শৈলেন ঘোষ

হঠাৎই একদিন দেখা গেছল ছেলেটাকে। হঠাৎই একদিন সে বলেছিল, তার নাম গুড়িয়া। হঠাৎই একদিন সে এই বটগাছটার ঝুরি বেয়ে ওপরে উঠেছিল। দোল খেতে খেতে বলেছিল, এ গাছটা আমার। ওই ওপর ডাল থেকে একটা ঝাঁপ দিয়ে মাটিতে পড়ে বলেছিল, এ জায়গাটা আমার। তারপর উড়ন্ত ডিগবাজি খেয়েছিল পর পর চারটে। সিধে হয়ে দাঁড়াল যখন দেখা গেল, তার মুখে একগাল হাসি। হাসির সঙ্গে দু’পাটি দাঁত বেরিয়ে পড়ল। অযত্নে ছ্যা-ছ্যা করছে। শুধু দাঁত কেন, দ্যাখো তার মাথার চুলগুলো! রুক্ষু। কপাল ছুঁয়ে চোখের ওপর ছড়িয়ে আছে। কী অদ্ভুত দেখতে লাগছে। চোখদুটো চুলের ফাঁকে লুকিয়ে লুকিয়ে মিটমিট করছে। ঠিক একটা খুদে শয়তান!
অবিশ্যি তোমাকে মানতেই হবে, ওই উড়ন্ত ডিগবাজি খাওয়াটা ভীষণ শক্ত। আমি বললুম আর তুমি এক-দুই-তিন বলে লাফিয়ে উঠলে, সেটি হচ্ছে না। দস্তুর মতো মাথার ঘাম পায়ে ফেলে শিখতে হয়েছে। জানি না কার কাছে শিখেছে সে। নাকি, ওকে শিখতে হয়নি, নিজে নিজেই পারে। এক-একজন তো না-শিখেই কেমন গান গায়। ঘুড়ি ওড়ায়। ফুটবল খেলে। আর এই ফুটবল খেলা নিয়েই সেদিন কী কাণ্ড হয়ে গেল। কী মারামারি। গুড়িয়া গাছে বসে বসেই খেলা দেখছিল। হঠাৎ গোলকিপার একটা বল ধরে এমন আনতাবড়ি মারল, সিধে এসে পড়ল গাছের ওপর। সটান গুড়িয়ার হাতে। হাতে পড়তেই গুড়িয়া গাছ থেকে লাফিয়ে বল নিয়ে দে চোঁ-চাঁ দৌড়। চেঁচাল, “আমি দেব না, আমি দেব না। আমার গাছের গায়ে লেগেছে। এখানে আমি বল খেলতে দেব না।”
পারবে কেন একা অতগুলো ছেলের সঙ্গে। ধরা পড়ল। মার খেল। তারা বলটা কেড়ে নিল। মারের চোটে চোখের পাশটা ফুলে ঢোল। রাগে ফোঁস ফোঁস করতে লাগল। এখন আর ফুঁসলে কী হবে, যা হবার সে তো হয়েই গেছে। কী দরকার ছিল তোমার গাজোয়ারি করার! তার মানে তোমার এ গুণটিও আছে! মানে তুমি গুন্ডামিও করতে পারো! ভাল!
কিন্তু ভাল কাকে বলছ? এখন অবস্থাটা মোটেই ভাল নয় গুড়িয়ার। যদি খুঁটিয়ে দ্যাখো, দেখবে তার চোখের পাশটিই শুধু নয়, সারা গায়ে ছিটেফোঁটা রক্তও লেগে আছে। তবু ভাল যে, হাড়গোড় ভাঙেনি। তবে কি এদেরই আদর করে বলে পথের শিশু? এদেরই বুঝি কেউ থাকে না? কিছু থাকে না? আচ্ছা বলো তো, কেন থাকে না? একটা ছোট্ট ঘর। মা। বাবা। একটা গল্পের বই। অনেক ছবি। একটা গান-শোনাবার বাজনা। চাবি ঘোরালেই বাজনা গেয়ে উঠবে, বাঁশ বাগানের মাথার ওপর…’।
মার খেতে খেতে গুড়িয়া মাটিতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল। এখন উঠে দাঁড়িয়েছে। জামা-প্যান্ট ঝাড়তে ঝাড়তে গজরাতে লাগল। গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে ও দেখতে লাগল ছেলেগুলোকে। বলটা মেরে-ধরে কেড়ে নিয়ে আবার খেলছে তারা। বিকেলের ভাঙা ভাঙা রোদের ছায়া গাছের পাতা গড়িয়ে ওর মুখে পড়েছে। চোখে তার আক্রোশের দৃষ্টি। ওদের কাউকে একা পেলে সে যেন ছিঁড়ে খায়, এখনই।
সূর্য ডুবছে। সন্ধে নামছে। আর খেলা যায় না। দল বেঁধে ওরা বেরিয়ে এল মাঠ থেকে। এই গাছের নীচ দিয়েই যাবে। চট করে লুকিয়ে পড়ল গুড়িয়া গাছের আড়ালে।
ওরা হল্লা করছে। যেমন সবাই করে খেলার শেষে।
গুড়িয়া আরও আড়াল খোঁজে।
গাছের ছায়া ডিঙিয়ে খেলোয়াড়ের দল এগিয়ে যায়।
এবার গুড়িয়াও নিঃসাড়ে ওদের পিছু নেয়। এবার দলটা ভাঙতে থাকে। যে-যার বাড়ির দিকে মুখ ফেরায়। কেউ যায় বাঁয়ে। কেউ যায় ডাইনে। শুধু একজন যায় একা, সামনে। তার হাতে বল। গুড়িয়া এবার পিছু নেয় তারই। গুড়িয়া আচমকা ধেয়ে যায় তার দিকে। চকিতে তার জামাটা খামচে ধরে মারে এক ধাক্কা। ছেলেটা ছিটকে পড়ে। বলটা ফসকে যায় হাত থেকে। গুড়িয়া লাফিয়ে পড়ে তার ঘাড়ের ওপর। লেগে যায় মারামারি।
তা, যখন খোলা-রাস্তায় মারামারি হচ্ছে, তখন লোক জুটতে কতক্ষণ! লোক জুটতেই মারামারিটা ফাটাফাটিতে গড়িয়ে গেল। পাঁচজনে হই-হই করে দু’জনকে দু’দিকে ভাগিয়ে দিল। গজগজ করতে করতে দু’জনেই দু’দিকে চলে গেল। অবিশ্যি জিতে গেল গুড়িয়াই। সে বলটা রাস্তা থেকে কুড়িয়ে নিয়েছে। নিয়েই পাঁই পাঁই করে ছুট দিয়ে হাওয়া। যখন সবাই জানতে পারল বলটা গুড়িয়ার নয়, তখন আর কে তার পাত্তা পায়। বল খুইয়ে ছেলেটা অগত্যা কাঁদো কাঁদো মুখে ঘরমুখো হল। আর গুড়িয়া? সে কি বলটা হাতিয়ে নিয়ে লুকিয়ে পড়ল?
না, মোটেই না। এইখানে সে বসেছিল। এই রাস্তায়, মস্ত বাড়িটার সামনে। এইখানেই বসে বসে হঠাৎ তার মনে হয়েছিল, সে কি গুন্ডা! গুন্ডারাই তো এমন কাণ্ড করে! এমন করে গায়ের জোর ফলিয়ে অন্যের জিনিস ছিনিয়ে নেয়! হঠাৎ তার মনটা ছিঃ ছিঃ করে উঠল। কী দরকার ছিল তার এমন মারামারি করে বলটা কেড়ে নেওয়ার! হয়তো এই কথাটাই সে অনেকক্ষণ ধরে ভেবেছিল। বুঝি মনে হল, এখনই সে বলটা ফেরত দিয়ে আসে। হায় রে, যার বল, তার বাড়িটা জানা থাকলে তবে তো ফেরত দেবে। তাকে এখন খুঁজবে কোথায়? রাস্তার আলোগুলো জ্বলে উঠেছে। রাত নামছে। এখন এই আলো-আঁধারিতে ছেলেটাকে কোথায়ই বা খুঁজে পাবে! এখন কাজকর্ম সেরে সবাই ঘরে ফিরছে। শুধু তারই ঘর নেই। তার ঘরে ফেরার তাড়াও নেই। তার ঘর হয় গাছতলা, না-হয় মস্ত বাড়ির গাড়ি-বারান্দার নীচে। শীতকালটাই যা একটু কষ্টের। অবিশ্যি গুড়িয়ার কিবা শীত, কিবা গ্রীষ্ম। সব সয়ে গেছে। শুধু সেই যেবার খুব শীত পড়েছিল, গুড়িয়া পর-পর তিনরাত্তির ঘুমোতে পারেনি। তবে একেবারেই যে ঘুমোয়নি, তা নয়। সকালে রোদ উঠলেই তার চোখ জড়িয়ে আসত। শীতের রোদ মানেই যেন আকাশ থেকে মায়ের আদর ছড়িয়ে পড়া। না, মাকে একদমই মনে করতে পারে না গুড়িয়া। মাকে কোনওদিন দেখেইনি, তা, মনে করবে কেমন করে। মাকেও না, বাবাকেও না। গুড়িয়া লোকের মুখে শুনেছে, সে যখন একদিন, না দু’দিনের তখন কারা যেন মায়ের কাছ থেকে ছিনিয়ে এনে তাকে আঁস্তাকুড়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিল। তিনটে কুকুর-মা তাকে বাঁচিয়েছিল। সেসব কথা এখন ভেবেই বা কী হবে। এখন বরঞ্চ ভাবা যাক, বলটা নিয়ে সে এবার কী করবে। সত্যিই, বলটার জন্যে তার মনটা ভীষণ আনচান করছিল। করলেই বা কী করা। নিজের বিপদ নিজে ডেকে আনলে আমরা কী করতে পারি। ঝক্কি তোমাকেই সামলাতে হবে।
ঝক্কি বলে ঝক্কি। সারারাত ঘুমোতে পারেনি গুড়িয়া। যখন চোখে একটু তন্দ্রা এল, তখন ভোর হয়ে গেছে। এখনই এখান থেকে পালাতে হবে। কোনও বাড়ির দোরগোড়ায় এমন একটা নোংরা-নোংরা ছেলেকে বসে থাকতে দেখলে, কে আর হাসিমুখে তোমায় খাতির করে ঘরে ডেকে নেবে! উলটে এমন তাড়া মারবে যে পালাবার পথ পাবে না। সুতরাং মানে মানে কেটে পড়াই ভাল।
আর দেরি করল না গুড়িয়া। তক্ষুনি সে হাঁটা দিল। কিন্তু সে কোথায় যাবে? কেন, যার সঙ্গে মারামারি করে বলটা হাতিয়েছে তাকে খুঁজে বার করতে হবে না? বলটা যে তাকে ফেরত দিতে হবে।
হাঁটতে হাঁটতে বেলা হয়ে গেল। ছেলেমেয়েরা ইস্কুল যাচ্ছে পিঠে ঝোলানো ব্যাগে বই নিয়ে। ও রোজই দ্যাখে এই দৃশ্য। রোজই গুড়িয়ার মনে হয়, ওদের সঙ্গে ইস্কুলের ভেতর ঢুকে পড়ে। ওদের পাশে বসে বসে দেখে আসে কী হয় সেখানে। ইস্কুল মানেই কি শুধু পিঠে ব্যাগ নিয়ে যাওয়া-আসা করা। না অন্যকিছু। অন্য কিছুটা কী, গুড়িয়া তা জানে না। কেউ তাকে বলেও দেয়নি সেকথা কোনওদিন।
কিন্তু কে জানে, আজ কেমন করে সে চলে এসেছে আনমনে ইস্কুলেরই সামনে। ইস্কুলের গেটে পাহারা দিচ্ছে দরোয়ান। ছেলেরা দলে দলে ঢুকছে। যার নজরে পড়ছে, সে আড়চোখে দেখছে। হয়তো দেখছে গুড়িয়াকে। নয়তো, দেখছে লোভের চোখে তার হাতের বলটাকে। সত্যিই, বল দেখলে কার না লোভ হয়। অবিশ্যি এখন তো খেলার সময় নয়। এখন পড়ার সময়। কাজেই লোভ হলেও উপায় নেই। এক্ষুনি ঘণ্টা পড়ে যাবে। শুরু হয়ে যাবে ক্লাস।

দেখতে দেখতে হঠাৎ অমন অস্থির হয়ে উঠল কেন গুড়িয়া। তার চোখদুটো ইস্কুলের গেট ডিঙিয়ে অমন উদ্গ্রীব হয়ে কী দেখছে ভেতরে। ওই শোনো আচমকা সে চেঁচিয়ে ডাক দিল। “এই-ই-ই! এই-ই-ই!”
কাকে ডাকছে?
গুড়িয়াকে চেঁচাতে দেখে দরোয়ান তেড়ে এল তার দিকে। ধমকে উঠল, “ভাগ!”
কিন্তু ‘ভাগ’ বলার আগেই দরোয়ানের হাতের ফাঁক দিয়ে গুড়িয়া ইস্কুলের ভেতরে ঢুকে পড়ল। ছুটতে লাগল। একে ধাক্কা মেরে, ওকে পাশ কাটিয়ে ছুটতে ছুটতে চেঁচাতে লাগল, “এই-ই তোর বল।” গুড়িয়া পেছন ফিরে একবারও দেখল না দরোয়ানও ছুটতে ছুটতে তাকে ধরতে আসছে।
দরোয়ান তাকে ধরার আগেই গুড়িয়া পৌঁছে গেছে সেই ছেলেটার কাছে। হ্যাঁ, হ্যাঁ, এরই সঙ্গে গুড়িয়া কাল মারামারি করেছিল। এরই কাছ থেকে সে বলটা কেড়ে নিয়েছিল। ছেলেটা পিছু ফিরতেই গুড়িয়া তার হাতে বলটা দিয়ে বলল, “তোর বল।”
বলটা তার হাতে তুলে দেবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে দরোয়ান খপাত করে গুড়িয়ার ঘাড়টা ধরে ফেলল। টেনে মারল এক থাপ্পড় গুড়িয়ার গালে। নিমেষে গুড়িয়ার চোখে অন্ধকার নেমে এল। তার মাথা ঘুরতে লাগল। তাকে হিড়হিড় করে টানতে টানতে গেটের বাইরে ঠেলে ফেলে দিল দরোয়ান। যা-নয় তা-ই বলে দরোয়ান চেঁচাতে লাগল। গুড়িয়া রাস্তার ওপর পড়ে পড়ে হাঁপাতে লাগল। একঝাঁক ছেলে গুড়িয়াকে দেখতে লাগল হুমড়ি খেয়ে।
আর উঠতে পারেনি গুড়িয়া। বুঝতে পারেনি তার চোখের নীচটা কেটে গেছে। রক্ত পড়ছে। সে জানতে পারেনি, একটা-একটা ঘণ্টা পড়ে ইস্কুলের শেষ ঘণ্টাটা কখন পড়েছিল। ছুটির আনন্দে হল্লা করতে করতে কখন যে ছেলের দল ইস্কুলের পড়া শেষ করে বাড়ি ফিরে গেছে, সেটাও সে জানে না।
আশ্চর্য সন্ধে হয়ে গেল তবু সে উঠল না। আকাশটার দিকে একবার তাকিয়ে দ্যাখো তো। সন্ধেরাতের একটা তারাও যেন আর দেখা যাচ্ছে না, মস্তবড় আকাশটার কোথাও। আকাশে কি মেঘ জমেছে? বলতে বলতেই বিদ্যুৎ চমকাল। মেঘ ডাকল। এখন কী হবে গুড়িয়ার? ও কি এখনও উঠতে পারছে না? বৃষ্টি নামলে গুড়িয়া কি তবে পড়ে পড়ে ভিজবে? কেউ কি নেই এখানে? একজনও? কেউ কি ওকে রাস্তা থেকে তুলে একটু আশ্রয় দেবে না?
না, রাস্তার এদিকে এখন কেউ ছিল না। থমথমে নির্জন চারদিক। শুধু ওই মেঘ আকাশের মুখ ঢেকে মাঝে মাঝে গর্জে উঠছে। কিন্তু দ্যাখো তো, ওই যেন কার মুখ বিদ্যুতের আলোয় ঝলসে উঠল। কে দাঁড়িয়ে আছে ইস্কুলের ভেতরে গেটের গরাদ ধরে? সে কি গুড়িয়ার দিকে তাকিয়ে আছে? এত কী ভাবছে মানুষটা তাকিয়ে তাকিয়ে। এত ভাববার কী আছে। দেখতে পাচ্ছে না ছেলেটা নিস্তেজ হয়ে পড়ে আছে রাস্তার ওপর। এখনই যদি বৃষ্টি নামে, ছেলেটা যে পড়ে পড়ে ভিজবে। ওই তো আবার বিদ্যুৎ চমকাল। আবার মেঘ ডাকল। বুঝি বাজ পড়ল। আকাশ মাটি একসঙ্গে থর থর করে কেঁপে উঠল। তবু লোকটা নড়ল না একচুল। যেন একটা পাথর। প্রাণ নেই।
বলতে বলতেই বৃষ্টি নামল তুমুলবেগে। পাথরের মূর্তির মতো যে-লোকটা এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল ইস্কুলের ভেতরে গেট ধরে, সে এবার নড়ে উঠল। সে ঠেলে খুলে ফেলল গেট। তিরবেগে বেরিয়ে এল ইস্কুল থেকে রাস্তায়। সে ছুটল গুড়িয়ার দিকে। তুলে নিল গুড়িয়াকে দু’হাত দিয়ে। ছুটল যেদিক থেকে এসেছিল সেইদিকে। ঢুকে গেল ইস্কুলের গেটে। পারল না গুড়িয়াকে বৃষ্টির ঝাপটা থেকে বাঁচাতে। দু’জনেই ভিজে ঢোল হয়ে গেল। সে ইস্কুলের গেটের পাশে তার ছোট্ট ঘরে ঢুকে পড়ল গুড়িয়াকে নিয়ে। মাটিতে শুইয়ে দিল। এতক্ষণ নিস্তেজ হয়ে পড়েছিল সে। এবার যেন তার হাতদুটো একটু দূলে উঠল। সে যেন উঠে বসতে চায়। পারে না। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। তারপর কাঁপতে থাকে। হয়তো ভয়ে। নয়তো ওই যে তার ছেঁড়া জামাটা ভিজে গেছে তারই ঠান্ডায়। লোকটা চটপট খুলে ফেলে গুড়িয়ার জামাটা। প্যান্টটা। মুছিয়ে দিল সারা গা। একটা চাদর জড়িয়ে দিল তার গায়ে। চটপট একটু দুধ গরম করে তাকে খাইয়ে দিল। সঙ্গে একটা মিঠাই। বোধ হয় আজই সে প্রথম দুধ মুখে দিল। কিন্তু যতক্ষণ না ঘরে আলো জ্বলল ততক্ষণ সে বুঝতে পারল না, লোকটা কে।
আলো জ্বলতেই তার বুকটা ধড়ফড় করে উঠেছে। গুড়িয়া ঠিক চিনতে পেরেছে, এ যে সেই ইস্কুলেরই দরোয়ান। এই দরোয়ানই মেরে তাকে রাস্তায় ঠেলে ফেলে দিয়েছিল। আঁকপাক করে উঠে বসতে গেল গুড়িয়া। পারল না। ভয়ে তার চোখ ছলছল করে উঠল। লোকটা কথা বলল এবার। খুব নরম গলায় জিজ্ঞেস করল, “তুই মারামারি করে বলটা কেড়ে নিয়েছিলি?”
গুড়িয়া কথা বলল না। তীক্ষ্ণ চোখে তাকাল দরোয়ানের দিকে।
তার চাউনি দেখে দরোয়ান বুঝতে পারল, বোধহয় কথাটা শুনতে ভাল লাগল না ছেলেটার। সঙ্গে সঙ্গে দরোয়ান অন্য কথা পাড়ল। বলল, “ভয় পাস না, আমি তোকে বাড়িতে পৌঁছে দেব। তোর বাবা-মা নিশ্চয়ই হন্যে হয়ে তোকে খোঁজাখুঁজি করছেন। কোথায় থাকিস?”
উত্তর দিল না গুড়িয়া। জোরে বৃষ্টি নামল।
“তুই ইস্কুলে পড়িস না?” জিজ্ঞেস করল দরোয়ান, “তোর নাম কী?”
তার মুখে কথাই সরল না।
হঠাৎ গুড়িয়ার গা থেকে খুলে-ফেলা জামাটার দিকে চোখ ফিরিয়ে দরোয়ান বলে বসল, “ভিখিরিও তোর মতো জামা গায়ে দেয় না। ছিঃ! কী দশা হয়েছে জামা-প্যান্টটার? তোর বাবা-মা দেখেনও না।”
চমকে উঠল গুড়িয়া। পারলে সে এখনই ছুড়ে ফেলে দিত জামাটা। কিন্তু সে শক্তি নেই তার। অথচ এখানেও তার একদণ্ড থাকতে ইচ্ছে করছে না। বৃষ্টিরও থামবার নাম নেই। ঝরেই চলেছে।
“বৃষ্টি না-থামলে পুলিশেই বা খবর দিই কী করে।” হঠাৎ বলে উঠল দরোয়ান, “তুই যখন কথা বলছিস না, তখন, যা করার তারাই করবে।”
“না-আ-আ-আ।” আমচকা চিৎকার করে উঠল গুড়িয়া। ধড়ফড় করে উঠে বসল। ভীষণ আতঙ্কে কাঁপতে কাঁপতে সে বলল, “না, আমি পুলিশের কাছে যাব না। আমায় ছেড়ে দাও। আমি একাই যেতে পারব।”
দরোয়ান-লোকটা গুড়িয়ার চিৎকার শুনে থতমত খেয়ে গেল। খানিক অবাক চোখে চেয়ে রইল গুড়িয়ার মুখের দিকে। তারপর জিজ্ঞেস করল, “পুলিশের নাম শুনে অমন আঁতকে উঠলি কেন? চুরি না-করলে কেউ পুলিশকে ভয় পায় না। মনে হচ্ছে তুই চোর। তোকে পুলিশেই দিতে হবে।”
কী বিপদেই না পড়ল গুড়িয়া। এ-বিপদ থেকে তার বাঁচার কোনওই রাস্তা নেই। বাইরে তুমুল বৃষ্টি। আর এই ঘরের ভেতরে ভয়ংকর কাঠখোট্টা এক দরোয়ান। আসলে গুড়িয়া এখন বন্দি তার হাতে। আর কিছু করার নেই গুড়িয়ার। তার ভাল-মন্দ সব এখন দরোয়ানের হাতে। এত কষ্টেও একটা সন্দেহ তার মনে বার বার উঁকি দিচ্ছে। আচ্ছা, লোকটা যদি এতই নিষ্ঠুর হয়, তবে তার কী দরকার ছিল তাকে রাস্তা থেকে তুলে আনার? কী দরকার ছিল মিঠাই আর দুধ খাওয়াবার? কার মনে যে কী আছে কে জানতে পারছে। আচ্ছা-আচ্ছা বুদ্ধিমান লোকও মানুষের মনের তল পেতে হিমশিম খেয়ে যায়, তো গুড়িয়া! ওতো এখন ছোট্ট।
“কীরে, কথা বলছিস না কেন?” দরোয়ান হঠাৎ জিজ্ঞেস করল।
উত্তর দিল না গুড়িয়া। যে তাকে চোর বলেছে, এখন তার মুখের দিকে তাকাতেও ইচ্ছে করছে না গুড়িয়ার। সে জোর করে চোখ টিপে শুয়ে রইল।
দরোয়ান আবার জিজ্ঞেস করল, “ঘুমিয়ে পড়লি নাকি?”
ঘুমের নাম শুনতেই তার মাথায় চট করে একটা দুষ্টুবুদ্ধি খেলে গেল। হ্যাঁ, ঘুম! সে ঘুমের ভান করেই পড়ে থাকল। বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে। এই বৃষ্টিতে সে তো গুড়িয়াকে পুলিশের কাছে নিয়ে যেতে পারছে না। বৃষ্টি যে এখনই থামল, তেমন লক্ষণও দেখা যাচ্ছে না। একটু পরে দরোয়ানও নিশ্চয়ই ঘুমিয়ে পড়বে। সেই ফাঁকে গুড়িয়াও দেবে চম্পট। বৃষ্টি পড়ে পড়ুক। সেই বৃষ্টিতে ভিজতে ভিজতেই সে পগার পার। সুতরাং মটকা মেরে পড়ে থাকল গুড়িয়া।
এ কী সর্বনাশ! গুড়িয়া চোখ বুজে পড়ে থাকতে থাকতে সত্যিই যে ঘুমিয়ে পড়ল। পড়বেই তো। ওই একটা ছোট্ট ছেলের সেই সকাল থেকে কম ধকল গেছে। ঘুমের আর দোষ কী। গুড়িয়া নিজেও কি বুঝতে পেরেছিল এমন দুষ্টুমি করে চোখ বুজে পড়ে থাকলে সে ঘুমিয়ে পড়বে। হ্যাঁ, ওই তো দ্যাখো, ঘুমে অচেতন হয়ে গেছে ছেলেটা। কেমন ফুসফুস করে নিশ্বেস পড়ছে তার। এরই নাম গভীর ঘুম। এরপর?
হঠাৎ ঘুম ভেঙে গেছল গুড়িয়ার। এ কী! এ যে সকাল! ফুটফুট করছে! তড়বড় করে উঠে পড়ল গুড়িয়া। বসে বসে জুলজুল করে এদিক ওদিক দেখতে লাগল। কাউকে দেখতে পেলে না। তাই তো দরোয়ানটা কোথায় গেল। যেমন করে সে তড়বড়িয়ে উঠে বসতে পারল, ঠিক তেমনই করে সে দাঁড়াতেও পারল। সে জানলা দিয়ে উঁকি মারল। আকাশে মেঘ নেই। কাজেই বৃষ্টিও নেই। দরজাটা ফাঁক করে বাইরেটা দেখল। কারও সাড়া পেল না। হঠাৎ তার মনে হল, দরোয়ান নিশ্চয়ই পুলিশ ডাকতে গেছে। অস্থির হয়ে উঠল গুড়িয়া। ঘর থেকে পালাবার ফন্দি আঁটতে লাগল। বেশি দেরি করলে যে তার বিপদ নিশ্চিত, একথাটা বুঝতে তাকে মাথা খাটাতে হল না। সামনেই পড়েছিল প্যান্টটা। এখনও ভিজে সপসপ করছে। চাদরটা গা থেকে সরিয়ে ভিজে প্যান্টটাই পরে ফেলল সে। জামাটা আর পরা যায় না। কাজেই সে খালি গায়েই ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ছুটে গেল গেটটার কাছে। গেটটা ঠেলে খুলতে গিয়েই চমকে গেল। গেটে তালা। যাঃ! কী হবে তা হলে! ইস্কুলের সারা চত্বরও উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা। গুড়িয়ার সাধ্যি কী এই পাঁচিল ডিঙোয়! ভয়ে কুঁকড়ে গেল গুড়িয়া। তার কোনও সন্দেহই নেই, দরোয়ান তাকে বন্দি করে পুলিশ ডাকতে গেছে। প্রাণের ভয়ে সে এদিক ওদিক ছুটোছুটি লাগিয়ে দিল। কিন্তু কোথাও পালাবার রাস্তা নেই।
হঠাৎ থতমত খেয়ে যায় গুড়িয়া। গেটের রেলিং-এর ফাঁক দিয়ে সে স্পষ্ট দেখতে পেল বাইরের রাস্তা দিয়ে দরোয়ান হনহন করে এদিকেই আসছে। তাকে দেখেই চোখের পলকে গুড়িয়া পাঁচিলের আড়ালে লুকিয়ে পড়ল। ভাল করে দেখতেও পেল না, সঙ্গে ক’জন পুলিশ আসছে। নাই দেখতে পাক। তার এখন বাঁচা নিয়েই কথা। সুতরাং পাঁচিলের আড়ালে সিটিয়ে লুকিয়ে থাকো।
বলতে বলতেই শোনা গেল গেটে তালা খোলার শব্দ। বলতে বলতেই গেট খুলে, তালাটা হাতে নিয়েই দরোয়ান ছুটল তার ঘরের দিকে। কিন্তু তার হাতে ওটা কীসের প্যাকেট। দেখা হল না ভাল করে। কেন না, দরোয়ান গেট খুলে ভেতরে ঢুকে, যেই ক’পা এগিয়েছে অমনই গুড়িয়া মারল ছুট। নিমেষে হাওয়া। এখন তাকে ছুটতে দেখলে কে বলবে, কাল সে নড়তেই পারছিল না।
দরোয়ান নিজের ঘরে ঢুকল হন্তদন্ত হয়ে। না, তার সঙ্গে কোনও পুলিশ ছিল না। সে একা। ঘরে ঢুকে সে হকচকিয়ে গেল। কোথায় গেল ছেলেটা! ঘর থেকে বেরিয়ে সে ইস্কুলের চত্বরটা অস্থির হয়ে দেখতে লাগল। দেখতে পেল না। ডাক দিল, “কোথায় গেলি রে!” সাড়া পেল না। ডাকতে ডাকতেই এধার-ওধার ঘুরে-ফিরে ছেলেটার খোঁজ করতে লাগল। খোঁজ করতে করতেই চেঁচিয়ে বলল, “এই দ্যাখ, তোর জন্যে কী এনেছি।” তবু সাড়া নেই। তাই তো! তবে কি ছেলেটা পালাল। দরোয়ান ছুটে গেল গেটের কাছে। বেরিয়ে এল রাস্তায়। কিন্তু এখন মিথ্যে খোঁজ করা। কবেই সে চোখের আড়ালে চলে গেছে ছুটতে ছুটতে। আর তাকে কে ধরবে।
দরোয়ান ফিরে এল নিজের ঘরে। কালকের সেই রাগি মানুষটাকে আজ আর চেনা যায় না। কোথায় গেল তার সেই মারমুখো মূর্তি? কেমন যেন দুঃখের ছায়ায় ঢেকে গেছে তার সারা মুখখানা। হাতের প্যাকেটটা সে খুলে ফেলল। প্যাকেটের ভেতর থেকে ও দুটো কী বার করল দরোয়ান? একটা প্যান্ট আর একটা জামা। নতুন। রং-ঝলমল। ছোট্ট। এইমাত্র সে কিনে আনল গুড়িয়ার জন্যে। কিন্তু হায় রে গুড়িয়া এখন কোথায়! সে বোধহয় এখনও তার সেই ভিজে, ছেঁড়া প্যান্টটা পরে ছুটছে রাস্তায় একলাটি। জানতেই পারল না ওই মস্ত চেহারার দরোয়ানের চোখদুটি ছলছল করছে তার জন্যে। আহা! কেন সে মারল ছেলেটাকে! কেন!

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন