শৈলেন ঘোষ

রাজা কাক্কাবোক্কা যখন অকাতরে ঘুমোন তখন যা দেখতে লাগে! সেই সময় যদি আবার ভোরের হাওয়া ফুরফুর করে বয়ে যায়, তা হলে তো আর কথাই নেই। শোবেন তিনি চিত হয়ে। নাক ডাকাবেন ভুরভুর করে। নিশ্বেসের তালে তালে পেটটি একবার উঠবে একবার নামবে। দেখলে হেসে মরে যাই।
তা দেখি না তোমার মুরোদ! একবার হাসো! রাজার যদি ঘুম ভেঙে যায়, আর তোমাকে হাসতে দ্যাখেন, ব্যাস, ঘটে যাবে মহাপ্রলয়। তোমার হাসা তো চুকে যাবেই, এমনকী প্রাণটিও যদি ফুস হয়ে যায়, কিছু বলার নেই। কে বলবে? যে বলবে সেও মরবে। শখ করে কে আর মরতে চায় বলো?
কেন, একবার তো হলও তাই। হল তো হল সেই মন্ত্রীমশায়ের ওপরই হল। তা ঠিক আছে, তুমি ঘুমোচ্ছ, নাক ডাকাচ্ছ, কি থেকে থেকে ঘুমের ঘোরে বিড়বিড় করছ, এসব দেখে না হয় নাই হাসলুম। কিন্তু তুমি যদি একটি বাছুরের পেছনে ছুটতে গিয়ে লাথি খাও! কিংবা ধরো লাথি খেয়ে চিতপটাং হয়ে ছিটকে পড়, তখন কে না হেসে থাকে শুনি! তার ওপর তুমি রাজা। তা, রাজা বাছুরের লাথি খাচ্ছে, ডিগবাজি মারছে, আর আমরা তাই দেখে প্যাঁচার মতো মুখ ভার করে বসে আছি, এমন কথা কে কবে শুনেছে! তুমি হয়তো শুনলে অবাক হবে, যে-বাছুরটির কথা বলছি, সেটি রাজার চোখের সম্মুখেই জন্মাল। রাজার পাশেই ছিলেন মন্ত্রীমশাই। তাঁকে কিছু না-বলেই রাজা ধরতে গেলেন বাছুরটিকে। কী আশ্চর্য, বাছুরটি সঙ্গে সঙ্গে তিড়িং-বিড়িং শুরু করে দিল! ব্যাটার নাকে পৃথিবীর নোংরা হাওয়া সেঁদুতেই, বাছুর চার পা তুলে নাচ জুড়ে দিল! শাবাশ! তা, বাছুর নাচছে নাচুক। তুমি রাজা! তুমিও তার সঙ্গে নাচানাচি শুরু করে দিলে কী বলে! ঘরে রাজলক্ষ্মী আছে। গাছে কাকপক্ষী আছে। পাশে মন্ত্রী-সান্ত্রি আছে। ছিঃ, ছিঃ, রাজার মান-সম্মান বলে তো একটা ‘ইয়ে’ আছে! তা তুমি সেসব কিচ্ছু মানবে না! তুমি কী বলে বাছুরের সঙ্গে নাচ! বলতে নেই, রাজাকে বাছুরের সঙ্গে নাচতে দেখে গোশালের লোকজন একটুও হাসেনি। অবিশ্যি তারা ভেতরে ভেতরে হাসছিল কি না, তা বাপু তাদের ভেতরে না ঢুকলে কে বলবে! কিন্তু রাজাকে বাছুরের লাথি খেতে দেখে মন্ত্রীমশাই আর থাকতে পারেননি। তার ওপর বাছুরের লাথির ধাক্কায় রাজামশাই যখন আছাড় খেলেন, তখন মন্ত্রীমশাই একেবারে অট্টহাস্য করে উঠলেন, হা-হা-হা!
ব্যাস! সেই হা-হা-হা থেকেই শুরু হয়ে গেল হাহাকার। সিপাই-সান্ত্রি ছুটল রাজাকে সামাল দিতে। দাস-দাসী ছুটল রানিকে খবর দিতে। পাত্র-মিত্র ছুটল রাজ-কবিরাজকে ডাক দিতে। সে এক হুলুস্থূল কাণ্ড! কিন্তু মন্ত্রীমশায়ের ‘হা-হা’ শুনে কোন ফাঁকে যে রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীর মুখের দিকে কটমট করে চোখের দৃষ্টি হানলেন, সে এক মন্ত্রীমশাই ছাড়া আর কেউ টের পেল না। রাজা কাক্কাবোক্কার সেই ভয়ংকর চক্ষু দেখেই মন্ত্রীমশায়ের রক্ত হিম। আর হাসি! এবার ফাঁসির হুকুম হল বলে!
খুব রক্ষে বলতে হবে। কপালের জোর না থাকলে এমন বিপদ থেকে মানুষ বাঁচে না। কেননা, অমন কটমট করে তাকিয়েই ঝপ করে চোখ বোজালেন রাজা কাক্কাবোক্কা। আসলে, তিনি যে শখ করে চোখ বোজালেন, তা যেন ভেবো না। তিনি মূৰ্ছা গেলেন। বাছুরের লাথি খেয়ে এক আছাড়েই রাজার কম্ম সারা। রাজার কাঁকাল ভাঙল, না ঘাড় মটকাল সেটা তৎক্ষণাৎ বলবার মতো কবরেজ তখনও সেখানে উপস্থিত হননি। তিনি হয়তো তখনও পথে ছুটছেন। সেই ফাঁকে রাজাকে চ্যাংদোলা করে ঝুলিয়ে আনা হল গোশাল থেকে তাঁর শয়নকক্ষে।
মন্ত্রীর তখন দুরু-দুরু বুক। মুখখানা তাঁর রোদে পোড়া শুঁটকি মাছের মতো চিমসে গেছে। তাঁর মনের ভেতরটা যতবারই ‘হে ভগবান, হা ভগবান’ করে কেঁদে উঠছিল, ততবারই তাঁর চোখের ওপর রাজা কাক্কাবোক্কার সেই কটমটে চাউনিটা ভেসে ভেসে উঁকি মারছিল। রাজা যদি অক্কা পান, তবে তিনি যে ভূত হয়ে মন্ত্রীমশায়ের ঘাড় মটকাবেন, এ কথাটা একজন উদোও জানে। তেমনই তিনি যদি চক্ষু কপালে না তোলেন, তবে মন্ত্রীমশাইকে যে মন্ত্রিত্ব খুইয়ে রাস্তায়-রাস্তায় ফ্যা ফ্যা করে ঘুরে বেড়াতে হবে, এটাও কারও অজানা নয়। এ হেন অবস্থায় রাজা কাক্কাবোক্কার মরা না বাঁচা, কোনটা উচিত, মন্ত্রীমশাই সেটা কিছুতেই ভেবে পাচ্ছিলেন না। তবে, বাছুরের লাথি খেয়ে একজন রাজা পটল তুলবেন, এটা কখনওই মেনে নেওয়া যায় না। বিশেষ করে রাজা যখন মানুষ। বাছুরের ঠ্যাং-এর ঠোক্করে রাজা নামের এই মানুষটি মরলে পৃথিবীতে অন্য রাজারা মুখ দেখাবেন কেমন করে! তবে কি মনে করতে হবে, মানুষের ক্ষমতার চেয়ে বাছুরের লাথির তাকত বেশি?
যাক গে যাক, সে যাই হোক, আনন্দের কথা হচ্ছে রাজা কাক্কাবোক্কা বেঁচে গেছেন। বোঝা গেল, তাঁর আঘাতটা তেমন গুরুতর নয়। কেননা, রাজা আপনা-আপনিই জ্ঞান ফিরে পেয়েছেন। আরও আনন্দের খবর হচ্ছে, তাঁর কোমর-কাঁকাল অটুট আছে! ভাঙা-ফাটার লক্ষণ নেই। এটাও একটা কম তাজ্জব ব্যাপার নয়। রাজা কাক্কাবোক্কার অতবড় দেহটা ধপাস করে পড়ল, অথচ ফটাস করে ফাটল না, এ যেন বিশ্বাসই করা যায় না। তবে রাজার জ্ঞান ফিরতে একটু সময় নিয়েছে। তা নিক। তিনি যে শেষ পর্যন্ত কথা কইতে পেরেছেন, এও কম কথা নয়!
জ্ঞান ফিরতে, প্রথমেই রাজা একটি ঢোঁক গিলে রানির মুখের দিকে চোখ ফেরালেন। রানি আঁকপাঁকিয়ে রাজার মুখের দিকে ঝুঁকে পড়তেই রাজা ফোঁস করে উঠলেন। মানে, নিশ্বাস ফেললেন। রানি চমকে উঠে ‘আউ’ করে ছিটকে গেলেন। রাজা তারপরই কথা কইলেন, “এখন কত রাত?”
রানি তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিয়ে উত্তর দিলেন, “আজ্ঞে রাত তো নয়, এখন দুপুর।”
রানির উত্তর শুনে রাজা অবাক-চোখে এদিক ওদিক তাকালেন। তারপর বললেন, “ছিঃ, ছিঃ, আজ আমি একদম ঘুমিয়ে পড়েছিলুম! বেলা দুপুর হয়ে গেল!”
রানি বললেন, “না রাজামশাই, আপনি ঘুমিয়ে পড়েননি, আপনি গড়িয়ে পড়েছিলেন।”
রাজা কাক্কাবোক্কা উত্তর দিলেন, “ওই হল, যাহা ঘুমানো, তাহাই গড়ানো।”
রানি ব্যস্ত হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনার বুকে পিঠে ব্যথা হয়নি তো?”
রাজা কাক্কাবোক্কা গোঁফভর্তি নাকের নীচটা দু’বার নাচিয়ে নিয়ে ঝপ করে উঠে বসলেন। বসেই তিনি ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন। কেননা, তিনি দেখলেন, একঘর লোক তাঁর দিকে উন্মুখ হয়ে চেয়ে আছে। দেখলেন পাত্রমিত্র, সভাসদ, সেনাপতি, সান্ত্রি-সেপাই সবাইকে। মন্ত্রীমশাই তো আছেনই। রাজা অস্ফুট স্বরে রানিকে জিজ্ঞেস করলেন, “কী ব্যাপার?”
রানি বললেন, “আপনাকে সবাই দেখতে এসেছেন।”
“কেন?”
রানি উত্তর দিলেন, “আজ্ঞে আপনি এঁদের রাজা। আপনি দুর্ঘটনায় পড়লে এঁরা তো দেখতে আসবেনই।”
“দুর্ঘটনা!” রাজা যেন আকাশ থেকে পড়লেন, “কীসের দুর্ঘটনা?”
মন্ত্রীমশাই ঝট করে এগিয়ে এসে বলে বসলেন, “আজ্ঞে আপনি বাছুরের লাথি খেয়ে এরই মধ্যে ভুলে গেলেন!”
