ্যাখো, আমি যাব আর আসব। দাও তোমার চুড়ি!”

না, এবার আমার মনে সত্যিই ভীষণ এক সন্দেহ চেপে বসল। ছেলেটার এই ছিরিছাঁদ দেখে কোনও মানুষের যদি সন্দেহ হয়, তবে তাকে কিছুতেই দোষ দেওয়া যায় না। তার সারা ঘরে দুর্দশার চিহ্ন। নিজে পেট ভরে খেতে পায় না। তার হাতে সোনার চুড়ি দেওয়া যায়! আমি ইতস্তত করতে লাগলুম। ছেলেটাও তেমনই চালাক। আমাকে দোনোমনো করতে দেখে, আমার মনের কথা বুঝতে তার কষ্ট হল না। তাই হাসতে হাসতেই সে যখন বলল, “আমায় বিশ্বাস করতে পারছ না বুঝি?”

তখন আমি লজ্জায় মরে যাই। কিন্তু পরক্ষণেই তার মুখের দিকে চাইতেই কে যেন আমায় সম্মোহন করে দিল। তার অদ্ভুত সরল মুখখানা দেখে আমার হাত যেন আপনা-আপনি চুড়িটা তার দিকে এগিয়ে দিল। সে চোখের পলকে চুড়িটা আমার হাত থেকে নিয়ে তার প্যান্টের পকেটে পুরে ছুট দিল। আমি বোকার মতো চেয়ে রইলুম।

এই ঝুপড়ির ভেতর আমি এখন উট্টিকে নিয়ে একা বসে আছি। উট্টি ঘুমোচ্ছে। আমি নিজেকে ভাগ্যের ওপর ছেড়ে দিয়ে সময় গুনছি। কোথায় আমার সেই ছিমছাম ঘরখানা। আর এখন আমি কোথায়। কোথায় শোব, কোথায় যে কী করব, কিছুই মাথায় আসছে না। যাক, সে না-হয় পরে ভাবা গেলেও চলবে, কিন্তু এখন ছেলেটা যদি ভালয়-ভালয় না ফেরে! আমার অমন শখের চুড়িটা হাতছাড়া করে কিছুতেই মনস্থির রাখতে পারছিলুম না। ছেলেটা তো আমার মোটেই চেনা নয়। মানুষের লোভ, কখন যে কোথা দিয়ে চাগাড় দিয়ে ওঠে কেউ বলতে পারে না। কী যে ভাবনা হচ্ছে, কী বলব!

ছেলেটা এখনও এল না। অথচ হয়ে গেল অনেকক্ষণ। আমার ছটফটানি শুরু হয়ে গেছে। যতই সময় বয়ে যাচ্ছে, আমি ততই আনচান করছি। কখনও দাঁড়াচ্ছি, চটের পর্দা ঠেলে বাইরে মুখ বাড়াচ্ছি, বসছি। সে আর আসছে না।

আরও অনেকক্ষণ কেটে গেল। আমার আর ধৈর্য নেই। আমি রাস্তায় বেরোব বলে যখন উট্টিকে কোলে নিতে গেছি। একেবারে ঠিক সেই সময়ে ছেলেটা হইহই করে ঘরে ঢুকে চেঁচিয়ে উঠল, “মাসি!”

আমি চমকে উঠেছি। তার চিৎকারে উট্টিরও ঘুম চটে গেছে। সে কান্না জুড়ে দিল। অমনই উট্টির দিকে চেয়ে প্রায় আধহাত জিব বার করে অপরাধীর মতো মুখে শব্দ করল, “ইস-স-স!” তারপরেই হাত বাড়িয়ে, চাপাস্বরে বলল, “এই নাও তোমার চুড়ি!”

আমি অবাক হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলুম।

সে আবার বলল, “নাও।”

আমি হাত বাড়িয়ে চুড়িটা হাতে নিয়ে ওর হাতের দিকে চাইতেই দেখি, ওর এক হাতে ভাঁড়ভর্তি দুধ, আর একহাতে ঠোঙাভর্তি খাবার। তাড়াতাড়ি সেগুলো ঘরের এককোণে রেখে, উট্টির মুখের সামনে হুমড়ি খেয়ে বসে উট্টিকে আদর করে কান্না ভোলাতে লাগল, “আ-আ-আ!” ভোলাতে ভোলাতে বললে, “মাসি, ওকে একটু দুধ খাইয়ে দাও। নিশ্চয়ই খিদে পেয়েছে।”

আমার মুখে আর রা নেই। ভাবছি, আমার চুড়িটা সে ফেরত দিল, অথচ এত খাবার কেনার পয়সা সে পেল কোথায়!

সে আবার বলল, “দাও, আমিই খাইয়ে দিই!” সে দুধের ভাঁড়টা নেবার জন্যে হাত বাড়াল। কিন্তু তার আগেই ভাঁড়টা হাতে নিয়ে উট্টির মুখে একটু একটু করে দুধ ঢেলে দিতে লাগলুম। উট্টি কান্না ভুলে চুকচুক করে দুধ খেতে শুরু করে দিল। অমনি খুশিতে সেই ছেলেটার মুখখানা উছলে উঠল। হাসতে হাসতে সে উট্টির চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “দ্যাখো মাসি, তোমার ছেলের কী ভীষণ খিদে পেয়েছিল। সবটা খাইয়ে দাও। আবার কাঁদলে আবার নিয়ে আসব।”

এবার আমি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করলুম, “এত পয়সা তুমি কোথা থেকে পেলে বাবা?”

সে খুশিতে ডগমগ করতে করতে বলল, “সে আর তোমাকে কী বলব। একে বলে বরাত। এক ভদ্রলোক মালপত্তর নিয়ে এক্কাগাড়ি করে বাড়ি ফিরছিলেন। ব্যাস, হঠাৎ কোথাও কিচ্ছু নেই, ছুটতে ছুটতে গাড়ির চাকা গেল খুলে। সে কী ভয়ানক কাণ্ড! হুড়মুড় করে গাড়ি পড়ল মুখ থুবড়ে। এই বুঝি গাড়ি পড়ল খাদে। উফ! খুব বাঁচোয়া। কিচ্ছু হয়নি। চাকা খুলল বটে, ভাঙেনি। ঘোড়াটাও বেঁচে গেছে। ভাগ্য বলতে হয় ভদ্দরলোকের। একটুর জন্যে তিনি বেঁচে গেছেন! কিন্তু ঘোড়াটা প্রাণের ভয়ে এত জোর চিৎকার করে উঠেছিল যে, তাতেই ভদ্দরলোকের আধখানা প্রাণ উড়ে গেছে। রাস্তার লোকেরা সেই চিৎকার শুনে যে যেদিকে পারল মারল ছুট। আমি অবশ্য ছুটটুট দিইনি। আমার অত ভয়ডর নেই। তবে মিথ্যে বলব না, হঠাৎ চিৎকার শুনে বুকটা একটু ধড়াস করে উঠেছিল। ওমা! দেখি কী, যে-কোচোয়ান গাড়ি চালাচ্ছিল সে আমার চেনা। সে আমায় দেখতে পেয়ে ডাক দিল, “ইদিকে একটু আয় তো বাবা। গাড়িটা ধরাধরি করে একটু ঠিক করে নিই। তা বলো, মানুষের এই বিপদের সময় মুখ ঘুরিয়ে চলে যাওয়াটা কী ঠিক! আমি কোচোয়ানের সঙ্গে হাত লাগালুম। দু’জনে মিলে, অনেক কষ্ট করে গাড়ির চাকাটা জায়গা মতো লাগিয়ে গাড়িটা দাঁড় করালুম। তারপর আমি তো চলেই যাচ্ছিলুম। কোচোয়ান ডাকল আমায়। ডেকে আমার হাতে পাঁচটা টাকা দিল। আমি তো একেবারে থ হয়ে গেছি। একটুখানি কাজ অথচ পাঁচ-পাঁচটা টাকা। বলো, কম তো নয়, কী ভাল লোক দ্যাখো! আর এদিকে বাবুদের ভারী ভারী মাল টেনে নিয়ে যাও, একটি টাকা আদায় করতে তোমার প্রাণ বেরিয়ে যাবে। আবার আর এক কাণ্ড হয়েছে। হয়েছে কী, সেই যে ভদ্দরলোক এক্কাচেপে মাল নিয়ে যাচ্ছিলেন, তিনি আর গাড়িতে চড়তে চান না। সঙ্গে তাঁর মালও ছিল অনেক। অগত্যা আমি তাঁর মাল মাথায় নিয়ে পৌঁছে দিয়ে এলুম। ব্যাস! তিনিও আমায় দু’টাকা বকশিশ করলেন। মানে, পাঁচ টাকা আর দু’ টাকা সবসুদ্ধু সাত টাকা। বলো, কম হল? আর এই করতে করতে তো দেরি হয়ে গেল। তুমি এককাজ করো মাসি, ছেলেকে খাইয়ে চান করে এসো। সামনেই একটা ঝিল আছে। দেখিয়ে দেব। সারাদিন খাওয়া নেই, ঘুম নেই। কিছু খেয়ে ঘুমিয়ে নাও। শরীরের কথা কিচ্ছু বলা যায় না।”

আমি ফ্যালফ্যাল করে ছেলেটার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম। তার মুখখানা দেখতে দেখতে আমার চোখ ছলছল করে উঠল। কোনও পাপ নেই। কী দয়ালু ছেলে! সে হঠাৎ তার হাতটা বাড়িয়ে বলল, “এই ক’টা টাকা তোমার কাছে রেখে দাও। আমি কোথায় রাখতে কোথায় ফেলব।”

এবার আর আমি চোখের জল সামলাতে পারলুম না। আমি মুখ ঘুরিয়ে নিয়ে আঁচল দিয়ে চোখ মুছলুম।

উট্টির দুধ খাওয়া শেষ হতেই, খিলখিল করে সে কী হাসি উট্টির। হাসি দেখে তেমনই আনন্দ সেই ছেলেটির। সে খুশিতে চিৎকার করে উঠল, “মাসি, তোমার ছেলে হাসছে।” বলে উট্টিকে কোলে নিয়ে আদর করতে লাগল। আমি নির্বাক হয়ে দেখতে লাগলুম।

আদর করতে করতেই সেই ছেলেটি বলল, “তুমি ভয় পেয়ো না মাসি, তোমার ছেলের ভাবনা তোমাকে আর ভাবতে হবে না। যতদিন আমি আছি, তোমরা আমার কাছেই থাকবে। তোমার ছেলেকে তা বলে আমি আমার মতো কুলি হতে দেব না। আসলে কী জানো, আমিও কি কুলি ছিলুম! আমার বাবার ইচ্ছে ছিল বড় হলে আমি উড়োজাহাজ চালাব। তা সে তো আর হল না। দেখতেই তো পাচ্ছ আমার দশা। তবে যাই বলো, আমি বেশ আছি। কী করছি, কী খাচ্ছি, কেউ দেখতেও আসছে না, বলতেও আসছে না। আমার শুধু ভয় একটাই। এই যে ঘরটা দেখছ এটা আমার, কিন্তু জায়গাটা অন্যের। কোনদিন না জায়গার মালিক চড়াও হয়ে ঘরটা ভেঙে দেয়। তা আমার তো কিছু বলার নেই। আইন বলে তো একটা কথা আছে। তবে যেদিন ভেঙে দেবে, সেইদিনই হবে মুশকিল। আমার আর কী, আমি তো যেখানে সেখানে পড়ে থাকতে পারি। কিন্তু এখন তো আর তা হবার জো নেই। তোমরা আছ। তোমাদের তো আর যেখানে সেখানে ফেলে রাখতে পারি না। যাকগে, সে যখন হবে তখন দেখা যাবে। এখন আর ওসব কথা ভেবে দরকার নেই।

“হ্যাঁ, এখন কথা হচ্ছে, এবার থেকে আমাকে খুব খাটতে হবে। রোজ অনেক অনেক পয়সা উপায় করব। যা পয়সা পাব সব তোমার কাছে দিয়ে দেব। খরচপত্তর করে যা বাঁচবে, তুমি জমাবে। তারপর যখন অনেক পয়সা জমে যাবে, তোমার ছেলের জন্যে একটা এক্কাগাড়ি কিনে দেব। তখন তোমার ছেলে নিশ্চয়ই বড় হয়ে যাবে। দেখো, এক্কা চালিয়ে কত পয়সা উপায় করে আনবে। তোমার কোনও দুঃখই থাকবে না। আমার বাবাও তো এক্কা চালাত। আমাদের গাড়ি-ঘোড়া সব ছিল। সেই এক্কা চালিয়ে বাবা একটা ছোট্ট বাড়িও করেছিল। কিন্তু একদিন কী হল জানো? সেদিন ছিল এক্কাগাড়ির দৌড়বাজির মেলা। তুমি হয়তো ব্যাপারটা ঠিক বুঝতে পারছ না। তোমাকে আরও সোজা করে বলে দিচ্ছি।

“আমাদের এই পাহাড়ি দেশে প্রত্যেক বছর এইসময়ে তো ভিনদেশি লোক হাওয়া বদলাতে আসে। তাই এইসময়ে এখানে যে কতরকমের কাণ্ডকারখানা হয়, কী বলব। কোথাও নাচ, কোথাও গান, সিনেমা-থিয়েটার, একেবারে হইহই কাণ্ড! আর তার সঙ্গে হয় এক্কাগাড়ির দৌড়বাজি। ইস্টিশানের পাশে একটা খোলা ময়দান আছে, সেই ময়দানে এক্কাগাড়ির মালিকরা সব গাড়ি নিয়ে দৌড়ের বাজি লড়তে আসে। মানে একসঙ্গে ছুটতে ছুটতে যার গাড়ি সবাইকে হারিয়ে দেবে, সে পাবে সোনার মেডেল, টাকাকড়ি, আরও কত উপহার। তা, সেবার আমার বাবাও নাম দিয়েছিল দৌড়বাজিতে। যেদিন দৌড় হবে, সেদিন বাবার সঙ্গে এক্কা চেপে আমি আর মা যাচ্ছিলুম বাজি দেখতে। কিন্তু বাবাকে আর লড়াইয়ের ময়দান পর্যন্ত যেতে হল না। আমাদের এক্কাটানা ঘোড়াটা ছিল ভীষণ তেজিয়ান। দেখতেও ছিল তেমনই। আমরা সবাই জানতুম, এই ঘোড়াটার জন্যেই বাবা মেডেল পাবে। কিন্তু হল কী, এক্কায় চেপে যখন আমরা ময়দানের কাছাকাছি এসেছি, তখন ঘোড়াটা গেল খেপে! আচমকা চার পা তুলে লাগিয়ে দিল তুলকালাম কাণ্ড। বাবা আর কিছুতেই তাকে বাগে আনতে পারে না। বিপদ কাকে বলে! আমরা না পারছি এক্কা থেকে নামতে, না পারছি বসে থাকতে। মানে, এই বুঝি গাড়ি উলটে পড়ে। ঘোড়া লাফাচ্ছে, চেঁচাচ্ছে, ছুটছে। শেষকালে হল কী, ঘোড়া গাড়ি নিয়ে হুড়মুড় করে পড়ল গিয়ে খাদে। গাড়ি তো ভেঙে চুরমার। ঘোড়া তো মরলই, তার সঙ্গে আমার বাবা-মা’রও প্রাণ গেল। কে জানে, কী করে আমি বেঁচে গেলুম। যমের অরুচি তো আমি, তাই। তখন আমি নেহাত ছোট। বাবার সব আপনজনেরা ছুটে এসে ‘আহা’ ‘উহু’ করতে করতে চোখের জলে ভেসে গেল। আমার মতো বাপ-মা মরা ছেলের জন্যে তাদের সে কী দরদ! কেউ বলল, ‘ছেলেটাকে আমার কাছে নিয়ে যাই।’ কেউ বলল, ‘না, আমার কাছে চলুক ও।’ বুঝতেই তো পারছ তাদের কী মতলব। আমার বাবার যা কিছু আছে, সব হাতানোর ধান্ধা। আর ঠিক তাই। সেই ধান্ধাবাজের দল ক’দিন পরেই আমার বাবার বাড়িটা, টাকাকড়ি সব হাতিয়ে নিয়ে আমাকে রাস্তায় বার করে দিল। আমার তখন কী অবস্থা। অকূল সমুদ্রে হাবুডুবু খেতে শুরু করে দিয়েছি। কেউ দেখবার নেই, কেউ বলবার নেই। আমি একা। চারদিক শূন্য।”

বলতে বলতে সে থামল। দেখলুম তার মুখখানা থমথম করছে। এই শীতেও তার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের ফোঁটা চিকচিক করছে। স্থির চোখে সে চেয়ে আছে। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল সে। তারপর আমার চোখে তার চোখ পড়তেই সে থতমত খেয়ে গেল। ব্যস্ত হয়ে বলে উঠল, “দেখেছ, তোমার খিদে পেয়েছে, আর এদিকে আমি গল্প করছি! চলো, চলো, ঝিলটা দেখিয়ে দিই তোমায়।”

আমি বললুম, “ছেলেটাকে একা রেখে কেমন করে যাই?”

“ছেলেকে আমি নিয়ে যাচ্ছি। তুমি চলো তো।” বলে সে সঙ্গে সঙ্গে উট্টিকে কোলে তুলে নিল। উট্টিও সুড়ুত করে ওর কোলে উঠে পড়ল! তারপর কেমন হাসতে লাগল আমাকে দেখে।

ছেলেটাও হাসতে হাসতে বলল, “দ্যাখো মাসি, আমাকে কেমন চিনে ফেলেছে। আর তোমার ভাবনা কী! তা মাসি, ছেলের নামটাই তো জিজ্ঞেস করা হয়নি। কী নাম রেখেছ ছেলের?”

“উট্টি।”

“উট্টি।” সে উট্টির গালটা টিপে আনন্দে চিৎকার করে উঠল। তারপর বলল, “আমার নামটা শুনবে? বান্দা।” বলে এমন হি-হি করে হেসে উঠল যে, তাই দেখে এত দুঃখে আমারও হাসি পেয়ে গেল। আমি অবশ্য হেসে ফেলার আগেই সে তাড়া দিল, “চলো, চলো, ঝিলে চলো।” বলে সে উট্টিকে কোলে নিয়ে ঝিলের পথে পা বাড়াল। আমি ওর পিছু নিলুম।

চান আমার করা হল না। এককাপড়ে পালিয়ে আসতে হয়েছে আমায়। এই শীতে চান করে আমি পরব কী! অগত্যা হাত-পা ধুয়ে, মুখে-চোখে একটু জল দিয়ে চলে এলুম।

সমস্যা দেখা দিল রাত আসতে। এইটুকু একটা ঝুপড়ির মধ্যে তিনজনে শোওয়া তো যায় না। তার ওপর বিছানা বলতে ওই ছেঁড়া মাদুর আর ছেঁড়া চট। এই শীতে কী যে হবে। উট্টির না আবার ঠান্ডা লেগে যায়। এইসব কথাই যখন ভাবছি, তখন সেই বান্দা নামের ছেলেটিই হঠাৎ কথা বলল, “কী মাসি, কী ভাবছ?”

আমি বললুম, “না, তেমন কিছু নয়। তবে ঘরটা তো ছোট।”

সে বলল, “তাতে কী হয়েছে। তুমি তো উট্টিকে নিয়ে ঘরে শুতে পারবে। আমি ওই বাইরে শোব।”

“তাই কি হয়?” আমি উত্তর দিলুম, “এই শীতে তোমার যে কষ্ট হবে। এইঘরেই তিনজনে যা-হোক তা-হোক করে হয়ে যাবে।”

“হবে না মাসি। তোমারও কষ্ট হবে, উট্টিও ঘুমোতে পারবে না। আমি বাইরেই শোব।” বলে ছেলেটা সত্যি-সত্যি গায়ে একটা চট জড়িয়ে, আর একটা পেতে বাইরে শুয়ে পড়ল। খোলা আকাশ। হিমেল বাতাসে একটা ছেঁড়া চটে কতটুকু শীত আটকাবে। আমাদের জন্যে তার এই কষ্ট দেখে আমার চোখে কি আর ঘুম আসে। তার কথা ভাবতে ভাবতে এত মনখারাপ হয়ে গেল যে, সারা রাত আমার ঘুমই হল না।

চার

কী অস্বস্তিতে যে রাতটা কাটল, সে-কথা কাকে বলব। কাকভোরে বিছানা ছেড়ে উঠে পড়েছি। উট্টি বেশ করে একটা চট-চাপা দিয়ে ঘুমোচ্ছে। বান্দারও সাড়া-শব্দ নেই। ভাবলুম, ছেলেটাকে ঘরে ডেকে আনি। বেচারা সারারাত শীতে ভারী কষ্ট পেয়েছে, এখন একটু ঘরে আরাম করে ঘুমোক। এইকথা ভেবে তাড়াতাড়ি ঘরের পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে আসতেই দেখি, বান্দা সেই ছেঁড়া চটটা গায়ে জড়িয়ে বসে আছে। মনে হল ধুঁকছে। আধবোজা চোখে আমার দিকে তাকিয়ে খুব কষ্ট করে সে মুখে একটু হাসি আনল। কথা বলল না। তারপর তার মাথাটা হেলে পড়ল। আমি শিউরে উঠলুম। কাছে এগিয়ে গিয়ে খুব ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলুম, “কী হয়েছে, বান্দা?”

অতি কষ্টে মাথাটা হেলিয়ে সে ঘাড় নাড়ল। বলতে চাইল, কিছু না। কিন্তু আমার বুঝতে কষ্ট হল না, তার ভীষণ কিছু একটা হয়েছে। আমি তাড়াতাড়ি কাছে এগিয়ে গিয়ে তাকে ধরলুম। ছ্যাঁত করে উঠল আমার বুক। ইস! এ কী, ছেলেটার গা যে জ্বরে একেবারে পুড়ে যাচ্ছে! যে ভয় করেছিলুম, ঠিক তাই হয়েছে। সারারাত এই শীতে, এই খোলা আকাশের নীচে শুয়ে এই বিপত্তি! কোনওরকমে ধরাধরি করে তাকে ঘরে নিয়ে এলুম। এত জ্বর, সে দাঁড়াতেই পারছে না। মেঝের ওপরেই শুয়ে পড়ল। আমি তার গায়ে ভালভাবে চটটা জড়িয়ে দিলুম। সে শুয়ে শুয়ে কাঁপতে লাগল। মুখে টুঁ শব্দটি পর্যন্ত করল না। আমি দুর্ভাবনায় আনচান করতে লাগলুম। কী ভয়ংকর বিপদ! কাছে একটা পয়সা নেই, এখানে জানাশোনা কোনও মানুষও নেই যে ডাক্তার-বদ্যির কথা জিজ্ঞেস করব। সকালের আকাশ আরও পরিষ্কার না হলে কিছু করাও তো যাবে না। আমি তার দিকে চুপটি করে ভয়-চোখে চেয়ে রইলুম। হঠাৎ একবার ও যখন আমার দিকে চাইল, তখন জিজ্ঞেস করলুম, “খুব কষ্ট হচ্ছে?”

সে কথা বলতে পারছে না। যেটুকু বলল, এত অস্পষ্ট তাও বুঝতে পারলুম না। আমি তার মাথায় হাত দিলুম। সে আবার চাইল আমার দিকে। কী করুণ দৃষ্টি! আমার ভীষণ মায়া লাগল। আমি কেমন অসহায়ের মতো তার দিকে তাকিয়ে রইলুম।

একটু পরে আকাশে যখন রোদ ঝলসে উঠল, তখন আমার মনে হল, এবার একটা কিছু করতেই হয়। জ্বর যে কমছে, এমন কোনও লক্ষণ আমার নজরে পড়ছে না। চিকিৎসা করতে হলে এক্ষুনি টাকার দরকার। হাতের একটা চুড়ি বিক্রি না করে আর উপায় নেই। বিক্রি যে কোথায় হবে, তাও জানি না। খোঁজ করতে হলে বাইরে আমায় বেরোতেই হবে। কিন্তু ছেলেটাকে ঘরে একলা ফেলে, কেমন করে যাই!

হঠাৎ বান্দা ফিরে তাকাল আমার দিকে। আমি অস্থির গলায় জিজ্ঞেস করলুম, “কিছু বলবে?”

সে কথা বলতে পারল না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল আমার দিকে।

আমি বললুম, “এক্ষুনি আমি ওষুধ এনে দিচ্ছি। তুমি একটু কষ্ট করে শুয়ে থাকো। কিচ্ছু ভেবো না। আমি যাব আর আসব।”

আমি স্পষ্ট দেখতে পেলুম, আমার এই কথা শোনার পর চোখদুটো তার উৎকণ্ঠায় ছটফট করে উঠল। সে অতি কষ্টে ঘাড় নেড়ে আমায় মানা করল। কিন্তু আমি জানি এখন ওর বারণ শোনা মানেই আরও বিপদ ডেকে আনা। তাই আমি ওর কপালে হাত বোলাতে বোলাতে বললুম, “ওষুধ না খেলে, অসুখ যে বেড়ে যাবে বাবা।”

তখন সে কথা বলল। অত্যন্ত ক্ষীণ তার গলার স্বর। সে বলল, “ওষুধ কেনার পয়সা কোথায় পাবে?”

আমি বললুম, “সে তুমি ভেবো না।”

সে এবার আমার দিকে একদৃষ্টে চেয়ে চুপ করে রইল।

আমি বললুম, “উট্টি এখনও ঘুমোচ্ছে। ওকে নিয়ে যাই। ঘুম থেকে উঠে আমায় দেখতে না পেলে কাঁদবে।”

এবারও সে কথা কইল না।

আমি আর একবার বান্দার মাথায় হাত দিলুম। তারপর উট্টিকে কোলে নিয়ে বেরিয়ে পড়লুম। সে কোনও কথা বলল না। পথের দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে রইল।

বেলা বেড়েছে ঠিকই। লোকজনও অনেক দেখা যাচ্ছে। কিন্তু আমি তো পথ-ঘাট কিছুই চিনি না। সেই অচেনা পথেই এদিক ওদিক দেখতে দেখতে হাঁটতে লাগলুম। সব আগে আমায় চুড়িটা বিক্রি করতে হবে। তারপর ডাক্তারের খোঁজ করতে হবে। কিন্তু কোনদিকে গেলে যে সোনারুপোর বিক্রির দোকান পাব, সেও যেমন জানি না, তেমনই কোনদিকে ডাক্তারখানা আছে তাও আমার জানা নেই। তবে জায়গাটা খুব বড় নয়। তাই খুঁজে পেতে খুব একটা অসুবিধে হবে না বলেই মনে হয়।

সত্যিই অসুবিধে হল না। একটু হাঁটতেই আমি দোকান বাজার দেখতে পেলুম। সেখানে একটু খোঁজ করতে সোনারুপোর দোকানও খুঁজে পেলুম। আমি দোকানের সামনে দাঁড়াতে দোকানি কেমন যেন বাঁকা চোখে দেখল আমায়। দেখবেই তো, আমার যা ছিরি হয়েছে। একেবারে ভিখিরির মতো। তারপর দোকানি বেশ বেজার হয়েই আমাকে জিজ্ঞেস করলে, “কী চাই?”

আমি তাড়াতাড়ি কাপড়ের খুঁট খুলে একটা চুড়ি বার করে বললুম, “এটা বেচব।”

আমার হাতে সোনা দেখে দোকানি চমকে উঠল কি না বলতে পারব না, কিন্তু তার বেজার মুখটা যে হঠাৎ ঝকঝক করে উঠল, এটা আমার চোখ এড়াল না। এবার সে বেশ উৎসাহের সঙ্গেই আমাকে বলল, “হ্যাঁ, সোনারুপো কেনাবেচা করি আমরা।”

“আমার এটা দেখুন তো কত হয়।” বলে আমি তার হাতে আমার সোনার চুড়িটা এগিয়ে দিলুম।

দোকানি আমার হাত থেকে চুড়িটা নিয়ে বলল, “বোসো।” তারপর চুড়িটা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল।

আমি বললুম, “আজকের নয় বাবা, এ আমার বিয়ের সময়কার।”

দোকানি বলল, “তাই তো দেখছি।” বলে কষ্টিপাথরে ঘষে চুড়িটা ওজনে চাপাল।

আমি ওদের ওজন-টোজন অত বুঝি না। দেখলুম নিক্তির পাল্লা দু’দিক সমান হতেই, কাগজে কী সব হিসেবপত্তর লিখে দোকানি বলল, “দাম হবে পাঁচশো টাকা!”

পাঁচশো টাকা! জানি না, দামটা ঠিক না বেঠিক। যাই হোক, সে নিয়ে তো আর আমি দরাদরি করতে পারি না। যা পাওয়া যাচ্ছে, এখন তাই-ই যথেষ্ট। তাই আর কথা না-বাড়িয়ে তাকে বললুম, “তা বাবা যা দাম হয়, তার বেশি আর আপনি আমায় দেবেন কেন? বিপদে না পড়লে, কেউ কি আর গায়ের গয়না বেচে বাবা? যা হয়েছে তাই দিন!”

লোকটা পাঁচশোটা টাকা আমার হাতে দিয়ে বলল, “সাবধানে রাখো। রাস্তা-ঘাটে একটু নজর রেখে চলাফেরা কোরো।”

আমি টাকাটা কাপড়ে বেঁধে, কোমরে লুকিয়ে রাখলুম। না, কেউ দেখেনি। আমি দোকান থেকে বেরিয়ে পড়লুম।

এতক্ষণে চারদিকে বেশ লোকজন দেখা যাচ্ছে। তা হয়েও গেল অনেকক্ষণ। উট্টি আমার কোলে। ওর ঘুম ভেঙে গেছে অনেকক্ষণ। মুখটা শুকিয়ে এইটুকু হয়ে গেছে। বুঝতে পারছি, খিদে পেয়েছে। তারওপর মা-বাবাকে কাল থেকে দেখতে পাচ্ছে না। কী জানি, আবার কান্নাকাটি না জুড়ে দেয়। সুতরাং এখনই ওর জন্যে একটু খাবারের ব্যবস্থা করতে হয়। খাবারের দোকান অবশ্য অনেক আছে। কাল দুটো টাকা রাখতে দিয়েছিল বান্দা। সেই টাকা বার করে দুটো গজা আর দুটো লাড্ডু কিনে একটা গজা উট্টির হাতে দিলুম। সে সঙ্গে সঙ্গে খেতে শুরু করে দিল। আমি জোরে জোরে হাঁটতে লাগলুম। এবার আমার কাজ ডাক্তারখানা খুঁজে বার করা। কাল উট্টিকে যে-ডাক্তারবাবু দেখেছিলেন, তাঁর কাছে যেতে আমার মন সায় দিচ্ছিল না। কিন্ত অন্য ডাক্তারবাবুকে কোথায় পাব, সেও তো আমার জানা নেই। অবিশ্যি পথে এই যে এত লোক এদের কাউকে জিজ্ঞেস করলে, ডাক্তারখানার খবর নিশ্চয়ই পাওয়া যেতে পারে। তাই সামনে যে-লোকটি আসছে, তাকে জিজ্ঞেস করার জন্যে আমি একটু এগোতেই বুকটা আমার ধড়াস করে চমকে উঠেছে। আমি স্পষ্ট দেখলুম, যে-লোকটি এদিকে আসছে, সে আমার চেনা। আমাদেরই গ্রামের ও-পাড়ার একজন বাবু। নিশ্চয়ই এখানে বেড়াতে এসেছে। তাকে দেখে আমার কাঁপুনি ধরে গেছে। কী রে বাবা, আমাকে দেখে ফেলল নাকি! আমি মুখ ঘুরিয়ে নিলুম। কাপড় দিয়ে মুখটা আড়াল করে পেছন দিকে হনহন করে হাঁটা দিলুম। উট্টি আমার কোলে বসে বসে নিশ্চিন্তে গজা খাচ্ছে। আমি যে ভয়ে পালাচ্ছি, সে আর জানবে কেমন করে!

আমার পা যেন চলতে চাইছিল না। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি ধরা পড়লুম। আমি জানি, বাবুটি যদি আজই এসে থাকে, তবে মারদাঙ্গার খবরটা তার জানাই আছে। অবিশ্যি আমি যে উট্টিকে নিয়ে এখানে পালিয়ে এসেছি, এ-খবরটা তার না-ও জানা থাকতে পারে। কিন্তু সে যদি দেখে ফেলে, তা হলে সব ফাঁস হয়ে যাবে। সুতরাং আমি তখন প্রায় ছুটতে ছুটতে হাঁটতে লাগলুম।

উফ! আর পারছি না বাবা। দু’দিন ধরে ভয়ংকর বিপদ নিয়ে চলতে চলতে ধ্বস্ত হয়ে গেল শরীরটা। আর দম নেই। এই সময় একটু যদি জিরিয়ে নিতে পারতুম। কী মনে হল, চট করে একবার পিছু ফিরে পেছনটা দেখে নিলুম। অনেক লোক। কোন ফাঁকে সেই বাবুটি আছেন, তা আর আমার নজরে পড়ল না। আমি দাঁড়ালুম। ভাল করে দেখলুম। কিন্তু তাকে দেখতেই পেলুম না। তাকে দেখতে না পেয়ে, আমার যে কী হল, আমি পাগলের মতো ছুটতে শুরু করে দিলুম। ডাক্তারখানা আমার মাথায় উঠল এখন পালাতে পারলেই বাঁচি। আমি বুঝতে পেরেছি, সামনেই বিপদ। কিন্তু কোথায় পালাই, কোনদিকে!

“ইস্টিশান! ইস্টিশান!” একটা এক্কাগাড়ির কোচোয়ান হাঁকতে হাঁকতে ছুটে যাচ্ছে। আমার মাথায় বুদ্ধি এসে গেল। হ্যাঁ, ঠিক ঠিক আবার ইস্টিশানে গিয়ে রেলগাড়ি করেই পালাব। আমি কোচোয়ানকে জিজ্ঞেস করলুম, “ইস্টিশান যেতে কত নেবে?”

“এক টাকা।”

“চলো।” আমি উট্টিকে নিয়ে তড়বড় করে গাড়িতে উঠে পড়লুম। তারপর ফিরে এলুম আবার সেই ইস্টিশানে।

কখন ট্রেন আসবে, আমার জানা নেই। দেখলুম লোকজনও কম। এখনই কোনও গাড়ি আসার লক্ষণও দেখতে পাচ্ছি না। কাজেই মনে হচ্ছে আমাকে অপেক্ষা করতে হবে। এখন অবশ্য আমার উত্তেজনা অনেকটা কম। ভাবনাও তেমন নেই। সঙ্গে পাঁচশো টাকা আছে! না-খেয়ে শুকিয়ে মরতে হবে না। এখন খাওয়ার কথা থাক। আগে বিপদ থেকে রক্ষা পাই, তারপর অন্য কথা। আগে যে গাছটার নীচে আমি বসে ছিলুম, ঠিক সেই গাছেরই ছায়ায় এসে বসলুম। এখানেই সেই বান্দা নামে ছেলেটির সঙ্গে আমার প্রথম দেখা হয়েছিল। এখান থেকেই সে উট্টিকে নিয়ে ডাক্তারখানায় ছুটেছিল। ছেলেটি গরিব, কিন্তু নির্দয় নয়। আমাদের জন্যে বেচারি কী না করেছে। আর শেষকালে আমাদের জন্যেই এই শীতে খোলা আকাশের নীচে শুয়ে জ্বরে পড়ল। আহা! না-জানি এখন কী করছে ছেলেটা! জ্বর যদি বাড়ে! কে দেখবে তাকে!

ভাবতে ভাবতে চমকে উঠলুম। ছিঃ, ছিঃ! আমার বিপদে যে আমাকে দেখল, তার বিপদের সময় তাকে আমি ফেলে পালাচ্ছি! কী স্বার্থপর আমি। আমার ভেতরটা হু হু করে জ্বলে উঠল। আমি কিছুতেই আর স্থির থাকতে পারলুম না। নিমেষে উঠে দাঁড়ালুম। পা চালিয়ে বান্দার ঝুপড়ির দিকে হাঁটা দিলুম। এবারও উট্টি আমার কোলে বসে আমাকে অবাক হয়ে দেখতে লাগল।

ছেলেটির আস্তানা খুঁজতে আমায় বেশি মেহনত করতে হল না। পথটা চেনা। সামনেই তার ঝুপড়ি। পর্দা ঠেলে ঘরে ঢুকতে গিয়ে আমি থমকে দাঁড়িয়ে পড়লুম। কই বান্দা? কোথা গেল সে? ঘরে তো নেই! এই যে তাকে দেখে গেলুম জ্বরে সে ছটফট করছে! এ কখনওই হতে পারে না, এক্ষুনি এক্ষুনি সেরে উঠে সে ঘুরে ফিরে আমাদের খোঁজাখুঁজি করবে। তবে হ্যাঁ, আমিও বেরিয়েছি অনেকক্ষণ। আমাদের দেরি দেখে শেষকালে সত্যিই কি সে জ্বর গায়ে আমাদের খুঁজতে বেরোল! এখানে এসে এ যে আর এক দুশ্চিন্তা। এখন তো আমি বাইরে বেরিয়ে আর তাকে খুঁজতে পারব না। সুতরাং এই ঝুপড়ির মধ্যে বসে বসে আমি অপেক্ষা করতে লাগলুম।

অনেকক্ষণ হয়ে গেল। চোরের মতো বসে আছি। হ্যাঁ, যারা জানে না, তারা এখন আমাকে দেখলে তাই বলবে। কিন্তু আমি কি সত্যিই চোর! বিনা অপরাধে আমাদের ঘরে যদি কেউ আগুন লাগিয়ে দেয়, আমাদের মারতে আসে তাদের হাত থেকে বাঁচার অধিকার কি আমাদের নেই! বাবুরা বুকের ভেতর যে প্রাণ নিয়ে বেঁচে থাকতে চায়, আমাদের বুকেও তো সেই প্রাণই আছে। নিজের প্রাণকে তো ভাল সবাই বাসে। তবে এত হানাহানি কেন?

“মাসি!”

আমি আঁতকে উঠেছি। এ যে বান্দা!

“কোথা গেছলে?” বান্দা জিজ্ঞেস করল।

আমি অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে রইলুম। তার হাতে খাবার। উট্টির জন্যে দুধ।

“আমায় দেখে অবাক হচ্ছ?” খাবার আর দুধের ভাঁড়টা রাখতে রাখতে সে বলল, “আমার জ্বর ছেড়ে গেছে। আমি ইস্টিশানে গেছলুম ট্রেন ধরতে। প্যাসেঞ্জার পেলুম, মাল বইলুম, তারপর রাস্তার এদিক ওদিক তোমাদের খুঁজলুম। দেখতে পেলুম না। ভাবলাম, এতক্ষণে ফিরেছ। তাই খাবার কিনে আনলুম।”

আমার চোখ ছলছল করে উঠল। আমার মনে হল, ছেলেটার বুকের ভেতরে একখানা এত বড় সোনার টুকরো জ্বলজ্বল করছে।

সে জিজ্ঞেস করল, “কী, অমন চুপচাপ কেন?”

আমি বলতে পারলুম না, “তোমার কাছে আমি হেরে গেছি বান্দা। তুমি আমার চেয়ে অনেক বড়। আমি কী স্বার্থপর, তোমার অসময়ে তোমাকে ফেলে আমি পালাচ্ছিলুম।”

“নাও, খেয়ে নাও।” খাবারের ঠোঙাটা আমার দিকে এগিয়ে দিল।

এবার আমি কথা না বলে আর থাকতে পারলুম না। বললুম, “বান্দা, তোমার জন্যে ওষুধ আনতে পারিনি।”

সে আচমকা হেসে উঠল হো-হো করে। “ওষুধ আনোনি ভালই করেছ। আমার এ-জ্বরে ওষুধ লাগে না। এ তো ভাল্লুকের জ্বর। কোঁ কোঁ করে কখন যে আসে আর কখন যে ছাড়ে, এতদিনে আমি নিজেও তা জানতে পারিনি।”

আমি বললুম, “না বাবা, এভাবে এই শীতের রাতে তোমাকে বাইরে ফেলে আমরা ভেতরে শুতে পারব না।”

সে আমার কথা যেন কানেই নিল না। বলল, “কই শীত? একে আবার শীত বলে! আমার গায়ে শীতই লাগে না। তবে তোমাদের যে খুব কষ্ট হচ্ছে, সেটা আমি বুঝতে পারছি। কী করব! তোমার ছেলের জন্যেও যদি একটা গরম জামা থাকত। আহা! বেচারি শীতে একেবারে কুঁকড়ে আছে।”

আমি এবার ছেলেটির মাথায় হাত দিলুম। আবদার করেই বললুম, “তুমি যদি কিছু মনে না করো, একটা কথা বলব?”

সে অবাক চোখে চাইল আমার মুখের দিকে। জিজ্ঞেস করল, “কী কথা?”

আমি বললুম, “আমার একটা চুড়ি বেচে দিয়েছি।”

সে যেন থতমত খেয়ে গেল।

“পাঁচশো টাকা পেয়েছি।”

সে চুপ করে রইল কিছুক্ষণ। কিছু হয়তো ভাবল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “হ্যাঁ, ঠিকই করেছ। আমি তো একটা অকর্মের ধাড়ি। না আছে ঘর, না আছে দোর। রোজগারও করতে পারি না, খেতেও পাই না। আমার কাছে থাকলে তোমারও দুর্দশা, তোমার ছেলেরও কষ্ট।”

আমি বললুম, “এ-টাকা তো আমি তোমার জন্যেই এনেছি।”

“আমার জন্যে!” সে অবাক হল, “তোমার গয়না বেচে আমার জন্যে এত টাকা? কী হবে?”

“তুমি মাল বওয়া ছেড়ে দাও বাবা। বড্ড কষ্ট তোমার। এই টাকা নিয়ে তুমি একটা এক্কাগাড়ি কেনো।”

ছেলেটা থাকতে পারল না। শব্দ করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “মাসি, তোমার একদম বুদ্ধি নেই। এই টাকায় এক্কাগাড়ি হয়? ওরে বাবা, এক্কাগাড়ি মানে তো হাজার হাজার টাকা।”

“কত হাজার?”

“অনেক, অনেক।”

“আমি যদি তোমাকে অনেক টাকাই দিই?”

সে চট করে আমার পা থেকে মাথা অবধি চোখটা বুলিয়ে নিয়ে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কোথায় পাবে?”

আমি বললুম, “আমার কাছে আরও গয়না আছে।”

“না...” সে চিৎকার করে উঠল। যেন ধমক দিল আমাকে। তারপর আর একটি কথাও তার মুখ দিয়ে বেরোল না। কেমন যেন নির্বাক হয়ে গেল। আমিও আর কোনও কথা বলতে পারলুম না। শুধু মনে মনে ভাবলুম, এখানে আমার থাকাটা আর মোটেই উচিত নয়। ও কষ্ট করে পয়সা উপায় করে আনবে আর আমি বসে বসে খাব, এ যেন কিছুতেই মন মানতে চাইছিল না। অথচ ছেলেটি আমার পয়সাও নেবে না। সুতরাং আর কথা না বাড়িয়ে আমিও চুপ করে গেলুম।

আমার মনের কথাটা সে বুঝতে পেরেছিল কি না কে জানে। চুপ থাকতে থাকতে হঠাৎ সে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “দেখেছ, খাবার পড়ে আছে যে! যাঃ! সব ঠান্ডা হয়ে গেল। নাও, নাও, খেয়ে নাও।” বলে সে উট্টির মুখে একটা মিঠাই দিতেই সে একেবারে গপগপ করে খেতে শুরু করে দিল। খেতে খেতে খিলখিল করে হাসতে লাগল। আর আমি বোকার মতো চেয়ে চেয়ে দেখতে লাগলুম।

আজ রাতটা কোনওরকমে কাটাতে পারলেই হয়। কাল তো চলেই যাব। একটু রাত হলে, এই জায়গাটাও বড় নির্জন হয়ে যায়। এমনিতেই ফাঁকা। তার ওপর শীতের হাওয়া। ছেলেটি বলল, “আজও আমি বাইরে শোব।”

আমি জানি আপত্তি করা মিছে। তবু কালকে তার জ্বরের কথা মনে হতে, আমার বুকের ভেতরটা থরথর করে উঠল। তাই না বলে পারলুম না, “আবার ঠান্ডা লেগে গেলে?”

“কিচ্ছু হবে না মাসি, কিচ্ছু হবে না।”

অবিশ্যি সে-রাতে আমায় আর ঘুমোতে হল না। তখন কত রাত জানি না। খুব বেশি হলে দশটা। বান্দা উট্টিকে নিয়ে বকবক করে আদর করছে। হাসছে আর এমন ভাঙা গলায় গান গাইছে যে, আমারই হাসি পাচ্ছিল। ঘরের এককোণে একটা ছোট্ট লম্ফ জ্বলছে। মাঝে মাঝে উত্তুরে হাওয়া ঘরে ঢুকে পড়ছে, আর লম্ফের শিখাটা তিরতির করে কেঁপে উঠছে। মনে হচ্ছিল, এই বুঝি গেল অন্ধকার হয়ে। আর সত্যি-সত্যিই হাওয়ার দাপটে একবার দপ করে নিবেও গেল লম্ফটা। আমি ধড়ফড় করে উঠে দাঁড়াতে ছেলেটি চেঁচিয়ে উঠল, “মাসি, নোড়ো না। দাঁড়াও, আমার কাছে দেশলাই আছে, জ্বেলে দিচ্ছি।” বলে ছেলেটি ঝপ করে দেশলাই জ্বালাল। ব্যাস! লম্ফতে সে দেশলাই ঠেকাতে হল না। কারণ আমি দেখতে পেলুম, সেই ঝুপড়ির ভেতর আমার সামনে একজন ইয়া পেল্লায় লোক। আমি আতঙ্কে চেঁচিয়ে উঠলুম, “কে?”

সঙ্গে সঙ্গে একেবারে বিদ্যুতের মতো একখানা হাত এসে আমার চুলের গোছাটা খামচে ধরল। চোখের পলকে বান্দাও সেই লোকটার ওপর চিৎকার করে ঝাঁপিয়ে পড়ল। কিন্তু হলে কী হবে, তারা দলে ছিল তিনজন। বান্দাকে তারা চ্যাংদোলা করে ধরে তুলোধোনা শুরু করে দিল। আমি চেঁচাচ্ছি, উট্টি কাঁদছে। কিন্তু কে কার ধার ধারে। তারা আমার কাছ থেকে সেই পাঁচশো টাকা ছিনিয়ে নিয়ে আমার হাত, পা, মুখ বেশ করে বেঁধে, ঘরের মধ্যে ফেলে চম্পট দিল।

পাঁচ

কী ভয়ংকর তুলকালাম কাণ্ড হয়ে গেল নিমেষে, এই ঝুপড়ির মধ্যে। যেন ঝড় উঠল, হঠাৎ প্রচণ্ডবেগে। মুহূর্তে সব তছনছ করে দিয়ে পালিয়ে গেল। ঝুপড়ির ভেতরটা অন্ধকার। জমাট। আমি বে-দম হয়ে হাঁফাচ্ছি। উট্টি তারস্বরে চেঁচাচ্ছে। বান্দাকে দেখতে পাচ্ছি না অন্ধকারে। আমাকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধেছে, না-পারছি উঠতে, না-পারছি কথা বলতে। মাটির ওপর পড়ে আছি, ছটফট করছি। আমি যে নিজের বাঁধন নিজে খুলব, সে উপায়ও নেই। অন্তত হাতের বাঁধনটাও যদি কোনওরকমে খুলে ফেলতে পারি। না, আপ্রাণ টানাটানি করেও, বাঁধনের ফাঁস এতটুকু আলগা করতে পারলুম না। অগত্যা কী করি, মাটির ওপর গড়াগড়ি শুরু করে দিলুম।

এমন সময়ে ফস করে একটা দেশলাই-কাঠি জ্বলে উঠল। চেয়ে দেখলুম, বান্দা দাঁড়িয়ে। হাতে দেশলাই-এর জ্বলন্ত কাঠি। আমাকে দেখতে পেয়েই সে আলোর কাঠিটা ছুড়ে ফেলে দিল। আলোর রোশনাই মিলিয়ে যাবার আগেই আমি স্পষ্ট দেখতে পেলুম ওর মুখখানা। মুখে রক্ত। বান্দা এগিয়ে এল আমার কাছে। আমার মুখের বাঁধনটা ঝটপট খুলে দিল। আমি কিছু বলার আগেই সে খুব চাপাস্বরে বলে উঠল, “একদম কথা বোলো না।” বলে সে অত্যন্ত ক্ষিপ্র হাতে আমার হাত আর পায়ের বাঁধনও খুলে দিল। আমি অন্ধকার হাতড়ে উট্টিকে কোলে তুলে নিলুম। বান্দার হাতে আবার দেশলাই জ্বলে উঠল। সে লম্ফটা জ্বালাল। লম্ফের আলোয় তার মুখখানা আরও স্পষ্ট দেখতে পেলুম আমি। দেখলুম, সত্যিই তার মুখ দিয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। চোখের নীচটা ভয়ংকর ফুলে গেছে। ভয় পেয়ে আমি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলুম তার মুখের দিকে চেয়ে। আমি কিছুই জিজ্ঞেস করতে পারলুম না। বান্দা আমায় অমন হতভম্বের মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে নিজেই কথা বলল, “মনে হচ্ছে, লোকগুলো চোর। হয়তো কোনওরকমে জানতে পেরেছে, তোমার কাছে টাকা আছে। মনে হয়, তুমি যখন চুড়িটা বিক্রি করে টাকা নিয়ে ফিরছিলে, তখন থেকেই তোমাকে চোখে চোখে রেখেছে। তোমার টাকাকড়ি, গয়নাগাটি সব বোধহয় কেড়ে নিয়ে গেল?”

আমি আড়ষ্ট গলায় উত্তর দিলুম, “না, আর সব আছে, শুধু টাকাটাই গেছে।”

বান্দা বলল, “ওরা যদি ডাকাত হত, শুধু টাকা নিয়ে ভাগত না। ঝেড়ে-মুছে সব নিয়ে যেত।” বলে, আমার কাছে এগিয়ে এসে বলল, “ও নিয়ে আর মন খারাপ কোরো না। কাল থেকে ডবল খাটব, ডবল টাকা হবে। আস্তে আস্তে তোমার সব টাকা আবার এনে দেব।”

আমি চুপ করে রইলুম।

সে-রাত্তিরে আর ঘুমোতে পারলুম না। ভীষণ আতঙ্কে সারারাত জুজুবুড়ি হয়ে বসে রইলুম। বান্দা ছটফট করে কখনও বাইরে যাচ্ছে, কখনও ঝুপড়ির ভেতরে ঢুকছে। মাঝে মাঝে আমার সামনে দাঁড়িয়ে পড়ছে। আমায় দেখছে। আর যখনই মনে হচ্ছে, তখনই বলছে, “শুয়ে পড়ো না মাসি! জেগে জেগে কষ্ট করছ কেন? আমি তো আছি।”

তোমরাই বলো, এই একটু আগে যে ধুন্ধুমার কাণ্ড ঘটে গেল, তারপর মানুষের চোখে ঘুম আসে কেমন করে? আবার যদি ওরা এসে পড়ে! এখনও তো আমার কাছে দুটো গয়না আছে। কেড়ে নিলে তখন আমি কী করব! যতই ভাবছি, ততই গায়ে কাঁটা দিচ্ছে। আমার এই শেষ সম্বলটুকু আমি যে কেমন করে রক্ষা করব, আমি তা তো জানি না। চোরের দল যদি আমার গয়না ছিনিয়ে নিতে চায়, আমি খানিক রুখে দাঁড়াতে পারি, বাধা দেবার শক্তি তো আমার নেই।

বসে বসেই সকাল হয়ে গেল। আমি অবশ্য অনেকক্ষণ থেকেই দেখছি, বান্দা ঘরে নেই। সেই যে ঘর বার করতে করতে কখন একবার ঝুপড়িতে আর ঢুকল না, তা আমি খেয়াল করতে পারছি না। কোথায় গেল, তা আমায় বলেও গেল না। সত্যি বলতে কী, এখানে আমার আর একদণ্ড থাকতে ইচ্ছে করছে না। পালাতে পারলেই বাঁচি। গেলেও আমি কি আর বান্দাকে না বলে যাব। এমন কাজ আমি কেমন করে করি। আমায় দেখতে না পেলে বেচারা বড্ড কষ্ট পাবে। যদিও আমি তার মা নই, তবু সে যে আমাকে তার মায়ের মতোই ভালবেসেছে।

“মাসি!”

হঠাৎ আমায় ডাক দিয়ে বান্দা ঘরে ঢুকল। আঘাত লেগে মুখখানা বেশ ফুলে আছে। তার ডাক শুনে মনে হল, সে যেন অন্য কোনও বিপদের কথা নিয়ে ঘরে এসেছে। আমি উদ্‌গ্রীব হয়ে ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলুম।

“চলো, এখান থেকে আমরা চলে যাই!” হঠাৎ ঢুকে সে হঠাৎই কথাটা বলল।

আমি তার কথা শুনে এবার কিন্তু একটুও ভয় পেলুম না। খুব সহজ গলায় জিজ্ঞেস করলুম, “কেন?”

সে বলল, “এখানে আর আমাদের থাকতে দেবে না। যার জায়গা আজই সে আমাদের ঝুপড়িটা ভেঙে দেবে। আর আমরা যদি না যাই, আমাদের মেরে বার করে দেবে।”

আমি দেখলুম, এখান থেকে আমার চলে যাবার এই সুযোগ। তাই বান্দাকে বললুম, “সেই ভাল। আমিও ভাবছি, উট্টিকে নিয়ে আজ আমিও অন্য কোথাও চলে যাব।”

সে যেন চমকে উঠল, “তুমি কোথায় যাবে?”

আমি বললুম, “দেখি।”

“আমায় ফেলে তুমি চলে যাবে?” তার গলায় যেন আর্তনাদ।

আমি থমকে গেলুম। তার মুখে ওই একটি কথা শুনে আমার মুখে আর কোনও কথা সরল না। আমি চকিতে তার মুখের দিকে তাকালুম। কিছুক্ষণ থমকে রইলুম তারপর অস্ফুটস্বরে জিজ্ঞেস করলুম, “তা ছাড়া আর তো কোনও উপায় দেখছি না বাবা। তোমার এই অসময়ে আমি তোমার কাছে থাকলে, তোমারই বিপদ। তোমার নিজেরই তো থাকবার জায়গা নেই বাবা।”

সে বলল, “আমায় এত বোকা ভাবছ কেন মাসি। আমি কি জায়গা না-দেখে তোমার কাছে এসেছি।”

“কোথায়?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করলুম আমি।

সে বলল, “মন্দিরে।”

“মন্দিরে!” ভয়ে আঁতকে উঠলুম আমি।

“হ্যাঁ, মন্দিরের লাগোয়া একটা জায়গা আছে। ওখানে গরিব লোকদের থাকতে দেয়।”

তার কথা শুনে আমার হাত-পা যেন ঠান্ডা হিম হয়ে গেল। মন্দির! আমাদের যে মন্দিরে ঢুকতে নেই, একথা তাকে বলি কেমন করে! বলি কেমন করে যে, আমরা জঞ্জাল সাফা করি। আমাদের ছোঁয় না কেউ!

কিন্তু না, সে-সব কথা তাকে বলতে পারলুম না। তাকে আমার নিজের আসল পরিচয়টা গোপন রেখে শুধু জিজ্ঞেস করলুম, “মন্দির কেন, অন্য কোথাও যাওয়া যায় না?”

সে খুব উৎসাহের সঙ্গেই বলল, “হ্যাঁ, ওখানে কি আর চিরদিন থাকব। অন্য কোথাও একটা জায়গা দেখে চলে যাব।” বলে সে আমায় তাড়া দিল, “চলো, চলো! আর দেরি করা ঠিক নয়।”

আমার যে তখন কী করুণ অবস্থা, কী বলব! ভয়ে কাঠ হয়ে গেছি। এ যে আমি আর-এক বিপদের মধ্যে জড়িয়ে পড়ছি। হঠাৎ একবার মনে হল, না, কিছু গোপন না করাই ভাল। সব কথা বান্দাকে বলেই দিই! আবার তার পরক্ষণেই নিজের ভেতরে নিজেই গুটিয়ে গেলুম। আমি কাঠের পুতুলের মতো নিঃসাড়ে ঝুপড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে ওর সঙ্গে পায়ে পায়ে মন্দিরেই চলে এলুম। বলতে লজ্জা নেই, তখন আমার মনে ভয়ংকর এক পাপের চিন্তা জুড়ে বসল। যেন এক অজানা অভিশাপের কালো ছায়া আমাকে ঘিরে ধরল। আমি জানি না এরপর আমার বরাতে আর কী আছে!

বান্দার সঙ্গে মন্দিরের ভেতরে ঢুকে একটা সুবিধামতো জায়গা খুঁজে, নিশ্চিন্তে বসে পড়লুম। মন্দিরের এই জায়গাটায় আরও অনেক লোক আস্তানা গেড়েছে। তা ঠিক, এদের দেখলে কেউ বলবে না, বেশ সুখে-স্বাচ্ছন্দ্যে এদের দিন চলে যায়। দেখলেই বুঝবে, দুর্দশাগ্রস্ত একদল মানুষ তোমার আশেপাশে সংসার পেতেছে। এদের সঙ্গে এখানেই থাকতে হবে। তা আর কী করা! এখন আমার যা ছিরি, কেউ আমাকে দেখলে কখনই ভাবতে পারবে না, আমার কাছে সোনা আছে, গয়না আছে। তা সে না ভাবাই ভাল।

“তা হলে মাসি, তুমি উট্টিকে নিয়ে এখানে একটু বোসো। আমি একবার ইস্টিশানটা ঘুরে আসি। গাড়ি আসবার সময় হয়ে গেল। দেখি প্যাসেঞ্জার পাই কি না। পেলে আসবার সময় খাবার কিনে আনব।” বলে বান্দা আমাকে সেখানে একলা রেখে চলে গেল। আমি অবশ্য বলতে ভুললুম না, “তাড়াতাড়ি এসো বাবা।”

ভারী কষ্ট লাগছিল বান্দার কথা ভেবে। কালকে রাত্তিরের সেই বেদম মারের চিহ্নগুলো তার মুখে চোখে এখনও দগদগ করছে। কাল ও যতটা হাসিখুশি ছিল, আজ যেন তা ফুরিয়ে গেছে। বুঝতে পারছি, তার কষ্ট হচ্ছে। তা হলেই বা কী। একটু যে বিশ্রাম করবে, সে ছেলে বান্দা নয়। আমার কথা শুনতে তার বয়েই গেছে।

মন্দিরে লোকের আনাগোনার কামাই নেই। আমি অবশ্য এখনও জানি না, এ মন্দিরে কোন দেবতা অধিষ্ঠান করছেন! কাউকে গায়ে পড়ে জিজ্ঞেস না করাই ভাল। তুমি একটা কথা জিজ্ঞেস করলে সে তোমাকে হয়তো জিজ্ঞেস করে বসবে হাজারটা কথা। কী দরকার বাবা! তার চেয়ে বরং যেমন আছি, তেমনই ভাল। বান্দা আসুক, তারপর তাকেই না হয় জিজ্ঞেস করা যাবে।

হঠাৎ উট্টি কেঁদে উঠল। অনেকক্ষণ থেকেই ছেলেটা ঘ্যানর ঘ্যানর করছিল, আমিও অনেকক্ষণ ধরে এটা-ওটা বলেকয়ে ভুলিয়ে ভালিয়ে রাখছিলুম। এখন এমন প্যাঁ ধরল যে, কার সাধ্যি তাকে সামলায়। তা আর দোষ দেব কী বেচারিকে। সকাল থেকে নির্জলা উপোস করে আছে। কাঁদবেই তো!

তা কাঁদুক। যত পারে কাঁদুক। কিন্তু ঠিক এই সময়ে না-কাঁদলে কী তার চলত না! আমি যে বিপদে পড়লুম। আমি যতই আদর করছি, ওর কান্না ততই বাড়ছে। আর আমারও বিপদ ঘনিয়ে আসছে। ওই দ্যাখো সবাই কেমন আমার দিকে চেয়ে চেয়ে দেখছে। বুঝতে পারছি, খুবই বিরক্ত হচ্ছে তারা উট্টির চিৎকারে। একজন তো তেড়েই উঠল, “বাইরে নিয়ে যা, বাইরে নিয়ে যা। কান একেবারে ঝালাপালা করে দিল। যত্তোসব!”

কথা শুনে রাগে আমার গা রিরি করে উঠল। মনে হল, দিই শুনিয়ে দু’-চারটে কথা। বলি, তোমরাই বা কোথাকার কে লাটসাহেব। এটা কি কারও কেনা জায়গা! কিন্তু না, ওসব কথা বলার দরকার কী বাবা। এখন বাঁচার তাগিদেই আমাকে বোবা হয়ে থাকতে হবে। অবিশ্যি উট্টিকে নিয়ে আমি সেখান থেকে উঠে মন্দিরের সামনে চলে এলুম। ছেলেটা যদি পাঁচজনকে দেখে কান্না ভোলে। কিন্তু উট্টি নাছোড়বান্দা। উঃ! কান ফাটিয়ে দিলে। কী বিচ্ছু ছেলে রে বাবা। আমি কোথায় নিজের জ্বালায় মরছি, ছেলে দ্যাখো না, ততই যেন পেয়ে বসেছে। এত রাগ ধরছে! মনে হচ্ছে, দিই ঠাস করে চড়িয়ে।

“আরে সরস্বতী না?”

আচমকা কে যেন আমাকে ডাকল। ফিরে তাকাতেই আমার হাত-পা পেটের মধ্যে সেঁধিয়ে গেছে। আমাদের গ্রামের সেই বাবুটি। যাকে দেখে আমি রাস্তায় মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছিলুম। এখন একেবারে আমার পেছনে দাঁড়িয়ে।

“তুই এখানে? কী ভয়ানক কাণ্ড, তুই মন্দিরে ঢুকেছিস!” আমাকে মন্দিরে দেখে তার মাথার ওপর যেন আকাশ ভেঙে পড়েছে!

আমি ব্যাকুল হয়ে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলুম একটু দয়ার জন্যে। কিন্তু সে আমাকে দয়া করল না। উলটে চেঁচামেচি শুরু করে দিল, “ডাইনি, গ্রাম থেকে এই ছেলেটাকে চুরি করে এনে এখানে লুকিয়ে বসে আছিস?”

দেখতে দেখতে একজন, দু’জন করে লোক জমতে শুরু করল। একজন জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে মশাই?”

“আরে মশাই, এ মেয়েটা জঞ্জাল সাফা করে। এই ছেলেটাকে চুরি করে এনে মন্দিরে লুকিয়ে আছে। ছোঁয়াছুঁয়ি করে সব নষ্ট করে দিল।”

ততক্ষণে অনেক লোক জমে গেছে। অমনই শুরু হয়ে গেল “মার মার, কাট কাট।” তবে সবই হচ্ছে ওই আমার থেকে সাত হাত দূরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে। কেন না, আমাকে তো কেউ ছোঁবে না। ছুঁলেই যে গঙ্গা জলে চান করতে হবে। কিন্তু ওরই মধ্যে একজন বীরপুরুষ ঝট করে একটা ইট তুলে ধাঁই করে ছুড়ে মারল আমাকে! আঃ! আমি যন্ত্রণায় চিৎকার করে উঠেছি। কিন্তু বুঝতে পেরেছি, আর আমার নিস্তার নেই। ওরা আমায় মেরেই ফেলবে। সুতরাং বাঁচতে হলে আমায় পালাতে হবে। তাই আর মুহূর্ত না-দাঁড়িয়ে আমি ঊর্ধ্বশ্বাসে ছোটা দিলুম। ছুটতে ছুটতে মন্দিরের ফটক ডিঙিয়ে আমি রাস্তায় পড়লুম। তখন তো লোকে লোকে লোকারণ্য। আমি পালাব কোথা দিয়ে? তবু, যা হোক করে ওই ভিড় ঠেলেই আমি ছুটলুম। কিন্তু ছুটলে কী হবে! পেছনে ওই বীরের দল। তাদের সবার হাতেই ইট। তোলে আর আমার দিকে ছোড়ে। আমি যেন শেয়াল কুকুরেরও অধম। ইট মেরে তাড়িয়ে তাড়িয়ে আমাকে শেষ করে ফেলতে চায়। তারা ইট মারে, চিৎকার করে, আর ডাক ছাড়ে “চোর, চোর।” আমার গায়ে ইট লাগুক। তবু ভাল। কিন্তু উট্টির না লাগে। আমি ছেলেটাকে সামলাই। কোনদিকে যে পালাচ্ছি সে আমার জানা নেই। ছুটছি আর ছুটছি।

কিন্তু অতজনের সঙ্গে আমি আর কতক্ষণ পারব? একটা ইট এসে লাগল আমার মাথায়। সমস্ত শরীর যেন থরথর করে উঠল। পড়ে গেলুম হোঁচট খেয়ে। উট্টিও পড়ল মুখ থুবড়ে। তারপর আর কিছুই জানি না। কারণ তখন আর জ্ঞান ছিল না আমার।

আমি বলতে পারব না কতক্ষণ পর, হয়তো অনেকক্ষণ পর, আমি চোখ চেয়েছিলুম। মনে হচ্ছে, বড্ড আবছা হয়ে আছে চারদিক। তারপর ধীরে ধীরে আমার চোখে স্বচ্ছ হয়ে উঠছে আলো। আমি এবার স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি আমার চারপাশটা। দেখতে পাচ্ছি, আমার চারপাশে একটি জনপ্রাণীও নেই। দেখলুম, আমি একটা নির্জন জায়গায় পড়ে আছি। চারদিকে রক্ত। আমার শরীর থেকে গড়িয়ে পড়ছে। আঃ! বড্ড ব্যথা, ভারী যন্ত্রণা আমার সারা শরীরে। আমি ক’বার চেষ্টা করে অনেক কষ্টে উঠে বসলুম। বসতে না বসতেই ছ্যাঁত করে উঠেছে বুকের ভেতরটা। উট্টি কই? আমি ধড়ফড়িয়ে দাঁড়াতে গেছি, পারিনি। তারপরেই সামনে চেয়ে থমকে গেছি। দূরে দাঁড়িয়ে আছে বান্দা। তার কোলে উট্টি। সে মুখখানা ভারী গম্ভীর করে আমার দিকে এগিয়ে আসছে। তবে কি বান্দাও সব জেনে ফেলেছে। সেও কি আমাকে মারবে?

না, সে মারল না। সে আমার কাছাকাছি এগিয়ে এসে কঠিন গলায় জিজ্ঞেস করল, “এ ছেলে কার?”

আমি হকচকিয়ে গেছি। আমি যা সন্দেহ করেছি, তাই কী সত্যি হল! বান্দা কি আমার সব কথা জেনে ফেলেছে! হ্যাঁ, হ্যাঁ, নিশ্চয়ই জেনেছে। নইলে...

“এ ছেলে কার?” এবার সে আরও কঠোর।

আমি দেখলুম, আর তো আমার কিছু গোপন করার মানে হয় না। আমি কাতরস্বরে উত্তর দিলুম, “আমি তোমাকে সত্যিকথা বলিনি বাবা।”

“তুমি উট্টিকে চুরি করে এনেছ?” সে দৃঢ় গলায় জিজ্ঞেস করল।

আমি কেঁদে ফেললুম। আমি বুঝতে পারলুম, আমার আর কোনও কথাই বলার নেই। বললেও কেউ বিশ্বাস করবে না। তাই বান্দাকে নিজের কথাটা বলার জন্যে আমার সব চেষ্টা উজাড় করে আমি উঠে দাঁড়ালুম। তার চোখে চোখ রেখে বললুম, “বাবা আমরা জঞ্জাল সাফা করি। আমাদের কেউ ছোঁয় না। একমুঠো খাবারের জন্যে বাবুদের কাছে ভিক্ষে করতে গেছলুম বলে বাবুরা আমাদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দিয়েছিল। সেই আগুনে উট্টির বাবা আর মা-ও হয়তো শেষ হয়ে গেছে। আমি ছেলেটার প্রাণ বাঁচাব বলে কোনওরকমে নিজের প্রাণ বাঁচিয়ে পালিয়ে এসেছি। এ যদি চুরি করা হয়, তবে আমি নিশ্চয়ই চোর।”

বান্দা আমার কথা শুনে, কেমন যেন হতভম্বের মতো অপলকে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর দেখলুম মুখখানা যেন তার রাগে ফুলে উঠছে। চোখের দৃষ্টিতে প্রতিহিংসা। আমি তার চোখের দিকে আর তাকাতে পারলুম না। চোখ ফিরিয়ে হাঁটা দিলুম।

সে গম্ভীর স্বরে চেঁচিয়ে উঠল, “কোথা যাচ্ছ?”

আমি বললুম, “জানি না।” বলে তার দিকে ফিরে দাঁড়ালুম।

সে বলল, “তুমি যেতে পারবে না।”

আমি বললুম, “আর না গিয়ে যে উপায় নেই আমার।”

“না”, সে যেন আর্তনাদ করে উঠল, “আমাকে ছেড়ে তুমি যেতে পারবে না।”

“আমি যে চোর।”

সে কেমন যেন বিহ্বল চোখে তাকাল আমার দিকে। আমি তার মুখ থেকে চোখ সরিয়ে যেই হাঁটা দিয়েছি, কোথাও কিচ্ছু নেই, উট্টি চেঁচিয়ে উঠল, “তিত্তি।” বান্দার কোল থেকে নেমে সে টলতে টলতে আমার কাছে এসে আমার কাপড়ের আঁচলটা তার ছোট্ট মুঠি দিয়ে আঁকড়ে ধরল। আমি আবার ঘুরে দাঁড়িয়েছি। এবার সে তার ছোট্ট হাতদুটি আমার দিকে তুলে আর একবার ডাকল, “তিত্তি।” ভারী নরম আদর-মেশানো সেই স্বর।

আমি থাকতে পারিনি। উট্টিকে কোলে তুলে আবার ফিরে গেছি বান্দার কাছে। ওর মুখের দিকে চাইতেই দেখি, মুখখানি তার আবছা হাসির আড়ালে লুকিয়ে আছে। কিন্তু চোখদুটি তার অশ্রুর ফোঁটায় টলমল করছে। সে তার শীর্ণ একটি হাত আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। তারপর কান্না ভেজা গলায় আকুল হয়ে বলল, “তুমি আমার মা।”

আমি নির্বাক হয়ে চেয়ে রইলুম তার দিকে এই একটি কথা শুনে। তারপর তার সেই শীর্ণ হাতটি ধরে আকাশের দিকে তাকালুম। দেখলুম, আলোয় ভরে আছে আকাশ, নতুন দিনের আলোয়। সে আলো ভারী উজ্জ্বল, ভারী সুন্দর।

______

অধ্যায় ১১৪ / ১১৪
সকল অধ্যায়
১.
কাক্কাবোক্কার বিয়ের পদ্য
২.
ইতিমিচিসাহেবের স্বপ্নের গাধা
৩.
কাক্কাবোক্কার টোক্কা ফক্কা
৪.
কাক্কাবোক্কার কান্নাকাটি
৫.
কাক্কাবোক্কার গানের জলসা
৬.
ইতিমিচিসাহেবের ছাগলি-মা
৭.
কাক্কাবোক্কার বায়নাক্কা
৮.
কাক্কাবোক্কার ঘাড়ে ভূত
৯.
পিঠ নিয়ে পিঠোপিঠি
১০.
কাক্কাবোক্কার কাণ্ড বটে
১১.
গল্পের নাম ফিক
১২.
কাক্কাবোক্কার ভুতুড়ে কাণ্ড
১৩.
ইতিমিচিসাহেবের ঘোড়া
১৪.
রাজা বাপ্পাহুহুর দাড়ি
১৫.
ছি ছি, এ কী কাণ্ড
১৬.
ইতিমিচিসাহেবের নাচানাচি কাণ্ড
১৭.
আচ্ছা আজব ইচ্ছে বটে
১৮.
রগড় নিয়ে কাণ্ড জবর
১৯.
ইতিমিচিসাহেবের আম্মা বিল্লি
২০.
ভগবানের হাত
২১.
তাক্কাদুম
২২.
চ্যাং ঝোলা
২৩.
স্বপ্ন দেখি রূপকথায়
২৪.
দস্যি সেই ছেলেটি
২৫.
পাখিমের আকাশ
২৬.
সোনা-ঝুরঝুর হাসি
২৭.
ছুম আর ছবি
২৮.
টুক্‌কির ফুলবাগানে
২৯.
চাঁদ আর পাপুই
৩০.
কালো বেড়ালের গুপ্তধন
৩১.
মায়ের সোনা ছেলে আফজল
৩২.
এক বুড়ো আর একটি পাখি
৩৩.
আজবদেশের নাচন-পাখি
৩৪.
একলা ডিঙি যখন একা
৩৫.
সেই যে আলো নীল
৩৬.
আকাশের দুই বন্ধু
৩৭.
তিনটে বুড়োর গল্প
৩৮.
ভেলকির নাম ঘোড়া
৩৯.
বন্ধুর নাম কাকের ছানা
৪০.
টুং-এর বন্ধু ঝুমঝুমি
৪১.
উড়ুক্কু ভূত
৪২.
ঘণ্টা বাজে টুংটাং
৪৩.
সময়ের জাদুখেলা
৪৪.
আমি শূন্য
৪৫.
কেউ জানে না কে চোর
৪৬.
একটি মেয়ের গল্প
৪৭.
শুধুই গল্প অদ্ভুতুড়ে
৪৮.
আলোর সন্ধান
৪৯.
সোনার ঘণ্টা
৫০.
সে এক ভেলকি
৫১.
সুন্দর যাকে বলি
৫২.
সর্দার
৫৩.
বেড়াল-বাঁদর-গাধা আর লোকটা
৫৪.
রুমঝুম নূপুরের রূপকথা
৫৫.
হো-বুড়োর খুদে বন্ধু
৫৬.
ভালবাসি পশুপাখি
৫৭.
বুক্কুটা তা বলে বোক্কা নয়
৫৮.
ছোট্ট পাখি আর কেঁদো বাঘ
৫৯.
যার যা সাজে না
৬০.
কানকাটা বাঘ
৬১.
একটা গান শেখাবে
৬২.
হ্যাংলা
৬৩.
কুক্কু আর হাঁসছানা
৬৪.
ছোট্ট পাখি টুনটুন
৬৫.
ছাগল-বুড়োর মামা
৬৬.
চাচার গানে নাচানাচি
৬৭.
একটা ছিল নেংটিছানা
৬৮.
টুক্কুর হাসি
৬৯.
হুম-চক্‌কা
৭০.
কাণ্ড বটে আজব
৭১.
পিড়িং-পিড়িং গঙ্গাফড়িং
৭২.
একটা বুদ্ধু নেংটি
৭৩.
বনমানুষ না ভালুক
৭৪.
তিড়িং-তিড়িং পাখিটা
৭৫.
কীসের থেকে কী
৭৬.
গল্পের রং রকম রকম
৭৭.
দাদু ভুলে গেছে
৭৮.
মুক্তো আছে কোন ঝিনুকে
৭৯.
নীল গোলাপের গল্প
৮০.
ডাকু
৮১.
অদ্ভুত সেই ঘোড়ার গল্প
৮২.
সে কী আনন্দের দিন
৮৩.
আলোর ভোর
৮৪.
রাংতা
৮৫.
মুক্তো-আঁকা
৮৬.
ইয়াসিনের চিঠি
৮৭.
গুড়িয়া
৮৮.
ছই একটি মেয়ের নাম
৮৯.
মায়ের জন্য একটি গোলাপ
৯০.
এই সুন্দর পৃথিবীতে
৯১.
স্বপ্নের ঝলমলে আলো
৯২.
সাগরের বন্ধু জানলা
৯৩.
রহস্য
৯৪.
ফিকির ভাবনা
৯৫.
নির্দোষ দুই বন্দি
৯৬.
রতন
৯৭.
রোদ ঝিলমিল
৯৮.
রহস্যের নাম সুন্দরী
৯৯.
ঝড়ের বনে আতঙ্ক
১০০.
কুয়াশার তিন সঙ্গী
১০১.
মায়ের ডাকা নামটি
১০২.
ভোরের আলো ফুটছে
১০৩.
ভালবাসার পৃথিবী
১০৪.
এ সময়ের গল্প
১০৫.
উত্তর পাইনি এখনও
১০৬.
অরুর বিকেল হারিয়ে গেল
১০৭.
মিষ্টি হাসির খেলনা
১০৮.
ম্যাজিক
১০৯.
বন্ধ ঘরে কান্নার শব্দ
১১০.
পাকা ধানের গন্ধ
১১১.
সেতুপারের বন্ধুরা
১১২.
সুলতান
১১৩.
তুসি জাদু জানে
১১৪.
তিত্তি

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%