আচ্ছা, কথাটা আগ বাড়িয়ে তোমার বলার কী দরকার ছিল। আরে বাবা কথা হচ্ছে রানির সঙ্গে রাজার, তোমায় কে ওস্তাদি করতে বলেছে! কপালে দুর্ভোগ থাকলে কে তাকে খণ্ডাবে! বাছুরের লাথি খাওয়ার কথাটা হয়তো রাজা ভুলেই যেতেন। হয়তো ভুলে যেতেন মন্ত্রীমশায়ের সেই হা-হা করে হাসির কথাটাও। এখন আবার সেই মন্ত্রীই খুঁচিয়ে ঘা করে বসলেন। রাজার চোখ আবার ঝলসে উঠল। কটমটিয়ে উঠল তাঁর চোখের দৃষ্টি। চোখ দিয়ে যেন আগুন ঠিকরোচ্ছে। সেই মূর্তি দেখেই তো আত্মারাম খাঁচাছাড়া! পালা, পালা! ঘরভর্তি লোক চোখের পলকে হাওয়া! মন্ত্রী-সান্ত্রি, সিপাই-সেনা যে যেখানে ছিল, মারল ছুট।
তাদের যেই না ছুটতে দেখা, অমনি রাজার চিৎকার, “পাকড়ো!” বলেই, ধপাস করে আবার বিছানায় গড়াগড়ি।
ঘরে তখন শুধু রানি একা। তিনি ব্যস্ত হলেন। রাজার কানের কাছে মুখ এনে আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “মহারাজ, আপনার কি আবার মূৰ্ছা-মূৰ্ছা লাগছে?”
“না-আ-আ!” চিলচেঁচিয়ে উঠলেন রাজা, “মন্ত্রীকে পাকড়ে আনতে বলো!”
তা, হুকুম বলে হুকুম, রাজার হুকুম। সঙ্গে সঙ্গে কাজ। অবশ্য মন্ত্রীকে পাকড়াতে হল না। রাজার হুকুম মন্ত্রীর কানে সেঁদুতেই তিনি নিজেই উপস্থিত। সেই সময় রাজার সামনে উপস্থিত হওয়া তো নয়, যেন জলহস্তীর মুখের গর্তে মুন্ডু পেতে দেওয়া। উপায় তো নেই। মন্ত্রীমশাই মাথা হেঁট করে রাজার সামনে দাঁড়ালেন। ঘন ঘন নিশ্বাস ফেলতে লাগলেন ভয়ে। তা এইরকম একজন বুড়ো মানুষকে অমন করে হাঁপাতে দেখে রানির নিজেরই এমন লজ্জা লজ্জা পাচ্ছিল যে, তিনি আর ঘরে থাকতে পারলেন না। পাছে মন্ত্রীমশাই তাঁর লজ্জাটা দেখে নিজে লজ্জা পান, তাই তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।
এই রে, এইবারেই বিপদ! তবু ঘরে একটা মানুষ ছিল। যদিও রানি মেয়েমানুষ, তবুও মানুষ তো বটে। রাজা উলটো পালটা কিছু বললে, রানি কি আর মন্ত্রীর হয়ে দু’-একটা কথা বলতেন না! নিশ্চয়ই বলতেন। কিন্তু এখন! হেঁট হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছাড়া আর কিচ্ছু করার নেই।
হঠাৎ রাজা কাক্কাবোক্কা মন্ত্রীকে খোঁচা মারলেন, “কী হল? বরের মতো মাথা হেঁট করে দাঁড়িয়ে রইলেন কেন? আর একবার হা-হা করে হাসুন!”
মন্ত্রীমশাই কথা বলতে সাহস করলেন না।
রাজা কাক্কাবোক্কা এবার গাঁক করে উঠলেন, “ভাবছেন, মুখে কুলুপ এঁটে দাঁড়িয়ে থাকলে পার পেয়ে যাবেন! বাছুরে আমায় লাথি মেরেছে, এবার আমি আপনাকে” পরের কথাটা বলতে গিয়েও তিনি বললেন না। কেননা, তাঁর মনে হল রাজার মুখে এমন কথা শোভা পায় না। তাই তিনি সঙ্গে সঙ্গে অন্য কথা পাড়লেন, “আমাকে বাছুরে লাথি মেরেছে, এ-কথাটা রানির সামনে কে আপনাকে বলতে বলেছিল? জানেন না, রানির সামনে এমত কথাবার্তা হলে রাজা-বাদশারা কতখানি অপমানিত বোধ করেন?”
মন্ত্রীমশাই এবার মাথা তুলে রাজার মুখের দিকে চাইলেন। চোখদুটি তাঁর পিটপিট করে উঠল। তিনি অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে বললেন, “আজ্ঞে তিনি তো আমাদের সকলের মহারানি। আমাদের সকলের মা।”
“আপনাদের সকলের মা হতে পারেন, কিন্তু তিনি তো আর আমার মা নন!” রাজা কড়কে উঠলেন। “তিনি মেয়েমানুষ। মেয়েমানুষের সামনে মুখ ফসকে যে কোনও কথা বলা উচিত নয়, এ-বুদ্ধিটা আপনার এখনও হল না!”
“কিন্তু মহারাজা, আপনি যে বাছুরের লাথি খেয়েছেন, এ-কথাটা তো মিথ্যে নয়।”
“চোপ!” চিৎকার করে ধমকে উঠলেন রাজা কাক্কাবোক্কা। “কে বলেছে আমি বাছুরের লাথি খেয়েছি! ডাহা মিথ্যে কথা।”
“আজ্ঞে রাজ্যসুদ্ধু সবাই জানে।” খুবই ভয়ে ভয়ে উত্তর দিলেন মন্ত্রী।
“সবাইটা জানল কেমন করে?” তেমনই তিরিক্ষি মেজাজে জিজ্ঞেস করলেন রাজা।
মন্ত্রী বললেন, “আজ্ঞে আপনি রাজা। এমন একটা ভয়ংকর ঘটনা সে কি চাপা থাকে!”
রাজা হুংকার ছাড়লেন, “আমি বুঝতে পেরেছি, আমার নামে এইসব মিথ্যে কথা আপনিই রটিয়েছেন!”
রাজার হুংকার শুনে মন্ত্রীমশাই ভয়ে ব্যস্ত হয়ে বলে ফেললেন, “আপনি কিছুই বুঝতে পারেননি মহারাজ।”
আগুনে যেন ঘি পড়ল। রাজা কাক্কাবোক্কা দপ করে জ্বলে উঠলেন। বললেন, “বলেন কী, আমি কিছুই বুঝতে পারিনি! এ্যাঁ! এর পরে বলবেন, বাছুরটা জন্মেই উঠে দাঁড়াল, এটা আমি বুঝতে পারিনি! উঠে দাঁড়িয়েই সে ছুটতে আরম্ভ করল, এই আজব ব্যাপারটাও আমি বুঝতে পারিনি! ছুটতে ছুটতে সে লাফাতে লাগল, আমি তাকে ধরতে গেলুম, সে আমাকে লাথি মারল, আমি তাও বুঝতে পারিনি! ভাল!”
হঠাৎ মন্ত্রীমশাই রাজা কাক্কাবোক্কার কথার শেষে খুবই উৎসাহে চেঁচিয়ে উঠলেন, “এই তো মহারাজ, আপনি নিজেই তো স্বীকার করছেন বাছুরটা আপনাকে লাথি মেরেছে।”
রাজা চটে লাল, “আপনার আস্পদ্দা তো কম নয়! আপনি আমাকে মিথ্যুক ঠাওরান! লাথি খাওয়া আর লাথি মারা এক হল! আমি তো আপনাকে লাথি মারার কথা বলেছি। লাথি খাওয়ার কথা তো বলিনি। আপনিই তো লাথি খাওয়ার কথা বলছেন।”
রাজার কথা শুনে মন্ত্রীমশাই কেমন যেন থতমত খেয়ে গেলেন। তাঁর কেমন যেন ধাঁধা লেগে গেল। তিনি কী বলবেন, না বলবেন ভেবে ওঠার আগেই রাজা কাক্কাবোক্কা বলে উঠলেন, “ঠিক আছে, আমি আপনার পেটে একখানি ঘুষো মারি। আপনার বিবেচনায় সেটি যদি খাওয়া হয়, তবে নিশ্চয়ই আপনার পেটও ভরবে!”
মন্ত্রীমশাই ঢোঁক গিললেন। বলে উঠলেন, “আজ্ঞে, এ-ক্ষেত্রে ঘুষো খাওয়ার কথা ওঠে না।”
রাজা জিজ্ঞেস করলেন, “তবে কী খাওয়ার কথা ওঠে?”
মন্ত্রী বললেন, “আজ্ঞে, লাথি খাওয়ার কথা।”
রাজা গাঁক করে উঠলেন, “ঠিক আছে। তা হলে আপনাকে লাথিই—” বলতে গিয়ে আবার সামলে গেলেন রাজা কাক্কাবোক্কা। তিনি অজান্তে জিব কেটে ফেললেন।
কিন্তু সামলাতে পারলেন না মন্ত্রীমশাই। রাজাকে অমন করে জিব কাটতে দেখে, তাঁর ভয়-মাখানো মুখের ওপর ফিক করে এক টুকরো হাসি পিছলে পড়ল। ব্যাস! উলটা বুঝিলি রাম! রাজা রেগে টং। জিজ্ঞেস করলেন, “ফিক করে হাসা হল কেন?”

আর হাসি! মন্ত্রীর তখন বুকের ধুকধুকি ধকধক করতে শুরু করে দিয়েছে। ইস! বে-আক্কেলে হাসিটা কি হাসবার আর সময় পেল না! এখন কী উত্তর দেবেন তিনি!
তাঁকে আর উত্তর দিতে হল না। রাজাই আবার কড়কে উঠলেন, “ফিক করে হাসা হল কেন?”
আর কথা না বলে উপায় নেই মন্ত্রীমশায়ের। তিনি অত্যন্ত কাঁচুমাচু হয়ে বললেন, “মহারাজ, মাপ করবেন। আমি হাসতে চাইনি। হাসিটাই আমার সঙ্গে শত্রুতা করে হেসে দিয়েছে!”
“বটে!” রাজা কাক্কাবোক্কা কড়কে উঠলেন। “বেশ রসিকতা করতে শিখেছেন তো! হাসিটা আপনার সঙ্গে শত্রুতা করে হাসিয়ে দিল! এ্যাঁ! এ কি ছেলেমানুষের হাসি যে, হাসি না পেলে হাসিটাই হাসিয়ে দেবে! আপনি মশায় একটা ধুমসো লোক! আপনাকে হাসিটা হাসিয়ে দিল, এ আমায় বিশ্বাস করতে হবে! আমাকে আপনি বোকা ঠাওরেছেন! ভেবেছেন এই বলে পার পেয়ে যাবেন! আমি বুঝতে পেরেছি, এর পেছনে আপনাদের গভীর ষড়যন্ত্র আছে। আমি এক এক করে সক্কলকে দেখে নেব।”
মন্ত্রীমশায়ের গলা শুকিয়ে গেল ভয়ে। তিনি খকখক করে কেশে উঠে বললেন, “বিশ্বাস করুন মহারাজ, আমি কোনও ষড়যন্ত্রের মধ্যে নেই।”
রাজা কাক্কাবোক্কা চোখ টেরিয়ে দেখে নিলেন মন্ত্রীমশাইকে। তারপর সন্দেহে চোখ পাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “ষড়যন্ত্রের মধ্যে নেই! তবে বাছুরটা আমায় লাথি মারল কেন?”
“আজ্ঞে, আপনি তাকে ধরতে গেলেন বলেই তো সে আপনাকে মারল।”
মন্ত্রীর কথা শুনে রাজা এবার ভয়ংকর চটিতং। তিনি হাঁকার দিলেন, “নিজেরা দোষ করে এখন দোষটা আমার ঘাড়ে চালান করে দিচ্ছেন। বাহ্! খুব কায়দা, শিখেছেন তো! আমি যদি বলি বাছুরটাকে আপনারা আমার পেছনে লেলিয়ে দিয়ে আমাকে হত্যা করার ফন্দি এঁটেছিলেন!”
মন্ত্রীমশাই আর থাকতে পারলেন না। সটান ঘরের মেঝেয় লুটিয়ে পড়ে চেঁচিয়ে উঠলেন, “রাজামশাই গো, এমন কথা কেন বললেন গো! আমি আপনার গোঁফের দিব্যি করে বলছি, এমন ফন্দি আমি জীবনে করিনি!”
“তবে বাছুরটা লাফায় কেন? আপনাদের উসকানি না থাকলে ব্যাটা জন্মেই পা ছোড়ে! আমায় লাথি মারে!”
মন্ত্রীমশাই তেমনই ব্যাকুল হয়ে বলে উঠলেন, “বিশ্বাস করুন মহারাজ, বাছুরের লাফালাফিতে আমার কোনও উসকানিও নেই, ফুসফাসানিও নেই। আমি নির্দোষ! এ-ব্যাপারে আমার কোনওই হাত নেই!”
রাজা কাক্কাবোক্কা এবার ঠেস দিয়ে কথা বললেন, “এই তো, পথে আসুন। আপনি নির্দোষ! এ-ব্যাপারে আপনার কোনও হাত নেই তো, কার হাত আছে?”
কী ফ্যাসাদ দ্যাখো দিকিনি! বুড়ো মন্ত্রীকে একেবারে নাজেহাল করে ছাড়লেন। আচ্ছা, মন্ত্রীমশায়ের নিজের হাত নেই বলার মানে কি আর কার হাত আছে সেটা জানা! আশ্চর্য যুক্তি!
“কী হল!” হঠাৎ রাজা কাক্কাবোক্কা গর্জে উঠলেন, “কথা বলছেন না কেন?”
এরকমভাবে অন্যায় বকাবকি করলে মানুষের মেজাজ কি ঠিক থাকে! কিন্তু মন্ত্রীমশাই একটুও রাগ করলেন না। করলেও সেটা মনের মধ্যে চেপে রাখলেন। তারপর খুবই ইনিয়ে বিনিয়ে বললেন, “এর পেছনে ভগবানের ছাড়া আর কার হাত থাকতে পারে বলুন!”
“ভগবানের?” রাজার কপালের চামড়া কোঁচকাল।
“আজ্ঞে।” উত্তর দিলেন মন্ত্রী।
“তার আসকারায় বাছুর আমাকে লাথি মেরেছে?”
“আজ্ঞে।”
“ভগবানের হাতের এত জোর?”
“আজ্ঞে।”
“তার হাতটা আমার চাই। যেমন করে পারেন সেই হাত ভেঙে আনার ব্যবস্থা করুন!”
“আজ্ঞে, হুজুর!” চমকে উঠলেন মন্ত্রী।
“কোনও কথা নয়!” ধমক দিলেন রাজা। “কোনও ওজর-আপত্তি শুনব না আমি। যার হাতের জোরে আমি লাথি খাই, তার হাত আমার চাই-ই চাই!”
মন্ত্রীমশাই ভ্যাবাচাকা খেয়ে গেলেন। কী বলতে চেয়েছিলেন তিনি, সে তো একটা বাচ্চা ছেলেও জানে। ভগবানের হাত কোথায় আছে, সে ভগবানের দেখা না পেলে কে ভেঙে আনবে! আরে বাবা, বাঘা বাঘা মানুষ তার কোনওদিন দেখা পেল না এখনও পর্যন্ত, তো এই বুড়ো মন্ত্রী! কী হ্যাপা বলো দিকি! আর, এ এমন একগুঁয়ে রাজা, একবার যেটি মাথায় ঢুকবে, তার হেস্তনেস্ত না হওয়া পর্যন্ত ছাড়ান নেই। সত্যি, খুবই ভেঙে পড়লেন মন্ত্রীমশাই।
ভাঙা মন নিয়ে তিনি রাজার ঘর থেকে বেরিয়ে যখন এদিকেই আসছিলেন, তখন দেখা হয়ে গেল রাজবাড়ির ওস্তাগরের সঙ্গে। ওস্তাগরেরও বয়েস হয়েছে। মন্ত্রীকে অমন মনমরা হয়ে হাঁটতে দেখে, ওস্তাগর থমকে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল, “মন্ত্রীমশাই, অমন শুকনো মুখে কোথায় চললেন?”
“আর বল কেন ভাই, আমার ভীষণ বিপদ।”
“কীসের বিপদ?”
“রাজামশাই বলেছেন, তাঁর ভগবানের হাত চাই। আচ্ছা বলো তো, এমন অসম্ভব আবদার আমি কেমন করে মেটাই!”
মন্ত্রীমশায়ের কথা শুনে ওস্তাগার হো-হো করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে বলল, “ও, তাই বলুন! এই জন্যেই আপনার মন খারাপ। কিচ্ছু ভাববেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে।”
“তুমি কী করে বলছ ভাই, সব ঠিক হয়ে যাবে?”
ওস্তাগর উত্তর দিল, “বলছি কেন জানেন, আপনার ওই ভগবানের হাত আমার কাছে আছে বলেই বলছি!”
মন্ত্রীমশাই ফ্যাকাশে মুখে একটু কষ্ট করে হেসে বললেন, “তুমি কি আমার সঙ্গে তামাশা করছ ভাই?”
“তামাশা কি সাচ্চা, সেটা আমি প্রমাণ করে দিলেই তো হল!” হাসতে হাসতেই উত্তর দিল ওস্তাগর।
“সাচ্চা, কী করে বলছ ভাই? ভগবানের হাত এ তো কথার কথা।” মন্ত্রীমশাই জবাব দিলেন।
“এখন রাজামশাই যদি এই কথার-কথাটাকেই সত্যি বলে মনে করেন, তখন তার জবাবটাও তো সেই কথার মতোই হওয়া চাই।” উত্তর দিল ওস্তাগর। তারপর বলল, “এখন আপনি ঘরে যান। খানিক পরে আমি নিজে ভগবানের হাত আপনাকে দিয়ে আসব।”
ওস্তাগরের আশ্বাস পেয়ে মন্ত্রীমশাই নিজের ঘরে ফিরে গেলেন ঠিকই, কিন্তু মন তাঁর কিছুতেই ওস্তাগরের কথায় বিশ্বাস করতে পারছিল না। ভগবানের হাত, সে আবার কী! সে হাত ওস্তাগর কোথা থেকে পাবে!
যেমন কথা ছিল, ঠিক সেই কথামতোই খানিক পরে ওস্তাগর মন্ত্রীমশায়ের ঘরে হাজির। হাতে একটি বেতের তৈরি টুকরি। আঁটসাঁট করে মুখ ঢাকা। ঝলমলে রেশমি কাপড় দিয়ে চমৎকার করে বাঁধা। মন্ত্রীমশাই তো উদগ্রীব হয়ে বসেই ছিলেন। ওস্তাগর ঘরে ঢুকতেই মন্ত্রীমশাই ব্যস্ত হয়ে তাকে কাছে ডেকে নিলেন। বসল ওস্তাগর। মন্ত্রী তার হাতের টুকরিটার দিকে কেমন যেন হতভম্বের মতো তাকিয়ে রইলেন। অবশ্য মন্ত্রীমশাইকে কিছু বলতে হল না। ওস্তাগরই মন্ত্রীমশায়ের মুখের চেহারা দেখে নিজেই বলল, “ভাবছেন বোধহয়, আমার হাতে এটা কী?” তারপরে নিজেই হাসতে হাসতে বলল, “এর ভেতরই ভগবানের হাত আছে।”
ছ্যাঁত করে উঠল মন্ত্রীমশায়ের বুকের ভেতরটা। অবাক হয়ে সেই রেশমি কাপড়-বাঁধা টুকরিটা দেখতে দেখতে নিজেই ভাবতে লাগলেন, কী বলে লোকটা!
ওস্তাগর এমন সময় বলে উঠল, “আপনার ঘাবড়াবার কিছু নেই। আমি যেমনটি যেমনটি বলব, ঠিক তেমনটি আপনাকে অক্ষরে অক্ষরে করতে হবে। আপনি খুব সাবধানে এই টুকরিটি রাজামশায়ের কাছে নিয়ে যান। তাঁকে বলবেন, এই টুকরির মধ্যেই আছে ভগবানের হাত। বলবেন, আজও নয়, কালও নয়, পরশুদিন সূর্য ওঠার ঠিক আগে, এই টুকরির বাঁধন খুলতে হবে। তার আগেও নয়, পরেও নয়। তা হলেই কিন্তু সব গুবলেট হয়ে যাবে। আর তাঁকে সাবধান করে দেবেন, তিনি ছাড়া ভগবানের হাতের এই খবরটি অন্য কেউ যেন না জানতে পারে। টুকরিটি কেউ দেখতে না পায়। এমনকী রানিও।”
মন্ত্রীমশাই কেমন যেন একটা সন্দেহ-মেশানো গলায় উত্তর দিলেন, “আচ্ছা, তুমি যা বলছ তাই করব।”
মিথ্যে বলব না, সন্দেহ হলেও মন্ত্রীমশাই টুকরিটি রাজার কাছে তক্ষুনি তক্ষুনি নিয়ে গেলেন। ওস্তাগর যেমন যেমন শিখিয়ে পড়িয়ে টুকরিটি রাজাকে দিতে বলেছিল, সেগুলি সব ঠিক-ঠিক তিনি বলেও ছিলেন। কিন্তু এ-এক আশ্চর্য বোক্কা রাজা! মন্ত্রীমশায়ের হাত থেকে টুকরিটি পেয়ে তিনি সত্যিই ধরে নিলেন, এর মধ্যে ভগবানের হাত আছে। তিনি শুধু নাচতেই বাকি রাখলেন! প্রথমটা তিনি হেসেও ফেলেছিলেন খুব জোরে, খুশিতে। তারপর সামলে গেলেন মন্ত্রীমশায়ের চোখ-মটকানিতে।
না, রানি কেন, রাজবাড়ির একটি প্রাণীও জানতে পারল না, ভগবানের হাতের সেই টুকরির কথা। এমন জায়গায় রাজা কাক্কাবোক্কা লুকিয়ে রাখলেন, কার সাধ্যি টের পায়! কিন্তু রাখলে কী হবে, রাজা নিজেকে নিয়ে নিজেই পড়লেন মুশকিলে। সারাদিন যেমন-তেমন। কিন্তু সন্ধে হতেই মনটা তাঁর এমন ছুঁকছুঁক করতে লাগল। বারবার মনে হচ্ছিল টুকরিটা খুলে এখনই তিনি ভগবানের হাতটা একবার দেখে নেন। না, খুলে কাজ নেই। মিছিমিছি লোভ ভাল নয়। পরশুদিন তো আর খুব দূরে নয়। আজ রাতটা, তারপর কালকের রাত। তারপরেই কেল্লা ফতে। অবিশ্যি টুকরিটা একটু নেড়েচেড়ে দেখা যেতে পারে। উঁহুঁ, একদম নয়। হুট করে কখন যে রানি ঘরে ঢুকে পড়বেন কেউ জানে না। তার চেয়ে ধৈর্য ধরাই ভাল।
কিন্তু রাজার মন মানে কই। কোনওরকমে মনকে প্রবোধ দিয়ে তিনি রাতে শুয়ে পড়লেন! কিন্তু শুলে কী হবে, কখনও তিনি উঠে বসেন। কখনও তিনি বালিশ নিয়ে ধামসা-ধামসি করেন। কখনও হাই তোলেন। কখনও জল খান। রাজামশায়ের দোষ নেই। তোমার-আমার ঘরেও যদি এমনি করে ভগবানের হাত লুকনো থাকত, আমাদেরও এই দুর্ভোগে পড়তে হত। চোখ বুজত না ঘুমে। মন বসত না কাজে। আমাদেরও নাস্তানাবুদ হতে হত।
সত্যি, চোখে সেদিন রাজা কাক্কাবোক্কার ঘুম এল না। হঠাৎ একটি পাখি ডেকে উঠল বাইরের বাগানে। ব্যাস! অনিদ্রায় রাত কেটে গেল রাজা কাক্কাবোক্কার। মন তাঁর ওই ভগবানের হাতের টুকরিটির জন্যে এমনই উচাটন হয়ে উঠল যে, তিনি কিছুতেই আর থাকতে পারছেন না। এ খুব অন্যায়। এমন করে তিন দিনের সময় নেওয়া খুবই অনুচিত! একটা রাত তাঁর ঘুমই হল না। আবার আজকের রাতেও তো রাজার চোখে ঘুম না আসতে পারে। ঘুম না আসা মানে, আবার সেই ছটফটানি। আচ্ছা, আজকের ভোরের সঙ্গে কালকের ভোরের তফাতটা কোথায়! আজকের ভোর যা কালকের ভোরও তা। আজকে যেমনভাবে আকাশ রাঙিয়ে সূর্য উঠবে, কালও তো তেমন করেই সূর্য উঠবে। তবে শুধুমুধু শরীরকে কষ্ট দেওয়া কেন? রাজা কাক্কাবোক্কা এইসব কথা ভাবতে ভাবতে বিছানা ছেড়ে বাগানের অলিন্দের সামনে এসে দাঁড়ালেন। হ্যাঁ, ভোরের আলো দেখা দিয়েছে। সূর্য এখনও ওঠেনি। আকাশ লাল হচ্ছে। পাখির কিচিরমিচির শুরু হয়ে গেছে। গোশালে গোরুর ডাকাডাকি কানে আসছে। হ্যাঁ, গোরুর ডাক শুনেই রাজার মনে পড়ে গেছে সূর্য উঠে পড়বে। রাজা কাক্কাবোক্কা তাড়াতাড়ি, খুব তাড়াতাড়ি দেরাজের পেছন থেকে লুকনো রেশমি-বাঁধা টুকরিটা বার করে আনলেন। ঝটপট খুলে ফেললেন রেশমি কাপড়ের আস্তরণ। চটপট করে টুকরির ঢাকাটা খুলতেই হঠাৎ রাজার শয়নকক্ষের দরজা ঠেলে রানি ঢুকে পড়লেন। রাজা থতমত খেয়ে গেছেন। তাড়াতাড়ি টুকরিটাকে সরিয়ে ফেলে, তিনি নিজেও দেরাজের আড়ালে লুকিয়ে পড়লেন।
রাজা যে রানির ভয়ে লুকিয়ে পড়বেন, এ-কথা আর কে ভাবে! রানি তাই বিছানায় রাজাকে না দেখে নরম গলায় ডাক দিলেন, “মহারাজ!”
মহারাজের সাড়া নেই।
আবার ডাকলেন, “মহারাজ!”
মহারাজের তবু সাড়া নেই।
মহারানির কেমন যেন আশ্চর্য লাগল। এই ভোরে রাজামশাই কোথায় গেলেন! তিনি আবার ডাকলেন। এবারও সাড়া পেলেন না। তিনি ঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন। রাজার শয়নকক্ষের প্রহরীকে জিজ্ঞেস করলেন, “মহারাজ ঘরে নেই, কোথায় গেছেন দেখেছ?”
“আজ্ঞে না তো। তিনি তো ঘর থেকে বেরোননি।” উত্তর দিল প্রহরী।
“তিনি তো ঘরে নেই।” রানি ব্যস্ত হয়ে উঠলেন।
প্রহরী ভড়কে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, “আপনি ঠিক দেখেছেন?”
দুশ্চিন্তায় অস্থির রানি উত্তর দিলেন, “দেখেছি, ডেকেছি। দেখাও পাইনি, সাড়াও দেননি।”
প্রহরী রানির কথা শুনে ঘরে ঢুকল। “মহারাজ, মহারাজ” বলে ডাকাডাকি শুরু করে দিল। কিন্তু কে সাড়া দেবে! যিনি সাড়া দেবেন, তিনি তখন দেরাজের পেছনে ঘাপটি মেরে লুকিয়ে আছেন। হঠাৎ প্রহরী থমকে দাঁড়াল। তার নজর পড়ে গেল, সেই টুকরিটার দিকে। দেখেই সে চেঁচিয়ে উঠল, “রানিমা, এটা কী?”
রানিমা হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এলেন। দেখলেন, একটা বেতের টুকরি। খালি। দেখলেন, খানিকটা রেশমি কাপড়। অবাক হয়ে বললেন, “তাই তো!”
ঠিক এই সময়ে রাজা কাক্কাবোক্কা দেরাজের আড়াল থেকে উঁকি মারলেন। তাঁর বুক ঢিপঢিপ করে উঠল। তিনি না পারলেন বেরোতে, না পারলেন চেঁচাতে! তিনি শুধু ভাবতে লাগলেন, “টুকরিটা খালি কেন?”
এদিকে হইহই কাণ্ড। সবার মুখে এক কথা, রাজামশাইকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। মন্ত্রীমশায়ের কানে এমন একটা গুরুতর কথা পৌঁছতে বেশি সময় লাগল না। কথা শুনে তাঁর তো বুক শুকিয়ে কাঠ। কী রে বাবা, ভগবানের হাত নিয়ে শেষে কিছু একটা ভয়ংকর বিপদ ঘটে গেল নাকি! তিনিও ছুটলেন। একেবারে রাজার শয়নকক্ষে। ঘর ফাঁকা, এমনকী রানি পর্যন্ত ব্যস্ত হয়ে অন্য ঘরে খোঁজ চালাচ্ছেন। তিনি শয়নকক্ষে ঢুকে যেই ‘মহারাজ’ বলে ডাক ছেড়েছেন, মহারাজ দেরাজের আড়াল থেকে দেখতে পেয়েছেন। দেখতে পেয়ে রেগে আগুন! মন্ত্রীমশাই ঘরের এদিক-সেদিক খুঁজতে খুঁজতে পালংকের নীচে যেই মাথা গলিয়েছেন, ব্যাস! অমনই আর এক কাণ্ড! দেরাজের পেছন থেকে রাজা কাক্কাবোক্কা ঝপ করে বেরিয়ে এসে, খপ করে মন্ত্রীর গলাটা খামচে ধরেছেন। মন্ত্রী ‘ওরে বাপ রে’ বলে ভয়ে আঁতকে উঠতেই, রাজা চেপে ধরেছেন তাঁর মুখখানা। চেপে ধরেই রাজা চাপা স্বরে ধমকে দিলেন, “চুপ!”
মন্ত্রী চুপ করলেন না। ফিসফিসিয়ে বলে উঠলেন, “ছেড়ে দিন মহারাজ! আমার ঘাড়ে লাগছে!”
মন্ত্রীর কথা শুনে রাজা তেলে-বেগুনে জ্বলে উঠে বলে উঠলেন, “আমাকে বিপদে ফেলার সময় মনে ছিল না! আমার সঙ্গে টোক্কা ফক্কা খেলা!” বলে মন্ত্রীর ঘাড়ে মারলেন এক ঝটকা। মন্ত্রী হুমড়ি খেয়ে পালংকের নীচে গড়াগড়ি খেলেন। খেয়েই চিৎকার করে উঠলেন।
তাঁর চিৎকার শুনে রাজা কাক্কাবোক্কা আবার কড়কে উঠলেন, “চেঁচানো হচ্ছে!”
মন্ত্রীমশাই তবু থামলেন না। তিনি চেঁচাতেই লাগলেন, “ওরে বাবা রে!”
রাজা মন্ত্রীমশায়ের চিৎকার থামাতে তাঁর বুকের ওপর চেপে বসলেন। মন্ত্রীর তো দফা শেষ। তিনি একে বুড়ো, তার ওপর একগাল দাড়ি। বুড়োর দম আটকে আসছে, দাড়িতেও টান লাগছে। তিনি আর না পারছেন চেঁচাতে, না পারছেন ছাড়াতে। শেষে যখন মনে হল দম ফেটে তিনি বুঝি মরে যান, তখন মারলেন এক ঠেলা। মন্ত্রীর বুক থেকে রাজা ছিটকে ধপাস! তারপর লেগে গেল ধস্তাধস্তি। পালংকের নীচে সে এক ধুন্ধুমার কাণ্ড। প্রথমটা হচ্ছিল চাপা গলায় তড়পানি। তারপর কাঁপা গলায় কড়কানি। শেষে হুহুংকার, আর্তনাদ। রাজা আর মন্ত্রীতে সে কী লড়াই! দু’জনেই বেপরোয়া! লড়তে লড়তে দু’জনেই এমন বেঁহুশ হয়ে পড়লেন, ঘরে যে কখন রানিমা হাজির হয়েছেন, সেটি পর্যন্ত তারা খেয়াল করতে পারলেন না! প্রথমটা রানিমা তাঁদের দেখতে পাননি। শুধু তাঁদের তড়পানি শুনতে পাচ্ছিলেন। রানিমা এদিক ওদিক খুঁজতে খুঁজতে যখন পালংকের নীচে উঁকি মেরেছেন, তখন তো তিনি থ! দুটো ধুমসো লোকের এ কী কাণ্ড! দেখে তাঁর চক্ষু ছানাবড়া! তিনি কী করবেন, কী বলবেন ভেবে না-পেয়ে মারলেন এক ধমক, “কী হচ্ছে আপনাদের?”
রানির এক ধমকেই কাজ। দু’জনেই থতমত খেয়ে থমকে গেছেন। দু’জনেই চোখ ঘুরিয়ে রানিকে দেখে, এ ওকে ছেড়ে দিয়েছেন। ধড়ফড়িয়ে উঠে পড়েছেন। পালংকের নীচে মাথা ঝুলিয়ে পিটপিট করে দেখতে লেগেছেন। ছিঃ ছিঃ! কী লজ্জা! দু’জনেই লজ্জায় মরে যান আর কী! যতই হোক, কথাটা তো বলার মতো নয়। একটা পালংকের নীচে রাজা আর মন্ত্রী মারামারি করছেন, আর রানি তাই দেখে তাঁদের ধমক দিয়ে থামাচ্ছেন, এ-কথা বলতেও লজ্জা, শুনতেও লজ্জা। সুতরাং দু’জনেরই মাথা হেঁট। হেঁট মাথায় তখন তাঁরা হয়তো দু’জনেই ভাবছিলেন, এরই নাম বোধহয় ভগবানের হাত! ভগবানের হাত আছে বলেই লড়াইটা লাগল, লড়াইটা থামল। সে হাত দেখা যায় না।

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন